কামিনী - পর্ব ৮৬ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
“হেমলক পিয়ার্স!”
 রানি হেমলকের নামটি উচ্চারণ করলেন ভীষণ বিস্ময় নিয়ে। তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না ফ্রেয়ার কথা। 
ফ্রেয়া নত মস্তক পুনরায় নাড়ালো, “হ্যাঁ, তিনিই এসেছিলেন। বহু বহু দিন আগে তিনিই এসে এই নিষেধাজ্ঞা করে যান।”

  রানির কোথাও একটা মনে হলো ফ্রেয়া হয়ত ভুল বলছে। কারণ হেমলক পিয়ার্স রানির মাতার খোঁজ জানবেই বা কীভাবে? আর জেনে থাকলেও বা না করল কেন? তখনই চট করে তার মাথায় ভাসল ক্যামিলাস রাজ্যে পাওয়া সেই নথিপত্রের কথা। তবে কি তার আড়ালেও অনেককিছু ছিলো? হেমলক সবটা জেনেও লুকিয়ে গিয়েছিলো!
 রানির চোখগুলো ধীরে ধীরে লালচে হয়ে উঠে। রাগে, অবিশ্বাসে কাঁপতে থাকে হাত। লাল বর্ণ চক্ষু যুগল নিয়ে তিনি হরিতকীজির দিকে তাকান ফ্রেয়ার কথার সত্যতা জানার জন্য। 

হরিতকীজির মুখ তখন নত। কাঁপে সে। দাঁতমুখ চেপে উত্তর দেয়,
“হ্যাঁ, ফ্রেয়া সঠিকই বলছে। সত্যিই বলছে।”

 “কিন্তু কেন হেমলক পিয়ার্স এটা করেছেন? আমার মাতা কি তবে এখনও তাদের রাজ্যে বন্দী? ওখানেই আছেন? কেন ওখানে? আমাকে জানান। আমার জানতে হবে। আমার পুরো জীবন জড়িয়ে গিয়েছে এই সত্যের সাথে। আমাকে বলুন।” রানির কণ্ঠে অসহায়ত্ব ও গোমর একই সাথে যেন মিলেমিশে গিয়েছে। 

 হরিতকীজি শেষ রক্ষা করতে পারেনি বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মাথা মৃদু মৃদু নাড়ায়। 
  “আপনার মাতাকে রাজা কেশবচন্দ্র চওড়া মূল্যে হস্তান্তর করেন গণিকালয়ে। আপনার মাতার ভেতরও তখন পুরুষদের সান্নিধ্য পাওয়ার আলাদা লোভ, নেশা চেপে বসেছিলো। আমরা সেখান থেকেও তাকে আনতে চেয়েছিলাম কিন্তু গণিকালয়ের সাম্রাজ্য পেয়ে তিনি যেন নিজেকে ভাবতে শুরু করলেন অপ্সরা। রাজা কেশবচন্দ্রের থেকে তার মোহ কেটে গেলো আপনার জন্মের পরপরই। আপনাকে জন্ম দিয়েই সে যেন সকল মোহ কাটিয়ে ফেলল। আপনাকে নির্দ্বিধায় তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলো। তার এমন অদ্ভুত আচরণে সেই সময়ে আমরা সকলেই অবাক হয়েছিলাম। রাজা কেশবচন্দ্র কেমন লোক তা জানার পরেও আপনার প্রতি মমতাও সে কেমন করে ছাড়ল আমার জানা নেই। এরপর সেই গণিকালয় থেকেই তার সখ্যতা গড়ে উঠে ক্যামিলাস রাজ্যের মহারাজার সঙ্গে। এরপর শুনেছিলাম রাজার রাজপ্রাসাদেই তাকে একটি স্থান দেওয়া হয়েছিলো বাইজি নৃত্যের জন্য ও রাজার বিশেষ মনোরঞ্জন করার জন্য। এরপরের সবকিছুই আমাদের কাছে অজানা।”

  হরিতকীজির কথা থামলো। রানি প্রশ্ন করলেন না পুনরায়। স্তব্ধ ভাবে বসে রইলেন ঠাঁই। তবে তার মাতাই তাকে রাজা কেশবচন্দ্রের হাতে তুলে দিয়েছিল? তার মাতা! অথচ পুরো জীবন জুড়ে তিনি ভেবেছিলেন কি-না তার মাতার কোনো দোষত্রুটি ছিলো না। তার মাতা তাকে নিশ্চয় বাঁচাতে চেয়েছিলো। কিন্তু আজ সেই সমস্ত জানাই ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে। এ কী খেলা খেলছেন সৃষ্টিকর্তা তার সঙ্গে! 

 “আপনি এবার বাকিটুকু হেমলক পিয়ার্সের কাছেই জানতে পারবেন, রানি।” রানিকে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকতে দেখে হরিতকীজিই আগ বাড়িয়ে বলল। 
নিজের ভেতরে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভেঙে ফেলার মতো ঝড় হওয়ার পরেও রানি বাহিরে দেখালেন শান্ত। হরিতকীজির কথায় মুখ তুলে তাকালেন। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন,
“যদিও আপনি অনেক সত্য লুকিয়েছিলেন ছল করেছিলেন ঠিকই কিন্তু আপনিও কোথাও না কোথাও হয়ত সকল মানুষের মতোই নিজেকে ভালোবেসে ছিলেন। যারা নিজেকে ভালোবাসতে পারে তাদের আমি শ্রদ্ধা করি। আপনার মনোরঞ্জন অঞ্চলের জন্য শুভকামনা। তবে, আপনার আজ ক্ষমতার প্রতি লোভ যদি একটু, বিন্দু পরিমাণ কম থাকত তবে বোধহয় আমার মাতার জীবনে এত খারাপ ঘটনা ঘটতো না। শেষমেশ গণিকা হতে হতো না। তবে তা কেবল আপনারই দোষ ছিলো না। আমার মাতার জীবন ধ্বংসের পেছনে সে-ই বোধহয় সবচেয়ে দায়ী ছিলো। অতিরিক্ত মোহ মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। আমার মাতা তার জলজ্ব্যান্ত প্রমাণ। নয়ত কোনো নারী সতীত্ব বিলিয়ে দিতে পারতো এত পুরুষের ভেতর কেবল একজন পুরুষকে পেতে? পারতো না।”
 শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে রানির মনে হলো তার যেন গা গুলিয়ে উঠছে। নিজের মাতা-পিতা নিয়ে তার হতাশার শেষ রইল না।

  রানি দোর ঠেলে বেরিয়ে যেতে নিলে পুনরায় পিছু ডাকে হরিতকীজি। উঠে আসে সে নিজের জায়গা থেকে। দাঁড়ায় রানির সামনা-সামনি এসে। রানির ভরাট ললাট, টানা চোখগুলো, অদ্ভুত সুন্দর মুখটির দিকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকায়। এরপর সস্নেহে হাত রাখে রানির মাথায়। ঠোঁট কাঁপে তার, কণ্ঠও কাঁপে খানিক,
 “আপনার জীবন সুন্দরতম হোক। আমার আপনার জন্য মায়া হতো। কত লুকিয়ে দেখতে গিয়েছি আপনাকে। শেষমেশ আপনার বিপদের আশঙ্কা করে ফ্রেয়াকেও পাঠিয়ে ছিলাম। আমি আপনার ভেতরে আপনার মাতার যৌবনের সে অবয়বটিকে দেখতে পাই। কিন্তু আপনার মাতা এক পুরুষের মোহে ডুবে নিজের জীবন শেষ করে দিলো। স্বেচ্ছায় নিজেকে বানালো নরকের অপ্সরা। আপনার কথাও ভাবল না। আমার তার জন্য আফসোস লাগে। আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।”

  “যার যার কৃতকর্মের ফল সে সে ভুগেছে। মাতার ফলও বোধহয় মাতা ভুগেছেন। আপনার এখন লঘু দোষ।”

  রানি বেরিয়ে যান নাট্যশালা থেকে। বাহিরে তাকিয়ে দেখেন তার প্রজারা দাঁড়িয়ে আছে তখনও। তার ভেতর থেকে ছিটকে আসা কান্না, ঘৃণা তিনি গিলে নেন সেই প্রজাদের মুখটির দিকে তাকিয়ে। মাতাপিতাহীন যেহেতু একটি জীবন কাটিয়ে দিয়েই ফেলেছেন তাহলে আর তাদের অপকর্মের জন্য কেন তিনি নিজেকে দোষারোপ করবেন? হ্যাব্রো তাকে এত ভরসা দিয়েছে। হ্যাব্রোর ভরসা তিনি ভাঙতে পারেন না কোনোক্রমেই। তিনি অনন্য। জন্মপরিচয় কিংবা পিতৃপরিচয় তার জীবন নয়। তার এই জীবন তিনি নিজে গড়েছেন। নিজের দাপটে গড়েছেন।

 হরিতকীজি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখলেন ভিড় ঠেলে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে সামনে , ক্রমশই। ভিড়ের সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে অনায়াসেই চোখ চলে যাবে সকলের। কী সেই রূপ! কী সেই ঐশ্বর্য। বাহুগুলো এখন কেমন চওড়া। সাহস যেন তার উপচে পড়ছে। তার মহিমায় আলোকিত চারপাশ। 
 বহুবছর আগের সুরসুন্দরীর মুখটি যেন অন্য এক জীবন পেয়েছে! স্বর্গের মতো এবারের জীবনটি। 

—————

  ক্লান্ত দেহ ছড়িয়ে রানি সবে বসেছেন কেদারায়। বিকেলের ম্লান আলো এসে চুম্বন এঁকে যাচ্ছে তার পায়ে। গা থেকে ভুরভুর করে বের হচ্ছে চন্দনের সুঘ্রাণ। সদ্য স্নান করেছেন কি-না। 
মাথার ভেতরে ঘুরে বেড়ানো সকল জটিল থেকে জটিলতায় ভোগা হিসেব থেকে আপাতত তিনি অবসাদ গ্রহণ করেছেন। টানা এতগুলো দিনের যুদ্ধে ক্লান্ত মস্তিষ্ক। দেহ ভেঙে আসছে। একটু নিদ্রাতেই যেন এখন স্বস্তি মিলবে।

 রানির চোখ প্রায় বুজে এসেছে। নিদ্রার ঘোরে ঢলে পড়বেন ঠিক সেই মুহূর্তে তার কক্ষে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করল কেউ। এতটাই জোরে সেই প্রবেশ ছিলো যে রানির নিদ্রা ছুটে গেলো। ভারি চোখের পাতা তড়িৎগতিতে খুলে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখলেন হেমলক এসেছে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক। অস্থির হয়ে আছে চোখমুখ। ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে হেমলক ছুটে এলো। রানির একেবারে সামনেই বসল হাঁটু ভেঙে। রানির হাতে-পায়ে অনবরত হাত বুলাতে, বুলাতে বলল,
“তুমি ঠিক আছোতো? কোথাও লাগেনিতো? দেখি, ঠিক আছো কি-না। বলো আমায়।”

  ছোট্টো শিশুরা পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে তার অবিভাবকের যেমন করে আহ্লাদে ভরা কণ্ঠ থাকে, ঠিক তেমন আহ্লাদই হেমলকের কণ্ঠে বাসা বেঁধেছে। তেমন করেই যত্ন করে করে হাত-পা ছুঁয়ে দেখছে। তেমন করেই জিজ্ঞেস করছে বারংবার। 
এমন মায়াময় স্বর, এমন যত্ন দেখে রানি কিছুক্ষণ চুপই রইলেন। হয়ত অজুহাতে একটু আহ্লাদ তিনিও গ্রহণ করতে চাইলেন। কিংবা দেখতে চাইলেন মিথ্যে লুকিয়েও কেমন করে একজন মানুষ এতটা অভিনয় করতে জানে!

 “বলছো না যে! লাগেনি তো?”

 “লাগবে কেন? আঘাত করবে কে আমায়?” রানির সোজাসাপটা উত্তরে হেমলক স্বস্তির শ্বাস ফেলে। আলগোছে রানির ডানহাতটা নিজের দু'হাতের মাঝে চেপে ধরে,
“প্রখাণ্ড রাজ্যে গিয়েছো পত্র পেতেই ছুটে এলাম। এসে শুনলাম সবার মুখে সেই রাজ্যে ঘটা ঘটনাগুলো শোরগোল তুলেছে। ওরা তোমাদের আটকেও রেখেছিলো! আমাকে নিয়ে গেলে না কেন? কিংবা আমাকে না বিশ্বাস করতে পারো, নিজের ক'টা দেহরক্ষীদেরতো নিতে পারতে! এত সাহস দেখাও না মাঝে মাঝে! আমার প্রাণ কোনদিন যেন বেরিয়ে যায় তোমার চিন্তায়?”

 “চিন্তায়? আমার জন্য চিন্তা হয়েছিল?”

“হবে না?”

 “চিন্তা হয়েছিলো বলেই কি এতদিন খোঁজ নেননি? পত্র পেতেই খোঁজ নেওয়ার কথা মনে পড়েছিলো? আমায় ভোলানো এত সহজ? আমি বালিকা? শিশু কন্যাটি?”

হেমলক আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রানির হাতটি। ক্লান্ত কণ্ঠস্বর তার,
“অভিমান করেছো কি তাই?”

 “মান, অভিমান, অভিযোগ আমার নেই। আমার ভেতরে কেবল আত্ম অহংকার, ঘৃণা এবং হিংস্রতা।”

“তবে এফোঁড়ওফোঁড় করে ফেলো হৃদয় আমার। দেখি তোমার হৃদয় শান্ত হয় কি-না।”

 “তা করব অবশ্যই। তার আগে জানতে চাই মাতা কোথায় আমার? সুরসুন্দরীকে লুকিয়ে রেখে আমার সাথে এমন ছলনাও বা করার কারণ কী?”
 রানি ভেবেছিলেন হেমলক চমকে যাবে ভীষণ। ভীত হবে। কিন্তু তার কিছুই হলো না। হেমলক চমকালো না। নির্জীব রইল। 

 রানি তলোয়ার তুললেন হাতে। বিনা দ্বন্দ্বে, বিনা সংকোচে,
“আমি বলেছিলাম আমার সাথে ছলনা করলে আমি পৃথিবী ধ্বংস করে দিবো। বলেছিলাম আমি বারবার। তবুও কেন এমন ছলনার আশ্রয় নিলেন?”

  “ছলনা করে কেউ বলে আমি ছলনা করেছি? অপরাধীতো সবসময় অপরাধ লুকাতেই চায়।” খুব ধীরস্থিরে বলল কথাটি হেমলক। 

 রানির রাগ ক্রমশই বাড়ল, “আমার সাথে এমন ধোঁকাবাজি করার আগে আপনার বোঝা উচিত ছিলো। আমি কাউকে ক্ষমা করি না।”

“ক্ষমা কখন করতে বললাম? বললাম তো বুকটা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দাও।”

 “দিবো। তার আগে আমি জানতে চাই এসব করার কারণ কী? আমার মাতা কোথায়?”

হেমলক উত্তর দিলো না। এমন করে চুপ করে রইল যেন উত্তর সে দিবেই না কোনো ক্রমেই। 
 “আমি আঘাত করতে বাধ্য হবো।”

“বার বার আঘাত করার কথা বলছ কেন? এর আগে কখনো তুমি কোনো অপরাধীকে আঘাত করার আগে জিজ্ঞেস করেছো না বলেছো? তবে আমার বেলা কেন এত সংশয়?”

 “রাজনীতি করছেন?”

“তোমাকে ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড়ো রাজনীতি, রানি। আর কী রাজনীতি করব?”
 
  রানি বুঝলেন, তলোয়ারের আঘাতের ভয় হেমলক অন্তত পাচ্ছে না। তাছাড়া কোথাও একটা বাঁধা যেন পাচ্ছেন তিনি। তলোয়ার চেয়েও হেমলকের বুকে বিঁধিয়ে দিতে পারছেন না। পারবেনও না বোধহয়। যেই সুখী স্মৃতি যৎসামান্য তার জীবনে তার সমস্তটা জুড়েই তো কেবল এই লোকটির বসবাস। সেই স্মৃতির বুকে কেমন করেই বা ছুরি বসাবেন তিনি?

 রানি আলগোছে রাখেন তলোয়ার। ধীরে ধীরে বসেন মাটিতেই হেমলকের বরাবর। হাত জোর করতে নিলেই হেমলকের বলিষ্ঠ হাত বাঁধা দেয়। আঁতকে উঠে সে,
“কী করছ রানি তুমি? এই স্থান তোমার নয়। এমন দণ্ড দিও না আমায়। আমার সামনে হাত জোর করছ তুমি! আমি বড়োই নগন্য মানব, রানি। এমন লজ্জা দিও না।”

 “আমাকে কেবল আমার মাতার খোঁজ দিন দয়া করে। একটিবার। আমার তার সাথে কিছু হিসেব বাকি আছে। ভিক্ষে চাই।”

  “তিনি এই পৃথিবীতে থাকলে আমিই বোধহয় সর্বপ্রথম তোমাকে তার খোঁজ দিতাম। কিন্তু বহু বর্ষ আগেই তিনি সমাহিত হয়েছেন এই পৃথিবীর বুক থেকে। তিনি নেই, রানি। নেই।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp