সাহেবের ভয়ংকর রুপ শুধু মিষ্টির আপুর মুখেই শুনেছিলাম। এই তিনমাসে আমি তা দেখে নি। ভেবেছিলাম মিষ্টি আপু বাড়িয়ে বলেছে। সাহেব হয়তো খিটমিটে মেজাজের। অল্পতেই বিরক্ত হন। কিন্তু আমার ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল করে দিলেন তিনি। তার কপালের ধপধপ করে ফুলে উঠা শিরা আর রক্তচক্ষু আমার ভেতরে তীব্র ত্রাশের জন্ম দিলো। আমার হাত-পা কেমন অসাড় হয়ে গেলো। সেই সাথে আরেকটা দুশ্চিন্তা আমাকে কাবু করছিলো, সাহেব কি আমাকে ভুল বুঝবেন? আমি মাহমুদের ব্যাপারে জেনেও তাকে কিছু বলি নি। ঘরে যে শুধু একা আমি ভীত ছিলাম তা নয়। প্রতিটা মানুষ ভয়ে শিটিয়ে গিয়েছিলো। মার হাট কাঁপছিলো। তিনি বসে গিয়েছিলেন ধপ করে। সাহেব বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে গেলেন মাহমুদের কাছে। ঘাড়টা শক্ত করে ধরে হীম শীতল স্বরে বললেন,
"জানোয়ার কোথাকার! একে দোষ করবি উপর থেকে অন্যের ঘাড়ে দোষ দিবি। তোর কি মনে হয় আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি৷ আমাকে কেউ বলবে আর আমি যাচাই না করে হম্বিতম্বি করবো। বালিকা স্কুলের কোনায় বসে যখন গাঁজার পুটলিটা কিনছিলি আমি ওখানেই ছিলাম। কি ভেবেছিলি! আমি তোর মিথ্যে ধরতে পারবো না। ভাইপ্রেমে অন্ধ থাকবো। আমি অনেক সুযোগ দিয়েছি তোকে। তুই সদব্যবহার করিস নি। এখন নিজের দোষ ডাকতে কাননকে দোষ দেওয়া হচ্ছে! ক্ষমা চা! এখন ক্ষমা চাবি, নয়তো এখানে পুতে ফেলবো আমি তোকে৷ এমন জানোয়ার ভাইয়ের আমার প্রয়োজন নেই।"
মাহমুদ আধজ্ঞানেই কোনো ভাবে আওড়ালো। তার ঠোঁটটা ঝুলছে। রক্ত পড়ছে তা থেকে। গালের একপাশ ফুলে উঠেছে। কি প্রকান্ড চড় ছিলো যে একটা চোখ খুলতে পারছে না। ব্যথায় সাদা ছেলেটা নীল হয়ে গেছে। মা কাঁপা স্বরে বললেন,
"মুহাইমিন, ওরে ডাক্তারের কাছে নিয়া যা। ও মইরে যাবে। মইরে যাবে আমার ছেলে।"
সাহেব একবার মায়ের দিকে তাকালেন। রক্তচক্ষুতে কোথাও যেন হতাশাও লক্ষ করলাম আমি৷ ওই মুহূর্তে সাহেবকে খুব পাষন্ড মনে হচ্ছিলো। ভয়ে কেমন জুবুথুবু হচ্ছিলাম। তার ভাইয়ের এতো খারাপ অবস্থা অথচ তার মুখশ্রীতে একটু মায়া নেই। এতো ভয়ংকর লোক আমার স্বামী! কিন্তু আজ জানি, উনি সেদিন কড়া না হলে আজ মাহমুদ ভেসে যেত। আজ সে বাংলাদেশ আর্মির কর্ণেল। ভাইয়ের একনিষ্ট ভক্ত। বিয়ে করেছে, দুটো মেয়ে আছে। ভাগ্যিস সাহেব শক্ত হাতে তার রশি ধরেছিলেন। এজন্যই আমার খুব আফসোস হয়। আমি তার সমবয়সী হলে হয়তো আমাদের মধ্যে এতোটা ভুলবোঝাবুঝি হতই না। সে কেন করছে এই ব্যাপারগুলো ঠিক বুঝতে পারতাম।
মাহমুদকে নিজেই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন সাহেব। তার ঠোঁটে তিনটে সেলাই লেগেছিলো। রাতে ভীম জ্বর। হাসপাতালেই ভর্তি করাতে হলো। সাহেব একাই ওখানে ছিলেন। আমি মিষ্টি আপুর ঘরে ঘাপটি মেরে বসে রইলাম। তার মুখ ফ্যাকাশে। গলা শুকিয়ে আসছে বারেবারে। মিষ্টি আপু আমার দিকে তাকাচ্ছেন। তার হয়তো মনে হচ্ছে, যা ঘটেছে আমার জন্য। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"সেদিন আমি মিথ্যে বলেছিলাম, তোমার উপর দোষ দিয়েছিলাম। তুমি আমার উপর রাগ করতে পারো। কিন্তু আজ দেখলে তো কেন আমি মিথ্যে বলেছি। ভাইয়ের রাগ এর থেকেও ভয়ংকর হয়। আমাদের ড্রয়িং রুমের শো-কেসটা দেখছো ওইটা একদিন রাগে ভেঙ্গে ফেলেছিলেন ভাই। আমি জানি মাহমুদ জঘন্য কাজ করেছে, তবে তুমি আমাকে বলতে পারতে আগে। ভাইয়াকে সরাসরি না বললেই হত!"
"বিশ্বাস করুন আপু, আমি তাকে কিছু বলি নি। মাহমুদ আমাকে বলেছিলো সে আর এমন করবে না। আমিও আপনার ভাইয়ের ভয়ে তাকে বলি নি। বললে কি এখন আপনার রুমে বসে থাকতাম। আমার হাতপা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। উনি না জানি আমাকে কি করবেন।"
মিষ্টি আপু তার বইটা বন্ধ করে আমার পাশে এসে বসলেন। আমার ঠান্ডা হাতটা ধরে বললেন,
"তোমাকে কিছুই বলবে না। তোমার প্রতি তার একটা সফট কর্ণার আছে। নয়তো মাহমুদের ওই অবস্থাতেও তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়াতো না। অবশ্য আমি ভাইকেও দোষ নেই না জানো। ভাই রাগী ছিলেন ছোট বেলা থেকে। কিন্তু রাগটা প্রকাশ করতেন না। গত দশ বছরে দায়িত্বের পিষ্টনে পিষতে পিষতে সে এমন হয়ে গেছেন। একটা সংসার চালানো, চারটে মানুষের দায়িত্ব নেওয়া এতো সহজ না। তার মধ্যে যদি কেউ ক্যান্সারের প্যাশেন্ট হয়। ভাইয়া যখন অনার্সের তৃতীয় বর্ষে, আমার বাবার কণ্ঠনালিতে ক্যান্সার ধরা পড়ে। যদিও সেটা প্রথম স্টেজ ছিলো। কিন্তু আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। বাবার ছোট চাকরি ছিলো, তাতে তিনটা ছেলে মেয়ের ভরণপোষণ। যা অর্থ জমতো বাড়িতে জমি কিনতেন। হাতে জমানো কিছু ছিলো, যা তার চিকিৎসাতেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো। আমার বয়স বারো, মাহমুদের সাত। এই বাড়িটা আমার দাদার বানানো। তাই আমাদের মাথা গোজার কোনো চিন্তা না থাকলেও ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি রোগের সাথে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ ছিলো না। ভাইয়া তখন চাকরি করে না। মাঝে মাঝে টিউশন পড়াতো। তাতে তার হাতখরচ চলে যায় কিন্তু ঘর না। মা তাই সিদ্ধান্ত নিলো বাড়ি বন্দক রাখবেন। বাড়ি বন্দকের টাকা দিয়েই বাবার অপারেশন করানো হলো। রেডিওথ্যারাপি দেওয়া হলো। আল্লাহর রহমতে বাবা ক্যান্সার মুক্ত হলেন। কিন্তু দেনার বিশাল পাহাড় নেমে এলো ভাইয়ের উপর। ক্যান্সারের জন্য বাবা অফিস করতে পারেন নি। ফলে তার চাকরিটা চলে যায়। বাবার চাকরি চলে যাওয়ায় বিপদের পাহাড় নেমে এলো। তাই ভাইয়া পড়াশোনার পাশে পাশে পার্টটাইম জব করতো, যেন ঘর চলতে পারে। সকালে বের হত আর রাতে ফিরতো সে। বাবার ঔষধপত্র, আমাদের স্কুলের খরচ, আমাদের খাওয়া খরচ-- সবমিলিয়ে কেমন যেন হিমসিম খেয়ে যেত সে। তাও কাউকে বলতো না। বলার মতো কেউ ছিলোও না। কাকে বলবে? আমরা তো ছোট। আর মাকে বলবে? আরোও জ্বালা তাতে। বাবা অসুস্থ হবার পর থেকেই মা যেন কেমন অস্থির অস্থির স্বভাবের হয়ে গেলেন। বাড়ি বন্দকের সুদ বাড়তে থাকলো। ভাইয়া খাবি খেলো এই সুদের চাপে। তাই বাবা যা জমি জমা বাড়িতে কিনেছিলো সব বেঁচে বাড়ির কিস্তি দেওয়া হত। তাও অনেক দেনা ছিলো। ভাইয়া সব একা হাতে সামলাতো। বাবা অসহায়ের মতো ভাইয়াকে দেখতো। ভাইয়া কারোর সাথে কথা বলতো না। এতো চাপে যে কেউ নিয়ন্ত্রণহারা হবে। ভাইয়ের অবস্থাও তেমন হয়েছিলো। রেগে যেতো, ধমকাতো। কোনো কিছু তার মত না হলে তার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যেত। পৃথিবীর প্রতি ছিলো চরম বিরক্ত। আমরাও তার রাগকে ভয় পেতাম। ফল। ফলে ভাইয়া আমাদের কাছে ভয়ের উৎস হয়ে গেল। ভার্সিটি পার হয়ে ভাইয়া চাকরির জন্য মরিয়া হয়ে গেলো। প্রতিদিন পরীক্ষা, ইন্টারভিউ। রেজাল্ট খুব ভালো হওয়ায় বেশিদিন লাগলো না। বেশ ভালো বেতনের চাকরি পেলো ভাইয়া। অফিস শেষে আবার একটা টিউশনি করাতো। ফলে আমাদের ভালো দিন এসেছে বলে মনে হচ্ছিলো। আমাদের বাড়ির বন্দক ছাড়ানো হয়েছে। বাবা সুস্থ। ঘরে অভাব নেই। ভাইয়া সব সামলে নিয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ বলে না, কারোর কপালে সুখ সয় না। আমাদেরও তেমন হলো। বাবা আবার অসুস্থ হলেন। চেকাপ করে দেখা গেলো তার ক্যান্সার আবার হয়েছে, তাও থার্ড স্টেজ। অথচ আমরা টেরও পাই নি। অবস্থা শুধু খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছিলো। খেতে পারতো না। প্রায় ই হাসপাতালে ছুটতে হত। ক্যামো দিতে দিতে শরীরটা নেতিয়ে গিয়েছিলো। প্রায় একটা বছর মৃত্যুর সাথে লড়াই করেছে বাবা। সেই সাথে ভাইয়াও লড়েছে। সবকিছুর সাথে। আমরা থেকেও নেই। বাবার যত্ন করতে করতে মাও অসুস্থ। ভাইয়ার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিলো না। সে যে একদন্ড কারোর সাথে কথা বলবে সেই সুযোগ নেই। আমি দেখতাম ভাইয়া রাতে ঘুমাতো না। সিগারেট খেতো আর পায়চারী করতো। মাঝে মাঝে শূন্যে তাকিয়ে থাকতো। কিছু যেনো খুঁজতো। জানো ভাবী, ভাইয়া অনেক চেষ্টা করেছিলো কিন্তু বাবার শরীর আর এই লড়াই নিতে পারলো না। বাবা যখন মারা গেলেন আমি ইন্টার পরীক্ষার্থী, মাহমুদ এইটে পড়ে। মা হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ভাইয়া সব একা সামলালো। আমাদের মনে হচ্ছে একটা বিশাল পর্বত আমাদের আগলে রেখেছে। অথচ সেই পর্বতকে কতটা ঝড় পোহাতে হচ্ছে কারোর জানা নেই। বাবার মৃত্যুতে আমি ভাইয়াকে কাঁদতে দেখি নি। সে শুধু শুষ্ক চোখে তাকিয়ে ছিলো বাবার লাশের দিকে। তাকে খুব ক্লান্ত লাগছিলো। পরদিন থেকে আবার আগের জীবন। এভাবেই চারটে বছর কেটেছে। আমাদের ঘরের কর্তা ভাইয়া। তাই ভাইয়ার রাগারাগি করাটা আমরা মেনে নিয়েছি। আমার কি মনে হয় ভাইয়া ক্লান্ত আমাদের পালতে পালতে। তাই যখন তোমার সম্বন্ধ এলো সে মুখের উপর না করে দিলো। কারণ সে আরেকটা মানুষকে পালতে পারবে না। এই দায়িত্বের বোঝা তাকে নির্জীব করে দিচ্ছে। তুমি চিন্তা কর, অসুস্থ মা, একটা সেয়ানা বোন, ছোট ভাই সবাইকে দেখে রাখা, তাদেরকে পিতৃস্নেহে বড় করা কি কম কষ্ট। হয়তো এজন্যই আজ ভাইয়া এতো রেগেছেন। তুমি যদি আমাকেও একটু বলতে আমি মাহমুদকে সাবধান করতাম।"
মিষ্টি আপু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমার চোখ ভিজে গেছে। মানুষটার রাগগুলো যেন তখন খুব যৌক্তিক লাগছিলো। আমার মনে হয়েছিলো উনাকে যদি জড়িয়ে বলতে পারতাম,
"যখন ক্লান্ত লাগবে, মনে হবে পৃথিবীটা খুব অসহ্য! আপনি আমার উপর রাগ ঝাড়বেন। তাও নিজেকে কষ্ট দিবেন না।"
—————
সাহেব যখন সকাল বেলা বাড়ি ফিরলেন ফ্রেশ হতে আমি তখন পা টিপে টিপে তার ঘরে গেলাম। সারারাত তিনি ঘুমান নি তা যেন তার মুখে স্পষ্ট ছিলো। আমি অপরাধীর মতো তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি একনজর আমার দিকে চাইলেন। তীক্ষ্ণ সে দৃষ্টি। কিন্তু কিছু বললেন না। আমি অপরাধীর মতো বললাম,
"আমি ওকে ক্লাস কামাই করে সিগারেট খেতে দেখেছিলাম। কিন্তু ও আমার হাতে পায়ে ধরে বলেছিলো আর করবে না। আমি ওকে বিশ্বাস করেছিলাম। তাই আপনাকে জানাই নি। আমাকে ক্ষমা করে দিন।"
সাহেব শুনলেন কিন্তু কিছু বললেন না। আলমারি থেকে একটি শার্ট বের করে বাথরুমে চলে গেলেন। বুঝতে পারলাম তিনি আমার উপর রেগে আছেন। হয়তো কষ্টও পেয়েছেন। আমি সেদিন প্রতীজ্ঞা নিয়েছিলাম, আর কখনো উনাকে কিছু লুকাবো না৷ তাতে আমার শ্বশুরবাড়ির সবার সাথে মনোমালিন্য হলে হোক। সংসারজীবনে আমার এই প্রতীজ্ঞাটা শুধু একবার ভাঙ্গতে হয়েছিলো। সেটা পরে বলবো। তবে সাহেবের রাগ ভাঙ্গাতে আমার খুব কষ্ট হয়েছিলো সেবার। একদম নাকানিচুবানি যাকে বলে!
—————
মাহমুদের রিলিজ হলো তিনদিন পর। মা অত্যন্ত রেগে ছিলেন সাহেবের উপর এবং কিঞ্চিত অসন্তুষ্ট আমার উপরও ছিলেন। মাহমুদ কেমন ভেড়ার মতো হয়ে গিয়েছিলো। তার চাঞ্চল্যগুলো হুট করেই উবে গিয়েছিলো। মাঝে মাঝে তাকে দেখলে মায়া হত। কিন্তু তার দোষটাও পাপের সমতূল্য। সাহেব তার আগের রুপেই অনড় ছিলেন। মাহমুদকে বাড়ি আনার পর পর সাহেব ঘোষণা করলেন,
"আজ থেকে মাহমুদ বাড়ি থেকে অকারণে বের হবে না। মুদির দোকানেও যাবে না। কলেজে গেলে কাননের সাথেই যাবে। ওর সাথেই আসবে। বাসায় একটা শিক্ষক রাখবো সেই সব পড়াবে।"
মা এবার তার অসন্তোষ চাপা রাখতে পারলেন না। তিনি অনুযোগের স্বরে বললেন,
"বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না? হিতে বিপরীত হবে মুহাইমিন। একেই ওকে মেরে কি বানিয়েছিস। এখন জেলের কয়েদির মতো আচারণ করছিস। বেশি জোর দিলে কাঁচ ভেঙ্গে যায়, তখন নিজের হাতেই রক্তক্ষরণ হয়!"
"আমি অতকিছু বুঝি না। যদি চাও আমি মাহমুদকে খাওয়ার খরচ, পড়ার খরচ দেই তাহলে সে আমার কথাতেই চলবে। আমার কথার অবাধ্য হলে আমি তোমার ছেলেকে পালবো না। তোমার ছেলের পেছনে একটা টাকাও আমি খরচ করবো না। সে কিভাবে কি করবে তা তার ব্যাপার।"
সাহেবের দৃঢ় কথায় মা ক্ষিপ্ত হলেন। তিনি কঠিন গলায় বললেন,
"ভুলে যাস না! এই বাড়ি আমার। আমার বাড়িতে থেকে তুই আমার ছেলের খাওয়া পড়া বন্ধ করবি?"
মায়ের এমন কথায় আমি খুব আহত হলাম। তিনি শুধু মাহমুদকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। তিনি রীতিমতো সাহেবের সাথে পক্ষপাতীত্ব করছেন। হ্যা সাহেব একটু কড়াকড়ি করছেন বটে তবে মায়ের এক ছেলের প্রতি প্রেম আর অন্য ছেলের প্রতি এমন কটাক্ষভাব আমার ভালো লাগলো না। সাহেবের চোয়াল শক্ত হলো। তিনি খুব কঠিন গলায় বললেন,
"বেশ, আমি আমার বউকে নিয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছি। তুমি তোমার ছেলে মেয়েকে নিয়ে থাকো। মনে রেখো মা, আমি যদি এই বাড়ি থেকে বের হই কখনো ফিরেও তাকাবো না। যা বলি আমি তাই করি। এখন ভেবে দেখো কি করবে! তবে যদি চাও আমি এই বাড়িতে থাকি এবং তোমার ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করি তবে এই বাড়িতে তাই হবে যা আমি চাব। যেহেতু বাড়ির মানুষের সামান্য ব্রাশ থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচ আমার টাকাতেই চলে তাই মাহমুদকে কি করে সোজা করবো, মিষ্টির কখন বিয়ে হবে, তুমি মিষ্টি খাবে কি না, আমার বউ পড়াশোনা করবে কি না সব কিছু আমার কথাতেই হবে। যদি না চাও বলে দাও।"
সাহেবের কথাটা প্রচন্ড পাষন্ডের মতো লাগলো। তবুও তিনি একচুল নড়লেন না তার কথা থেকে। এদিকে মা বিপাকে পড়লেন। বাবার কোনো পেনশনের টাকা নেই। জমিজামা সব বেঁচে দেওয়া হয়েছে। সাহেব নতুন করে যাই কিছু করেছেন তা চারজনের নামে। চাইলে তা বেঁচা যাবে না। মাহমুদের পড়াশোনা, মিষ্টি আপুর বিয়ে-- সব চিন্তা করতেই তিনি হাঁপিয়ে গেলেন। তাই বাধ্য হয়েই সাহেবের কথা মেনে নিতে হলো। শুধু রাগে বললেন,
"তুমি টাকার গরম দেখিয়েছিস। আল্লাহ বিচার করবে তোরে!"
সাহেব শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন,
"আচ্ছা!"
মাহমুদের জন্য কড়া টিচার রাখা হলো। নাম আদনান ভাই। আদনান ভাই ভার্সিটি থেকে ফিজিক্সে এ ফার্স্ট ক্লাস থার্ড। তার টার্গেট ছিলো বিসিএস ক্যাডার হবেন। মাহমুদের সাথে সাথে তিনি আমাকেও পড়াতেন। আমারও কোচিং যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। মাহমুদের "আয় আয়" সংঘের সাথে মিলামিশা বন্ধ হয়ে গেলো। সে কড়া শিক্ষকের পাল্লায় পড়ে পড়াশোনা শুরু করলো। আমারোও ইন্টার পরীক্ষা ঘনিয়ে এলো। আমি ঘর সামলে পরীক্ষা দিলাম। আশ্চর্যজনক ব্যাপার আমার রেজাল্টও ভালো হয়েছিলো। রেজাল্ট ভালো হবার সুবাদে সাহেবের সাথে শীতল হয়ে যাওয়া সম্পর্কটা চনমনে হয়ে গিয়েছিলো। আমি যখন তাকে রেজাল্ট জানালাম তিনি শান্ত স্বরে বললেন,
"যাক, ঘটে বুদ্ধি আছে। কলেজের দ্বার পার করা গেলো অবশেষে। এখন কি পড়াশোনা করা হবে নাকি ইস্তফা?"
"আমাকে চারুকলায় ভর্তি করবেন? আমার আঁকাউঁকির হাত ভালো!"
"ছবি আঁকা?"
"হ্যা! কৃপা করে আমাকে চারুকলায় পড়ার সুযোগ দিন।"
সাহেব দীর্ঘসময় গাঢ় দৃষ্টি আমার দিকে চেয়ে রইলেন। আমার হাতটা টেনে নিজের কাছে নিলেন। গাঢ় স্বরে শুধালেন,
"আমার কৃপা চাই?"
"এখন যেহেতু আপনার গলায় ঝুলেই গিয়েছি, আর কারোর কৃপা চাওয়ার তো উপায় নেই। তাই আপনার কৃপায় জীবন ধন্য করতে চাই!"
সাহেব চোখ ছোট ছোট করে বললেন,
"জবান তো রেলগাড়ির মতো ছুটছে দেখি!"
"তা সারাজীবন গ্যাদা থাকবো নাকি! ঘরের কর্ত্রী আমি!"
"ওরে বাবা! তা কবে থেকে শুনি!"
"এখনো ডিকলেয়ার হয় নি, তবে হয়ে যাবে। আচ্ছা, শুনুন আমাকে একটা গোলাপ ফুলের মালা এনে দিবেন? রেজাল্ট উপলক্ষে আমার উপহার!"
সাহেব আমাকে ছেড়ে দিলেন। কড়া স্বরে জানালেন,
"এসব নকটামি করতে পারবো না। যন্ত্রণা, যত্তসব!"
আমার মন খারাপ হয়েছিলো তখন। কৃপাধারী হুতুম হনহন করে চলে গিয়েছিলেন। আমি হতাশা নিয়ে ঘরের হেসেলে ফিরে গিয়েছিলাম। তবে রাতে আমার খাটের উপর একটা শাড়ির প্যাকেট পেয়েছিলাম। তাতে লাল একখানা শাড়ি, একগাছি কাঁচের চুড়ি আর একটা গোলাপের মালা ছিলো। চিরকুট ছিলো। বিশ্রী হাতের লেখার। তাতে লেখা ছিলো,
"কৃপা করে শাড়িটা পড়ে ধন্য হলে ভালো হয়!"
·
·
·
চলবে……………………………………………………