সাবলেট - পর্ব ৩৫ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

          বাসায় ফিরে প্রথমেই নিশ্চিত হলাম, তানজিনা বাসায় নেই। পুরোপুরি একা আছি নিশ্চিত হয়ে ল্যাপটপটা নিয়ে সোফায় বসলাম। ল্যাপটপ চালু হলে প্রায় পাঁচ মাস আগে হার্ড ড্রাইভে ডাউনলোড করে রাখা ওর এনআইডি কার্ডের স্ক্যান কপিটা বের করলাম।
এনআইডি কার্ডে যে জায়গাটার নাম আছে ওটা নিশ্চয়ই ওর জন্মস্থান বা বাড়ি। ভালোমতো খেয়াল করে দেখলাম ঠিকানা হিসেবে ত্রিশালের নাম লেখা। ত্রিশাল ময়মনসিংহে। আমি আগে কখনও ওখানে যাইনি। গুগলে সার্চ করলাম। ঢাকা থেকে বাসে যেতে প্রায় আড়াই-তিন ঘণ্টা লাগবে। 
তারপার গুগলে আরো কিছুক্ষণ সময় কাটালাম। গুগল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ত্রিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একটা ফেসবুক পেজ আর ফোন নম্বর পেয়ে গেলাম।
ল্যাপটপ স্ক্রিনে নম্বরটা দেখে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। আমি ঠিক কী ভাবছি? ত্রিশালে তানজিনার বাড়ি বলে কি ওকে এই স্কুলেই পড়তে হবে? তিশার বাসায় নাবিলা আর তিশা দুজনই আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন আমি পাগল হয়ে গেছি। মনে হচ্ছিল ওরা আমাকে ভয় পাচ্ছে। আর এখন যেহেতু বাসায় বসে বসে ময়মনসিংহের হাইস্কুল গুগল করছি... কেন জানি না মনে হচ্ছে, ওরা হয়তো ভুল ভাবেনি।
তবু বুকের ভেতরটা বলছে, কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে।
ফোনটা টি-টেবিলে রাখা আছে। হঠাৎ সেটা কাঁপতে শুরু করল। কে কল করছে দেখার জন্য ডিভাইসটা হাতে নিলাম। ধুর, আসিফ! অসুস্থতার কথা বলে অফিস ছুটি চাওয়ার কথা একদম ভুলে গেছি। তবু কলটা রিসিভ করলাম।
“আহসান!” আসিফ গর্জে উঠল, “কোথায় তুমি? বিশ মিনিট পরেই এমডি স্যারের সাথে মিটিং আছে, ভুলে গেছো?”
পুরনো চাকরিতে থাকলে এই মিটিংটা আমিই লিড দিতাম। এখন আমি ফাইল ফটোকপি করি, কফি ঢালি... আর মিটিংয়ের মিনিটস লিখি। তবে মিটিঙের কথা আমার অবশ্যই মনে আছে। “সরি স্যার,” আমি বললাম। “ আমি খুব অসুস্থ। বিছানা থেকেই উঠতে পারছি না।”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। “তুমি অসুস্থ?” 
“জি স্যার। সকাল থেকেই জ্বর। সাথে শরীরে ব্যথা করছে... খুব বাজে অবস্থা, স্যার।”
“জানো,” আসিফ বলল, “রফিক আজ সকালে তোমাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। তুমি তখন ধানমন্ডিতে ছিলে তিশা ভাবিদের বাসার কাছে।”
এটা কি সম্ভব? আমি তো ওখানেই ছিলাম। তিশা আর জাহিদের বিল্ডিংয়ের সামনে। কিন্তু রফিক তো খুব বদমাশ ছেলে। আমি ওখানে না থাকলেও বানিয়ে বানিয়ে ঠিকই বলতো আমাকে ওখানেই দেখেছে। আমাকে বিপদে ফেলতে ও মিথ্যা বলতেও দ্বিধা করবে না।
“ও এটাও বলেছে,” আসিফ যোগ করল, “তুমি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে টি-শার্ট খুলছিলে।”
ঠিক আছে। আমি যে টি-শার্ট খুলেছিলাম কোনো সন্দেহ নেই। আমার গলা শুকিয়ে গেল। “ওহ...” শুধু এটুকুই বলতে পারলাম।
“মানে তুমি কিন্তু অসুস্থ না।”
“আমি... আমি...” আমার বসের সাথে নিজের ব্যক্তিগত সমস্যা শেয়ার করার ইচ্ছে একদম নেই। ও তো এমনিতেই আমাকে অপছন্দ করে। “সকালটা খুব খারাপ গেছে স্যার। পার্সোনাল কারণে আমার একটা লিভ দরকার।”
“যে ব্যাপারটা আমি একদম পছন্দ করি না,” আসিফের কণ্ঠটা বেশ কঠিন। “সেটা হলো তোমার এই ধোঁকাবাজি। চাইলে তো ইমার্জেন্সি লিভ নিতেই পারতে। ঘুম থেকে উঠেই জানাতে পারতে। কিন্তু তুমি ব্যাপারটা না বলে চুপচাপ বসে থাকলে। আর এখন তুমি মিথ্যা বললে। তবে তোমার ব্যাপারে যা শুনেছি, তাতে আমি অবাকও হচ্ছি না।”
“আমি... আমি দুঃখিত স্যার,” আমি কাঁপা গলায় বললাম। 
“ওকে আসতে না চাইলে এসো না। ঠিক আছে? কালও আসার দরকার নেই।” 
“স্যার—” 
“তোমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পিওন দিয়ে পাঠিয়ে দেব। গুডবাই, আহসান।”
তারপরই সে ফোনটা কেটে দিল।
ও আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দিল! এক মুহূর্তে! বিশ্বাসই হচ্ছে না। আবার... হচ্ছেও। কারণ সত্যি বলতে, সাম্প্রতিক সময়ে আমি কাজে অনেক গড়িমসি করছি। অফিসে গেলেও কাজে মন দিতে পারছি না। একটা টেম্পরারি জবও ধরে রাখতে পারলাম না।
এখন ও আমার এইচআর এজেন্সিকে জানাবে আমি ফায়ারড। তারপর? জানি না। এজেন্সি হয়তো আবার আরেকটা অপমানজনক কাজ ধরিয়ে দেবে। আর ওটা না হলে হয়তো বাসাটাও বিক্রি করে দিতে হবে। 
কোথাও না কোথাও অবশ্যই অবশ্যই এসবের পেছনে তানজিনার হস্তক্ষেপ আছে। কিন্তু কেন? কীভাবে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।
আবার ল্যাপটপের দিকে মন দিলাম। ত্রিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এখন তো অফিস খোলা থাকার কথা। অন্তত এটা তো আমি করতেই পারি।
ফোনে এগারোটা ডিজিট চাপলাম। সঙ্গে সঙ্গে রিং টোন বাজল। আর আমার তালু ঘেমে উঠল। ঠিক কী করছি জানি না, কিন্তু শুরু তো কোথাও না কোথাও থেকে করতেই হবে। তানজিনা হক সম্পর্কে আরও তথ্য দরকার। আর স্কুলটা তথ্য পাবার চেষ্টা শুরু করার জায়গা হিসেবে খারাপ না। যদিও জানি না, ওরা এত বছর আগের কোনোকিছু নিয়ে আমাকে সাহায্য করতে পারবে কি না। 
কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশে গম্ভীর কণ্ঠের এক ভদ্রমহিলা কল ধরলেন। “হ্যালো, ত্রিশাল গার্লস স্কুল,” তিনি বললেন।
আমি গলা খাঁকারি দিলাম। “জি, স্লামালিকুম। আমার নাম... জামান। আমি একজন ক্যান্ডিডেটকে চাকরি দেওয়ার কথা ভাবছি। তাই ওর এসএসসি-র সার্টিফিকেটটা ভেরিফাই করতে চাই। ও বলেছে, আপনারা হয়তো এ বিষয়ে হেল্প করতে পারবেন।”
“অবশ্যই পারব,” ভদ্রমহিলা বললেন, “তবে এজন্য স্টুডেন্টের রোল আর রেজিস্ট্রেশন নম্বর লাগবে।”
ধুর। আমাকে যে এই বিষয়ের সম্মুখীন হতে হবে আশা করিনি। “আসলে, ও তো কাগজপত্র ছাড়াই ইন্টারভিউ দিতে চলে এসেছে। শুধু নাম আর সেশনটা জানি।”
সৌভাগ্যক্রমে তিনি নরম হলেন। “আচ্ছা, বলুন তো দেখি। পুরনো রেকর্ড চেক করতে হবে। তবে আপনাকে সাহায্য করতে পারব কি না জানি না। ক্যান্ডিডেটের নাম কী?” 
“তানজিনা হক।” 
হঠাৎ ওপাশে কলমের খসখস করার শব্দ থেমে গেল। 
“তানজিনা হক?” 
“জি।” 
“তানজিনা হক চাকরির জন্য আবেদন করেছে?” 
“হ্যাঁ। কোনো সমস্যা আছে?”
ওপাশ থেকে ওনার দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল। “হয়তো কথাটা আমার বলা উচিত না, কিন্তু...”
“কিন্তু কী?”
“আপনি যদি তানজিনা হককে চাকরি দেয়ার কথা ভেবে থাকেন, ” ভদ্রমহিলা গলা নামিয়ে বললেন, “তাহলে আমি জোর দিয়ে বলব, চাকরিটা অন্য কাউকে দিন।”
আমি ফোনটা আরও শক্ত করে ধরলাম। “কিন্তু কেন?” 
এবার তিনি গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “তানজিনা হক ভীষণ ভয়ংকর একটা মেয়ে। আমি হলে ওর ছায়াও মাড়াতাম না।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp