সাবলেট - পর্ব ২৯ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

দৃশ্যটা কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারছি না।
বাথরুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে পুলিশের হটলাইনে ফোন করার পরেও না। পুলিশের সাথে আসা ডাক্তার যখন বলল— আর কিছু করার নেই, তখনও না। হক সাহেবেকে সাদা কাপড়ে ঢেকে যখন তার বাড়ি থেকে স্ট্রেচারে করে বের করা হলো তখনও না। 
“আপনি ঠিক আছেন, আহসান সাহেব?” ইউনিফর্ম পরা এক তরুণ পুলিশ অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করল।

অ্যাম্বুলেন্সের দরজা জোরে বন্ধ হতেই আমি চমকে উঠলাম। যাক অবশেষে ওটা চলে গেল। সাইরেন থেমে গেল। এখন আর তাড়াহুড়োর কিছু নেই। বাথরুমের মেঝেতে তাকে পড়ে থাকতে দেখার মুহূর্তেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম কী ঘটেছে। লোকটার মাথার পাশে জমাট বেঁধে ছিল রক্তের একটা চাকা...

“হুম,” আমি বিড়বিড় করলাম। তবে সত্যি বলতে কী, আমি ঠিক নেই। কেউ যদি এক গ্লাস পানি দিত! পুরোটা শরীর এখনও কাঁপছে। এই কাঁপার ব্যাপারটা কিছুতেই থামাতে পারছি না। 

“এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক,” অফিসার সাহেব কথাটা বেশ গুরুগম্ভীর গলায় বলল। যদিও দেখে মনে হচ্ছে বয়সে ও আমার থেকে খুব একটা বড় হবে না। “উনার বয়স নিশ্চয়ই আশির বেশি। বাথরুমে পা পিছলে পড়ে মাথায় আঘাত লাগতে পাারে। স্ট্রোকও হতে পারে। এমনটা আমরা প্রায়ই দেখি।”

আশির বেশি। ইয়া আল্লাহ... উনার সুঠাম শরীর দেখে আমার মনে হতো সত্তর কি বাহাত্তর হবে। “হুম,” আমি আবার বললাম।

সে চোখ কুঁচকে তাকাল। “আপনার সাথে থাকার মতো কেউ আছে?”

আমার একদম কেউ নেই। কিন্তু এই পুলিশকে আমার জীবনের কাহিনি শোনানোর দরকারও নেই। “বাসায় একজন সাবলেট আছে,” শুধু এটুকুই বললাম।

সে মাথা নাড়ল, যেন এটুকুই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আজ ওর অনেক ব্যস্ত একটা রাত যাবে। আর শেষ কথা হলো, ও নিশ্চয়ই চায় না একটা পঁয়ত্রিশ বছরের লোকের পাশে বসে থেকে পাহারা দেবে। তাছাড়া আমি এমনিতেই ঠিক হয়ে যাব। হ্যাঁ, একটা লাশ নিজে থেকে আবিস্কার করা একটা বিশাল ধাক্কা। আজ রাতে নিশ্চয়ই দুঃস্বপ্নও দেখতে হবে। কিন্তু আমি ঠিক সামলে নেব।

হক সাহেব তো আর ওটা পারবেন না।

“একটু বসুন। আমাকে আরেকবার কনফার্ম করতে হবে...” অফিসার পকেট থেকে একটা নোটবুক আর কলম বের করল। “আপনি হক সাহেবের ফ্ল্যাটে কেন ঢুকেছিলেন?”

“উনাকে নিয়ে চিন্তিত ছিলাম,” আমি বললাম। “উনার বাসার বাইরে কখনো আবর্জনা পড়ে থাকে না। এই ব্যাপাওে উনি ভীষণ কড়া মানুষ। তাই ভেবেছিলাম নিশ্চয়ই কিছু একটা গড়বড় হয়েছে।”

আমি তাকে এটা বললাম না যে আমি আসলে ওনার দরজায় দাঁড়িয়েছিলাম উনাকে কিছুটা কথা শোনানোর জন্য।

অফিসার সহানুভূতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, আমারও এমন এক প্রতিবেশী আছে। তো... আপনার কাছে কি ওনার বাসার ডুপ্লিকেট চাবি ছিল?”

“না। দরজাটা খোলাই ছিল।” 
“খোলা?” 
“মানে, লক করা ছিল না। ভেজানো ছিল।” 
“উনি কি সাধারণত লক না করে রাখেন?” 
অফিসারটা পাগল না কি? আমি এতকিছু জানব কী করে? 
“উমম... এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।” 
“তাহলে আপনি যখন দেখলেন দরজায় লক নেই, তখন ভেতরে ঢুকে পড়লেন?”

আমি মাথা নাড়লাম। “আমি বেল দিয়েছিলাম অনেকবার। সাড়া না পেয়ে শুধু দেখতে চেয়েছিলাম উনি ঠিক আছেন কি না। তারপর দেখি ডাইনিং টেবিলে খাবার বেড়ে রাখা। আর বাথরুমে আলো জ্বলছে, আর আমি...”

বলতে বলতে আমার গলা ধরে এল। এমনটা কেন হচ্ছে, বুঝতে পাারলাম না। লোকট কে তো আমি পছন্দই করতাম না। 

“ঠিক আছে,” অফিসার বলল। নোটবুকে কিছু একটা লিখে সেটাকে আবার পকেটে ঢুকিয়ে নিল। “এইটুকুই যথেষ্ট। আপনার স্টেটমেন্ট নেওয়া হলো।”

আমি কেবল মাথা নাড়লাম, কোনো কথা বের হলো না।

“আমি ওনার মেয়েকে ফোন করে জানাবো কী ঘটেছে,” অফিসার সাহেব তথ্য দিলেন।  
“হক সাহেবের কোনো মেয়ে আছে?”
“কাগজপত্রে তো দেখলাম, আছে।” সে বলল। “আমেরিকায় থাকে। মনে হয় খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হতো না। আর উনার ছেলেও তো আছে। উনারা মনে হয় বেড়াতে গেছে। আপনার কাছে কি উনার কোনো নাম্বার আছে?”
আমি মাথা নাড়লাম, “না, নেই।” 

আমার বাসার সামনে থেকে যখন পুলিশের শেষ গাড়িটাও চলে গেল, আমি ফোন বের করলাম। নাবিলাকে মেসেজ টাইপ করলাম—

‘হক আংকেল মারা গেছেন।’

স্ক্রিনে কয়েকটা টাইপিং ডট ভেসে উঠল। মানে হয়তো ও রিপ্লাই দিচ্ছে। যদিও আগেও একবার এই ডট দেখে আমি এটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু কোনো মেসেজ আসেনি।

কিন্তু এবার সত্যি সত্যি উত্তর এল—

‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তুমি ঠিক আছো?’

আমি লিখলাম— ‘কিছুটা নার্ভাস। অন্তত এখন আর গেটের সামনের ময়লা নিয়ে ওনার চেঁচামেচি শুনতে হবে না।

ও লিখল— ‘যাক, ভালো একটা দিক আছে তাহলে।’

ও আমার সাথে কথা বলছে। এটা একটা ভালো সাইন। হয়তো ওর ‘স্পেস’ নেওয়া শেষ, এবার ফিরে আসবে। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে আমি টাইপ করলাম—

‘আমি তোমাকে মিস করছি।’

আবার টাইপিং ডট উঠল। বারবার উঠতে থাকল। আর, আমি ও কী লিখছে দেখার জন্য নিশ্বাস আটকে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে থাকলাম।

কিন্তু... ও আর কোনো মেসেজ পাঠাল না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp