- হাতের ক্ষত যেভাবে সারিয়ে দিচ্ছ, সেভাবে আমাকেও সারিয়ে দাও। যেখানে তুমি আছ এখন, সেখানে শান্তি ছড়িয়ে দাও।
শব্দের রেশে চোখ বুজে ফেলেছে শাওলিন। তাকায়নি একবারও। অনুভব করতে পারছে বেপরোয়া নিঃশ্বাস। ক্ষণে ক্ষণে ছুঁয়ে যাচ্ছে কানের কাছ। বলশালী হাতের রুক্ষ থাবায় প্রচণ্ড আঁটো অনুভূত হচ্ছে কোমরের ডানপাশে। কিন্তু হাতটা সরিয়ে দেবার আকাঙ্ক্ষাটুকু কেন যেন হলো না। পৌরুষ-তপ্ত হাতের ওপর নিজের কোমল হাত বসিয়ে মৃদু গলায় বলল,
- হাতে ব্যথা আপনার। কাঁটা জায়গাটা ফুলে আছে।
এটুকুই যথেষ্ট ছিল। কানে শব্দগুলো পৌঁছুতেই সমস্ত বাঁধন ঢিলে করে দিল। যেটুকু তীব্র ভাব ধরা দিয়েছিল তা যেন নিমিষেই হাওয়া। আগের মতো কঠোরতার মুখোশে হারিয়ে গেল শোয়েব। নিজেই বসা থেকে ওঠে শাওয়ার ছেড়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। যেন তার চেহারা ও চাহনি শাওলিন না দেখতে পাক। দোনোমনা অবস্থা নিয়ে শাওলিন উচ্ছিষ্ট তুলোগুলো বিনে ফেলতে থাকে। কিন্তু আড়চোখে দেখতে থাকে মানুষটার গতিবিধি। সে নীরব হয়ে কৃত্রিম ঝর্ণায় ভিজছে। একটা হাত দেয়ালে রাখা। মাথা কিঞ্চিত ঝুঁকানো, চুল গড়িয়ে কপাল চুয়ানো পানিটা লম্বা হয়ে পড়ছে। কিছু হয়েছে অবশ্যই। ফেরার পর থেকেই চোখদুটো নিষ্প্রাণ। ওই অদ্ভুত সুন্দর তারা দুটো ওকে কিছু বুঝতে দিচ্ছে না। কী ভেবে কাঁচের কেবিনেট খুলে বডিওয়াশ, জেন্টস শ্যাম্পু, নরম লুফাহ্ বের করে নিল। বুকের ভেতর যে সংকোচের দানা কাঁটার মতো অস্বস্তি দিচ্ছিল, তা কাটিয়ে ওঠে পা বাড়াল তার কাছে। ইঙ্গিতপূর্ণ কাশি দিয়ে বলল,
- সাবান মাখানোর জন্য এদিকে ঘুরতে হবে। ঘুরবেন একটু?
চোখ খুলে দেয়াল থেকে হাত নামাল শোয়েব। ডানে তাকিয়ে ওর নিষ্পাপ মুখটায় তাকাল। সাদা স্যাটিনের শাড়ি ওর গায়ে, ছোটো হাতায় গাঢ় নীল ব্লাউজ, চুলগুলো খোঁপা থেকে মুক্ত হতে চাইছে, কোমল গলার যে পাশে ছোট্ট একখানি তিল, সেখানে কালি মেখে আছে। শোয়েব ওর কথামতো ঘুরে দাঁড়াল। শাওয়ার নবটা বন্ধ করে দিয়েছে। লুফায় সাবান মাখিয়ে ফেনা তুলে শাওলিনও চুপচাপ তার সারা গায়ে মাখিয়ে দিল। কিন্তু বিপত্তি দেখা দিল তার উচ্চতায়। এ পর্যন্ত মুখটা উঁচু করে তালগাছ সম উচ্চদেহী পুরুষটাকে দেখতে হতো ওর। এখনো যে খুব আরামে কাজ করছে তা নয়। ঘাড় ও গলায় হাত উঁচু করেই সাবান মাখাতে হচ্ছে। কিন্তু এখন আরো উঁচুতে হাত উঠাতে দুপায়ের ভরও কুলাবে না। বাধ্য হয়ে ব্যাপারটা মুখেই বলল শাওলিন,
- মাথা নোয়ানো যায়?
প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখতে পেল। মাথা নুইয়ে দিয়েছে শোয়েব। ওর উচ্চতা বরাবর নিজের ঘাড়কে নত করা তার। ব্যাপারটায় অদ্ভুত অনুভূতি টের পেল শাওলিন। কিছু না বলে এই প্রথম তার মাথাটা দুহাতে স্পর্শ করল। জানে না কেন হঠাৎ প্রশ্নটা করে ওঠে ও,
- আপনি সেদিন কোথায় ছিলেন?
চোখ বুজে উত্তর করে শোয়েব,
- কোন দিন?
- ধানমণ্ডিতে ফিরলেন না যেদিন।
হাত উঁচু করে পায়ের পাতায় ভর করে দাঁড়িয়েছিল শাওলিন। কোমরের কাছে গোঁজা আঁচল ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল নেই ওর। উঁচু হওয়ায় ব্লাউজের প্রান্ত উপরে উঠে যাচ্ছে, অনাবৃত হয়ে যাচ্ছে পেলব পেট। ক্ষণিকের জন্য চোখ খুলেছিল শোয়েব, তাতেই নিচু করা মাথায় ব্যাপারটা দেখতে পেল সে। অন্যদিকে শাওলিন চুলে আঙুল চালনা করতেই বলল,
- বিধ্বস্ত চেহারায় ফিরেছিলেন। মনে হচ্ছিল না স্বাভাবিক কাজে ---
হঠাৎ কথা আঁটকে গেল। শাওলিন কী যেন আঁচ করে মাথাটা ধীরে ধীরে নিচু করল। চোখদুটো যখন নিজের দেহে পড়ল, স্পষ্ট দেখতে পেল ওই হাতদুটো ভয়ংকর কাজ করছে। সাদা শাড়িটা একপাশে সরিয়ে পেটের ডানদিকে উন্মুক্ত করেছে। শাওলিন দ্রুত বাঁধা দিতে চাইল, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। শোয়েবের আঙুল ডেবে গেল নরম চামড়ায়, সমস্ত শরীর প্রচণ্ড শিউরে কুঁকড়ে উঠল। কানে শুনতে পেল শোয়েবের প্রশ্নবাণ,
- কীভাবে হয়েছে?
একবার নিচু চোখে তাকায় ও। ইতস্তত গলায় কিছু বলবে, তার আগেই কেউ অধৈর্য কণ্ঠে বলে উঠল,
- কীভাবে হয়েছে বলো না কেন?
এ বিষয়ে কিছু বলতে চাইছিল না। পারতপক্ষে বিষয়টা সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, যখন মায়ের আর্তমুখ ওর শিশুমনে ভয় জাগাতো। কখনো বলতে পারতো না ওই নৃশংস শব্দ কতটা লোমহর্ষক! রাতে ঘুমোতে গেলেও স্বপ্নে হানা দিতো। শোয়েব ওই মুহুর্তে এতোটাই স্তব্ধ ছিল যে, মাথা ওঠাল ওর চোখের দিকে। চুপ করে খানিক পর্যবেক্ষণ করল, ওকে দেখল, ওকে বুঝে নিল; তারপর গভীর শ্বাস ফেলে খুব হালকা গলায় বলল,
- এরকম আরো আছে?
শাওলিন স্থির চোখে মাথা ডানে-বাঁয়ে নাড়ায়। আর নেই পোড়া দাগ। শুধু এটিই। স্বস্তির চাহনি ছড়ায় নীল চোখে। মাথা নিচু করে ফরসা চামড়ায় পোড়া দাগটা ছুঁয়ে যেতে থাকে। এবার যেন চেপে থাকা আঙুল নয়, বরং নাজুক কিছুতে সাবধানে ছোঁয়া হাত। যে লোকটা দেখল, বুঝল, তারপর চুপ হয়ে গেল, সে লোকটা ওর সবটুকু নীরবতাকে চুপচাপ বুঝে নিল। শাওলিন এই প্রথম নিজ থেকে ব্যক্ত করল কিছু,
- কিছু বীভৎস দাগ। ছোটো থাকতে দাদা, আর এখন আপনি দেখছেন।
চোখ তুলে ওর দিকে তাকায় শোয়েব। কপালের ডানদিক চুয়ে শ্যাম্পুর ফেনা নামছে। ভ্রুঁর কাছে পৌঁছবে দ্রুত চোখটা বাঁচাতে হাত নামিয়ে মুছে দিল শাওলিন। কিন্তু সেসময় খেয়াল নেই শ্যাম্পু ওর হাতেই মাখা। চোখ বাঁচাতে গিয়ে চোখেই ঢুকে গেল খানিক। শোয়েব মুহূর্তেই দুচোখ খিঁচিয়ে ফেললে শাওলিন ত্রস্ত হাতে শাওয়ারটা ছেড়ে দিল। পানির ফোয়ারা থেকে বাঁচতে যখন দু পা পিছাবে, ঠিক তখনি গতি আঁটকাল শোয়েব। যে হাত ওর কোমরের একপাশ চেপে ধরেছিল, সেই হাতই বেড়িবাঁধের মতো ওকে বুকে টেনে আনলো। এক ঝর্ণার নিচে জবুথবু ভিজতে থাকা শাওলিন চোখ খুলে দেখার অবকাশ পেল না। টের পেল খোঁপাটা খুলে দেয়া হচ্ছে, সাদা শাড়িটা বাঁ কাঁধ থেকে পিনমুক্ত হয়েছে, কিছুক্ষণ পর ভেজা ফ্লোরে ঝপ করে লুটালো শাড়ির আঁচল।
—————
পাহাড়ি রাত নটা। মাঝরাতের মতো ঝিঁঝিঁ পোকার স্বর চারধার থেকে মুখর। বাতাস ছুটে আসছে সদ্য সাজানো ডাইনিং টেবিলের দিকে। পরিবেশটা হইচইয়ে পূর্ণ ছিল, কিন্তু এখন গভীর নীরবতায় ঢাকা। ডিম্বাকার টেবিলের ডানদিকে পুরুষ, বাঁদিকে সমস্ত নারী বসা। দুই চাচী সবিতা ও আরিফা, দুজনের গর্ভে দুটি করে পুত্র, যারা প্রত্যেকেই শোয়েবের বয়সে বড়ো। আহসান, শাহেদ, তৌহিদ, জাবের। শোয়েবের কাছ ঘেঁষে জাবের বসা, তার পরপর তৌহিদ, শাহেদ, শেষে আহসান। টেবিলের ও-মাথায় ছোটো চাচা খালিদ মির্জা বসে আছেন। মুখে পরাক্রম গাম্ভীর্য। কাঁচা-পাকা এক মাথা চুল ছোট করে ছাঁটা, পরনে ধূসর পাঞ্জাবী-পাজামা, চেয়ারের পাশে দুটো স্ক্র্যাচ উনার পঙ্গুত্বকে ইশারা করছে। শোয়েব সদাসর্বদার মতো টেবিলের এ মাথায় শির-উচুঁ চেয়ারে বসা। তার বাঁদিকে ফাতিমা নাজ বসতেন; কিন্তু ফাতিমা নিয়ম বদলে শাওলিনকে বসিয়েওর পাশের চেয়ারে আসন গ্রহণ করেছেন। ব্যাপারটায় মুখ কালো করলেন সবিতা। নিজের ছেলে আহসান যখন সেগুফতার সঙ্গে পাশে বসতে চাইতো, তখন ফাতিমা যে অগ্নিদৃষ্টি বর্ষণ করতেন তা জীবনেও ভুলবেন না। কত বড়ো দজ্জাল হলে একচোখে দুই নীতি! আরিফা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নতুন বধূর কর্ম দেখছিলেন। তাহিয়ার সহযোগিতায় প্রত্যেকের পানির গ্লাস ভরে দিল নিজেই। অধরা ভাত বেড়ে প্লেট এগিয়ে দিচ্ছে। সেগুফতা বাবার বাড়িতে বিয়ে খেতে ব্যস্ত। সঙ্গে জুটিয়ে নিয়ে গেছে মিথিলাকেও। সবিতা সব জানা সত্ত্বেও একটা না জানার ভঙ ধরে বললেন,
- তাহিয়া কী সেগুফতার সঙ্গে কথা বলো না?
হঠাৎ চমকে ওঠে চাচী শ্বাশুড়ির দিকে চাইল। ভদ্রমহিলা ভালো করে জানে সেগুফতা তাহিয়াকে সুনজরে দেখে না। ছোটো হয়েও সেগুফতাকে যেটুকু মর্যাদা দেয়, উলটো তাচ্ছিল্য পেয়েছে সে। তাহিয়া শান্তভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়,
- বিয়ে বাড়িতে কথা বলার সময় কোথায় চাচী? ভাবী আসুক, এখানে তো সবাই আছিই। এখানেই কথাবার্তা হবে।
ভাতের পাশে মিষ্টি কুমড়ার ভাজি তুলে নেন সবিতা। ঠোঁটে ক্রুর হাসিটা ফুটল উনার,
- জায়ে জায়ে মিল থাকতে হয় বউ। নইলে কার বিপদে কার দরজায় যেতে হয় বলা যায় না।সংসারে হাঁড়ি-পাতিল একসাথে হলে শব্দ একটু হবেই। তাই বলে খোঁজখবর নিবে না এ কেমন কথা?
সবিতার কথায় বিরক্ত হলো পুরুষরা। আহসান মায়ের দিকে তাকালে কী ভেবে ছোটো ভাইয়ের দিকেও দৃকপাত করল। মুহুর্তেই শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা কনকনে স্রোত নামলো! শোয়েব ব্যগ্র বাঘের দৃষ্টিতে সবিতাকেই দেখছে। পরিস্থিতি বিপণ্ণ! থামানো দরকার! আহসান মিথ্যে হাসির জোয়ার তুলে শাহেদকে ধরতে চাইল। কিন্তু পারল না, দেরি হয়ে গেছে। শাহেদ প্রথম লোকমা মুখে দিয়েছে, তখনি গর্জন করা মেঘের মতো স্বর ভেসে এল,
- আমার সংসারে হাঁড়ি-পাতিল চলে না, চাচী। এখানে পাথরের বাসন। পাথর শব্দ করে না। শাণ বাড়ায়। পরেরবার মনে রাখবেন।
মুখের ওপর চপেটাঘাত পড়ল। মুহুর্তে তীব্র অপমানে স্থির হয়ে যান সবিতা। মিষ্টি কুমড়োয় মাখানো ভাত লোকমায় উঠল না। ফাতিমা তৌকির সাহেবের দিকে তাকালে ভদ্রলোক স্ত্রীর দিকে ইশারা করেন। চোখদুটো যেন বলছে,
- তোমাকে বারবার বলেছি খেপাবে না। ওর সামনে এমন কথা তুলবে না! তুমি প্রতিবার সেটাই করো! লজ্জা করে না?
সবিতা থমথমে মুখে চুপ হয়ে যান। একমাত্র এই ছেলের মুখের কাছে সবিতা বাক হারান। তার স্বামী, দেবর, শ্বাশুড়ি, এমনকি ছেলেরাও 'ফারশাদ' বলতে অজ্ঞান। যদি ওকে চটায়, তাহলে গোটা ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ধুলিসাৎ। জাবের পরিবেশটা শান্ত করতে অধরার ইঙ্গিত পেল। আপন মনে ডালের বড়ায় ভাত মেখে বলল,
- ফারশাদ, একবার তোকে দেশের বাইরে যেতে হয়। ক্যালিফর্নিয়ার দিকে যে বিজনেস ডিলার, চিনিস তুই। তোর ভক্ত। লোকটা ইদানিং লাল সুঁতা চেনাচ্ছে।
- নাম কী?
- ক্রিস্টোফার ব্রাউন।
- ব্রাউন ইন্ড্রাস্ট্রির বোর্ড অফ ট্রাস্টি?
সাদা ভাতের ওপর দু চামচ সবজি তুলছে শোয়েব। শাওলিন আড়চোখে দেখল সবজিটা চাইনিজ ভেজিটেবল। মশলা ছাড়া, আধ সেদ্ধ, হালকা গোলমরিচ ও সামান্য হার্ব দিয়ে রান্না। রান্নাটা করেছে তাহিয়া। অন্য সময় হলে রোকেয়াই করতো। শোয়েব জাবেরের কথা শুনে মুখে খাবার তুলে বলল,
- মিস্টার হ্যারিস ব্রাউনের মেয়ের জামাই। একমাত্র মেয়ে, বুঝতেই পারছিস। উত্তরাধিকার সূত্রে মেম্বারশিপ পেয়েছে। এখন হ্যারিস বুড়া মেয়ের জামাইর হাতে সাম্রাজ্য ধরিয়ে দিয়ে নাকে খড় দিয়ে ঘুমাচ্ছে। মির্জা এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে কূটনীতিক ডিলগুলোর জন্য আবার বৈঠক বসাতে চাচ্ছে। তুই শিডিউল দিচ্ছিস না, তাই আমিও ডেট ফিক্সড দিইনি।
- ক্যালিফোর্নিয়ার এজেন্ট কী বলল? তারা সমঝোতায় বসতে চায় না?
- তারা তোকে চায়। ওদের প্রত্যেকটা ডিল সাইন তোর অথরিটিতে চাইছে। জানি না ওদের মাথায় এই পোকা কে ঢুকিয়েছে, সামহাউ কেউ তো এটা বলেছে! তুই স্টেটসে না থাকলে মির্জা এন্টারপ্রাইজ নাকি অস্তিত্ব হারাবে। এখন তুই বল আহসান ভাই আর আমি কতদিক সামলাব?
যে আলোচনা কখনো খাবার টেবিলে ওঠানো পছন্দ করে না, আজ সেই পর্ব অজান্তেই উঠে গেল। শাওলিন ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে আছে। ওর চাহনি চকচকে উজ্জ্বল, যেন বুঝতে চাইছে পারিবারিক ব্যবসাটায় শোয়েবের ভূমিকা কী। শোয়েব খাওয়ার ফাঁকে ও-মাথায় বসা খালিদ চাচার দিকে তাকাল। খালিদ সাহেব ধীরেসুস্থে মুরগীর ঝোল দিয়ে ভাত মাখাচ্ছেন। কান দুটো খরগোশের মতো সজাগ, সব কথাই শুনছে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। শোয়েবের বুঝতে বাকি নেই মার্কিনী বাজারে বিখ্যাত পোকাটা কে ছেড়েছে। গভীর শ্বাস ফেলে শোয়েব খাওয়া সেরে উঠল। সবচাইতে কম সময়ে খাওয়া, কম খাবার নেয়া আরো একটি অভ্যাস। শাওলিন তখন কয়েক লোকমার বেশি শেষ করেনি, এমন সময় পাশ থেকে চেয়ার ফাঁকা হতে দেখল। কপাল কুঁচকে সবার দিকে শাওলিন তাকাচ্ছিল, কেন বেশি খাওয়ার জন্য সবাই জোর করল না, কিন্তু দেখল সবাই যার যার কাজেই মগ্ন। যেন এটা স্বাভাবিক ঘটনাই। অর্থাৎ উনার পরিবারই উনাকে ঘাঁটায় না।
—————
সদস্য বেশি বলেই এঁটো বাসন বেশি। রান্নাঘরে একে অপরকে সাহায্য করার মাঝে চমৎকার আনন্দ করছে। তাহিয়া, অধরার খুনশুঁটি, রাবেয়া রোকেয়া ফাঁকে ফাঁকে মজা নিচ্ছে, আর শাওলিন হাতে হাত লাগাচ্ছে সবকিছু গোছাতে। কেউ দূর থেকে দেখলে বলবে না এখানে নতুন বধূ আছে। যাদের আত্মিক মন আন্তরিক, তাদের কাছে যেন নিবিড় প্রশান্তি। সেই প্রশান্তির কাছেই স্বস্তি খুঁজে পেয়ে শাওলিন তাহিয়ার আর অধরাকে যেতে বলল। আজ সারাদিন ওর চেয়ে বেশি কাজ করেছে এরাই। রাবেয়ার শরীর গরম। জ্বরের আশঙ্কা থাকায় রোকেয়াকেও যেতে বলল ঘুমাতে। রাত দশটার ওপাশে। চুলার কাছটা ছোটো কাপড়ে পরিষ্কার করছে, এমন সময় কে যেন বলে উঠল,
- ওমা! তুমি নাকি? তুমি এদিকে কী করছ? ফারশাদ কোথায়?
প্রশ্নগুলো এতোটাই খাপছাড়া, ঝটিতি পেছন ফিরে তাকায় শাওলিন। রান্নাঘরের চৌকাঠে সবিতা চাচি। রান্নাঘরে উনার ভাশুর পুত্র থাকবে? এই রাতে কী কারণে? উনি ভাইদের সঙ্গে বসে কথা বলছেন, এটা তো নিচতলায় হাঁটতে গেলেই বোঝা যায়! শাওলিন আশ্চর্য হলেও শান্ত ভাবে প্রত্যুত্তর করল,
- আপনার কিছু দরকার চাচি?
প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন শোনাটা সবিতার পছন্দ না।উনি প্রশ্ন করবেন অন্যরা দেবে উত্তর। সবিতা পায়ে পায়ে ভেতরে ঢুকতেই বলল,
- দরকার তো ছিল। কিন্তু তুমি পারবে কিনা জানি না। আমার দুই বউ বাড়িতে নেই, অন্যের বউদের কাছে কিছু বলাটা কেমন হয়, কে জানে। ফারশাদ এখানে থাকলে ভালো হতো। ওর কাছে অনুমতি চেয়ে ওর বউকে একটু সাহায্য করতে বলতাম।
কথাটা প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে জিলাপি পাকালো। সোজাসুজি বললেই হয় উনি কিছু দরকারে এসেছেন। এখন কাজের কথা মুখে বলবেন কিনা ওই ব্যক্তির জন্য ভয়ে আছেন। শাওলিন বেসিনে হাত ধুঁয়ে আঁচলে হাত মুছে বলল,
- আপনি বলুন, আমি করে দিচ্ছি। কাউকে ডাকতে হবে না। এখানে অনুমতির কিছু নেই।
ভদ্রমহিলা একটা কাঠের টুল পেয়ে বসলেন। চোখদুটো যেন শান দেয়া ছুরি। চকচক করে ছেঁনে দেখছে শাওলিনকে। সবিতা হাসিমুখে বললেন,
- চা খেতে চাচ্ছিলাম মা। বানাতে পারো?
- জ্বি, আপনি খাবেন? বানিয়ে দেব?
- হ্যাঁ হ্যাঁ। দাও দাও। অনেক উপকার হবে গো। রাতে এক কাপ চা না পেলে ঘুমই হয় না আমার।
- কেমন চা খাবেন চাচী?
- কেমন চা...
দ্বিধা কণ্ঠে কথা থামান সবিতা। গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে কোন অসাধ্য চায়ের নাম বলা যায়। খানিক ভেবে চোখে বিদ্যুৎ স্ফুরণ ঘটল। মুখটাকে নিমিষের ভেতর কাতর বানিয়ে টুল থেকে উঠতেই বলল,
- না, দরকার নেই। ছেলে আমার রেগে যাবে। এমনিই আমাকে দুচোখে দেখতে পারে না। তার ওপর যদি তোমাকে খাটাই, লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে দেবে। না না, থাক গো।
শাওলিন বাঁধা দিয়ে ওঠল। বোঝাতে চাইল সে এ ব্যাপারে কিছু জানবে না। এক কাপ চা বানাতে কী এমন সময় লাগে? শাওলিন বিনীতভাবে বলল,
- চাচী, আপনি ভয় পাচ্ছেন শুধু শুধুই। আপনি বসুন। আমার চা করতে বেশিক্ষণ লাগবে না। আপনি বলুন কোন চা খাবেন। বানিয়ে দিচ্ছি।
কথা দিয়ে কথা তুললেন সবিতা। মুখে ছদ্ম গর্বের সন্তুষ্টি। যেন নতুন বউয়ের প্রতি প্রশংসার সীমা নেই। আহা! তিনি প্রগাঢ় গলায় বললেন,
- অপরাজিতা চা বানাতে পারো গো?
ফুল দিয়ে কখনো চা বানানো হয়নি। কিন্তু চায়ের প্রস্তুত প্রণালী জানে ও। ফাতিমা নাজও এই চা-টা খান। মাথাটা সম্মতিতে নাড়িয়ে বলল,
- পারব। আপনি বসুন। আজ সকালেই কিছু অপরাজিতা ফুল ফ্রিজে রাখা হয়েছে। করে দিচ্ছি পাঁচ মিনিট।
তৎক্ষণাৎ তেড়ে বেগে চ্যাঁচিয়ে ওঠেন সবিতা,
- ফ্রিজের ফুল? ফ্রিজের ওসব তো বাসি ফুল। বাসি ফুলের চায়ে কোনো স্বাদ আছে? তুমি এক কাজ করো। ফারশাদের বাড়ির পেছনে অপরাজিতা ফুলের ঝোঁপ আছে। বিরাট বড়ো! সেখান থেকে বেছে-বেছে কয়েকটা ফুল আনো।
- এখন?
- হ্যাঁ এখন। কেন? পারবে না? রাতে অবশ্য তোমাদের মতো মেয়েরা ভয়-টয় পায়। আচ্ছা থাক, আমি ---
- এখানে ভয়ের প্রসঙ্গ নয় চাচী। বাইরে যেয়ে ওটা আনতে পারব। কিন্তু ঝোঁপটা কোথায়, তা আমি জানি না। এখনো আশপাশটা ঘুরে দেখা হয়নি।
- বাইরে বের হলেই হাতের ডানদিকে তাকাবে। মাটির একটা রাস্তা দেখবে, দুপাশে সবুজ ঘাস। ওটা ধরে সোজা এক মিনিট হাঁটবে, বাঁদিকে ঝোঁপ। বড়ো বড়ো ফুল ধরে আছে দেখবে। যাও, কোনো সমস্যা হবে না। ওখানে সাপ নেই... অন্তত এখন আর থাকার কথা না।
- ঠিক আছে, চাচী। ধন্যবাদ।
বাইরে বেরোনোর আগে চুলটা খোঁপায় বেঁধে নিল। গোসলের পর হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি পরেছে ও। সুতির। পায়ে জুতা গলিয়ে ঘন অন্ধকারে বেরিয়ে গেল সে। আসার আগে একবার অধরার খোঁজ করেছিল, কিন্তু অধরা বাথরুমে। তাহিয়া দাদীর পায়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। ভদ্র মহাশয় উনার অফিস ঘরের দুয়ার দিয়ে ভাইদের সাথে আলোচনায় মগ্ন। নির্দেশ মাফিক পায়ে চলা মাটির পথ, সবুজ ঘাসের আস্তরণ পেয়ে গেল শাওলিন, কিন্তু যেটা দেখে গা ছমছম করে উঠল, তা হলো নিশিরাতের নিশ্ছিদ্র আঁধার। চোখ সয়ে না এলে হাঁটা দুষ্কর। পথ সাবধানে বাতলে নিতে হয়। মচমচ শুকনো পাতার ওপর পা ফেলে শাওলিন আরো ভেতরের দিকে যাচ্ছিল, এক মিনিটের চেয়ে তিন মিনিট অনায়াসে কেটে গেল। কিন্তু কই? অপরাজিতা ফুলের ঝোঁপ কোথায়? হাতে টর্চ আনা দরকার ছিল। কিন্তু টর্চ আনতে গেলে কৈফিয়তের ফিরিস্তি দিতে হবে। এমনিতেই মাথায় ঢুকছে না কেন খাবার-টেবিলে চাচী-স্থানীয় মহিলাকে কড়াভাবে কথাটা বলল। উনার কী মাথা খারাপ? উনি কী একা ওই কথাগুলো আলাদা করে বলতে পারতেন না? সবার সামনে অপমান করাটা? উনি তো রগচটা, বদমেজাজি, বদরাগী না! প্রায় মিনিট পাঁচেক টানা হাঁটার পর অবশেষে বুনো ঝোঁপটা দেখল। তবে বাঁদিকে নয়, ডানদিকে। পা বাড়িয়ে অন্ধকারেই ফুল তুলতে লাগল শাওলিন। কিন্তু আঁধার ঘন বলেই কিছু একটা দেখা গেল না। গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে আছে জ্বলজ্বলে চক্ষু। ফোঁস শব্দ বেরুচ্ছে চেরা জিভ দিয়ে। ওঁত পেতে আছে ছোবল দেয়ার!
—————
- তাহমিদ কেন ধরে নিয়ে গেল? ও কী সাধু সাজতে গিয়েছিল নাকি? ফুপা মিডিয়া গরম করে ফেলছে। কিন্তু মনে হচ্ছে এখানেও শক্তিশালী পক্ষ বাজিমাতটা করবে।
কথাটা ঘোষণার সুরে ব্যক্ত করছিল শাহেদ। অফিস ঘরের সুসজ্জিত ডিভানে বসে কফি হাতে ভাইদের দিকে জানাল। শোয়েব সিঙ্গেল সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসা। বাঁদিকে ছোট্ট একটি কাঠের টেবিল। তার উপর Nescafe লেখা কালো কফির মগ। কথাটা শুনে মন্তব্য করতে ভুলল না আহসান। ডিভানের ডানদিকে বসে এক চুমুক কফি খেয়ে বলল,
- দেশ এখন দুইভাগ। মানলে মান, না মানলে কিছু করার নেই। একপক্ষ সরাসরি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধি করছে। অন্যপক্ষ দেশের সার্বভৌম টেকাতে জনগণকে সচেতন করছে। অবশ্য লাত্থি-উষ্ট্রা খাচ্ছে এই অন্যপক্ষটাই। শালার বাঙালি, ভালো কথা বুঝালে বুঝবে না। যখন বাড়ির দুয়ারে আগুনটা লাগবে, তখন মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে হাহাকার করবে।
কথার মোড় রাজনৈতিক আলোচনায় ঘুরে যাওয়ায় সিঁধ কাটল জাবের। বেশ গম্ভীর সুরে ব্যাপারটা নিয়ে বলল,
- আমজণতার দোষ দিয়ে লাভ কী? ওরা তো ইতিহাস জানে না। পলাশীর প্রাঙ্গণ থেকে ঔপনিবেশিক রাজ্যত্ব শুরু হলো। সেই রাজ্যত্ব গিয়ে ঠেকল দেশভাগের পর। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকার এই উপদেশের মানচিত্রটাই দুই টুকরো করে দিয়ে গেল। হিন্দু আর মুসলিম আলাদা দুই প্রদেশ বানিয়ে গেল। অথচ আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আরো কটা রাষ্ট্রের নাম জানি না। কেউ জানো নামগুলো?
জাবেরের আলোচনা ইতিহাস-নির্ভর। দেশ আজ ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় ছিল ব্রিটিশ শোষক গোষ্ঠী, এখন প্রতিবেশী দ্বারা আগ্রাসন হামলা। প্রচণ্ড ভীতিকর এক সময় যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিরোধের ছদ্মবেশে। জাবের আবার বলে উঠল। এবার কঠোর হয়ে উঠেছে গলার স্বর,
- যে দেশের রাজনৈতিক যোদ্ধারা, সাংস্কৃতিক কর্মীরা, সমরনায়ক, আমলা, ব্যবসায়ীরা বিদেশি রাষ্ট্রের ইঙ্গিতে চলে, সেই দেশের বিপদ আসতে কতো দেরি? নিজ দেশের লোকেরাই গাদ্দার। চরম অকৃতজ্ঞ। এরা জানতেও চায় না ক্ষমতার কেন্দ্রে কী হচ্ছে।
আলোচনা এবার সংবেদনশীল দিকে যাচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করেই শোয়েব রণে যুক্ত হল। বাঁহাতের কনুই সোফার হাতলে রেখে আঙুলটা ঠোঁটের কাছে রাখা। ভাবুক ভঙ্গিতে চশমা আবৃত চোখ স্থির করে বলল,
- হায়দারাবাদের কথা উঠছে নাকি? স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র আজ নামে মাত্র শহর।
জাবের বিস্ফোরিত চোখে আশ্চর্যে হয়। ঠোঁট হাঁ করে বলতে লাগল,
- ফারশাদ, ইতিহাস পড়ছিস তুই? এই মারভেলাস ইনফোটা কীভাবে জানলি?
শোয়েব সেই ভঙ্গিতেই ধীরেসুস্থে বলল,
- গ্রেট ব্রিটেনের কাছ থেকে ফ্রিডম পেয়েছিল রাষ্ট্রটা। ১৯৪৭ সাল উইদ ভারত। বাংলাদেশের মতোই ছিল হায়দারাবাদ রাষ্ট্র। পতনের সময় আয়তন ছিল ৮২ হাজার ৬৯৮ বর্গমাইল। মেবি দিস কান্ট্রি ইজ ফলিং ফর অ্যা এনাদার হায়দারাবাদ। সো আই রিড দ্যাট হিস্টোরি।
জাবের প্রফুল্ল কণ্ঠে খুশি হয়ে বলল,
- আই কান্ট এক্সপ্লেইন হাউ হ্যাপি আই অ্যাম! ফাইনালি ইয়্যু আর অন দি রাইট ট্র্যাক ফারশাদ। ফারদিন আঙ্কেল অলওয়েজ থট এবাউট দিস, হোয়েন উই রিড হিজ পার্সোনাল ডায়েরি।
এমন সময় স্রোতের বাইরে থেকে প্রশ্ন উঠাল শাহেদ। যেন ঘুরেফিরে ফুপাতো ভাই তাহমিদের কথাই মনে পড়ছে। কীভাবে নিখোঁজ হলো? কারা ধরে নিয়ে গেল? আজ মিডিয়া পাড়া কাদের ইশারায় চুপ? প্রশ্নগুলো নিয়ে প্রচুর ভাবলেও উত্তর পায়নি শাহেদ। কফিতে ছোট্ট চুমুক দিয়ে অন্যমনষ্ক কণ্ঠে বলল,
- তাহমিদের ব্যাপারটা কেমন যেন স্বাভাবিক মনে হয় না। বাড়ির কাছ থেকে তুলে নিয়ে গেল। বিয়ের আগের দিন রাতে, তাও বাড়ির বাইরে ডাকিয়ে! এমন কাজটা কেউ কেন করতে পারে?
তৌফিক বহুক্ষণ পর নীরবতা ভাঙে,
- তাহমিদ সবসময়ই বলতো ওর প্রোমোশন দরকার। ওর ভেতরে একটা ক্ষুধা আছে। আমার যতদূর মনে হয়, তাহমিদ কোনো কেস নিয়ে চেকমেট করতে চাইছিল। কিন্তু ডাবল চেকমেট করে ওকেই সরিয়ে দিল। বাবা বলল, ফুপা উনাকে ইন্টারন্যাশনাল লিংকের জন্য হেল্প চাইছে। কিন্তু তোরা জানিস এটা অসম্ভব। একজন না চাইলে বাবা কখনো অ্যাপ্রোচ করবে না।
এই রেশ ধরে আহসান একবার সিঙ্গেল সোফাটায় চাইল। নির্বিকার মুখ শোয়েবের। চেহারায় গভীর অভিব্যক্তি নেই। একটু পরই হালকা কেশে বলল আহসান,
- তৌফিক কী তাহমিদের সাথে কথা বলতি? তোদের লাস্ট কথা কবে হয়েছিল?
তৌফিক একটু ভেবে বলল,
- ফুপা যেদিন স্ট্রোক করলেন সেদিনই। তাহমিনা ফুপু আম্মার কাছে কল করল। আমি খবরটা শুনে তাহমিদকে কল করি। তখনি শুনি, ওর কেস নিয়ে খুব লোড যাচ্ছে।
তৌফিকের কথা শেষ হতেই বাক্যের মোড় ঘুরাল শোয়েব। বারবার রিষ্টওয়াচে সময় দেখছিল সে। বুকের ভেতর চিনচিনে করছিল নাম না জানা অনুভূতি, যা তাকে স্বস্তি দিচ্ছে না একপলক। মন, ইন্দ্রিয়, মনোযোগ সমস্ত ঝুলে আছে তার প্রিয়তমার কাছে। শোয়েব গভীর শ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল,
- আগামীকাল বিশদে আলোচনা করি? আজ আমি খুব ক্লান্ত। বিজনেস স্ট্র্যাটেজি নিয়ে ভাবার পর্যাপ্ত সময় দরকার। তোমরা জেট ল্যাগে আছ নিশ্চয়ই?
চার ভাই একসঙ্গে নিজেদের ভেতর চাওয়া-চাওয়ি করল। প্রত্যেকের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠতেই দ্রুত সেটা মিলিয়ে গেল। জাবের শাহেদের দিকে ইশারা করে বোঝাচ্ছে,
- বাহানা দিচ্ছে!
শাহেদ নীচের ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে হাসি চাপলো। চোখের ইশারায় সেও বোঝাল,
- এক মিনিটে ষাট সেকেণ্ড। ষাট সেকেণ্ডে একশো বিশবার ঘড়ি দেখল। তর সইছে না মনুর।
নানী বাড়ির আঞ্চলিক ভাষাটা ইঙ্গিতে বলল শাহেদ। দুই ভাইয়ের ইতরামি দেখে পিঠের পেছনে চিমটি বসালো তৌফিক। সবাই ডিভান ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তৌফিক জাবেরের কানে হালকা ফিসফিস করে জানাল,
- হারা.মজা..দারা, তোরা যেটা ভাবছিস, ঘটনা ওটা ঘটেই নি! গলায় ওটা নখের দাগ না। ধানমণ্ডি থেকে গাজীপুর গিয়েছিল। ওখান থেকেই ওই বিউটি স্পট নিয়ে এসেছে।
তৌফিকের জবাবে ভ্রুঁ কোঁচকালো আহসান। সে সবার সামনে হাঁটছিল, বাকিরা একসারিতে পেছনে। হঠাৎ পা থামিয়ে কৌতুহল চোখে শুধাল,
- কী নিয়ে আলোচনা করছিস?
জাবের ভালো মানুষের মতো মুখ করে বলল,
- যে বয়সে বউয়ের আঁচড় খাবে, সে বয়সে ছুরির ধার খেয়ে আসছে। লজ্জায় মাথা তুলতে পারি না। এসব নিয়েই টুকটাক কথা চলছে ভাই।
আহসান কোনো কথা বলল না। পাথর কঠিন মুখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল সে। জাবেরের দিকে ঠাণ্ডা গলায় বলতে যাচ্ছিল ' কারো হানিমুন সাজাতে আসিস নি জাবের। এখানে কার্যোদ্ধার করতে এসেছিস। কাজটাই কর!', কিন্তু কথাগুলো উচ্চারণ হলো না তার। অফিস ঘর দিয়ে বেরোচ্ছিল শোয়েব, তাকে দেখেই কথা থামিয়ে ঘরমুখো হাঁটা দিল। শোয়েব ব্ল্যাক ট্রাউজারের পকেটে সেলফোনটা ঢোকাচ্ছিল, গায়ে নেভি ব্লু টিশার্ট। হঠাৎ রান্নাঘরের দিকে চোখ যেতেই থমকে গেল পা। রিষ্টওয়াচে আবার তাকাল। দশটা বিশ। কী ব্যাপার? এখনো রান্নাঘরে কেন? উপরে যায়নি? পায়ে পায়ে দ্রুত রান্নাঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়াল শোয়েব। ভেতরে কেউ নেই। চুলায় টগবগ করে পানি ফুটছে। আলো জ্বালানো এখানে। একবার গলা ছেড়ে ডাকল ওকে,
- শাওলিন? আছ!
সাড়াশব্দ নেই। নিশ্চিত এখানে একটু আগেও ছিল। চুলার আঁচটা কমিয়ে দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোল। পকেটে ফোন বাজছে। ভাইব্রেশনের কম্পনটা টের পেতেই পকেটে হাত গলিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল। একহাতে রিসিভে টিপে কানে ধরল শোয়েব; ওভাবেই কথা বলতে বলতে অস্থির চোখে খুঁজছিল ওকে।
- হ্যালো। ডি. এফ. ও. শোয়েব ফারশাদ।
- ........ .
- জ্বি। খাগড়াছড়ি, সিটিজি হিল ট্র্যাক্টস। . . আহ.. পুরো পরিচয়ের দরকার নেই। তোমাকে চিনেছি, গাজীপুর অন দি স্পট। ওটা আমার দায়িত্ব ছিল। কেমন আছ?
- ........ .
- বারবার ধন্যবাদ দিয়ে আমাকে ছোটো করছ। তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে এভাবেই আমার সহযোগিতা পেতে। তোমার ফ্যামিলি কেমন আছে?
কলে তখনো কথা বলছে শোয়েব, ওপ্রান্তের বুঝতেই পারবে না সে অন্য কাজেও মগ্ন। কান একদিকে, বাকি সব মনোযোগ অন্যত্র। সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলো। চর্তুদিক বৃক্ষছায়ায় আচ্ছন্ন। আঁধারের কুণ্ডলী কেমন কুয়াশার মতো পাক খেয়ে খেয়ে উঠছে। শোয়েব ঠোঁটের ডানকোণটা দাঁতে কামড়ে ধরল। কোথায় গেল ও? এই দশটার দিকে কোথায় বেরোল? রোকেয়াদের পাকাঘরের কাছ দিয়ে শোয়েব যাচ্ছিল। যেতে যেতে কানে শুনল,
- মূর্খ মানুষের কথা ইট-পাথরের মতোন। জ্ঞানী মানুষের কথা বিশাল পাহাড়। যখন তুমি পাথর দিয়া ঢিল ছুঁড়বা, নদীতে সাময়িক ঢেউ তুলতে পারবা — তার বেশি কিছু পারতা না। কিন্তু পাহাড় বসাইলে পানির দিকই খুঁইজা পাইবা না, উল্টা নদীর চেহারাই বদলাইয়া যাইব। তাই কথা যখন বলবা, জ্ঞানী মানুষের মতোন বলবা। না পারলে আজাইরা কাটাকুটি লাগায়ে নদী ঘোলা করার দরকার নাই।
কথাগুলো শুনে শোয়েব থামতে চাইল, কিন্তু তখনি দেখল অদ্ভুত এক দাগ। ছোটো পায়ের জুতার ছাপ! শোয়েব তিরিক্ষি মেজাজে ভয়ংকর চটে যায়! চোয়াল খিঁচে আসে ভয়ংকর মূর্তিতে। কলটা কেটে ত্রস্ত পায়ে ভেতরের দিকে পা চালাল। মাটির পথ ধরে সোজা চলে গেছে ঘন জঙ্গলের অস্তিত্ব। বুকের ভেতর এই প্রথম শঙ্কা ভর করল। ঢিপ ঢিপ করছে হৃৎপিণ্ড, কানে অনুভব করছে বেগতিক হাতুড়ি পেটা! শোয়েব চিৎকার করে ডাকল,
- শাওলিন! শাওলিন, কোথায় আছ! জবাব দাও! কথা বলো শাওলিন!
মেজাজি স্বরটা বিস্ফোরণের মতো ছড়াল। কানে শুনতে পেল শাওলিন। আমূল কেঁপে হাতটাই ফুল থেকে সরে গেল। ওভাবে ডাকছে কেন? রাগান্বিত গলায় চেঁচালো যেন? আঁচল ভরে অপরাজিতা ফুল তুলেছে, কিন্তু এখন আর একটা সেকেণ্ডও দাঁড়িয়ে থাকল না। অদ্ভুত কৌতুহলে জর্জরিত হয়ে শাওলিন পা বাড়াল তখুনি। ফুলভর্তি আঁচল সামলে দ্রুত এগোতেই হঠাৎ স্থির হয়ে যায় ও। সমুখেই ছয়-সাত দূরে দীর্ঘ ছায়ামূর্তি দাঁড়ানো। অস্পষ্ট হলেও বুঝেছে, মানুষটা কে। শাওলিন হিমশিম খেয়ে অপ্রতিভ সুরে বলল,
- কী ব্যাপার? এভাবে চেঁচাচ্ছেন কেন? আমি তো এদিকে ফুল---
শব্দটা মুখেই আঁটকে গেল। শাওলিনের চোখ স্থির হয়ে গেল সামনে। অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার চেহারা স্পষ্ট নয়, কিন্তু চোখ দুটো, সেই চোখ দুটো চিনতে একটুও ভুল হলো না। শোয়েব। কিন্তু এই শোয়েব, ওর চেনা শোয়েব না। নিঃশ্বাস ভারী। কাঁধ ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখ দুটো জ্বলছে অদ্ভুত এক আগুনে। রাগ? ভয়? নাকি দুটোই একসাথে? এক পা এগোতেই থেমে গেল সে। কণ্ঠটা নিচু, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা জেদ স্পষ্ট,
- এখানে কেন এসেছ তুমি?
এ যেন প্রশ্ন না, কটাক্ষ জিজ্ঞাসাবাদ। শাওলিন কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। আঁচলে ধরা ফুলগুলো ধীরে ধীরে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে, ও খেয়ালই করল না। শোয়েব এগিয়ে এলো। দ্রুত, ভারী, অদ্ভুত পায়ে।
- আমি কি বলিনি একা বাইরে বের হতে না?
কথার ভেতরে যেন চাপা গর্জন। ঠিক সেই মুহূর্তে ওদের দুজনের মাঝখানের ঝোপের ভেতর শব্দ উঠল। ফোঁসসস আওয়াজ। শব্দটা এত কাছে, এত জোরালো, হঠাৎ মাটির ওপর কুঁচকে থাকা কালো ছায়াটা নড়ে ওঠে। মাটিতে চলা সরর সরর আওয়াজ। শাওলিনের গলা থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। কালো কুচকুচে বিষধর একটি সাপ! ফণা তুলে চেরা জিভে ফুঁসছে! ঠিক তখনি শোয়েব বজ্রস্বরে ডেকে উঠল!
- রেইন্জার, ইয়া জ্দিয়েস!
Page 2
কথার ভেতরে যেন চাপা গর্জন। ঠিক সেই মুহূর্তে ওদের দুজনের মাঝে ঝোপের ভেতর থেকে শব্দ হলো। ফোঁসসস আওয়াজ। শব্দটা এত কাছে, এত জোরালো, হঠাৎ মাটির ওপর কুঁচকে থাকা ছায়াটা নড়েচড়ে ওঠে। সরর সরর স্বর। শাওলিনের গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। কালো কুচকুচে বিষধর একটি সাপ! ফণা তুলে চেরা জিভে ফুঁসছে! ঠিক তখনি শোয়েব বজ্রস্বরে ডেকে উঠল!
- রেইন্জার, ইয়া জ্দিয়েস!
নিঃশব্দে কয়েক পলক কেটে গেল। এরপরই হলো অশরীরী তাণ্ডব! ঝড়ের বেগের কিছু একটা ছুটে আসছে এদিকে। দূরের জঙ্গল থেকে তেঁড়েফুঁড়ে আসছে পাশবিক কিছু। শাওলিন দৃশ্যটা দেখেই বরফের মতো জমে গেল। শরীরের কোণে কোণে কাঁটা দিয়ে উঠল ভয়! রোমশ দেহী পশু! হিংস্র দাঁতাল জানোয়ার! চিৎকার দিতে নিচ্ছিল শাওলিন, ঠিক তখনি শোয়েব রাজস্বী স্বরে হুকুম ছুঁড়ল,
- রেঞ্জার, ডোন্ট মেক এনি ম্যাস। স্লো ডাউন মাই বয়। দেয়ার ইজ এ স্নেক, হ্যাণ্ডেল ইট।
রেঞ্জার মনিবের কথায় তৎক্ষণাৎ বোঝাল,
- অ্যাজ ইয়্যু কমাণ্ড, মাই মেজিস্টি!
এরপরই জান্তব চোখ তুলে তাকাল এই অচেনা রমণীর দিকে। যাকে সে আজই প্রথম দেখছে, এই প্রথম বাংলো অরণ্যে নারী চরণ পড়ছে। রেঞ্জার এক মুহুর্ত তাকিয়ে ফের শোয়েবের দিকে বোঝাল,
- মাই মেজিস্টি, ইনি কে? আপনি পরিচয় করাননি।
ভঙ্গি দেখে চোখ রাঙাল শোয়েব। অবোলা প্রাণী হলেও সে এই জন্তুর ভাষা বোঝে। এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে এসব প্রাণীদের কথা বোঝার। শোয়েব মেজাজ তপ্ত করে গর্জন দিল,
- এখনো জানার সময় হয়নি। এখন ওকে উদ্ধার করো! ডু দ্যাট জব ফাস্ট!
জিভ বের করে নিজের নির্বুদ্ধিতা বোঝাল জার্মান শেফার্ড। বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শরীরে নিজেকে অগ্রসর করল বিপদে। একপলক ভীতি-বিহ্বল মেয়েটির মুখে ভয় চিহ্নিত করল, এরপর নিচুস্বরে ঘেউ করে পা বাড়াল সে। শাওলিন ছোটো থেকেই কুকুর ভীতিতে আক্রান্ত। কুকুর দেখলেই দশ হাত দূরে চলে যায়। এই মুহুর্তে সেই চলন্ত ভীতিকে এগোতে দেখে ওর হৃৎপিণ্ড মোচড়ে উঠে! চকিতে চার পা পিছিয়ে কম্পিত স্বরে বলে,
- আপনি ওকে যেতে বলুন! আমি... আমি এভাবেই আসতে পারব। প্লিজ যেতে বলে দিন, নাহলে আমি এগোব না!
দৃঢ়, অটল মেয়েটাকে এভাবে কাঁপতে দেখে আশ্চর্যের সীমা থাকে না। শোয়েব ভাবেনি ওর কুকুর ভীতি আছে। রেঞ্জার তখন দু পা এগোতেই ঘাড় ঘুরিয়ে মনিবের দিকে দেখে। অবোলা জীবটাও যে এই রমণীর কথা বুঝেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শোয়েব ওকে আশ্বস্ত করতে সাপটা গতিবিধি বুঝে বলল,
- রেঞ্জার আমার পোষা। ওর দ্বারা কোনো ক্ষতি হবে না। তোমাকে উদ্ধার করবে শাওলিন, তুমি শান্ত থাকো।
- ননা,
- শাওলিন, আমার রাগ তুলবে না! এই প্রাণী ক্ষতিকর না বলেছি। ও তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। যে সাপ তুমি দেখছ, ওটা আমার পোষা না। ওটা বিষধর। রেঞ্জারকে চুপচাপ কাজ করতে দাও।
- ভাল্লুকের মতো কুকুরটা আপনার পোষা?
- ভাল্লুকের মতো কুকুরটা আমার। কোনো ক্ষতি করবে না শাওলিন। রেঞ্জার দেখতে ভয়ংকর হতে পারে। কিন্তু তোমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। প্লিজ কাম ডাউন। মেক এ মুভ।
এ কথায় কাজ হলো। বুকের ভেতরে ভয়ের পুকুর হলেও তাতে ডুব দিল না ও। নিজেকে সামলে কুকুরটাকে সহজভাবে নিতে চাইল। রেঞ্জার পরিস্থিতি বুঝেই সাপটাকে ডানপাশ দিয়ে ডিঙিয়ে শাওলিনের কাছে পৌঁছুল। মুখ তুলে শাওলিনকে যেটুকু দেখল, তাতে নিচু স্বরে কুইকুই করল পিছু আসতে। তার দেখানো পথ ধরে শাওলিন নিঃশব্দে হাঁটা দিয়েছে। শোয়েব ফোনের ফ্ল্যাশলাইট ধরিয়ে ওর আগুয়ান পথ আলোময় করে দিল। অন্যদিকে সাপটা তখনো ফণী তোলা; চেরা জিভটা ফোঁস ফোঁস করে ভেতর-বাহির করছে। একপর্যায়ে সহি সলামত ওকে পৌঁছে দিল রেঞ্জার। নিজে ফিরে গেল সেই সাপটার দিকে। যেন ওটার দ্বারা হঠাৎ আক্রমণের সুযোগ না থাকে। শাওলিন বাঁহাতের মুঠোতে শাড়ির আঁচল মুঠো করে ধরেছিল, তাতে সদ্য তোলা অপরাজিতা ফুল। হঠাৎ তীক্ষ্ম দৃষ্টিটা সোজা গিয়ে পড়ল ওই ছোট্ট পুটুলির মতো আঁচলটাতে, তৎক্ষণাৎ শোয়েব ভ্রুঁ ভঙ্গি করে খর গলায় বলল,
- কী ওখানে?
শাওলিন মুখ নামাল নিচে। আঁচল গোঁজ করা পুটুলিটা দেখে ইতস্তত সুরে বলল,
- ফুল।
- কীসের ফুল?
- অপরাজিতা ফুল।
উত্তরটা দিতেই তার ভ্রুঁ দুটো কোঁচকাতে দেখল শাওলিন। চোখে, চোয়ালে, কপালের ডানদিকে ভিন্ন এক অবস্থা ফুটে উঠতে থাকে। একবার ওর সন্দেহ হলো, ওই অভিব্যক্তিটা বোধহয় অশনি ক্রোধের ধক! কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে বোঝাল, না, চোখের ভুল হয়েছে। শোয়েব খানিক চুপ থেকে ঠাণ্ডা গলায় শুধাল,
- এই ফুল এখন ছেঁড়া কেন? রাত দশটায় কেন প্রয়োজন?
শাওলিন পানসে মুখে বিপন্ন পরিস্থিতির আঁচ করে। পাশ কাটাতে দ্রুত গলায় বলে,
- চা বানাতে প্রয়োজন। চুলায় পানি দিয়ে এসেছি। পাতিলটা নামানো দরকার!
কথাটা বলতেই এক পা সামনে এগিয়েছিল ও, অমনেই বিপুল চাপে প্রচণ্ড এক টান খেল হাতে। ছিঁটকে যে জায়গায় ছিল, সেখানেই ঝটিতি ফিরে আসে শাওলিন। অবাক বিস্ময়ে শীতল মুখটায় ফিরে চাইলে মানুষটা রুঢ় গলায় বলল,
- মিথ্যা বাহানা কাকে দাও? আমাকে?
শাওলিন কথা বলতে পারল না। নির্বাক চোখে মাথাটা নিচু করে ও। দেখতে পেল সরু কবজিটা বজ্রমুষ্টিতে খামচে আছে। একটু এদিক সেদিক হলেই হাড্ডিটা যেন মট করে ভাঙবে। শাওলিন মাথা তুলে আহত চোখে তাকায়। অন্যহাতে থাকা আঁচলের গোঁজ সেই কবজির কাছে এনে শোয়েবের মুষ্টিটা ছাড়াতে থাকে। ব্যর্থ হয়েই শাওলিন বিক্ষুদ্ধ সুরে বলে ওঠে,
- আপনার বাড়িতে চা খেতে হলে অনুমতি লাগবে? হাত ছাড়ুন! আমি রান্নাঘরে যাব! আমাকে ব্যথা দিচ্ছেন অফিসার ফারশাদ!
শেষদিকে এসে গলা কেঁপে উঠে। চোখে অজান্তেই পানি চলে এসেছে। ব্যথায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে তখন, অবশ অবস্থায় ঝিমঝিম করছে হাত। ঝাঁকুনি দিয়ে হাতটা ছাড়াতে চাইল, তার আগেই শোয়েব স্থিরচোখে ছেড়ে দেয়। শাওলিন যখন ব্যথাতুর কবজিতে অন্যহাত বুলাচ্ছে, তখন ওর দিকে মাথা নামিয়ে দৃষ্টি সোজাসুজি করছে শোয়েব। ভয়ংকর খেপাটে গলায় কথাটা বলল,
- তুমি আমার অনুমতির দাস নও। কথাটা আজ থেকে মাথায় ঢোকাও। তোমাকে আমার বাড়িতে বাইরের কেউ চাকর বানাবে, এই লেভেলের অনুমতি আমি কাউকেই দিইনি।
শাওলিন ভেজা চোখে তাকিয়ে ছিল। অন্ধকারের আলো ওর চোখের অশ্রুকে মুক্তদানার মতো জ্বলজ্বল করে ফোটাচ্ছে। সেই দৃশ্য কারো পাষাণ বুকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে বিঁধছে, বহুগুণ যন্ত্রণা হচ্ছে পাথর মনে। কিন্তু মস্তিষ্কের ভেতর তোলপাড় করছে রাগের লেহন। শাওলিন ডানহাতের উলটো পিঠে চোখের কার্নিশটা মুছল। অনেকটা নির্বিকার সুরেই জানাল,
- আপনার কাকি চা খেতে চেয়েছেন। উনার জন্য অপরাজিতা ফুল নিতে এখানে এসেছি। জানতাম না এদিকটায় সাপের বসবাস। উনিও বলেননি সাপ আসলেই আছে। আপনি কার্বালিক এসিডে সাপের আখড়া ঘুচিয়েচেন, এমনটাই বলেছিলেন কাকি। আপনি বিশ্বাস না করলে সবিতা কাকিকে জিজ্ঞেস করুন।
কথাগুলো বলেই দুহাতে আঁচল খুলে দেখাল। থোকা থোকা ফুলগুলো ওর ছোট্ট আঁচলে লুকিয়ে আছে। শোয়েব একনজর সেদিকে তাকালেও শাওলিন তখন দেখছে শোয়েবের হাত। নেভি ব্লু টিশার্ট পরা দেহটা কাঁপছে, কাঁধের চওড়া পেশিগুলো এর আগে কখনোই এতোটা ভয়ংকর ভঙ্গিতে কঠোর হতে দেখেনি। ডান ভ্রুঁটা শেষদিকে মাঝ বরাবর কাঁটা, সেই ভ্রুঁটা উঁচু হচ্ছে কপালে। চশমার কাঁচ যেন নড়ছে, সমস্ত শরীরই অপ্রতিরোধ্য নিঃশ্বাসে কাঁপতে শুরু করেছে। শাওলিন কিছু ভেবে না পেয়ে বলল,
- আপনি উনাকে —
কথা শেষ করার সুযোগই পেল না। তার আগেই হিংস্র ভঙ্গিতে এগোচ্ছে শোয়েব। তার পিছু পিছু তাকে থামাতে চাচ্ছিল শাওলিন। কিন্তু লাভ হচ্ছে কোনো। এদিকে ছোটো বোন রাবেয়াকে ঔষুধ খাওয়াচ্ছে রোকেয়া। পানির গ্লাসটা রাখতে গিয়ে হঠাৎ যেন হইচই শুনতে পেল। রাবেয়া হালকা জ্বর গায়ে বিছানা ছেড়ে বলল,
- বু, ভাইজানের মতো হুনাই না? বাইরে কী হইছে?
রোকেয়া কপাল কুঁচকে গলায় ওড়না তুলে নিচ্ছে। দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে, কাঠের ডাসা সরিয়ে বাইরে যেতেই বলল,
- তুই থাক, আমি যাই দেহি! জ্বর শইল্যে বাইর হইস না!
কিন্তু রাবেয়াকে দমালো গেল না। জ্বর শরীরে ঝটপট উঠে গেল সে। বড়ো বোনের পিছু যেতেই দুবোন থমকে দাঁড়ায়। শাওলিনকে ওরকম অবস্থায় দেখে দুজনই দৌড়ে যায়। গমনরত শোয়েবের দিকে তাকিয়ে রোকেয়া ত্রস্ত সুরে বলল,
- ভাবী, হইছে কী? ভাইজান অমন খেপা ক্যান?
শাওলিন গতি না দেখে রোকেয়াকে সব বলে দিল। দুবোন কথাগুলো শুনতে শুনতে আঁতকে ওঠে! রাবেয়া চরম আতঙ্কিত হয়ে যায়, শঙ্কিত সুরে রোকেয়ার দিকে বলে,
- বু, এলাহি কাণ্ড বাঁধব! রাইত বিরাতে ঝগড়া হওন ভালা না। এমনিই ভাইজান —
হঠাৎ কথাটা বলে ফেলছিল রাবেয়া, চকিতে শাওলিনের উপস্থিতি দেখে কথা থামালো। এসব বলা যাবে না শাওলিনের সামনে। রাবেয়া শোয়েবের দিকে দৃকপাত করতেই শাওলিনকে বোঝাল,
- ভাবী, থামান! উনি বাড়িত ঢুকলে কাউরে আস্তো রাখতো না। থামান ভাবী, আপনে বললে শুনব। জোর করলে থামব! আপনের কথা ফেলব না ভাবী। উনারা পরিবারের মানুষ বহুত বছর পর আইছে! আজকা কিছু না ঘটুক।
শাওলিন তখন থতমত দৃষ্টিতে তাকানো। কী করবে বুঝে পাচ্ছিল না। ঘাসে ছাওয়া ফাঁকা জায়গাটা পার করছে সে। আরেকটু এগোলেই বাংলোর হাঁটাপথের সীমানা। শাওলিন যখন দোনোমনায় ভুগছে, তখন রোকেয়া পাশ থেকে সুন্দর করে বোঝাল। কাঁধের হাত দিয়ে আলতো সুরে বলল,
- আপনে বুঝায়ে বলেন ভাবী। ভাইজান আপনের কথা শুনব। আমরা কিছু কইলে আরো ঝামেলা বাড়ব, তুলকালাম কাণ্ড বাঁধব ভাবী। কিন্তু আপনে কিছু কইলে কিছু কইতো না। যান, যান তাড়াতাড়ি!
শাওলিন আর দেরি করে না। বাড়িতে একটা ঝড় উঠবে এটা কস্মিনকালেও চায় না ও। পা দুটো গতিশীল করে মানুষটার পিছু গিয়ে জোরে হাঁক ছাড়ল,
- ফারশাদ সাহেব, দাঁড়ান!
ওর রিনরিনে কণ্ঠটা গতি আঁটকে দিল। সামনে বাড়ানো পা ফিরিয়ে আনলো মাটিতে। শোয়েব পিছু তাকাল ডান কাঁধ বরাবর। শাওলিন এক পা এগিয়ে গভীর দম ছেড়ে বলল,
- যদি আমার ভালো চান, দরকার নেই ঝামেলা করার। আমি চাই না আপনার সঙ্গে কারোর তর্ক হোক। সেই কারণটা যদি আমি হই, তাহলে অনুরোধ থাকবে শান্ত হয়ে যান।
শোয়েব ওভাবেই অটল। চোখের পলক পরছে না। চশমার দরুন কেমন কঠোর দেখাচ্ছে, সেটা ব্যক্ত করা যায় না। শাওলিন ঢোক গিলে শান্ত ভাবে বলল,
- দোষ অবশ্য আমার। আমি আপনাকে জানিয়ে আসিনি। আমি জানতামও এদিকটা কেমন। অন্যের কথা শুনে বেরিয়ে পড়াটা অবশ্যই ভুল হয়েছে। আমি চা বানাবার জন্যই এতোটা চিন্তা করেছি। আমার পক্ষে তো জানা সম্ভব নয়, আপনার পরিবার কেমন। কে কেমন। এই ভুলটা থেকে শিখে নিলাম, পরবর্তীতে আর করব না।
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে ছোট্ট মেয়ের মতো মাথাটা দুদিকে নাড়ায় ও। আর কখনো এরকম ভুল হবে না ওর। কিন্তু কথাগুলো বলেও কোনোরূপ পরিবর্তন দেখে না। চোখের পলক এখনো ফেলছে না! ওই সুন্দর তারা দুটো সর্বক্ষণ ওকে দেখে; ওর ভাষাগুলো পড়ে নেয়, ওর ভেতরটাকে গুছিয়ে দেয়; সেখানে আজ কেন অতো নিষ্ঠুরতা কেন? শুধু ওকে চাকর বলে? নাকি ওকে বিপদে ফেলেছিল বলে? শাওলিন আগপাশ না ভেবে আবারও অধীর গলায় বলল,
- রাত দশটার ভেতর রান্নাঘরের বাতি নিভিয়ে দিব। কেউ এলে তার ব্যাপার। আমি সাহায্য করতে যাব না।
ডান কাঁধ থেকে ঘাড় ঘুরাল শোয়েব। সামনে ফিরে চুপচাপ নিঃশব্দে হাঁটা দিয়েছে। এবারের চলনগতি আগের চেয়ে ধীরস্থির। রাগের ঘনঘটা পদক্ষেপে আর নেই। শাওলিন চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস টেনে ছাড়ে। আঁচলে লুকোনো ফুলগুলো রান্নাঘরে রেখে দেয়। অদ্ভুত বিষয়, রান্নাঘরে কেউ নেই। চুলাটাও নেভানো। কাঠের যে টুলটায় সবিতা চাচি বসেছিলেন, সেটাও জায়গা মতো রেখে দেয়া, যেন কেউ বসেই নি। শাওলিন রান্নাঘরের হলুদ বাতিটা নিভিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার সিঁড়িতে পা রাখল। প্রথম কদম সবে রেখেছে, ঠিক তখনি গোল টর্চলাইটের আলো পড়ল সামনে। যেন আলোটা ওকে সাবধানে আসার জন্য ফেলা হয়েছে। চট করে উপরে তাকায় শাওলিন। দোতলার ডান অংশে অল্প সামান্য আলো। সেই আলোতে একটি দীর্ঘদেহি অবয়ব। পকেটে বাঁ হাত গোঁজা, ডানহাতে টর্চ ধরা। তার পেছনে আলো থাকায় তার মুখ আঁধারে ঢাকা। শাওলিন মাথা নামিয়ে আরেক কদম ফেলল সিঁড়িতে। আলোটা ওর প্রতি কদমে অগ্রসর হচ্ছে। ওকে দোতলা পর্যন্ত নিয়ে এল টর্চের নির্দেশ। এরপর আলোটা বন্ধ হয়ে গেলে শাওলিন করিডোর পেরিয়ে রুমে ঢুকে যায়। তার পরপরই ঘরে ঢুকল শোয়েব, দুহাতে দরজার পাল্লা ধরে বন্ধ করে দেয় মাঝ বরাবর।
পেছন ঘোরে শোয়েব। একবারও তাকায়নি শাওলিনের দিকে। ওয়াক ইন ক্লোজেটের দিকে যেতে যেতে নিজেকে অদৃশ্য শোয়েব। শাওলিন বুঝে পেল না এখন কী তার জন্য অপেক্ষা করবে কিনা। বিয়ের পর আজ দ্বিতীয় রাত্রি। প্রথম রাতের পর লোকটা বনবিভাগ নিয়ে ব্যস্ত। যদি সে হিসেব ধরে, তবে স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ও এতোটাই অপ্রস্তুত, ওর জানার পরিধি বড্ডই ক্ষীণ। বিছানায় ওঠে কিছুক্ষণ অন্ধকারে তাকিয়ে থাকে। শরীর জুড়ে অবসাদ ও ক্লান্তি, বেশিক্ষণ চোখ খুলে রাখতে পারে না ও। নিচতলার প্রকাণ্ড সাইজের ঘরগুলো একা হাতে সাফ করাটা ওকে অতল ক্লান্তিতে ডুবিয়ে দিয়েছে। ঘুমিয়ে যায় শাওলিন। বিছানার একদম কিনার ঘেঁষে, ওপাশ ফিরে নিদ্রায় তলিয়ে যায়। অপরদিকে ওয়াক ইন ক্লোজেট থেকে কিছু প্রয়োজনীয় কাজ সেরে বের হয়েছিল শোয়েব। হাতে গান ওয়েল মাখা, একটা ছোট্ট ন্যাপকিনে কালিমাখা ছোপ। যেন গানওয়েল দিয়ে ভারি বস্তুটা পরিষ্কার করে রাখল। ঘরে পা রেখে বুঝল বাতি নেভানো, শাওলিন শুয়ে পড়েছে। হাতটা হ্যাণ্ডওয়াশে ধৌত করে বিছানায় উঠল শোয়েব। ঝড়ো বাতাসে নরম ফিনফিনে পর্দাগুলো বিছানার চারধার থেকে উড়ছে। শোয়েব নেভি ব্লু টিশার্টটা দুহাতে খুলে ফেলে। মাথার কাছে ওটা রাখতেই একবার তাকাল ওর দিকে। গায়ে হালকা গোলাপি শাড়ি, রঙটা ওর ছোট্ট, নরম শরীরটার ফুলের মতো মিশে গেছে। ওর দিকে ঝুঁকে এল সে। সন্তর্পণে মাথা নোয়াল ওর ঘুমন্ত মুখে। ডান হাত বাড়িয়ে ওর ব্যথাতুর হাতটা তুলে নিল। বৃদ্ধাঙুলে লালচে কবজিটা ছুঁয়ে দিলে দুঠোঁট নামাল সে। গভীর উষ্ণ চুমু খেল হাতে। চোখ বন্ধ করে ছুঁয়ে দিতে লাগল নরম আঙুল, উষ্ণ তালু, আদুরে উলটোপিঠে। ঘুমের ঘোরে থাকায় তবু কেঁপে উঠছে শাওলিন। মানুষটার প্রখর স্পর্শ ওর অচেতন মনে করাঘাত দিচ্ছে। হাতটা টেনে নিজের শেভড গালে ছোঁয়াল শোয়েব। বাঁহাতে ওর গলার কাছ থেকে সরিয়ে দিচ্ছিল কেশরাশি। উন্মুক্ত হয়ে গেল সন্ধ্যায় ঘটানো কাজটুকু। বাঁহাতের পুরুষালি আঙুলে ছুঁয়ে ধরল রক্ত জমাট দাগটা। কিঞ্চিত ফুলে ওঠেছে দাঁতের দংশনে। শোয়েব মাথা নামিয়ে সেখানেও অধরজোড়া ছুঁয়ে দেয়। বুকের ভেতর মোচড়ে ওঠে তার, শোয়েব অনুভব করে প্রবল আবেশী অনুভূতিটা। তার ফাঁকা বুকে আস্তে করে জড়িয়ে নেয় ওকে। ওর পিঠ, ঘাড়, মাথাকে তুলে নেয় নিজের ওমে, দুবাহুর ভেতরে, তার সান্নিধ্যের কুটিরে। ঘুম জড়ানো স্বরে শোয়েব বলছিল,
- খাগড়াছড়িতে এলে তুমি বিছানায় শোবে না শাওলিন। শোবে. . আমার বুকের ভেতর।
একটু থেমে আবারও গভীর গলায় চোখ বুজে ফেলল। নিদ্রার ঢল দুচোখে, তার ভারি কণ্ঠ মিইয়ে আসে। তবু ফিসফিস স্বরে ঘুমঘোরে বলল,
- রেবা বৌভাতের তারিখ দিবে। না করে দিলে ভালো। নাহলে . . আমি বৌভাত চাই না। তুমি আমার কাছেই থাকছ।
—————
পরদিন স্বাভাবিক ছন্দে সকাল শুরু হয়। পুরুষরা ঘুম থেকে ওঠেনি। খালিদ মির্জা নিয়মমাফিক ভোর চারটা ত্রিশে উঠে গেছেন। স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে ঘুরে দেখেছেন নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা। না, বাংলাদেশের মাটিতে পুরোনো তরিকা লাগায়নি ও। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির আনাগোনা দেখা দিচ্ছে গাছের ফাঁকে, ক্ষুদ্র সিসিক্যামে, ইলেক্ট্রিক বাউণ্ডারির কার্যকলাপে। খালিদ এখনো চান শোয়েব আগের জীবনে ফিরুক। হতে পারে ওটা নীতিবদ্ধ জায়গা না; কিন্তু কার্যকারিতায় অপকারীও ছিল না। শাওলিন ঘুম থেকে জেগেছে। রান্নাঘরে ঢুকতেই রোকেয়া, তাহিয়া, অধরার উপস্থিতি দেখল। ওরা এখনো জানে না, সবিতা চাচি আরেকটু হলে মারাত্মক বিপদে পড়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি এখন তুলনামূলক ঠাণ্ডা। শোয়েব সোয়া পাঁচটায় ওঠে ওয়াকিটকি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। কাউকে জানিয়ে যায়নি কোন দরকারে বেরুল। যখন ফিরেছে তখন সারামুখ ঘর্মাক্ত; গালদুটো রক্তাভ। মাইলে পর মাইল দৌড়ে এসেছে তা বুঝতে বাকি থাকে না। নাশতার টেবিলে হাতমুখ ধুয়ে বসল শোয়েব। সবিতা চাচিকে ডেকে আনালো ওর পাশে বসে নাশতা খেতে। এমন তাজ্জব দৃশ্য দেখে খালিদ, ফাতিমা নাজ, তাহিয়া ও অধরা প্রত্যেকেই হতভম্ব! এই রূপ তো ভালো কিছু বোঝাচ্ছে না! উদ্দেশ্য কী? কেউ কোনো কথা বলল না শোয়েবকে। মনে মনে ধরে নিল হয়ত সবিতার পূর্ববতী কর্মকাণ্ড মাফ করে দিয়েছে সে। তাই নতুন বধূর সামনে অপকাজ করতে চাইছে না শোয়েব। এর মধ্যে নাশতা শেষে চায়ের পসরা আনা হলো। ফাতিমা সকালে যেহেতু অপরাজিতা ফুলের চা খান, আজ খালিদ মির্জাও চা খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেন। শোয়েব দু টুকরো সেদ্ধ ডিমে গোলমরিচ ছিঁটিয়ে বলল,
- সবিতা চাচী,
ডাক শুনে খাওয়া থামান সবিতা। চোখ বাঁয়ে ঘুরিয়ে বলল,
- হ্যাঁ বাবা, কিছু বলছ?
- শরীর-স্বাস্থ্য কেমন? হেলথ চেকআপ করিয়েছেন?
সবিতা ভড়কে যাওয়া দৃষ্টিতে বলল,
- কেন বাবা? হঠাৎ এই কথা কেন? তুমি তো আমার স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্নই করো না ফারশাদ। তুমি তো জানো না, তোমার একটা কলের অপেক্ষায় কতগুলো দিন খারাপ ভাবে কাটিয়েছি।
- আপনি কল দেবার মতো পরিস্থিতি তো রাখেন না। এমনভাবে সম্পর্কগুলো বাজে করেন, তখন ইচ্ছে করে কল কেন, এই দুনিয়া থেকে অন্য দুনিয়ায় কানেকশনটা ফিট করি।
শোয়েবের কথা কিছুই বুঝলেন না সবিতা। তিনি ভ্রঁ
কুঁচকে আলগোছে বলে উঠেন,
- সেটা কি দুনিয়া, বাবা? তোমার কথা যে তুমি বুঝিয়ে না দিলে বুঝব না।
- মৃত্যু।
মুখের ওপর গরম ঝাঁজ পড়ল। এমনই ভাবে শিউরে উঠলেন সবিতা। তিনি চকিতে ফাতিমার দিকে তাকালেন। আমতা আমতা কণ্ঠস্বর ফুটতে যাচ্ছিল, হঠাৎ শোয়েব কথার মোড় অন্য রাস্তায় ঘুরিয়ে বলল,
- আমি সম্পর্কের মৃত্যু বুঝিয়েছি। ওই মৃত্যু না। আপনি চা খাবেন? মেবি ওর হাতের চা-টা ভালো হয়। চেখে দেখতে পারেন। এই?
শেষ কথাটা যার উদ্দেশ্যে, সে তখন খালিদকে চা ঢেলে দিচ্ছিল। ভদ্রলোক কিছুটা দূরে হলঘরের সোফায় বসেছিলেন। ভাইপোর ডাক শুনে হলঘর থেকে একপলক ডাইনিং ঘরটা দেখে শাওলিনকে বললেন,
- মা, দেখে এসো। ডাকছে। চিনিটা দেখে নিতে পারব।
- জ্বি, আচ্ছা চাচা।
শাওলিন পায়ে পায়ে নিকটবর্তী হলে ধীরভাবে বলল,
- ডেকেছেন?
শোয়েব বড়ো চাচিকে দেখিয়ে কফির মগটা টেনে নিচ্ছে। সেভাবেই নির্বিকার স্বরে বলল,
- এক কাপ চা দাও। সবিতা চাচির বেশি দিবে। উনি হেলথ কনশাস মানুষ। বি কেয়ারফুল।
- ঠিক আছে।
শাওলিন দুটো কাপে ফাতিমা নাজ, সবিতা আফরোজ দুজনকে অপরাজিতা চা দিল। সিলেটি চায়ের সুঘ্রাণে মৌ মৌ করছে চারপাশ। ফাতিমা চায়ে চিনি খান না। তিনি ছোট্ট চুমুক দিয়ে বললেন,
- দারুণ! স্বাদটা দেখছি ভালো এসেছে। সবিতা, এ স্বাদ অতুলনীয়। না খেলে বোঝার উপায় নেই।
শোয়েব কফিতে চুমুক দিচ্ছে। চোখদুটো শাওলিনের দিকে। শাওলিন চিনির পট এগিয়ে সবিতার দিকে শুধাল,
- চিনি ক'চামচ খাবেন?
সবিতা মুখে হাসির ঢল নামিয়ে বলল,
- দুই চামচ, মা। দুই চামচ তুলে দাও।
শাওলিন যখন দুই চামচে চিনি মেশালো, চামচে টুং টাং করে গোল গোল নাড়াচ্ছিল, ঠিক সেসময় গলা খাকারি দিয়ে শোয়েব বলল,
- এই চায়ের লিকারটা ঘন। ব্যালেন্স রাখতে কিছুটা বেশি সুগার লাগে। আধ চামচ বাড়িয়ে দাও। টেস্ট বেটার আসবে।
সবিতা কথাটা শুনে মুচকি হাসলেন। শোয়েবের কথা মোতাবেক শাওলিন সেভাবেই বাড়তি চিনি মিশিয়ে দিল। চায়ের কাপটা যখন এগিয়ে দিল, তখন সবিতা দুহাতে কাপ তুলে একটা হাসি দিলেন। মধু মাখানো হাসি। হাসিটা দিয়েই কাপে চুমুক দেন। মুখের হাসিটা হঠাৎ আক্রান্ত হলো। চুমুক দিয়েই চোখস্থির করে ফেলেন সবিতা। এদিকে ফাতিমা উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছেন। তিনি পরপর চুমুক দিয়েই যাচ্ছেন। হঠাৎ দেরি দেখে বলে উঠলেন,
- বউ? চায়ের স্বাদটা অসাধারণ না?
দাদীকে উষ্কে দিতে শোয়েব নিজেও তাল মেলালো। কফির মগটাকে সাইডে রেখে শাওলিন নিজের জন্য যে কাপটা বানিয়েছিল, ওটা ওর হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে এক চুমুক দিল। এহেন কাণ্ডে লজ্জায় লাল হয়ে গেল শাওলিন। বাড়ির লোকদের সামনে ওর খাওয়া চা-টা সবলে কেড়ে নিয়ে খাচ্ছে! পাষাণ, দ স্যু, অ স ভ্য কোথাকার! মনে মনে লজ্জায়-কুণ্ঠায় বকাগুলো দিলেও সবিতা তখন অকুলপাথারে। তিনি না পারছেন মুখ থেকে ফেলতে, না পারছেন গলা দিয়ে গিলতে। এদিকে শোয়েব দুই চুমুকে চা শেষ করে চাচীর দিকে ভ্রুঁ নাচাচ্ছে।
- চা ভালো হয়নি? কিছু বললেন না?
সবিতা সিপাহী যুদ্ধ দেখেননি। কিন্তু আজ যুদ্ধের আগপাশ স্বাদ পেয়ে ঢোকটা গিললেন। মুখে তার চেয়েও কঠিন যুদ্ধে হাসি ফোটালেন। পরিস্থিতি দেখে নিরুপায় হয়ে আবারও এক চুমুক বিষ পান করে বললেন,
- অপূর্ব। অপূর্ব চা।
শোয়েব গর্ব নিয়ে তাকাল। চাহনিটা দূরবর্তী রান্নাঘরের দিকে তাক। সেখানে শয়তানি হাসিতে ওড়না চাপা দিয়েছে রোকেয়া। হাসতে হাসতে রান্নাঘরের দেয়ালে দুবার থাপ্পর মারল। মতিন লাল রান্নাঘর থেকে কয়লা গুঁড়ো নিচ্ছে। তর্জনীতে মাখিয়ে দাঁতে ঘষতেই রোকেয়ার দেয়াল থাপড়ানো দেখে কপাল খিঁচালো। মতিন বোকা বনে বলল,
- কিরমি ধরছে?
রোকেয়া এই কথায় আরেক দফা ফেটে পড়ল। হাসি আর চাপানো যাচ্ছে না। রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকে গেলে এদিকে সবিতা পুরো চা-টাই খেতে বাধ্য হলেন। একদিকে না খেলে শোয়েব ভালো ভাবে দেখবে না, অন্যদিকে এটা খেলে নিজের ভালোটা থাকে না। তবু সবিতা খেলেন। খেয়ে তড়িঘড়ি একটা ফোন এসেছে বলে চলে গেলেন। শোয়েব ততক্ষণে চেয়ার ছেড়েছে। টেবিলের এঁটো কাপগুলো তুলে রান্নাঘরে গেল শাওলিন। রোকেয়া তখন হাসি থামাতে কলপাড়ে গেছে।
সিঙ্কে কাপগুলো রাখতেই হঠাৎ একটার তলায় চোখ আটকে গেল শাওলিনের। বেগুণি বর্ণ চায়ের নিচে অস্বাভাবিক এক প্রলেপ। ঘন, যেন শত নাড়ালেও গলেনি। সন্দেহ কাটাতে তলানি থেকে আঙুল ছুঁয়ে তুলল। প্রথমে শুঁকে দেখল, মিষ্টি ঘ্রাণটা নেই। তারপর কী ভেবে জিভের এক কোণে ছোঁয়াল। পরমুহূর্তেই পুরো শরীর ঝাঁকুনি খেয়ে উঠল। চোখ-মুখ খিঁচুনি দিয়ে ফেলেছে শাওলিন। কী এটা? এটা চিনি? এতো বিষাক্ত জিনিস. . বুঝতে বাকি নেই, এটা লবণ। শুধু লবণই না, সামুদ্রিক লবণ — সী-সল্ট! মাত্রাতিরিক্ত কড়া, জ্বালাধরা, বিদঘুটে! হঠাৎ থমকে গেল শাওলিন। বুকের ভেতরে ধক্ করে উঠল। এটা কী কালরাতের প্রতিশোধ? ভীত চোখে কাপটার দিকে তাকাল। অশুভ আতঙ্কে কণ্ঠরোধ হয়ে আসছিল . . . পেছন থেকে ঠিক তখনি আসলো গমগমে গলাটা,
- যে গলা দিয়ে চা খেতে চেয়েছে, সেই গলাটায় কার্বালিক এসিড ছেড়ে দিতাম। ভাগ্য তোমার, শুধু সী সল্ট দিয়েছি। আমি হিসাব না মিটিয়ে ছাড়ি না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………