বঁধুয়া - মম সাহা - অনু গল্প

          বিপিনের বউটার বড্ড বদনাম গাঁয়ে। স্বামীর জন্য সেই ভোরে উঠে গরম জল করে। জলটা একটু বেশি গরম হলেই বিপিন লাথি মারে। জলের পাত্রে নয়, বউটার কোমড়ে। আবার জলটা একটু ঠান্ডা হলেও বাঁধে বিপত্তি। বউটার বাপের বাড়ির চৌদ্দ পুরুষকে স্বর্গ থেকে নামিয়ে আনে বিপিন বকতে বকতে। গ্রামের লোক সেই হরহামেশা ঘটা ঘটনার জন্য বউটাকে দোষে। বলে, বাপু স্বামী তোর দেব্ তা। তার জন্য সামান্য জলটাও ঠিকঠাক গরম করতে পারিস না? এ কেমন অকাজের বেটি?
 শাশুড়িটা এক কাঠি উপরে। উঠোন ঝাঁট দিতে একটু দেরি করলেই পাড়া-প্রতিবেশীদের ডেকে ডেকে নালিশ করে। নিজের কপাল চাপড়ে মরে এমন হতভাগিনীকে বিয়ে করিয়ে আনার জন্য। বউটা মোটেও রা করে না। তার সমস্ত অপরাধ সে মাথা পেতে নেয়। যেই অপরাধগুলো সে করে না সেগুলোর শাস্তিও মাথা পেতে নেয়।

  বিপিন দুপুরের খাবার খেতে আসে না মাঝে মাঝে। তখন সেই দুপুরের রোদ মাথায় নিয়ে বউটা মাঠে যায় খাবার দিতে। বিপিনের সহকর্মীরা হাসে তা দেখে। চোখাচোখি করে। ব্লাউজের ফাঁক গলিয়ে বের হওয়া সাদা চামড়া দেখে তাদের পুরুষত্ব লোভী হয়ে উঠে। একে অপরকে বলাবলি করে, "খাসা মাল বটে।"
 বউটার অস্বস্তি হয়। তবুও স্বামী ভক্তি তার কমে না মোটেও। এ নিয়েও গ্রামে কথা উঠে। এত ব্যাটালোকের মাঝে যাওয়ার কী দরকার? 
অথচ তারা জানে না, একদিন দুপুরে বিপিনের বউটার জ্বর এসেছিলো বলে খাবার নিয়ে যায়নি দেখে তাকে দু'দিন উপোস করিয়ে রেখেছিলো বিপিন। সেসব কথা জেনে কারই বা কী লাভ? একটু রগরগে কথা বলতে পারার মতন শান্তি কি আর সত্য বলার ভেতর আছে?

  বিপিনের বোন- নোয়াটা আবার বেশ ভালো। সবে মাধ্যমিক দিয়েছে। দাদার বউকে সে মাথায় তুলে রাখে। কত বুদ্ধি দেয়! একদিন তার দাদা নিজের বৌকে মারায় সে দাদার সাথে ঝগড়া করল। বউটাকে শিখিয়ে দিলো আরেকদিন দাদা মারতে এলে যেন সেও দু’ঘা লাগিয়ে দেয়। পুরুষ মানুষ এরপর লজ্জায়ও আর হাত তুলবে না।
কিন্তু বিপিনের বউ তা শুনে আঁতকে উঠে। স্বামীর গায়ে হাত তোলার কথা সে কস্মিনকালেও ভাবে না। নোয়া ভাইয়ের বউকে আঁতকে উঠতে দেখে বলেছিলো,
"এত ভয় পাওয়ার কী আছে? একদিন সাহস না করলে কোনোদিন মাথা তুলে বাঁচতে পারবা? আমি হলে তো এমনই করতাম!"

 বিপিনের বউটা তখন লক্ষ্মীমন্ত স্বরে উত্তর দিয়েছিলো, "তুমি করতে পারবা, ছোটদ্দি। আমি যে পারব না।"

 নোয়া আরও রেগে গিয়ে বলে, "কেন পারবে না? তোমার কী নাই? "

"বাবা। আমার যে বাবা নাই। ভাই নাই। আছে একটা বয়স্ক মা তাও থাকে একলা, অনেক কষ্টে। আজ তোমার দাদার শরীরে হাত তুললে কাল যদি আমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় আমি কী করব? আমার বয়স্ক মায়ের বোঝা হওয়ার চেয়ে এখানে থাকা ভালো না? বাবা, ভাই যার মাথার উপর নাই সে কার ভরসায় বুকে সাহস জোগাবে?"

  নোয়া সেদিন দমে এসেছিলো। তবে তার মায়া কম হয় না এই মেয়েটার জন্য। কী সুন্দর ফুলের মতন মেয়ে। পড়াশোনায় ছিলো চমৎকার। হুট করে তার বাবা মারা গেলো। গরীব মা মেয়ের ঝামেলা কমাতে বিয়ে দিলেন। যেন চঞ্চল পাখিটাকে আটকে দিলেন খাঁচায়। তারপর থেকেই মেয়েটার মুখে বুলি নেই।
 
  বিপিনদের বাড়িতে একটা চাঁপাফুলের গাছ আছে। বিপিনের বউটার সাথে গাছটার বড়োই সখ্যতা। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই সে চাঁপাফুলের গাছটার নিচে প্রথমে যায়। ঘ্রাণ নেয়। কথা বলে একা একা। গাছটাকে তার মায়ের মতন নাকি মনে হয়। 
রাতে যখন বিপিন পুরুষত্ব ফলিয়ে গভীর নিদ্রায় নিমজ্জিত থাকে তখনও সে এই গাছটার নিচে এসে বসে। গাছটার বাকলে মায়া করে হাত বুলায়। বিড়বিড় করে কয়েকবার 'মা, মা' বলে ডাকে।
নোয়ার মাঝে মাঝে মনে হয় তার দাদার বউটা পাগল। মাঝে মাঝে মনে হয় বোকা। মাঝে মাঝে বোবাও মনে হয়। সংসার করতে হলে এত রূপ ধারণ করতে হয় সেসব তার ভাবনায় আসে না।

  প্রতি রবিবার বিপিন বাড়িতে থাকে। সকালে উঠেই রেডিওতে গান শুনে। গরম গরম চা খায়। 
সেই রবিবারে ব্যতিক্রম ঘটলো। সকালে তার সামনে গরম গরম চা দেওয়া হলো না। বউটার রাত থেকে এত জ্বর ছিলো। বিপিনের কি আর সেই হুঁশ আছে?
 সকাল শুরু করল অকথ্য ভাষায়। লাটসাহেবের বেটি, জমিদারের বাচ্চা আরও কত কী! বিপিনের মা আবার উস্কে দিতে পারতেন ভালো। ছেলেকে তিনি আরও রাগালেন, 
"তোর বউ এমনই তো করে। দেখ, দেখ আজ তুই বাড়িতে, তুই দেখেনে।"

  পুরুষ বিপিন বুক ফুলিয়ে গিয়ে প্রথমেই লাথি মারল কোমড়ে। জ্বরের ঘোরে বেহুঁশ থাকা বউটা ককিয়ে উঠল। গলার স্বর ভেঙে যা-তা অবস্থা। তবুও বউটা উঠে বসল ক্লান্ত শরীরে। কোনো প্রতিবাদ না করে, কোনো অভিযোগ না রেখেই ছুটল রান্নাঘরে। 
 কিন্তু শরীরটা বড্ড বেশিই খারাপ ছিলো কি-না, মাথা ঘুরিয়ে সেখানেই পড়ল। নোয়া নিজের ভাই আর মায়ের উপর বড্ড চোটপাট করল। বৌদিকে নিয়ে ছুটল হাসপাতাল। সেদিনই বউটার ভাগ্য বদলে গেলো।

 দু'দিন পর যখন বউ বাড়ি ফিরল দেখল বাড়ির চিত্র আরও ভয়াবহ। শাশুড়ি আগে যতটুকু বা রয়েসয়ে কথা বলতেন তার এক ভাগও অবশিষ্ট নেই। উঠতে বসতে বলতে লাগলেন, একটা বাঁজা এসে পড়ল আমার ছেলের কপালে। আমার ছেলে কী দুর্ভাগ্যগো! বাচ্চা দিতে না পারা বেডি আর গাভী কোনোটাই কামে দেয় না-কি? 
 বিপিনের বউ যেন পাথরমূর্তি। কী হবে তার? শ্বশুর বাড়ি ছাড়বে না বলে এত যুদ্ধ শেষমেশ সেই যুদ্ধে ঈশ্বর তাকে হারিয়ে দিলেন? 

 বিপিন তো কথায় কথায় বলত, তুই তো মা* একটা। তোর দিকে কুত্তাও ফিরবো না। বে* একটা। বাচ্চা না দিতে পারলে তোকে দিয়ে আমার কী কাজ?

  বউটা কাঁদতো তখন বড়ো। বুক কাঁপতো তার সেসব অকথ্য ভাষায়। সারাজীবন এক স্বামী ভক্তিতে কাটিয়ে দেওয়া মেয়ে বে শ্যা বিশেষণে কাঁপবে না? 
তবুও চুপ থাকত। একটিবার প্রতিবাদ করে বলতো না, আমায় এসব বলো না। প্রতিবাদ না করতে করতে সংসার যেন ওর বুলি কেঁড়ে নিয়েছিলো। 
গ্রামের সবাই তখন ফিসফাস করতো। বিপিনের বউয়ের বদনাম আরও বাড়লো। অকাজের বেটি যে এতটা অকাজের তা নিয়ে কানাঘুষা হতো ভীষণ। 

  একদিন বৃষ্টিমুখর দুপুরের কথা। বিপিনের বাড়িতে নিমন্ত্রিত ছিলো বিপিনের বন্ধু মনির। সেদিন বাহিরে বড্ড বৃষ্টি ছিলো। বিপিন সকাল থেকেই বাড়িতে ছিলো না। আজকাল তার আবার অন্য নারীর প্রতি টান জন্মেছে। অকাজের বউটার দিকে ফিরে তাকাবার সময় নেই।
মনির ছাতা মাথায় ঠিক দুপুর দুটোতেই হাজির হয় বাড়িতে। হাতে এক হাঁড়ি রসগোল্লা। নোয়া বাড়িতে ছিলো না, পিসিমার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলো। বিপিনের মা ভাত খেয়ে এই সময়ে ঘুমাতেন সবসময়। সেদিনও তাই করলেন। 
বিপিনের বউ স্নান সেরে গামছা পেঁচিয়ে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলো। অতিথি আসতেই অতিথি আপ্যায়নে সে মগ্ন হয়ে যায়। মনিরকে বসতে দেয় চেয়ারে। মিষ্টির হাঁড়িটা ছুটে গিয়ে রান্নাঘরে রাখে। এক গ্লাস লেবুর শরবত করে এনে এগিয়ে দেয় মনিরের দিকে। 

  বিপিনের বউকে মনির এর আগে বহুবার দেখেছে। স্বামীর জন্য ও যখন খাবার নিয়ে যেতো তখন তাকে নিয়ে ওরা ভেতর ভেতর নানান মন্তব্যও করেছে। মেয়েটার শরীরের কোন ভাঁজে প্রথমে চোখ আটকায় তা নিয়ে কত হাসিহাসি হয় তাদের ভেতর! আজ সেই নারীদেহ সামনে, মনিরের চোখ কি আর সামলাতে পারে কাম, লালসা?
বৃষ্টির শব্দ টিনের চালে ঝামুরঝুমুর শব্দ তুলে। মনির শরবতের গ্লাসে হাত না রেখে হাত রাখে বউটার বাহুতে। চমকে উঠে বিপিনের বউ। হাত থেকে তার গ্লাস পড়ে যায়। ছিটকে সরে যেতে নেয় দূরে। 

 সরতে পারে না। তার আগেই পুরুষালি বাহু তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে। সে চিৎকার করতে চায় কিন্তু বৃষ্টির সেই তীব্র শব্দ পেরিয়ে তার চিৎকার পৌঁছাতে পারে না কারো কানে। শকুন যেমন খুবলে খায় মৃতদেহ, তেমনই মনির তার সমস্ত সতীত্ব খুবলে নেয়। 

 বৃষ্টি থামে বিকেলে। চারপাশে অন্ধকার নামে। জ্বরে গা পুড়ে যায় বিপিনের বউটার। মুখে রা করে না। মুনির বাড়ি ফিরে গিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। তার ঐ দানবীয়, কালো, উন্মুক্ত শরীরটা বার বার জ্বরের ঘোরে দেখতে থাকে মেয়েটা। নিজের সর্বনাশের কথা তার মাথায় ঘুরতে থাকে। গাঁয়ে তার এত বদনাম, সতীত্ব হারানোর বদনাম সেখানে যুক্ত হলে সে বাঁচতে পারবে? তার সংসার থাকবে?
 জ্বরে ঘোরে সে নিজেকে আবিষ্কার করে চাঁপাগাছের নিচটায়। চাঁপাফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারপাশটায়। বিপিন সামনে দাঁড়িয়ে আছে পাঞ্জাবি পরে। দু-হাত মেলে ডাকছে তাকে। 
Page 2
          বিপিনের বউটার যে বৃষ্টির দিনে জ্বর এলো সেই জ্বর গুনে গুনে থাকল সাতদিন। গা পুড়ে যেতো সেই সাতদিন মেয়েটার। আবোলতাবোল বকতো জ্বরের ঘোরে। গোঙ্গানি ক্রমশ বাড়তো। ছটফট করতো গলা কা টা পশুর মতন। নোয়া ছিলো না বলে কেউ একটু যত্ন করে বলেনি বউটাকে হাসপাতাল নেওয়ার কথা। বিপিন তো স্বামী ছিলো। অথচ সে-ও একটিবার বউটার পাশে এসে বসেনি। হাত ধরেনি, জিজ্ঞেস করেনি কতটুকু কষ্ট হচ্ছে তার। 
 শাশুড়িটার কথার বিষে ভালো মানুষও মরে যাওয়ায় উপক্রম হবে, সে আর কীই-বা যত্ন করবে? জ্বরও অবশেষে অবহেলা, অযত্ন পেয়ে একা একাই সেরে উঠল। এবং জ্বরের সাথে সাথে যেন সেরে গেলো বিপিনের বউয়ের কথা না বলার অসুখটা। 

   জ্বরের পর বিপিনের বাড়িতে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটল। এতদিন বাড়িতে শোনা যেতো কেবল বিপিন এবং ওর মায়ের গলা। কিন্তু সেই প্রচলিত রীতি বদলে গেলো যেন হুট করেই। মানুষ ধীরে ধীরে শুনতে পেলো বিপনের বউটার কথা। কণ্ঠ উঁচুতে উঠতে আরম্ভ করল তার। কেউ কেউ বলাবলি করল জ্বরে কি মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেলো? কেউ বলল হয়তো ভূত-প্রেত পেয়েছে। নয়তো বুলি না ফোটা মেয়ের কণ্ঠ এত চনমনে কেন?

 জ্বর সারার পরেরদিনেরই কথা। বিপিন যথারীতি ঘুম থেকে উঠে কল ঘরে গেলো। জলের বালতিটায় হাত দিয়ে দেখলো ভোরের জল বেজায় ঠান্ডা, কনকনে। ঘুমন্ত চোখজোড়া থেকে তার ঘুম উবে গেলো নিমিষেই। বউটা এখনো তার জল গরম করেনি?
 সে বার কয়েক শূন্য উঠোনের দিকেও তাকাল। উঠোন ঐ অবুঝ বউটার চোখ দুটোর মতনই শূন্য, খাঁ-খাঁ করছে। আপনা-আপনি ভ্রু কুঁচকে নিজেকে সামলে বিপিন নিজের বউকে ডাকে,
 "জমিদারের বেটি কই? কই মরছেরে? আমার স্নানের জল এখনো কলপাড়ে আসে নাই ক্যান? ঐ জমিদারের বাচ্চা।"

  বিপিনের হম্বিতম্বি শুনলে অন্যান্য সময় ও ছুটে আসে পাখির মতন। একপাশে গুটিশুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে যত রাজ্যের গাল গিলে অপরাধীর মতন। পৃথিবীর সমস্ত দোষের ভার তুলে নেয় মাথায় চাঁপাগাছটার মতন দাঁড়িয়ে। আজ তা হলো না মোটেও। বউ এলো রয়েসয়ে। ধীরে-স্থিরে। যেন সত্যিকারের জমিদারের বেটির ঘুম ভেঙেছে। বিচারকার্য বসাতে আসছে বুক ফুলিয়ে। 

 বউয়ের এমন গা-ছাড়া হাবভাবে বিপিনের রাগ না উঠে পারে? ছুটে গিয়ে মা গী বেটি বলে যেই না চুল চেপে ধরল, বউটা হাতের পেছন থেকে চাপা গাছের মোটা একটা শুকনো ডাল বের করে সপাটে বারি বসিয়ে দিলো স্বামীর পিঠে। তাও যেমন তেমন আঘাত নয়, দানবীয় আঘাত। একটা না দুই তিনটে বারি পর পর। বিপিন 'ও মাগো, ও মাগো' বলে ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো উঠোনে। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না তার বউ এমন করেছে! তার লক্ষ্মীমন্ত বউ! হাজার কথা ও মারেও যে রা করতো না সে?

 বিপিন অবিশ্বাস্য চোখে তাকাতেই বউটা লাজুক লাজুক মুখে, যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে সরল স্বরে বলল, "মা গী তোর প্রেমিকা ঝুমুর। যে তোর বউ আছে জেনেও তোর সাথে শোয়।"
 পাখির মতন কণ্ঠ। বিপিন অবাক হয়ে শুনল বউয়ের কথা। বহু বছর বউটার কথা তার কানে বাজেনি। সে তো ভুলতেই বসেছিলো বউ তার কথা বলতে জানে! এত বছর পর যা-ও কথা বলল এমন তেমন কথা নয়। এমন বিশ্রী কথা! 
বিপিনের মা তখন ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন হন্তদন্ত হয়ে। 'কী হয়েছে বাপ আমার, কী হয়েছে' বুলি আওড়াতে আওড়াতে ছেলের বুকে পিঠে হাত বুলাতে লাগলেন। বিপিন কোন লাজে বউয়ের মারের কথা মায়ের কাছে বলবে? পুরুষত্বে আঘাত পাবে না? তাই সে লুকিয়ে গেলো সেই দৃশ্যের গল্প। অজুহাতে বলল, কলপাড়ে একটি জোঁক দেখেছিল। 

 বিপিনের বউ যেমন আলগোছে এসেছিলো তেমন আলগোছেই ঘরে চলে গেলো। নাটকীয় ভঙ্গিতে আটকে দিলো দোর। তার বড্ড ঘুম এখনো বাকি। সারাজীবনের ঘুম। সংসার জীবনের ঘুম। যে ঘুম এত বছর ঘুমাতে পারেনি।
 বিপিনের মা ছেলেকে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করলেও উত্তরে মৌন রইল বিপিন। 

  আরেকদিন সন্ধ্যাকালেরই কথা। সন্ধ্যাবাতির সময়ে বিপিনের শাশুড়ি দেখল তার ছেলের বউ ঘরে নেই। জ্বর সারার পর টইটই করছে বেশি। আজকাল গ্রাম ঘুরতে বেরিয়ে যাচ্ছে। রান্নাবান্নায় মন নেই। বিপিনের জন্য ভোরে উঠে জল গরম করে না, উঠোন ঝাঁট দেয়না। বিপিন মুখে কুলুপ এঁটেছে। কিচ্ছুটি বলছে না বউকে। তিনি বলতে গেলেও থামিয়ে দিচ্ছে সে। 
 উঠোনে তখনই ঝামুরঝুমুর শব্দ তুলে উপস্থিত হলো বউটা। হাঁটু সমান চুলগুলো পুরো খোলা। সন্ধ্যাকালে এমন অলক্ষ্মীর মতন চুল খুলে রাখে কে? এ কেমন কালসাজ বউটার?
খ্যাপে উঠেন শাশুড়ি, খ্যাঁকানি দিয়ে উঠেন,
"চুল বাঁধো, বাঁধো। এই ভর সন্ধ্যায় কেমন রূপ দেখাচ্ছো? বাঁধ অলক্ষ্মী চুলটা। বাঁধ। আমার সংসারে বালা আনবি?"

  বিপিনের বউ চুল বাঁধে না। গিয়ে বসে চাঁপাগাছটার নিচে। গুনগুন করে গান গায়। সেই সন্ধ্যায় এমন দৃশ্য গা কাঁপিয়ে তুলে বৃদ্ধার। তবুও তিনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলেন,
"সন্ধ্যা না দিয়ে ওখানে গিয়ে বসলি কেন? সংসারের প্রতি কি টান নাই? বাঁজা মেয়ে কোথাকার!"

  শাশুড়ির উর্ধ্বাকাশে উঠা কণ্ঠকে ছাপিয়ে হাসে বউ। আরও দ্বিগুণ কণ্ঠ উঁচিয়ে বলে,
"তোর ছেলের মতন কুত্তার বাচ্চা জন্ম দেওয়ার চেয়ে বাঁজা থাকা ভালো। একটা অমানুষ জন্ম দিয়েছিস। তোর নিজের মতন অমানুষ।"

  শাশুড়ির হাত-পা কেঁপে উঠে। শীগ্রই বাড়ি ছেড়ে হৈহল্লা করে বেরিয়ে যান তিনি। প্রতিবেশীদের এক করেন। বিপিনের বউটার কী হলে, কী হলো, তেনারা ধরেছেন বোধহয়... এসব বলে বলে পাড়া মাথায় তুলেন। 
 প্রতিবেশীরাও বাহির থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখে। বউটা খোলা চুলে চাঁপাগাছটার নিচে বসে হাসছে। কিশোরীর মতন খিলখিলিয়ে। 

 সেই ঘটনার পর থেকেই গ্রাম থেকে গ্রাম ছড়িয়ে গেলো বিপিনের বউয়ের কথা। বউটাকে চাঁপাগাছের তেনারা পেয়েছে। এত লক্ষ্মী বউটা!
ছোটো, শিশু, বাচ্চা, কিশোর সবাই ওকে যেখানেই দেখতো সেখান থেকেই ছুটে চলে যেতো ভয়ে। সেসব দেখে ও যখন হাসতো তখন সবাই আরও নিশ্চিত হতো বউটার ভেতরে খারাপ কিছু ঢুকেছে বলে। 

 মাঠে ও যখন বিপিনের জন্য খাবার নিয়ে যেতো এই ঘটনার পর তখন বিপিনের সহকর্মীরা মুখ তুলে তাকাতো অব্দি না। মনির তো চোয়ালের সাথে থুতনি লাগিয়ে ফেলতো। 
নোয়া এলো পিসিমার বাড়ি থেকে। গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া ঘটনা তার কানেও গেলো। তার মা আজকাল বউকে গালিগালাজ করেন না, ভাইটা হাত তুলে না নিজের স্ত্রীর গায়ে। অকথ্য ভাষাও আর বলে না। নিজের মনমতন চলে সেই মেয়ে। যেটার স্বপ্ন নোয়াই দেখিয়ে ছিলো তাকে। 

  একদিন গ্রামে আকস্মিক একটা ঘটনা ঘটল। মনিরের মৃত্যু। তালবাগানের পুকুরটায় পেট ফুলে ভেসে উঠে মুনিরের লাশ একটি বৃষ্টির দিনে। গ্রাম জুড়ে কলরব, হৈচৈ পড়ে। মনিরের লাশ দেখতে দলে দলে ছুটে যায় গ্রামের সমস্ত লোক। সাঁতারে দক্ষ মনিরের ডুবে মরাটা যেন কলরব তুলে গ্রামে। সেই বৃষ্টিতে বিপিনের বউটা বসে থাকে চাঁপাগাছের নিচে। কত কথা বলে। কত হাসে। হাত বুলায় গাছটায়। তার যেন আনন্দ ধরে না। 'মা, মা' করে গাছটাকে কী যেন বলে। বলতে বলতে কাঁদেও। শুয়ে পড়ে সেই মায়ের কোলে।

   জানালা দিয়ে তাকিয়ে সেই দৃশ্য দেখে নোয়া। তার কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে যায়। চাঁপাফুলের ঘ্রাণে চারপাশটা ভরে যায়। এমনই ঘ্রাণ ছিলো সেদিন যেদিন বউটা বাড়িতে আসে। নোয়া ছিলো ছোটো। সে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করেছিলো, "তোমার নাম কী বউ?"
 বউটা নাম বলার আগে ওর মা বউটার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো 'বিপিনের বউ' বলে। এরপর আর কখনো নামটা জানা হয়নি তার। বউটাও আর কখনো, কাউকে নাম বলেনি। যে-ই জিজ্ঞেস করেছিলো পরিচয় তাকেই জানিয়ে ছিলো, সে বিপিনের বউ।

বিয়ের পর প্রথম বিসর্জন দিয়েছিলো বউটা নিজের নাম। এরপর বছরের পর বছর ধরে বউটা বিসর্জনই দিয়ে গিয়েছে। কখনো নাম, কখনো কান্না, কখনো সুখ। কত না পাওয়া, অপূর্ণতা নিয়েও সবাইকে সবটা দিয়ে গিয়েছিল। অথচ কেউ একটিবার জানতে চায়নি বউটার কী চাই? কেউ জানতে চায়নি, ওর কি কোনো ডাকনাম ছিলো? নিশ্চয় চাঁপাফুলের মতনই মিষ্টি নাম ছিলো ওর! কেবল বধূ হওয়ায় কতকিছু ত্যাগ করতে হয়েছিলো ওকে। সংসার জুড়ে কত না পাওয়া, কত হাহাকার মিশে ছিলো। তবুও এই সংসার ওকে আপন করে নেয়নি। দুঃখ দিয়েছে। প্রতারণা দিয়েছে প্রেমের বদলে। 

 নোয়ার মনে হলো হাসতে থাকা বিপিনের বউটা পাগল নয়, ভূতেও ধরেনি। ও কেবল নিজের পরিচয় খুঁজছে এত বছর পর। নিজেকে ভালোবাসছে...
·
·
·
সমাপ্ত……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp