রাতের খাওয়া শেষে মার্জিয়া পড়তে বসেছে। মৌমিতা আর সে একই ঘরে থাকে। পড়ার টেবিল এখানে একটাই। বেশিরভাগ সময়ই টেবিল মৌমিতার দখলে থাকে। মার্জিয়ার অবশ্য এতে কোনো আক্ষেপ নেই। সে বিছানায় দুটো বালিশের উপর বই রেখে পড়তে বসে। তারপর পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ে। আজকেও সে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।
রাবেয়া ঘরে ঢুকলেন, “কালকে বড় আপা আসবে, বুঝেছো? তোমাদের তো বাইরে যেতে হবে না। তাই না?”
মার্জিয়া মুখ তুললো, “হুম। কালকে শুক্রবার।”
“সেটাই বলছি। ভালো জামা কাপড় পরে থাকবা। মৌ, ঐ কয়েকটা জামা বাদ দিয়ে অন্যকিছু পরবা।”
মৌমিতা বই থেকে চোখ সরায় না, “ফুপু কি আমার জামা দেখতে আসবে?”
“সবসময় বাঁকা কথা! একটা মানুষ বাসায় আসবে, আর তুমি তার সামনে কাজের লোকের মতো কাপড় পরে ঘুরবা!”
মৌমিতা বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকায়, ঝাঁঝালো স্বরে বলে, “আমার কোনোকিছুই আপনার পছন্দ হয় না কখনও। আর মাঝে মাঝে এমনভাবে কথা বলেন, নিজেকে আমার আসলেই কাজের লোক মনে হয়।”
রাবেয়া কোমড়ে হাত দিয়ে হেসে বললেন, “মায়ের সব কথা ধরতে হয় না মৌ। সারাদিন কতো খাটতে হয়। মাথা ঠিক থাকে না। আর আমি কিছু বললেই তুমি মন খারাপ করো কেন? কেন রাগ করি, সেটা বোঝো না? শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে!”
মৌমিতা ভাবলেশহীন মুখে আবার বইয়ের দিকে তাকায়। এমন ভান করে, যেন সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছে। যদিও সামনে রাখা বইটা পাঠ্যপুস্তক নয়। মৌমিতা তার বান্ধবী তামান্নার কাছ থেকে এই গল্পের বইটা ধার করে এনেছে। রাবেয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই সে বিড়বিড় করে বলে, “প্রবাদ বাক্য ছাড়া আর কী জানেন আপনি?”
—————
আমজাদ খাটের এককোণে বসে, বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, “এগুলো ডাল বানায়, নাকি পানির মধ্যে কীটনাশক মিশায়, বুঝি না কিছু।”
রাশেদ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়, “হোস্টেলে এর চেয়ে ভালো খাবার আশা করা বোকামি।”
চেয়ারে বসে থাকা বাদলের দিকে তাকায় আমজাদ। বিকাল থেকেই ছেলেটা পড়ার টেবিলে কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত। দেড় বছরের সিলেবাস একদিনেই শেষ করে ফেলবে নাকি? তার দিকে ইঙ্গিত করে আমজাদ রাশেদকে জিজ্ঞেস করে, “দ্যাখ তো, ঐ বালটা কী করে?”
বাদল টের পেলো, কথাটা তাকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। সে ঘুরে সোজাসুজি আমজাদের মুখের দিকে তাকায়।
“কী রে? কী করিস?”
ব্যাপারটাকে হালকা দেখানোর চেষ্টা করে বাদল, “তেমন কিছু না। এমনিই বসে আছি।”
রাশেদ টেবিলের দিকে উঁকি দেয়। তার ধারণা, বাদল হয়তো গত সপ্তাহে কুড়িয়ে আনা সেই নীল ডায়েরিটা ঘাঁটাঘাঁটি করছে। এ নিয়ে রাশেদ কোনো কথা বললো না। সে যদি এটা বোঝানোর চেষ্টাও করে, অন্যকারো ব্যক্তিগত জিনিস বিনা অনুমতিতে দেখা ঠিক না—বাদল তার কথায় ভ্রুক্ষেপ করবে না। তাছাড়া এখন আমজাদ ভাই উপস্থিত আছে ঘরে। এসময় যদি রাশেদ কোনো জ্ঞান দিতেও যায়, তাহলে তাকে নিয়ে ব্যাপক হাসাহাসি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে, সে চুপ করে বসে রইলো।
বাদল ঘুরে তাকালো ডায়েরিটার দিকে। এর রচয়িতা কেবল লেখেই না, ছবিও আঁকে। ডায়েরির কিছু পৃষ্ঠায়, মলাটের পেছনে সে অদ্ভুত সব ছবি এঁকে রেখেছে। প্রথম দিকের দুই তৃতীয়াংশ পাতায় কিছু না কিছু লেখা হয়েছে। পেছনের দিকের পাতাগুলো ফাঁকা। এতো যত্নে সাজানো একটা জিনিস কেউ ডাস্টবিনে ফেলবে কেন?
কাজটা যে-ই করে থাকুক, খারাপ করেনি অবশ্য। অন্তত বাদলের জন্য ভালো একটা বিনোদনের জোগাড় হয়ে গেলো!
“জুন, ১৯৮৫:
আমি জানি, এই ডায়েরির লেখাগুলো কেউ পড়বে না। তবু একটা কথা কিছুতেই লিখতে ইচ্ছে করছে না। আব্বা বলেছেন, যে কথাগুলো আমি কাউকে বলতে পারি না, সেগুলোই লিখতে। তাই লিখছি। আম্মাকে অনেকবার বলতে চেয়েছি, বলতে পারিনি। কিন্তু কাউকে বলতে পারলে ভালো লাগত। এমন একটা ব্যাপার নিজের মধ্যে চেপে রাখতে ভালো লাগছে না।
আমার বড় ফুপুর নাম মমতাজ খন্দকার। উনার বাসা রাজশাহীতে। দুই ছেলেমেয়ে। রতন ভাই এবার এসএসসি পরীক্ষা দিবেন। রিতা আপা আমার চেয়ে এক বছরের বড়, সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। আমি ছোটবেলা থেকে কয়েকবার ফুপুর বাসায় যাওয়া আসা করেছি। ফুপুরাও আমাদের বাসায় এসেছেন অনেকবার। জানি না কেন, ফুপুদেরকে আমার ভালো লাগে না। রিতা আপা কথায় কথায় কীভাবে যেন অপমান করে। তবে সবচেয়ে বেশি অসহ্য লাগে রতন ভাইকে। উনার আচরণ খুবই খারাপ। লিখে প্রকাশ করা সম্ভব না। সবার সামনে ভালোই থাকেন। কিন্তু আমাকে একা পেলেই বারবার গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করেন। মাঝে মাঝে উনার কথাবার্তাও কেমন হয়ে যায়, ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে। এই একটা মানুষকে আমি খুব ঘৃণা করি।
রতন ভাইকে দেখলে আমি লুকিয়ে পড়তাম। ফুপু বললেন, আমি নাকি অসামাজিক হয়ে যাচ্ছি। আম্মাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। আম্মা বললেন, আমি কেন ছেলে মানুষের আশেপাশে থাকি? সুযোগ দিলে তো ঝামেলা করবেই।
কে জানে? দোষটা হয়ত আমারই। সতর্ক থাকা উচিত ছিল আমার। মার্জিয়া এবার তৃতীয় শ্রেণিতে উঠেছে। রতন ভাই ওর সাথেও বাজে আচরণ করার চেষ্টা করেন। আমার ভীষণ খারাপ লাগছে। আমি কিছু করতে পারছি না কেন?”
বাদল চুপচাপ বসে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর ডায়েরিটা বন্ধ করে বইয়ের মাঝে ঢুকিয়ে রাখলো। চেয়ারে হেলান দিয়ে গভীরভাবে কিছু একটা ভাবতে লাগলো।
ডায়েরি যেহেতু লাইব্রেরির ডাস্টবিনে পাওয়া গেছে, এর মালিক নিশ্চয়ই এই কলেজে পড়ে। তাকে কোনোভাবে খুঁজে বের করা যায় না? নিজেকে অযথা দোষী ভাবছে মেয়েটা। তার ধারণাটা বদলে দেয়া যায় না? রতন নামের ঐ লম্পটের নাক বরাবর অন্তত একটা ঘুষি মারা উচিত।
বাদল নিজের উপর বিরক্ত হলো। মেয়েটা যদি জানতে পারে, কেউ তার ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ে ফেলেছে, তবে সে অবশ্যই বাদলের প্রতি ক্ষুব্ধ হবে। সুতরাং, দেখা করার পরিকল্পনা বাতিল।
বাদল মনোযোগ দিয়ে হিসাব কষতে শুরু করলো। মৌমিতা খন্দকার ১৯৮৫ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তো। এখন কি তবে দ্বাদশে পড়ে? বাদল সোজা হয়ে বসলো। খাতা কলম নিয়ে আবার গুনতে শুরু করলো। ফলাফল দেখে সে খুব একটা সন্তষ্ট হতে পারলো না। মৌমিতা বয়সে তার চেয়ে বড়।
কপালে হাত দিয়ে বসে থাকে ছেলেটা। কোনো একটা বিষয় নিয়ে ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে তার।
—————
শুক্রবার।
দোকান বন্ধ থাকায় মারুফ আজ বাড়িতেই আছেন। এই মুহূর্তে তিনি খুবই বিরক্ত। রিপন তার ঘরে এসে বসে আছে। রাজনৈতিক আলাপ করছে। এই ছেলেটার সাথে এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করে না মারুফের। মুখ ফসকে দলের বিরুদ্ধে কিছু বলে ফেললেই সর্বনাশ!
মার্জিয়া আজ দেরি করে খেতে বসেছে। প্রায় প্রতি শুক্রবারেই সে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। তারপর কোনোমতে মুখ ধুয়ে খেতে বসে। রাবেয়া সামনের চেয়ারে বসে শাক পরিষ্কার করছেন। কাজের ফাঁকে আবার মেয়েকে বকাও দিচ্ছেন।
“জুমার দিনে একটু তাড়াতাড়ি ওঠা লাগে না? এতো দেরি করে ওঠে, সবার শেষে খায়। অলস মানুষদের ভাগ্য খারাপ হয়। চুলটাও আচড়ায়নি ঘুম থেকে উঠে। পাখির বাসা হয়ে আছে। কতোবার বললাম, তোমার বড় ফুপু আসবে। একটু পরিপাটি হয়ে থাকবা। চুলে তেল দেয় না কতোদিন হলো। বাসায় থাকবোই না আর আমি। মেয়েদুটো আমার একটা কথাও শোনে না—”
ঘর থেকে মৌমিতার চিৎকার ভেসে আসে, “মেয়েদুটো কেন বলছেন আবার? আমি কিছু করলে শুধু আমার দোষ, মার্জিয়া কিছু করলে দুইজনের দোষ?”
“তোমাকে দেখেই তো শিখছে।”
মার্জিয়ার মুখভর্তি ভাত। ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া ভাত তরকারি খেতে তার মোটেও ভালো লাগছে না। কিন্তু খাবার শেষ না করে উপায় নেই। রাবেয়া এমনিতেও রেগে আছেন। খেতে অনীহা দেখালে বড় ধরনের ঝামেলা হতে পারে।
হঠাৎ দরজার দিক থেকে পুরুষালি কণ্ঠ শোনা যায়, “চাচি? আছেন নাকি?”
মার্জিয়া লাফিয়ে উঠে ছুটে গেলো কিছুদূর। তারপর ফিরে এসে খাবারের থালাটা নিয়ে ঘরের দিকে দৌড়ে গেলো। মেয়ের কাণ্ড দেখে রাবেয়া বেশ ক্ষুব্ধ হলেন। তবে তিনি রাগ প্রকাশের আগেই জুনায়েদ ভেতরে এসে দাঁড়ালো, “চাচি?”
তিনি সেদিকেই মাথা ঘোরালেন, “জুনায়েদ? কী অবস্থা তোমার? ভালো আছো?”
“এই তো আছি। রিপন কি বাড়িতে আছে নাকি? গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ ছিলো।”
“হ্যাঁ। তোমার চাচার ঘরে আছে।”
জুনায়েদ মারুফের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। রিপন আর সে একইসাথে পড়ছে, অনার্স তৃতীয় বর্ষে; যদিও ডিপার্টমেন্ট আলাদা।
জহির মিঞার ছোট ছেলে জুনায়েদ, খন্দকারদের নিকট প্রতিবেশী তিনি। এককালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। অবসরে যাওয়ার পরে আরেকটা কাজ খুঁজে নিয়েছেন, ঘটকালি। এলাকার নতুন মানুষগুলোর কাছে তিনি ঘটক জহির হিসেবেই বেশি পরিচিত।
রিপনকে অপছন্দ করলেও মারুফ জুনায়েদকে বেশ পছন্দ করেন। ছেলেটা ভীষণ একগুঁয়ে, অথচ কোনো কাজে তার ‘না’ নেই। প্রতিবেশী মারুফ খন্দকারের সব আদেশ যথাযথভাবেই পালন করে, এক্ষেত্রে জহিরের আপত্তিকেও সে তোয়াক্কা করে না। মারুফ ব্যতীত এই বাড়ির আরও একজন ব্যক্তি জুনায়েদকে পছন্দ করে।
মৌমিতা চমকে উঠে দরজার দিকে তাকালো। দরজাটা বিকট শব্দে লাগানোর পর মার্জিয়া ভাতের থালা নিয়ে বিছানায় বসে। আরেকটু হলেই তার মানসম্মান ধুলোয় মিশে যাচ্ছিলো। ব্যাপারটা কল্পনা করে সে কিছুক্ষণ শিহরিত হয়ে বসে রইলো, তারপর আবার খেতে শুরু করলো। মৌমিতা বলে উঠলো, “খাবার নিয়ে ছোটাছুটি করছিস কেন?”
মার্জিয়া উত্তর দিলো না। পাশের ঘর থেকে কথাবার্তার আওয়াজ আসছে। জুনায়েদের কণ্ঠ শুনে মৌমিতা আবার বোনের দিকে তাকালো। তার ছোটাছুটির কারণটা এখন স্পষ্ট। মৌমিতা গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, “জুনায়েদ ভাই এসেছে।”
মার্জিয়া নিজেকে যথাসম্ভব নির্বিকার দেখানোর চেষ্টা করলো, “হুঁ, জানি।”
রাবেয়া ভেবেছেন, আজ দুপুরে বিরিয়ানি রাঁধবেন। মারুফসহ মেয়ে দুটো আজ বাড়িতেই রয়েছে। এই মানুষগুলো প্রতিদিনই এতো ব্যস্ত থাকে, তাই ভালো কিছু রান্না করার জন্য সঠিক সময় হলো ছুটির দিন।
মার্জিয়া গোসল সেরে উঠোনে গামছাটা ঝুলিয়ে দিয়েছে। রাবেয়া বারান্দায় এসে ঐ ঝুলন্ত গামছাটা দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন, “মার্জু? কতোবার করে বললাম, বড় আপারা আসবে। তবু একেবারে দরজার সামনে গামছা ঝুলিয়ে রেখেছো। তোমরা কি কথা বোঝো না?”
মার্জিয়া ছুটে এলো। সে দেখলো, মারুফ গামছাটা হাতে নিয়ে বারান্দার দিকে আসছেন। আর রাবেয়া অপ্রসন্ন মুখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি দুঃখপ্রকাশ করলেন, “আপনি মেয়ে দুটোকে শাসন করতে পারেন না? সবসময় মাথায় তুলে রাখেন কেন?”
“মাথায় কখন তুললাম?” মারুফ হাতে থাকা গামছাটা মার্জিয়ার দিকে এগিয়ে দিলেন, “ধরো।”
মার্জিয়া বাধ্য মেয়ের মতো মাথা কাত করে সেটা হাতে নিলো, তারপর রাবেয়ার মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে ভেতরে চলে গেলো। স্বামীকে আর কিছু বললেন না রাবেয়া। বললেও তেমন লাভ হবে কিনা সন্দেহ। বিয়ের এতো বছর পরেও লোকটাকে ভালোভাবে বুঝতে পারেন না তিনি। মাঝে মাঝে তাকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটা মানুষ মনে হয়। কোনোকিছুতেই যেন কিছু যায় আসে না তার। সবসময় নিজের জগত নিয়েই ব্যস্ত। অল্প বয়সে রাবেয়া তার এই উদাসীনতা বেশ উপভোগ করতেন। এমন দুর্বোধ্য একজন মানুষ যে তার সাথে ঘর বেঁধেছে—ব্যাপারটা তখন খুব রোমাঞ্চকর মনে হতো। কিন্তু ইদানিং বিরক্ত লাগে। মারুফ বদলে যাননি। তার এই চিরপরিচিত বিচ্ছিন্নতা আজকাল রাবেয়াকে বেশ পীড়া দেয়।
ব্যাপারটা হয়তো এতোটাও বিরক্তিকর হতো না, যদি তাদের ঘরে মারুফের একটা নতুন সংস্করণ না আসতো। মৌমিতা যেন তার আব্বার এই অস্বস্তিকর স্বভাবগুলোরই একটা ক্ষুদে রূপ। চেহারাটাও আব্বার মতোই। সে কিসে রাগ করবে, কিসে অভিমান করবে, কিসে খুশি হবে—কোনোকিছুই রাবেয়ার বোধগম্য নয়। সৃষ্টিকর্তা বেছে বেছে এসব দুর্বোধ্য প্রাণীকে কেন তার মতো সরল মানুষের জীবনে পাঠালেন–এই প্রশ্নের উত্তর অন্তত রাবেয়া এখনও খুঁজে পাননি।
মার্জিয়া ছোটবেলায় চঞ্চল, হাসিখুশি একটা মেয়ে ছিলো। কিন্তু সঙ্গদোষে এই মেয়েটারও বেশ অবনতি হয়েছে। অবশ্য এখানে বয়সেরও দোষ আছে।
—————
মমতাজ খন্দকার এলেন সময়মতো, পড়ন্ত বিকেলে। তার স্বামী রাজধানীতে চাকরি করেন। ছুটি পেলেই কেবল বাড়িতে আসেন। মমতাজ দুই ছেলেমেয়েকে প্রায় একা হাতেই মানুষ করেছেন। রতন ও রিতা, উভয়েই পড়াশোনায় বেশ ভালো। ওদের নিয়েই নাটোরে ছোট ভাইয়ের বাড়িতে ঘুরতে এসেছেন মমতাজ।
সালাম জানিয়ে মৌমিতা আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়ালো। পাশে মার্জিয়া। টেবিলে হরেক রকমের নাস্তা সাজানো। পাশের সোফায় মারুফ বসেছেন। মমতাজ তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মেয়ে তো বড় হয়ে গেলো। বিয়ে কবে দিচ্ছিস?”
রাবেয়া গদগদ হয়ে কিছু বলতে গেলেন, কিন্তু মারুফ তার আগেই রসকষহীন শুষ্ক স্বরে বলেন, “পড়াশোনা তো শেষ হয়নি এখনও। দেখি, কিছু কিছু করতে পারে কিনা জীবনে।”
মৌমিতা মনে মনে সন্তুষ্ট হলো। আম্মার সামনে কেউ বিয়ের কথা বললেই তিনি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আগ্রহ দেখান। কিন্তু আব্বা এমন করেন না। পড়াশোনার কথা তুলে বিয়ের প্রসঙ্গ ধামাচাপা দেন।
মৌমিতা এখন যে পোশাকটা পরে আছে, সেটাই হয়তো বিয়ের আলাপকে উস্কে দিয়েছে। রাবেয়ার জোরাজুরিতেই সে এই কমলা বর্ণের সালোয়ার কামিজ গায়ে জড়িয়েছে। মাথায় ওড়না দিয়েও সে কৈশোর আর যৌবনের ব্যবধানটা ঢাকতে পারেনি, বরং তা যেন মেয়েটার নারীসুলভ কমনীয়তাকে আরও বেশি দৃশ্যমান করেছে। তাকে দেখলে ছাত্রী কম, পাত্রীই বেশি মনে হচ্ছে। এই মুহূর্তে মৌমিতার ইচ্ছে করছে অদৃশ্য হয়ে যেতে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মার্জিয়া অবশ্য এসব আলোচনার কিছুই শোনেনি। সে একদৃষ্টে থালার উপর রাখা বিস্কুটের দিকে তাকিয়ে আছে।
মাস দুয়েক আগে মারুফ ঢাকার গিয়েছিলেন ব্যবসার কাজে। আসার সময় এই বিস্কুটগুলো এনেছিলেন। উপরে চিনি ছিটানো, পাতলা, মিষ্টি বিস্কুট। এদিকে এখনও পাওয়া যায় না এগুলো। মার্জিয়া কয়েকদিন ধরেই রাবেয়ার কাছে এটা নিয়ে বায়না করেছে; তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, বিস্কুট শেষ। কিন্তু আজ সেই বিস্কুটকে অক্ষত অবস্থায় মেহমানদের সামনে দেখে মার্জিয়ার মনটা ভেঙে গেলো।
কুশল বিনিময় শেষ হতেই মৌমিতা তাড়াহুড়ো করে নিজের ঘরের দিকে যায়। মার্জিয়াও মুখ কালো করে বোনের পিছু নেয়। রাবেয়া পুরো ব্যাপারটা দেখলেন। রাগ সামলে হাসিমুখে তবু অতিথি আপ্যায়নে মনোযোগ দিলেন। হঠাৎ তিনি রিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “রিতা? যাও, মৌ-দের সাথে কথা বলো।”
“জ্বী মামি।”
রিতা উঠে দাঁড়ায়। মমতাজ ভালোভাবে হেলান দিলেন সোফায়, “রিতা তো এবার এইচএসসিতে ভালোই করেছে। কিন্তু ওকে পড়াবো কিনা? অনেক ভালো একটা প্রস্তাব এসেছে—”
মারুফ হাসলেন, “এতো বিয়ে বিয়ে করছেন কেন আপা? ভাগ্যে থাকলে ভালো মানুষের সাথেই বিয়ে হবে। রিতা পড়ায় এতো ভালো, পড়ুক। আজকাল কেউ এতো ছোট মেয়েকে বিয়ে দেয় না। আর আপনাদের তো টাকা পয়সারও সমস্যা নেই।”
“ঐ আরকি। রতনও সেটাই বলে।”
“রতনের পড়াশোনা কদ্দূর?”
রতন এতোক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলো। মারুফের প্রশ্নে সে সোজা হয়ে বসে, “মাস্টার্স শুরু করবো কিছুদিন পরেই।”
মারুফ মাথা নাড়লেন। নিজের অবস্থার কথা মনে পড়লো তার। মেয়ে দুটো এতো ধীর গতিতে বড় হচ্ছে। কতোদিনে ওরা এই জায়গায় পৌঁছাবে? কতোদিনে নিজের পায়ে দাঁড়াবে?
মমতাজ শুরুতে যেভাবে তাড়া দেখাচ্ছিলেন, সেই অনুযায়ী তাড়াতাড়ি তিনি রওনা দিতে পারলেন না। দেরি হয়ে গেছে, বিধায় রাবেয়ার অনুরোধে রাতের খাবারটা তাদের এখানেই সারতে হলো। তারপরেও রাবেয়া আরেকটা আবদার করে বসলেন, “এখন রওনা দিলে তো অনেক দেরি হয়ে যাবে আপা। রাতটা এখানেই থাকেন।”
প্রস্তাবটা মারুফের পছন্দ হলো না। একে তো তার এই বাড়িতে জায়গার সংকট, তাছাড়া আরেকটা ব্যাপার নিয়ে তিনি শঙ্কিত। তবে তিনি সরাসরি আপত্তি দেখালেন না, বড় বোনের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রইলেন।
মমতাজ হাসলেন, স্পষ্ট করে বললেন না কিছু। রিতা মায়ের পাশে বসে আছে, এখানে থাকার তেমন ইচ্ছে নেই তার। কিন্তু মামার সামনে অনাগ্রহের কথাটা সে বলতে পারছে না।
রাত ৯টা বাজে। সাড়ে ৯টার দিকে নাকি একটা ট্রেন আছে। জুনায়েদের সাহায্যে মারুফ সেই ট্রেনের খোঁজ খবর নিয়েছেন।
মার্জিয়া না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। আর মৌমিতা খাটের এককোণে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। বিকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। গরমে আরও ক্লান্তি ভর করেছে শরীরে। তার ওড়নাটা মাথা থেকে খুলে এক ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাখা। মেহমান এখনও যাচ্ছে না কেন!
দরজায় শব্দ হতেই মৌমিতা সতর্ক হয়ে বসলো। রাবেয়া এসে যদি দেখেন, মার্জিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে, আরও বকাঝকা করবেন। মৌমিতার মাথায় হঠাৎ অন্য চিন্তা এলো, সে দরজার দিকে ছুটে গেলো। রাবেয়া না, রতন এসেছে!
দরজাটা ভালোভাবে লাগানোর আগেই ছেলেটা শক্ত হাতে সেটা ধরে ফেললো। হেসে বললো, “আরে আরে! বিদায় জানাতে এসেছি।”
মৌমিতা দরজা ছাড়লো না, কপাল কুঁচকেই বললো, “আচ্ছা, সাবধানে যাবেন। ভালো থাকবেন।”
“মার্জিয়াকে বলে যাই—”
“ওকে আমি বলবো।”
“আহা!” রতন মৌমিতার মুখের দিকে তাকালো, নিচু স্বরে বললো, “দরজাটা ছাড়ো।”
“আপনি ছাড়েন!”
“ভেতরে ঢুকতে দিবা না?”
“এখন তো যাচ্ছেনই, দেরি হলে ট্রেন মিস হয়ে যাবে।”
মৌমিতা আর ধরে রাখতে পারছে না দরজাটা, কিন্তু এতো সহজে সে ছাড়তে রাজি না। রতন আরেকবার হাসলো, “আচ্ছা? ঘরে ঢুকলে ট্রেন মিস হয়ে যাবে? কেন? আমাকে এতো সময় দেওয়ার ইচ্ছা! তোমার কথা কিন্তু আমি বুঝলাম না মৌ।”
“রতন!”
মারুফের কণ্ঠ শুনে রতন দরজা ছেড়ে দিলো। মৌমিতাও হতভম্ব হয়ে তার আব্বার দিকে তাকালো। তারপরই কাঁপা হাতে ওড়নাটা গায়ের উপর ভালোভাবে টেনে নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। রতন হাসিমুখে বললো, “বিদায় নিতে এসেছিলাম মামা। অনেকদিন হলো দেখা হয় না, তাই লজ্জা পাচ্ছে ওরা!”
মারুফ আগের মতোই গম্ভীর স্বরে বললেন, “যাও। ট্রেনের সময় হয়ে যাচ্ছে।”
মৌমিতা মারুফের দিকে কেবল এক মুহূর্তের জন্য তাকায়, তারপর চোখ নামিয়ে নেয়। আব্বা এখন কী ভাবছেন? ভুল বুঝলেন না তো?
মেয়েটার মুখখানি লাল হয়ে উঠেছে। রতন সেই মুখের দিকে তাকালো আবার, “আসি তাহলে।”
মারুফ তার আদরের ভাগ্নেকে উদ্দেশ্য করে কর্কশ স্বরে বললেন, “রতন? আমার মেয়েদের আশেপাশে যেন তোমাকে আর না দেখি।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………