‘পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;
পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;
পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দু'জনার মনে;
আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে আকাশে।’
মাথার ভেতর ঘুমন্ত জীবনানন্দ নিয়ে সাব্বির যখন চেম্বার থেকে ফিরল তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছে। করিডোরের হলদে বাতিটা নির্বিকার জ্বলছে। সাব্বির তার ঘরের সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পকেটে চাবির সন্ধান করতেই মনে পড়ল, দরজায় আজ তালা নেই। ভেতরে মিথি আছে। এর আগে যখন মিথি এই বাসায় থাকতে এসেছিল তখন খুব রাত করে বাড়ি ফিরতো। সাব্বিরকে সন্ধ্যায় ফিরে প্রত্যেকদিনের মতোই দরজার আগল খুলতে হতো। ঘরে আলো দিতে হতো। তাই মিথির আগমনে ‘আগমন’ ব্যতিত তেমন কোনো পরিবর্তন অনুভব করেনি। আজ প্রথমবার দরজার ওপাশে ছিটকানি টেনেছে কেউ। সাব্বির কলিংবেল বাজাল। দু'বারের মাথায় ব্যস্ত হয়ে দরজা খুলে দিলো মিথি৷ একটা সাদা-গোলাপি আটপৌরে শাড়ি তার পরনে। শাড়ি পরায় খুব একটা যত্নের ছাপ নেই। যেন খুব আনাদরে জড়িয়ে আছে মিথির শরীর৷ চুলগুলো কোনোরকম খোঁপায় বাঁধা। একটা অভ্যস্ত ক্লান্তি তার চোখে। এই ঘর, এই দরজা, এই মিথি আর এই সন্ধ্যা মিলে যে অতি সাধারণ, অতি পরিচিত দৃশ্যপটের সৃষ্টি হয়েছে তাতে সাব্বিরের নিজেকেই ভারি আগন্তুক মনে হলো। যেন কোনো খেয়ালি কবির সাজানো কল্পনায় বিচ্ছিন্ন এক চরিত্র হয়ে উপস্থিত হয়েছে সে। তার এখানে আসার কথা ছিল না। তার যাওয়ার কথা ছিলো কোন এক ধানসিঁড়ির পাড়ে, একলা এক কবিতা হয়ে। মিথি তাকে কলের পুতুলের মতোন নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘ আমার জন্য পেয়ারা মাখা আনতে পারবেন, সাব্বির?’
‘পেয়ারা মাখা?’ একটু অবাক হলো সাব্বির। অপ্রত্যাশিত এই প্রসঙ্গে কিছুটা বিভ্রান্তি নিয়ে সে তাকিয়ে রইল মিথির মুখের দিকে। মিথি বলল,
‘ আপনার ঘরের জানালা দিয়ে তাকালে একটা পেয়ারা গাছ চোখে পড়ে। ওটা দেখার পর থেকেই হঠাৎ পেয়ারা মাখা খেতে ইচ্ছে করছে। একটু দেখুন তো কোথায় পাওয়া যায়?’
আদেশ নয়, অনুরোধ নয় অধিকার। সাব্বির কিছুক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে ব্যাগ হাতেই ফেরার পথ ধরল। মিথি বলল,
‘ ব্যাগটা রেখে যান। দেখি, আমাকে দিন।’
সাব্বির কলের পুতুলের মতোন ব্যাগটা মিথির হাতে দিয়ে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। পথে নেমে সে বুঝতে পারল না ঠিক কোথায় পেয়ারা মাখা পাওয়া যায়। সাব্বির কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াল। কলাবাগানের ফলের দোকানগুলোতে পেয়ারা পাওয়া গেলেও পেয়ারা মাখার সন্ধান পাওয়া গেল না। সাব্বির সেখান থেকে এক কেজি পেয়ারা কিনে ফের পেয়ারা মাখার সন্ধানে ছুটল।
প্রায় ঘন্টা দুই ঘুরে রাত্রির দশটার দিকে বাসায় ফিরল সাব্বির। তার হাতে তখন নানান জাতের পেয়ারার ব্যাগ। মিথি দরজা খুলে তার হাতের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জানতে চাইল,
‘ এসব কী?’
সাব্বির ভেতরে ঢুকে ব্যাগগুলো খাবার টেবিলের উপর রেখে বলল,
‘ পেয়ারা।’
‘ আমি আপনাকে পেয়ারা মাখা আনতে বলেছি। পেয়ারা তো আনতে বলিনি, সাব্বির।’
সাব্বির ইতস্তত করে বলল,
‘ পেয়ারা মাখাও এনেছি। আপনার যদি শুধু পেয়ারা খেতে ইচ্ছে করে এজন্য পেয়ারাও এনেছি।’
‘ তাই বলে এতোগুলো?’
সাব্বির লজ্জাবনত হয়ে বলল,
‘ এখানে কয়েক ধরনের পেয়ারা আছে। এখন তো অফ-সিজন কাজি পেয়ারা ছাড়া অন্য কোনো পেয়ারা তেমন পাওয়া যায় না। ওগুলো কেনার পর রাস্তার পাশে এক চাচাকে দেশি পেয়ারা নিয়ে বসে থাকতে দেখে এক কেজি দেশি পেয়ারা কিনেছি। আরেক জায়গায় রাঙা পেয়ারা পেলাম৷ যদিও থাই। আপনার কোনটা খেতে ভালো লাগবে বুঝতে পারছিলাম না।’
মিথি সাব্বিরের দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থেকে নীরবে ব্যাগগুলো খুলে দেখতে লাগল। তার এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে কোনোদিন সে কারো কাছে কোনো আবদার রাখেনি। কেউ বোকা বোকা মনে তার আরামের কথাও ভাবেনি। ভাবেনি বলে মিথির অবশ্য কোনো আফসোস নেই। এসব আবেগী নাটক তার পছন্দও না। কিন্তু সাব্বিরের ভাবনাটুকু তার ভালো লাগল। চারটা আলাদা আলাদা ব্যাগভর্তি পেয়ারা। মিথি একটি ব্যাগে উঁকি দিতেই সাব্বির বলল,
‘ এগুলো বউ পেয়ারা। বেশ মিষ্টি। আপনি ট্রাই করে দেখতে পারেন।’
মিথি ব্যাগ থেকে মুখ তুলে সাব্বিরের দিকে তাকাল। বলল,
‘ বউ পেয়ারা! বর পেয়ারা নেই?’
সাব্বির সরল গলায় বলল,
‘ জানি না তো!’
মিথি বলল,
‘ মনে হয় আছে। কালকে খোঁজ নিবেন তো। বর পেয়ারা খেতে কেমন হয় টেস্ট করে দেখতে হবে। মিষ্টিই হওয়ার কথা।’
তারপর সাব্বিরকে একবার পরখ করে নিয়ে বলল,
‘আপনাকে দেখে তো মিষ্টিই মনে হয়।’
সাব্বির এতোক্ষণে মিথির দুষ্টুমি ধরতে পারল। ফ্যাকাশে, অসহায় মুখে সে তাকিয়ে রইল মিথির দিকে। মিথি বরাবরের মতোন নির্লিপ্ত। যাবতীয় ভয়ংকর কথাবার্তা সে বলে বিকারশূন্য চেহারায়। মিথি সাব্বিরকে পাণ্ডুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
‘ এমন পাথরের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? যান, ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি।’
সাব্বির নিরাসক্ত বদনে ফ্রেশ হতে গেল। শোবার ঘরে ঢুকেই সে দ্বিতীয়বারের মতোন থমকাল। চারদিকে ম ম করছে রমণীয় সুবাস। ওয়াশরুমে সাব্বিরের তোয়ালের পাশে ঝুলছে আরেকটি তোয়ালে। যেখান থেকে ভুরভুর করে বেরুচ্ছে রমণীয় খুশবু। বাথরুম র্যাকে আরও নানান রমণীয় জিনিস। এগুলো সাব্বির তার জীবদ্দশায় কোনোদিন দেখেনি। শাওয়ার ক্যাডিতে এখন পর্যন্ত একটিই সাবান, যে সাবান সাব্বির প্রতিদিন মাখে। অথচ গোসল করতে গিয়ে বডি স্ক্রাবার হাতে নিয়েই সাব্বিরের মনে হলো ওখান থেকে ভেসে আসছে একদম অন্যরকম সুবাস। সম্ভবত মিথি মিথি সুবাস। এই একই স্ক্রাবার মিথি ব্যবহার করেছে এখন তার পালা ভাবতেই অস্বস্তিতে কান লাল হয়ে গেল সাব্বিরের। এই ঘরটা আর তার নেই। নিজের ঘরেই সে পুরোদস্তুর আগন্তুক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে গোসল শেষ করে বেরিয়ে এলো সাব্বির। রাতের খাবার শেষে ঘরে এসে দেখল, জানালার কাছের টেবিলে চেয়ার টেনে বসে অফিসিয়াল কাজ করছে মিথি। তার সামনে এক গাদা কাগজ। দুই ভ্রুয়ে গভীর ভাঁজ ফেলে অখণ্ড মনোযোগে সেগুলোই পড়ছে মিথি। সাব্বিরের উপস্থিতি বুঝতে পেরেও সেই মনোযোগে কোনো হেরফের হলো না। এতোদিনের পরিচিতিতে সাব্বির বুঝেছে, মিথি প্রচন্ড কর্মঠ। কাজের বেলা কোনোরকম ফাঁকি সে পছন্দ করে না।
সাব্বির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানার একপাশে বসল। গতকাল রাতেও সে আর মিথি একই কামরায় থেকেছে। সাব্বির একবার ভেবেছিল পাশের ঘরে চলে যাবে কিন্তু পাছে এই ব্যাপারে মিথি অপমানবোধ করে তাই মধ্যরাতে শেষমেশ এই ঘরেই ঘুমাতে এসেছে। ঘরে এসে মিথিকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়ে বাকি রাতটা সাব্বিরের খুব নির্ভার কেটেছে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। আজ মিথি জেগে আছে। সাব্বির একই সঙ্গে স্নায়ুবিক উত্তেজনা ও অপ্রস্তুত বোধ করলো। মিথিকে না ঘেঁটে নীরবে ঘুমিয়ে পড়বে বলে পরিকল্পনা করল। সাব্বিরের এই মানসিক টানাপোড়নের মাঝেই কথা বলল মিথি। ঘরের পরিবেশটাকে হালকা করে কাগজে চোখ রেখেই বলল,
‘ ঘরের আলো জ্বালানো থাকলে কি আপনার ঘুমের সমস্যা হবে সাব্বির? আমি মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করব।’
শেষ কথাটা বলে মাথা তুলে তাকাল মিথি। সাব্বির একবার ভাবল বলবে, তাহলে বরং আমি পাশের রুমে গিয়ে ঘুমাই মিথি। কিন্তু পরমুহূর্তেই কী ভেবে বলল,
‘ সমস্যা নেই। আপনি কাজ করুন, মিথি।’
মিথি নির্মল হেসে বলল,
‘ থেংকিউ। ঘুমিয়ে পড়ুন।’
মিথির হাসিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সাব্বির। অবচেতন মনে অনেক কিছু ভেবে ফেলায় কিছুটা লজ্জিতও হলো। শরীরের ক্লান্তি সেই লজ্জাকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারল না। গতকালের জ্বরের ধকল না কাটায় অচিরেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে।
ঘড়ির কাটা গভীর রাতের বার্তা দিচ্ছে। আকাশে এক ফালি চাঁদ কী এক কৌতুকে ঠোঁটজুড়ে বক্রহাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে ঘুমন্ত পৃথিবীর দিকে। মিথি তখনও পড়ছে। নতুন একটা প্যাকেজ নাটকের জন্য গল্প খুঁজতে হচ্ছে। হৃদয় নানান লেখকদের থেকে গল্প সংগ্রহ করে বিশাল এক ফাইল তৈরি করেছে। এর মধ্যে কোন গল্পটি নিয়ে কাজ করা যায় সেই সিদ্ধান্তটা দিবে মিথি। মিথি মূলত থ্রিলার জনরার কিছু খুঁজছে। থ্রিল তবে ভিন্নরকম কিছু। গড়পড়তা গল্প তার পছন্দ নয়। বেশিরভাগ লেখাই তাকে টানছে না। প্রাণহীন, একঘেঁয়ে গল্প। মিথি তারপরও পড়ে চলল। ফাইলে মৌনির দুই একটা লেখাও চোখে পড়েছে। মৌনি অস্থিরচিত্তের হলেও তার লেখার হাত ভালো। বেশ উপভোগ্য। কিন্তু সমস্যা হলো, মৌনি থ্রিলার লিখে না। তার সকল লেখাই মনস্তাত্ত্বিক, ব্যাঙ্গরসাত্মক অথবা রোমান্স ঘেঁষা। মধ্যরাত পর্যন্ত টানা কাজ করে হাঁপিয়ে উঠল মিথি। ফাইল থেকে মুখ তুলে খোলা জানালা দিয়ে অন্যমনস্ক চোখে তাকিয়ে রইল বাইরের অন্ধকারে। বেশ কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে কাজে ফেরার আগে একবার আনমনে ঘুমন্ত সাব্বিরের দিকে তাকাল। তারপর তাকিয়ে রইল অনেকটাক্ষণ। ঘুমন্ত অবস্থায় আরও সরল আরও নির্ভার দেখাচ্ছে সাব্বিরের মুখ। হাতের কাজ ফেলে রেখে আরাম করা মিথির স্বভাবে নেই তারপরও সাব্বিরকে এমন নির্ভার হয়ে ঘুমাতে দেখে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই ঘুমেই যেন পৃথিবীর যাবতীয় সুখ। মিথি কিছুক্ষণ সাব্বিরের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে সত্যি সত্যিই কাজ ছেড়ে উঠে গেল। ঘরের আলো নিভিয়ে অল্প আলো জ্বেলে দিয়ে বালিশে মাথা রাখতেই আবার তার চোখ গেল সাব্বিরের কোমল মুখে। আলো-আঁধারির খেলায় তার শ্যামলা দোহারা চেহারা কী যে মিষ্টি দেখাচ্ছে! মিথি কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকে একটা হাত রাখল তার রুক্ষ চোয়ালে। খসখসে রোমরাজি মিথির কোমল তালুর সঙ্গে এক উন্মাদ, বৈপরীত্যের খেলায় নামতেই নিজের মনে হাসল মিথি৷ আরেকটু এগিয়ে গিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকাল সাব্বিরের কালচে শৈল্পিক ঠোঁটে। নিজের খুব কাছে কোনো উষ্ণ দেহের উপস্থিতি টের পেয়েই কিনা কে জানে গাঢ় ঘুমে কিঞ্চিৎ ব্যাঘাত ঘটল সাব্বিরের। ঘুমের ঘোরেই সে চোখ মেলে তাকাল। চোখের সামনে একটা আবছা নারী অবয়ব দেখল ঠিক কিন্তু কী হচ্ছে বুঝে উঠতে পারল না। মিথি সাব্বিরকে চোখ মেলে চাইতে দেখেই মুখটা আরেকটু এগিয়ে নিয়ে তার ঠোঁটে হালকা একটা চুমু খেল। সাব্বির ঘুমের ঘোরেই মাথাটা সামান্য পিছিয়ে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বুকের কাছে শুয়ে থাকা নারীটির দিকে তাকাল। মিথি মৃদু গলায় ডাকল,
‘ সাব্বির?’
সাব্বির এবার নারীটিকে চিনতে পেরে বলল,
‘ মিথি!’
মিথি আরেকটু ঘনিষ্ঠ হয়ে এসে তার জামার কলার ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
‘ আমি এখন আপনাকে একটা চুমু খাব। আপনি আমাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।’
সাব্বির মিথিকে সরিয়ে দেওয়ার কোনোরূপ চেষ্টা করলো না। মিথির সতর্কবার্তার কারণে নয়; এই মধ্যরাতের আলো-আঁধারিতে মিথির পাখির মতোন নরম শরীর নিজের শরীরে পেতে তার সম্ভবত ভালো লাগছিল৷ মিথি সাব্বিরের কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে এগিয়ে গিয়ে গাঢ় করে চুমু খেল তার ওষ্ঠপুটে। সেই উষ্ণ, ভেজা চুম্বন সাদরে গ্রহণ করলো সাব্বির। অনুভব করলো, প্রবল এক পুরুষোচিত চাহিদায় ক্রমেই তার মস্তিষ্ক উষ্ণ হয়ে উঠছে। নির্বিকার পড়ে থাকা হাতদুটো চঞ্চল হয়ে অজান্তেই চেপে ধরেছে মিথির সরু কটিদেশ। প্রবল আকর্ষণে তাকে মিশিয়ে নিয়েছে নিজের প্রস্তর কঠিন বুকে। যুদ্ধটা মিথির পক্ষ থেকে আরম্ভ হলেও কী এক অভিনব উপায়ে ক্রমশ সেই যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠল সাব্বির। আনকোরা চুম্বনের আবেশে চূর্ণ মিথি সাব্বিরের এই অচেনা রূপে অভ্যস্ত হওয়ার আগেই আচমকা থেমে গেল সাব্বির। কালবৈশাখী ঝড়ের মতোন হুট করে এসে, সমস্ত কিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে, নীরবে সরে যাওয়ার মতোই মিথিকে মুক্ত করে সরে যেতে চাইল সাব্বির। তার মনোভাব বুঝতে পেরেই হাতের মুঠোয় থাকা জামার কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল মিথি। নিজের দিকে আকর্ষণ করে বলল,
‘ কোথায় যাচ্ছেন?’
সাব্বির উত্তর দিলো না। দৃষ্টি ফিরিয়ে মিথির দিকে তাকালও না। তার হঠাৎ করেই দমবন্ধ লাগছে। মিথির বাহুডোরে মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে অদ্ভুত এক জ্বালা হচ্ছে। সাব্বির অস্থির হয়ে এই বাহুবন্ধন থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। মিথি তাকে না ছেড়ে নিজের দিকে আকর্ষণ করে বলল,
‘ আমার দিকে তাকান সাব্বির।’
সাব্বির না তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
‘ আমাকে ছাড়ুন মিথি। প্লিজ। আমার সাফোকেশন হচ্ছে।’
মিথি তাকে না ছেড়ে জোরপূর্বক তার মুখটা ঘুরিয়ে নিলো নিজের দিকে। তখন প্রবল অস্থিরতায় কুলকুল করে ঘামছে সাব্বির। মিথি তার ঘর্মাক্ত চেহারাটা দুই হাতের মধ্যে নিয়ে মাদক কণ্ঠে বলল,
‘ আমাকে দেখুন।’
সাব্বির না চাইতেও দেখল৷ একটু আগে তার চালানো তান্ডবেই এলোমেলো হয়ে প্রায় খসে পড়েছে মিথির শাড়ির আঁচল। গায়ের জামাটা নেমে গিয়েছে কাঁধ থেকে অনেকখানি নিচে। ভরাট বুকের কাছে একটি বোতাম নিষ্ঠুরভাবে ছিঁড়ে আরও মোহনিয়া করে তুলেছে তার রমণীয় সৌন্দর্য। আলো-আঁধারিতে মদিরার মতোন হাতছানি দিচ্ছে তার দুধ সাদা কোমল উদর। সাব্বির শুকনো ঢোক গিলল। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সৌন্দর্যে এক মুহূর্তের জন্য সে ভুলে গেল মস্তিষ্কের চাপ। তার বদলে শরীরে অনুভব করলো প্রগাঢ় এক তাড়না। কাঁপা হাতে মিথির উদাম উদরে হাত রেখে সে ফিসফিস করে বলল,
‘ আপনি এতো সুন্দর মিথি!’
সে কথার জবাব দিলো না মিথি। ধীর হাতে সাব্বিরের জামার বোতাম খুলে চুমু খেল তার প্রস্তর কঠিন বুকে।
ঘরের ভেতরের হাওয়া ভারী হয়ে উঠল ফের। সাব্বির চাপাস্বরে বলল,
‘ আমার এতো কাছে আসবেন না মিথি। আমার শরীরে ঘৃণ্য পশুর রক্ত। আমি আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফেলব।’
মিথি ততোধিক চাপা গলায় বলল,
‘ আপনি বরং আমায় কষ্টই দিন, সাব্বির।’
তারপর একটু থেমে সাব্বিরের চোখে চোখ রেখে বলল,
‘ এই মুহূর্তে আমি আর আপনি ছাড়া কোনো সত্য নেই সাব্বির। কোনো অতীত নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কোনো পাপ নেই, পুণ্য নেই। কেবল আমরা আছি, আপনি আর আমি।’
সাব্বির ওই চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে ক্রমেই ভেসে যেতে লাগল। মিথি তার মুখটা দুই হাতের তালুতে নিয়ে পরম আশ্লেষে চুমু খেয়ে বলল,
‘ আমি আপনাকে ভালোবাসি সাব্বির। সকল সত্য, পাপ, ঘৃণার ঊর্ধে গিয়ে আপনাকে ভালোবাসি। আজ আপনি আমাকে ভালোবাসুন।’
মিথির আকুল আহ্বনে দিকভ্রান্তের মতো মিথির বুকের কাছে নোঙর ফেলল সাব্বির। গ্রীষ্মের আরও কিছুদিন বাকি। অথচ কোনো এক দৈব উপায়ে এইমাত্র সাব্বিরের ঘরে যেন একটা কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেল। অপরিচিত অলিগলি, নতুন আবিষ্কারের উত্তেজনা কিছুক্ষণের জন্য তাদের ভুলিয়ে রাখল জাগতিক পৃথিবী। তারপর হঠাৎ করেই সব যেন বদলে গেল। দৈহিক তৃপ্তির খুব কাছাকাছি এসে আকস্মাৎ কী যেন হয়ে গেল সাব্বিরের। চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল মিথি। তার বদলে সে দেখতে পেল একটি কিশোরী। জীর্ণশীর্ণ শরীর। ব্যথা আর যন্ত্রণায় ছটফট করছে তার সমস্ত দেহ। সাব্বির চমকে নেমে গেল বিছানা থেকে। বিধ্বস্ত কিশোরীটি এবার চোখ তুলে সাব্বিরের দিকে তাকাল। তার চোখে একইসঙ্গে তীব্র ঘৃণা, ভয়, অসহায়ত্ব। সাব্বিরের শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। কোথায় দরজা, কোথায় আলো কিচ্ছু বোধগম্য হলো না। সে অন্ধের মতো ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। পেছনে ফেলে গেল হতভম্ব মিথিকে।
আকাশে এক ফালি ম্রিয়মান চাঁদ। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে লু হাওয়া বইছে। প্রচন্ড গরম। এমন গরমকে সম্ভবত কাঁঠালপাকা গরম বলে। কাঁঠালপাকা গরমের ব্যাপারটা সুহানা জেনেছে বই পড়ে। সুহানা বাংলায় খুব একটা ভালো নয়। হাই স্কুল শেষ করার আগেই মায়ের সঙ্গে লন্ডনে পাড়ি জমাতে হয়েছে। তারপর আর সেভাবে বাংলা চর্চা করা হয়নি। আজকাল কাজের খাতিরে আবার বাংলা বইপত্র পড়ার চেষ্টা করছে।
সুহানা বসে আছে তাদের দো'তলা বাড়ির টেরাসে। সামনে খোলা ল্যাপটপ, নোটবুক আর বিস্তর বই। সন্ধ্যার পর পরই রাতের খাবার খেয়ে পড়াশোনায় মন দিয়েছে সে। এখন মধ্যরাত। তারপরও দু'চোখে ক্লান্তির লেশমাত্র নেই। বাবা সেদিন তাকে বলেছেন, জ্ঞান নিয়ে কখনো অহংকার করতে নেই। এই পৃথিবীর সকলেই মেধাবী। মেধা কোনো উদযাপন করার মতো ব্যাপার না। সুহানার মায়ের বক্তব্য আবার ভিন্ন। তার বাবা-মার প্রেমের বিয়ে। ক্যাডেট কলেজে থাকতে তাদের পরিচয়। কলেজের ছুটিতে তারা কৌতূহলবশতই গোপনে পরিণয় সূত্রে বাঁধা পড়েন। সেই বয়সেই তারা উত্তাল শরীরী প্রেমের মদিরায় ডুবে যান৷ কৈশোরের বেপরোয়া মেলামেশায় কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগমুহূর্তে নিজের ভেতরে সুহানার অস্তিত্ব টের পান মা। বাড়িতে বিরাট একটা দক্ষযজ্ঞ হয়ে গেলেও সন্তান রাখার ব্যাপারে সুহানার মা ছিলেন অটল। দুই বাড়ির সমঝোতায় একটা লোক দেখানো অনুষ্ঠান হয়। বাবা যদিও চেয়েছিলেন মা অন্যান্য বউদের মতোন তার বাড়িতে এসে থাকুক। কিন্তু মা শ্বশুরবাড়ি যেতে রাজি হলেন না। কলেজ শেষ করে বাবা ঢুকে গেলেন আর্মিতে, মা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে চাকরিতে ঢুকলেন। তারপর পিএইচডির জন্য উড়াল দিলেন লন্ডনে। মা ‘নারী’ কে নারী বলে আলাদা করাতে বিশ্বাসী নন। শরীরী কৌতুহলে দু'জনের সমান উপস্থিতি থাকলেও কেবল সন্তান হওয়ার কারণে নারীকে পিছিয়ে পড়তে হবে– এরকম কোনো ধ্যান ধারণায় তিনি আস্থা রাখেন না। সারাটা জীবন তাই তিনি এই আস্থার দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছেন। বাবার চাইতে বড় কিছু হওয়ার একটা সুপ্ত জেদ তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। সুহানাও সম্ভবত তার মায়ের মতোই হয়েছে। বাবাকে সে প্রচন্ড ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া স্বভাবগুলোকে পরিবর্তন করতে পারে না। বলতে দোষ নেই, নাহিদদের প্রথমে সে কিছুটা তাচ্ছিল্যই করেছে। তবে তা জ্ঞানের অহংকারে নয়। বাঙালি ছেলেদের স্বভাবচরিত্র নিয়ে একটা ভুল ব্যাখ্যা মাথায় এঁটে থাকার কারণে। বাঙালি ছেলে মাত্রই মেয়েদের সঙ্গে তেলতেলে ফ্লার্ট করে এরকম একটা ধারণা তার ছিল। এই দেশীয় ছেলেরা কাজেকর্মে একেবারেই এফোর্ট দিতে চায় না এ সত্যবচনটা তো মিথ্যে নয়। কিন্তু নাহিদদের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা ধারণাতেই ভুল প্রমাণিত হচ্ছিল বলে কিঞ্চিৎ বিরক্ত ছিল সুহানা। তাদেরকে তার চাইতে নিচুতে দেখার একটা সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা সে রেখেছিল মনে মনে। কিন্তু সেদিনের আর্টিকেলে নাহিদের নিস্পৃহ ব্যবহার সেই প্রচ্ছন্ন আকাঙ্ক্ষাকে রোখে পরিণত করেছে। নিজেকে আরও উঁচু, উৎকৃষ্ট দেখানোর তাড়নায় চঞ্চল হয়ে আছে তার মন। সেদিনের পর থেকে সুহানার পরিশ্রমের মাত্রা হয়ে গিয়েছে অমানুষিক পর্যায়ের। লাস্ট আর্টিকেলের প্রতিটি মন্তব্য সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছে। কেউ তার গবেষণার অংশ নিয়ে কোনো সমালোচনা করলে সেটা সে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নোট করেছে। কেন এই সমালোচনা, তার পেছনের কারণ, ফলাফল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছে। এছাড়া বই, জার্নাল, মনস্তত্ত্ব – সকল বিষয় নিয়ে ছক কষে কষে মাঠে নেমেছে। তার লক্ষ্য উৎকৃষ্টের শেষ সীমানা পর্যন্ত পৌঁছানো। যেখানে সুহানা হবে অপরিহার্য। যেখানে নাহিদ স্ব-ইচ্ছায় উচ্ছ্বাস নিয়ে প্রশংসা করবে তার লেখার। সেই দিনটা আসতেই হবে তার জীবনে।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ঋতির দু'চোখে গভীর ঘুম। ট্রেনের উইন্ডো শাটার দিয়ে আসা আলোচ্ছটায় সে অল্প চোখ মেলে তাকাল। সকাল ছয়টায় ট্রেন চট্টগ্রাম স্টেশনে এসে পৌঁছানোর কথা। ট্রেন কি কাছাকাছি চলে এলো তবে? আসার কথা। আপাতত তার দু'চোখের ঘুমের বাহার দেখে সেরকমই বোধ হচ্ছে। প্রত্যেকবার এরকমই হয়। সারারাত জেগে থেকে ট্রেন থেকে নামার আগমুহূর্তে দু'চোখ বুজে আসে ঘুমে। একবার তো ঘুমিয়েই গেল। তারপর কত যে কেলেংকারী হয়ে গেল! ঋতি সিট থেকে উঠে গিয়ে চোখে-মুখে পানি দিয়ে জেগে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। ট্রেন যখন চট্টগ্রাম স্টেশনে এসে থামল তখন ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজে। চারদিকে তখনও অন্ধকার। ধূসর চাদরে যেন বৃষ্টির মতো টিপটিপ করে ঝড়ছে ভোর। ঋতি ট্রেন থেকে নেমে এসে প্ল্যাটফর্মের বাঁধানো বেঞ্চিতে বসে পড়ল। ঘুমে তার শরীর অসার হয়ে আছে। হলে ফিরতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে, এখানেই যদি একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যেতো! মৌপু হলে নিশ্চিত এতোক্ষণ হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে ঘুমিয়ে যেতে। মৌপু সব পারে, ঋতি ভিতুর ডিম। ভাবতে ভাবতে ঘুমের ভারে সামনের দিকে ন্যুব্জ হয়ে পড়তেই মাথাটা টক্কর খেলো পাথরের মতোন শক্ত একটা শরীরে। ঋতি চমকে তাকাল। চোখের সামনে এক জোড়া চকচকে কালো সু চোখে পড়ল সবার প্রথম। তারপর ধীরে ধীরে উপরের দিকে তাকিয়েই বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল। ঋতিকে তাকাতে দেখেই ভদ্রলোকটি ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ কেমন আছেন?’
ঋতি থতমত খেয়ে লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটি তাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,
‘ আপনি বোধহয় একটু পাগল ধরনের। এভাবে প্ল্যাটফর্মে বসে ঘুমিয়ে যেতে আমি আজ প্রথম কাউকে দেখলাম।’
ঋতি এবারও কিছু বলল না। ভদ্রলোক আবার বললেন,
‘ আপনি বোধহয় ঘুমের আফটার শক থেকে বেরুতে পারেননি। চা খাবেন?’
ঋতি অসহায় বোধ করলো। কী সুন্দর একটা লোক! ফটফট করে কথা বলে চলেছে। মৌপু বলেছে, পুরুষদের মধ্যে সবসময় ঝামেলা থাকে। সাধারণ পুরুষদের মধ্যে অল্প, অতিশয় সুদর্শন পুরুষদের মধ্যে বড়সড় ঝামেলা। তাই সুদর্শন পুরুষদের দূর থেকে দেখে সিটি বাজানোই উত্তম। বেশি কাছে যাওয়া যাবে না। কিন্তু এখানে তো এই লোক তাকে চায়ের দাওয়াত দিয়ে বসে আছে। চেহারাটা ভারি নিষ্পাপ। দেখে মনে হয় না মনে কোনো পঙ্কিলতা আছে। কিন্তু মৌপু বলেছে, মুখ দেখে মানুষ বিচার করা যায় না। লোকটা যদি তার চায়ে কোনো ঔষধ টৌষধ মিশিয়ে দেয়? ঘুমের ঘুরে কি আর ঋতি টের পাবে সেসব? লোকটি ঋতিকে অথৈ ভাবনায় ডুবে যেতে দেখে ভ্রু উঁচাল। তাতেও যেন মুগ্ধতায় ভরে গেল ঋতির মন। এমন মনোমুগ্ধকর উপায়ে আর কে ভ্রু উঁচু করতে পারে? লোকটি বলল,
‘ দেখলেই তো হা করে তাকিয়ে থাকেন। তাকিয়ে থাকতে পারেন অথচ চা খেতে পারবেন না? আশ্চর্য!’
ঋতির বিস্ময়ভাব বাড়ল। কিছুটা অপমানিতও বোধ করলো। লোকটা তো খুবই পাজি! চেহারাটা সুন্দর বলে নাহয় ঋতি তাকিয়েছেই একটুখানি। তাই বলে মুখের উপর বলে ফেলতে আছে?
ধুলায় ধূসরিত ঢাকায় নতুন সকাল এসেছে। সূর্যটা আকাশের এক কোণায় আড়মোড়া ভাঙতেই শহুরে রাস্তায় পঙ্গপালের মতো নেমে এসেছে অফিস যাত্রীদের ভিড়। মৌনিও সেই পঙ্গপালদের একজন। তার অবশ্য অফিস নেই। কিন্তু ব্যস্ততা প্রচুর। অনেক খোঁজাখোঁজির পর ডিপার্টমেন্টের এক বন্ধু দয়াপরবশ হয়ে তার জিনিসগুলো দুটো মাস নিজের বাসায় রাখবে বলে কথা দিয়েছে। মেয়েটার বাসা জেল গেইট রোড। ফার্মগেট থেকে বেশ খানিকটা দূর। সকাল সকাল একটা সিএনজি ভাড়া করে বহু ঝাক্কি ঝামেলা পোহায়ে তাতে জিনিসপত্রগুলো বেঁধে টেধে দিয়েছে মৌনি। সেখান থেকে তাকে একবার ইউনিভার্সিটি যেতে হয়েছে। ইউনিভার্সিটির কাজ শেষ করে লোকাল বাসে উঠেছে বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সেখানে জিনিসপত্রগুলো একবার দেখে এসে সে যাবে ব্যাংকে। আগামীকাল এগারোটায় তার শ্রীমঙ্গলের টিকেট। দীর্ঘ ভ্রমণের আগে তার কিছু কেনাকাটাও আছে। অথচ হাতে সময় নেই। তার মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে রাস্তায় জ্যাম। চকবাজারের কাছে এসে আধঘন্টা ধরে থমকে আছে বাস। কিছুতেই সামনে এগুচ্ছে না৷ এতোক্ষণ গাড়ির চাপ ছিলো, এখন ব্যাপার অন্য। রাস্তার পাশে চাঁদাবাজি সংক্রান্ত কোনো ব্যাপার নিয়ে দু'পক্ষের খুব ঝামেলা হচ্ছে। বাস সামনে এগুতে পারছে না। কিছুক্ষণ পর বাস হেলেদুলে সামনে এগিয়ে গেল। দুই পক্ষের জটলাটা সরে গিয়েছে ফুটপাতের দিকে। বাসের জানালা দিয়ে তখনও উৎসুক চোখে বাইরের কলহ দেখছে উৎসাহী যাত্রীরা। মৌনিও মাথা বের করে তাকাল। একটা তরমুজের গাড়ি উল্টে পড়ে আছে ফুটপাতের কাছে। তার পাশেই একটা ছেলের মাথাকে নিচু করে ধরে তার মাথায় একের পর এক তরমুজ ভাঙা হচ্ছে। বিষয়টাতে বাকি সঙ্গীরা খুবই আমোদিত। থেকে থেকে হর্ষধ্বনি করে নিজেদের আনন্দের মাত্রা বুঝাচ্ছে। তরমুজগুলো মালিক সম্ভবত নির্যাতিত ছেলেটিই। দিনের বেশিরভাগ সময় মৌনি তার আশেপাশের ঘটনায় নির্লিপ্ত থাকে। কোনোরকম আবেগ অনুভব করে না। নির্যাতিত ছেলেটির প্রতিও তার খুব একটা সমবেদনা এলো না। কিন্তু সে চমকালো ওই ছেলেদের ভিড়ে একটা পরিচিত মুখ দেখে। বখাটে, চাঁদাবাজ, অশিক্ষিত ছেলেগুলোর একপাশে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মুখে সিগারেট ফুঁকছে নাহিদ। তাকিয়ে দেখছে এদের নিষ্ঠুরতা। বখাটে ছেলেদের একজন একটু পর পরই হাত রাখছে তার কাঁধে। নাহিদের সে বিষয়ে কোনো ভাবান্তর নেই। একজন তো তার ঠোঁটের সিগারেটটা নিয়ে দু'বার ধোঁয়া ছেড়ে ফিরিয়ে দিলো আবার। নাহিদ নিরুত্তাপ মুখে সেই সিগারেটটা ফের ঠোঁটে রাখল। খুব দক্ষতার সাথে ধোঁয়ার রিং উড়িয়ে আনমনে রাস্তার দিকে তাকাতেই তার চোখ পড়ল জানালার পাশে বসে থাকা মৌনির দিকে। মৌনির বিস্মিত চোখের অবিশ্বাস্য চাহনিতে কেমন থমকে গেল নাহিদ। খুব সন্তপর্ণে ফেলে দিলো হাতের সিগারেট। পরমুহূর্তেই আফসোস হলো, কেন অযথা নষ্ট করলো সিগারেটটা? নাহিদ যা, নাহিদ তাই। এখানে লুকোচুরির তো কিছু নেই। লুকোচুরি করেই বা লাভ কী হবে? তার চাইতে এই ভালো! ভেবেও ফের একবার বাসটির দিকে তাকাল নাহিদ। কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে থেকে খুব স্বাভাবিকভাবে মুখ ফিরিয়ে নিলো মৌনি। বাসটা নাহিদকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল তার নিজস্ব গন্তব্যে। সকালের রোদ চড়তে আরম্ভ করেছে। সেই চড়া রোদে দাঁড়িয়ে থেকে চলন্ত বাসটির দিকে অনেকটাক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল নাহিদ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………