ডেসটিনি - পর্ব ১২ - সুহাসিনি মিমি - ধারাবাহিক গল্প

ডেসটিনি - সুহাসিনি মিমি
"মজা কই করলাম। আ'ম অলসো ভেরি সিরিয়াস! ভয় তো বেচারা সাপ টা আপনাকে পাচ্ছে। আরেকটু জোরে পা দিয়ে চেপে ধরলেই বেচারা পটল তুলবে হান্ড্রেড পার্সেন্ট!"

ঠোঁটের কোণ থেকে চাপা হাসি সরছেই না লোকটার। প্রিয়ন্তীর ভয়ার্ত মুখটা দেখতেই আরও দিব্যি মজা পাচ্ছে যেন। প্রিয়ন্তী হতভম্বর ন্যায় ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে রইলো শুধু। কতটা হার্টলেস এই লোক ভাবা যায়! কাপুরুষ কোথাকার! ব্যাটা তুই জীবনও বউয়ের সঙ্গ পাবিনা। তোর বউ তোর সামনেই অন্য পুরুষের সঙ্গে চলে যাবে।টু বউকে জীবনেও স্যাটিসফাইড করতে পারবিনা সালা। মনে মনে আরও বেশ কয়েকটা গালি ছুড়েও শান্ত হতে পারছেনা প্রিয়ন্তী। পায়ের নিচে এমন মর ণ যন্ত্রনা নিয়ে কি শান্তি থাকা যায়? 

এইবার ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দিলো মেয়েটা। ওর কান্নায় যেন হুস ফিরে এলো তাজধীরের। গুরুগম্ভীর হয়ে লোকটা এবার বলল,

“একদম নড়বেন না।”

প্রিয়ন্তী এমনিতেই পাথর হয়ে আছে। কথাটা শুনতেই খানিকটা আশার আলো ফিরে পেলো ও। চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল ওভাবেই। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা এমন জোরে ধুকপুক করছে মনে হচ্ছে আসে পাশের সবাই ও শুনতে পাচ্ছে সেটা। 

তাজধীর পকেট হাতড়ে একটা রুমাল বের করল। রুমালটা হাতে পেঁচাতে পেঁচাতে আবার বলল,

“আমি যা-ই করি না কেন, আপনি একচুলও নড়বেন না। গট ইট?"

উপর নিচ মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানাল প্রিয়ন্তী। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পাভেল উত্তেজনায় উঠে আসতে চাইলে হাত দিয়ে ইশারায় আসতে বারণ করে দেয় তাজধীর। 
নিচ থেকেই এবার জোরে হাঁক ছাড়ছে পাভেল,

"ভাই একটু জলদি কিছু করুন। আমার বোনটা ভীষণ ভয় পাচ্ছে যে!"

ওদিকে পায়ের নিচে সাপটার নড়াচড়া আরও স্পষ্ট করে অনুভব করছে প্রিয়ন্তী। শরীরের প্রতিটা স্নায়ু টানটান হয়ে আছে ওর। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মিতালী, পাভেল আর হাসিবও নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে শুধু। তাজধীর এবার নিচু হয়ে এলো। রুমালটা শক্ত করে হাতে পেঁচিয়ে সাবধানে সাপটার মাথার দিকে হাত বাড়াল সে। এক লহমায় সাপটার মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরে টান দিতেই ফোঁসফোঁস করে শব্দ করে উঠল সরীসৃপটা।নিয়ে এলো হাতের মুঠোয়। তৎক্ষণাৎ সেটাকে একটু দূরের ঝোপের দিকে ছুড়ে ফেলল সে। ঝোপে পড়তেই সাপটা সরসর শব্দ করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। 

অমনি নিচ থেকে একসাথে কয়েকটা হাঁফ ছাড়ার শব্দ ভেসে এলো,

“উফ! আল্লাহ! বাঁচসে!"

ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে প্রিয়ন্তী বুঝতেই পারল না ঠিক কী হলো।আদৌ সাপটা ওর পায়ের নিচ থেকে সরেছে তো?ততক্ষনে তাজধীর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“এখন চোখ খুলতে পারেন।”

প্রিয়ন্তী তখনো মূর্তির মত দাঁড়িয়ে। শরীরটাও কেমন শক্ত হয়ে আছে ভয়ে। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে এখনো। মনে হচ্ছে একটু নড়লেই বুঝি আবার পায়ের নিচে কিছু নড়বে। এভাবে কেটে গেলো কয়েক সেকেন্ড।

শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করে প্রিয়ন্তী কিঞ্চিৎ চোখ খুলল। তারপর আবার দ্রুত বন্ধ করে ফেলল। গলা শুকিয়ে কাঠ। দাঁত চেপে, চোখ-মুখ কুঁচকে আতঙ্কিত স্বরে বলল,

“ফে… ফেলেছেন?”

তাজধীর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,

“জ্বি। ব্যাটাকে তো প্রায় ভর্তা বানিয়েই ফেলেছিলেন আপনি। আপনি বেঁচে গেলেও ব্যাটা আদৌ বাঁচবে কিনা সন্দেহ!"

প্রিয়ন্তী তাজধীরের অহেতুক কথায় আর পা দিলোনা। আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস ওর নেই। ঝট করে চোখ খুলে চারপাশে একবার তাকাল। সাপটা সত্যিই নেই দেখে আর দেরি করল না। মুহূর্তের মধ্যে সরে গেল তাজধীরের পাশ থেকে।
তারপর প্রায় দৌড়েই নিচে নামতে লাগল ও। 

নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মিতালী, পাভেল আর হাসিব তখনও উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে আছে উপরের দিকে।
প্রিয়ন্তীকে নেমে আসতে দেখেই মিতালী ছুটে গিয়ে হাত ধরল ওর,

“প্রিয়! তুমি ঠিক আছো তো? আল্লাহ যেই ভয়টাই না পেয়েছিলাম!”

প্রিয়ন্তীর বুক তখনো উঠানামা করছে দ্রুত। ভয়ে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বের হলো না ওর মুখ দিয়ে। হ্যা না কিছুই বললো না উত্তরে। পাভেল দ্রুত এসে জিজ্ঞেস করল,

“কামড়ায়নি তো?”

প্রিয়ন্তী মাথা নাড়ল। হাফ ছাড়ল পাভেল। বোনকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। এরপর বলল,

"এখানে আর থাকা লাগবেনা। সবাই দ্রুত চলো। এখানে আর এক সেকেন্ড ও না!"

তাজধীর ততক্ষনে নেমে এসেছে নিচে। অন্ধকারে গাছপালা, ঝোপঝাড়, সবকিছুই বেশ অস্বস্তিকর লাগছে এখন।মিতালী গলা নামিয়ে বলল,

“চলো, চলো। এখানে আর এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছা করছে না ভাই!"

হাসিব ও তৎক্ষণাৎ সায় দিল,

“হ্যাঁ, চলো। এমনিতেও দেরি হয়ে গেছে!"

—————

রাতের অন্ধকারে কাঁচা পথটা বেশ পিচ্ছিল লাগছিলো। কোথাও কোথাও শুকনো মাটি, আবার কোথাও কাদামাটির স্তর। সবাই সাবধানে পা ফেলে এগোচ্ছিল সামনে। অটো টা তখনই চলে গেছে। অন্ধকারে উঁচু নিচু পথটায় হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল হাসিব। পায়ের নিচে কেমন নরম, চ্যাপচ্যাপে একটা অনুভূতি হচ্ছে ওর। ভ্রু কুঁচকে নিচের দিকে তাকাল। তারপর তাড়াতাড়ি পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্ল্যাশলাইট অন করল।
আলোটা জুতার দিকে পড়তেই মুখটা সঙ্গে সঙ্গে বিকৃত হয়ে গেল ঘৃণায়। 

“উফফ!এইটা আবার কী!”

গলা দিয়ে কয়েকটা বিরক্তির শব্দ বেরিয়ে এল।ওর জুতার উপর পুরোটা জুড়ে লেপ্টে আছে তাজা গরুর গোবর। শুধু ওপরেই নয়, জুতার ফাঁকফোকরেও ঢুকে গিয়ে চ্যাপচ্যাপে হয়ে আছে। গন্ধটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই পাশে থাকা সবাই একসাথে নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল। মিতালী তাড়াতাড়ি একটু দূরে সরে গিয়ে বলল,

“ইসস! হাসিব ভাই কিসের উপর পা দিয়েছেন আপনি?"

পাভেলও মুখ বিকৃত করে বলল,

“ভাই, জুতার অবস্থা তো একদম শেষ!”

হাসিব নিজেই বিরক্ত হয়ে জুতার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,

“ধুর!এখনই এটা হতে হলো? "

তাজধীর হাটছিলো সবার পিছনে। সবাই থেমে দাঁড়াতে থেমে দাঁড়ালো সেও। বন্ধুর পায়ে লক্ষ্য করতেই তৎক্ষণাৎ নাক কুঁচকে বিরক্ত মুখে বলল,

“দ্রুত গিয়ে পরিষ্কার করে আয়। তোর থেকে এমন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে যে পাশে দাঁড়ানোই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।"

হাসিব বিরক্ত হয়ে চারপাশে তাকাল একবার। একটু দূরেই অন্ধকারের মধ্যে একটা ছোট পুকুর চোখে পড়ল। পানির উপর হালকা চাঁদের আলো পড়ছে।
“ওইখানেই ধুয়ে আসি,” বলে সে দ্রুত সেদিকে হাঁটা দিল। পুকুরের ধারে গিয়ে সাবধানে পা নামাতে গেল।
কিন্তু কাদামাখা ঢালু পাড়টা যে কতটা পিচ্ছিল, সেটা বুঝতে পারল না বেচারা। পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই—
ধপাস করে পা পিছলে পরে গেল সেই পুকুরেই। পুকুরের পানি ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
নিচ থেকে সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এল হাসিবের হাঁকডাক,

“আরে ধুর! ধুর!বাল!"

ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকা বাকিরা কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। আচমকাই হো হো করে হেসে উঠল মিতালী। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা মেয়েটার। পাভেলও হাসি চেপে রাখতে পারল না।প্রিয়ন্তী ও হাসছে ঠোঁট চেপে।

পুকুরের ভেতর থেকে ছপছপ শব্দ ভেসে আসছে। পানির ভেতর হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে কোনোমতে ব্যালান্স করে স্থির হয়ে দাঁড়াল হাসিব । মাথা থেকে শুরু করে জামাকাপড়—সবকিছু একেবারে ভিজে চুপচুপে। চুলগুলো কপালের উপর লেপ্টে আছে। জামা থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা বাকিরা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে দৃশ্যটা দেখল। হাসিব উঠতেই মিতালী প্রথমেই হেসে কুঁকড়ে যেতে যেতে বলল,

“আল্লাহ! হাসিব ভাই, গোবর ধুতে গিয়ে তো একেবারে নিজেই ধুয়ে-মুছে গেলেন!”

পাভেলও পেট চেপে হাসতে হাসতে বলল,

“ভাই, জুতা কি ধুইতে গেসেন নাকি নিজেকে? "

প্রিয়ন্তীর ভয়ও ততক্ষণে অনেকটাই কেটে গেছে। হাসি চেপে রাখতে না পেরে সে-ও মুখ ঢেকে খিলখিল করে হেসে উঠল। পুকুরের ভেতর থেকে বিরক্ত মুখে তাকাল হাসিব।

“এইটা হাসার কিছু হইল?”

বলতে বলতেই কোনোমতে পাড়ে উঠে এল সে। পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে প্রথমে দু’হাত দিয়ে চুল থেকে পানি ঝাড়ল। তারপর জামা ঝাড়া দিল। চারদিকে আবার পানি ছিটকে পড়ল।মিতালী তাড়াতাড়ি এক পা পিছিয়ে গেল।

পাভেল আবার মজা করে বলল,

“ভাই, সাবধানে ঝাড়েন। না হলে আবার পিছলাইয়া পড়বেন!”

তাজধীর তখন দু’হাত বুকের কাছে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি রেখে 
ধীর গলায় বলল,

“তোর জন্য আলাদা করে গোসলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে ভাবছিলাম। দেখছি প্রকৃতি নিজেই সেই দায়িত্ব পালন করে ফেলেছে। আগামী দশদিন অন্তত আমার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকবি!"

আরও এক দফা হাসির রোল উঠল।কিন্তু হাসিব?
সে যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে দাঁড়িয়ে রইল। মুখটা যতটা সম্ভব গম্ভীর করে বলল,

“হাসা শেষ হইছে? হলে চলো। ঠান্ডা লাগতেছে।”

আরও একচোট হাসি শেষে আবার হাঁটা শুরু করল কাঁচা রাস্তা ধরে।হাসাহাসির রেশ তখনো পুরোপুরি কাটেনি। হাসিব ভেজা জামা গায়ে নিয়েই বিরক্ত মুখে হাঁটছে সামনে। আর বাকিরা মাঝে মাঝেই তাকে নিয়ে খোঁচা দিচ্ছে। কাঁচা রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে সবাই। গভীর রাত না হলেও এখানকার পরিবেশ দেখলে মনে হবে বেশ বেলা গড়িয়ে গেছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে তুমুল বেগে। গাছের সারি আর ঝোপঝাড়ে ঘেরা পথটা অন্ধকারে আরও বেশি নির্জন মনে হচ্ছে। ঠিক তখনই হঠাৎ করে এক ঝটকা বাতাস বইল। শোঁ শোঁ শব্দ তুলে বাতাসটা গাছের ডালপালা কাঁপিয়ে গেল।শুকনো পাতাগুলো সড়সড় করে উঠল। মুহূর্তেই চারপাশের পরিবেশটা কেমন যেন অদ্ভুত হয়ে উঠল—গা ছমছম করা এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে।
মিতালী নিজের বাহু দু’টো ঘষে বলল,

“উফ! হঠাৎ এমন ঠান্ডা বাতাস লাগল কেন?”

প্রিয়ন্তীর খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । অন্ধকারে চুলগুলো মুখের উপর এসে পড়ছে বারবার। বিরক্ত হয়ে হাত দিয়ে সরাচ্ছে ওগুলো। তাজধীর ওদের সবার পেছনেই হাঁটছিল। হঠাৎ সেই দৃশ্যটা চোখে পড়তেই ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল তার। একবার সতর্ক চোখে চারোপাশে চোখ বুলিয়ে কিছু একটা ভেবে প্রিয়ন্তীর পাশ কাটিয়ে গিয়ে খুব নিচু স্বরে মিতালীকে বলল,

“তোর ননদকে বল মাথায় ওড়না দিতে।”

কথাটা বলেই আবার আগের মতো হাঁটা দিল সামনে।
মিতালী প্রথমে খানিকটা অবাক হয়ে তাকাল ভাইয়ের দিকে। তারপর বুঝতে পেরে প্রিয়ন্তীর দিকে ফিরল।

“এই প্রিয় মাথায় ওড়না দাও ।”

প্রিয়ন্তী একটু থমকে তাকাল।

“কেন?”

মিতালী কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

“এই রাতে খোলা চুলে থেকোনা। দেখছোনা কেমন বাতাস বইছে। ওড়নাটা মাথায় দাও!"

ভাবীর কথা মতোই জামার ওড়নাটা টেনে মাথায় জড়ালো প্রিয়ন্তী। পিছনে থাকা তাজধীর আড় চোখে একবার লক্ষ্য করে পুনরায় আগের ন্যায় গুরুগম্ভীর ভাবেই হাঁটতে লাগে সামনে। 
Page 2
          রাত আনুমানিক দশটার ভিতরেই ওরা সবাই হোটেলে ফিরলো। আশার পথে একবারে রাতের ডিনার শেষ করেই এসেছে। হোটেলে ফিরে সবাই একসাথে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন। সারাদিনের এত এত জার্নি, ঘুরাঘুরি সব মিলিয়ে শরীরটা বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সবারই। লবিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গল্পগুজব করে যে যার রুমের দিকে চলে গেল।

প্রিয়ন্তী নিজের রুমে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করল। গলায় থাকা ওড়নাটা অলস্য ভঙ্গিতে ছুড়ে মারল বিছানায়। পরপর ফ্রেশ হতে চলে গেল ওয়াশরুমে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্লান্ত মুখটা দেখে আপনাআপনি একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওর। 

মুখে পানির ঝাপটা দিতে চোখ দুটো বন্ধ করতেই চক্ষু স্পটে ভেসে উঠল সেই ভিবৎস দৃশ্যখানা। অমনি গা শিউরে উঠে চোখ মেলল তড়িঘড়ি। পায়ের নিচটা তো এখনো পিলপিল করছে। মনে হচ্ছে পিচ্ছল জিনিসটা এখনো ওর পায়ের পাতার মধ্যে আটকে আছে। 

বেন্টিবেগে থাকা ফোনটা কতক্ষন যাবৎ ভাইব্রেট হয়ে বেজেই যাচ্ছে। প্রিয়ন্তী ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে ফোনটা তুলে নিলো হাতে। স্ক্রিনে বান্ধবীর নামটা দেখে আর দেরি করলোনা। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে চেনা কণ্ঠটা প্রায় উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল এবার,

“এই মাইয়া কই তুই? সারাদিনে একবারও ফোন দিলি না!কমান্ডার বেয়াই পেয়ে বান্ধবীদের ভুলে গেলি? জলদি আপডেট বল। আজকে কি কি করলি সব বল তাড়াতাড়ি! আমার সহ্য হচ্ছেনা!"

প্রিয়ন্তী বিছানার কোণে আরাম করে বসল এবার। এরপর বলে উঠল,

“আরে ধীরে! আমি এখানেই আছি ভাই। এত হাইপার হচ্ছিস কেন?"

“না না, আগে বল। তোরা আজকে কোথায় গিয়েছিলি? কি করছিলি? এই দাড়া ছবি কই? ছবি তোলোস নাই?"

“আজকে যা হয়েছে না, তোকে বললে তুই বিশ্বাসই করবি না।”

ওপাশ থেকে সাথে সাথেই উত্তর এল,

“আচ্ছা! তাহলে তো আরও কিউরিয়াস মামা। জলদি বলতো কি হয়েছে।"

প্রিয়ন্তী এবার পুরো ঘটনাটা খুব সংক্ষিপ্ত আকারে খুলে বলল। সকাল থেকে শুরু করে ওর সঙ্গে ঘটা যাবতীয় ঘটনাই শেয়ার করল বান্ধবীকে। সব শুনে ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা জারি রেখে তারপর হঠাৎ চিৎকার করেই উঠল মেয়েটা,

“কি বলছিস! তোর পায়ের নিচে সত্যি সত্যি সাপ ছিল?”

প্রিয়ন্তী বিরক্ত গলায় বলল,

“হ্যাঁ রে! আমি তো প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলাম ভাই। এরকম হরিবল এক্সপেরিয়েন্স কোনো শুত্রুর ও না হোক!"

ওপাশ থেকে হাসির শব্দ ভেসে এল তৎক্ষণাৎ। যেন মেয়েটা খুব মজা পাচ্ছে।উৎসুক হয়েই জানতে চাইলো পুনরায়,

“তারপর? তারপর কি হলো? নিশ্চই আমাদের কমান্ডার সাহেব তোকে সেইফ করেছিল? "

প্রিয়ন্তী থেমে বলল,

“হ্যা তাজধীর ভাই সাপটাকে টেনে ধরে ছুড়ে ফেলেছিলো। তবে এর আগে অবশ্য আমাকে টিজ করতে ভুলেনি। ”

ওপাশ থেকে সাথে সাথেই নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে থামে মেয়েটা,

“ওহহ! নায়ক এন্ট্রি!হু?ভাবতে পারছিস কি জোস্ একটা সিন্?ইশ আমার তো ভাবতেই ব্লাসিং ব্লাসিং ফিল হচ্ছে!"

প্রিয়ন্তী মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“উফ! নায়ক-টায়ক কিছু না।ওনার জায়গায় যে কেউ থাকলে অমনটাই করতো। স্বাভাবিক!"

"তোরে কি আমি শুধু শুধু বলদ বলি?আচ্ছা বাদ দে। তুই তো এমনিতেও বলদ। বাট লোকটা কিন্ত সেই মামা।”

“মানে?”

“মানে! দেখ প্রতিটা ক্ষেত্রেই লোকটা কেমন নায়ক স্টাইলে এসে তোকে সেইভ করে যাচ্ছে?"

প্রিয়ন্তী একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল,

“বাল।উনি উল্টো আমাকে নিয়েই মজা করছিল।”

ওপাশ থেকে আবার প্রশ্ন এলো,

“আরেহ ওটা, ওয়ান কাইন্ড অফ রোমান্টিক মোমেন্ট! ওসব তুই বুঝবি না। একেকজনের লাভিং স্টাইল একেকরকম। আচ্ছা এরপর কি করলি আর?"

প্রিয়ন্তী হাসতে হাসতে হাসিবের পুকুরে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটাও বলল এবার। সব শুনে মেয়েটা প্রায় হেসে লুটোপুটি খাওয়ার মত অবস্থা নিয়ে বলল,

“আরে থাম থাম! আমি কল্পনা করেই হাসতেছি ভাই। এই হাসিব ব্যাটা তো একটা চিজই।"

 বান্ধবীর সঙ্গে গল্প করতে করতে ক্লান্তির ভার একটু একটু করে কমে যাচ্ছিল বৈকি। ওপাশ থেকে শ্রেয়া আবারও আগ্রহভরা কণ্ঠে শুধাল,

“আচ্ছা এত কিছু বললি, কিন্তু ছবি কই? সারাদিন ঘুরলি, একটা ছবিও পাঠাবি না? আমি দেখবো না?"

প্রিয়ন্তী হালকা হেসে ফোনটা স্ক্রল করতে করতে বলল,

“আরে আছে তো। আজকে জাফলং গিয়ে বেশ কয়েকটা গ্রুপ ছবি তুলেছিলাম। দাড়া পাঠাচ্ছি।”

এক এক করে কয়েকটা ছবি পাঠিয়ে দিল ও।জাফলংয়ের পাথুরে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে তোলা ছবি, পাহাড়ের পটভূমিতে সবাই মিলে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি—সবই ছিল সেগুলোর মধ্যে। ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা ভেসে এলো বিনিময়ে। মনে হচ্ছিল শ্রেয়া অধীর মনোযোগ দিয়ে প্রতিটা ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। হঠাৎই মেয়েটা বলে উঠল,

“এই ভাই! একটা জিনিস খেয়াল করেছিস?”

প্রিয়ন্তী অবাক হয়ে বলল,

“কি?”

“দেখেছিস লোকটা তোর দিকে কিভাবে তাকিয়ে ছিল?”

প্রিয়ন্তী সঙ্গে সঙ্গেই সোজা হয়ে বসল। অবিলম্বে বলল সে,

“কি বলছিস! কোথায় তাকিয়েছে?”

শ্রেয়া বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল,

“আরে বলদ! ভালো করে দেখ। লাস্টে যে ছবিটা পাঠিয়েছিস, ওইটায় তোদের সবার দৃষ্টি ক্যামেরার দিকে। কিন্তু লোকটা—সে কিন্তু তোর দিকেই তাকিয়ে আছে। ভালো করে জুম করে দেখ মাইয়া!"

বান্ধবীর কথায় প্রিয়ন্তী তৎক্ষণাৎ সেই ছবিটা খুলে দেখল। কিছুক্ষণ মন দিয়ে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করল।
সত্যিই তো! ছবিটায় তাজধীর সামান্য ঝুঁকে আছে, আর তার দৃষ্টি যেন প্রিয়ন্তীর দিকেই নিবদ্ধ। তবে কি লোকটা সত্যিই ওর দিকে তাকিয়ে ছিল? নাকি ওর পেছনে অন্য কিছু দেখছিল? সেটা নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে না। মুহূর্তেই নিজের অস্বস্তিটা লুকিয়ে নিয়ে প্রিয়ন্তী ধমকের সুরে বলল প্রায়,

“উনি যে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল এটা তুই কিভাবে শিওর হলি?”

শ্রেয়া হেসে উঠল শব্দ করে। বলল,

“আরে বলদী, একটা ছেলের তাকানোর স্টাইল দেখলেই আমি বলে দিতে পারি। ছেলেরা যখন কোনো মেয়ের দিকে তাকায় না তখন ওদের চোখে এক অন্যরকম নেশা ফুটে ওঠে।”

প্রিয়ন্তী অবাক হয়ে জানতে চাইলো,

“সামান্য একটা ছবি দেখে তুই এতকিছু বলে দিতে পারছিস?"

শ্রেয়া সঙ্গে সঙ্গেই কটাক্ষ করে বলল,

“আমি কি তোর মত বলদ নাকি? জীবনেও একটা রিলেশন করেছিস? সবসময় বলিস—ছেলেদের নাকি তোর ট্রাস্ট হয় না! আরে সব ছেলে একরকম হয় না মামা।”

প্রিয়ন্তী বিরক্ত হয়ে বলল,

“হইছে! এখন আউল-ফাউল লেকচার বন্ধ কর।”

শ্রেয়া দুষ্টু গলায় বলল,

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন থেকে শুধু তোমার কমান্ডারকে নিয়েই কথা বলব।ওটাই তো শুনতে চাইছো পাখি!"

প্রিয়ন্তী তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করল,

“উনি মোটেও আমার কমান্ডার না। সো প্লিজ—‘আমার, আমার বলা বন্ধ কর।”

শ্রেয়া হাসতে হাসতেই বলল,

“আজ না হোক কাল হবেই। আমার তো ভাবতেই ভালো লাগছে—আমার বান্ধবী হবে কিনা একদিন লেফটেন্যান্ট কমান্ডারের বউ! আচ্ছা তখন তোকে ধরা যাবে তো?”

“না!”

প্রিয়ন্তী প্রায় রেগেই বলল কথাটা। কিন্তু কথাটা বলার পরই হঠাৎ করে যেন ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল ওর মনে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আচমকাই প্রশ্ন করে বসল,

“আচ্ছা শ্রেয়া… উনি কি সত্যিই আমাকে পছন্দ করে রে?”

“এই তো চান্দু, এইবার লাইনে আসছিস।”

“হেঁয়ালি না করে সরাসরি বল।”

শ্রেয়া এবার একটু গম্ভীর স্বরে বলল,

“বেটা শুধু পছন্দ না। পছন্দের সীমা অলরেডি অতিক্রম করে ফেলেছে ইতিমধ্যে।"

প্রিয়ন্তীর গলায় বিস্ময় ফুটে উঠল,

“সত্যি বলছিস?”

“আমি দূর থেকে বুঝতে পারছি, আর তুই কাছাকাছি থেকেও বুঝতে পারছিস না?"

প্রিয়ন্তী একটু থেমে বলল,

“কিভাবে বুঝব উনি আমাকে পছন্দ করে?”

শ্রেয়া কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল,

“ওটা সরাসরি বলে বুঝানো যাবেনা। তবে কিছু হিন্ট দিতে পারি।”

প্রিয়ন্তী চুপচাপ শুনতে লাগল।শ্রেয়া পুনরায় বলতে লাগল,

“যেমন ধর, লোকটার কাছাকাছি গেলে তোর ভিতরে একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করবে।উনাকে দেখলে মনে হবে সময়টা যেন থেমে যাক। আশেপাশের সবকিছু থেমে থাক। কখন সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে—সেদিকে তোর খেয়ালই থাকবে না।উনার কথা শুনলে অকারণেই তোর ভালো লাগবে। উনার কাছে দাঁড়ালে তোর বুকটা অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করবে।স্বাভাবিক নয়, বড্ড অস্বাভাবিক ভাবে চলবে হৃদস্পন্দন। আর যদি বাই চান্স কখনো উনার স্পর্শ লাগে, মনে হবে শরীরের ভেতর কোনো হাই ভোল্টেজের কারেন্ট বয়ে গেছে!"

প্রিয়ন্তী নিশ্চুপ হয়ে শোনলো সবটা। শ্রেয়া আবার বলল,

“আর একটা কথা—ওনাদের পার্সোনালিটি কিন্তু খুব স্ট্রং মামা । ওই বয়সের মানুষগুলো এমনই হয়। মুখে কিছু স্বীকার করবে না। ওরা কিন্তু ‘প্রেম ট্রেম" করবে না। ওনাদের কি প্রেম করার বয়স আছে? দেখবি, সরাসরি একদিন বাসায় গিয়ে মায়ের কাছে তোর বিয়ের প্রপোজাল দিয়ে বসবে। যদি না দেয়—তখন আমার নাম পাল্টে দিস।”

বিয়ের কথাটা শুনতেই প্রিয়ন্তীর গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠল কেমন। মনে হলো বুকটাও কাঁপলো অস্বাভাবিক ভাবে। অদ্ভুত, অচেনা,অতিসুন্দর একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল ভিতরটায়। নিজেকে সামলে নিয়ে সে আবার বলল,

"এরকম ফিল হলেই বুঝবো আমি প্রেমে পড়েছি?"

"পড়েছি না। পরে গেছিস। তাও আবার গভীর প্রেমের খাঁদে। যেই খাঁদ থেকে নেভিয়ান ধুলাভাই ছাড়া আর কেউ উঠাতে পারবে না!"

"ধেৎ!চুপ থাকতো!"

লাজুক হেসে কপট রাগ দেখিয়ে বলে প্রিয়ন্তী। এভাবেই আরও কিছুক্ষন দুজনের মধ্যে আড্ডা চলল। 
কথা বলতে বলতে কখন যে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে কেউই খেয়াল করেনি। শেষে শ্রেয়া হাই তুলে বলল,

“চল, এখন রাখি। কাল আবার সব আপডেট দিবি।”

প্রিয়ন্তী মৃদু হেসে বলল,

“ঠিক আছে।”

কলটা কেটে গেল তখনি। ঘরের নিস্তব্ধতায় ফোনটা নামিয়ে রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল প্রিয়ন্তী।
এরপর ফোনটা পুনরায় অন করে আনমনেই সেই ছবিটায় দৃষ্টি তাক করল। যেখানে তাজধীর সামান্য ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। আর তার দৃষ্টি যেন ঠিক প্রিয়ন্তীর দিকেই। বিড়বিড় করে আওড়াল প্রিয়ন্তী,

"আমার নিরামিষ কমান্ডার?"

—————

সেদিনের রাতটা কোনোভাবে কাটালেও প্রিয়ন্তীর চোখে ঘুম তেমন একটা জোটেনি। অদ্ভুত সব ভাবনা আর দিনের ঘটনাগুলো বারবার এসে ভিড় করছিল মনে। তবে সকালে উঠতে হলো খুব ভোরেই।

গতরাতে রুমে ফেরার আগেই সবাইকে কড়া গলায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল—সকালে সবাই মিলে যাবে হাসিবদের বাসায়। নাস্তার করবে সেখানেই। তাই ভোরের আলো ফুটতেই একে একে সবাই উঠে পড়ল। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে, রেডি ফেডি হয়ে সবাই নিচে লবিতে এসে জড়ো হলো।

হাসিবও এরই মধ্যে গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে-মুখে ঘুমের রেশ উতলে পড়ছে ছেলেটার। বারবার হাই তুলছে সে। বোঝাই যাচ্ছে, খুব ভোরে ঘুম ভেঙে উঠতে তার মোটেও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু তার আম্মার কড়া নির্দেশ—ওদের নিজে গিয়ে নিয়ে আসতেই হবে। তাই বাধ্য হয়েই হাজির হয়েছে সময়মতো। সবাই একে একে গাড়িতে উঠতেই গাড়িটি ধীরে ধীরে রওনা দিল সিলেটের বিখ্যাত লন্ডনীপাড়ার উদ্দেশ্যে।

লন্ডনীপাড়া—নামটা শুনলেই এক ধরনের আলাদা আভিজাত্যের অনুভূতি জেগে ওঠে মনে । সিলেটের এই অঞ্চলটি বরাবরই পরিচিত তার স্বচ্ছলতা আর বিদেশফেরত বাসিন্দাদের জন্য। এখানকার অধিকাংশ মানুষই দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে বসবাস করেন কিংবা সেখানেই স্থায়ী হয়েছেন। ফলে এই এলাকার বাড়িগুলোতেও সেই বিদেশি স্টাইলে তৈরী। 

তবে এই সবকিছুর মাঝেও সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন, সবচেয়ে বিলাসবহুল যে বাড়িটি—সেটি নিঃসন্দেহে হাসিবদের।প্রায় দশ মিনিটের মধ্যেই গাড়িটি এসে থামল সেই বিশাল ভবনের সামনে। উঁচু গেটের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা এক নজরেই চোখ আটকাটে সক্ষম। গাড়ি থামতেই দারোয়ান তড়িঘড়ি করে গেট খুলে দিল। গেট খুলতেই সামনে উন্মোচিত হলো এক আধুনিক, নান্দনিক স্থাপত্য—যেখানে আভিজাত্য আর সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

হাসিবদের পরিবার মূলত যৌথ পরিবার। তার বাবা, চাচারা সবাই একসঙ্গে থাকেন এই বিশাল বাড়িটিতে। তবে এই মুহূর্তে বাড়িটা কিছুটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। কারণ গত সপ্তাহেই হাসিবের চাচা-ফুফুরা সবাই মিলে বিদেশে ঘুরতে গেছেন। এখন বাড়িতে আছেন শুধু হাসিবের বাবা।

বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে দরজাটা খুলে দিলেন এক মধ্যবয়সী নারী। প্রথম দেখাতেই চোখ আটকে যাওয়ার মতো অতীব সৌন্দর্যর অধিকারী সেই নারীর চেহারায় বয়সের ছাপ থাকলেও তার ভেতরকার লাবণ্য একটুও ম্লান হয়নি।চেহারায় অকৃত্রিম মাধুর্য আর মুখভরা আন্তরিক হাসিতে পরিপূর্ন সেই নারীকে দেখামাত্রই তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গিয়ে সালাম জানাল তাজধীর,

“আস্সালামুআলাইকুম আন্টি, কেমন আছেন?”

নারীটি স্নিগ্ধ হেসে সালামের জবাব দিলেন। মিতালীও তাকে আগে থেকেই চিনত, তাই এগিয়ে এসে সালাম জানিয়ে বলল,

“আন্টি, কেমন আছেন?”

তিনি মমতাভরা কণ্ঠে উত্তর দিলেন,

“আছি আলহামদুলিল্লাহ, আম্মু। তোমরা কেমন আছো? আসো, আসো—তাড়াতাড়ি ভেতরে এসে বসো।”

প্রিয়ন্তী বুঝল এটা নিশ্চয়ই হাসিবের আম্মু।যদি হাসিবের সঙ্গে চেহারায় মিল নেই সামান্যটুকুও। সবাই একে একে ভেতরে ঢুকে ড্রইংরুমে গিয়ে বসল। চারপাশে সাজানো-গোছানো অভিজাত পরিবেশ, আর তার মাঝেই যেন এক উষ্ণ পারিবারিক আবহ।
হাসিব সোফায় বসতে বসতেই বিরক্ত গলায় বলল,

“এই যে, তোমাদের ছেলেকে এনে দিয়েছি। এখন আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে একটু রেস্ট নিতে দাও—আমি গেলাম!”

কথা শেষ করে উঠে যেতে নিতেই তাজধীর দ্রুত হাত চেপে ধরে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে দিল বন্ধুকে। বলল চিবিয়ে চিবিয়ে,

“কোথায় যাচ্ছিস। একটুও নড়বি না খবরদার!"

হাসিব কাতর গলায় বলল,

“ভাই, ছাড়! একটু রেস্ট নিতে দে না!”

কিন্তু তাজধীর ছাড়ার পাত্র নয়। মুখে দুষ্টু হাসি নিয়ে সে আবার বলল,

“আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দে—আমার বউ কোথায়, আন্টি?”

তাজধীরের কথা শেষ হতে না হতেই ভেতরের দিক থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধা নারী। তিনি এসে সোজা হাসিবকে ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে দিলেন,

“এই সর! আমি বসব আমার হ্যান্ডসামের সঙ্গে।"

তারপর নিজে এসে বসে পড়লেন তাজধীরের পাশে।
তাজধীর মুচকি হেসে বলল,

“বা! আমার বউ তো দেখি দিন দিন আরও বেশি সুন্দর হয়ে যাচ্ছে! সামনাসামনি তো আরও ইয়াং লাগছে তোমাকে ইয়াং লেইডি!"

বৃদ্ধা ভান করে চোখ রাঙিয়ে বললেন,

“চুপ কর বেয়াদব! বুড়ি মানুষকে নিয়ে এসব ফাজলামি করিস?"

তাজধীর হেসে বলল,

“বুড়ি কোথায়? তুমি তো এখনো একদম আমার সুইট সিক্সটিনই আছো দেখছি!"

চারপাশে হালকা হাসির রোল পড়ে গেল অমনি। এরপর তাদের মধ্যে আরও বেশ কিছুক্ষন আলাপচারিতা চললো। এক পর্যায়ে তাজধীর সবাইকে একে একে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করল।
সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিতে দিতে শেষে এসে থামল প্রিয়ন্তীর সামনে। একটু থেমে, সংক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

“ও… মিতালীর ননদ।”

কথাটা শেষ হতেই হঠাৎ করেই হাসিবের দাদি কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে বসলেন,

“তোমার বিয়ে হয়েছে?”

আকস্মিক এহেন প্রশ্নে খানিকটা ভড়কে গেল প্রিয়ন্তী। কী উত্তর দেবে, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না । মুখ খুলে কিছু বলার আগেই মিতালী দ্রুত সামলে নিয়ে হেসে বলল,

“না দাদি, আমরা আমার ননদকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিব না।”

অমনি সেখানে এসে হাজির হলেন হাসিবের দাদান। হাতে একটি লাঠি—যদিও সেটার উপর ভর দেওয়ার প্রয়োজন তার নেই, তবুও সেটা তার ব্যক্তিত্বেরই অংশ হয়ে ফুটে উঠেছে। এক সময় পুরো সিলেট শহরের অর্ধেকাংশ তার অধীনস্ত ছিল। বয়স তাকে খানিকটা ধীর করেছে ঠিকই, কিন্তু তার উপস্থিতির গাম্ভীর্য এখনও আগের মতোই অটুট।

ঘরে ঢুকেই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো তার সহধর্মিনীর উপর। যিনি বেশ আয়েশ করেই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তাজধীরের পাশে বসে আছেন। দৃশ্যটা দেখে ভ্রু খানিকটা কুঁচকে উঠল বৃদ্ধার। চোখের দৃষ্টিতেই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে তাজধীরকে তিনি খুব একটা পছন্দ করেন না।

তাজধীরও বিষয়টা বুঝতে পেরে হালকা সোজা হয়ে বসল তৎক্ষণাৎ। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে টেনে টেনে বলল,

“কেমন আছো, ইয়াং ম্যান?”

বৃদ্ধ লোকটি মুখে স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য এঁটে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। চোখ দুটো স্থিরকরে ভারী কণ্ঠে শুধালেন,

“এতক্ষণ তো ভালোই ছিলাম। এখন আর ভালো থাকা হবে না দেখছি।”

কথাটার মধ্যে লুকানো খোঁচাটা স্পষ্টই বুঝতে পারল তাজধীর। দাদান তাকে খুব একটা সহ্য করতে পারেন না জানে সে। তবুও সুযোগ পেলেই একটু খোঁচা দিতে ছাড়ে না সেও। আর এবারও ব্যতিক্রম হলো না।
তাজধীর মুচকি হেসে, আরও একটু সামনে ঝুঁকে বলল,

“তোমার বউটা কিন্তু হেব্বি জোস হচ্ছে দিন দিন। একটু দেখে শুনে রেখো—কোনো দিন না আবার গায়েব হয়ে যায়!”

কথাটা ঠিক আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল।
বৃদ্ধ লোকটির মুখমণ্ডল আরও কঠিন হয়ে উঠল তখনি। লাঠিটা মেঝেতে ঠুকলেন একবার। চোখে বিরক্তি নিয়ে চাপা কণ্ঠে সুধালেন,

“তোমার এই বেয়াদবি দিন দিন বাড়তেছে তাজধীর। বড়দের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার আদব-কায়দা শিখোনি এখনো?”

তাজধীর নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল,

“আদব তো শিখছি দাদাভাই। কিন্তু তোমার সামনে এলেই না, কেন জানি ভুলে যাই! আদব হারিয়ে বেয়াদব হয়ে যাই!"

বৃদ্ধ এবার ফসফস করে বললেন,

“এত বড় পদে নিযুক্ত থেকেও দেখছি স্বভাব পাল্টায়নি। ঠিক হয়ে যাও বুঝছো? "

তাজধীর এবার একটু সোজা হয়ে বসল। বলল ভাবলেশহীন, 

"তোমার বউটাকে আমায় দিয়ে দাও দাদা ভাই। একদম স্বভাব পাল্টে ফেলবো। তোমার প্রমিস করে বলছি!"

বৃদ্ধ চোখ রাঙালেন এবার। ফসফোঁস করে বললেন,

"তুই একটাবার বিয়ে কর। তোর বউকে তোর সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাবো আমি। বাসর ঘর থেকেই ওকে নিয়ে পালাবো। তখন বুঝবি কেমন লাগে!"

তাজধীর হালকা হেসে বলল,

"আমার বউয়ের তো ঠেকা পড়ছে তোমার মত বুড়োর সঙ্গে পালাবে। তোমার মধ্যে কিছু আছে নাকি। সব তো ঝঙ্গ ধরে গেছে। বউ তুমি একটু আপডেট দিতে পারোনা তোমার বুড়ো বরটাকে?"

"আপডেট দিলেও কাজ হবেনা ভাই।বুড়োটা পুরো ডেমেজ হয়ে গেছে।"

হাসিব এবার মুখ চেপে হাসি থামানোর চেষ্টা করছে।মূলত এটা নতুন কিছু নয়।ওর দাদা ভাই তাজধীর কে আগে থেকেই পছন্দ করেন না। তার একমাত্র কারণই হলো ওর দাদি। বউ যদি সারাদিন জামাইর সামনে অন্য পুরুষের গুনগান গায় তাহলে কোন পুরুষ সহ্য করবে ওসব? বৃদ্ধ বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন,

“আল্লাহ জানে, এই ছেলের শেষ কী হবে!”

বলেই গটাগট পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন তিনি। অমনি সশব্দে হেসে উঠলেন উপস্থিত সকলে। 

তাজধীর সোফায় হেলান দিয়ে বসে চারপাশে একবার তাকিয়ে হঠাৎই বলল,

“আন্টি, কাঠবিড়ালিটা কোথায়? দেখছি না তো!”

হাসিবের মা হেসে মাথা নেড়ে বললেন,

“আর বলো না বাবা! তোমরা আসবে শুনে সেই যে নিজে পাকামো শুরু করে কিচেনে ঢুকছে—এখনো কাজ করেই যাচ্ছে! আল্লাহই জানে কি করছে এতক্ষন লাগিয়ে!"

তারপরই তিনি কিচেনের দিকে মুখ করে ডেকে উঠলেন,

“এই হীরা! আর কতক্ষণ লাগাবি? তোর জুসের অপেক্ষায় থাকলে ছেলেমেয়ে গুলো আমার পানিপিপাসায় মরবে!”

কিচেনের ভেতর থেকে ভেসে এলো চিকন, মিষ্টি মেয়েলি নরম একটা কণ্ঠ,

“আসছি আম্মু!”

কিছুক্ষণ পরই সেখান থেকে বেরিয়ে এলো এক তরুণী। বয়স বড়জোর ষোলর ঘরে হবে। চিকন-চাকন গড়ন, ফর্সা ত্বক, আর চঞ্চলতায় ভরা মুখখানা—দেখতেই যেন একেবারে প্রাণবন্ত।
হাত ভর্তি ট্রে নিয়ে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। ঘরে সার্ভেন্টের অভাব না থাকলেও, নিজ হাতে সবার জন্য জুস পরিবেশন করছে সে।মিতালী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বলল,

“এইটা আমাদের হীরা না ? মাশাআল্লাহ! কত বড় হয়ে গেছে!”

হীরা হেসে এগিয়ে এসে বলল,

“ভালো আছো আপু?”

মিতালী স্নেহভরা কণ্ঠে উত্তর দিল,

“এই তো বোন, ভালো আছি। কিন্তু তুমি এত কষ্ট করতে গেলে কেন?”

এর মাঝেই হীরা একে একে সবার হাতে জুসের গ্লাস তুলে দিলো। তাজধীর কৌতূহলী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,

“কোন ক্লাসে পড়ছিস তুই?"

তুই সম্বোধনটা যে হীরার খুব একটা পছন্দ হয়নি, সেটা তার চোখ-মুখ দেখলেই বোঝা যায়। তবুও ভদ্রতা বজায় রেখে উত্তর দিল,

“এই তো নিউ টেন।”

“ওহ! কোন বিভাগ?”

“সায়েন্স।”

তাজধীর মাথা নেড়ে বলল,

“ভালো! তো পড়াশোনা ঠিকঠাক করছিস তো?”

হীরা কিছু বলার আগেই,তাজধীরের দিকে গ্লাস বাড়িয়ে দিতে গেলেই অকসস্মাৎ হঠাৎ করেই ওর হাতটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই—গ্লাসটা হাত ফসকে সোজা পড়ে গেল তাজধীরের পায়ের ওপর।
ঝপ করে জুস ছিটকে পড়তেই হীরা একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। তড়িঘড়ি নিচু হয়ে তার পা থেকে জুসটা মুছতে মুছতে বলতে লাগল,

“সরি ভাইয়া! সরি, সরি! আমি ইচ্ছে করে করিনি!”

হাসিব সঙ্গে সঙ্গেই বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,

“যেটা পারিস না, সেটা করতে আসিস কেন? পাকা কোথাকার!”

তাজধীর হাত বাড়িয়ে ইশারায় হাসিবকে থামিয়ে পরপর বলল ওকে,

“আরেহ আরেহ পাকা বুড়ি থাম থাম। কিছুই হয়নি। তুই সর—আমি নিজেই ক্লিন করে নেবো।”

হীরা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

“আমি সত্যি ইচ্ছে করে করিনি ভাইয়া। হঠাৎ হাত ফসকে গেছে।"

তাজধীর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

“আরে, তো কি হয়েছে? পড়তেই পারে—একদম নরমাল ব্যাপার। তুই যে আমাদের জন্য নিজে হাতে জুস বানিয়ে নিয়ে এসেছিস, সেটাই তো অনেক বড় কথা।”

ওদিকে সবেই জুসের গ্লাসটায় চুমুক বসিয়েছিল প্রিয়ন্তী। অমনি মেয়েটার কাণ্ডে রীতিমতো থ বনে গেল ও । আশ্চর্য, হতবিহুল হয়ে দেখছে সেসব। মস্তিস্ক টা তরাক করেই জলে জ্বলে উঠছে। দৃষ্টি সেদিকে রেখেই এক টানে জুসের গ্লাসটা খালি করে ধুম করে গ্লাসটা টি টেবিলের উপরে রাখল। তবে সকলে সেই কাণ্ডে ডুবে থাকায় সেদিকে আর কেউ খেয়াল করলোনা। প্রিয়ন্তী মনে মনে দাঁত পিষলো কয়েকবার। বাচ্চা একটা মেয়ে অথচ হাবভাবে মনে হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্কা নারী। মেয়েটা মোটেও সুবিধাজনক নয়। এই কোন জ্বালায় এসে পড়ল ও?একটা মেয়ের দৃষ্টি আরেকটা মেয়ে খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারে। প্রিয়ন্তীর দেরি হলোনা সেসব বুঝতে। মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,

" শেষমেষ কিনা একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে ওর কম্পিটিশন লাগবে?"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp