নীরবতায় কাটল বহু সময়। নিশ্চুপে কত দীর্ঘশ্বাস ভেসে গেল! রানির ভঙ্গুর মুখটিকে দেখে হ্যাব্রোর ভীষণ ইচ্ছে হলো রানির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। একটু স্নেহ করে বলতে, কাঁদবেন না যেন। আপনাকে মোটেও মানায় না কান্নায়।
কিন্তু তার যে সেই ক্ষমতা নেই। তার অধিকার নেই। সে কীভাবে রানি কামিনীকাঞ্চনকে স্পর্শ করবে? রানি যে আকাশের চাঁদ। সে পথের পথিক। পথিকের কেবল সীমানা চাঁদ দেখা অব্দি। ছোঁয়ার কি আর সাধ্য আছে?
হরিতকীজির বয়স্ক কণ্ঠ খুব ধীরে উচ্চারণ করল, “হ্যাঁ, তুমিই সেই কন্যা। তুমিই সুরসুন্দরীর কন্যা।”
রানি চোখ বন্ধ করে নেন এক মুহূর্তের জন্য। এক লহমায় ভেসে উঠে জীবনের সমস্ত স্থিরচিত্র চোখের উপরে। তিনি সেই রানি যে চোখের ইশারায় সবাইকে মাত দিতে জানতেন। এমন কোনো যু দ্ধ নেই যেখানে তিনি হেরেছেন। এমন কোনো রাজ্য নেই যেখানে তার নাম উচ্চারণ হয়নি। এমন কোনো মানব নেই যে তার কথা শুনে কাঁপেনি। তার কি নিজের জীবন নিয়ে গর্ব ছিলো না? ছিলো। ভীষণ ভীষণ ছিলো। অহংকার ছিলো আকাশচুম্বী। সেই অহংকার নিশ্চয় মায়ের থেকেই পাওয়া। মায়ের রূপ, মায়ের অহংকার, মায়ের জৌলুশ ছিলো তার ভেতর। আর রাজনীতিতে সেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সেটি কার থেকে পেয়েছিলেন? তার মাতাতো বোকা ছিলো। নয়তো এমন করে ফাঁসতেন?
তাহলে? রাজা কেশবচন্দ্র থেকেই কি পাওনা সেই রাজনীতির তুখরতা? কিন্তু আদৌ রাজা কেশবচন্দ্র কি তার পিতা ছিলেন?
“রাজা কেশবচন্দ্র তাহলে আমার কী হয়?” বোকা বোকা প্রশ্ন রানির। নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে মরিয়া যেন। হরিতকীজি তাকিয়ে থাকে রানির মুখপানে। একদম সেই মুখ। সেই নাক, সেই চোখ। অসহায়ের কণ্ঠটিও সেই সুরসুন্দরীর মতন। মায়ের নকল যেন মেয়েটি।
“কেশবচন্দ্রকে তোমার পিতা ধরে নাও।”
“ধরে নিব? আমার জন্ম পরিচয় এতটাই ধোঁয়াশা যে এখন আমার ধরে নিতে হবে? হাহ্!”
“এমন করো না। জন্ম পরিচয়ই কি সব?”
রানি উঠে দাঁড়ান। সামনের প্রাচীরে ক্রমাগত হাত দিয়ে আঘাত করতে করতে বলেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব, সব। আমি রানি কামিনীকাঞ্চন। আপনি জানেন আমার কথায় দু'টো রাজ্য চলে। এই আমার কথাতে সমস্ত কিছু হয়। সেই আমার আসল পিতার নাকি পরিচয় নেই। আমাকে নাকি ধরে নিতে হবে কাউকে পিতা বলে। আমার প্রজারা হাসবে আমাকে দেখে। মজা উড়াবে। বলবে, অমন রাজসিংহাসনে কি-না এমন মানুষ বসে যার পরিচয় নেই। আমি মানবো কেমন করে? হ্যাঁ, কীভাবে মানবো? আমার পুরো পৃথিবী মিথ্যে হয়ে গিয়েছে। আপনি আমার দুঃখ বুঝছেন না। আমি এক লহমায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছি। আমার বুক চিরে তলোয়ার বেরিয়ে গেলেও আমি বেঁচে থাকতাম। এখন, এখন কীভাবে বাঁচব? এই লজ্জা, এই আঘাত কীভাবে আমাকে বাঁচতে দিবে। আমি শেষ, কামিনীকাঞ্চন শেষ হয়ে গিয়েছে এক নিমিষেই। ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছে তাকে তার জন্ম পরিচয়। আমি কীভাবে বাঁচব?”
হ্যাব্রো দেখল বিনা যুদ্ধে রানি হেরে যাচ্ছেন কেমন করে। কেমন করে ভেঙে গেলেন চোখের পলকে। হরিতকীজি তাকিয়ে রইল পাগলের মতন বিলাপ করা মেয়েটার দিকে। বহু বছর আগের সুরসুন্দরীকে দেখতে পেল এই মেয়েটির ভেতরে।
যেই সুরসুন্দরী এমন করেই আকুতি করেছিল কেশবচন্দ্রকে পাওয়ার জন্য। এমন করেই ভেঙে পড়েছিল ঝরঝর করে।
হ্যাব্রো রানির এই হার মানতে পারল না। কোনো ভাবেই তার সহ্য হলো না রানির ভেঙে পড়া। রানি কামিনীকাঞ্চন ভাঙতে পারেন না যে। তার অস্তিত্ব তার নিজের ক্ষমতা। জন্মপরিচয় কখনো রানির অস্তিত্ব ছিলোই না।
হ্যাব্রো হাতজোড় করে হরিতকীজির দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কৃপা করে কি একটু কক্ষের বাহিরে যাবেন? আমি রানির সাথে কিছু আলাপ করতে চাই।”
হরিতকীজি মেনে নিল। ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে। পুরো কক্ষ জুড়ে ভাসল কেবল রানির হাহাকার। হ্যাব্রো রানিকে স্থির হতে বলতেই রানি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন হ্যাব্রোর সামনে। হ্যাব্রোর দু'টি হাত ধরে বললেন,
“হ্যাব্রো, আমার কী হবে হ্যাব্রো? আমার কেউ নেই? আমার কিছুই নেই! এই রাজ্য, রাজত্বের এত অহংকার নিয়ে ঘোরা রানি কামিনীকাঞ্চনের কি-না জন্ম পরিচয়ই নেই! পিতৃপরিচয়ই নেই! লোকে হাসবে না? বলো হাসবে না? তোমার কি আমাকে ঘৃণা লাগছে হ্যাব্রো? আমার মাতা নর্তকী ছিলেন, পুরুষের মনোরঞ্জন করতেন, বহু পুরুষের শয়নসঙ্গী ছিলেন, এসব ভেবে তোমার ঘৃণা হচ্ছে আমাকে তাই না? ও হ্যাব্রো, আমি কত বোকা দেখো। মিথ্যে জিনিসের জৌলুশ দেখিয়ে গেলাম এতদিন। এত এত অহংকার করলাম। তাই বোধহয় স্বয়ং স্রষ্টা আমাকে ধূলিসাৎ করে দিলেন। হ্যাব্রো আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমাকে তোমার ঘৃণা করছে কি? আমার লাগছে নিজেকে ঘৃণা। হ্যাব্রো, আমি কে? কী? এই সময়ে এসে নিজের সমস্ত পরিচয় ধোঁয়াশা। আমি বাঁচব না, হ্যাব্রো। বিনা যুদ্ধে হেরে গেলাম আমি। বিনা যুদ্ধে।”
এই উন্মাদ রানিকে দেখে হ্যাব্রো ঠিক থাকতে পারল না। কেঁদে দিলো। বুক চওড়া করে সবসময় রানির ঢাল হয়ে থাকা সেনাপতি, সেনাপ্রধান হ্যাব্রো আজ কেঁদে দিলো। এই প্রথম রানির হাত সে ধরল নিঃসংকোচে। বসল রানির মুখোমুখি। বাচ্চাদের মতন আবদার করে বলল,
“এমন করবেন না, রানি। আপনার এই অবস্থা আমি মেনে নিতে পারছি না। এমন করবেন না।”
“না, না, হ্যাব্রো। তুমি বুঝতে পারছ না। এমন কখনো দেখেছো, নর্তকীর মেয়ে রানি হয়? দেখেছো রানির কখনো পিতার পরিচয় থাকে না? এমন কোথাও হয়নি, কখনো হয়নি। হ্যাব্রো, আমাকে স্রষ্টা এ কেমন আঘাত করলেন? তোমাকে ধরেছি বলে ঘৃণা হচ্ছে তাই না বলো?”
“না, না, ঘৃণা হচ্ছে না। আপনি আমার কাছে খুব বড়ো। স্রষ্টাকে আমি দেখিনি তবে আপনাকে দেখেছি। স্রষ্টার পরেই আপনাকে স্থান দিয়েছি। আপনি আমার মাতার মতনই শ্রদ্ধার। ভগিনীর মতনই আদরের। কেন ঘৃণা হবে আপনাকে? আমি তো আপনার জন্মপরিচয় দেখে আপনাকে শ্রদ্ধা করিনি। শ্রদ্ধা করেছি আপনার ব্যক্তিত্ব দেখে। আপনি যে এসকল জন্ম পরিচয়ের উর্ধ্বে। সামান্য পিতৃ পরিচয় আপনার জীবনের কোনো বৃহৎ অবদান নয়! আপনি স্বয়ং সম্পূর্ণা। আপনিই আপনার জন্য পরিচয়। বাকি সব ফিঁকে। সব।”
অশ্রু ভেজা নয়নে তাকিয়ে হাসলেন রানি, “মন ভোলানো কথা বলছো আমায়, হ্যাব্রো? আমি কি এতই বোকা?”
হ্যাব্রোর নিজেকে কী ভীষণ অসহায় লাগল। এটা তার সামনে কে বসে আছেন? রানি কামিনীকাঞ্চন! কোথায় তার রাগ, কোথায় তার জেদ!
রানি কান্নার সাথে সাথে হাসলেন,
“আমাকে মন ভোলানো কথা বলো না। আমি সব বুঝি। আমি সব জানি। আমার সব শেষ হ্যাব্রো। সব। কেউ রইল না আমার, কিছু না। আমার সব শেষ, হ্যাব্রো। আহ্, বুকে ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে ছুড়ি বিঁধিয়েছে কেউ।”
রানি শুয়ে পড়লেন এবার মেঝেতে উপুর হয়ে। “ও সৃষ্টিকর্তা, কী করলে, কী করলে, আমার কেউ নেই, কেউ নেই” বলে বলে আহাজারি করতে লাগলেন।
হ্যাব্রোর মনে হলো ঝড়ে নিজের সমস্ত সম্বল হারিয়ে ফেলা পাখিটি বোধহয় হা-হুতাশ করছে। ডানা ঝাপটাচ্ছে। ছটফট করছে মৃত্যুর আগে।
এত মায়া হলো তার। সে আর অধিকার, ক্ষমতা বিচার করতে পারল না। রানির একান্ত আত্মীয়র মতন রানির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আদরে, স্নেহে, মমতায়। সেই হাত বুলানোতে রানির কান্না বাড়লো বৈ কমল না। এমন মমতা জন্মের পর পাননি তিনি কখনো। এমন মায়া, এমন স্নেহের অভাবে তিনি কত রাত হাপিত্যেশ করেছেন! কেউ একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়নি।
হ্যাব্রো হাত বুলাতে বুলাতে বলল, “কে বলেছে আপনার কেউ নেই? এইতো আমি আছি। দেখুন, আপনার সেনাপতি হ্যাব্রো আপনার পাশেই আছে। সবসময়, আজন্ম।”
“তুমি আমায় আর মায়া দিও না, হ্যাব্রো। এই পৃথিবী আমাকে কিছুই দেয়নি। কেন শেষবেলায় এসে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছো? আর চাই না কিছু।”
“পৃথিবী সত্যিই কি কিছু দেয়নি আপনাকে, রানি? এমন বিশাল রাজ্য দিয়েছে। এমন অসীম প্রজা দিয়েছে। এমন গর্ব করার মতন পরিচয় দিয়েছে এগুলো কি কিছু না? বলুন?”
“এগুলো কিছুই আমার নয়। রাজা কেশবচন্দ্রের সব!”
“না, না, এ সমস্তই আপনার। প্রজারা আপনার শাসনকে আশীর্বাদ মনে করে। আপনাকে তাদের অভিভাবক মনে করে। আপনার কাছে তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করে। কেশবচন্দ্রের সব হলে আপনি কখনোই সেখানে জায়গা নিতে পারতেন না। আপনার জায়গা আপনি নিজে তৈরি করে নিয়েছেন রানি। আপনার পরিচয় আপনি নিজেই। আপনার পরিচয় আপনার রাজ্য, আপনার প্রজা। ওরা সকলেই আপনার! সমস্তই আপনার।”
রানির চোখে তখন ঘোর। কাঁদতে কাঁদতে নির্বোধ, বাচ্চা শিশুর মতন অবস্থা।
তাদের কক্ষের সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করেই কপাট সপাটে খুলে হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করল কতগুলো মানুষ। হ্যাব্রো আচমকা সাবধান হয়ে তলোয়ার উঠিয়ে নিতে নিতে দেখল তাদেরকে চারপাশে ঘিরে নিয়েছে প্রখাণ্ড রাজ্যের সেনাপতিরা। বাজে ভাবে ঘেরাও করে ফেলেছে।
রাজ্যের সেনাপ্রধান দূরে দাঁড়িয়ে নির্দেশ করল, “দু'জনকে শীঘ্রই প্রাসাদে নিয়ে চলো। বহু বর্ষ পর রাজা তাদের পেয়েছেন।”
রানি সমস্তই দেখলেন তবে নড়লেন না এক বিন্দু। কিচ্ছু বললেন না। যেন সেচ্ছায় নিজেকে সঁপে দিলেন তাদের হাতে। তবে শেষবেলায় তিনি সেনাপতির কথা ঠিক ভাবলেন। নত নয়নে বললেন,
“সেনাপতিকে ছেড়ে দাও। আমায় নিয়ে চলো। আমি যাচ্ছি।”
“কাউকে ছাড়তে পারব না। রাজার নির্দেশ।” সেনাপ্রধানের অকপটে বলা কথায় রানি অগ্নিচক্ষু নিয়ে তাকালেন,
“আমি কে তোমাদের নিশ্চয় ধারণা আছে। আমি নিজেকে না সঁপে দিলে তোমার রাজার সাধ্য নেই আমাকে একবিন্দু সরানোর। তাই আমি যা বলছি তা শোনো নয়তো..”
দমে আসে প্রখাণ্ড রাজ্যের সেনাপতি। মাথা নামিয়ে নেয় সেই অগ্নিঝরা কণ্ঠে।
হ্যাব্রো বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে রইল। রানি যে আর রানি কামিনীকাঞ্চন নেই তা স্পষ্ট তার নত নয়ন, ক্লান্ত স্বর বলে দিল। নয়তো এমন কয়েকটা সৈনিককে একা ঘায়েল করা ক্ষমতা এই নারীটির ভেতর ছিলো। ভীষণ ভীষণ ছিলো। কিন্তু তাও নিজেকে সঁপে দিলেন। রানি তো জানেন প্রখাণ্ড রাজ্যের রাজা তাকে পেলে প্রাণনাশ করে ফেলবে। শেষ করে ফেলবে। তবুও! তবুও এই কাজটি রানি করলেন!
সেনাপতি তলোয়ার উঠাতে নিলেও রানি বাঁধা দেন। মাথা নাড়ান। আজ্ঞা করে বলেন, “তুমি ফিরে যাও, হ্যাব্রো। এ্যাজেলিয়া রাজ্য তোমার। তুমি তাদের দায়িত্ব নিও। আমার প্রজাদের দেখে রেখো। ভালো থেকো। তোমার ঋণ আমি আমৃত্যু মনে রাখব। তুমি শেষবেলায় আমার পরম আত্মীয় হয়ে গেলে। শেষবেলায় একটু হলেও কেউ আমায় মমতা করল। আমার আর দুঃখ নেই, সেনাপতি। আমি তোমার মতন একজন বীরকে সাথে পেয়েছিলাম। নয়তো আজন্ম আফসোস থাকতো। আর আমার প্রজাদের জানিয়ে দিও, তাদের রানি তাদের ভালোবাসতো। রাগ, ক্ষোভের ভেতরেও রানি তাদের খুব ভালোবাসতো। তারা যেন আমাকে কখনো ঘৃণা না করে। ফিরে যাও। তোমায় আমি মনে রাখব চিরকাল। এমন করে কখনো কেউ আমার মাথায় হাত রাখেনি। আমার দুঃখ লাঘব হয়েছে। লাঘব হয়েছে। রানি কামিনীকাঞ্চনের গল্প এখানেই শেষ। বিদায়, বিদায়।”
কথা শেষ করেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ক্লান্ত রানি। মনে হলো বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টি ধ্বসে পড়েছে। চিরজীবনের মতো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………