কামিনী - পর্ব ৭৯ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          ঢাকের শব্দ থেমে গিয়েছে বোধহয়। এই বদ্ধ কক্ষটিতে শোনা যাচ্ছে না ঠিক। চোখ গুলো ঝাপসা থেকে স্পষ্ট করার চেষ্টায় রত রানি দেখলেন ঘুঙুরের শব্দ থেমে গিয়েছে। চারপাশে জ্বলতে থাকা মশালের আলোয় মৃদু মৃদু দেখা যাচ্ছে ঘুঙুর পায়ে জড়ানো, দাঁড়িয়ে থাকা একটি নারীমূর্তিকে। 
 মাথা উঁচিয়ে ভালো করে তাকানোর আগেই আচমকা যেন আক্রমণ করল নারীটি। রানি কোনোরকমে সেই আক্রমণ থেকে বাঁচলেন হামাগুড়ি দিয়ে। তিনি বুঝেই উঠতে পারছেন না, প্রাসাদের ভেতরে থেকেও তিনি কোন গোলকধাঁধায় এমন করে আটকে গিয়েছেন। সামনের নারীটিও বা কে যিনি এমন করে হামলে পড়তে চাইল তার উপর।

  দ্বিতীয় বার সেই নারীটি হাত বাড়াতে নিলেই রানি আটকে দেন হাত। প্রতিরক্ষার ক্ষমতার তার বেশ জানা আছে বিধায় সেই অজ্ঞাত নারীটি সহজেই এসে পড়ে তার হাতের মুঠোর। রানি সেই নারীর হাত চেপে ধরে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়,
“থামুন, থামুন। কিচ্ছুটি করব না আমি। ধৈর্য ধরুন। আমাকে কথা বলতে দিন…”

  হাত চেপে আটকে দেওয়াতে গোঙাতে থাকে সেই নারী। রানির কথায় শান্ততো হয়ইনি বরং আরও উগ্র আচরণ করতে থাকেন। রানি শেষমেষ কণ্ঠ আরও শান্ত করে। এমন পরিস্থিতিতে কণ্ঠ শান্ত রাখা যদিও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে তবুও তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় নিজেকে সংযত রাখার। যদিও এখনো তিনি নারীটির মুখদর্শন করতে পারেননি তবুও মনটা বড্ড খচখচ করতে লাগল তার। মনে হলো আজ এখানেই অনেক অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটবে। শেষ হয়ে যাবে সব বাক-বিতণ্ডা। শেষ হবে সকল প্রশ্ন। 

  “দেখুন, আমি কি কখনো এখানে এসেছি? আসিনি তো। আমি জানতামও না এখানে কী আছে, কে আছে। আমি আপনার ঘুঙুরের শব্দ পেয়েই এসেছি। আমাকে কথা বলতে দিন।”
 রানির আপ্রাণ চেষ্টা করে যাওয়া শান্ত স্বরে এবার বোধহয় নারীটির হুঁশ ফিরল। শান্ত হতে শুরু করলেন তিনি। হাতের যে মোচড়ামুচড়ি চালিয়ে গিয়েছিলেন এতক্ষণ সেটি ধীরে ধীরে থেমে এসেছে। 
চারপাশে জ্বলতে থাকা মশালের আলোয় রানি দেখলেন মহিলাটি গিয়ে বসেছেন এক পাশে। গায়ের রঙ হলুদ ফর্সা। নর্তকীদের মতন পোশাক জড়ানো। পোশাকেরও সে কী রাজকীয়তা! আজ থেকে আরও বেশ কিছু বছর আগে বড়ো বড়ো নর্তকীরা এমন পোশাকই তো পরিধান করতেন। রানি পা থেকে ধীরে ধীরে চোখ বুলিয়ে যখন সেই নারীটির মুখের দিকে তাকালেন তখন যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলো তার চোখ, তার মণিদু'টি। 
 এ যে অবিকল তারই মতন দেখতে নারীটি!
কেমন করে এমন সম্ভব! এত সুন্দর, এত জৌলুশ ভরা প্রায় হুবুহু দেখতে দু'টি মানুষ! যেন রানি আরশিতে নিজেকে দেখছে অন্যরূপে। 

  রানি থমকালেন। মুখের ভাষা ছিনিয়ে নিলো যেন কোনো একটি শক্তি। তার সমগ্র জীবনে সে-ই বোধহয় প্রথম কথা হারালেন। শব্দ হারালেন। অবাক, বিস্মিয়ে চুপ করে থাকলেন বহু বহু সময়। 

 সামনের নারীটি নবযৌবন রূপে বসে রইলেন রানির সামনে। রানিকে দেখছেন চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। রানির মনে হলো চোখগুলো কেমন অদ্ভুত সেই নারীর। শুকনো, মোলায়েম। নারীটি দু-হাত ছড়িয়ে, দু'হাতের মুঠোয় রানির মুখটি নিয়ে বড়ো করুণ স্বরে বললেন,
“তুমি এসেছো? এলে তুমি! বহুবছর তোমার অপেক্ষায় ছিলাম আমি। বহুবছর।”

 রানির ভ্রু কুঁচকে আসে আপনা-আপনি। তিনি বুঝতে পারেন না কিছু। তার সাথে এতটা মিল দেখতে একজন নারী তার মুখটি আদরের সাথে ধরে এমন বলছে কেন?
 সেই অজ্ঞাত নারী বার কয়েক রানির মুখে হাত বুলান। এবার তার শুষ্ক চোখগুলোতেই টলমলে অশ্রুর দেখা পাওয়া যায়। তিনি রানিকে জড়িয়ে ধরেন নিঃসংকোচে। অকপটে বলতে থাকেন,
“তুমি কত দেরি করলে! এতটা দেরি কেন করলে?”

  রানির মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, মুখে হাত বুলিয়ে দেন। আবার আলিঙ্গন করে চেপে ধরেন বুকে। রানি পাথরের মতন নির্জীব বসে থেকে সমস্ত বুঝতে চেষ্টা করেন। কী হচ্ছে, কী দেখছেন তিনি, কেনই বা এমন হচ্ছে তার সাথে। মনে মনে কত কথাই ভাসে কিন্তু ঠোঁটে একটা বুলিও ফোটে না। 

 রানি মহিলাটির হাত চেপে ধরলেন এবার। বহু কষ্টে অস্ফুটস্বরে বললেন, “আপনি! কে? এখানে, একা কী করছেন! এত বদ্ধ একটি কক্ষে, আপনি…”

 “আমি তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম। বহুদিন। তুমি এত সময় নিলে কেন? কতবার তোমায় বলেছি একটু আমাকে খুঁজে নাও, তুমি এত দেরি কেন করলে?”
 বলতে বলতে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল মহিলাটির। তিনি রানিকে আবারও জাপটে ধরলেন। 

 ধূপের ঘ্রাণে রানির চোখ বুঁজে আসে। মহিলাটির কাঁধেই মাথা রাখে পরম মমতায়। তার বুক জুড়িয়ে আসে। মনে হয় যেন, বহু বর্ষ যাবত এই বুকটির, এই আলিঙ্গনটির অপেক্ষায় হাহাকার করছিলো হৃদয়। পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিলো তার পুরো জীবনটা। আজ শান্তি লাগছে। ভীষণ শান্তি। 

 রানির ঘোলাটে চোখের পাতায় অস্পষ্ট হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল সেই স্বপ্নটি যা তিনি বহুদিন ধরে দেখতেন। একটি ছোটো মেয়ে জঙ্গলে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। জঙ্গলের অপরিচিত গাছপালায় পথ হারিয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে ছুটছে সেই কন্যাটি। দূর থেকে একটি বাঁশির সুর শোনা যাচ্ছে। মোহনীয় সেই সুর মেয়েটিকে টানছে। প্রতিবার ছোটো মেয়েটি সেই বাঁশির সুরের সন্ধানে ছুটতে ছুটতেই রানির স্বপ্ন ভেঙে যায়। কিন্তু আজ ঘটল সম্পূর্ণ বিপরীত। আজ সেই স্বপ্ন থামল না। ছোটো মেয়েটি ছুটল বাঁশির সুরের পেছনেই। আধো অন্ধকার জঙ্গলটিতে দিকভ্রষ্টের মতন ছুটতে ছুটতে ছোটো মেয়েটির কানে স্পষ্ট হতে লাগলো সেই বাঁশির সুরটি। মনে হলো সে নিকটেই চলে এসেছে সুরের। এই হয়তো ছুঁয়ে ফেলবে মানুষটাকে। এবং ছুটতে ছুটতে আবিষ্কার করল মেয়েটি যে অন্ধকার জঙ্গলটিতে ধীরে ধীরে আলো ফুটছে। তার জঙ্গল থেকে বের হওয়ার পথ যেন নিকটেই উপস্থিত। আর কিছুক্ষণ ছুটলেই বোধহয় পেয়ে যাবে ছোটা থেকে মুক্তি। 
  রানির চোখ পুরোপুরি ডুবে যায় নিদ্রায়। নাকে ভাসে কেবল ধূপগন্ধী গাঢ় সুঘ্রাণ। পবিত্র সুঘ্রাণ তাকে আচ্ছাদিত করে আরও অধিক। 
Page 2
          রানির নিদ্রা ভাঙল যখন, তখন এক ঝলক আলো এসে তার চোখ-মুখে লাগছে। আচমকা আলো লাগায় তিনি আবার চোখ বন্ধ করে নিলেন। আবিষ্কার করলেন তার চোখের পাতাগুলো ভীষণ ভার। মনে মনে তার ভাবনাও উদয় হলো বেশ! তার সবকিছুই স্পষ্ট মনে আছে। 
 তিনি তো সন্ধ্যার দিকে সেই বদ্ধ কক্ষটিতে গিয়েছিলেন। অন্ধকার একটি কক্ষ। মশাল জ্বলছিলো কেবল চারপাশে। তাও ঝাপসা অন্ধকারে ডুবে ছিলো সেই একখণ্ড পৃথিবী। তাহলে এত আলোও বা আসছে কীভাবে? ঢাকের শব্দ, ঘুঙুরের শব্দ কোথায় সব?

মনে প্রশ্ন জাগতেই তিনি জোরপূর্বক পিটপিট করে চোখ খুলে তাকালেন। আধো আধো ভাবে সবার প্রথমে তার চোখ পড়ল খুলে রাখা জানালার দিকে। সেখান দিয়েই রৌদ্র এসে আলিঙ্গন করে যাচ্ছে তার মুখমণ্ডল। কিন্তু, কিন্তু তিনি যেখানে ছিলেন সেখানে তো রোদ পৌঁছানোর কথা নয়!
 এরপর একটু ঘাড় নাড়াতেই তীব্র ব্যথা অনুভব হলো। মুখ থেকে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এলো শব্দ। চোখের সামনে এসে ঝুঁকলো এবার হেমলকের চিন্তিত মুখটি,
“উঠলে তাহলে! ব্যথা পাচ্ছো? কোথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। চোখ মেলোতো পুরোপুরি। দেখি, সব দেখতে পারো কি-না!”

  রানি বুঝে উঠতে পারলেন না হেমলক কোথা থেকে এলো। চোখ ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখতেই তার কাছে এবার সব পরিষ্কার হতে লাগল। তিনি তার কক্ষে আছেন বর্তমানে। তার পাশে গা ঘেঁষে বসা হেমলক তার দিকে আকুল নয়নে তাকিয়ে আছে। রৌদ্রের আলোয় হেমলকের অন্যরকম মণিগুলো ঝলমল করছে। কিন্তু তারতো এই কক্ষে আসার কথা নয়! ঐ নারীটির সাথে তো ছিলেন তিনি। তবে? কীভাবে এখানে এলেন? নারীটির থেকে তো তার অনেক কিছু জানার ছিলো। হেমলক তাকে পেলোও বা কোথায়?

  রানি বিচলিত হয়ে উঠেন সেই নারীর চিন্তায়। হেমলকের দিকে তাকিয়ে হাঁসফাঁস করতে করতে বললেন, 
“আমি তো এখানে ছিলাম না। তুমি আমায় এখানে এনেছো কীভাবে? আর ঐ নারীটি কোথায়? হ্যাঁ?”

   রানির বিচলিত ভঙ্গিমায় হেমলক দু'বার চোখের পলক ফেলে তাকালো,
“বিশ্রাম করো। এত বিচলিত হচ্ছো কেন?”

 “বিচলিত হতেই হবে। ঐ নারীটিকে আমার প্রয়োজন। কোথায় উনি?”

“কোনো নারী নেই তো। কাকে খুঁজছ?”
 হেমলকের কথাই কপালে ভাঁজ ফেলেন রানি। 
“ঠাট্টা করছ আমার সাথে? আমি ঠাট্টার মতন অবস্থায় নেই।”

 “ঠাট্টা কেন করব? তোমার সাথে কি আমার তাই সম্পর্ক?”
হেমলকের কণ্ঠ আরও গুরু-গম্ভীর শোনায়। বোঝা যায় যে, সত্যি সত্যি সে কোনো ঠাট্টা করছে না। কিন্তু… 

  রানি ভেতর ভেতর নিজেকে স্থির করেন। চোখ বন্ধ করে সম্পূর্ণটা আবার মেলান। তিনি কখন প্রাসাদের শেষ দিকের কক্ষে গিয়েছিলেন, কীভাবে সেখান থেকে নিচে পড়ে যান। তার মতন দেখতেই আরেকটি নারীর সাথে কীভাবে তার আলাপ হয়… সমস্তটাই তিনি একে একে চোখের সামনে কল্পনা করেন। 
 না, এখানে কোনো ভুল নেই। তার সাথে এই সমস্ত কিছুই ঘটেছিল। কিন্তু এরপর কীভাবে তিনি এখানে এলেন এতটুকুই তার জানা নেই। বাকিটুকু জানলে হয়ত তার সুবিধা হবে সবটা বুঝতে। মনে মনে নিজেকে স্থির করে তিনি বাহিরের আলোর দিকে আবার তাকান। আলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে দুপুরের প্রথম প্রহরের রোদ। তার মানে দুপুর হয়ে গিয়েছে। তাহলে গোটা একটি রাত তার কোনো হুঁশ ছিলো না। নিজের মনের ভাবনা আরেকটু স্বচ্ছ করতেই তিনি হেমলককে শুধালেন,
“আমি কোথায় ছিলাম সারাটি রাত?”

 “এই কক্ষেই।”

রানি হোঁচট খান তবে থামেন না। পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, “আমার তো এই কক্ষে থাকার কথা না। কোথায় পেয়েছিলে আমাকে?”

  হেমলক স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দেয়, “প্রাসাদের শেষদিকে। তলোয়ার রাখা যে জায়গাটায় সেখানে। জ্ঞান ছিলো না তোমার। বেহুঁশের মতন পড়েছিলে। এবার আর প্রশ্ন করো না। গত রাত তোমার শরীর তীব্র জ্বরে পুড়ে গিয়েছিলো। আগে কিছু খাও। এরপর সকল প্রশ্নোত্তর।”

  হেমলকের জবাবের সাথে রানির গত রাতের স্মৃতি সমস্তটা না মিললেও কিছুটা মিলে। কিন্তু তিনি সেই কক্ষের বাহিরেও বা এসেছিলেন কীভাবে তা মনে করতে পারেন না। আবার এত তীব্র জ্বরও বা হলো কেন তা বুঝে উঠেন না। তাই ঝট করে আবার নিজের কপালে হাত রাখেন। এবং চমকে যান। হ্যাঁ, তার শরীর পুড়ে যাচ্ছে গরমে। কিছুটা ভারও লাগছে শরীরটা। কিন্তু সেসবের তিনি তোয়াক্কা করলেন না। কীসের একটা নেশা, ঘোর যেন তাকে বেঁধে রেখেছে। সেই নারীটিকে তার খুঁজে বের করতে হবে। 
 যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। তিনি পালঙ্ক ছেড়ে অচিরেই উঠে দাঁড়ান। 

হেমলক এতে বিস্মিত হয়। গত রাতে এই মেয়েটিই তো জ্বরে অজ্ঞান ছিলো। হেমলকের তখন পাগলপ্রায় অবস্থা। রাজবৈদ্য এসে সারারাত একের পর এক চেষ্টা করেছে জ্ঞান ফেরানোর। হেমলক কেবল চিন্তায় হা-হুতাশ করেছে। অথচ যেই না জ্ঞান ফিরলো ওমনিই মেয়েটা অবাধ্য হচ্ছে?
 হেমলক রানির পথরোধ করল, “যাচ্ছ কোথায়? তোমার কাল সারারাত কতটা করুণ অবস্থা ছিলো তুমি জানো? তোমার শরীর এখনও ঠিক নেই।”

  হেমলককে সরিয়ে দিলেন এক ঝটকায় রানি। তার ভেতর যেন ঐশ্বরিক শক্তি ভর করেছে। কী করছেন, কী ভাবছেন তা বাহির থেকে বোঝার সাধ্যি কারো নেই।
 হেমলকের বিস্ময় কমল না। সে রানির পেছন-পেছন হাঁটতে হাঁটতে বার বার প্রশ্ন করতে লাগল,
“তুমি চাচ্ছ কী? আমায় বলো! আমি তোমায় সাহায্য করব।”

  রানি তার ভাবনায় অবিচল। হেমলকের প্রস্তাব নাকচ করতে করতে উত্তর দিলেন, “প্রয়োজন নেই। আমি খুঁজে নিবো সমস্তটা। আপনাদের বলার হলে এতদিনে বলতেন। কিন্তু আপনারা তা করেননি। আপনারা লুকিয়েছেন আমার থেকে সমস্তটা।”

 “কী লুকিয়েছি?”
হেমলকের প্রশ্নে উন্মাদ চলতে থাকা রানি দাঁড়িয়ে পড়লেন। তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“সন্ধ্যার ঢাকের শব্দে কে নৃত্য করে এই প্রাসাদ জুড়ে? আমি স্পষ্ট শব্দ পেয়েছি এতগুলো দিন। কখনো তার ব্যাপারে কিছু বলেছিলেন আমাকে? আপনাদের রাজমাতা তীব্র, কুটিল বুদ্ধি খাঁটিয়ে যাচ্ছেন দিনের পর দিন আপনি কখনো কেন তাকে থামাননি? আমাকে আপনি সহধর্মিণী করেছিলেন রাজমাতাকে মাত দিতে সেটাও আমায় বলেননি। আপনি বলেননি প্রাসাদের শেষদিকের কক্ষটিতে কেন শেকল বাঁধা। কেন প্রাসাদের আরেকটি কক্ষের সামনে লোহার শিক দিয়ে আটকানো বাঁধা। বিষাক্ততা সেই শিকে। বলেছেন? বলুন? বলেছেন?”

  হেমলক ঢোক গিলে, “না, বলিনি।”

 “কেন বলেননি? নিশ্চয় এখানে কোনো গড়বড় আছে।”

“কারণ এতকিছুর সম্পর্কে আমিই ঠিকঠাক অবগত নই!”

 “আর যদি আমি টের পাই আপনি অবগত তবে?”

“তবে? কী করবে?” এই পর্যায়ে রানির চোখে চোখ রাখে হেমলক। রানির চোখে পুরানো সেই তেজ, সেই লাস্যময় চাওনি, 
“তবে এই ক্যামিলাস রাজ্য আমি ধূলিসাৎ করে দিবো। আমি সব ধ্বংস করে দিবো। এমনকি আপনাকেও।”
 হেমলক আশাহত হয়। ভঙ্গুর চোখে তাকিয়ে থাকে রানির দিকে। এ-ই সে ভালোবেসেছে মেয়েটাকে? এই প্রতিদান? কত অকপটে মানুষটা তাকে ধ্বংস করার কথা বলল! অথচ সে তো তা পারল না। কেন পারল না? ভালোবাসে বলেইতো! কিন্তু প্রতিদানে এতটুকুই পাওনা ছিলো?

  রানি হেমলকের সেই চাহুনিকে অদেখা করেই আবার ছুটেন প্রাসাদের সেই শেষদিকের কক্ষটির উদ্দেশ্যে। দিনের বেলা হওয়াতে কিঞ্চিৎ আলো পৌঁছাচ্ছে শেষ দিকটায়। রানি ছুটে গিয়ে দাঁড়ান কক্ষটির সামনে। কাল যে তিনি শেকল ভেঙেছিলেন আজ তা আগের মতনই রয়েছে। কেউ আটকায়নি আর। যদি সেই কক্ষে গোপন নারীটি থেকেই থাকেন তবেতো আটকে দেওয়ার কথা ছিলো! দুর্বোধ্য এই ধাঁধায় নিজেকে তলিয়ে যেতে দেখে বড়ো করে শ্বাস নেন রানি। বুক ভরে। ধীরে ধীরে কক্ষটিতে খুলতেই দেখলেন ফাঁকা, বৃহৎ একটি কক্ষ। কক্ষের প্রাচীরে আঁকা নর্তকীদের আবছা তৈলচিত্র। প্রাচীরের পর প্রাচীর সাজানো আসবাবে ধূলো জমে জমে স্তূপ। বসার কত আসন! এককালে নিশ্চয় কক্ষটি সৌন্দর্যতায় জীবন্ত ছিলো! কিন্তু বহুবছর এখানটায় কেউ আসেনি, আসে না তা ধূলো দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে বেশ। অথচ কালতো তিনি এসব কিছুই দেখলেন না! দেখলেন কেবল কাঠের জমিন। কিন্তু আজ সেই কাঠের জমিন নেই। আছে রাজকীয় কার্পেট বিছানো। 
  রানির মনে সন্দেহ উদয় হলো। কেন যেন মনে হলো কালকের সমস্তটা তার ভ্রম ছিলো না আবার পুরোপুরি বাস্তবও হয়ত নয়। কিছুতো একটা লুকানো ছিলো। কিছুতো আছে তার অজানা। কিন্তু কী?

 তিনি সেই নর্তকীর খোঁজের জন্য বের হতে চান। তিনি জানেন না কোথায় গেলে পাওয়া যাবে সেই খোঁজ। এতদিন তবে তিনি ভুল জায়গায় ঘুরেছেন। কেবল গণিকালয় তার আকাঙ্ক্ষিত সেই নারীটিন খোঁজ জানত না। জানতো অন্য কেউ। তাকে ভুলভাল ঘোরানো হয়েছে। কেন ঘোরানো হয়েছে তা তিনি পরে বের করবেন। টেনে ছিঁড়ে ফেলবেন সেই গণিকার শরীরটা। তার সাথে ছলনা করার ফল কেমন হয় তা তিনি ঠিক দেখাবেন। কিন্তু তার আগে তিনি যাবেন এই ধাঁধার শেষ করতে। 

 প্রাসাদ থেকে বের হওয়ার সময়ই রানির চোখ গেলো রাজমাতার দিকে। যিনি খাবারশালায় বসে আয়েশেই খাবার খাচ্ছেন। অথচ মাস পার হয়নি পুত্র হারিয়েছেন! পুত্র হারানো মাতা এমন করে খেতেও পারে?
এই রাজ্য যেন কেমন। আত্মার টান এখানে বড়োই ফিঁকে। বড়োই নাদান সম্পর্ক সকলের সঙ্গে সকলের। ভাগ্যিস সে হেমলকের কথায় ভুলতে গিয়েও ভুলেননি! এত লোক দেখানো প্রেম তার সহ্য হতো না যে। 

 হেমলক সমস্তটাই দেখল উপরে দাঁড়িয়ে। রানিকে একটিবার আটকানোর আর চেষ্টা করল না। দিলো না স্পষ্ট বিবৃতি। অসুস্থ শরীর নিয়ে রানি কোথাও যেতে পারবেন না, এমন আর বলল না অধিকার খাটিয়ে।

—————

 এ্যাজেলিয়া রাজ্যে প্রজাদের দিন ভালো যাচ্ছে। রাজ্যে পৌঁছেই প্রজাদের ভেতর সেই আনন্দ দেখতে পেয়ে রানির ভীষণ ভালো লাগল। তবে মনের অশান্তি কি আর যায়?
 নিজের কক্ষে এসে দেখলেন সবসময়ের মতনই ঝকঝক করছে কক্ষ। হ্যাব্রো যে খুব যত্নে কক্ষটির রক্ষণাবেক্ষণ করে তা দেখেই বোঝা যায়। 

রানির আচমকা রাজ্যে আসার খবর হ্যাব্রোর কাছে পৌঁছুতেই সে হন্তদন্ত হয়ে প্রাসাদে পৌঁছায়। গিয়েছিলো রাজ্যের প্রজাদের সাথে দেখা করতে। রানির নির্দেশ ছিল প্রতি পনেরো দিন অন্তর অন্তর প্রজাদের সাথে সাক্ষাৎ করে করে তাদের সমস্ত সমস্যার কথা শুনতে। একদিনে তো আর সব প্রজাদের সাথে সাক্ষাৎ করা সম্ভব নয় তাই একেকদিন একেকটি স্থান বেছে বেছে সমস্যা বের করতে। হ্যাব্রো সেই নির্দেশ মাথা পেতে পালন করছে। তাই রাজ্যে কোনো ঝঞ্জাটই অবশিষ্ট রইল না বললেই চলে। পৃথিবীতে শান্তিময় রাজ্যের একটি হয়ে উঠছে যেন ক্রমশই।

  রানি নিজের আরামকেদারায় চোখ বন্ধ করে ছিলেন। হ্যাব্রো উপস্থিত হয়ে অনুমতি চাওয়ার আগেই রানি দরাজ কণ্ঠে অনুমতি দিলেন,
“হ্যাব্রো, আসো ভেতরে শীঘ্রই।”

 হ্যাব্রো যদিও একটু আশ্চর্য হলো, রানি তার উপস্থিতি কত নিখুঁত ভাবে অনুভব করে ফেললেন দেখে। করবেন নাই-বা কেন? এ্যাজেলিয়া রাজ্যের রানি উনি। এগুলো আর কী এমন বিষয়?
 হ্যাব্রো তাড়া নিয়েই প্রবেশ করল। সর্বপ্রথম এসেই কুর্নিশ করল মাথা নত করে। 
 “আপনি? হুট করে? আমায় সংবাদ দিতেন। আমি চলে যেতাম।”

 “অত সময় নেই আমার। তোমাকে একটি কাজ করতে হবে অবিলম্বে। পারবে?”

“আপনি আজ্ঞা করুন, সব হাজির করব।”

 রানি আশ্বস্ত হন এই একটি পুরুষের কাছে এসেই। তিনি আশ্বাস নিয়েই আজ্ঞা করেন,

 “আজ থেকে প্রায় ত্রিশ কিংবা বত্রিশ বছর আগেকার আমাদের রাজ্যের নথিপত্র এখানে উপস্থিত করতে পারবে?”

হ্যাব্রো কিছুটা ভাবুক হয়, “এত বর্ষ আগের নথি আদৌ আছে কি-না দেখতে হবে। চেষ্টা করছি।”

 “তাহলে এখুনি খোঁজ লাগাও।”

“ত্রিশ থেকে বত্রিশ বছর আগের সকল নথি আনব?”

 “না, কেবল দেখবে কোথাও কোনো নর্তকী কিংবা বাইজির নাম উল্লেখ আছে কি-না। তাহলেই হবে। এই শব্দ দুটি উল্লেখ থাকলেই নিয়ে আসবে।”

“আমাকে কিছু সময় দিন। আমি দেখছি।”

 রানি হ্যাব্রোকে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। হ্যাব্রো বেড়িয়ে যাবে প্রায় তার আগেই তিনি পিছু ডাকলেন। আরামকেদারায় বসে থেকেও যেন আরাম মিলছে না তার। 
 হ্যাব্রো থামল। প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকাল, “আর কিছু প্রয়োজন, রানি?”

“দাঁড়াও। আমিও যাচ্ছি তোমার সঙ্গে।”

 “আপনি বিশ্রাম করুন। আপনাকে ক্লান্ত লাগছে। আমি পারব। ভরসা রাখুন।”

“আমি জানি তুমি পারবে, কিন্তু আমার এখন বিশ্রাম হবে না। আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন, হ্যাব্রো। আমাকে খোঁজ এনে দাও যে করেই হোক।”

  “যথা সম্ভব চেষ্টা করেই ফিরব। কিছুটা সময় দিন।” হ্যাব্রোর নাছোড়বান্দা আবদারের কাছে হার মানলেন রানি৷ বললেন,
“ঠিক আছে, যাও তুমি। আমি অপেক্ষা করছি।”

 হ্যাব্রো যেমন ব্যস্ত গতিতে এসেছিলো তেমন করেই বেরিয়ে গেলো। রানি আবারও গিয়ে বসলেন আরামকেদারায়। ক্যামিলাস রাজ্যে তিনি যেটার সমাধান পাননি সেটার সমাধান তার খুঁজতেই হবে। যেকোনো মূল্যে। 

—————

দুপুরের রোদের তেজ কমে এসেছে। বিষণ্ণ বাতাস ঢুকছে ক্ষণে ক্ষণে। রানি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন জানালার বাহিরে। বেশ অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে হ্যাব্রো যাওয়ার। এখনো খোঁজ নিয়ে এলো না কেন সে ভেবে ভেবে হয়রান হচ্ছেন তিনি। তবে কি খোঁজ পেলো না? 
 মনে মনে উদয় হওয়া এমন ভাবনায় নিজেই শিউরে উঠেন। রাজ্যের নথিপত্রই শেষ উপায় খোঁজ পাওয়ার। যদি সেটাও কোনোক্রমে না পাওয়া যায় তবে আর কি কোনো পথ খোলা থাকবে? থাকবে না। 
গোটা একটা জীবন নিজের অস্তিত্ব না জানতে পেরেই তিনি কাটিয়ে দিবেন কি তাহলে? অসম্ভব। অসম্ভব। এই মানবজীবন তিনি অস্তিত্বহীনতায় শেষ করতে পারবেন না। কোনো ক্রমেই না। 

 হ্যাব্রো এলো। অনুমতি নিয়েই প্রবেশ করল কক্ষে। 
রানি তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন বসা থেকে। চোখেমুখে জানতে চাওয়ার তীব্র আগ্রহ। হ্যাব্রোর বলার আগেই তার কৌতূহল ছিটকে বেরিয়ে এলো,
“পেলে কি কিছু? কোনো নথিতে কিছু কি ছিলো?”

 হ্যাব্রো মাথা নাড়ে, “না, তেমন কিছুই পাইনি। আপনার জন্মের দুই তিন বছরের আগের নথিও দেখেছি। তেমন কিছু উল্লেখ নেই।”

 রানি আশাহত হন ভীষণ, “তবে কি আর আমার শুরুটা জানা হবে না?”

 “তবে একটা জিনিস পেয়েছি। এটা আপনার কাজে লাগতে পারে বোধহয়।”

 আশার আলো খুঁজে পেয়ে দিশেহারা হন রানি, “কী পেয়েছে? দেখি! দেখাও।”

 হ্যাব্রো তার হাতে থাকা কাপড়ের কিছু একটা এগিয়ে দেয়। বেশ রাজকীয় সাজসজ্জারই কিছু একটা। বহু বর্ষ হওয়ায় কাপড়টি ছিঁড়ে গিয়েছে, ধূলো পড়েছে অনেক। রানি কাপড়ের গোল করা ভাঁজ খুলতেই দেখলেন একটি নিমন্ত্রণ পত্র গোছানো। লিখা— রাজা কেশবচন্দ্রের পক্ষ থেকে নৃত্যের রানি- হরিতকীজিকে আমন্ত্রণ পাঠানো হলো। সকলেই উপস্থিত হবেন আমার রাজপ্রাসাদে। ধন্য করবেন আমাকে। আপনাদের গোষ্ঠীর সবচেয়ে উজ্জ্বল নারীটিকে আনতে ভুলবেন না যেন। একশো স্বর্ণ মুদ্রা আলাদা তার জন্য। বাকি একশো আপনাদের জন্য। 

 শেষদিকে একটি ঠিকানাও লিখা ছিলো। আমন্ত্রণ পত্রটি দেখেই রানি চট করে বুঝে নিলেন এটি তার পিতার পাঠানো নিমন্ত্রণ পত্র। এখানে গেলেই সমস্ত সন্দেহ মিলেমিশে যাবে এক হয়ে। এখানেই হবে সমাধান। 
 রানি হ্যাব্রোকে আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল জায়গাটি কোথায়। বহু বর্ষ আগে যেই নাম ছিলো সেই নামটি বোধহয় এখন আর নেই তাই রানি জায়গাটি চিনতে পারলেন না ঠিক। 

কিন্তু বুদ্ধিমান হ্যাব্রো ঠিক চিনে নিলো। অকপটেই বলল,
 “এটি তো আমাদের শত্রুরাজ্যের একটি বিরাট নর্তকী অঞ্চল। আগের নাম বদলে নতুন নামকরণও হয়েছে সেখানে। আমি চিনি।”

 “শীঘ্রই তাহলে চলো হ্যাব্রো। আমরা তার উদ্দেশ্যে বের হই।”

 “কিন্তু রানি, ওটা যে শত্রুরাজ্য। আপনি তাদের রাজ্যে পা দিয়েছেন জানলে তারা আপনাকে বন্দী করেও নিতে পারে!”

  রানি ভাবুক হলেন। উতলাও হলেন বিশেষ। গেলে যে বিপদ সেই বিপদ তুচ্ছ হলো তার অস্তিত্বের খোঁজের কাছে। তিনি বুদ্ধি আঁটলেন। একটি পত্র লিখলেন হেমলকের উদ্দেশ্যে। পত্রটি হ্যাব্রোকে দিয়ে পাঠালেন বিশ্বস্ত পত্রবাহকের কাছে। জানিয়ে দিলেন আগামী তিনদিনে যদি তারা রাজ্যে এসে না পৌঁছায় তবেই যেন পত্রটি হেমলককে পাঠানো হয়। 

 এরপর সেই ভর সন্ধ্যেতেই রানি ছুটলেন প্রখণ্ড রাজ্যে। যে রাজ্যের সাথে তার শত্রুতা এতই গুরুতর যে সেই রাজ্যের রাজা তাকে পেলে মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারেন৷ কিন্তু এতকিছু ভাববার সময় কি রানির আছে? 
 তিনি এখন দিকহারা, দিশে খুঁজছেন কেবল। তাকে কি আর ভয়-ভীতি আটকাতে পারে? তিনি নিজেই যে ভয়ের জন্মদাত্রী।

—————

  প্রখণ্ড রাজ্য হিমশীতল ঠাণ্ডা। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় এর তাপমাত্রা যেন অধিকই অন্যরকম। প্রায় প্রতি সপ্তাহে বৃষ্টি হয়। চারপাশের বেশিটা জুড়েই তাই নদ-নদী, হ্রদ। 
 এই রাজ্যটি এ্যাজেলিয়া রাজ্য থেকে বেশ খানিকটা দূর হওয়ায় রানি ও হ্যাব্রোর এখানে আসতে সময় লেগেছে প্রায় পাঁচ প্রহরেরও বেশি। সেই সন্ধ্যায় রওনা হয়ে তারা পৌঁছেছে সকাল শেষ হবে হবে এমন সময়ে। 
যদিও মধ্যাহ্ন শুরুর দিকে সময় তবুও চারপাশ দেখে তা বোঝার উপায় নেই। আকাশে ঘন-কালো মেঘ জমে আছে। আবহাওয়া অত্যাধিক গুরু-গম্ভীর। রানির পরনে সাবলীল পোশাক। দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি কোনো রাজ্যের রানি। তবে সেই সাবলীল পোশাকেও তাকে স্বর্গের অপ্সরা লাগছে। যেন নেমে এসে আকাশের সবচেয়ে সুন্দরী নারীটি। 

  নর্তকীদের অঞ্চলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর হলো ঠিক। দীর্ঘ এতটা সময় বিনা বিশ্রামে এসেছেন। ঘোড়াগুলোর ভেতরও ক্লান্তি নেই। রানি কামিনীকাঞ্চনের ঘোড়া বলেই হয়ত শক্তি তাদের অঢেল। 
নর্তকীদের প্রাসাদের সামনেটা কঠোর পাহারায় ঘেরা। জায়গায় জায়গায় পাহারাদার। রানিদের যখন আটকানো হলো রানি তখন নিজেকে রাজা ইনান ণেকিতানের বার্তাবাহক বলে পরিচয় দিলেন। 

 এত বৃহৎ জায়গা জুড়ে নর্তকীশালা যে রানি ও হ্যাব্রো বিস্মিত না হয়ে পারল না। এর কাছে যেন রাজপ্রাসাদও ফিঁকে পড়ে যাবে অবলীলায়! 
 রানি চারপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে ভেতরে প্রবেশ করার আগেই পথরোধ করল পাহারাদাররা। জিজ্ঞেস করল,
“কার সাথে দেখা করতে চান?”

 রানি নিঃসংকোচে বললেন, “হরিতকীজির সাথে।”

 পাহারাদারদের ভ্রু আপনা-আপনি কুঁচকে গেলো। সেখানে দিয়ে যেতে নেওয়া একটি মেয়ের পা থমকে গেলে আচমকা। ভ্রু কুঁচকে সে রানির দিকে তাকালো। পা থেকে মাথা অব্দি গম্ভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলল,
“কারা আপনারা?”

  হ্যাব্রো রানির দিকে তাকাল একবার। হরিতকী নাম নেওয়াতেই মেয়েটার সন্দেহের উৎপত্তি হয়েছে তা বোঝার বাকি নেই দু'জনের। রানির মুখের সামনে কাপড় বাঁধা। কপালের লাল রাজচিহ্নটুকু বোঝা যাচ্ছে কেবল। 
 মেয়েটি আবার বলল, “কারা আপনারা? হরিতকীজির সাথে কাজ কী? তার খোঁজ করছেন কেন?”
 বলতে বলতে মেয়েটা পাহারাদারদের চোখের ইশারা করল। এবং পরক্ষণেই পাহারাদাররা আটকে ফেলল তাদের দু'জনকে। 

  হৈ হট্টগোলে অনেকগুলো অল্পবয়সী, মধ্যবয়সী মেয়ে এসে জমা হলো। সকালের সাজপোশাকই অন্যরকম। 
 রানি নিজের সত্যি পরিচয় দিতে উদ্যত হলেন। মুখ, মাথা থেকে কাপড় সরালেন। এবং তার সেই মুখাবয়বই যেন আতঙ্ক সৃষ্টি করল উপস্থিত কলরবে। প্রতিটা মেয়ে পিছিয়ে গেলো এক কদম। 
 সোপান বেয়ে নেমে আসতে দেখা গেলো একজন বয়স্ক মহিলাকে। যিনি সোপানের উপরের সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে পড়লেন হতবিহ্বল হয়ে। 

 হ্যাব্রো খেয়াল করল সেই বয়স্ক নারীটির পেছনে একটি বৃহৎ তৈলচিত্র পুরো প্রাচীর জুড়ে লাগানো। এবং অদ্ভুত ভাবে তৈলচিত্রে থাকা নর্তকীটি যেন পুরো রানি কামিনীকাঞ্চনের মতো। সেই একই মুখ, একই চোখ,টানা টানা কাজল, উঁচু বুকে ধারণ করা জৌলুশ। যেন রানিকে আঁকা ভিন্ন ভাবে। 

  বয়স্ক নারীটি অস্ফুটস্বরে বললেন, “সুরসুন্দরী!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp