আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে - পর্ব ৩৮ - সালমা চৌধুরী - ধারাবাহিক গল্প


          মাইশার শ্বশুর বাড়ির লোকজন চলে গেছে অনেকক্ষণ হলো। তবুও মেঘ, মীমের পাত্তা নেই। আবির আদিকে দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছে অথচ মেঘ আর মীম এখনও নামছে না। হঠাৎ আবিরের মনে হলো, মেঘের জন্য সে আলাদা করে গায়ে হলুদের ড্রেস নিয়ে আসছিল, যেটা আবিরের ব্যাগেই আছে৷ আবির সাকিবদের ঘরে গিয়ে ড্রেসটা বের করে দেখছে। গায়ে হলুদ উপলক্ষে সবার জন্য রানী গোলাপি রঙের শাড়ি-পাঞ্জাবি আনা হয়েছে। কালার পছন্দ করার দায়িত্ব আবিরের ছিল, তাই হলুদ রঙ বাদ দিয়ে অন্য রঙকেই প্রাধান্য দিয়েছে সে ৷ শাড়ি- পাঞ্জাবি কেনার দিন ই মেঘের জন্য একটা ড্রেস কিনেছিল। কিন্তু বাসায় আসার পর সেই জামা দেখে মন ভরছিল না। তাই গতকাল রাতে মার্কেটে গিয়ে অনেক খোঁজে মেঘের জন্য পছন্দমতো রানী গোলাপি রঙের একটা ড্রেস নিয়ে আসছে। ড্রেসটা পড়লে তার Sparrow কে কেমন লাগবে সেটায় ভাবছে। কিছু একটা ভেবেই নিজের মাথায় গাট্টা মেরে আনমনে হেসে ফেলল । ড্রেসটা শপিং এ ভরে মালাদের ঘরের সামনে উঠান পর্যন্ত আসতেই মালিহা খান ডাকলেন,

"এসে থেকে কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছিস? ভাবি বললো আসার পর নাকি অল্প ভাত খাইছিলি ৷ তোর কি খিদে পায় না? পিঠা দিব তোকে? নাকি ভাত খাবি?"

"এখন কিছু খাবো না, আম্মু। বিকেলে পিঠা খাইছি। খুদা লাগলে খাব। তুমি টেনশন করো না। "

আবির মায়ের সাথে কথা বলে যেই না ঘরে ঢুকতে যাবে। তখনই সামনে মালা হাজির হলো। আবিরের কন্ঠ শুনেই নিজের রুম থেকে বেড়িয়ে এসেছে। মালা উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো, 

"ভাইয়া, তোমার কি কিছু লাগবে? আমায় বলো আমি এখনি দিচ্ছি। "

আবিরের হাতে শপিং ব্যাগ দেখে পুনরায় প্রশ্ন করল,
"শপিং ব্যাগে কি?"

আবির রাগান্বিত কন্ঠে উত্তর দিল,
"সে যায় থাকুক, তোর ভাবতে হবে না। আর আমার কিছু লাগলে আমি নিজেই নিতে পারবো। তুই নিজের চরকায় তেল দে। "

আবিরের রাগান্বিত কন্ঠ শুনে মালা মাথা নিচু করে মনে মনে বলল,
"আমার ই তো ভাবতে হবে। আমি যে তোমাকে ভালো.."

আবির ধমক দিল,
"রাস্তা থেকে সরে দাঁড়া। "

মালা তড়িঘড়ি করে সরে দাঁড়ালো। আবিরকে যেতে দেখে মালাও নিজের রুমে সাজতে চলে গেছে।

 আবির বারান্দা পেরিয়ে দুতলায় যাওয়ার জন্য কয়েক সিঁড়ি উঠতেই, আচমকা আলতা রাঙা একটা পা চোখে পরলো৷ পায়ের মালিক দুতলা থেকে নামছিল, সিঁড়িতে এক পা রেখেই যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। আবির স্বাভাবিক ভাবে চোখ তুলে তাকাতেই আশ্চর্য বনে গেল। চোখ পড়ে এক মায়াবিনীর দিকে, সহসা মুগ্ধ আঁখিতে তাকায়। সেই মায়াবিনী যেন মায়ার জাল বিছিয়ে রেখেছে, আবিরের মতো হাজারো সুপুরুষ যুবক তার এই রূপে ঝলসে যাবে। বাঙালি স্টাইলে রানী গোলাপি রঙের শাড়ি পরিহিতা মায়াবিনীর কোমড় ছাড়ানো চুলগুলো অতিশয় ধীর গতিতে উড়ছে। মুখে হালকা মেকাপ, চোখে আইলানারের সঙ্গে গাঢ় করে কাজলও লাগানো, ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক ৷ গলায় হালকা গহনা তার সঙ্গে কোমড়ের বিছা ৷ আবির কিংকর্তব্যবিমূঢ়, বিষ্ময় চোখে মায়াবিনীকে আপাদমস্তক দেখলো। বাকরুদ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সেই আঁখি জোড়ায় । মায়াবিনীর দিকে তাকিয়ে, উপরের সিঁড়িতে পা রাখতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়তে নিলে সঙ্গে সঙ্গে হ্যান্ডরেলে ধরে কোনোরকমে নিজেকে সামলালো। 

আবিরকে হোঁচট খেতে দেখে মায়াবিনী কয়েক সিঁড়ি নেমে আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালো,

"কি হয়েছে আপনার?"

মায়াবিনীকে কাছে আসতে দেখে আবির তৎক্ষনাৎ ২/৩ সিঁড়ি নিচে নেমে, নেশাক্ত কন্ঠে বিড়বিড় করে কি যেন বলল,

মায়াবিনী শুধু শেষে বলা "উফফ" টায় বুঝতে পেরেছে। মায়াবিনী চিন্তিত স্বরে শুধালো,

"আপনি ঠিক আছেন তো?"

আবির উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, 
"তুই কি ঠিক থাকতে দিচ্ছিস ?"

আবিরের প্রশ্ন শুনে মায়াবিনী অপলক দৃষ্টিতে তাকালো৷ চোখে মুখে উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে। উত্তেজিত কন্ঠে পুনরায় প্রশ্ন করল,

"শাড়িতে কেমন লাগছে আমায়?"

আবির পুনরায় তাকালো, ক্লান্তিহীন অমত্ত চেয়ে রইলো কিছুটা সময়। মেঘ তীর্যক চোখে চেয়ে আছে, মুখে তার মিষ্টি হাসি৷ আবিরের ঘোর যেন কিছুতেই কাটছে না। দৃষ্টি তার সরছেই না। মনে হচ্ছে, মায়াবিনীকে দেখার ব্যাকুলতা এই জনমে আর শেষ হবে না। মৃত্যু ব্যতীত মায়াবিনীর মায়ার জাল থেকে বের হতে পারবে না সে ৷ 

মেঘ পুনরায় প্রশ্ন করল,
"কেমন লাগছে বললেন না!"

মেঘের কথায় আবিরের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটে, আবেশিত কন্ঠে বলল, 
" মায়াবিনী "

আবির ভাইয়ের মুখে মায়াবিনী শব্দ শুনে অষ্টাদশী লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেল। ব্লাশ দেয়া কপোল আরও বেশি রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। ডিসেম্বরের তীব্র শীতেও অষ্টাদশীর নাক ঘামে চিকচিক করছে। প্রিয় মানুষের মুখে নিজের প্রশংসা শুনে অষ্টাদশীর কলেবরে অন্যরকম শিহরণ জাগছে। 
 
এতক্ষণ আবির ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, এখন লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। 

আবির গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
"হাতটা দেখি। "

আবির নিজের হাত বাড়ালো, মেঘ ডান হাত একটু এগুতেই আবির মেঘের হাত ধরে, এক সিঁড়ি উপরে উঠে মেঘের ডান হাতের কনিষ্ঠা আঙুল মুখের কাছে নিল। মেঘের কনিষ্ঠা আঙ্গুল ব্যতিত বাকি আঙুলগুলো স্থান পেল আবিরের গালে। আবিরের গালে থাকা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি স্পর্শ করতেই অষ্টাদশীর বুকের ভেতর উতালপাতাল ঢেউ শুরু হয়ে গেছে। আবির মেঘের কনিষ্ঠা আঙুলে আস্তে করে কামড় দিল৷ ওমনি অষ্টাদশী কেঁপে উঠলো। মেঘের অস্বস্তি বুঝতে পেরে আবির হাত ছেড়ে কিছুটা দূরে দাঁড়ালো।  

আবির স্বভাবসুলভ ভারী কন্ঠে বলল,
" আমায় সুন্দর লাগছিল বলে তুই একদিন নজর কাটিয়েছিলি, আজ আমি কাটালাম। " 

মেঘ নিস্তব্ধ, নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । আবির নিজেকে সামলে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

" মানুষ মা*রার প্ল্যান টা কার?"

"মানে?"

" তুই তো কোনোদিন শাড়ি পড়িস নি, আজ হঠাৎ শাড়ি পরার কারণ কি?"

মেঘ আমতা আমতা করে বলল,
"মাইশা আপু জোর করলো শাড়ি পড়ার জন্য। আপু আর আপুর বান্ধবী মিলেই আমায় সাজিয়ে দিয়েছে। "

"তাই তো বলি..."

"কি?"

"কিছু না। পড়েছিস ভাল কথা কিন্তু তোর জন্য শাড়ি আনা হয় নি। এইযে তোর ড্রেস, শাড়ি টা পাল্টে ড্রেস টা পড়ে নিচে আসবি। "

মেঘ শপিং ব্যাগ টা হাতে নিয়ে একটু দেখল, তারপর মন খারাপ করে বলল,

" আনা হয় নি মানে শাড়িটা তো মাইশা আপুই আমায় দিয়েছে৷ ওখানে তো অনেক শাড়ি ছিল৷ "

"এত বেশি বুঝিস কেন? শাড়ি বেশি থাকলেই কি পড়তে হবে?"

একটু থেমে পুনরায় বলল,
" তুই এভাবে স্টেজে গেলে মাইশা আপুর বদলে, সবাই তোকেই হলুদ লাগাতে আসবে। তার থেকেও বড় বিষয়, বিয়ে বাড়িতে এত এত মানুষ, কত বাজে মেন্টালিটির ছেলে আছে, কখন কোন ছেলে কি বলে ফেলবে, তখন তো গাল ফুলাইয়া কান্না শুরু করে দিবি৷ আমি তানভির না, যে সর্বক্ষণ তোকে চোখে চোখে রাখবো, কোনো সমস্যা হলে ঠান্ডা মাথায় সমাধান করবো। বাই এনি চান্স কোনো ছেলে উল্টাপাল্টা কিছু বললে,তখন আমার হাত উঠে যাবে।আমি বিয়ে খেতে আসছি, মা*রপিট করতে নয়৷ তুই কি চাস, তোর জন্য আমি বিয়ে বাড়িতেও মা*রপিট করি?"

মেঘ ডানে-বামে মাথা নেড়ে উচ্চস্বরে বলল,
"নাহ"

আবির মোলায়েম কন্ঠে বলল,
" যদি বিয়ে বাড়িতে কোনোরকম ঝামেলা না চাস, তাহলে এসব মেকাপ তুলে, ড্রেসটা পড়ে সিম্পলি নিচে আসবি। আর যদি মনে হয়, সবাই শাড়ি পড়েছে তাই তোকেও শাড়িই পড়তে হবে তাহলে এভাবেই যেতে পারিস৷ চয়েজ ইজ ইউর'স৷ "

মেঘ আর কিছু বলল না ৷ শপিং ব্যাগটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। মন খারাপ হওয়ার বদলে অষ্টাদশীর চোখে-মুখে প্রখর উজ্জ্বলতা । আবির ভাইয়ের বলা "মায়াবিনী" শব্দটা বার বার কানে বাজছে৷ আবির ভাই যে তাকে নিয়ে চিন্তা করে, এটা ভাবতেই মেঘের হৃদয়ে প্রশান্তির হওয়া বয়ে গেল। 

আবিরের দৃষ্টি মেঘেতে নিবদ্ধ, অকস্মাৎ বুকে হাত রাখল। মস্তিষ্কের নিউরনে অবিরাম বাজছে, 
"তোর রূপে এই আবির বিধ্বস্ত। "
মানসিক টানাপোড়েনে ভুগছে সে৷ অশান্ত মনকে শান্ত করার কোনো শব্দ খোঁজে পাচ্ছে না। হৃদয়ে গান বাজছে,

"Yeh dil pagal bana baitha
Isey ab tu hi samjha de
Dikhe tujhme meri duniya
Meri duniya tu banja re"

যতক্ষণ অষ্টাদশীকে দেখা যাচ্ছিল, আবির ততক্ষণ দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। অষ্টাদশী আড়াল হতেই আবির ধপ করে সিঁড়িতে বসে পড়েছে, হাত দিয়ে চোখ-মুখ ডেকছে । বক্ষপিঞ্জরে উতালপাতাল ঢেউ৷

তখনই সাকিব আসছে৷ আবিরকে সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখে চিন্তিত স্বরে শুধালো,
"কি হয়ছে ভাইয়া? এখানে বসে আছো কেন?"

আবির চোখ-মুখ থেকে হাত সরিয়ে সাকিবের দিকে তাকিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল, 
"সাকিবরে আমি শেষ। "

সাকিব আবিরের কাছাকাছি এসে শুধালো,
" কি হয়ছে বলবা তো "

"যত দিন যাচ্ছে, আমি ওর প্রতি তত বেশি আসক্ত হয়ে যাচ্ছি। মায়াবিনীর মায়া কাটানোর ক্ষমতা যে আমার নেই।"

"মায়া কাটানোর দরকার কি? তুমি তো মেঘবতীকেই ভালোবাসো। বিয়ে করে নাও, তাহলে এই মায়ার বাঁধন আরও বেশি শক্ত হবে৷ তোমাদের দুজনকে পাশাপাশি দেখলে আমার কি যে ভাল লাগে "

সাকিব মাথা চুলকে শুধালো,
"ভাইয়া, তুমি না বলছিলা দেশে আসার ৩ মাসের মধ্যে বিয়ে করবা। এখন তো ৬ মাস হয়ে যাচ্ছে। বিয়ে করছো না কেন?"

বিয়ের কথা শুনতেই আবিরের চোখে-মুখে বিষন্নতা ছেয়ে গেছে। মামা-মামিরা ব্যতীত আবিরের ফুপ্পির ঘটনা আর কেউ জানে না৷ আবিরও নিজে থেকে সাকিবকে কিছু বলে নি৷ আবির সিঁড়ি থেকে উঠে যেতে যেতে বলল,

" পরিস্থিতি বলতে একটা শব্দ আছে৷ জানিস তো? আমি এখন পরিস্থিতির অধস্তনে বন্দি। পরিস্থিতি যেদিকে নিয়ে যাবে আমি সেদিকে যেতে বাধ্য। "

সাকিব কিছুই বুঝলো না। আবিরকে প্রশ্ন করার আগেই আবির সেই জায়গা ত্যাগ করল। আশপাশে না তাকিয়ে সোজা সাকিবের রুমে চলে গেল। রুমে ঢুকেই বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। বক্ষে তার তীব্র কম্পন, পৃথিবীর সবার চোখে অদম্য, গুরুগম্ভীর আর শক্তপোক্ত ব্যক্তিটা আজ এক মায়াবিনীর রূপে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এত বছর বুকের ভেতর চেপে রাখা অনুভূতিরা যেন খাঁচা ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। অষ্টাদশী কি করে বুঝবে, তাকে এই রূপে দেখে আবিরের হৃদয়ে কতটা তোলপাড় চলছে। 

২০ মিনিট কেটে গেল। আবিরের এক হাত মাথার নিচে অপর হাত বুকের বা পাশে। আচমকা চোখ মেলে তাকায়, ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি। বিছানার পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিল। গ্যালারিতে ঢুকেই প্রথম ছবিটাতে চাপ দিল। ওমনি মেঘের শাড়ি পরা একটা ছবি ভেসে উঠেছে। মেঘের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছুক্ষণ আগেই ২ টা ছবি তুলেছিল আবির। সেখান থেকেই একটা ছবি সুদীর্ঘ মনোযোগ দিয়ে দেখছে। কাজল কালো চোখ, লজ্জায় লালিত মুখমণ্ডল, ওষ্ঠদ্বয়ে মায়াবী হাসি আবিরের অশান্ত মন জানান দিচ্ছে, 

"মায়াবিনীর মায়াজালে আবিরের মৃত্যু নিশ্চিত। "

আবির ফেসবুকে ঢুকে নিজের টাইমলাইনে একটা পোস্ট করে,
"মনের বিরুদ্ধে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে যুদ্ধে শহীদ হওয়া বোধহয় অধিকতর শান্তিপূর্ণ। "

নিচে ছোট করে লিখেছে " Best Surprise ever 🖤"

আবির পুনরায় মেঘের শাড়ি পরা ছবিটা বের করেছে৷ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। অকস্মাৎ ফোনের যান্ত্রিক আওয়াজ বেজে উঠলো৷ তানভির কল করেছে। আবির রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠ ভেসে এলো,

"ভাইয়া, তুমি ঠিক আছো ? বনু ঠিক আছে তো? "

আবির মৃদু হেসে উত্তর দিল,
"তোর বোন বোধহয় সিদ্ধান্ত নিয়েই নিছে, আমায় না মে*রে থামবে না। 

"কেন? কি হয়ছে? বনু কিছু করছে? রাগে বকা দাও নি তো আবার! "

"তোর বোন এমন রূপে আমার সামনে আসছে, ধমক দেয়া বহু দূর, আমি তো........ "

"তুমি তো কি? বনু কেমন রূপে আসছে?"

"তুই না আমার সম্বন্ধি হোস, ছোট বোনের প্রেমালাপ শুনতে চাস, লজ্জা লাগে না তোর। "

"আচ্ছা সরি। তোমরা ঠিকঠাক থাকলেই হলো। তোমাদের দুজনকে একসাথে পাঠিয়ে এখন টেনশনে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তোমার স্ট্যাটাস দেখে আরও বেশি ভয় লাগছিল। তাই তাড়াতাড়ি কল দিলাম। কিছুক্ষণ আগে মাইশা আপু কল দিয়েছিল আমায়। যাই নি বলে রাগারাগি করছে। আমি বলছি সকাল সকাল চলে আসবো। "

"আচ্ছা। সাবধানে থাকিস । আর আসার সময় আমার বাইকটা নিয়ে আসিস। "

"আচ্ছা। "
"রাখছি। "
"ভাইয়া শুনো"
 "হ্যাঁ বল।"
"বনুর সাথে রাগ দেখিও না প্লিজ। "

"এখন রাগ দেখানোর অবস্থায় আমি নেই। তোর বোনকে নিয়ে পালাইয়া না যায়, এই টেনশনে আছি৷ রাখছি "

আবির কল কেটে ওয়াশরুম থেকে হাতমুখ ধৌয়ে আসছে। তানভির আহাম্মকের মতো বসে আছে, বনু কি করছে, ভাইয়ার কি হয়ছে, কি বললো সব যেনো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আবির ভাইয়া পরিবারের জন্য এত দৃঢ় সংকল্প নিয়ে, হুট করে পালিয়ে যাওয়ার কথায় বা কেন বলছে। ভাইকে কল দিলেও লাভ নাই। মাঝে মাঝে তানভির ভাবে, ভাইয়ার সম্বন্ধি না হয়ে শালা হলেই ভালো হতো। মজার ছলেও অন্ততপক্ষে ভাই কিছু বলতো। যাতে ভাইয়ের মনোভাব বুঝতে পারতো সে। আবির কিছুক্ষণের মধ্যে রেডি হয়ে বের হয়ছে, রানী গোলাপী রঙের পাঞ্জাবি পরায় আজ আবিরকে অন্যরকম সুন্দর লাগছে। সাদা, কালো আর ধূসররঙের ভিড়ে উজ্জ্বল বর্ণটা আবিরকে বেশ মানিয়েছে। প্যান্ডেলে ঢুকতে গিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো, মেঘ কোথাও নেই। মীম, দিশা আরও কয়েকজন মিলে গল্প করছে। 

আবির মীমকে ডেকে জিজ্ঞেস করল,
"মেঘ কোথায়?"

মীম ও আশেপাশে তাকাচ্ছে, ধীর কন্ঠে বলল,
"আপুকে তো দেখছিলাম নিচে আসছিল, এখন তো দেখছি না।রুমে গিয়ে দেখে আসবো ভাইয়া ?"

"তোর যেতে হবে না। "

আবির দুপা এগুলোতেই সাকিব ছুটে আসছে। আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,

"ভাইয়া এতক্ষণে আসছো তুমি। তোমার মেঘবতী তো সেজেগুজে নিচে আসছিল, ঐনে মালা আর ওর দুই বান্ধবী কথা বলছিল। কি কথা বলছে তো শুনি নাই কিন্তু দেখলাম মেঘবতী মুখ গোমড়া করে উপরে চলে যাচ্ছে। তখন আব্বু, চাচ্চু আমায় ডেকে নিয়ে গেছে, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস আনার দরকার ছিল। তাড়াহুড়োতে রুম পর্যন্ত যেতে পারছিলাম না, ফোনটাও রুমে চার্জে রেখে আসছি তাই জানাতেও পারছিলাম না। কাজ শেষে দৌড়ে আসছি.."

আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
"যে ভ*য়টা পাচ্ছিলাম...."

আবির ঝড়ের গতিতে মেঘদের রুমে গেছে। রুমে কেউ নেই, বিছানার উপর শাড়ি, কসমেটিকস এলেমেলো পরে আছে। আবির আশেপাশের ২-৩ টা রুম চেক করল। কোথাও কেউ নেই। হঠাৎ সিঁড়ির দিকে নজর পরতেই ছুটলো সেদিকে৷ ছাদ জুড়ে ঝলমল করছে লাল নীল আর সবুজ রঙের আলো, তার একপাশে মেঘ দাঁড়িয়ে আছে । হাতে একটা গাছের ঢাল যেটা দিয়ে ছাদের রেলিং এ অবিরত আঘাত করছে। 

মেঘ ড্রেস পড়ে নিচে নামতেই চোখ পরে মালা আপু আর তাদের বান্ধবীদের দিকে। তারা কোনো বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন। মেঘ সেসবে পাত্তা না দিয়ে দু পা এগুতেই কানে আসে, 
" আবির ভাইয়ার সাথে আমার দুবছর যাবৎ ফোনে কথা হয়, প্রায় ই ভিডিও কলে কথা হয়,আমি যে ওনাকে ভালোবাসি এই কথাটা এখনও বলি নি। আজকে সুযোগ পেলে ভাইয়াকে বলে ফেলব। তোরা আমায় বুদ্ধি দে, কিভাবে বললে ওনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাবেন। "

কথাগুলো কানে আসতেই মেঘ স্তব্ধ হয়ে গেছে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরল। ক্রোধে কপালের শিরাগুলো দৃশ্যমান হয়ে গেছে। মেঘের চোখ-মুখ রক্তাভ হয়ে ওঠেছে। দাঁত কিড়মিড় করছে। আবির ভাই মালা আপুর সাথে কথা বলে, এই কথাটা অষ্টাদশীর মনে চরমভাবে আঘাত করেছে। রাগে গজগজিয়ে ছাদে চলে আসছে। রাগ টা আসলে কার উপর উঠেছে সেটা নিজেও বুঝতে পারছে না। মালা আপুর আচরণ ভালো লাগে নি এজন্য মালা আপুকে আগে থেকেই সহ্য করতে পারে না। অথচ আবির ভাই..! ভাবতেই বক্ষস্পন্দন থমকে গেল। রাগে ফুঁসতে আর ভাবছে,
" এতগুলো বছরে একটাবারও আপনি আমার সঙ্গে কথা বলেন নি, এখন জোর করতে পারলে তখন কেন জোর করে আমার সাথে কথা বললেন না। যদি কথা না ই বলবেন, তাহলে মালা আপুর সাথে কেন কথা বলেছেন। তাহলে কি আপনি....!"

এটুকু ভেবেই থেমে গেল৷ ক্রোধ যেন কমছেই না বরং বাড়ছে। পাশে একটা গাছ থেকে একটা ঢাল ভেঙে সেটা দিয়ে রেলিং এ আঘাত করেই নিজের ক্রোধ কমানোর চেষ্টা করছে। 

আবির বিদ্যুৎ বেগে ছুটে এসে মেঘের হাত চেপে ধরল৷ হাত থেকে ঢাল টা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল। আবির সরু নেত্রে খেয়াল করল অষ্টাদশীর চোখ-মুখ। লাইটের আলোতে বারবার পরিবর্তন হচ্ছে চেহারার বর্ণ। মেঘের চোখে-মুখে তীব্র ক্ষিপ্রতা। আবিরের উপস্থিতি বুঝতে পেরে রাগ যেন তিনগুণ বেড়ে গেছে। আবিরের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কোথাও কেটেছে কি না, আবির সেটা দেখার চেষ্টা করছে। অথচ মেঘ নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে হাত সরানোর চেষ্টা করছে। মেঘের এমন কান্ডে আবির অগ্নি চোখে তাকিয়েছে৷ ধমক দিতে গিয়েও থেমে গেল, ঢোক গিলে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করল। মেঘের অন্য হাতটা টেনে নিল। মেঘের দু'হাত একসঙ্গে রেখে কব্জি বরাবর চেপে ধরে তপ্ত স্বরে বলল, 

"এখন দেখব কিভাবে নিজের হাত ছাড়াস "

মেঘ রাগে কটমট করে বলল,
"ছাড়ুন আমায়৷ "

"না ছাড়লে কি করবি?"

রাগে কটমট করছে মেঘ প্রশ্ন করল,
"কোন অধিকারে আমায় ছুঁয়েছেন? "
মেঘ রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে কথাটা বলল।

আবির নিরেট কন্ঠে উত্তর দিল,
" আমায় অধিকারবোধ শেখাতে আসিস না। তোকে ছোঁয়ার জন্য যদি অধিকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়, আমি সেই অধিকারনামায় স্বাক্ষর করে হলেও তোকে ছুঁবো।"

রাগের মাথায় আবিরের কথাগুলো মেঘ শুনলো কিনা কে জানে৷ অতিরিক্ত ক্রোধে মেঘের মাথা ঘুরছে, তবুও শান্ত হওয়ার নাম নেই৷ মেঘ রাগান্বিত কন্ঠে পুনরায় চেঁচিয়ে উঠল,

"আমায় ছাড়ুন বলছি৷ "

"ছাড়ার জন্য তো ধরি নি, ছাড়িয়ে নিতে পারলে নে। "

মেঘ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
"আমি কিন্তু চিৎকার করব।"

আবির এবার স্ব শব্দে হাসলো। মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে বলল,
"হাসছেন কেন? আমি কিন্তু সত্যি সত্যি চিৎকার করবো।"

আবির তপ্ত স্বরে প্রশ্ন করল,
"তুই যে অগাচণ্ডী সেটা কি জানিস?"

"মানে..."

"এইযে চিৎকার করবি বললি, চিৎকার তুই করতেই পারিস, কিন্তু সবাই আসলে বলবি টা কি শুনি? আমি তোর হাত ধরেছি এটায় নালিশ করবি? তোর কি মনে হয়, তোর এই নালিশের ভয়ে আমি তোর হাত ছেড়ে দিব? জীবনেও না। বরং তুই নালিশ করলে আমার সুবিধায় হবে। দে চিৎকার। "

আবিরের কথাগুলো শুনে মেঘ হঠাৎ ই আবিরের দিকে কেমন করে তাকালো। এতক্ষণ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আবিরের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির ঝলক দেখে অষ্টাদশীর রাগ কিছুটা কমে এসেছে। তবে এখনও পুরোপুরি শান্ত হতে পারে নি। আবিরের মুখের পানে দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি নামাতেই চোখ পরে রানী গোলাপী পাঞ্জাবিতে। সঙ্গে সঙ্গে অষ্টাদশীর অভিব্যক্তি পাল্টাতে শুরু করলো। আবির ভাইকে এভাবে দেখে যেন চোখ ফেরাতে পারছে না। আচমকা ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। নিজের ভেতরের সমস্ত রাগ ঝেড়ে ফেলতে চাইলো। এই মানুষটার সাথে আর যাই হোক রাগ করা অষ্টাদশীর পক্ষে অসম্ভব বিষয়। 

আবির গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করল,

"তোর কি হয়েছে আমি জানি না, জানতেও চাই না। আমি কিছু কথা বলবো তুই চুপচাপ সেগুলো শুনবি।"

আবিরের কথায় মেঘের দৃষ্টি সরল, মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। আবির বলে,

"মনে কর, তুই একটা ড্রেস কিনতে একটা দোকানে গেছিস, অনেক খোঁজার পর একটা ড্রেস তোর খুব পছন্দ হয়েছে। যেই ড্রেসটা নিতে যাবি তখনি অন্য একজন এসে তোর পছন্দের ড্রেসটা নিয়ে দেখতে লাগল । তারও ড্রেসটা খুব পছন্দ হয়েছে। তখন তুই কি করবি ড্রেসটা হাসিমুখে তাকে দিয়ে দিবি? নাকি শক্ত গলায় বলবি, এই ড্রেসটা আমি নিব। যদি অভিমান করে তোর পছন্দের জিনিস গুলো মানুষকে দিতে থাকিস, পরে একটা সময় দেখবি তোর আশেপাশে প্রিয় জিনিস বলতে কিচ্ছু নেই। "

মেঘ মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলো। আবির মেঘের হাত ছেড়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

"আমাদের আশেপাশে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যেগুলো দেখেও না দেখার মতো করে চলতে হয়। যদি আমরা সেগুলোকে পাত্তা দেয়, তাহলে আমাদের জীবন ধ্বংস। অনিশ্চিত জীবনে যতদিন বাঁচবি, ততদিন নিজেকে নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবি। আমি নিচে যাচ্ছি, ১০ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসবি। "

আবির দীর্ঘ পা ফেলে সিঁড়ির কাছে গিয়ে আবার পেছন ফিরে তাকালো, উচ্চস্বরে বলল,

"My Dear Sparrow,
সবকিছু চাইলেই পেয়ে যাবেন, এমনটা নাও হতে পারে৷ প্রয়োজনে কিছু জিনিস আদায় করে নিতে হয়।"

আবির চলে গেছে। মেঘ ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় ঘুরছে আবির ভাইয়ের বলা শেষ কথাটা৷ "প্রয়োজনে কিছু জিনিস আদায় করে নিতে হয়।" মেঘের রাগ, অভিমান, মন খারাপের কারণগুলো এক মুহুর্তেই পালিয়েছে। আবির ভাই যেন অষ্টাদশীকে ইন্ডাইরেক্টলি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, "আবির ভাইয়ের ভালোবাসা আদায় করে নিতে হবে৷ " সহসা মেঘের ঠোঁটে হাসি ফুটেছে। এই হাসিতে কোনো খাদ নেই। মনের ভেতর নেই কোনো অভিযোগ। 

মেঘ দ্রুত রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে, অন্তহীন পায়ে ছুটতে ছুটতে নিচে নামলো। মেঘের ছুটোছুটি দেখে হালিমা খান বিরক্ত হয়ে বললেন,

"এভাবে দৌড়াচ্ছিস কেন, পরে ব্যথা পেলে কি হবে?"

মেঘ এক গাল হেসে উত্তর দিল,
"আমার কিচ্ছু হবে না। "

দৌড়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। আঁখি জোড়া কাউকে খোঁজছে। হঠাৎ চোখ পরে প্যান্ডেলের দিকে। একটা ব্রেঞ্চে আবির ভাই বসে আছে।পেছনের সাইড দেখা যাচ্ছে, মেঘ চুলগুলো দেখেই চিনতে পেরেছে। আবিরের পাশে সাকিবকে দেখে সিউর হয়েছে। সাকিব এদিকেই তাকিয়ে ছিল। 

সাকিব আবিরের কানের কাছে বিড়বিড় করে বলল,
"ভাইয়া, তোমার প্রেয়সী আসছে কিন্তু সাথে শত্রুপক্ষের আগমন হচ্ছে। বি কেয়ারফুল। "

সাকিব আবিরের পাশ থেকে উঠে আবিরের বিপরীতে একটা চেয়ার টেনে বসল। মেঘ আবিরের কাছাকাছি আসতেই চোখে পরল, মালা একটা ট্রে নিয়ে মেঘের আগে আবিরের সামনে হাজির হলো। কিছু খাবার আর এক গ্লাস শরবত। আবিরের কাছে এসে মালা মোলায়েম কন্ঠে বলল,

"ভাইয়া, তোমাকে কতক্ষণ যাবৎ খোঁজতেছিলাম। তুমি তো দুপুরের পর আর কিছু খাও নি। তাই খাবার নিয়ে আসছি। "

মালার আহ্লাদী কন্ঠে আবিরের মেজাজ খারাপ হলো। তবুও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। আবির প্রখর তপ্ত স্বরে জানাল,
"আমি এখন খাবো না। নিয়ে যা। "

মেঘের রাগ ক্রমে ক্রমে বেড়েই চলেছে। গাল ফুলিয়ে আবিরের থেকে কিছুটা দূরে আবিরের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। সামনে থেকে আবিরকে দেখছে। অথচ আবির কারো দিকেই তাকাচ্ছে না। 

মালা পুনরায় বলল,
"খাবার টা খেয়ে নাও প্লিজ।"

আবির রাগান্বিত কন্ঠে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মেঘ আবিরের কাছাকাছি দাঁড়ালো। ঝোঁকে আবিরের মুখোমুখি হলো। মেঘকে কাছে আসতে দেখে আবির একটু পিছিয়ে গেল। মেঘ আচমকা আবিরের বুকের উপরের বোতাম টা লাগাতে লাগাতে বলল,

"পাঞ্জাবি তো পরেছেন ঠিকই, বোতাম গুলোও ঠিকমতো লাগাতে পারেন নি। "

বোতাম লাগিয়ে তাকালো মাথায়, এক মুহুর্তের ব্যবধানে চুলে হাত দিল। দুহাতে চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল,

"ইশশ, চুলগুলোও এলোমেলো করে ফেলেছেন। আমি না থাকলে যে আপনার কি হবে, এটায় ভেবে পায় না।"

আবির অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে মেঘকে দেখছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে নিম্নাষ্ঠ কামড়ে ধরল। চোখে মুখের বিস্ময় যেন সরছেই না। মেঘ যে এমন কান্ড করবে, এটা আবির কল্পনাতেও ভাবতে পারে নি। মেঘের কান্ডে স্তব্ধ হয়ে গেছে আবির। মেঘ চুল ঠিক করে এক পা পিছিয়ে আবিরকে ভালোভাবে পরখ করে মোলায়েম কন্ঠে বলল,

"এইতো এখন ভালো লাগছে৷ মাশাআল্লাহ। "

কথাটা বলেই ধপ করে আবিরের পাশে বসে পরল। সাকিব চেয়ারে বসে এতক্ষণ বিপুল চোখে সব ঘটনা দেখছিল। ছেলেটা মুখ চেপে হেসেই যাচ্ছে। সবার মুখে হাসি থাকলেও। মালা রাগে ফুঁসছে। মেঘকে আবিরের বোন ব্যতিত কিছু ভাবে নি সে। তবে এখন মেঘের আচরণ দেখে মালার সহ্য হচ্ছে না৷ 

মেঘ মালার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

"আপু, আবির ভাই এ সময় কিছু খায় না। কিছু লাগলে আমি এনে দিব নে। তুমি বরং তোমার বান্ধবীদের সময় দাও। "

মালা রাগে কটমট করে চলে যাচ্ছিল। সাকিব পেছন থেকে ডাকল,

"মালা, খাবার টা বরং আমায় দিয়ে যা। আমি খেয়ে তোর জন্য দোয়া করবো। "

মালা হুঙ্কার দিয়ে উঠল,
"তোর দোয়া আমার লাগতো না। "

আবির মেঘের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আজ সকাল থেকে যা যা ঘটছে তারপর আবির আর কোনোভাবেই নিজেকে সংযত রাখতে পারছে না। মালা চলে যাওয়ায় মেঘও আবিরের দিকে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই আবির ভ্রু নাচালো। মেঘ নিঃশব্দে হাসলো। কাজল কালো চোখ সাথে অকৃত্রিম হাসিতে আবির ঘায়েল হয়ে গেছে। নেশাক্ত কন্ঠে শুধালো,

"এটা কি ছিল?"

মেঘ হাসিমুখে উত্তর দিল, 
"আপনি বুঝবেন না৷ "

আবির ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই সাকিব বলে উঠল,
"ভাইয়া, শুধু হাতে পায়ে লম্বা হলেই হয় না। বুদ্ধির ও প্রয়োজন আছে। তোমার উচিত মেঘবতীর থেকে কিছু বুদ্ধি ধার নেয়া৷ "

আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকেই মুচকি হেসে জানাল,

"আমিও তাই ভাবছি। এখন থেকে যখন ই বুদ্ধির প্রয়োজন হবে, তখন ই ওর কাছে যাবো।"

মেঘ আবিরের মুখের পানে চেয়ে ভেঙচি কেটে উঠে চলে গেছে । আবির নিঃশব্দে হাসছে আর অষ্টাদশীর প্রস্থান দেখছে। আবিররা যেখানে বসেছে তার পেছনে কিছুটা দূরে গায়ে হলুদের স্টেজ৷ মীম, দিশা আরও কয়েকটা মেয়ে সেখানেই বসে আছে। মীমকে দেখে মেঘও সেখানে গিয়ে মীমের পাশে বসেছে। 

সাকিব চেয়ার থেকে উঠে এসে আবিরের পাশে বসতে বসতে মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বলল,
"নাও তোমার ভিডিও আর ছবি। ঠিক আছে কি না দেখো।"

আবির টেনে টেনে সবগুলো দেখছে। মেঘের ভেঙচি থেকে শুরু করে আরও অনেক ছবি তুলে ফেলছে। ১ টা ছবিতে দু'জন দু'জনের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা ভিডিও করেছে। ভিডিওটা তে বোতাম লাগানো, চুল ঠিক করার দৃশ্য। 

সাকিব আস্তে করে বলল,
" ভাইয়া আমার কিন্তু খুব রাগ উঠতেছে। "

আবির ফোনটা পকেটে রেখে বলল,
" কেন? "

আবির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল মেঘ সবার সঙ্গে কথা বলছে আর হাসছে। সাকিবের কাঁধে মাথা রেখে আবির মেঘকে দেখছে। সাকিব ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

" তোমাদের লুকোচুরি প্রেম আর কতদিন চলবে? " 

"জানি না।"

"এইযে কিছু বলতে পারো না তোমার খারাপ লাগে না?"

"খারাপ তো লাগেই। ওর জন্য কত নির্ঘুম রাত কাটে আমার। ও যদি জানতো! নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালবেলা ওর মায়াবী আঁখি জোড়া দেখলে মনে হয় আরও শত শত রাত নির্ঘুম কাটাতে পারবো।"

সাকিব মজা করে বলল,
"আহারে ভালোবাসা। "
          আবিরের ঘোর যেন কোনোমতেই কাটছে না। সাকিবের কাঁধে মাথা রেখে ক্লান্তিহীন অমত্ত চোখে মেঘকে দেখেই যাচ্ছে। নিজে পছন্দ করে কেনা ড্রেসটাতে অষ্টাদশীকে যতটা মোহনীয় লাগবে ভেবেছিল তার থেকেও কয়েকগুণ বেশি রমণীয় লাগছে। মেঘের মায়াবী হাসি দেখে আবিরের টালমাটাল অবস্থা। মায়াবিনীর মায়াবী হাসি দেখলে বরাবরই আবিরের সকল দুশ্চিন্তার অবসান ঘটে ৷ হৃদয়ে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। আজ সকাল থেকে ঘটা একের পর এক ঘটনা আবিরকে বেসামাল করে দিচ্ছে। নিজেকে সামলানোর বিন্দু মাত্র শক্তি আবিরের নেই। নানান রকমের নিষিদ্ধ ইচ্ছা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অষ্টাদশীর প্রাণোচ্ছল হাসি, তার সাথে গাঢ় কাজল টানা দু চোখ দেখে আবির আনমনে বিড়বিড় করে বলে,

"আমার ক্লান্ত মস্তিষ্ক জোড়ে শুধু তোর বিচরণ চলে "

সাকিব ঠাট্টার স্বরে শুধালো, 
"কার?"

সাকিবের প্রশ্নে আবির কিছুটা নড়ে বসল। বুঝতে পারল, তার মনের কথা মুখ ফঁসকে বেড়িয়ে গেছে। নিজেকে সামলে উত্তর দিল,

"মাহদিবা খান মেঘ"

"এখনও মেঘবতীকেই দেখছ নাকি? কোথায় মেঘবতী, দেখি! " 

 যেই না ঘাড় ঘুরাতে যাবে,ওমনি আবির আঁটকে দিল। তেজঃপূর্ণ ভারী স্বরে বলল,

" আমার সম্পত্তিতে ভুলেও নজর দিবি না। "

সাকিব আমতা আমতা করে বলল,
"আমি তো শুধু দেখতে চাইছিলাম৷ ভাইয়ের সম্পত্তিতে নজর দিব এত নিকৃষ্ট আমি না। তাছাড়া আমার মানুষ আছে। "

আবির কোনো কথা বলল না। একটু থেমে সাকিব পুনরায় বলল,
"ভাইয়া চলো একটা জায়গায় যায়। "

আবির উদাস কন্ঠে বলে উঠল,
"আমি জানি তুই কোথায় যেতে চাচ্ছিস৷ কিন্তু আমি এখন কোথাও যাচ্ছি না।"

"প্লিজ ভাইয়া চলো না। ওদের সন্ধ্যার পর আমাদের বাড়িতে আসার কথা ছিল,আমি বলছিলাম এগিয়ে নিয়ে আসবো। "

আবির ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
" ইশশ কি প্রেম! দুইটা বাড়ি পরেই তো বাড়ি। এখান থেকেও আবার এগিয়ে আনতে হয় ? আর কত কি যে দেখতে হবে। "

সাকিব একগাল হেসে প্রশ্ন করল,
" এই কথা তুমি বলছ ভাইয়া? ২৪ ঘন্টা যার চোখের সামনে মেঘবতী ঘুরঘুর করে, মেঘবতীর কন্ঠ না শুনলে রাতে যার ঘুম হয় না, সেই সাজ্জাদুল খান আবির এই কথা বলছে?"

আবির গম্ভীর কন্ঠে বলে,
"চুপ থাকবি তুই৷ "

"আর একটা প্রশ্ন, 
বাসায় তো সারাদিন মেঘবতীকে দেখই তারপরও এত বিভোর হয়ে আছো কেন, বলবা ? "

আবির রাশভারি কন্ঠে জবাব দিল,
"বাসায় তো এভাবে দেখার সুযোগ পায় না। একবারের বেশি দুবার তাকাতে গেলেই চোখে চোখ পরে যায়৷ না চাইতেও বাধ্য হয়ে আমার ই দৃষ্টি সরিয়ে নিতে হয়। আজ এতদিন পর ও কে দেখার সুযোগ পেয়েছি। দয়া করে তোর মুখ টা বন্ধ রাখ। " 

"ওদের কি আনতে যাব না?"

আবির গম্ভীর কন্ঠে জানাল,
"কল বা মেসেজ দিয়ে বল চলে আসতে৷ আমি এখন কোথাও যাব না৷ আর তুই ও যেতে পারবি না৷ প্রোগ্রাম শেষে এগিয়ে দিয়ে আসিস। এখন ডিস্টার্ব করিস না। "

সাকিব পকেট থেকে ফোন বের করে মেসেজ করছিল। সাকিবের কাঁধে আবিরের মাথা, অক্ষি যুগল নিবদ্ধ মেঘের চোখে-মুখে। প্রেয়সীর মুগ্ধতায় ডুবে আছে সে। পল্লব ফেলছে না একটিবারও। ইহজগতের আর কোনোকিছুতেই মনোযোগ নেই তার।

আচমকা কেউ একজন আবিরের কান চেপে ধরায়, আঁতকে উঠে। অগাধ মনোযোগে ছেদ পরল। আকস্মিক ঘটনায় আবির কিছুটা ভড়কে গেল। হকচকিয়ে সোজা হয়ে বসে সঙ্গে সঙ্গে তাকায় সেদিকে। মাইশা শক্ত হাতে আবিরের কান চেপে ধরে আছে, চোখে-মুখে পরিষ্কার রুষ্টতা। আবির বিস্ময় চোখে তাকায়, ভ্রু কুঁচকে নরম স্বরে বলল,
"উফ, আপু লাগছে। "

মাইশা রাগী স্বরে জবাব দেয়,
"লাগুক। তোরে কতক্ষণ পি*টাইলে মনে শান্তি পাইতাম। "

আবির নিরুদ্বেগ কন্ঠে বলল,
"আমি আবার কি করলাম?"

"ফাজিল ছেলে, আবার কথা বলিস।"

"প্লিজ আপু কান ছাড়ো। ব্যথা পাচ্ছি ৷"

মাইশা কান ছেড়ে আবিরের পিঠে ঠাস ঠাস করে ২-৩ থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছে। আবির কপাল গুটিয়ে কোমল কন্ঠে আর্তনাদ করে,

"আপু.....!"

সাকিব চিন্তিত স্বরে শুধালো, 
"হয়ছে টা কি আপু? ভাইয়াকে মারতেছো কেন?"

মাইশা রাগান্বিত কন্ঠে বলা শুরু করে,

"মারবো না তো কি করব। আমি নিজে না সেজে কতটা সময় নিয়ে মেঘকে সাজিয়েছি। সাথী শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছে, মুন্নি আর আমি মিলে মেকাপ করে দিয়েছি, আলতা টা পর্যন্ত আমি দিয়ে দিয়েছি৷ বার বার মেয়েটাকে বলছি, তুমি বসে থাকো আমি রেডি হলে একসাথে নিচে আসব। ছটফটে মেয়ে একটুও বসলো না, রুম থেকে ছুটে চলে আসছে। আমি রেডি হয়ে আসতে পারলাম না, মেঘের পড়নে না আছে শাড়ি, আর না আছে কোনো সাজগুজ। আমি সিউর এটা এই ফাজিলের কাজ। "

বলতে বলতে আবিরের পিঠে আরেকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছে। সাকিব মাইশার কথা শুনেই বসা থেকে উঠে গেছে৷ আবিরের মুখোমুখি হয়ে শুধায়,

" ওহ আচ্ছা, এই কারণেই তাহলে তোমার টালমাটাল অবস্থা?"

মাইশা পুনরায় চেচিয়ে উঠে, 
" কিরে কথা বলছিস না কেন?"

আবির অন্য দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
"আমি কি বলব।"

 "মেঘ শাড়ি পাল্টালো কেন?"

"জানি না "

"আবির, একদম ফাজলামো করবি না। আমি ডেম সিউর এটা তোর কাজ। "

সাকিব পাশ থেকে বলে উঠল,
"এতক্ষণে বুঝলাম, ভাইয়ার মাথা নষ্টের কারণ মেঘবতীর শাড়ি। থাক আপু, তুমি মন খারাপ করো না। ভাইয়া মেঘবতীর প্রতি একটু বেশিই সিরিয়াস তো, তাই হয়তো শাড়ি পাল্টাতে বলছে।"

মাইশা ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
"তুইও জানিস? আবির তাহলে সত্যি সত্যি মেঘকে পছন্দ করে?"

সাকিব উত্তেজিত কন্ঠে জানাল,
"পছন্দ না গো আপু। মেঘবতীর প্রেমে আবির দেওয়ানা বলো। মানুষ তো প্রেমে হাবুডুবু খায়, ভাইয়া পুরোপুরি ডুবে আছে। কবে যে নিঃশ্বাস আটকে মরে যায় আল্লাহ জানেন।"

আবির সাকিবের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে। সাকিবের সেদিকে হুঁশ নেই। আবির ধমক দিতে যাবে তার আগেই মাইশা শীতল কন্ঠে বলে উঠে,

"ছিঃ আবির তোর থেকে অন্তত এটা আশা করি নি। ছোট বেলা থেকে তুই বলতি, আমি নাকি তোর সবচেয়ে ভালো বোন। ভালো বোন হওয়ার এই প্রতিদান দিলি৷ একটাবার বলতে তো পারতি!"

আবির কৈফিয়তের স্বরে জবাব দিল,
"কি করে বলব! তোমার সাথে কি নিরবে কথা বলতে পারি? ফোনে কথা বললে মামা, মামি, মালা, দিশা কেউ না কেউ থাকেই সবসময়৷ বলবো কিভাবে?"

মাইশা সেসবে পাত্তা না দিয়ে বলে,
"তুই আমার প্ল্যানে পানি ঢালছিস, এখন আমি তোর প্রেমে আগুন লাগাবো। ওয়েট বাবু। "

মাইশা রাগে গজগজ করে ২-৩ কদম এগুতেই আবির ছুটে গিয়ে মাইশার পথ আঁটকে দ্বিগুণ ভারি কন্ঠে প্রশ্ন করে,

"কি করবা?"

"তানভির কে কল দিয়ে বলব, তুই যে গোপনে হের বোনের পিছে ঘুরছিস৷ "

আবির মাইশার সামনে থেকে সরে একপাশ হয়ে দাঁড়িয়ে উত্তর দিল,

"ওহহ "

মাইশা ভ্রু কুঁচকে আবিরের মুখের পানে তাকায়। আবিরের ঠোঁটের কোণে হাসি দেখে মাইশার চরম রাগ উঠে গেছে। সাকিবের দিকে তাকাতেই সাকিব হেসে ফেলল৷ সাকিবকে হাসতে দেখে মাইশা রাগে প্রশ্ন করল,

"হাসছিস কেন?"

"হাসছি, কারণ তুমি যাকে বিচার দিতে যাচ্ছো। সে অলরেডি সবকিছু জানে৷ এখন না, আরও ৭-৮ বছর আগে থেকেই জানে। "

"কি? আবির কি এতবছর যাবৎ মেঘকে ভালোবাসে? "

"হ্যাঁ।"

মাইশা আবিরকে শুধালো,
"মেঘ জানে?"

"না"

"বলিস না কেন?"

"সময় হলে বলব।"

"তুই সময়ের অপেক্ষা কর, আমি এখনি বলে দিব৷ "

আবির আতঙ্কিত হয়ে বলে,
"আপু প্লিজ, ওরে এখন কিছু বলো না।"

" আমি বলবই৷ "

"সরি আপু। প্লিজ ওরে কিছু বলো না। "

" সরি বললেই কি সবকিছুর সমাধান হয়ে যায়? এত কষ্ট করে সাজিয়ে দেখতেই পারলাম না আর একটা ছবিও তুলতে পারলাম না। এখন তোরে কি করতে মন চাই বল "

" আপু শুনো, ভাইয়া যেহেতু ঢাকায় জব করেন, বিয়ের পর তো তুমিও ঢাকা তেই থাকবা। কোন একদিন মেঘকে শাড়ি পরিয়ে তোমার সাথে দেখা করাবো, দরকার হলে তোমাদের বাসা থেকেও ঘুরে আসবো। তবুও শাড়ি পরা নিয়ে আর কিছু বলো না। আম্মুরা কারো কানে একথা গেলে তুলকালাম হয়ে যাবে। প্লিজ৷ "

"ফুপ্পি জানে না?"

"না।"

"ঠিক আছে, মাফ করতে পারি তবে একটা শর্তে"

"কি শর্ত?"

" কানে ধর "

"এখন?"

"হ্যাঁ এখন। কানে ধরবি নাকি মেঘকে বলবো?"

"আচ্ছা ধরছি " বলে আবির দু'হাতে আলতোভাবে কানের লতি স্পর্শ করল৷ 

মাইশা মৃদু হেসে শুধালো,
"মেঘকে প্রথমবার শাড়িতে দেখার অনুভূতি বল "

আবিরের জবাব এলো,
"কানে ধরে কেউ অনুভূতি শেয়ার করে?"

"কেউ করে না বলেই তুই করবি।"

"শুনো তবে, 
শাড়ি পরিহিতা মাহদিবা খান মেঘকে দেখে সাজ্জাদুল খান আবিরের অন্তরতম অঁচল পূর্বাভাস বিহীন কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়েছে। মাহদিবার সাহচর্য ব্যতীত আবিরের অশান্ত হৃদয় শান্ত হবে না।"

মাইশা আর সাকিব দুজনেই হা করে তাকিয়ে আছে। মাইশা উচ্চস্বরে হেসে বলল, 

"হায় আল্লাহ! আমার ভাই এখন প্রেমিক পুরুষ হয়ে গেছে। "

মাইশার হাসির শব্দে মীমদের নজর পড়ে। আবির কে দেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে,

"আপু, দেখো ভাইয়া কানে ধরে দাঁড়িয়ে আছে৷ "

তৎক্ষনাৎ মেঘের নজর পরে সেদিকে। আবিরকে এই অবস্থায় দেখে মেঘের মাথায় চক্কর দিয়ে উঠে। মেঘ, মীম ছুটে যায় সেদিকে। 

মেঘ দূর থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধায়,

"কি হয়েছে? আপনি কানে ধরে আছেন কেন?"

মাইশা আবিরকে ইশারা দিতেই আবির কান থেকে হাত নামিয়ে বলে,

" কিছু হয় নি৷ "

"কিছু হয়নি মানে কি?"

মাইশা মেঘের দিকে তাকিয়ে কোমল কন্ঠে বলে,
"আবির ভুল করেছিল তাই আমি শাস্তি দিয়েছি। "

মীম প্রশ্ন করে,
"ভাইয়া কি ভুল করছিল?"

"সেটা তোমাদের বলা যাবে না। " এই বলে মাইশা চলে গেছে। মেঘ আবিরের মুখের পানে চেয়ে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,

"কি করছিলেন আপনি?"

আবির কিছু বলার আগেই সাকিব বলল,

"ভাইয়া ছোট একটা ভুল করেছিল তাই আপু শাস্তি দিয়েছে৷ তুমি টেনশন করো না। "

এই কথা শুনে মেঘ ফিক করে হেসে উঠলো। আবির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
"হাসছিস কেন?"

মেঘ মুচকি হেসে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল। মীমের হাত ধরে হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছে। আবির কপাল গুটিয়ে প্রেয়সীর গমনপথে চেয়ে আছে। মেঘের চিন্তান্বিত চেহারার হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ আবিরের মাথায় ঢুকছে না। মাইশাকে স্টেজে বসানো হয়েছে। প্যান্ডেলে আত্মীয়ের সমাগম। এরমধ্যে দুটা অল্পবয়স্ক মেয়ে শাড়ি পড়ে বাড়িতে ঢুকছে। সাকিব একপলক তাকিয়ে আবিরের কানে ফিসফিস করে কি যেন বলে সেদিকে চলে গেছে। মালা আর ওর বান্ধবীরা কয়েকটা ছেলের সাথে হেসে হেসে কথা বলতে ব্যস্ত। ছেলেগুলো মালার ই বন্ধু। আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে। মেঘ চেয়ারে বসে মাইশার ছবি তুলছে আর সেগুলো মীমকে দেখাচ্ছে। মাঝে মাঝে দুইবোন সেলফিও তুলছে। সাকিব গেইটের কাছে গিয়ে একটা মেয়ের সঙ্গে একটু কথা বলেই সরে গেছে। আদি ছুটে এসে মীমকে টেনে নিয়ে কোথায় চলে গেছে। এই সুযোগে আবির লোকজনের ভিড় পেরিয়ে মেঘের পেছনে দাঁড়িয়ে মেঘের মাথায় গাট্টা মারে। আকস্মিক ঘটনায় মেঘ আঁতকে উঠে। পেছন ফিরে আবিরকে দেখে কিছুটা স্বাভাবিক হয়। 

আবির রাশভারি কন্ঠে প্রশ্ন করে,
"তখন হাসছিলি কেন ?"

"এমনি!"

"এমনি কেউ হাসে না। কারণ বল। "

"আপনাকে শাস্তি দেয়ার মানুষ আছে দেখেই হাসি পাচ্ছিল। "

"তারমানে আমি শাস্তি পেলে তুই খুশি?"

"আমি এই কথা কখন বললাম! "

"সব কথা বলতে হয় না। তোর মনের কথা চোখে স্পষ্ট ভাসতেছে।"

মেঘ ঘন ঘন পল্লব ফেলে শুধালো,  
"আপনি কি চোখের ভাষাও বুঝেন?"

"জ্বি।"

"সবার?"

"জ্বি না। তোর মতো তার ছিঁড়া মানুষের মনের কথা বুঝার ক্ষমতা আল্লাহ আমায় দিয়েছেন। "

"আমি তার ছিঁড়া? "

"কি মনে হয়?"

মেঘ গাল ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,
 "আমি মোটেই তাঁর ছিড়া না।"

"সেসব পরে দেখা যাবে। মামি খাওয়ার জন্য ডেকে গেছেন। মীম, আদিকে নিয়ে তাড়াতাড়ি আয়।" 

মালা আর ওর বান্ধবীরা দূর থেকে আবির মেঘের কথোপকথন শুনার চেষ্টা করছিল। স্টেজ থেকে মাইশাও আবির মেঘকে দেখছিল। মাইশার মুখে মিষ্টি হাসি। মাইশা আর আবিরের বয়সের পার্থক্য মাত্র ১ বছর হওয়ায় দুই ভাই- বোনের মধ্যে ছোট থেকেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। মামা বাড়িকে কেন্দ্র করে আবিরের শৈশবের অনেকখানি স্মৃতি জড়িয়ে আছে। মামা বাড়ির সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল মাইশা৷ সাকিব একটু বড় হওয়ার পর থেকে সাকিবের সঙ্গেও খুব ভালো সম্পর্ক হয়েছে । বাকিদের সঙ্গে তেমন আন্তরিকতা নেই। মাইশা পড়াশোনার জন্য বাড়ির বাহিরে চলে যাওয়া, আবিরের দীর্ঘদিন মামা বাড়িতে না আসা, তারপর বিদেশে চলে যাওয়া। সব মিলিয়ে মাইশার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়নি অনেক বছর। মালার ফোন দিয়ে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে। তবে সবসময় মালা আশেপাশে থাকে। মালার সামনেই মাইশা আবিরকে অনেকবার প্রশ্ন করেছে, আবির কাউকে পছন্দ করে কি না। কেউ আছে কি না! কিন্তু আবির সবসময় এই প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে। ব্যস্ততা দেখিয়ে কল কেটে দিয়েছে। মাইশাও আলাদা ভাবে কখনো আবিরকে কল দেয় নি, আবিরও নিজ থেকে কিছু বলে নি। এতদিন পর মাইশা আবিরের মনের কথা জানতে পেরেছে। তাই মেঘ আবিরের খুনসুটি দেখে আনমনে হাসছে। তবে মাইশা খুশি হলেও মালা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছে। সন্ধ্যার ঘটনার পর থেকে দুজনকে একসঙ্গে দেখলেই মালা ফুঁসে ওঠে। 

আবির বাড়ির ভেতরে চলে গেছে। মীম আর আদি আসার পর মেঘও ওদের নিয়ে খেতে চলে গেছে। মাইশার বাবা-চাচারা, মামারা আরও যারা যারা আছেন সবাই মাইশাকে হলুদ লাগাতে ব্যস্ত। ২ জন ক্যামেরাম্যান ছবি তুলতেছে। মেঘদের পিছুপিছু মালাও ওর বান্ধবীদের নিয়ে খেতে গেছে। মালিহা খান আর আবিরের ছোট মামি মিলে সবাইকে খাওয়াচ্ছেন। মালাকে বসতে দেখেই সাকিব ঠাট্টার স্বরে বলল,

"কিরে মালা, তুই খেতে বসছিস কেন?"

"তোর কি সমস্যা? "

"আমার আবার কি সমস্যা হবে। যে মেয়ে সাজলে সারাদিন পানিও খায় না। সেই মেয়ে শাড়ি পরে, সেজেগুজে ভাত খেতে বসছে। ঘটনা কি?"

" তোর মাথা। "

সাকিব আর কথা না বাড়ালো না। আবিরের একপাশে সাকিব বসেছে। অপরপাশে আদি বসেছে, তারপর মীম, এরপর মেঘ। মেঘের পাশেই মালা বসেছে। মালাকে মেঘের পাশে বসতে দেখেই আবির চোখ রাঙিয়ে সাকিবের দিকে তাকিয়ে আছে। সাকিব চোখে ইশারা করল, আবির যেন শান্ত থাকে। মালার থেকে মেঘকে দূরে দূরে রাখতে চেয়েও পারছে না। আবির নিজের রাগ কন্ট্রোল করে খুব তাড়াহুড়োয় খাবার খাচ্ছে। আবির খাবার প্রায় শেষ। তখন মালা মেঘকে উদ্দেশ্য করে বলছে,

"মেঘ তুমি বরং এই মাছটা খাও।"

একটা মাছের পিস চামচে তুলে মেঘের দিকে এগুতেই আবির রাগান্বিত কন্ঠে বলে,

"মাছের তরকারি অনেক ঝাল হয়েছে, মেঘ এত ঝাল খেতে পারে না৷ "

মালা পুনরায় মাছ বাটিতে রেখে দিল। আবিরের কথা শুনে মেঘ চোখ জোড়া বড় করে তাকালো। অষ্টাদশীর খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। মেঘ এত ঝাল খেতে পারে না, এটা আবির ভাই মনে রেখেছে, ভেবেই অষ্টাদশীর মন খুশিতে ভরে গেছে। মেঘ চিবুক নামিয়ে লাজুক হাসলো। আবির ভাইয়ের প্রতি ভালো লাগা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। 

আবির উঠে যেতে যেতে মালাকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
" মেঘকে খাওয়ানোর দায়িত্ব তোকে দেয়া হয়নি। তোর যতটুকু কর্তব্য ততটুকুই করিস৷ এর বাহিরে কোনো প্রকার ভালোবাসা দেখানোর প্রয়োজন নেই। "

আবির রাগে কটমট করে রুম থেকে বেরিয়ে পরেছে। রাগটা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারছে না৷ আবার গিলতেও পারছে না৷ খাওয়ার মধ্যে তানভির ৫-৭ বার কল দিয়ে ফেলেছে৷ তানভিরের সাথে কথা বলে নিজের ভেতরের ক্ষোভ প্রকাশ করছে৷ তানভিরও ঠান্ডা মাথায় ভাইকে বুঝাচ্ছে ৷ আচমকা আবিরের সামনে মেঘ দাঁড়াতেই আবিরের কথা বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষোভের পরিবর্তে আবিরের চোখে-মুখে মুগ্ধতা প্রতীয়মান হচ্ছে। মায়াবিনীর মায়াবী মুখ দেখলে আবিরের ক্রোধ যেন নিমিষেই বিলীন হয়ে যায়। আবির উঠে যাওয়ায় মেঘ তাড়াহুড়ো করে খাবার খেয়ে ছুটে এসেছে। আবির ভাইয়ের অপ্রকাশিত ভালোবাসা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে সে। আবিরকে নিরুত্তর থাকতে দেখে তানভির কয়েকবার হ্যালো হ্যালো বলছে । কয়েক মুহুর্ত পর আবির বলে,
"এখন রাখছি। পরে কল দিব।"

মেঘ মোলায়েম কন্ঠে শুধালো, 
"ভাইয়া কল দিয়েছিল?"

"হ্যাঁ।"

"ভাইয়া কি রাতে খেয়েছে?"

"হ্যাঁ। তুই কি জন্য এসেছিলি?"

"আপনাকে দেখতে। "

আবির কপাল কুঁচকে বলে,
"মানে?"

" আপনার শীত লাগছে কি না দেখতে আসছিলাম। ঠিক আছে চলে যাচ্ছি। "

আবিরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেঘ লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিজের প্রতি রাগ হচ্ছে। মুখ ফসকে সবসময় সত্যি কথায় কেন বের হয়! মেঘ কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে স্টেজের দিকে চলে গেছে৷ মেঘকে দেখেই মাইশা হাতে ইশারা করলো স্টেজে যাওয়ার জন্য। 

ঘন্টাদুয়েক গায়ে হলুদের প্রোগ্রাম চলল। স্টেজের আশেপাশে ছবি তুলার জন্য বেশ কিছু সোফা, তার আশেপাশে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানেই সকলে দল বেঁধে ছবি তুলছে। সবার হলুদ ছোঁয়ানো শেষে নাচের প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। দিশা, মালা, মালার বান্ধবীরা সবাই গায়ে হলুদের গানে অনেক সুন্দর নেচেছে। ছেলেদের মধ্যেও বেশ কয়েকজন নেচেছে। সবার শেষে ১০ জন ছেলে স্টেজে উঠেছে। সবার পরনে রানী গোলাপী পাঞ্জাবি , সবাই এক গানে নাচছে। মেঘ সামনের দিকে চেয়ারে বসে সেই নাচের ভিডিও করছে। কারণ ১০ জনের কেন্দ্রবিন্দু হলো আবির। সবাই নিজেদের মতো নাচলেও আবিরকে স্টেজে উঠানো যায় নি। মাইশা আপু আর সাকিবের জোড়াজুড়িতে আবির শেষমেশ সবার সাথে নাচতে রাজি হয়েছে। টানা ৩ টা গানে ১০ জন একসঙ্গে পারফর্ম করেছে। আবির স্টেজ থেকে নেমে একটা চেয়ারে বসতে বসতে মেঘকে বলল,

"একটু পানি নিয়ে আসবি, প্লিজ। "

"এক্ষুনি আনছি। " বলে মেঘ হুটোপুটি করে পানি আনতে চলে যায়। পানির গ্লাস নিয়ে আসতে আসতে দেখে মালা আবিরকে পানির বোতল সাধতেছে। মেঘ গ্লাস হাতে মাঝপথেই দাঁড়িয়ে পরেছে। আবির ঘাড় ঘুরিয়ে উচ্চস্বরে বলল,

"পানি কি দিবি? "

মালা পুনরায় বলল,
"এটা ভালো পানি। খাও। "

মেঘ কয়েক পা এগিয়ে আবিরের কাছে আসতেই আবির হাত বাড়িয়ে পানির গ্লাস নিতে নিতে বলল,
"বোতল দিয়ে পানি খায় না আমি। "

মালা রাগে গজগজ করে চলে যাচ্ছে। যতবারই আবিরের কাছে যেতে চায়, আবির ততবারই মালাকে অবহেলা করে, দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এটা মালার একদম সহ্য হচ্ছে না। মেঘের প্রতি এত কেয়ার সহ্য করতে পারছে না সে। 

মেঘ পানির গ্লাস নিতে নিতে বলল,
"আপনি এত ভালো ডান্স করেন। জানতাম না তো! "

আবির মুচকি হেসে বলে,
 " সময় হলে আরও অনেককিছু জানতে পারবেন। "

মেঘ অবাক লোচনে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে৷ প্যান্ডেলের আনাচে-কানাচে মানুষের ভিড়। শীতের রাত বলে প্রোগ্রাম তাড়াতাড়ি শেষ করা হয়েছে। মেহেদী দেয়ার জন্য পার্লার থেকে তিনজন মেহেদী আর্টিস্ট আনা হয়েছে। মাইশা রুমে চলে যাওয়ায় পাড়া-প্রতিবেশীরাও যে যার মতো বাড়ি চলে যাচ্ছে। এত মানুষের ভিড়েও দু'জোড়া চোখ একে অপরকে দেখছে। উভয়ের তপ্ত দৃষ্টি তোলপাড় চালাচ্ছে উভয়ের হৃদয়ে৷ হৃৎস্পন্দনের মাত্রা তীব্র হচ্ছে। দুজনার আঁখি যুগল জড়িয়ে আছে মোহময়তায়। হঠাৎ ফোন ভাইব্রেশন হওয়ার আবিরের দুর্ভেদ্য চাহনিতে ছেদ পরে। স্ক্রিনে তাকাতেই সাকিবের নাম চোখে পড়ে ৷ ঘাড় ঘুরিয়ে সাকিবের হাস্যোজ্জল মুখ দেখে আবির পুনরায় মেঘের দিকে তাকায়। মেঘ তখনও গভীর মনোযোগের সঙ্গে আবিরকে দেখছে৷ আবির মেঘের চোখের সামনে দু আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে মেঘের ঘোর কাটানোর চেষ্টা করল। তুড়ির শব্দে মেঘ নড়ে ওঠে। 
সম্বিৎ ফিরতেই মেঘ লাজুক হাসলো। সে কল্পনায় আবির ভাইয়ের সঙ্গে কাপল ডান্স করতেছিল। আবির তুড়ি বাজিয়ে রোমান্টিক মুহুর্তটা নষ্ট করে ফেলেছে। মেঘকে হাসতে দেখে আবির কপাল গুটিয়ে বলল, 
"কি হলো?"

মেঘ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজালো। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ছেড়ে ডাকল, 
"আবির ভাই..!"

আবির আবেশিত কন্ঠে জবাব দিল,
"হুমমমমমম। "

আগপাছ না ভেবেই মেঘ বলল,
"আপনি মানুষটা খুব তেঁতো। "

মেঘের কথায় আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। মুচকি হেসে আশেপাশে তাকিয়ে ভাবলেশহীন জবাব দিল,

"তেঁতো হয়েই যে বিপদে আছি, মিষ্টি হলে না জানি কি হতো!"

মেঘের ওষ্ঠদ্বয় আরও প্রশস্ত হলো। আবির ভাই ঠিকই বলেছেন। আবির ভাইয়ের এই অ্যাটিটিউড দেখেই মালা আপু, এমপির মেয়ের মতো না জানি আরও কত মেয়ে পাগল। মালা আপুর আচরণে মনে হয় আবির ভাই তার সম্পত্তি। ভাবতেই আচমকা মেঘের হাসি গায়েব হয়ে গেছে। মুখ ফুলিয়ে শ্বাস টেনে বিড়বিড় করে বলল,

"আবির ভাই শুধুই আমার। আর কারোর না। "

আবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেঘের হঠাৎ পরিবর্তন দেখছে। মেঘের যে ক্ষণে ক্ষণে কি হয়ে যায় এটা ভেবেই আবির ক্লান্ত। আসার পর থেকেই মেয়েটাকে চোখে চোখে রাখছে। তারপরও কি যে হয়! বাসায় থাকলে আবির কখনোই এতটা সময় মেঘকে দিতে পারতো না।বিয়ে বাড়ি আত্মীয়ে পরিপূর্ণ। তাছাড়া সাকিব আর ওর বন্ধুরা আবিরকে অনেকদিকে সাহায্য করছে। মামারা বা আবিরের বাবা কোনো কাজে আবিরকে খোঁজতে গেলে সাকিবের বন্ধুরায় সে কাজ করে দিচ্ছে। আবিরকে ডাকার সুযোগ ই দিচ্ছে না তারা। সাকিব দু'দিকে ই নজর রাখছে। 

আবির গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকল,
"এইযে "

মেঘের নজর পরলো আবিরের চোখে। কোনো উত্তর দিল না। 

আবির রাশভারি কন্ঠে বলল,
" অনেক রাত হয়ে গেছে। আর টইটই করতে হবে না। কুয়াশার মধ্যে বাহিরে ঘুরলে ঠান্ডা লাগবে। প্রোগ্রাম তো শেষ ই। এখন রুমে যা। "

"আপনি কি করবেন?"

" আমার কাজ আছে ।"

মেঘ এবার ভাব নিয়ে বলল,
"রাত অনেক হয়েছে। আপনারও টইটই করা উচিত হবে না৷"

আবির প্রশস্ত নেত্রে তাকাতেই মেঘ ছুটে পালালো সেখান থেকে। আবির ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে। সহসা স্বভাবসিদ্ধ হাসে। আবিরের প্রতি মেঘের ভয়ভীতি যেমন কমছে, তেমনি বাড়ছে মেয়েটার দায়িত্ববোধ। প্রেয়সীর অল্পস্বল্প যত্ন দেখে আবির বেশ বিস্মিত হয়। মনখারাপের জায়গায় ভিড় করে একরাশ মুগ্ধতা। মেঘের সবকিছুই আবিরকে টানে তবে ছোট ছোট পাগলামি আর দুষ্টামি গুলো আবিরের অনেক বেশি টানে। দুজন মেহেদী আর্টিস্ট মিলে এক রুমে মাইশার দুহাতে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। মাইশাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে তাই পাশের রুমে আরেকজন সবাইকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। মেঘ মাইশার রুমে বসে মেহেদী দেয়া দেখছে। 

 মাইশা মেঘের হাতের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,
" তোমার হাত ফাঁকা কেন? মেহেদী দিতে পারো না?"

"না"

"সমস্যা নেই৷ পাশের রুমে একজন আপু আছেন, ওনি সবাইকে দিচ্ছেন। ওনাকে বলো তোমাকে দিয়ে দিতে। "

"মেহেদী লাগাবো না আপু।"

"এসব বললে হবে না। সবার হাতে মেহেদী তোমার হাত ফাঁকা দেখলে তোমার আবির ভাই আমার সাথে রাগ দেখাবে। এক হাতে অন্তত দাও। "

"আবির ভাই কিছু বলবে না। "

"তোমাকে বলবে না। আমাকে ঠিকই বলবে। যাও বলছি।"

"ঠিক আছে আপু।"

মেঘ পাশের রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে রুমের পরিস্থিতি দেখল। একপাশে মালার বান্ধবীরা যে যার মতো একে অপরকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। পার্লারের আপুটা মীমকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। 

মেঘকে দেখে মীম ডাকল,
"আপু আসো। তোমাকেও মেহেদী দিয়ে দিবে।"

মেঘ মীমের পাশে বসেছে। মীমের মেহেদী দেয়া প্রায় শেষ। মেঘ বসে মেহেদী ডিজাইন দেখছে। আপুটা খুব দ্রুত আর অসম্ভব সুন্দর করে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছেন। মীমের মেহেদী দেয়া শেষ। মীম বিছানায় ওঠে বসেছে, দিশারা আগে থেকেই বিছানায় বসে ছিল। মেঘকে মেহেদী দেয়ার জন্য আপু মেঘের বামহাতের কব্জিতে ধরতেই মালা রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"আপু, এখন আমাকে মেহেদী দিয়ে দিবেন। "

আপুটা হেসে বলল,
"তুমি একটু বসো। বেশিক্ষণ লাগবে না। "

মালা রাগে কটমট করে বলল,
"মেঘ তুমি বরং পরে মেহেদী দিও। এখন আমি দিব। "

মেঘ চুপচাপ উঠে রুম থেকে বেরিয়ে গেছে। মেঘ উঠতেই মালা মেঘের জায়গায় বসে নিজের হাত বাড়ালো। আবির আর মেঘ প্যান্ডেলে কথা বলার সময় মালা নিজের রুম থেকে দেখেছে। সন্ধ্যার পর থেকে মালা মেঘকে সহ্য ই করতে পারছে না। নিচে মালা কাজ করছিল, মেঘ মেহেদী দিতে আসায় মালার বান্ধবী মালাকে কল দিয়েছে। সব কাজ ফেলে মালা মেহেদী দেয়ার নাম করে মেঘের মনে আঘাত দিতে আসছে৷ মালার আচরণে মেঘের মন খারাপ হওয়ার থেকেও বেশি অপমানিত হয়েছে। সে তো ইচ্ছে করে মেহেদী দিতে আসে নি, মাইশা আপু জোর করায় এসেছিল।

প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট পর আবির কোথা থেকে এসেছে। মালাদের উঠোন পেরিয়ে সাকিবদের উঠোনে যেতে যেতে আচমকা থমকে দাঁড়ালো। চোখ পরে স্টেজের দিকে। স্টেজের পাশে একটা টেবিলের উপর মেঘ মাথা রেখে বসে আছে। কিছু চুলে পিঠ ঢেকে আছে আর কিছু চুল টেবিলের উপর। আবির ভ্রু জোড়া নাকের ডগায় টেনে, এগিয়ে গেল সেদিকে। তপ্ত স্বরে ডাকল,

"মেঘ। "

মেঘ মুখ তুলে পেছন ফিরে আবিরকে দেখে পুনরায় মুখ লুকালো। আবির মেঘের কাছাকাছি এগিয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
"আবার কি হয়ছে?"

মেঘ আগের অবস্থায় থেকেই উত্তর দিল,
"কিছু না। "

আবিরের মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ভারী কন্ঠে বলল,
" কে কি বলছে?"

মেঘকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আবির মেঘের ডান বাহু চেপে ধরে একটানে দাঁড় করালো। আকস্মিক ঘটনায় মেঘের ছোট দেহ কম্পিত হয়।আবিরের মুখের পানে তাকাতেই মেঘের বুক কেঁপে উঠে। আবিরের রক্তাভ দুচোখ দেখেই মাথা নিচু করে ফেলেছে । ভয়ে জড়সড় হয়ে যাচ্ছে। আবির রাগান্বিত কন্ঠে ধমক দিল, 
"তাকা আমার দিকে৷ "

মেঘ আঁতকে উঠে তাকালো আবিরের তামাটে চেহারায়৷ চারপাশে এত লাইটিং থাকা সত্ত্বেও আবিরের মুখে উজ্জ্বলতার ছিটেফোঁটা নেই। কপাল গুটিয়ে প্রশ্ন করল,

"এখানে বসে ছিলি কেন?"

মালার আচরণে মেঘের খুব রাগ হয়েছিল। আজ পর্যন্ত তাকে কেউ এমনভাবে অপমান করে নি। মালা কি না এভাবে কথা বলল! সেই আক্রোশেই রুম থেকে বেরিয়ে প্যান্ডেলে এসে বসে আছে। চারপাশ কুয়াশায় আচ্ছাদিত৷ লাইটের আলোতে কুয়াশাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সামান্য জ্যাকেটে শীত মানছে না তবুও মেঘ রুমে যাচ্ছে না। মেঘ এতক্ষণ রাগে ফুঁসলেও প্রিয় মানুষের উপস্থিতিতে এখন অনেকটা শান্ত হয়ে গেছে। মেঘের কন্ঠস্বর ভার হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি ভেতরের ক্রোধ কান্না হয়ে বেড়িয়ে আসবে৷ মেঘ উদ্বেল কন্ঠে বলে,
"আমি এখানে থাকবো না। বাসায় চলে যাব। "

আবির ঢোক গিলে ছোট করে শুধালো,
"কি হয়ছে বল, প্লিজ। "

মেঘ দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে, অভিযোগের স্বরে আবিরকে মালা আপুর নামে নালিশ জানালো। মনের যত ক্ষোভ ছিল একদমে সব প্রকাশ করল। আবির অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মেঘের অভিযোগ গুলো শুনেছে৷ এতক্ষণ ধরেই আবির মেঘের বাহু চেপে ধরেছিল। মেঘের কথা শেষ হওয়া মাত্রই আবির মেঘের বাহু ছেড়ে দিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল, 
" মেহেদী দিতে পারিস নি বলে এত রাগ? "

মেঘ কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল,
"আমি কি একবারও বলছি মেহেদী দিতে পারি নি বলে রাগ উঠেছে? দূর ভাল্লাগে না। আমি থাকবোই না। "

এই কথা বলে মেঘ চলে যেতে নিলে সঙ্গে সঙ্গে আবির মেঘের হাত ধরে এক টানে নিজের কাছে টেনে নেয়। টাল সামলাতে না পেরে আবিরের প্রশস্ত বুকে ধাক্কা খেল মেঘ। তৎক্ষনাৎ আবিরের পাঞ্জাবি আঁকড়ে ধরল। মেঘের হাত স্পর্শ করতেই আবির পুনরায় কপাল গুটালো। মেঘের আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে৷ মেঘ আবিরকে ছেড়ে একটু দূরে সরে দাঁড়ালো। আবির তখনও মেঘের হাত ধরেই আছে। মেঘ সরে যাওয়ায় আবির দুহাতে মেঘের হাত ঘসতে ঘসতে বলল,

"মানুষের উপর রাগ করে নিজের ক্ষতি করা কবে বন্ধ করবি তুই?"

মেঘ ওষ্ঠ উল্টে আবিরের অভিমুখে চেয়ে আছে। আবির পুনরায় বলল,

"তোর হাত আর বরফের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। কথা বললে শুনিস না কেন? "

মেঘ আস্তে করে বলল,
"সরি। এখনি রুমে চলে যাব।"

"এখন আর রুমে যেতে হবে না। বস এখানে। আসছি আমি। "

মেঘ চেয়ারে বসে আছে। আবির সাকিবের রুমে গেছে। ২ মিনিটের মধ্যে পাঞ্জাবি পাল্টিয়ে টিশার্ট তার উপর জ্যাকেট পরে আসছে। হাতে একটা শপিং ব্যাগ আর একটা চাদর হাতে নিয়ে আসছে৷ মেঘের গায়ে চাদর জরিয়ে পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে মেঘের অভিমুখে বসলো। শপিং ব্যাগ উল্টাতেই টেবিলে ৮-১০ টা মেহেদী পরল। মেঘ বিপুল চোখে তাকিয়ে আছে মেহেদী গুলোর দিকে৷ আবির বলল,

"তোকে মেহেদী দিতে দেয় নি কথাটা একবার জানাতি আমায়..."

আবির টেবিল থেকে একটা মেহেদী নিল। মেঘের বামহাতের কব্জিতে ধরে শুধালো, 

"এই হাতে দিব?"

আবিরের কথা শুনে মেঘ আশ্চর্য বনে গেল। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গলা খাঁকারি দিয়ে আস্তে করে বলল,
"আবির ভাই, আপনি মেহেদীও দিতে পারেন?"

আবির স্বভাবসুলভ ভারী কন্ঠে জবাব দিল,
"হয়তো আর্টিস্টদের মতো সুন্দর হবে না। কিন্তু চেষ্টা করতে পারি৷ অবশ্য তুই না চাইলে দিব না।"

তখন অভিভূত হয়ে গেছে। আবির ভাই মেহেদী দিয়ে দিবে এটা অষ্টাদশীর কল্পনাও করতে পারছে না। মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে বলল,

"আপনার যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই দেন। "

আবির মেঘের হাত ধরে কাঁপা কাঁপা হাতে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। আর মেঘ অপলক দৃষ্টিতে সেই দৃশ্য দেখছে। মালিহা খানের হঠাৎ নজর পরে স্টেজের কাছে আবির মেঘ বসে আছে। ওনি কৌতূহল বশতই এগিয়ে যান সেদিকে। কাছাকাছি যেতেই চোখে পরে আবির মেঘের হাতে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। ততক্ষণে মেহেদী দেয়া প্রায় শেষদিকে। মালিহা খান হাসিমুখে বললেন,

"আলহামদুলিল্লাহ। "

মায়ের কন্ঠ শুনে আবির আঁতকে উঠে। মেঘের মনোযোগেও বিঘ্ন ঘটে। দু'জনেই মালিহা খানের দিকে তাকায়। মালিহা খানের হাস্যোজ্জল মুখ দেখে মেঘ আবির দুজনেই স্তব্ধ হয়ে আছে। 

মালিহা খান পুনরায় বললেন,
"আমি তো এই আবিরকেই দেখতে চাইছিলাম। বোনের প্রতি এই টান এতদিন কোথায় ছিল?"

আবির উত্তর না দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো, 
" কাকামনি আর চাচ্চু কখন আসছেন?"

মালিহা খান বললেন,
"কিছুক্ষণ আগেই আসছে। খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পরছে।"
একটু থেমে মালিহা খান আবার বললেন,
"কত বছর পর মেহেদী হাতে নিছিস বল তো আবির?"

"মনে নেই। "

মেঘ একবার বড় আম্মুর দিকে তাকাচ্ছে আবার আবিরের দিকে। বড় আম্মুর কথার মানে বুঝার চেষ্টা করছে মেঘ। মালিহা খান মেঘকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

"জানিস মেঘ, ছোটবেলা আবির মেহেদী না দিয়ে দিলে তুই কি যে কান্না করতিস।"

মেঘ ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
"আমি?"

"হ্যাঁ তুই। মীম তখন কোলে ছিল। ঈদের সময় আশেপাশের বাসার পিচ্চিদের হাতে মেহেদী দেখে তুই বাসায় এসে কান্না করতিস। তখন তো এত পার্লারও ছিল না। আমি তোর মা, কাকিয়া কেউ ই মেহেদী দিতে পারতাম না। বাধ্য হয়ে আবির ই তোরে মেহেদী দিয়ে দিতো।মীমরেও কয়েকবার দিছে৷ তবে তোরে বেশি দিয়ে দিছে। "

মেঘ ডান হাতে মাথা চুলকে বলল,
"আমার কিছু মনে নাই কেন?"

মালিহা খান হেসে উত্তর দিলেন,
"জন্মের পর থেকে ৬-৭ বছরের ঘটনা কারোর ই মনে থাকে না। কিন্তু তোরা এত ঠান্ডায় এখানে বসে আছিস কেন? "

আবির রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
"আম্মু তোমার ভাইয়ের মেয়েকে সাবধান করে দিও।"

মালিহা খান চিন্তিত স্বরে বললেন,
"কে? মালা?"
"হ্যাঁ"
"মালা আবার কি করছে?"

"মালা মেঘকে অপমান করছে। মেঘ কি ওদের বাড়িতে দাওয়াত ছাড়া আসছে? যা তা ব্যবহার কেন করবে! এরকম আচরণ যদি আর একবার করে আমি কিন্তু ওর খবর করে ছাড়বো। "

মালিহা খান হেসে উত্তর দিলেন, 
"মালাকে আমি বুঝিয়ে বলব নে। দাঁড়া তোর মামনি আর কাকিয়াকে ডেকে আনি। ওদের দেখায় আমার ছেলেটা ঘরমুখো হচ্ছে। "

মালিহা খান দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে চলে গেছেন। এদিকে মালা দুহাতে মেহেদী দিয়ে প্রতিটা রুমে রুমে মেঘকে খোঁজছে অথচ মেঘ কোথাও নেই। মালিহা খানকে ঘরে ঢুকতে দেখে মালা প্রশ্ন করল,
"কি হয়েছে ফুপ্পি৷ এত তাড়াহুড়োতে কোথায় যাচ্ছ?"
"আবির মেঘের হাতে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখার জন্য আমার দুই ঝা করে ডাকতে যাচ্ছি।"

মালিহা খান চলে গেছেন। কথাটা মালার কাটা গায়ে নুনেরছিটের মতো লাগছে। দ্রুত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। ঘন কুয়াশার মধ্যেও চোখ পরে মেঘ আবিরের দিকে। নিজের উপর এখন আরও বেশি রাগ হচ্ছে। আবির মেঘকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে, এটা কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। সে যদি মেঘের সাথে এই আচরণ না করত তাহলে আবির আর মেঘ কাছাকাছি আসতো না, আবিরও মেঘকে মেহেদী দিয়ে দিত না। রাগে মালার চোখ-মুখ জ্বলছে। রুমে ঢুকেই ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। 

বড় আম্মু যাওয়ার পর থেকে মেঘ আবিরকে দেখেই যাচ্ছে। পল্লবও ফেলছে না। আবির তড়িঘড়ি করে মেহেদী দিচ্ছে। মেঘ কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। মনের ভেতর এক রাশ মুগ্ধতা। আবির ভাই ছোটবেলা নিজের হাতে মেঘকে মেহেদী দিয়ে দিতো। এটা ভেবে ই আনমনে হাসছে। আবির মেহেদীটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল,

"তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরিস। আমি গেলাম। "

বলেই সাকিবদের ঘরের দিকে দৌড় দিল। মেঘ মুগ্ধ আঁখিতে আবিরকে দেখছে। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে আবির ঘরে ঢুকে পরেছে। মেঘ তখনও সেদিকেই তাকিয়ে আছে। ততক্ষণে তিন ঝা আসছেন। দূর থেকে মেঘকে ডেকে বলল,

"কিরে আবির কই?"

"চলে গেছে। "

কাকিয়া মেঘের হাত ধরে এপাশ-ওপাশ ঘুরিয়ে বলল,
"বাহ! অনেক সুন্দর করে দিয়েছে তো। "

কাকিয়ার কথায় মেঘ এবার নিজের হাতের দিকে তাকালো। মেহেদী আর্টিস্টদের মতো না হলেও খুব একটা খারাপ হয় নি। মেঘ হাতের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মন, মস্তিষ্ক জোড়ে আবির ভাই বিচরণ করছে। মনে অন্যরকম প্রশান্তি কাজ করছে। মনে মনে হাজার বার মালা আপুকে ধন্যবাদ দিচ্ছে । "মালা আপু অপমান না করলে, আবির ভাইয়ের সাথে এত সুন্দর মুহুর্তটা কখনো উপভোগ করতে পারতো না সে। " মা কাকিয়ারা কি বলছে তার কোনোকিছুতেই মেঘের মনোযোগ নেই। 
অষ্টাদশীর হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দন বলছে, 
" আবির ভাই, আপনি আমার সেই পূর্ণতা। ভালোবাসি আপনাকে। "

মা কাকিয়ার সঙ্গে ঘরে গিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেছে। মীম, দিশারা অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পরেছে। মেঘ মীমের পাশে শুয়েছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে মেহেদী না তুলেই ঘুমিয়ে পরেছে। অনেকক্ষণ যাবৎ ফোন ভাইব্রেশন হচ্ছে। মেঘ গভীর ঘুমে নিমগ্ন। দীর্ঘ সময় ভাইব্রেশনের পর মেঘ চোখ বন্ধ রেখেই পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে রিসিভ করে কানের উপর রাখল। ওপাশ থেকে আবেশিত কন্ঠ ভেসে আসে,

"ম্যাম, আপনার ঘুম কি এখনও ভাঙে নি? এক ঘন্টা যাবৎ আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। "
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp