আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৬২ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          সকালে মৌনির ঘুম ভাঙলো বেশ সময় নিয়ে। ঘরের বাইরে তখন পাখিদের মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। মৌনি আড়মোড়া ভেঙে বাংলোর বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে মনটা ভরে গেল অকৃত্রিম মুগ্ধতায়। গতকাল রাতে যে ভয়টা ভাল্লুকের মতো থম ধরে ছিলো বুকের ভেতর, সকালের নরম রোদে সেই ভয়টা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। মৌনি গায়ে চাদর জড়িয়ে বারান্দার রেলিঙে ঝুঁকে আশপাশটা দেখল। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো লনে। গতকাল যেরকমটা ভেবেছিল, জায়গাটা আসলে ঠিক সেরকম নয়। সন্ধ্যার ধূসর অন্ধকারে পশ্চিমের যে ছায়াবীথিকে সে জঙ্গল ভেবে ভুল করেছিল। সেটা আদতে কোনো জঙ্গল নয়। কিছু অপরিচিত গাছের সারি আর ফুলগাছের ঝাড়। প্রতিটি গাছের গায়ে লিখে রাখা হয়েছে তাদের স্থানীয় নাম, উৎপত্তি এবং বৈজ্ঞানিক পরিচয়। রক্তজবা, নয়নতারা, কামিনী– গাছে গাছে অসংখ্য ফুলের মেলা। মৌনি একটা নয়নতারা ফুল ছিঁড়ে কানের পাশে গুঁজে সরু রাস্তাটা ধরে সামনে এগুলো। গাছগুলো পিছু ফেলতেই বেরিয়ে এলো মস্ত এক উঠোন। সদ্যই ঝাড়ু দেওয়া হয়েছে। কোথাও একটি ঝরা পাতাও অবশিষ্ট নেই। উঠোনকে ঘিরে নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে আছে দুটো একতলা বাংলো। তার পাশে রান্নাঘর। এখানেই কালকে খেতে এসেছিলো মৌনি। একটু দূরে টঙ ঘরটিও দাঁড়িয়ে আছে একলা। রাতের অন্ধকারে ওপাশের জঙ্গলটাকে যত গভীর আর ভয়ংকর মনে হয়েছিল, সকালে তাদের ততটাই নির্দোষ বৃক্ষদল বলে মনে হচ্ছে। মৌনি হেঁটে টঙ ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার পায়ের শব্দ পেয়েই ঝরা পাতায় খসখস শব্দ তুলে সরে গেল একটি মেটে রঙের কাঠবিড়াল। এছাড়া কোথাও কেউ নেই। এই রিসোর্টে এখনো যেন ঘুম ভাঙানো পায়রারা জেগে উঠেনি। 
‘ আপনার কিছু লাগবে ম্যাম?’ 
ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল মৌনি। রান্নাঘরের পেছনে একটি ছোট্ট পাকা ঘর। সেখান থেকেই বেরিয়ে এসেছে ছেলেটি। চোখদুটো এখনও ঘুম ঘুম। মৌনি বলল,
‘ না। কিছু লাগবে না। রিসোর্টটা ঘুরে দেখছিলাম।’ 
ছেলেটি মাথা হেলিয়ে ফের ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। মৌনি হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলো নিজের বাংলোর কাছে। এই রিসোর্টের সব কিছুই কাঠের তৈরি। পদ্ম পুকুরের ঘাটটাও বাঁধানো হয়েছে নানন্দিক কাঠে। মৌনি কিছুক্ষণ পুকুরের পাড়ের দোলনায় বসে থাকল। ছোট্ট পুকুরটিতে অসংখ্য লাল পদ্ম। দোলনায় দোল খেয়ে অনায়াসে চলে যাওয়া যায় পুকুরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। দখিনা হাওয়া বইছে। 
মৌনি তার রেশমের মতো মসৃণ চুলগুলো খুলে দিলো আনমনে। গতকাল রাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ভোর হলেই পালিয়ে যাবে এই নির্বাসিত বাংলো থেকে। কিন্তু ভোর হওয়ার পর সে অনুভব করছে, বাংলোটা তার ভালো লেগে গিয়েছে। মনের ঝড় থামাতে এরকম 
 প্রকৃতিঘেরা দূর্গই তো তার দরকার ছিলো। কিন্তু নিরাপত্তা? দীর্ঘশ্বাস ফেলল মৌনি। পশ্চিমাকাশে ফের অন্ধকার জমতে আরম্ভ করেছে। কোথা থেকে উড়ে আসছে কালো কালো মেঘ। মৌনি কিছুক্ষণ আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে এলো। রিসোর্টের সামনে সরু লাল মাটির পথ। তার ওপাশেই কিছুটা পতিত জমি পেরিয়ে নিরুত্তাপ উদাসীনতায় উঠে গিয়েছে কয়েকটি পাহাড়। গায়ে তার অলংকারের মতোন সেজে আছে বিস্তৃত চা বাগান। পাহাড়ের গোড়ায় কাঁটাতারের বেড়া। মৌনি মাটির পথটা ধরে হাঁটতে লাগল সামনের দিকে। এই চা বাগানের প্রবেশ পথটা এদিকেই কোথাও থাকবে নিশ্চয়? সামনে এগিয়ে তাদের রিসোর্টের মতোই আরেকটি রিসোর্ট আবিষ্কার করে যারপরনাই চমৎকৃত হলো মৌনি। কেবল রিসোর্টই নয় দশ-বারোটা ঘর নিয়ে একটা আদিবাসী পল্লিও আছে এদিকে। একটা মনিহারি দোকানও পেলো। খোপের মতো জীর্ণ দোকানে চানাচুর, বিস্কুটের প্যাকেট ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। দোকানের সামনে অর্ধনগ্ন এক শিশু বিস্কুটের প্যাকেট হাতে চোখ বড় বড় করে দেখছে মৌনিকে। মৌনি সেখানের এক লোককে জিজ্ঞেস করলো, 
‘ এই চা বাগানে যাওয়ার পথটা কোনদিকে?’ 
লোকটি দোকানের মাচায় বসে ছিলো৷ মৌনির প্রতি তার খুব একটা আগ্রহ নেই। বড়ো অনিচ্ছায় হাত তুলে আদিবাসী পল্লির ভেতর দিয়ে সরু পথটা দেখিয়ে দিলো। মৌনি সেই পথ ধরে যেখানে এসে পৌঁছাল তা যেন এক কল্পনার ক্যানভাস। চারদিকে সবুজের ঢল। গায়ে লাগছে ফুরফুরে হাওয়া। মৌনির বহুদিন পর কোনো দায়বদ্ধতা, কোনো চাপ ছাড়া কেবল নিজের জন্য আঁকতে বসতে ইচ্ছে হলো।  

মাথায় রঙের কোলাহল নিয়ে তড়িঘড়ি করে রিসোর্টে ফিরে এসে ফটকের কাছেই এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল মৌনির। ঠিক দেখা হওয়া নয়। দেখা হওয়া ব্যাপারটা দ্বিপাক্ষিক। কেবল মৌনিই দেখল তাকে। একটা ওভার সাইজড টি-শার্ট, খাদির চাদর আর থ্রী-কোয়ার্টার প্যান্ট পরে মৌনির উল্টো পথ থেকে নীরবে হেঁটে এসে ঢুকল রিসেপশনে। মৌনির দিকে সেভাবে তাকাল না। রিসেপশনিস্টের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এসে ফটকের কাছে ঝিমুতে থাকা কুকুর দুটোকে দুটো বিস্কুট খেতে দিলো। মাথায় হাল বুলিয়ে আদর করে হেঁটে চলে গেল রিসোর্টের ভেতরের দিকে। লোকটিকে দেখে কেন যেন ভারি পরিচিত মনে হলো মৌনির। কোথায় যেন দেখেছে এর আগে। কিন্তু কোথায় দেখেছে? মৌনির ভাবনার মাঝেই রিসেপশন থেকে বেরিয়ে এলো রিসোর্টের ম্যানেজার। নির্মল হেসে বলল,
‘ ঘুরতে বেরিয়েছিলেন? এখানে কেমন লাগছে, ম্যাম?’ 
মৌনি হেসে বলল,
‘ বেশ ভালো!’ 
তারপর দূরের পাহাড়ের দিকে একবার তাকিয়ে জানতে চাইল, 
‘ আপনাদের রিসোর্টটা তো শহর থেকে বেশ দূর। নিরাপত্তার সংকট হয় না কোনো?’ 
ম্যানেজার মৌনির মনের ভয় বুঝতে পেরে বলল, 
‘ ওসব নিয়ে একদম দুশ্চিন্তা করবেন না, ম্যাম। নিরাপত্তার ব্যবস্থা আমাদের করা আছে।’ 
কী রকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা আছে সে নিয়ে আর প্রশ্ন করলো না মৌনি। তখনও তার মাথায় রঙেরা প্রজাপতির মতো উড়ছে। এখনই এদের কাগজে ধরে ফেলতে না পারলে কিছুতেই আর বাগে পাওয়া যাবে না। মৌনি ম্যানেজারের কাছ থেকে কোনোরকমে বিদায় নিয়ে ফিরে এলো নিজের বাংলোতে। শহরে ফেরার কথা বিস্মৃত হয়ে পুবের জানালাটা খুলে দিয়ে ইজেল ক্যানভাস টেনে বসল। 

মৌনির আঁকা যখন মোটামুটি শেষ হলো তখন প্রায় বিকেল। ইজেল ক্যানভাস একপাশে সরিয়ে রেখে রঙ মাখা হাতেই জানালার পাশে এসে দাঁড়াল সে। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে দূরের পাহাড়টা দেখতে দেখতে রাস্তার উপর চোখ সরাতেই সকালের সেই লোকটিকে চোখে পড়ল। সম্ভবত শহর থেকে ফিরছেন। পরনে ধূসর রঙের পলো শার্ট আর জিন্স। লম্বা ছিপছিপে শরীর। তাকে দেখেই ছুটে এলো রিসোর্টের কুকুর দুটো। তাদের সঙ্গে সম্ভবত ভদ্রলোকের গভীর বন্ধুত্ব। মৌনি তাদের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার অন্যমনস্ক ভাবনার মাঝেই লোকটি আচমকা চোখ তুলে তাকাল। চোখে চোখ পড়তেই মৌনির মনে পড়ে গেল, লোকটিকে সে দেখেছিল রংপুরের বাসে। পঞ্চগড় থেকে ফেরার পথে ভয়াবহ দূর্ঘটনা থেকে রক্ষা করে হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলো যেই লোকটা– এই তো সেই! চেহারা আগের মতোই আছে। তামাটে গায়ের রঙ, কঠিন চোয়াল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, আকর্ষণীয় দেহষৌষ্ঠব। কেবল চুলগুলো একটু বেড়েছে। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপে তাকিয়ে থেকে দু'জনেই খুব সহজভাবে ফিরিয়ে নিলো চোখ। মৌনির অলস দৃষ্টি ফের স্থির হলো দূরের পাহাড়ে। লোকটিও কুকুরদের গায়ে আদর দিতে দিতে চলে গেল রিসোর্টের প্রবেশদ্বারের দিকে। পশ্চিমাকাশে সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে মৌনিকে জানানো হলো ডাইনিংয়ে তার ইফতার সার্ভ করা হয়েছে। সে চাইলে ডাইনিংয়ে এসে বসতে পারে। মৌনি ঘরটা তালাবদ্ধ করে পোর্টারের সঙ্গেই বেরিয়ে এলো। অন্যান্য জায়গায় গোধূলির পর সন্ধ্যা নামে, এই রিসোর্টে সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসে আঁধার ঢাকা জঙ্গল। মৌনি সেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পোর্টারকে জিজ্ঞাসা করলো,
‘ এখানে কতজন স্টাফ কাজ করছেন?’ 
পোর্টারটি গতকালের সেই পনেরো ষোল বছরের ছেলেটি। সে ঘাড় ফিরিয়ে মৌনির দিকে তাকিয়ে চেহারায় ছদ্ম গাম্ভীর্য নিয়ে বলল,
‘ বর্তমানে সাতজন। অফ-সিজনে স্টাফ কম থাকে।’ 
মৌনি বলল,
‘ তাহলে প্রতিদিন আপনিই কেন ডাকতে আসেন আমায়?’ 
ছেলেটি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একটু থামল। তারপর বলল,
‘ প্রতিটি বাংলোর জন্য আলাদা আলাদা পোর্টার থাকে। আপনাকে সার্ভ করার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে। এই বাংলোতে যতদিন থাকবেন। আমিই আপনাকে সার্ভিস দিবো।’ 
মৌনি বুঝদারের মতো মাথা নাড়ল। গতকালের সেই টঙ ঘরে গিয়ে বসতেই ছেলেরা একে একে খাবার এনে হাজির করতে লাগল তার সামনে। খাবার আনা শেষে একজন পোর্টার খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল,
‘ ম্যাম, হিম কুঁড়ি বাংলোর গেস্ট আপনাকে তার সঙ্গে ইফতারের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আপনি যদি অনুমতি দেন তিনি নিজে এসে আপনাকে ইনভাইট করবেন।’ 
মৌনি হঠাৎ করে তার কথার অর্থ বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। জিজ্ঞাসা করল,
‘ হিম কুঁড়ি?’ 
ছেলেটি হাতের ইশারায় সামনের বাংলোটি দেখিয়ে দিলো। মৌনির মনে পড়ল, এখানের প্রত্যেকটি বাংলোরই আলাদা আলাদা নাম আছে। মৌনির বাংলোর নাম, ‘অপেক্ষা’। মৌনি এই প্রস্তাবের বিপরীতে কী বলবে বুঝতে না পেরে ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ-না পর্যায়ের কিছু একটা বুঝাল। পোর্টার সেটাকে হ্যাঁ নাকি না ধরে নিলো তা মৌনি জানে না। তবে কিছুক্ষণ পর সামনের সেই ছনের চালার ডাইনিং থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল বিকেলের সেই লোকটিকে। খুব স্মার্টলি, লম্বা পায়ে এগিয়ে এসে যখন সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়াল মৌনি এক মুহূর্তের জন্য খুবই নার্ভাস হয়ে পড়ল। লোকটি সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে খুব সহজ গলায় বলল,
‘ হ্যালো! আমি ওদিকে ইফতার করছি। আপনার প্রাইভেসিতে ব্যাঘাত না ঘটলে আপনি আমার সঙ্গে জয়েন করতে পারেন।’ 
মৌনি ভেতর ভেতর অপ্রতিভ হয়ে পড়লেও সৌজন্যতার হাসি হেসে বলল,
‘ শিওর।’ 
ভদ্রলোক প্রত্যুত্তরে হেসে সিঁড়ির দিকে হাত প্রসারিত করে বিনয়ের সঙ্গে বলল, 
‘ প্লিজ, আসুন।’ 
ভদ্রলোকের গলার স্বর ঝরঝরে। প্রতিটি শব্দের উচ্চারণ ছাড়া ছাড়া, চমৎকার। যেন সর্বক্ষণ কবিতা আবৃত্তি করছে। মৌনি সুদর্শন পুরুষ দেখে যতটা দ্রবীভূত হয় তার চাইতেও বেশি দ্রবীভূত হয় সুশ্রাব্য কণ্ঠস্বরে। ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর তাকে ভেতর ভেতর খানিকটা দ্রবীভূত করে তুলল। ভদ্রলোকের সঙ্গে তার ডাইনিং স্পেসে গিয়ে বসতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 
‘ এখানে একা এসেছেন আপনি?’ 
মৌনি একজন পোর্টারকে ডেকে তার খাবারগুলো এখানে সার্ভ করার আদেশ দিয়ে বলল, 
‘ হ্যাঁ।’ 
ভদ্রলোকের মুখ দেখে ভেতরের খবর বুঝার উপায় না থাকলেও ভেতর ভেতর তিনি সম্ভবত খানিকটা বিস্মিত হলেন। বললেন, 
‘ আপনার সাহসের প্রশংসা না করে পারছি না। বাংলাদেশের সামগ্রিক যে অবস্থা তাতে এমন নির্জন প্রত্যন্ত অঞ্চলে একা বেড়াতে আসা মেয়েদের জন্য অনেক দুঃসাহসিক কাজ।’ 
মৌনি হেসে বলল,
‘ থেংকিউ। তবে আমি এতোটাও দুঃসাহসিক নই। এখানে আসলে একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে। আমি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রিভিউ দেখে বাংলোটা বুক করেছি। ছবিতে পরিবেশটা চমৎকার লাগল। তাছাড়া দীর্ঘ সময় থাকবো। দামও রিজেনবল তাই এতোকিছু না ভেবে বুক করে ফেলেছি। এখানে আসার পর বুঝতে পারলাম। কাজটা একদম ঠিক হয়নি। নিরাপত্তার ব্যাপারে আরও খোঁজ নেওয়ার দরকার ছিলো।’ 
ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন। ততক্ষণে ইফতারের সময় হয়েছে। একজন পোর্টার ইতোমধ্যেই জানিয়ে গিয়েছে খেতে শুরু করবার কথা। মৌনি খাবার মুখে দিয়ে বলল,
‘ আপনার নামটা এখনও জানা হয়নি।’ 
‘ আহসান।’ চাকু আর কাঁটা চামচের যুদ্ধ করতে করতে শব্দটা বলে মুখ তুলে তাকাল লোকটি। বলল,
‘ আহসান তাহমিদ।’ 
নামটা শুনে অধিক বিস্ময়ে খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল মৌনির। অবাক হয়ে বলল,
‘ আহসান? হোয়াট আ কো-ইন্সিডেন্স। আমার নামও আহসান৷ মৌনি আহসান।’ 
আহসান হাসল। বলল,
‘ আপনি সম্ভবত লেখালেখি করেন?’ 
মৌনি অবাক হয়ে বলল,
‘ টুকটাক লিখি। কিন্তু আপনি কী করে জানলেন?’ 
আহসান মৌনির দিকে খাবারের বাটিগুলো এগিয়ে দিতে দিতে বলল,
‘ আপনার একটা লেখা পড়েছিলাম পত্রিকায়। 
তারপর আপনার লেখা একটি গল্পের উপর টেলিফিল্ম দেখেছি কিছুদিন আগে।’ 
মৌনি চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল, 
‘ আপনার কি মনে আছে, এর আগেও একবার দেখা হয়েছিল আমাদের? আপনি আমাকে সাহায্য করেছিলেন একটি ইন্সিডেন্টে।’ 
আহসান মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, 
‘ হ্যাঁ, মনে আছে।’ 
মৌনি সন্দিগ্ধ গলায় জানতে চাইল, 
‘ তখনও কি চিনতেন আমায়?’ 
‘ না। আপনার নাম জেনেছি আমি আরও অনেক পরে। আমি সাধারণত আমাদের দেশীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কাজগুলো খুব একটা ফলো করি না। কিন্তু এই টেলিফিল্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে গল্প আর পরিচালকের খুব প্রশংসা করলো। তার বাড়াবাড়ি প্রশংসা শুনে দেখলাম। গল্পকারের নামের জায়গায় আপনার নামটা চোখে পড়ল। আমি অবশ্য জানতাম না আপনিই সেই মৌনি আহসান। আপনাকে অবজারভ করে ধারণা থেকে বলেছি। ব্যাটে, বলে লেগে গেল। টেকনিক্যালি, আমি এখনও আপনাকে চিনি না।’ 
মৌনি মাথা নাড়ল। সোশ্যাল মিডিয়ার সীমিত গণ্ডিতে তার যে কিছু পরিচিতি আছে সে সম্পর্কে সে ওয়াকিবহাল। কিন্তু সেই মিথ্যে জনপ্রিয়তা কোনোদিনই খুব একটা স্পর্শ করতে পারেনি তাকে। তারপরও আজ এই অপরিচিত স্থানে প্রায় নির্বাসিত একটি জায়গায় একমাত্র পরিচিত লোকটির মুখে নিজের কাজের কথা শুনে একটু আন্দোলিত হলো তার মন। হেসে বলল,
‘ ঠিক আছে। লেটস্ ইন্ট্রডিউস। আমি মৌনি আহসান। লেখালেখি, আঁকাআঁকি, ছবি তোলা– এগুলো একই সঙ্গে আমার প্যাশন এবং প্রফেশন। আর আপনি?’ 
আহসান হাতের চামচ আর ছুরিটা নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসল। বলল,
‘ আমি আহসান তাহমিদ। রিটায়ার্ড মেজর অব বাংলাদেশ আর্মি।’ 
‘বাংলাদেশ আর্মি!’ মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল মৌনি। পৃথিবী কি এতোই ছোট? নাকি মৌনির ভেতরই আছে কোনো সামরিক চুম্বক? নয়তো ঘুরেফিরে তার আশেপাশে কেবলই কেন আসে ডিফেন্সের লোকজন? প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল মৌনি। কিছুক্ষণ দু'জনেই নীরবে খাওয়া-দাওয়া চালিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ মনে হয়েছে এমন ভাব করে মৌনি জিজ্ঞেস করলো, 
‘ ওহ, আচ্ছা। আপনার বন্ধু টেলিফিল্মে কোন চরিত্রে অভিনয় করেছে বলুন তো? টেলিফিল্মটা যদিও আমার দেখা হয়নি। কিন্তু চরিত্রগুলো সম্পর্কে জানি।’ 
আহসান নির্বিকার গলায় বলল,
‘ সাফাত। মেইন লীডে ছিলো সে। আপনি চেনেন ওকে?’ 
তারপর একটু বিস্ময় নিয়ে বলল,
‘ আপনিও কি আমার মতো দেশীয় কাজগুলো খুব একটা ফলো করেন না? আপনার গল্পটা নিয়ে এতো আলোচনা হচ্ছে চারদিকে। অথচ আপনি এখনও দেখেননি!’ 
আহসান সাফাতের বন্ধু শুনেই প্রায় বিষম খেয়েছিল মৌনি। এতোটাও আশা করেনি সে। পরবর্তী প্রশ্নে বিষম ভাবটা কাটিয়ে মৃদু হাসল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
‘ আগ্রহ হয়নি তাই দেখিনি। আমি নিজেকে কোনো বিষয় নিয়ে জোর করি না কখনো।’ 
প্রত্যুত্তরে আহসান বুঝদারের মতো মাথা নাড়ল। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে মৌনিকে তার বাংলো পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলো আহসান। ততক্ষণে সন্ধ্যা কেটে রাত নেমেছে। পুবের পাহাড়ের কোলে হলদেটে গোল চাঁদ। একটু পরই হলদে ভাব কেটে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে দুধসাদা আলো। জ্যোৎস্না স্নান করবে পাহাড়, চা বাগান আর দিগন্ত বিস্তৃত জঙ্গল। 
 আহসান চাঁদটির দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ আজ পূর্ণিমা। লেখক এবং চিত্রশিল্পীদের জ্যোৎস্নার প্রতি অন্যরকম মমতা থাকে। আপনারও আছে?’ 
মৌনি এতোক্ষণ লক্ষ্য না করলেও এবার মুখ তুলে চাঁদের দিকে তাকাল। বিস্ময় আর আনন্দের মিশেলে খুশি খুশি গলায় বলল,
‘ আরে তাই তো! হুমায়ুন আহমেদ অনেকবার তার বইয়ে জঙ্গলে পূর্ণিমা দেখার কথা লিখেছেন। আমার খুব শখ ছিলো কোনো এক পূর্ণিমার রাতে কোনো এক গহীন বনে গিয়ে বসে থাকব। আমার ইচ্ছে যে এভাবে পূরণ হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি। কী যে আনন্দ হচ্ছে আমার!’ 
আহসান হাসল। ততক্ষণে মৌনির বাংলোর সামনে চলে এসেছে তারা। চা বাগানের উপর পূর্ণিমার এই অপার সৌন্দর্য রেখে মৌনির কিছুতেই ঘরের ভেতর যেতে ইচ্ছে করছে না। আবার রাতের বেলা একা বাইরে থাকার ভরসাও হচ্ছে না৷ আহসান মৌনির মনের ভাব বুঝতে পেরে বলল,
‘ হাঁটবেন?’ 
এক মুহূর্ত দ্বিধা করে রাজি হয়ে গেল মৌনি। ওরা দু'জন রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে এসে লাল মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। দূরের গাছপালাগুলোকে এখন আর সামান্য গাছপালা মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে ভয়াল জঙ্গল। যেকোনো সময় মেঘস্বরে হুঙ্কার দিয়ে উঠবে হিংস্র কোনো জানোয়ার। মৌনি মুগ্ধ হয়ে চা বাগানের জ্যোৎস্না স্নান দেখতে দেখতে বুক ভরে শ্বাস নিলো। একপাশে বিস্তৃত জঙ্গল, অন্যপাশে জেদী পাহাড়, মাথার উপর পূর্ণিমার চাঁদ। চারদিকে থৈ থৈ জ্যোৎস্নার আলো। দুই একটা রাত পোকার ডাক ছাড়া কোথাও কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই। কেবল আছে মৌনি আর আহসান। 

সন্ধ্যার পর খুব ঝড়-বৃষ্টি হলেও এখন পরিবেশ শান্ত। শাওন মিলিটারি একাডেমি থেকে ফিরে এসেই কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়েছে। বসার ঘরে ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছে বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়রা। টেলিফোনে শাওনের মায়ের অহেতুক আহাজারিই তাদের উপস্থিতির কারণ। সন্ধ্যার পর থেকে দরজায় ক্রমাগত করাঘাত পড়ছে। 
‘ শাওন? শাওন দরজা খোল।’ 
শাওন এতোক্ষণ দরজা খোলেনি। এবার বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। ওপাশ থেকে মা বললেন, 
‘ তোর ছোট খালামণি এসেছেন। দরজা খোল।’ 
ছোট খালামণি অর্থাৎ মৌনির মা। এই ভদ্রমহিলা খুব চেষ্টা করেছিলেন যেন শাওনের চাকরিটা বেঁচে যায়। রিটায়ার্ড বিগ্রেডিয়ার স্বামীকে দিয়ে খুব দেন-দরবার করবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু লাভ বিশেষ হয়নি। খালুজান সম্ভবত ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো শাওন। খালামণির দিকে তাকিয়ে শুকনো হেসে বলল, 
‘ কেমন আছো খালামণি?’ 
মাসুমা ব্যথিত চোখে ভাগ্নের দিকে তাকিয়ে থেকে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সন্তপ্ত গলায় বললেন, 
‘ এমন কাজ কেন করলে তুমি বাবা?’ 
শাওন সে প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। শাওনের মা গম্ভীর গলায় বললেন, 
‘ বসার ঘরে আয়। তোর মামা, খালুরা তোর জন্য অপেক্ষা করছেন।’ 
কথাটা শুনেই মেজাজ তপ্ত হলো শাওনের। দুইদিন আগে খুব স্বাভাবিকভাবে তার ক্যাডেটশিপ বাতিল হয়ে গিয়েছে। ভদ্রভাষায় তাকে ঘাড় ধরে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে এই আত্মীয়দের সভার কী মর্মার্থ শাওন বুঝল না৷ শাওন কি অবুঝ? ওরা কি এখন বর্ণমালা ধরে ধরে ওকে বুঝাবে, বাতিল হওয়া কাকে বলে? ভেতর ভেতর ফুঁসে উঠলেও খালামণির সামনে কোনোরকম উচ্চবাচ্য করলো না শাওন। নীরবে বসার ঘরে গিয়ে ঢুকল। সকলের উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে মাথা তুলে তাকাতেই দেখল ঘরের এক কোণে বিরক্তমুখে বসে আছেন মৌনির বাবা মঈনুল আহসান। খালুজান সচরাচর শ্বশুরবাড়ির মুখদর্শন করেন না বলে এই সংকটময় পরিবেশেও তাকে দেখে কিছুটা অবাক হলো শাওন। বড় মামা মেঘস্বরে বললেন, 
‘ বসো।’ 
শাওন বসলো। মামা গম্ভীর গলায় বললেন, 
‘ এইযে ঘটনাটা ঘটল। এর কোনো ব্যাখ্যা আছে তোমার কাছে?’ 
শাওন কিছু বলল না। এর আগে যখন ট্রেনিং ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলো তখনও এরকম বহু প্রশ্ন তাকে করা হয়েছে। নতুন করে দেবার মতো কোনো উত্তর বা ইচ্ছা কোনোটাই তার নেই। ছোট মামা ধমক দিয়ে বললেন, 
‘ জীবনটা তোর কাছে ছেলেখেলা মনে হয়? ভালো একটা সাবজেক্টে গ্রাজুয়েশন করছিলি। ওটা ছেড়ে দিয়ে বিমানবাহিনীতে ঢুকলি। আমরা তোর ইচ্ছেকে মেনে নিলাম। তারপর সেটাও মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে এলি। নিজের ক্যারিয়ারটা যে এভাবে নষ্ট করলি, একবারও তোর মায়ের কথা ভেবেছিস? তোর বাবা মারা যাওয়ার সময় তোর মায়ের বয়স ছিল মাত্র বাইশ বছর। চাইলেই সে আরেকটি বিয়ে করে সুখের সংসার করতে পারতো। আমরা তাকে এই নিয়ে অনেক জোরজবরদস্তিও করেছি। কিন্তু সে কেবল তোর মুখের দিকে তাকিয়ে তার নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে দিয়েছে। আর তুই তার এই প্রতিদান দিলি?’ 
এটাও সেই আগের ফিরিস্তি। শাওন প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল। এই মানসিক বিপর্যয়ের সময় এসব অহেতুক বিচার সালিশ তার অসহ্য লাগছে। ক্যাডেটশিপ বাতিল হয়েছে তো হয়েছে, এখন এরা কী চাইছে তার থেকে? মাসুমা বললেন,
‘ শাওন, আপা তার জীবনে এমন কোনো দুঃখ নেই যা ভোগ করেননি। তোমার পড়াশোনা, তোমার লিভিং স্ট্যান্ডার্ট, শখ-আহ্লাদ মেটাতে সারাটা জীবন কেবল খেঁটে গিয়েছে। এই বয়সে এসেও তুমি তাকে পেরেশানিতে রাখছো। একমাত্র ছেলে হিসেবে তোমার আরও দায়িত্বশীল আচরণ আমরা আশা করেছিলাম।’ 
শাওন বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ এই দায়িত্বগুলো পৃথিবীর সব বাবা-মা-ই পালন করে খালামণি। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তার লেখাপড়া-খাওয়া-পরার খরচ বহন করতে হবে এই ব্যসিক ব্যাপারগুলো জেনেই তারা সন্তান জন্ম দেয়। 
বাবা বেঁচে ছিলেন না বলে মাকে এই দায়িত্বগুলো একা পালন করতে হয়েছে। মা বাকি সবার থেকে আলাদা কিছু করেননি। তাহলে বারবার একই কথা বলে কেন তোমরা আমাকে গিল্ট ফিল করানোর চেষ্টা করছো?’ 
শাওনের এমন অপ্রত্যাশিত উত্তরে হতবাক হয়ে গেলেন মাসুমা। শাওন বরাবরই খুব বাধ্য ছেলে। বড়দের মুখের উপর কথা বলা তার চরিত্রের বিপরীত। আজ সেই ছেলেই কিনা মুখের উপর বলছে, তার মা তার জন্য আলাদা কিছু করেনি! মাসুমা স্তম্ভিত হয়ে বললেন,
‘ তোমার মা তোমার জন্য আলাদা করে কিছু করেননি?’ 
শাওন স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘ না, করেনি। এটলিস্ট মাথায় তুলে নাচার মতো কিছু করেনি।’ 
মাসুমা এবার বাক্যহারার মতো শাওনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বড় মামা তার দুঃসাহস দেখে মেঘস্বরে বললেন, 
‘ সাবধানে কথা বলো শাওন। তোমার মা তোমার জন্য তার গোটা জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছে। নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছে। এগুলো তোমার চোখে মূল্যহীন?’ 
শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ না। মূল্যহীন না। মা আমার জন্য ততটুকুই করেছে যতটুকু তার কর্তব্য ছিলো। অনেকে সন্তানের প্রতি নিজের কর্তব্যটুকু পালন করেন না, মা করেছেন এজন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু সে কারণে আপনারা সবাই মিলে আমার জীবন দূর্বিষহ করে দিবেন সেটা তো আমি মেনে নেব না।’ 
বড় মামা হতবাক হয়ে বললেন, 
‘ আমরা তোমার জীবন দূর্বিষহ করে দিচ্ছি?’ 
শাওন শক্ত গলায় বলল,
‘ হ্যাঁ দিচ্ছেন। দফায় দফায় আপনাদের বিচার সালিশে বিরক্ত হয়ে গিয়েছি আমি। বুঝলাম আপনাদের বোন খুব ত্যাগ করেছেন। সেই ত্যাগ তার দায়িত্ব ছিলো। মা তার নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। সময় হলে আমিও আমার দায়িত্ব পালন করে ব্যাপারটা শোধবোধ করে দেব। এখন দয়া করে আমাকে বিরক্ত করা বন্ধ করুন।’ 
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে একটা শক্ত চপেটাঘাত এসে পড়ল শাওনের ডান গালে। শাওন এক পাশে হেলে গিয়ে চোখ বন্ধ করে আঘাতটা হজম করলো। 
‘ এতোটা নষ্ট হয়েছিস তুই শাওন? ছোটবেলা থেকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করা মামাদের সঙ্গে এরকম ব্যবহার তোর!’ 
মায়ের অবিশ্বাস্য কণ্ঠের বিপরীতে মুখ ফুলিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল শাওন। ঘাড় ফিরিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, 
‘ আর কতজনের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে হবে আমাকে মা? এতোজনের কাছে আমার ঋণ! এতো ঋণ নিয়ে আমাকে বড় করার চাইতে মেরে ফেলতে পারলে না? তাহলে তোমার-আমার দুজনের কষ্টই অনেকখানি কমে যেতো মা!’ 
মা চোখ রাঙিয়ে বললেন, 
‘ শাওন!’ 
শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার আগে হতাশ গলায় বলল, 
‘ মায়েদের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ হয় এটা খুবই বাজে কথা মা। তোমরা তো সন্তানদের ইনভেস্ট মনে করো। ইনভেস্টের তুলনায় লাভ না হলেই মন খারাপ। 
বাবা মরার পরপর আমিও মরে গেলেই ভালো হতো। তুমি নিশ্চিন্তে আরেকবার বিয়ে করতে পারতে। এখন তো তোমাকে রেখে শান্তিতে মরতেও পারব না। লাশের কাছে গিয়ে বলবে, মায়ের সব ইনভেস্ট নিয়ে মরলি লজ্জা করে না? আমি কোথায় যাই বলো তো মা?’ 
শাওনের মা স্তব্ধ হয়ে ছেলের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বলহীন বস্তুর মতো ধপ করে পড়ে গেলেন। মেঝেতে পড়ার আগেই ছুটে এসে তাকে বুকে আগলে নিলেন মাসুমা। তার দু’চোখে জল। শাওনের এই রূপ তিনি এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বললেন না। ঘরের এই অস্বস্তিকর আবহাওয়া কাটাতে শাওনের মেঝো খালু মঈনুলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
‘ আপনি চাইলেই কিন্তু ব্যাপারটা শর্ট আউট করতে পারতেন ভাই।’ 
মঈনুল আহসান তার কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। এতোক্ষণ তিনি নীরবে সকলের মন্তব্য শুনছিলেন। বললেন, 
‘ আমি কী করে?’ 
শাওনের ছোট মামার মেজাজ অল্পতে চটে যায়। শাওনের ব্যবহারে তিনি তখনও ক্ষুব্ধ। ভাগ্নের রাগটা প্রচ্ছন্নভাবে মঈনুলের উপর দেখানোর সুযোগ পেয়ে বললেন, 
‘ আপনার খুব অহংকার দুলাভাই। ক্ষমতা থাকলেই কেবল মানুষ হওয়া যায় না। বড় মন থাকতে হয়। এতিম ছেলেটাকে একটু সাহায্য করলে আপনার কোথায় কম পড়ে যেতো? ছেলেটা ডিপ্রেশড হয়েই এইরকম ব্যবহার করছে। আপনি যদি আগেই বিষয়টা সামলে নিতেন তাহলে এই পরিস্থিতি হতো না।’ 
মঈনুলের ভ্রু কুঁচকে গেল বিরক্তিতে। ঠান্ডা গলায় বললেন, 
‘ আমার সঙ্গে কথা বলার সময় ভেবেচিন্তে কথা বলবে আতিফ। তোমার ভাগ্নে একটা অপরাধ করেছে। সেই অপরাধের শাস্তি সে পাচ্ছে। অযোগ্যতাকে ক্ষমতা দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করলেই সে যোগ্য হয়ে যায় না। আমি অফিসারদের সঙ্গে কথা বলেছি। হি ইজ নট ম্যান্টালি ফিট ফর দিস জব। একজন ক্যাডেটের একটা মিনিমাম ম্যাচিউরিটি থাকা উচিত। সামান্য প্রেমকে যে হ্যান্ডেল করতে পারে না। প্রেমিকার বিরহে ট্রেনিং ছেড়ে পালিয়ে আসে সে দেশের জন্য নিজেকে কী করে উৎসর্গ করবে?’ 
ছোট মামা বললেন,
‘ এসব এই বয়সে টুকটাক হয়ই। বয়স হলেই..’ 
মঈনুল দাঁতে দাঁত চেপে তপ্ত গলায় বললেন, 
‘ অপরাধকে বয়স দিয়ে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করবে না আতিফ। অপরাধ সবসময়ই অপরাধ। অপরাধ করলে শাস্তি পাবে। শাস্তি থেকে শিখবে। নতুন করে শুরু করবে। একটা চাকরিই জীবনের একমাত্র গোল নয়। তোমাদের এসব ফালতু অজুহাতে বাচ্চারা নিজেদের অপরাধকে যৌক্তিক ভাবতে থাকে। অথবা জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। পঞ্চাশের কোটা পেরিয়েও তোমার এখনও বুদ্ধি হলো না আতিফ। গাধা গাধাই থেকে গেলে।’ 
বলেই উঠে দাঁড়ালেন মঈনুল। ছোট মামা তার শেষ কথাতে ক্ষেপে গেলেও বড় মামার ইশারায় ক্রোধ সংবরণ করলেন। মঈনুল আর এক মিনিটও অপেক্ষা না করে স্ত্রীকে ডেকে দৃঢ় পায়ে বেরিয়ে গেলেন। এই স্কাউন্ড্রেলদের ভিড়ে তিনি আর এক মুহূর্ত থাকবেন না। এসব মাথামোটা ষাঁড়গুলোর জন্যই তার শ্বশুরবাড়িতে আসতে ইচ্ছে হয় না। মৌনি আসুক মনে মনে তিনি সেটাও পছন্দ করতে পারেন না।  

সন্ধ্যার শেষ চিহ্নটাও মুছে ফেলে কংক্রিটের শহরে নেমে এসেছে আঁধার ঢাকা রাত। নাহিদদের কাওরানবাজারের অফিসে ইফতার পরবর্তী চায়ের আয়োজন চলছে। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হতে পারে, কোনো সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গনে আনন্দঘন এক ইফতার সমাবেশ শেষে খোশগল্পে মত্ত হয়েছে সদস্যরা। কিন্তু আদতে এখানে চলছে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। এতোদিন নাহিদ একা হাতে সব সামলালেও কয়েকদিন হলো একজন গ্রাফিক ডিজাইনার, ইলাস্ট্রেটর ও একজন মার্কেটিং ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আজ তাদের ম্যাগাজিন কাভারের খসড়া এসেছে। কভার নাহিদের পছন্দ হয়নি। সেখানে কী কী ভুল এবং পরিবর্তনযোগ্য তারই স্বতঃস্ফূর্ত আলাপ চলছে। এই কাজ শেষে মার্কেটিং ম্যানেজারের সঙ্গে ছোটখাটো একটি মিটিং আছে নাহিদের। অফিস টাইম রাত্রি আটটা পর্যন্ত। নাহিদের অবশ্য অফিস টাইম বলে কোনো ব্যাপার নেই। সে সর্বক্ষণ অন ডিউটি। অফিস টাইমের পর ম্যাগাজিনের আর্থিক তহবিল নিয়ে আদিব হোসেনের সঙ্গে বসতে হবে তাকে। আদিব হোসেন বেরিয়ে গেলে অফিসে আসবে সুহানা। তারপর আরও একটি দীর্ঘ মিটিং। সুহানা মেয়েটা বেশ চটপটে ৷ সে এই কয়েকদিনের প্রচেষ্টায় যে হাই প্রোফাইল ব্যক্তিদের এপ্রোচ করে ফেলেছে তা সত্যিই বিস্ময়জাগানিয়া। এদের মধ্যে দু'জনের প্রতি আগ্রহী নাহিদ। যদিও তাদের নগন্য বাজেটে তাদেরকে যথাযথ তৃপ্ত করা যাবে কিনা এই নিয়ে খানিকটা সংকোচ আছে নাহিদের। তারপরও দেখা যাক কী হয়! পার্ট টাইম কাজে কতোই বা চার্জ করবে তারা? নাহিদ তাদের শেষ সীমা পর্যন্ত এগুবে। তাতেও না হলে, নেই। মার্কেটিং ম্যানেজারের সঙ্গে মিটিং শেষে ভারি দরজা ঠেলে ব্যস্ত পায়ে অফিসের কনফারেন্স রুমে ঢুকল নাহিদ। সেখানে আদিব হোসেন ও কর্ণেল ফতেহ সিদ্দিক নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলেন। নাহিদকে দেখে কথা থামিয়ে বললেন, 
‘ বসো।’ 
নাহিদ বসল। পরপরই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো সৌধ। একটা রাফ ফাইল নাহিদের দিকে এগিয়ে দিয়ে পাশের চেয়ার টেনে বসল। নাহিদ ফাইলটা খুলে সরাসরি মূল প্রসঙ্গে চলে গেল। বলল,
‘ স্যার, ম্যাগাজিনের জন্য আমাদের বরাদ্দ বাড়াতে হবে। নয়-দশ লাখের কমে আসলে সম্ভব হবে না। সম্পূর্ণ নতুন একটি ম্যাগাজিনকে দাঁড় করাতে জনবল ও বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মূলধনের বিকল্প নেই। আর আমাদের তো জনবলও নেই। এডিটর ইন চিফ, ম্যানেজিং এডিটর, ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট, রাইটার, প্রুফরিডার, রিসার্চার, ফ্যাক্ট চেকার, গ্রাফিক ডিজাইনার, এইচআর, মার্কেটিং সেক্টর সবগুলোর দায়িত্ব ধরতে গেলে আমি আর সৌধই সামলেছি। এই সেক্টরগুলোতে কাজ করার মতো একটা লোকও আমাদের নেই। তারপরও সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের কনটেন্ট মোটামুটি ট্রেন্ডে আছে। আলোচনা হচ্ছে। নির্দিষ্ট একটা পাঠক শ্রেণি তৈরি হতে শুরু করেছে। গত দুই মাসে আমাদের অফিশিয়াল পেইজ ফলো করেছে প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ। তারমানে আমরা আড়াই লক্ষ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছি।’ 
এটুকু বলে থামল নাহিদ। এই বাচ্চা দুটো ছেলে পুরো প্রতিষ্ঠানের বুঝা একলা কাঁধে নিয়ে নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে দেখে কর্ণেল ফতেহ সিদ্দিক মুগ্ধ ও বিস্মত হলেও আদিব হোসেন খানিকটা অপ্রস্তুত বোধ করলেন। নাহিদ তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 
‘ সবার আগে আপনার নিয়োগ দেওয়া বুড়ো বামগুলোকে কৌশলে আপনার অন্য কোনো অফিসে শিফট করুন। এরা কেবল পান চিবুতে আসে। এদের আমাদের দরকার নেই। বর্তমানে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো কনটেন্টের মান ইনরিচ করা। অফিসের জন্য আমি নতুন কিছু এমপ্লয় হায়ার করেছি। মার্কেটিং সেক্টরে একজন, গ্রাফিক ডিজাইনার পদে একজন, ইলাস্ট্রেটর একজন। গ্রাফিক ডিজাইনার আর ইলাস্ট্রেটর ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করবে। তাদের স্যালারির রেঞ্জ এই ফাইলে লেখা আছে। রিসার্চার, ফ্যাক্ট চেকার এবং প্রুফ রিডার হিসেবে এপোয়েন্ট করা হয়েছে মিস সুহানাকে। উনার সিভি এখানে ইনক্লুড করা আছে। কর্ণেল স্যারকে এডভাইজার হিসেবে রাখা হয়েছে। আপনি চাইলে তাদের সিভিগুলো দেখতে পারেন।’ 
আদিব হোসেন হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নিলেন। গম্ভীর মুখে একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলেন। নাহিদ বলল, 
‘ আজকে আমাদের একটা মিটিং আছে। দু'জন ফরেনার কলিগ আমরা পেতে পারি। তাদের প্রোফাইল ঈর্ষনীয়। একজন ক্রিমিনাল সাইকোলজি নিয়ে ফুলটাইম রিসার্চ করছেন। অন্যজন ব্রিটেনে বসবাসকারী বাংলাদেশী লেখক। তরুণ কিন্তু লেখার হাত ভালো। এদের দু'জনকে পেলে কাজের কাজ হতো। কিন্তু তারা আমাদের বাজেটে ফিট হবেন কিনা এটা একটা চিন্তার ব্যাপার।’ 
আদিব হোসেন মাথা নাড়লেন। প্রত্যুত্তরে কিছু বলবেন তার আগেই দরজায় এসে দাঁড়াল অফিসের একমাত্র পিয়ন। টেবিলের উপর চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বলল, 
‘ সুহানা ম্যাডাম এসেছেন। উনি কি ভেতরে আসবেন স্যার?’ 
নাহিদ একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিয়ে বলল,
‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ আসতে বলুন। মিটিংয়ের সময় হয়ে গিয়েছে।’ 
তারপর আদিব হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, 
‘ লিগ্যাল এডভাইজার হিসেবে আমাদের একজন ভালো এডভোকেটও হায়ার করে রাখতে হবে, স্যার।’ 
কর্ণেল সাহেব এতোক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার মুখ খুললেন। বললেন, 
‘ আমার এক বন্ধু আছে। একসময় কোর্টে জাজ হিসেবে কাজ করেছে। দুই বছর হলো রিটায়ার করেছে। এই বয়সেও দারুণ এক্টিভ। তোমরা চাইলে আমি তার সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারি। আমার রেফারেন্সে সে রাজি হয়ে যেতে পারে। তবে তোমরা যদি তরুণ কোনো এডভোকেট চাও। তাহলে ভিন্ন ব্যাপার।’ 
নাহিদ জানাল, বয়স নিয়ে তাদের কোনো প্রিফারেন্স নেই। তিনি চাইলেই কথা বলে দেখতে পারেন। তাদের আলাপের মধ্যেই কনফারেন্স রুমে এলো সুহানা। সে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে দু'জন প্রার্থীর সঙ্গেই জুম এ কানেক্ট করা হলো। সুহানা ভেবেছিল, ভিনদেশি ক্লায়েন্ট হওয়ায় পুরো মিটিংটা বোধহয় তাকেই হোস্ট করতে হবে। কতৃপক্ষের পক্ষ থেকে ম্যাগাজিনটাকে তাদের সামনে উপস্থাপন করা, তাদের কাজ, চাহিদা, শর্ত সব তাকেই বলতে বলা হবে। সেজন্য আগেই এই বিষয়ে বিশদ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল সে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সমস্ত জরুরি কথা, জিজ্ঞেসা, উপস্থাপন তাদের সামনে জলের মতো সহজ ভাবে বলে গেল নাহিদ। কোথাও একটু থামল না, অপ্রস্তুত হলো না, স্ক্রিপ্টের প্রয়োজন হলো না। সুহানা প্রবল বিস্ময় নিয়ে লক্ষ্য করলো, নাহিদ অনর্গল ব্রিটিশ উচ্চারণে কথা বলছে। নাহিদের ব্রিটিশ উচ্চারণ চমৎকার। সুহানা নিজের মনেই খুব অপমানিত বোধ করলো। কেউ তার পরিকল্পনা জানতো না, প্রস্তুতি দেখেনি তারপরও নাহিদের আত্মবিশ্বাসে ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ওর মনে হলো কেউ যেন ভরা মজলিশে নিঃশব্দে তার গালে চপটেঘাত মেরে দিলো। সে ভেবেছিল, নাহিদ সম্ভবত ইংরেজিতে ফ্লুয়েন্ট না। বেশিরভাগ বাঙালি ছেলেমেয়েরা তো এরকমই হয়! ইংরেজিতে কথা বলতে গেলে অপ্রস্তুত বোধ করে। নাহিদের সম্পর্কে যতটুকু জেনেছে তাতে সে মফস্বল থেকে উঠে আসা ছেলে। তেমন মনোযোগী ছাত্রও না। ক্যাম্পাসে সে পারতপক্ষে যায় না। এমন ছেলে আর পাঁচটা বাঙালী ছেলের মতোই হবে এমনই কি স্বাভাবিক না? কোনো এক অজানা রাগ আর জেদে সুহানার চোখে জল আসতে চাইল। মুখটা ঢেকে গেল অমবস্যার অন্ধকারে। 

মিটিং শেষ করে সৌধকে নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়েই একটা সিগারেট ধরালো নাহিদ। এই কংক্রিটের শহরে তখন রাত এগারোটা বাজে। 
ওষ্ঠপুটে জ্বলন্ত সিগারেটটা চেপে ধরে বাইকে স্টার্ট দিতেই অফিসের ভেতরের গম্ভীর নাহিদ নিকোটিনের ধোঁয়ার মতো উড়ে গিয়ে দেখা দিলো চিরাচরিত নাহিদ। বাইকের স্পিড নব্বইয়ের উপরে তুলে দিয়ে বলল, 
‘ চল দেখি কোনো রেস্টুরেন্ট খোলা আছে কিনা। কাচ্চি খেয়ে অর্ধেক মন ভালো করবো। তারপর কিছুক্ষণ শহরে ঘুরেফিরে রূপবতী নারী দেখে বাকি মনটা ভালো করে বাসায় ফিরে যাব। কালকে ডিপার্টমেন্টে পরীক্ষা আছে। একটু পড়াশোনা করতে হবে।’ 
সৌধ পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে নাহিদের ঠোঁটের সিগারেটটা নিয়ে নিজে কয়েকবার ধোঁয়া ছেড়ে বলল, 
‘ এতো রাতে রূপবতী নারী কোথায় পাবি? তার চাইতে তোর দাদাজানের হাতেপায়ে ধরে একটা বিয়ে কর। তাহলে রাতের বেলায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে আর নারী দেখতে হবে না। বাসায় ফিরেই দেখতে পাবি। এই সুযোগে আমিও দেখতে পাব।’ 
‘ ওরে নিমকহারাম! তোর কেবল আমার বউয়ের দিকে নজর।’ 
তারপর দুষ্ট গলায় বলল,
‘ সতীনদের অবশ্য একে-অপরের দিকে নজর থাকে। এরা সুযোগ পেলেই একে অপরের দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকে। আমি যেহেতু বিয়ের পর দ্বিতীয় বউয়ের প্রতি বায়াসড হয়ে যাব। সারাদিন তাকে চুমু খাব। সে হিসেবে তোর নজর রাখা জায়েজ।’  
সৌধ বিরক্ত হয়ে তাকাল। অফিস থেকে যে ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে বেরিয়েছিল তা মুহূর্তেই কাচের মতো শত টুকরো হয়ে গেল। প্রবল রোষ নিয়ে বলল,
‘ তোর সমস্যা কী? সব কথা টেনে ওখানে নিয়ে যাস কেন? তোর জন্য সবাই ভাববে, আমি হয়তো আসলেই…’ 
নাহিদ অবাক হওয়ার ভান করে বলল, 
‘ হয়তো? হয়তো কী রে? তুই তো আসলেই।’ 
এবার আর মেজাজ ধরে রাখতে পারল না সৌধ। সিগারটটা ঠোঁটে চেপে ধরে পেছন থেকে নাহিদের গলা চেপে ধরলো। নাহিদ হেসে ফেলে বলল,
‘ ছাড় শালা! এক্সিডেন্ট করবে।’ 
সৌধ ছাড়ল না। ঘাড়ের উপর চাপ আরও বাড়িয়ে বলল, 
‘ দুলাভাই ডাক তাহলে ছেড়ে দেব।’ 
নাহিদ হো হো করে হেসে উঠে বলল,
‘ আমি দুলাভাই ডাকলেই মৌনি তোকে পাত্তা দেবে? ও আমাকেই পাত্তা দিলো না জীবনে।’ 
‘ তুই ওর ভাই। ভাইয়েরা এমনিতেও বোনদের কাছে পাত্তা পায় না। ভাইয়ের বন্ধুরা পায়।’ 
নাহিদ বলল,
‘ তুই তাও পাত্তা পাবি না। তুই তো আর ওর ভাইয়ের বন্ধু না। ভাইয়ের বউ, ওর ভাবি।’ 
সৌধর মেজাজ খারাপ হলো। এই ছেলের তো জীবনের মায়া বলতে নেই। গলায় চাপ খেয়েও এর ঘাউড়ামি যায় না। সৌধ এবার তাকে উচিত শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে তার ঘাড়টা মটকে দেওয়ার মতো একপাশে ঘুরিয়ে ফেলার চেষ্টা করলো। নাহিদ একটু বেকায়দায় পড়ে মাথা নেড়ে সৌধকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই ভারসাম্য হারিয়ে বাইকটা গিয়ে ঠুকে দিলো একটি গাড়ি। ওরা দু'জন ছিটকে পড়ল বাইক থেকে কিছুটা দূর। দু'জনেই সাময়িক ব্যথাবোধ কাটিয়ে সচেতন হয়ে তাকাতেই দেখল, তিনটি লম্বা ছায়া তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তিনজনের পরনেই পুলিশের পোশাক। ঢাকা শহরের লাখ লাখ গাড়ির মধ্যে তারা মরার জন্য খুঁজে খুঁজে পুলিশের গাড়িতেই ঠুকে দিয়েছে দেখে নাহিদ-সৌধ দু'জনেই খুবই আনন্দিত বোধ করলো। একজন কনস্টেবল নাহিদের কলার ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে অফিসারের মুখোমুখি দাঁড় করাল৷ অফিসার বিরক্ত মুখে বললেন,
‘ বাইক চালানোর সময় নিজেদের একশন সিনেমার নায়ক মনে করিস নাকি? রাত-বিরেতে ফাজলামো?’ 
নাহিদ অপরাধী গলায় বলল,
‘ সরি স্যার। বাইকের ব্রেক ফেইল হয়ে গিয়েছিল।’ 
অফিসার ধমক দিয়ে বললেন,
‘ ব্রেক ফেইল হয়ে গিয়েছিল! আমাদের দুগ্ধপোষ্য শিশু মনে হয়? এই তোদের হেলমেট কই? কাগজ-পত্র দেখা। রাত বিরেতে মদ খেয়ে মাতলামো!’ 
নাহিদ হতাশ গলায় বলল,
‘ মদ খাই নাই স্যার। মদ খাওয়ার টাকা নাই।’ 
পুলিশ অফিসার চোখ মটকে বললেন, 
‘ তারমানে টাকা থাকলে খেতি? এখন কি ছিনতাই করে মদ খাওয়ার টাকা জোগাড় করতে বেরিয়েছিস? দেখা কাগজপত্র দেখা।’ 
নাহিদ কাগজপত্র দেখাল। কাগজপত্র ঠিক থাকলেও দেখা গেল তিনদিন আগে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ। অফিসার ব্যাপারটা আবিষ্কার করে এমনভাবে তাকালেন যেন ছদ্মবেশী আসামীকে চোখের পলকে ধরে ফেলেছেন। নাহিদ কিছু টাকা দিয়ে ব্যাপারটা মীমাংসা করার চেষ্টা করলো। অফিসার টাকার ধার না ধেরে হুমকি ধামকি দিয়ে বাইক সিজ করে নিলেন। বললেন, 
‘ মদের প্রভাব কমলে কালকে থানায় গিয়ে বাইক ছাড়িয়ে আনবি।’ 
নাহিদ- সৌধ দু'জনেই অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। পুলিশের লোক বাইকটা নিয়ে চলে যেতেই নাহিদ সৌধর পায়ে একটা লাথি মেরে বলল,
‘ আরও শুনতে চাস দুলাভাই ডাক? শালা! পুলিশকে গিয়ে দুলাভাই ডাক গে যা।’ 
সৌধ পড়ে গিয়ে পায়ে ভালো রকম ব্যথা পেয়েছে। জখমের উপর নাহিদের লাথি পড়ায় ককিয়ে উঠে কটমট করে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে তেড়ে গিয়ে শক্ত মুষ্ট্যাঘাত করলো নাহিদের চোয়াল বরাবর। নাহিদও পিছিয়ে নেই। দুই বন্ধু কিছুক্ষণ প্রাণান্তকর লড়াই করে ফুটপাতে বসে হাঁপাতে লাগল। নাহিদ আস্তেধীরে একটা সিগারেট ধরিয়ে আরেকটি এগিয়ে দিলো সৌধর দিকে। কিছুক্ষণ নীরবে সিগারেট ফুঁকে দু'জনেই রওনা দিলো রাতের খাবারের বন্দোবস্ত করতে। নাহিদের ঠোঁটের কোণে তখনও রক্ত জমে আছে। হাতে-পায়ের চামড়া ছিঁড়েছে। সৌধর অবস্থা আরও করুণ। সে নাহিদের কাঁধে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। এতোকিছুর পরও দুই বন্ধু চোখে-মুখে কোনো ব্যথাবোধ নেই। দু'জনেই নির্বিকার। কিছুদূর হেঁটে হঠাৎ একটা লেডিস শো-রুমের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল নাহিদ। সৌধ ওকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে কাচের ওপাশেগাঢ় খয়েরি রঙের জামদানি পরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ম্যানিকিনের দিকে তাকাল। সন্দিগ্ধ গলায় বলল,
‘ কী হলো? নারী পাসনি বলি, নারী মূর্তি দেখতে লেগে গেলি নাকি ভাই?’ 
নাহিদ কিছু বলল না। সৌধর হাতটা কাঁধ থেকে সরিয়ে দরজা ঠেলে নীরবে ভেতরে ঢুকে গেল। সৌধ আকস্মিক অবলম্বন হারিয়ে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
‘ আরে ভাই! দেখবি ভালো কথা। আমাকে সঙ্গে নিয়ে যা।’ 
নাহিদ যেন শুনলোই না। সৌধ নিজেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকল। নাহিদ শাড়ির আঁচলটা কিছুক্ষণ হাত দিয়ে ছুঁয়ে রেখে সেলসম্যানকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো,
‘ এটার দাম কত?’ 
সেলসম্যান নাহিদের চোটগুলো একবার পর্যবেক্ষণ করে সন্দিগ্ধ গলায় বলল,
‘ পয়ত্রিশ হাজার পাঁচশো টাকা, স্যার।’ 
শাড়ির দাম শুনে চোয়াল ঝুলে পড়ার জোগাড় হলো সৌধর। নাহিদের বাহু টেনে ধরে বলল,
‘ একটা শাড়ির দাম পয়ত্রিশ হাজার টাকা! ডাকাতি নাকি? বিয়ের শখ মিটে গেছে। আমরা ব্যাচেলরই ঠিক আছি। চল ভাই বাড়ি যাই।’ 
নাহিদ একটু নড়লও না। সেখানেই গাড়লের মতো দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
‘ তোর কাছে কত টাকা আছে?’ 
সৌধ অবাক হয়ে বলল,
‘ মানে! টাকা দিয়ে কী করবি?’ 
‘ শাড়ি কিনব।’ 
সৌধ আশ্চর্য হয়ে বলল,
‘ তুই শাড়ি দিয়ে কী করবি?’ 
নাহিদ কিছু বলল না। নিজের পকেট হাতড়ে পাঁচ হাজারের বেশি টাকা পেলো না। কার্ডে বিশ হাজারের মতো টাকা আছে। নাহিদ ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
‘ দশ হাজার টাকা দে।’ 
সৌধ নাহিদের হাবভাব বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। নাহিদ আবার তাড়া দিতেই বলল,
‘ টাকা কি গাছের পাতা নাকি? চাইলি আর দিয়ে দিলাম। আমার কাছে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা হবে। বড় ভাইয়ের থেকে এই মাসে হাত খরচার টাকা পাইনি এখনও।’ 
নাহিদ হাত বাড়িয়ে বলল, 
‘ দুই হাজারই দে।’ 
সৌধ কয়েক সেকেন্ড দ্বিধা করে টাকাটা দিলো। নাহিদ গুণে দেখল আরও সাড়ে আট হাজার টাকার দরকার। নাহিদ একটু ভেবে ফোন বের করে দ্রুত ফোন করলো আদিব হোসেনকে। তখন মধ্যরাত। টপাটপ নেমে যাচ্ছে সব দোকানপাটের শাটার। এই শো-রুমটাও বন্ধ করবে বলে তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দোকানের স্টাফ। আদিব হোসেনও তখন নিন্দ্রাগত। এই অসময়ে নাহিদের ফোন পেয়ে তিনি যারপরনাই আশ্চর্য হলেন। ফোন তুলে ভ্রু কুঁচকে বললেন, 
‘ কী ব্যাপার নাহিদ?’ 
নাহিদ সরাসরি বলল,
‘ এক্ষুনি আমার বিকাশে সাড়ে আট হাজার টাকা পাঠাতে পারবেন, স্যার? ইমারজেন্সি।’ 
আদিব হোসেন কোনো বিপদের আশঙ্কা করেছিলেন বলে টাকার প্রসঙ্গে কপাল কুঁচকে ফেলে বললেন, 
‘ এতো রাতে টাকা দিয়ে কী করবে তুমি নাহিদ?’ 
নাহিদ বলল,
‘ দরকার আছে। আপনি পাঠান।’ 
আদিব হোসেন একবার ভাবলেন কী দরকারে চায় জানতে চাইবেন। কিন্তু মন বদলে ফোন রেখে বিনাপ্রশ্নে টাকা পাঠিয়ে দিলেন। সৌধ এই এক শাড়ির জন্য নাহিদের এমন পাগলামো দেখে হতচকিত হয়ে গেল। পুলিশ অফিসারের মতো তারও মনে হলো, নাহিদ কি মদ্যপ? হতভম্ব গলায় বলল,
‘ বাইক এক্সিডেন্ট করে তোর কী মাথা টাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছে নাহিদ? আমাদের মোটরসাইকেল পুলিশ সীজ করে নিয়ে গিয়েছে। ছাড়াতে কত টাকা লাগবে জানি না। তোর লাইসেন্স রি-নিউ করতে টাকা দরকার। এতো ঝামেলার মধ্যে তুই মাসের খরচের সব টাকা দিয়ে শাড়ি কিনছিস! পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই?’ 
নাহিদ কোনো কথা না বলে পেমেন্ট করে শাড়ির ব্যাগটা নিলো। সৌধ কিছুক্ষণ নাহিদকে পর্যবেক্ষণ করে বলল,
‘ এতো দাম দিয়ে শাড়ি কিনে তোর বুক ব্যথা করছে না?’ 
নাহিদ নিরুত্তাপ গলায় বলল,
‘ না। এক লাখ টাকা চাইলে এক লাখ দিয়েই কিনতাম।’ 
সৌধ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে ভীত চোখে একবার শাড়ির ব্যাগের ভেতর উঁকি দিলো। বলল,
‘ এই শাড়ির বিশেষত্ব কী?’ 
‘ আমার পছন্দ হয়েছে, এটাই বিশেষত্ব।’ 
সৌধ জানতে চাইল, 
‘ খুব পছন্দ হয়েছে?’ 
‘ হু।’ 
সৌধ এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হলো, নাহিদের মাথা পাগল হয়ে গিয়েছে। সেও একটু আগে দু'চোখ ভরে শাড়িটা দেখেছে, দাম শুনে আরও কড়া চোখে তাকিয়েছে। কোনোবারই এই শাড়ি এক লক্ষ টাকা দিয়ে কিনে ফেলার মতো অমৃতের চিজ বলে মনে হয়নি তার। সৌধ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,
‘ এটা কাকে দিবি?’ 
নাহিদ কিছু বলল না। সৌধ জিজ্ঞেস করলো, 
‘ সুহানাকে?’ 
নাহিদ ঘাড় ফিরিয়ে অপরিসীম বিস্ময় নিয়ে তাকাল। অবাক হয়ে বলল,
‘ সুহানাকে কেন দিবো?’ 
সৌধ উত্তর না দিয়ে বলল, 
‘ তাহলে কাকে দিবি? রিফাকে? রিফা শাড়ি পরে?’ 
নাহিদ উত্তর দিলো না। উদাসমুখে সিগারেট ধরিয়ে মুখ তুলে তাকাল মেঘমুক্ত আকাশের দিকে। আজ বোধহয় পূর্ণিমা। চারদিকে ফকফকা চাঁদের আলো। সেই জ্যোৎস্না ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে নাহিদের বুক বেয়ে তপ্ত শ্বাস বেরিয়ে এলো। সৌধকে সে কখনো বলতে পারবে না, ওই যে সে প্রথমবার এলো। এই শাড়িটা পরেই তো এলো। একই রঙ, একই কোমলতা, কেবল গন্ধটা নেই। ওই গন্ধটা কেবল ওর গায়েই আছে। মায়াময়, ঘুম ঘুম গন্ধ। কাছে এলেই হাজার বছরের নিদ্রাহীন চোখে ঘুম নামে নাহিদের। 

আজকের রাতটা বেশ শীতল। গাঢ় চাঁদের আলো এসে পড়েছে শাওনের জানলার কার্ণিশে। ঘরের ভেতর ফুল স্পিডে পাখা চলছে। শাওন দেহের অর্ধেকটা বিছানায় বাকিটা বিছানার বাইরে ঝুলিয়ে রেখে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঘূর্ণিয়মান পাখার দিকে। মনটা খারাপ নাকি ভালো বোধগম্য হচ্ছে না। সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গে ওরকম খারাপ ব্যবহার করে ফেলায় দেহটা কেমন অসাড় লাগছে। উঠে গিয়ে মাকে সামনে বসিয়ে একটু সান্ত্বনা দেবে, মাফ চাইবে সেই পরিশ্রমটুকুও করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। শাওনের আজকাল কথা বলতে ক্লান্ত লাগে। নিজের প্রতি বিরক্ত হতে হতে সে পরিশ্রান্ত। সে মেনে নিয়েছে এই পৃথিবীর সবচাইতে অপদার্থ, নিকৃষ্ট প্রাণী সে। এবার সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচুক। বারবার তাকে একই ব্যাপার মনে করিয়ে দেওয়ার তো কোনো অর্থ হয় না। শাওন কিছুক্ষণ অলস শুয়ে থেকে আচমকা উদিত এক ক্রোধে পাশ বালিশটা ছুঁড়ে ফেলল দূরে। দাঁতে দাঁত চেপে হাতের কাছে যা পেল তাই ছুঁড়ে ফেলল এদিক ওদিক। টেবিলের পরিত্যক্ত বই, পানির গ্লাস, সুদৃশ একুরিয়াম। কাঠের টেবিলটিতে লাথি বসাতেই বেকায়দায় পড়ে সেটিও মেঝেতে আছড়ে পড়ল এক সময়। টেবিলের ড্রয়ার খুলে ভেতরের জিনিসগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। উন্মাদ শাওন বিছানায় বসে কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো জিনিসগুলোর দিকে। তারপর কী ভেবে সেখান থেকে তুলে নিলো দুটো পেনড্রাইভ। বিছানার উপর থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে অলসভাবে একটা পেইনড্রাইভ অন করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল মৌনির অসংখ্য ছবি। ধীরে ধীরে কপালের ভাঁজ শিথিল হয়ে গেল শাওনের। মনে পড়ল, মৌনি যখন ছবি ডিলিট করার জন্য খুব চাপ দিচ্ছিল তখন ল্যাপটপ আর ফোন থেকে বাধ্য হয়েই অধিকাংশ ছবিগুলো সরিয়ে ফেলেছিল সে। শাওন আনমনে একটার পর একটা ছবি দেখতে লাগল। হঠাৎ তার নজর আটকাল স্বচ্ছ শাড়ি পরিহিতা মৌনির ওপর। এই ছবিটা মৌনিই পাঠিয়েছিল তাকে। তখন শাওন প্রথম মোবাইল পেয়েছে। মৌনির তখনও নিজস্ব মোবাইল নেই। শাওন কৈশোরের কৌতূহলে নারী-পুরুষের অনেক নিষিদ্ধ বিষয় জেনে ফেললেও মৌনি তখনও সরল। জীবনের প্রথমবার মায়ের শাড়ি পরে নিজেকে একদম ভিন্নভাবে আবিষ্কার করে আবেগে আত্মহারা হয়ে পড়েছিল সে। ছবিটা পাঠিয়ে বলেছিল, 
‘ দেখো, শাওন! আমাকে একদম নায়িকাদের মতো লাগছে।’ 
ছেলেবেলার স্মৃতি মনে পড়ে হেসে ফেলল শাওন। দুষ্টু মৌনির কৌতূহলের শেষ ছিলো না সেসময়। আশপাশে নানান মানুষের মুখে নানান কথা শুনে এসে ম্যাসেজে এই সকল ভয়ংকর প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশা করতো সে শাওনের কাছে। বিপরীত লিঙ্গের বন্ধু হওয়ার যে কতরকম বিপদ তা তখনই হাড়ে হাড়ে টের পেতো শাওন। শাওন হাসিমুখে মৌনির ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল। কিশোরী মৌনির চঞ্চল চোখ, মুখ, ঠোঁটে চোখ বুলিয়ে দৃষ্টি এসে থামল স্বচ্ছ শাড়িতে নামমাত্র আড়াল হয়ে থাকা মৌনির কোমল উদরে। শাওন ছবিটা থেকে চোখ সরিয়ে দ্রুত আরও অনেকগুলো ছবি পেরিয়ে গিয়ে কী মনে করে আবারও ফিরে এলো সেই ছবিরই কাছে। প্রবৃত্তির কাছে হেরে গিয়ে, নৈতিকতা ভুলে একটু ঝুম করলো। আলাদা আলাদা করে দেখল মৌনির চোখ, নাক, গাল, ঠোঁট, নাভিকোমলের পাশের মিষ্টি তিলটি। মৌনি এতো সুন্দর! মৌনি এতো কোমল! এই পৃথিবীতে মৌনির মতো আর কে আছে? মুঠোফোনের ঝনঝন আওয়াজে প্রশ্ন ভুলে বাস্তবে ফিরে এলো শাওন। বিরক্ত হয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল সৌমি ফোন করেছে। কথা বলার বিন্দুমাত্র আগ্রহ না পেয়েও ফোন তুলল শাওন। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে সৌমি চিন্তিত কণ্ঠে বলল, 
‘ এখন কী হবে শাওন?’ 
শাওন ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ কোন ব্যাপারে? ভাববাচ্যে কথা না বলে বুঝিয়ে বলো।’ 
সৌমি মেজাজ খারাপ করে বলল, 
‘ কী ব্যাপার তুমি জানো না? তোমার ক্যাডেটশিপ বাতিল হয়ে গেল। এদিকে আমার বাসায় বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। তুমি কেন এতো বড়ো বিপদ ডেকে আনলে শাওন? একবারও আমার কথা ভাবলে না?’ 
শাওন বিরক্ত গলায় বলল,
‘ তোমাদের সবার ধারণা আমি সেধে সেধে ক্যাডেটশিপ বাতিল করিয়েছি? ক্যারিয়ার আমার অথচ টেনশন তোমাদের সকালের। তোমাদের ধারণা, ক্যাডেটশিপ বাতিল করিয়ে আমি মহানন্দে আছি। আমার কোনো টেনশন হচ্ছে না?’
সৌমি বলল,
‘ তোমাকে দেখে তো টেনশন হচ্ছে বলে মন হচ্ছে না, শাওন। টেনশন হলে তুমি এভাবে পালাতে পারতে না। ভালোবাসলে মানুষ পৃথিবী জয় করে ফেলে। আর তুমি আমার কথা ভেবে সামান্য ট্রেনিংয়ের কষ্টটা সহ্য করতে পারলে না?’ 
‘ সামান্য! মিলিটারি ট্রেনিং সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা আছে সৌমি? তোমার ধারণা ওখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো এক দুই বলে পিটি করায়? মূর্খের মতো কথা বলো সবসময়।’ 
সৌমি রেগে গিয়ে বলল,
‘ আমি মূর্খ? এখানে আমাকে রাতদিন বিয়ের আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। আর তুমি আমার সঙ্গে ফাজলামো করছো? তুমি খুব ভালো করে জানো, আমাদের বাসায় কোনোভাবেই প্রেমের বিয়ে মেনে নেবে না। অ্যারেঞ্জের মতো কিছু একটা ব্যবস্থা করবো তারমধ্যে তুমি চাকরিটা হারালে। আমাকে নিয়ে তোমার মধ্যে কোনো সিরিয়াসনেসই নেই শাওন।’ 
শাওন ত্যক্ত হয়ে বলল,
‘ তোমার যদি তাই মনে হয় তাহলে তাই।’ 
সৌমি রাগ করতে গিয়েও ব্যথিত কণ্ঠে বলল,
‘ শাওন, তুমি কী আমাকে আসলেই ভালোবাসো?’ 
‘ তোমার সঙ্গে আমার আড়াই বছরের সম্পর্ক। 
আর কতবার এই প্রশ্নের উত্তর দেব আমি সৌমি?’ 
‘ তাহলে তুমি কেন আমাকে নিয়ে সিরিয়াস নও?’ 
শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ সিরিয়াসনেস দেখানোর কোনো সিস্টেম তো আমার জানা নেই সৌমি। তুমি আমাকে সিস্টেমটা বলে দাও, দেখাই।’ 
‘ তুমি কেমন বদলে যাচ্ছ শাওন। সবসময় কেমন রুড হয়ে কথা বলো আমার সঙ্গে।’ 
শাওন ক্লান্ত গলায় বলল,
‘ আমি বদলাইনি। সময়টা বদলে গিয়েছে। আমি মানসিকভাবে অস্থির হয়ে আছি সৌমি। দুইদিন হলো বাসায় ফিরেছি তার মধ্যে একশোবার তোমার বিয়ে নিয়ে চিল্লাচিল্লি। তুমি একবারও বুঝার চেষ্টা করেছ, আমার মধ্যে দিয়ে কী যাচ্ছে? আমি কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি? নিজেকে ছাড়া আমাকে নিয়ে ভেবেছ তুমি একবারও?’ 
‘ তুমি আমাকে নিয়ে ভেবেছ?’ 
‘ কী ভাববো তোমাকে নিয়ে? বিয়ে ছাড়া আর কোনো টপিক আছে তোমার? এই মুহূর্তে তোমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্যই আমাকে বিয়ে করা।’ 
‘ তোমার লক্ষ্যও তো একইরকম হওয়া উচিত ছিলো শাওন। তুমি কেন ভিন্ন?’ 
শাওন বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ তার কারণ আমার আরও অনেক দায়িত্ব আছে সৌমি। তোমার মতো সারাদিন বিয়ে বিয়ে করে বরের কোলে উঠে বসে থাকার সুযোগ আমার নেই।’ 
সৌমিও এবার ধৈর্য হারাল। দ্বিপাক্ষিক ঝগড়ায় অতিষ্ঠ হয়ে একসময় কল কেটে ফোন বন্ধ করে রাখল শাওন। কপালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করতেই চোখের পাতায় ভেসে উঠল মৌনির মুখ। মৌনির হাসি। হাসতে হাসতে জল আসা মৌনির চঞ্চল চোখ। শাওনের বুকের ভেতর অস্থির বোধ করলো। এই মুহূর্তে যদি একটু মৌনির সঙ্গে কথা বলা যেতো! আর কারো সঙ্গে না কেবল মৌনির সঙ্গে কথা বললেই ঠিক হয়ে যেতো সব। মৌনি কোমল গলায় বলতো, 
‘ শাওন, শাওন, শাওন! তুমি এতো পাগল কেন? জীবনের কেমন বারোটা বাজিয়ে ফেলেছ দেখো তো!’ 
তাহলে বোধহয় শাওনের বারো বাজা জীবনটাকেও সে চেখের পলকে ঠিক করে ফেলতে পারতো। শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মোবাইলটা আবার সুইচড অন করলো। মৌনিকে কল করতে গিয়ে দেখল, কল ঢুকছে না। মৌনি তার নাম্বারটা ব্লক করে দিলো কবে? মৌনির কী আসলেই প্রেমিক আছে? তার জন্যই কী ব্লক করলো শাওনের নাম্বার? তার মাথার ভেতর যেন একদল অস্থির ভ্রমর ভো ভো করে উড়তে লাগল এবার। ক্রমেই পাগল করে তুলল তার মস্তিষ্ক। শাওন সৌমিকে ম্যাসেজ করলো, 
‘ সৌমি, তুমি কী আমাকে একটু মানসিক শান্তি দিতে পারো না? দুটো দিন আমরা ঝগড়া না করি? পৃথিবীর সবাই সুখে আছে। আমরা কেন ভালো নেই?’ 
একটু আগে ঝগড়া হলেও শাওনের ম্যাসেজে একটু নরম হলো সৌমি। লিখল, 
‘ তুমিই তো শুরু করো ঝামেলা। একটা মানুষ আর কত সহ্য করতে পারে, শাওন?’ 
শাওনের জিভে তেতো ঠেকলো। সে এই মুহূর্তে মৌনির মতোন মিষ্টি কিছু প্রত্যাশা করছিলো। ঝাঁজের বদলে ঝাঁজ নয়। শাওন লিখল,
‘ দোষারোপ নয় সৌমি। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি আমাকে আগলে নাও। দুটো দিন কোনো দোষ ছাড়া শুধু আমাকে ভালোবাসো?’ 
‘ তোমাকে তো আমি ভালোবাসিই শাওন। আমার মতো তোমাকে আর কে ভালোবাসতে পারবে?’ 
শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ কাল আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে সিলেট আসছি।’ 
সৌমি অবাক হয়ে বলল,
‘ হঠাৎ!’ 
‘ তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।’ 
‘ কিন্তু আমি তো ঢাকায়।’ 
‘ ঢাকায়! কবে এসেছ?’ 
‘ আজ সকালে। তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে।’ 
শাওন লিখল, 
‘ ঠিক আছে। আগামীকাল সন্ধ্যার পর বের হবে।’ 
সৌমি অবাক হয়ে বলল,
‘ সন্ধ্যার পর! পাগল নাকি? সন্ধ্যার পর কী করে বের হবো? খালামণি এলাউ করবে না।’ 
শাওন অধৈর্য হয়ে লিখল, 
‘ ম্যানেজ করো। আমি এমন অস্থির পরিস্থিতিতে আছি আর তুমি এটুকু ম্যানেজ করতে পারবে না?’ 
‘ দুপুরে বের হই? সারাদিন তোমার সঙ্গে থেকে ইফতার করে বাসায় ফিরে আসব। সন্ধ্যার পর বেরুলেও তো বেশিক্ষণ থাকতে পারব না।’ 
শাওন লিখল, 
‘ না। ইফতারের পর আসো। বাসায় বলে আসবে রাতে অন্য কোথাও থাকবে। কোনো বন্ধুর বাসায়।’ 
সৌমি অবাক হয়ে লিখল, 
‘ মানে!’ 
‘ মানে তুমি কাল আমার সঙ্গে থাকবে।’ 
সৌমি স্তম্ভিত হয়ে লিখল,
‘ তোমার কি মাথার ঠিক আছে শাওন?’ 
‘ না আমার মাথার ঠিক নেই সৌমি। এজন্যই তোমাকে চাইছি। আমার একমাত্র ঔষধ তুমি। ক্যান উই মেইক আউট, প্লিজ? আমার মনে হচ্ছে একমাত্র তোমার কাছে এলেই আমার এই বিধ্বস্ত অবস্থা কাটবে সৌমি। বলো, তুমি আসবে না?’ 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp