পদ্মজা - পর্ব ০৩ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
‘এই আপা, স্কুলে যাবা না?’

‘যাব।’

‘তাড়াতাড়ি করো।’

তাড়া দিয়ে পূর্ণা বাড়ির ভেতর চলে গেল। পদ্মজা বাড়ির পেছনের নদীর ঘাটে উদাসীন হয়ে বসে আছে। এ নদীর নাম—মাদিনী। জলে কানায় কানায় ভরে উঠেছে মাদিনী। জলের একটানা স্রোত বয়ে যায় সাগরের দিকে। উজান থেকে ভেসে আসছে ঘন সবুজ কচুরিপানা। পদ্মজার এই দৃশ্য দেখতে বেশ লাগছে, নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে মাদিনীর স্বচ্ছ জলের দিকে। একটা লঞ্চ জল কেটে এগিয়ে যাচ্ছে মাদিনীর বুকের ওপর দিয়ে। লঞ্চ দেখে এক মাস আগেকার ঘটনা মনে পড়ে গেল তার।

সেই রাতে হেমলতা ছুরি ধার দিয়ে নিজ ঘরে চলে যান। পদ্মজা অজানা আশঙ্কায় সেদিন ঘুমোতে পারেনি। চুপচাপ অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকে। শেষরাতে চোখ লেগে আসে। ভোর হতেই হিমেলের চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায়। হিমেল তার ছোটো মামা, প্রতিবন্ধী। এক পা বাঁকিয়ে হাঁটে। খুব সরল মনের মানুষ। বয়স বাইশ হলেও, এখনো শিশুদের মতো আচরণ করে; কথায় কথায় খুব কাঁদে।

পদ্মজা ওড়না গায়ে জড়িয়ে দৌড়ে বের হয়। পদ্মজাকে দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়ে হিমেল, ‘এই পদ্ম, আপা কই? আপা…আপা।’

পদ্মজা উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছে মামা? এমন করছ কেন?’ পদ্মজার প্রশ্ন উপেক্ষা করে হিমেল হেমলতাকে ডাকছে, ‘আপা, এই আপা।’

হেমলতা বাড়ির পেছন থেকে ব্যস্ত পায়ে হেঁটে এলেন। ‘কী হয়েছে?’

হেমলতাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল হিমেল।

‘আপা, ভাইজান খুন হইছে। রাইতে কে জানি মাইরা ফেলছেরে আপা…’

হিমেল কাঁদতে কাঁদতে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। পদ্মজা তাৎক্ষণিক সন্দিহান চোখে মায়ের দিকে তাকাল। হেমলতাকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি চমকে গিয়েছেন। অথচ, তার চমকানোর কথা ছিল না। নাকি হিমেলের সামনে অভিনয় করলেন?

হেমলতা দ্রুত পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘পূৰ্ণা- প্রেমাকে ওদিক যেতে দিস না, পদ্ম। আমি আসছি।’

হেমলতার পিছু পিছু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে যায় হিমেল।

পদ্মজা রাতেই ভেবেছিল, এমন ঘটনা ঘটতে পারে। সে তার মাকে সবচেয়ে ভালো জানে। তবুও এখন ভয় পাচ্ছে। পুলিশ কি এসেছে? মাকে ধরে নিয়ে যাবে না তো? ভাবতে গিয়ে ধক করে উঠল পদ্মজার বুক। গ্রামের কাছেই শহর, থানা। পুলিশ নিশ্চয় চলে এসেছে। পদ্ম ধপ করে বসে পড়ল মাটিতে। সে ঘামছে, নাক-মুখ-গলা ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

খুনের কথা শুনে ভীষণ ভয় পেয়েছে পূর্ণা। আতঙ্কে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সে পদ্মজার পাশে এসে হাত চেপে ধরে। পদ্মজা মৃদু কাঁপছে। চোখে ভাসছে, হেমলতাকে পুলিশ শিকল দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। তার খুব কান্না পাচ্ছে। সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি করে মাথায় ওড়নার আঁচল টেনে নিয়ে পূর্ণার উদ্দেশ্যে বলল, ‘প্রেমাকে দেখে রাখিস।’

বাড়ি ভরতি মানুষ। মানুষ আসছে ঠেলেঠুলে। হেমলতা হানিফের লাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ফরসা রঙের দুজন মহিলা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। আকস্মিক আক্রমণে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন হেমলতা। খেয়াল করে দেখেন, মহিলা দুজন তার মা আর বোন। তারা হাউমাউ করে কাঁদছে। কিন্তু হেমলতার তো কান্না পাচ্ছে না! ব্যাপারটা লোকচক্ষু ঠেকছে? একটু কী কান্নার অভিনয় করা উচিত? হানিফের মৃতদেহ দেখে মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছেমতো কুপিয়েছে। হেমলতার দেখে শান্তি লাগছে! এমন শান্তি অনেকদিন পাওয়া হয়নি। পদ্মজাও সেখানে উপস্থিত হয়। হেমলতার নজরে পড়ে। ভীতু চোখে মায়ের চোখের দিকে তাকাল পদ্মজা। হেমলতা ভ্রু কুঞ্চিত করে আবার স্বাভাবিক করে নিলেন। পদ্মজা চোখ ঘুরিয়ে দেখছে পুলিশ এসেছে কি না! চারিদিকে এত মানুষ। পদ্মজাকে এদিক-ওদিক উঁকি দিতে দেখে হেমলতা মেয়ের দিকে তেড়ে যান। চোখ রাঙিয়ে পদ্মজার মাথা ঢেকে দিলেন ওড়না দিয়ে। পদ্মজা দ্রুত ওড়নার আঁচল মুখে চেপে ধরে গোয়ালঘরে ঢুকে পড়ে। তার মা চায় না সে কখনো এত মানুষের সামনে থাকুক।

হেমলতা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন, পদ্মজা গোয়ালঘর থেকে উঁকি দিয়ে বাইরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশের দল আসে। সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হানিফের লাশ নিয়ে যায়। লোকমুখে শোনা যায়, হানিফ খুন হয়েছে শেষ রাতে। সকালে লঞ্চ ঘাটে লাশ ভেসে ওঠে!

হেমলতাকে পুলিশ নিয়ে যায়নি বলে পদ্মজা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে। মানুষের ভিড়ও কমে গেছে। হেমলতার মা কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে উঠোনের এক কোণে বসে আছেন। পদ্মজা গুটিপায়ে গোয়ালঘর থেকে বেরিয়ে আসে। পদ্মজার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসেন হেমলতা। সেই হাসি দৃষ্টিগোচর হয় হেমলতার মা মনজুরার। তিনি কিছু একটা ভেবে নিয়ে হেমলতার কাছে এসে কিড়মিড় করে বললে, ‘তুই খুন করছস?’

সঙ্গে সঙ্গে হেমলতা জবাব দিলেন, ‘তোমার এমন মনে হচ্ছে কেন?’

হেমলতার কণ্ঠ স্বাভাবিক। পদ্মজা এই প্রশ্ন শুনে ভয় পেয়ে গেছে।

যদি নানু পুলিশকে বলে দেয়? পুলিশ তো তার মাকে নিয়ে যাবে!

‘কাইল রাইতে তুই আইছিলি হানিফের ঘরে। আমি দেহি নাই?’ রাগে কাঁপছেন মনজুরা।

‘হুম এসেছি।’ হেমলতার নির্বিকার স্বীকারোক্তি।

‘কেন মারলি আমার ছেড়ারে? তোর কী ক্ষতি করছে?’

‘আসছি বলেই আমি খুন করেছি?’

‘এত রাইতে তুই তার কাছে আর কী দরকারে আইবি?’

‘আমি তাকে মারতেই যাব কেন?’

মনজুরা আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন হেমলতার দিকে। হেমলতার চোখ মুখ শক্ত। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে মনজুরা চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘পুলিশের কাছে যামু আমি।’

পদ্মজা কেঁদে উঠল। অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল, ‘নানু, এমন করো না।’ হেমলতা নিচু স্বরে কঠিন করে বললেন, ‘আমার মেয়েদের থেকে আমাকে দূরে সরানোর চেষ্টা করো না, আম্মা। ফল খুব খারাপ হবে।’

পদ্মজার মনে হলো মনজুরা ভয় পেয়ে গেছেন। তার চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়েছে শঙ্কা। তিনি সবসময়ই হেমলতাকে ভয় পেয়ে চুপসে থাকেন। পদ্মজা বুঝে উঠতে পারে না, নানু কেন ভয় পায় মাকে? মায়ের অতীতে কী ঘটেছে? কেন তিনি এমন কাঠখোট্টা? ছেলের খুনিকে কোনো মা ছেড়ে দেয়? নানু কেন ছাড়লেন? মেয়ে বলে? নাকি অন্য কারণ আছে? কোনো উত্তর নেই। এসব ভাবলে ভীষণ মাথা ব্যথা হয়। অন্য আট-দশটা পরিবারের মতো তারা নয় কেন? নাকি গোপনে সব পরিবারেই এমন জটিলতা আছে?

প্রশ্ন হাজারটা!!

উত্তর কোথায়?

সেদিন রাতে খাওয়ার সময় হেমলতা নিম্নস্বরে পদ্মজাকে ডাকেন, ‘পদ্ম?’

‘জি, আম্মা।’

‘আমি হানিফকে খুন করিনি। কারা করেছে তাও জানি না।

কথাটি শুনে পদ্মজা অবাক হয়। তার মা মিথ্যে বলে না। তাহলে কারা খুন করল? পদ্মজা প্রশ্ন করল, তাহলে শেষ রাতে মামার কাছে কেন গিয়েছিলে আম্মা?’

হেমলতা জবাব না দিয়ে খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলেন।

পদ্মজার ভাবনার সুতো কাটল কারো পায়ের আওয়াজ শুনে। ঘাড় ঘুরিয়ে মোর্শেদকে দেখতে পেল। মোর্শেদ পদ্মজাকে ঘাটে বসে থাকতে দেখে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেললেন, ‘এই ছেড়ি, যা এন থাইকা।’

জন্মদাতার এমন দূর দূর ব্যবহারে পদ্মজার কান্না পায়। নিঃশব্দে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে, তা আড়াল করে ব্যস্ত পায়ে বাড়ির ভেতর চলে যায় সে।

কয়েক মাস পর পদ্মজার মেট্রিক পরীক্ষা। নিয়মিত স্কুলে যেতে হয়। তিন বোন বই নিয়ে সড়কে ওঠে। পদ্মজার কোমর অবধি ওড়না দিয়ে ঢাকা। পূর্ণা একনাগাড়ে বকবক করে যাচ্ছে। স্কুলে যাওয়া অবধি কথা বন্ধ হবে না, মাঝে মাঝে জোরে জোরে হাসছেও! মেয়েটার হাসির রোগ আছে বোধহয়। একবার হাসি শুরু করলে আর থামে না। পদ্মজা বার বার বলেছে, ‘আম্মা

রাস্তায় কথা বলতে আর হাসতে মানা করছে। চুপ কর

তবুও পূর্ণা হাসছে। বাড়ির বাইরে এসে সে মুক্ত পাখির মতো আচরণ করে। তাকে দেখে মনে হয়, খাঁচা থেকে মুক্ত হয়েছে।

‘পদ্ম…ওই, পদ্ম। খাড়া।’

পদ্মজা ক্ষেতের দিকে তাকাল। ক্ষেতের আইল ভেঙে দৌড়ে আসছে লাবণ্য। একই সঙ্গে পড়ে দুজন। কাছে এসে হাঁপাতে লাগল লাবণ্য। শান্ত হওয়ার পর চারজন মিলে স্কুলের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে।

‘বাংলা পড়া শিখে এসেছিস বলল পদ্মজা?’

তার প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে লাবণ্য বলল, ‘আরে ছেড়ি, বাড়িত শুদ্ধ ভাষায় কথা কইলে বাইরেও কইতে হইব নাকি?’

‘আমি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারি না।’

লাবণ্য অসন্তোষ প্রকাশ করল। সে অলন্দপুরের মাতব্বর বাড়ির মেয়ে। তাদের বাড়ির সবাই শিক্ষিত। তবুও তারা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, পরিবারের দুই-তিন জন সদস্য ছাড়া। আর পদ্মজার চৌদ্দ গুষ্ঠি মূর্খ, দুই- তিন জন ছাড়া…তবুও এমন ভাব করে! আঞ্চলিক ভাষা নাকি পারে না!

‘সত্যি আমি পারি না। ছোটো থেকে আম্মা শুদ্ধ ভাষা শিখিয়েছেন। উনিও এই ভাষাতেই কথা বলেন। তাই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেই আরাম পাই।’

‘পূর্ণা তো পারে।’

‘আমার চেষ্টা করতে ইচ্ছে হয় না।’

‘আইচ্ছা বাদ দে। শুন, কাইল আমরার বাড়িত নায়ক-নায়িকারা আইব।’

পূর্ণা বিগলিত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘কেন আসবে? কোন নায়ক?

‘শুটিং করতে। ছবির শুটিং।’

পদ্মজা এসবে কোনো আগ্রহ পাচ্ছে না। পূর্ণা খুব আগ্রহবোধ করছে। সপ্তাহে একদিন সুমিদের বাড়িতে গিয়ে সাদাকালো টিভিতে ছায়াছবি দেখে, তাই অভিনয় শিল্পীদের প্রতি তার আগ্রহ আকাশছোঁয়া। পূর্ণা গদগদ হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘কোন নায়ক নায়িকা? বলো না লাবণ্য আপা!’

‘দাঁড়া! মনে করি।’

পূর্ণা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। লাবণ্য চোখ বুজে মনে করার চেষ্টা করল। এরপর মনে হতেই বলল, ‘লিখন শাহ আর চিত্রা দেবী।’

‘তুমি আমার ছবির নায়ক-নায়িকা?’

‘হ।’

স্কুলের যাওয়ার পুরোটা পথ লাবণ্য আর পূর্ণা ছায়াছবি নিয়ে আলোচনা করল। মূল বক্তব্যে ছিল সুদর্শন অভিনেতা— লিখন শাহ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp