অন্তর্নিহিত কালকূট - পর্ব ১১৯ - অনিমা কোতয়াল - ধারাবাহিক গল্প

অন্তর্নিহিত কালকূট
          বিষণ্ন চোখে হিসেবের রেজিস্ট্রার ফাইলটার দিকে তাকিয়ে আছে জয়। ফাইল কিংবা হিসেবে কোনটাতেই ওর মনোযোগ নেই। সেসব দেখতে দেখতেই অন্যমনস্ক হয়ে গেছে বহু আগে। রাণী মির্জা! এই একটা ব্যক্তিত্ব যা ওকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দেয়। বয়সে ওর সামান্য ছোট। কিন্তু প্রথমদিন থেকেই প্রচন্ড শ্রদ্ধা আর সম্মান করে এসেছে তাকে। ভীষণ গোপনে স্নেহও করেছে। যদিও তা এমনি এমনি না। 

ওদের প্রথম দেখার কথা এখনো মনে পরে জয়ের। মাঝরাত ছিল। ক্লাবের পার্টিতে একের পর এক মদের গ্লাস ফাঁকা করতে করতে নিজের ওপর থেকে সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল রাণী। লেটকে পরে রইল টেবিলের ওপর। শান মির্জার তখন সদ্য ডিভোর্স হয়েছে। ডিভোর্স নিয়ে তার মধ্যে তেমন কোন দুঃখ না থাকলেও ভীষণ বিরক্ত আর সবকিছু নিয়ে উদাসীন ছিল বটে। তখন জয় শানেরই অধীনে। শান নিজেও ড্রাঙ্ক, তাই জয়কেই বলল রাণীকে ভেতরে নিয়ে যেতে। জয় পালন করল আদেশ। 
সেই রাতে ফাঁকা রুমে নেশাগ্রস্ত রাণী গড়গড় করে জয়কে বলেছিল তার বিষাক্ত জীবনের বিষাক্ততার গল্প। জয় থম মেরে শুনছিল সবটা। মেয়েটাকে সবসময় বদরাগী, অহংকারী, নিষ্ঠুর, নির্দয়, জেদি, প্রচণ্ড স্বার্থপর হিসেবেই চিনতো। অথচ শৈশব থেকে একটু একটু করে বিষে বিষে নীল করে, একে তৈরী করা হয়েছে বিষকন্যা। সেদিন থেকেই মেয়েটার প্রতি দুর্বলতা, মায়া দুটোই তৈরী হয়েছিল মনে। শ্রদ্ধা জন্মেছিল ওর অধীনে কাজ করতে করতে। সেই মেয়েটার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ও দীর্ঘদিনের ঠান্ডা পরিকল্পনায়। তা নিয়ে বিন্দুমাত্র অনুতাপ নেই জয়ের। কিন্তু ভেতরের সেই স্নেহ, শ্রদ্ধা কী আজও মুছে গেছে? যায়নিতো। কিন্তু জয় কিছুতেই ভুলতে পারেনা মীরার সেই আর্তনাদ, চিৎকার, বেঁচে থাকার আকুতি। ভুলতে পারেনা সেই জঘন্য রাতকে, সেই যন্ত্রণাকে। নিজের একমাত্র ভালোবাসা হারিয়ে ফেলার হাহাকারকে। ভুলতে পারেনা সে ঘটনার জন্যে রাণীই দায়ী। কিন্তু একটা বিষয় আজও মনে খচখচ করে পীড়া দেয় জয়কে। রাণী জীবনের সেই অন্ধকার অধ্যায়টা ও জানায়নি রুদ্রকে। প্রতিশোধপরায়ণাতায় ইচ্ছে করেই জানায়নি। নিজ মায়ের হ*ত্যার কথাতো জানিয়েছে, হ*ত্যার কারণ জানায়নি। জানায়নি, রুদ্রর সন্তানকে মা*রার পেছনে রাণীর হাত থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সবচেয়ে বেশি যদি কেউ সেই সন্তানের কামনা করে থাকে তবে তা প্রিয়তাই করেছিল। জানায়নি, কুহুর ধ*র্ষ*ণ এবং রুদ্রকে অমনভাবে আহত করায় কী ভয়ংকর তান্ডব করেছিল রাণী মির্জা। নিজের ভাইয়ের গলা চেপে ধরে তাকে খু*ন করতে উদ্ধত হয়েছিল রাগের বসে। জানায়নি, কী ঘটেছিল রাশেদ আমেরের মৃত্যুর আগেরদিন।

' কী ভায়া? তাকিয়ে তাকিয়ে ঘুমাচ্ছো নাকি?'

উচ্ছ্বাসের হঠাৎ ডাকে ভাবনায় ছেদ ঘটল জয়ের। মাল বিক্রির টাকার হিসেব করছিল ওরা দুজন। রুদ্র ফিরলে তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে সবটাই। কাল পরশু ফিরবে সে। জয় মাথা নেড়ে বলল, ' নাহ্। ডিসট্রাক্ট হয়ে গিয়েছিলাম একটু।'

লম্বা একটা হাই তুলল উচ্ছ্বাস। আড়ামোড়া ভেঙে মাথার পেছনে দুহাত নিয়ে চেয়ারে হেলান দিল, 'লাইফ ইজ অল এবাউট ডিসট্রাকশন ব্রো। বিশেষকরে অংক করতে বসলে ডিসট্রাক্ট হওয়া মাস্ট। গণিত ক্লাস বাঙ্ক করার ফল। বাঙ্ক না করলে আবার ভিন্ন বিদপ ছিল, বুঝলে? চিকন বেতের মারাত্মক বারি পড়তো পাছায়। দুদিন অবধি বসতে গেলেই স্যারের নামে বাংলা গালি আসতো মুখে।'

জয় হাসল। উচ্ছ্বাস রেজিস্ট্রার ফাইল বন্ধ করে বলল, 'আজ বাদ দাও। বাকিটা কাল করবো। যেটুকু মাল আছে, কালকের মধ্যে ডেলিভারি হয়ে যাবেতো?'

'যাবে।'

অনুমতি পেয়ে সবটা গুছিয়ে চলে গেল জয়। আমের ফাউন্ডেশনে কেবল পরে রইল উচ্ছ্বাস আর জাফর আমের। জাফর আমের নিজের টেবিলে কাজ করছে ল্যাপটপে। সম্পূর্ণ মনোযোগ সেখানেই। উচ্ছ্বাস নিজের ফোনটা বের করে টেক্সট করল নাজিফাকে, 'খেয়েছো? না খেলে খেয়ে ঘুমিয়ে পরো। জেগে থেকোনা। অপেক্ষা করোনা। এই সপ্তাহে তোমার ডেলিভারি ডেইট। এসময় অনিয়ম ঠিকনা। সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে দেখা হবে।'

অতঃপর উঠে চলে গেল জাফরের কাছে। টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, 'হয়নি কাকা?'

মাথা তুলে স্নেহমাখা চোখে উচ্ছ্বাসের দিকে তাকাল জাফর আমের। মলিন হেসে, চোখ থেকে চশমা খুলে বলল, ' এইতো হয়ে গেছে।'

' বাকিটা কাল করো। রাত হয়েছে অনেক।'

জাফর কিছু বলল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপটা বন্ধ করল। চোখেমুখে উদাসীনতার ছাপ স্পষ্ট। উচ্ছ্বাস টেবিলের ওপর বসে বলল, 'কী নিয়ে ভাবছো এতো?'

' ভাবনার কী আর শেষ আছে? সবটাই কেমন এলোমেলো। সবকিছু ঠিক হয়েও যেন হচ্ছেনা। কেমন গুমোট লাগে আজকাল। রুদ্রটাও যে আজকাল কোথ থেকে কী করছে কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা। রাতে চোখবুজলেই এসব চিন্তা মাথা ধরিয়ে দেয়। ভাইজান থাকলে এতোটা ভার লাগতোনা বোধহয়।'

উচ্ছ্বাস টেবিল থেকে একটা কাটা আপেলের পিস মুখে পুড়ে নিয়েছে ততক্ষণে। চিবুতে চিবুতে বলল, 'তা ঠিক বলেছো। রাশেদ বাবা থাকলে যার যার হাতে কাজের ফাইল ধরিয়ে, মাথায় ব*ন্দু*ক ধরে রাখতো। কাজের চাপ নেবে নাকি বন্দুকের। সেই চিন্তা করতে করতেই কাজ শেষ। ঠেলার নাম বাবাজি আরকি।'

হেসে উচ্ছ্বাসের গায়ে একটা চাপর মারল জাফর, 'মানুষ হলিনা।'

' আমি বান্দর নাকি?'

' নাজিফার ডেলিভারী কবে? ডেট দিয়েছে?'

' ডক্টর বলেছেতো আট তারিখ। এখন দেখি। জ্যোতি আছে ওর আশেপাশে। প্যারা হবেনা। বাপ হয়ে যাব আমি, বুঝলা?'

' বিয়েটাও তাড়াতাড়ি করে ফেলিস এরপর। দেরী করিস না।'

' করব। তুমিও এইসব ঝামেলার পর কাকিদের নিয়ে আসোনা?'

জাফর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'ওরা আসবেনা।'

টেবিল থেকে লাফিয়ে নামল উচ্ছ্বাস, ' তাহলে তুমিই গিয়ে দেখো এসো ওদের।'

জাফর একটু চুপ থাকল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, ' আগে মিটুক সব।'

———

আগরতলা। ভারতে অবস্থিত ছোট একটি শহর। বড় কোন শহরের মতো চওড়া কিংবা চাকচিক্যপূর্ণ নয়। কম প্রশস্তের পিচঢালা রাস্তা, অত্যধিক গাছপালা আর বাতাসে কেমন এক কাঁচা, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। ভেতরের গলিগুলো বেশ আঁকাবাঁকা। রাস্তার পাশে পুরোনো টিনের দোকান, ছোট চায়ের স্টল। মাঝেমাঝে আধুনিক কাঁচের বিল্ডিং। স্ট্রিট লাইটগুলো কোথাও কোথাও কম আলো দেওয়ায় আলো অন্ধকারের শিহরণ বয়ে যায় সন্ধ্যা নামতেই। গাড়িঘোড়াও কমে আসে অন্ধকার নামার পরপর। শহরটা সাধারণ, শান্ত। অথচ কিছুক্ষণ এখানে কাটালেই বোঝা যায়, এই শহর আদতে শব্দ দমিয়ে রাখে। যাতে ভেতরের গতিবিধি বাইরে বের না হতে পারে।

একটা মোটামুটি সাইজের হোটেলের সামনে থামল একটা বাদামি রঙের জীপ। রাত হয়েছে বেশ। আশেপাশের সব দোকানের শাটার অর্ধেক নামানো। চারপাশে একবার ঘুরে এলো তীক্ষ্ম একজোড়া চোখ। মিনিটখানেক বসে থেকে বুঝে নিল পরিস্থিতি। অতঃপর জীপ থেকে নেমে এলো 'দ্য সোলার সিস্টেম' গ্রুপের লীডার, রুদ্র আমের। পরনে একটা কালো হুডি আর জিন্স। তাকে দেখে পাশের সিট থেকে নেমে এলো তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত চ্যালা, রঞ্জু। যদিও রঞ্জুর আসার কথা ছিলোনা। কিন্তু শেষমুহূর্তেই ওকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত জানায় রুদ্র। বোঝাই যাচ্ছিল শেষে বললেও পরিকল্পনা আগেই করা ছিল। জীবনে প্রেম ছাড়া হটকারীভাবে অন্যকিছুই করেনি রুদ্র।

দৃঢ় চলনে হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করল রুদ্র আমের। পেছনে রঞ্জু। হোটেলের নিচ তলার এক কর্ণারের দিকে এগোলো ওরা। বিশাল আকারের এক দরজা ঠেলে ভেতরে যাওয়ামাত্র কানে এসে লাগল হিন্দি আইটেম সং, সঙ্গে কাঁচের ঠোকাঠুকি আর ফিসফিস কথার শব্দ। চারপাশে অ‍্যাম্বার টোনের অল্প আলো ছড়িয়ে আছে, ব্যস্ত কাঠের টেবিল চেয়ার, দেয়ালজুড়ে নানারকম পুরোনো পেনটিং। হোটেলের বার এটা।

জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রত্যেকটা টেবিল থেকে ঘুরে এলো রুদ্রর চোখজোড়া। রঞ্জু সন্দিহান কন্ঠে বলল, 'ব্যপারগুলা বেশিই তামশা লাগতাছেনা, রুদ্র ভাই? একটা মিটিং এর লেইগ্গা এতো নাটক!'

রুদ্র জবাব দিলোনা। কাঙ্ক্ষিত টেবিলটা চোখে পড়তেই পা বাড়াল সেদিকে। এক সেকেন্ড থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে পিছু নিল রঞ্জুও। একদম শেষ কোণার একটা টেবিলে বসে আছে এক রমনী। বয়স বাইশ-তেইশ হবে। ঝলমলে একটা হাতাকাটা ফ্রক পড়ে আছে, কোমড়া চুলগুলো ছাড়া, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। দু আঙুলের মাঝে সরু সিগারেট নিয়ে নিশ্চিন্তে টানছে। একপলক মেয়েটাকে দেখে রুদ্র চেয়ারটা টেনে বসল তার মুখোমুখি। পাশের চেয়ারটাতে বসল রঞ্জু। মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এক্সকিউজ মি?'

' ইউ ওয়ার ওয়েটিং ফর আস।' গম্ভীর গলায় জবাব দিল রুদ্র।

' কেয়া?' 

মনে হল মেয়েটা হিন্দিভাষী। মুভি দেখে দেখে হালকাপাতলা হিন্দি শিখেছে রঞ্জু। নিজের সেই দক্ষতা প্রদর্শনের লোভ সামলাতে না পেরে বলল, 'আমরা বাংলাদেশ সে হ্যাঁ। আমাদের আপ ইহা ডাকতা হ্যাঁ। এইটা আমার বস হ্যাঁ, রুদ্র আমের।' 

ফিক করে হেসে ফেলল মেয়েটা। মাথা নেড়ে বলল, ' আপনি বাংলাতেই কথা বলতে পারেন। এখানে মানুষ বাংলাতেই কথা বলে। আমি বেশিরভাগ সময় বম্বে থাকি তাই হিন্দিই বেশি বলি।' তারপর রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ' আমি প্রিয়াঙ্কা।'

এতক্ষণে মাথা থেকে হুডিটা নামাল রুদ্র, ' রুদ্র। রুদ্র আমের।'

থমকে গেল প্রিয়াঙ্কার দৃষ্টি। সামনে বসে থাকা যুবকটি রীতিমতো থামিয়ে দিল ওর হৃদস্পন্দন। টেবিলে আঙ্গুল দিয়ে ট্যাপ করতে থাকা সুগঠিত, শিরা জাগা হাতে ঝুলে আছে একটা ব্রেসলেট। গলায় বহু পুরোনো একটা লকেট। কানের খানিকটা নিচে ঘাড়ের ঐ ইনফিনিট সাইনের ট্যাটু। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের কঠিন মুখের চারপাশে নতুন পুরাতন দু একটা ছোট ছোট দাগ। বিশেষ করে বাঁ চোখে পাশের কাটা দাগটা জ্বলজ্বল করছে। বেশিদিন আগ‍ের নয় বোধহয়। তীক্ষ্ণ গভীর চোখ, পুরুষালি ঘন ভ্রু। সিগারেট পোড়া. সরু, নিষ্ঠুর গোলাপি-তামাটে ঠোঁট। জীবনে পুরুষ অসংখ্য দেখেছে ও। কিন্তু এমন ভয়ংকর সুদর্শন পুরুষ কখনই দেখেনি। এই মানবকে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা কোন নারীতো দূর, পুরুষের পক্ষেও সম্ভব না। ক্রিমিনালরা কখনও এমন অলৌকিক রূপি হয় নাকি! ঢোক গিলে নিজেকে সামলাতে চাইল ও। কিন্তু পারল না। বেসামাল হয়ে উঠল ভেতরটা। নিয়ন্ত্রণ হল অনুভূতি। ফট করে নেশামাখা স্বরে বলে বসল, 'মে আই কিস ইউ ওয়ান্স, মিস্টার আমের?'

সবে এক ঢোক হুইস্কি মুখে নিয়েছিল রঞ্জু। ছিলকে বেরিয়ে এলো তা। বিস্ফোরিত চোখে তাকাল সে মেয়েটার দিকে। দেশে আশেপাশের মানুষেদের কাছ থেকে শোনা সেই শব্দ বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে, 'আস্তাগফিরুল্লাহ্।'

প্রিয়াঙ্কা বুঝলনা কথাটার মানে। রঞ্জু বোকা চোখে তাকিয়ে দেখল রুদ্র একটা সিগারেট জ্বালিয়েছে ততক্ষণে। মেয়েটার দিকে সরু দিকে তাকিয়ে থেকেই লম্বা এক টান দিল সিগারেট। চোখমুখ তার ভাবলেশহীন। 

———

হোটেল রুমের দেয়ালগুলো হালকা হলুদরঙের। জানালায় ভারী পর্দা টানা। টেবিল ল্যাম্পেয নরম আলো ছড়িয়ে আছে গোটা রুমজুড়ে। বেডশীটটা সম্পূর্ণ সাদা কিন্তু সেটা আপাতত খালি। রুমের এককোণে রাখা ছোট সোফাতেই দুকোণায় বসে আছে রুদ্র আমের আর প্রিয়াঙ্কা। বা হাঁতে ফোন নিয়ে ভ্রু কুঁচকে স্ক্রোল করছে রুদ্র। কী করছে জানা নেই। ডান হাতে আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেট ধরানো। চিকন সাদা ধোয়া উঠছে সেখান থেকে। নিস্তব্ধ রুমটাতে কেবল দূরের হর্নের শব্দ আর এয়ারকন্ডিশনারের হালকা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।

প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে রুদ্র যখন হোটেলের রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করছিল, তখন ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে ছিল রঞ্জু। দুইবছরের বেশি হল, এমনকিছু করতে দেখেনি সে তার বসকে। স্বামী হিসেবে সে লয়াল। কিন্তু আজ? যদিও কাজের জন্যে। কিন্তু তাই বলে দরজা বন্ধ করে দিতে হবে? মেয়েটা যেভাবে চুমু খাওয়ার জন্যে লাফাচ্ছিল। একারুমে পেয়ে না জানি কী করে। আপনমনেই সে বিড়বিড় করে চলেছে বারের টেবিলে বসে।

এদিকে অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পরেও রুদ্রর সাড়া না পেয়ে প্রিয়াঙ্কা সোজা হল। হাতের সিগারেট অ‍্যাশট্রেতে গুজে বলল, ' আমাদের বের হতে হবে তিনটার দিকে। এখনো অনেকটা সময় আছে কিন্তু।'

রুদ্র জবাব দিলনা। যেন শুনতেই পায়নি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সাহস জোগালো মেয়েটা। এগিয়ে গিয়ে রুদ্রর বুকের ওপর হাত রেখে প্রলুব্ধপূর্ণ স্বরে বলল, 'আ'ম অল ইওরস্।'

ফোন থেকে চোখ সরিয়ে ঠান্ডা দৃষ্টিতে হাতটা দেখল রুদ্র। অতঃপর টি-টেবিলে রাখা নিজের পি*স্ত*লের দিকে ইশারা করে বলল, 'রুমে ঢোকামাত্র বলেছিলাম এই ধরণের নষ্টামি করতে আসলে কী করব? নেহাতই প্রয়োজন তাই আ'ম ট্রলারেটিং আ স্লা*ট লাইক ইউ। আরেকবার গায়ে পড়তে আসলে শরীরে আগুন লাগিয়ে দেব।'

রুদ্র ছুড়ে ফেলল সে হাত। বিরক্ত হল মেয়েটা। এতো ভাও খাচ্ছে কেন? মানছে ভয়ংকর সুন্দর। কিন্তু ক্রিমিনালরা এতোসব বাছে নাকি? নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বলে বসল, ' এতো অনীহা কেন, রুদ্র আমের? মুড নেই কথাটা এমন পরিবেশে খাটেনা। গে? নাকি নপুংসক? নাকি আনফিট?'

ভয়ংকর রাগার কথা থাকলেও রুদ্র রাগল না। উল্টে শীতল এক হাসি খেলে গেল ওর ঠোঁটে। প্রিয়াঙ্কার দিকে তাকিয়ে বলল, ' আড়াইবছর আগে হলে সকালে সুস্থভাবে হেঁটে বাড়ি ফিরতে পারতেনা তুমি। '

থম মেরে গেল প্রিয়াঙ্কা। কথাটার মানে বুঝে ওঠা মাত্রই গাল লাল হয়ে উঠল। রুদ্র আরেকটা সিগারেট জ্বালিয়ে নিতে নিতে বলল, 'কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। যে নারী আমার শরীরের বাঁপাশে লেপটে ঘুমোয়; তার বাকিসব বাদ দাও, কেবল চোখদুটোর সৌন্দর্যের কাছে তোমাদের মতো হাজারটা নারী ফেলনা। জাস্ট নাথিং। ওর চাহনী আমাকে যতটা আকৃষ্ট করেছে, কোন নারীর ন*গ্ন শরীর আমাকে তার একাংশও আকৃষ্ট করতে পারেনি। ঐ চোখের মায়ায় আমি নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়েলাম। ওর স্পর্শের মায়া এতো ভয়ংকর ছিলোযে, ওকে ছোঁয়ার পর জগতের অন্যকোন নারীকে ছোঁয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারিনি আমি। সুতরাং শুধু ছুঁয়ে কেন, তোমার মতো মেয়ে ন্যু*ড হয়ে আমার সামনে দাঁড়ালেও, দ্যাট ওন্ট টার্ন মি অন। '

খানিকটা অপমানিত বোধ করলেও, চোখভর্তি বিস্ময় নিয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল প্রিয়াঙ্কা, 'কে সে? আপনার ওয়াইফ?'

রুদ্র মুখভর্তি ধোয়া ছেড়ে বলল, 'আনফরচুনেটলি।'

———

' তুমিতো আগরতলা গিয়েছিলে নিজের কোন কাজে বোধহয়। তাহলে? মেয়ে নিয়ে হোটেল রুমে গেলে কেন? আর মেয়েটাই বা কে?'

এতক্ষণ চুপ থাকলেও, আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না তমাল। প্রশ্নটা করেই ফেলল কথার মাঝে। ভ্রুকুটি করে তাকাল ওর দিকে তাকাল তুহিন। প্রশ্নটা প্রয়োজনীয় ছিলোনা। একটু পরে এমনিই জানা যেতো। তুহিনের চাহনী দেখে তমাল দমে গেল।

রুদ্র গম্ভীর স্বরে জবাব দিল, 'সিকিউরিটি।'

' কেমন?'

' ওদিকে আশেপাশে মাকড়সার মতো ছড়িয়ে থাকে অনেকরকম সিন্ডিকেটের আর অপনেণ্ট গ্রুপের চরেরা। ইন্টিলিজেন্স থেকেও থাকে অনেকসময়। তাদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে, ডাউটলিস্টের বাইরে থাকার জন্যে এসব করা হয়। মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করতে আসা লোক ভেবে চোখ সরিয়ে নেয়।'

তুহিন ভ্রুতে আঙ্গুল ঘষে চিন্তা করল খানিকটা। তারপর বলল, 'তুমি ওখানে তাহলে ইন্ড্রিরা লাইন এর সঙ্গে নতুন ডিল করতে গিয়েছিলে।'

' বার্মা নাইনও ছিল।'

' এতোকিছুর পরেও ওরা তোমাকে ডিল দিতো? তাও উইথ এডভান্স? কোন সুখে?'

পুনরায় তুহিনের চোখে চোখ রাখল রুদ্র। ঠোঁটে সামান্য বক্র হাসি। তুহিন ধারাল শ্বাস ফেলে বলল, 'তারমানে সফলভাবে ডিলটা নিয়ে এসেছিলে তুমি।'

রুদ্র মাথা দোলাল। তুহিন খানিকটা চুপ থাকল। কেমন বিষণ্ন লাগল ওর চোখ দুটো। ভেতরে ভেতরে যাকে নিয়ে ভাবছে, তার কথা তুলতে অস্বস্তি, দ্বিধা দুটোই হচ্ছে। কিন্তু সময় কম। তাই নিস্তব্ধতা ভেঙে সে করেই ফেলল প্রশ্নটা, 'আর প্রিয়তা?'

———

রাত তিনটে বাজে। চারপাশ স্তব্ধ, অন্ধকার। আগরতলা শহরের প্রান্তে, চা বাগানের ভেতর দিয়ে ঢুকে গেছে এক সরু পিচঢালা রাস্তা। সে রাস্তা ধরে এগিয়ে একটা বাংলোর সামনে থামল রুদ্রর ভাড়া করা জীপ। রুদ্র তাকিয়ে দেখল বাংলোটা দেখতে পরিত্যক্ত। টিনের ছাদ, ভাঙা বারান্দা। আশেপাশের গাছপালাগুলোকে যেন গিল খেয়েছে অন্ধকার।

গাড়ি থেকে নেমে আসে রুদ্র আর প্রিয়াঙ্কা। পেছন থেকে রঞ্জুও নামল। প্রিয়াঙ্কা রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ' আমার এই অবধিই আসার অনুমতি আছে। আসি তবে।'

রুদ্র তাকাল না। ভদ্রতা দেখিয়ে বিদায়ও দিলোনা। মনে মনে ভীষণ পীড়া আর অপমান অনুভব করল মেয়েটা। মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল হনহনে পায়ে। অন্য একটা গাড়ি উঠিয়ে নিয়ে গেল তাকে। রঞ্জুর স্বস্তির শ্বাস ফেলল। আপদ গেছে। রুদ্র চারপাশে তাকিয়ে দেখল কিছু চা শ্রমিক ছড়িয়ে আছে আশেপাশে। বস্তুত এরা পাহারাদার। জানে রুদ্র। সকলের চোখের সতর্কতা তাই বলে। জীবনে একবার চুখে গেলেও, চোখ দেখে শত্রু চেনার গুণ রুদ্রর নষ্ট হয়নি। এগিয়ে গিয়ে গেইটের সামনে দাঁড়াতেই দুজন পালোয়ান টাইপ লোক পথরোধ করল ওদের। তারমধ্যে একজন গম্ভীর স্বরে বলল, 'কোড?'

কোড বলে, চেকিং করিয়ে ভেতরে ঢুকল রুদ্র আমের। পেছনে রঞ্জু। ভেতরের মিটিংরুমে আলো কমিয়ে রাখা। মাঝে গোল কাঠের টেবিল। নিজের পি*স্ত*ল বের করতে করতে দৃঢ় চলনে রুদ্র এগিয়ে গেল সেদিকে। চোখ বুলিয়ে দেখল, টেবিলের একপাশে বসে আছে ইন্ড্রিরা লাইনের লীডার, অরিবিন্দ রাও। বয়স পঞ্চাশ। ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি। বোঝাই যায় ভীষণ মেপে কথা বলে সে। পেছনে একজন হিসেবরক্ষক, একজন সাব-অপারেটর। অপরপাশে বার্মা নাইনের প্রতিনিধি, থিন জও। বয়স পয়তাল্লিশের মতো। নির্বিকার চালচলন। পেছনে দুছন সাইলেন্ট গার্ড। রুদ্র এগিয়ে গেল। নিয়তমতো নিজের ব*ন্দু*ক জমা রাখল টেবিলে। এটাই নিয়ম। বাকি দুজনও তাই করেছে। অতঃপর অনুমতির তোয়াক্কা না করে বসে পড়ল চেয়ারে। রঞ্জু দাঁড়াল পেছনে। থিন বাংলা কিংবা হিন্দি কোন ভাষাই জানেনা। তাই মিটিং হল ইংরেজিতে। হালকা কুশলাদির পর। প্রথম কথা বলল থিন নিজেই, ' গত ডিল বাঝপথে ছেড়েছো। তারওপর তোমার কাছ থেকে পাওনা আদায়ের জন্যে ডেডলাইন দিতে হয়েছিল আমাদের। যদিও তা সময়ের মধ্যে শোধ করেছো। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটানোর পর, আমরা কেন তোমাকে আবার বিশ্বাস করব? কেন আবার ডিল দেব?'

রুদ্র গম্ভীর স্বরে বলল, ' ডিলটা মাঝপথে আমরা কেন ছেড়েছিলাম তা তোমরা জানো।'

অরবিন্দ বলল, ' আমরা ডিল দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছি।

রুদ্র চেয়ারে হেলান দিল। নিজের কথাগুলো মনে গুছিয়ে নিয়ে বলল, ' লাভের জন্যে। বর্তমানে যাদের কাছে তোমাদের ডিল আছে তাদের অবস্থা নিশ্চয়ই জানা? তারা সে মাল যাদের কাথে পাঠাচ্ছে তা বেশিরভাগ ডিফেক্টেড বের হচ্ছে। ক্রেতারা ক্ষেপে উঠছে, বাজার গরম। এতে কী তোমাদের রেপুটেশন খারাপ হচ্ছেনা? কোয়ালিটির ওপর প্রশ্ন উঠছেনা? সবচেয়ে বড় কথা, নেক্সট টাইম কোন বড় গ্রুপ তোমাদের সঙ্গে ডিল করতে চাইবে?'

অরবিন্দ ভ্রুকুটি করে বলল, 'তোমাকে ডিল দিলে সে সমস্যার সমাধান কীকরে হবে?'

বাঁকা হাসি খেলে গেল রুদ্রর ঠোঁটে, 'কারণ তোমাদের সেই মালগুলো ওদের আমরাই ছিনতাই করছি। শুধু তাই না, বেশ বড় অঙ্কের প্রফিটে তা বিক্রিও করছি। এবং সেই টাকা দিয়েই তোমাদের টাকা শোধ করেছি।'

চোখ বিস্ফোরিত করে তাকাল দুজনেই। এতো ভয়ংকর ধুরন্ধর! মাছের তেলেই কিনা মাছ ভেজেছে। থিন জও বলল, ' তারমানেতো বর্তমানে আর্মস মার্কেটে রাজত্ব তোমার?'

রুদ্র মাথা দোলাল, 'কাজেই এটা বোঝা কোন রকেট সাইন্স নয় যে, কাকে ডিল দিলে তোমাদের লাভ।'

অরবিন্দ রাও বলল, ' বুঝলাম। কিন্তু বিশ্বাস কীকরে করব তুমি বিশাল প্রফিটে সেই মাল বেঁচেছো?'

রুদ্র যেন জানতো এমন প্রশ্ন করা হবে। উত্তরও তৈরী ছিল। ও হাত বাড়িয়ে দিল রঞ্জুর দিকে। রঞ্জু একটা ফাইল দিল। সেই ফাইলটা এগিয়ে দিল অরবিন্দর দিকে। একে একে দেখল দুজনেই। সব রিপোর্ট, ট্রানজিকশন, ডেটা দেখে তারা মানতে বাধ্য হল রুদ্রর কথা।

থিন এবার গলা ঝেড়ে বলল, ' কত মালের ডিল করতে চাইছো তুমি?'

রুদ্র মুখস্থ বুলির মতো বলে গেল, ' অ্যাসল্ট রাইফেল ২,০০০ টা, 9mm পিস্তল ৩,৫০০, LGM গ্রেনেড ১২০টা, সাইলেন্সার ৬০০টা, গোলাবারুদ আড়াই লাখ রাউন্ড।'

অরবিন্দর হিসেবরক্ষক দ্রুত সব টুকে নিল। খানিকক্ষণের মধ্যেই হিসেব করে দিল অরবিন্দকে। সে দেখে বলল, ' এতো প্রায় একশ দশ কোটির মাল।'

রুদ্র লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, ' ইয়াহ। এন্ড তোমরা কে, কোনটা, কতটা দেবে দ্যটস্ ডিপেন্ড অন ইউ।'

' সেল করতে পারবে কত?'

' প্রায় আড়াইশ কোটি।'

কেশে উঠল থিন, ' আড়াইশ কোটি! সম্ভব?'

' সম্ভব!'

' এডভান্স কত চাইছো?'

' পঞ্চাশ কোটি।'

অরবিন্দ বলল, 'বেশি হয়ে যাচ্ছেনা?'

রুদ্র যান্ত্রিক স্বরে বলল, ' প্রফিট কামস্ থ্রু ইনভেস্টমেন্ট, মিস্টার রাও।'

' ঠিক আছে, আমরা আলোচনা করে দুপুরের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাব তোমাকে। যদি ডিল হয় তো সন্ধ্যার মধ্যে পেপার রেডি হবে। রাতে সাইন হবে। এগ্রি?'

থিন সম্মতি দিল। রুদ্র মাথা নেড়ে বলল, 'ডান!'

কথাটা বলে উঠে দাঁড়াল রুদ্র আমের। পিস্তলটা হাতে নিয়ে হোলস্টারে রাখতে রাখতেই ঘুরে গেল। কোনদিকে দৃষ্টিপাত না করে, কোন সৌহার্দ্যপূর্ণ বিদায় বা অনুমতির ধার না ধেরেই দৃঢ় কদমে বেরিয়ে গেল মিটিং রুমটা থেকে। কাঁধ সোজা রেখে রুদ্রকে অনুসরণ করে বেরিয়ে গেলো রঞ্জুও।

******

কলিংবেলের আওয়াজে কাঁচা ঘুম ভেঙে নড়ে উঠল তনুজা। ঘুমিয়েছে ঘন্টাখানেকই হলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, রাত চারটি বাজে। এমন সময় কে এলো? শান? কিন্তু শানেরতো এভাবে এখন আসার কথানা। কথাগুলো চিন্তা করতে করতে আবার বেজে উঠল কলিংবেল। সেই আওয়াজে মৃদু নড়ে উঠল ওর পাঁচ বছরের ছোট মেয়ে শায়না। মেয়ের ওপর আলতো করে হাত রেখে বাইরের দিকে একবার তাকাল তনুজা। তারপর নেমে এলো বিছানা থেকে। নিজের পি*স্ত*লটা বের করে সেফটি ক্যাচ অফ করতে করতে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। মেইন ডোরের ডোর হলে চোখ রাখতেই চোখমুখ থেকে সব চিন্তা খসে পড়ল ওর। লম্বা শ্বাস ফেলে পি*স্তলের সেফটি ক্যাচ অন করেষ দরজা খুলল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে রাণী মির্জা। একটা হালকা হলুদ রঙের ক্রপটপ আর হাইওয়েস্টের বাদামি প্যান্ট পড়া। মাঝে সিঁথি করে ছেড়ে দেওয়া চুলগুলো। সুন্দর চোখদুটোতে ভীষণ ক্লান্তি। বিদ্ধস্ত লাগছে দেখতে। তনুজা জায়গা দিতেই ভেতরে ঢুকল রাণী। গম্ভীর স্বরে বলল, 'অল ওয়েল?'

' ইয়ের ম্যাম।'

' শায়না?' 

' ঘুমোচ্ছ_'

বলতে বলতেই চোখ ডলতে ডলতে রুম থেকে বেরিয়ে এলো একটা মেয়ে, 'রাণী পিপি!'

বলতে বলতেই প্রিয়তার পেট জড়িয়ে ধরল শায়না। প্রিয়তা ভ্রুকুটি করে আলতো হাতে সরিয়ে দিয়ে বলল,' বলেছিনা আমি তোর পিপি-ফিপি নই। কল মি রাণী।'

শায়না বরাবরের মতো একগুঁয়ে হয়ে ফের বলল, 'রাণী পিপি।'

রাণী হতাশ শ্বাস ফেলল। শায়না হাত বাড়িয়ে দিল কোলে নেওয়ার জন্যে। প্রিয়তা ভ্রু কুঁচকে রাখলেও কোলে নিতেই শায়না চুমু খেল ওর গালে। প্রিয়তা প্রতিক্রিয়া করল না। কেবল কোঁচকানো ভ্রুজোড়া সোজা হল। শায়না একেরপর এক আল্লাদি কথা বলতে বলতেই ফের ঘুমিয়ে পড়ল প্রিয়তার কাঁধে। ও তনুজাকে ইশারা করতেই তনুজা শায়নাকে আবার নিয়ে শুইয়ে দিল। ফিরে আসতেই রাণী বলল, ' সে কই?'

' ঘরেই।' 

' ঘুম?'

' কীজানি? তার ঘুমেরতো ঠিক ঠিকানা নেই। একটানা কখনও ঘুমায়না। টাইমও একেকদিন একেকরকম।'

মাথা নেড়ে নির্দিষ্ট সেই ঘরের দিকে এগোলো রাণী। পেছনে তনুজা। দরজা খুলতেই দেখল, রুমের এককোণে ফ্লোরে বিছানো তোষকের ওপর দুপা ছড়িয়ে বসে আছে আটচল্লিশ বছর বয়সী এক লোক। মাথার কাঁচাপাকা চুলগুলো খানিকটা বড় হয়েছে, মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ি। পরনের পোশাক পরিস্কার, পরিচ্ছন্ন হলেও লোকটা ঠিকভাবে পরে নেই। হাতে একটা সোনার বালা। সেটা নাড়াচাড়া করতে আপনমনেই বিড়বিড় করছে।
সেদিকে অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রিয়তা। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এলো, ' বশির কাকা..'

তনুজা তাকিয়ে দেখল প্রিয়তাকে। রাণী মির্জার অমন নৃশংসতার পরেও তনুজার এই আনুগত্য অকারণ নয়, কৃতজ্ঞতার। একেতো প্রিয়তা তার ননদ। শান মির্জার প্রথম স্ত্রী তনুজা। অন্যদিকে আজ এই মেয়েটা না থাকলে তনুজার অন্ধকার জীবনটা আরও অন্ধকারে তলিয়ে যেতো। কোনদিন হয়তো শায়নাকেও জন্ম দিতে পারতোনা।

ওর স্পষ্ট মনে পড়ে তনুজা যখন জানতে পারল সে প্রেগনেন্ট। শান ছ'মাস ব্রিটেন, ছ'মাস দেশে থাকতো। সেই ছ'মাসেরই পরিণাম এটা। তখন চেয়েও কাউকে কিছু জানাতে পারছিলনা তনুজা। শান তখনও প্রভাবশালী এক এমপির মেয়ে রিমির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। যদি এখবর জানাজানি হতো শওকতসহ গোটা মির্জা পরিবার বিপদে পরে যেতো। তা হলে তনুজার পরিবার, তনুজাকেও ছাড়তো না দুই পরিবারের কোন পরিবারই। কী করবে কিচ্ছু বুঝতে পারছিলনা। নিজের বৈধ সন্তানকে নিয়েও এমন জটিলতায় তনুজার দম আটকে আসছিল। শানও কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলনা। শেষমেশ এবরশনের সিদ্ধান্ত নিতেই যাচ্ছিল ও। কিন্তু এরমধ্যেই তনুজার পরিবারে জানাননি হয়ে গেল তনুজার প্রেগনেন্সির কথা। কিন্তু এটা জানলোনা তনুজা বিবাহিত। এই সন্তান অবৈধ না। তাই এমন কেলেঙ্কারি শুনে মায়ের স্ট্রোক করে একসাইড প্যারালাইজড হয়ে গেল। বাপ তাড়িয়ে দিল ঘর থেকে। গর্ভাবস্থায় অমন পরিণতিতে মৃত্যু ছাড়া আর কোন উপায় দেখছিলনা মেয়েটা। শেষমেশ দিশেহারা শান সবটা খুলে বলে প্রিয়তাকে। প্রিয়তাই শানের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে তনুজাকে লুকিয়ে নিয়ে আসে ব্রিটেনে। সেখানে আলাদা বাড়ি ভাড়া করে দেয়। শায়নার জন্মের পর একটু স্টেবল হতেই রাণী মির্জা নিজ দায়িত্বে তৈরী করে তনুজাকে। অস্ত্র চালনা, ফাইটিং, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন সবটাই ঘটায় নিজ দায়িত্বে। নিজের পরিচয়, নিজের সন্তান নিয়ে বাঁচতে পারে শুরু রাণী মির্জার জন্যে। ততদিনে শানের সঙ্গে রিমির ডিভোর্স হয়ে যায়। কারণটা আজও ধোঁয়াশা। তনুজা কখনও জানতেও চায়নি শানের কাছে। আর না শানের কাছে ফিরে গেছে। শানের হাজারবার অধুরোধের পরেও শানের কাছে আর ফেরেনি তনুজা। যে ওর সবচেয়ে অসময়ে ওকে কাছে টানতে পারেনি, তার কাছে তখন কেন যাবে যখন সে একা চলতে শিখে গেছে? যদিও শান মাঝেমাঝেই আসে। নিজের মেয়ের সঙ্গে সময় কাটায়। তনুজার সঙ্গে সময় কাটায়। কখনও জোর করে, কখনও আবেগের তাড়নায়। তবে দুজনের মধ্যকার মানসিক দূরত্ব আজ অনেক বিশাল।
এরপর যখন দেশে ফেরে তখন এই ফ্লাটের ব্যবস্থাও করে দেয় প্রিয়তাই। তবে শর্ত ছিল একটাই, ওর এসিসটেন্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বশীরের দেখভাল করতে হবে ওকে। তনুজা মেনে নিয়েছে। ও জানেনা কে এই বশীর। শুধু জানে, জেল থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে তাকে। আর রাণীকে জিজ্ঞেস করায় একবার বলেছিল, ' আমার বাবা হওয়ার কথা ছিল তার।' ব্যস! এইটুকুই জানে ও। আর জানে, লোকটা মানসিক ভারসাম্যহীণ। প্রায় সারাদিনই মিতা বলে কাউকে ডাকতে থাকে, তার সঙ্গে কাল্পনিক কথা বলতে থাকে। আর বাকি সময় রাণীকে অভিশাপ দিতে থাকে।

প্রিয়তা ধীরপায়ে এগিয়ে গেল তোষকে বসে থাকা বশিরের দিকে। সময় নিয়ে নিজেও গিয়ে বসল তোষকের ওপর। খাট কিনে দেওয়া হয়েছিল প্রথমে। কিন্তু বশির তা ব্যবহার করেনি। উল্টে সেই খাটে আঘাত করতে করতে নিজেই ব্যথা পেয়েছে অনেকবার। তাই সরিয়ে ফেলা হয়েছে সেসব।
প্রিয়তার দিকে চোখ পড়া মাত্রই থম মেরে গেল বশির। আপনাআপনি থেমে গেল তার বিড়বিড়ানি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎই রাগে জ্বলে উঠল বশিরের চোখ। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ' তুই কেন এসছিস? কেন এসছিস তুই? এবার কাকে খাবি? আর কাকে খাবি? বল? বল কালনাগিনী।'

প্রিয়তা ক্লান্ত চোখে একপলক দেখল বশিরকে। কোনকিছুকে তোয়াক্কা না করে এগিয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে কাঁত হয়ে শুয়ে পড়ল বশিরের কোলে। ছোট্ট শিশুর মতো গুটিয়ে গেল একেবারে। ঠিক সেই পাঁচবছরের ছোট্ট প্রিয়তা যেভাবে শুতো, সেভাবেই। এতে যেন আরও তেঁতে উঠল বশির। সরিয়ে দিলোনা ঠিকই, কিন্তু রাগে চেঁচিয়ে বলল, 'সরেযা! সরেযা! আসবিনা তুই আমার কাছে। একদম আসবিনা। তোকে সহ্য হয়না আমার। তোর জন্যে মিতা নেই। মা নেই। কেউ নেই। তোর জন্যে নেই। তোর জন্যে। তুই আছিস কেন হ্যাঁ? কেন আছিস? মরে যা! তুই মরে যা। তুই মরলেই সবাই ভালো থাকবে। যাহ্ মরে যা। মরে যা।'

দীর্ঘশ্বাস ফেলল তনুজা। এমন হয়েছে আগেও। রাণী মির্জা ভীষণ বিদ্ধস্ত হলেই চলে আসে এখানে। এভাবে বশিরের কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকে চুপচাপ। বশির ঠিক এভাবেই তিরস্কার করে, অভিশাপ দেয়। কিন্তু একটা শব্দও করেনা মেয়েটা। চুপচাপ ওভাবেই শিশুর মতো শুয়ে থাকে। এইসময়টাতে বদমেজাজি এই মেয়ের মেজাজ কোথায় যায় জানেনা তনুজা।

কিন্তু আজ প্রিয়তা বলল। বশিরের কোলে মাথা রেখেই শূণ্যে তাকিয়ে থেকে বিষণ্ন গলায় বলল, ' আমি যখন পৃথিবীতে আসছিলাম, তখন কেউ চায়নি আমি জন্মাই। অনেক চেষ্টা করেছে আটকানোর। সকলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, জোর করেই জন্মেছিলাম আমি। আর আজ, সকলেই আমার মৃত্যু চায়। যারা আমার সত্যিটা জানে, তারা চায় আমি মরে যাই। ভীষণ কষ্ট পেয়ে মরে যাই। কিন্তু যে জন্মানোর সময় কারো ইচ্ছার ধার ধারেনি, সে মৃত্যুর সময় তা ধারবে কেন? সবাই চেয়েও আমার জন্মানো আটকাতে পারেনি, জন্মেছি আমি। আর যেদিন মৃত্যু আসবে, সেদিন সবাই মিলে চেয়েও তা আটকাতে পারবেনা। মরব আমি।'
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp