শ্রীমঙ্গলে মৌনির দিনগুলো ভালো কাটছে। প্রকৃতির এতো কাছে এসেই কিনা কে জানে মৌনি তার লেখকসত্তার নতুন এক বর্ণের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। যে বর্ণ জলের মতোন– কুলকুল শব্দ তুলে কেবল বয়ে যায়। কোনো দুঃখ, কষ্ট, জাগতিক প্রশ্নকে তোয়াক্কা না করে ছুটে চলে সৃজনীশক্তির এক অমোঘ আকর্ষণে। সেদিন পূর্ণিমা দেখে ফিরে এসেই লিখতে বসেছিল মৌনি। কিছু একটা লিখতে হবে এই তাড়না থেকে শুরু করলেও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে তার ঘটনাপ্রবাহ। দুই ভাই-বোন, তপু আর মিতু, গরমের ছুটিতে গহীন জঙ্গলে তাদের মামার কাছে বেড়াতে এসেছে। মামা রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার, অবিবাহিত উদাস মানুষ। গহীন জঙ্গলে প্রাচীন এক ভিলা মেরামত করে একমাত্র চাকর বাহাদুরকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। লোকালয় থেকে দূরে বিচ্ছিন্ন এই পাহাড় চূড়ায় কিছুদিন পর পরই ঘটে অলৌকিক সব ঘটনা। সেই অলৌকিক ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে কৌতুহলী তপু টেলিফোন করে আমন্ত্রণ জানায় তার খালাতো ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুহিবকে। মুহিব আরেক দুর্বোধ্য চরিত্র। তার এই দুর্বোধ্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই সম্ভবত তপু তাকে অসম্ভব পছন্দ করে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, মুহিব ভাইয়ের পক্ষে দুনিয়াবি যাবতীয় রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব। খুবই এলেবেলে সাধারণ কাহিনি। এই সাধারণ কাহিনিকে একটু জটিল করতে মৌনি তাতে পুরে দিয়েছে কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা। তারপর যা দাঁড়িয়েছে তাতে পাঠক হিসেবে মৌনি বিমুগ্ধ। এই মুগ্ধতাকে আরও পরিপক্ক করতে মৌনির দরকার কিছু বই, তথ্য আর পড়াশোনা। এক রাতে এক তৃতীয়াংশ উপন্যাস লিখে ফেলে মৌনি অস্থির হয়ে উঠল বাকিটা লেখার জন্য। তৎক্ষনাৎ তৈরি হলো শহরে যাবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু শহরে গেলেই কি বই পাওয়া যাবে? শ্রীমঙ্গলের মতোন মফস্বলে এরকম দুর্লভ ঐতিহাসিক বই পাওয়া সম্ভব? অথবা এরকম ভারি মনস্তাত্ত্বিক বা বিজ্ঞানের বই? মৌনি চিন্তিত মুখে সেদিনের সেই সিএনজি চালকের নাম্বারে টেলিফোন করল। ভাগ্যিস, নাম্বারটা রেখেছিল।
ভাঙা সাঁকোর ওপার থেকে সিএনজি যখন তাকে তুলে নিলো তখন মধ্যদুপুর। ঘড়িতে একটা বেজে বাইশ মিনিট। সন্ধ্যার আগে বাংলোয় ফিরতে হবে। এই অপরিচিত শহরে কোথায় লাইব্রেরি খুঁজে পাবে কে জানে! ভাবপ্রবণ হয়ে আশেপাশের জংলায় ফোটা বুনোফুল দেখতে দেখতে মৌনি যখন জঙ্গলের সরু রাস্তাটা পাড়ি দিচ্ছিল ঠিক তখনই দেখতে পেলো কিছুদূরে রাস্তার এক পাশ ধরে হেঁটে যাচ্ছে লম্বা মতোন এক লোক। অলিভ গ্রীন শার্ট, ব্ল্যাক প্যান্ট আর সাদা-কালোর মিশেল কেডস তার পরনে। লোকটি আশেপাশে না তাকিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটছে। তাদের সিএনজিটা আরেকটু কাছে যেতেই লোকটিকে চিনে ফেলল মৌনি। মাথা বের করে ডাকল,
‘ আহসান সাহেব!’
লোকটি এই নির্জন পথে হঠাৎ নিজের নাম শুনে সম্ভবত একটু চমকাল। মুখ তুলে তাকিয়ে মৌনিকে দেখে আন্তরিকভাবে হেসে বলল,
‘ আরে, মৌনি! শহরে যাচ্ছেন নাকি?’
মৌনি মাথা নাড়ল। একটু সরে বসে বলল,
‘ উঠে আসুন। আমি আপনাকে নামিয়ে দিচ্ছি।’
অনুমতির বালাই নেই। মৌনির সরাসরি আদেশে খানিকটা বিব্রত হলো আহসান। সেকেন্ডের মধ্যে ব্যাপারটা কাটিয়ে উঠে সিএনজিতে উঠে বসল। হেসে বলল,
‘ থেংকিউ।’
মৌনি প্রত্যুত্তরে হাসল। আহসান জানতে চাইল,
‘ শহরে কোনো কাজ আছে নাকি ঘুরতে যাচ্ছেন?’
‘ দুটোই। আমার এখনও শ্রীমঙ্গল ঘুরে দেখা হয়নি।’
‘ কতদিন আছেন এখানে?’
মৌনি ঠোঁট উল্টে বলল,
‘ পরিকল্পনা তো একমাস। দেখা যাক, কী হয়।’
আহসান একটু অবাক হয়ে বলল,
‘ একমাস! সে তো অনেকদিন। আমি অবশ্য বেশিদিন থাকবো না। সপ্তাহখানেকের মেহমান।’
তারপর কিছুক্ষণ কেবল ইঞ্জিনের উৎকট শব্দ। উঁচু-নিচু সরু রাস্তাটা পেরিয়ে পাকা রাস্তায় উঠতেই আহসান নীরবতা ভেঙে বলল,
‘ অনেকদিন একা থাকবেন। এই দুর্গম জায়গায় একা থাকার সময় মেয়েদের একটা নিয়ম মেনে চলতে হয়। নিয়মটা আপনি জানেন মৌনি?’
মৌনি জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। আহসান বলল,
‘ ডোন্ট ট্রাস্ট এনিওয়ান। আকাশ থেকে ফেরেশতা নেমে এলেও বিশ্বাস করবেন না। এই পৃথিবীতে মাঝে মাঝে মানুষকে বিশ্বাস করা পাপ।’
মৌনি হেসে বলল,
‘ আপনাকেও বিশ্বাস করবো না?’
আহসান প্রত্যুত্তরে গম্ভীর গলায় বলল,
‘ না।’
তারপর একটু থেমে উত্তরটিকে আরও স্পষ্ট করতে বলল,
‘ আমাদের সবার মধ্যে একটা ঘুমন্ত শয়তান থাকে। ইউ নেভার নো, হোয়েন ইট উইল ওয়েক।’
মৌনি মৃদু হাসল। মাথা ঝাঁকিয়ে ভাবুক মনে সিএনজির বাইরে তাকিয়ে রইল। সিএনজি তখন পাকা সড়ক ধরে ছুটছে। ধীরে ধীরে মোটরচালিত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। আহসান কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলে অত্যাধুনিক এক রিসোর্টের সামনে গাড়ি থামাতে বলল। মৌনি ভাবনা থেকে বেরিয়ে সচেতন চোখে আশেপাশে তাকাল। ফটকের বাইরে থেকে যতটা দেখা গেল তাতেই বুঝল রিসোর্টটি আকারে বিশাল। অত্যাধুনিক সকল সুবিধা এখানে উপস্থিত। তার ধারণা সত্য প্রমাণ করে সিএনজি চালক জানাল,
‘ এটা শ্রীমঙ্গলের সবচাইতে বড় রিসোর্ট, আপু। বিদেশি মানুষজন বেড়াতে আসে এখানে। ভেতরে তাদের নিজস্ব চা বাগানই আছে দুই তিনটা। বড়লোকের বড়লোকি কারবার।’
মৌনি কিছু না বলে আরেক নজর রিসোর্টটি দেখে আহসানের কাছে জানতে চাইল,
‘ এই রিসোর্টে কোনো কাজ আছে আপনার?’
আহসান ততক্ষণে সিএনজি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। হাতে ওয়ালেট। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, ভাড়া পরিশোধ করবে। তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে মৌনি বিরক্ত গলায় বলল,
‘ কী আশ্চর্য! আপনি টাকা বের করেছেন কেন? আমি আপনাকে লিফট দিয়েছি। এই সিএনজি আজ সারাদিনের জন্য আমি ভাড়া করেছি। ভাড়াও আমি দেবো। আপনি এতটুকু পথের জন্য ভাড়া দিতে চেয়ে আমাকে অপমান করবেন না, প্লিজ।’
আহসান সে কথায় মাথা নিচু করে সিএনজির ভেতরে তাকাল। মৌনির দিকে তাকিয়ে চমৎকার হেসে বলল,
‘ হোয়েন আ কুইন অ্যারাইভস, অল অ্যারাউন্ড হার বিকাম মিয়ার পন্স। সো লেট মি সার্ভ ইউ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।’
বলে ভাড়াটা মিটিয়ে দিয়ে ফের একইভাবে হাসল আহসান। মৌনি এবার আর প্রতিবাদ করতে না পেরে হেসে ফেলে বলল,
‘ আপনার ফ্লার্টিং স্কিল খুবই ভালো, আহসান সাহেব। তা, এখানে কোনো কাজ আছে আপনার?’
মৌনির প্রশ্নে মুখ তুলে একবার রিসোর্টের দিকে তাকাল আহসান। বলল,
‘ এখানে আমার গাড়ি রাখা আছে। এখান থেকে গাড়ি নিয়ে তারপর একটা দরকারি কাজে যাবো।’
‘ আপনার গাড়ি..’
মৌনির কথার মাঝেই রিসোর্টের ফটক খুলে বেরিয়ে এলো একটা ছাদ খোলা জিপ গাড়ি। ড্রাইভার রাস্তার একপাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দ্রুত হেঁটে আহসানের কাছে এসে বিনীত গলায় বলল,
‘ স্যার, চাবি।’
আহসান হাত বাড়িয়ে চাবিটা নিয়ে ফের মৌনির দিকে তাকাল। বলল,
‘ আপনি খুব অস্বস্তি বোধ না করলে আমার সঙ্গে আসতে পারেন। আই ক্যান ড্রাইভ ইউ হোয়্যারএভার ইউ ওয়ান্ট টু গো।’
মৌনি ইতস্তত করে বলল,
‘ না, না। আপনাকে শুধু শুধু কষ্ট করতে হবে না। আমি জাস্ট শহরের কয়েকটা লাইব্রেরি ঘুরে দেখব। কিছু বই কেনার আছে আমার। আপনি যেতে পারেন।’
‘ সেখানে তো আমিও নিয়ে যেতে পারি।’
মৌনি ছদ্ম গাম্ভীর্য নিয়ে বলল,
‘ নিয়ে গেলেই কী করে যাই বলুন তো? একটু আগেই আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে উপদেশ দিয়েছেন, ডোন্ট ট্রাস্ট এনিওয়ান মৌনি।’
মৌনির কথার ধরনে হেসে ফেলল আহসান। বলল,
‘ সে কথা তো সিএনজি ড্রাইভারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সন্ধ্যায় সিএনজি করে একা ফিরবেন। তার চাইতে স্বল্প পরিচিত কেউ বেশি নিরাপদ নয়?’
মৌনি একবার ভাবল নিষেধ করবে। পরমুহূর্তেই সিদ্ধান্ত বদলে বলল,
‘ ঠিক আছে চলুন।’
আহসান এগিয়ে গিয়ে প্যাসেঞ্জার সীটের দরজাটা খুলে দিয়ে বিনীত গলায় বলল,
‘ আফটার ইউ।’
মৌনি মৃদু হেসে গাড়িতে উঠল। আহসানও জলদগম্ভীর পায়ে নিজের সীটে এসে বসল। চোখে রোদচশমা পরে গাড়ি স্টার্ট দিতেই মৌনি বলল,
‘ এখানে বাইরের গাড়ি পার্ক করতে দেয়?’
‘ বাইরের গাড়ি?’
একবার মৌনির দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা বুঝেই বলল,
‘ ওহ! না.. আমি আসলে শিওর নই। তবে সম্ভাবনা খুবই কম।’
‘ তাহলে আপনি গাড়ি রেখেছিলেন কী করে? আপনি তো ওদের গেস্ট নন।’
আহসান সামনের দিকে দৃষ্টি রেখেই বলল,
‘ এই গাড়িটা আসলে ওদেরই। মানে, রিসোর্ট কতৃপক্ষের। আমি এখানে যতদিন আছি ব্যবহার করছি।’
মৌনি ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ ওরা রিসোর্টের গাড়ি রেন্টে দেয়? কী আশ্চর্য ব্যাপার!’
মৌনির এতো কৌতূহলে সামান্য হাসল আহসান। সে ব্যক্তিগতভাবে খুব কম কথা বলা মানুষ। কিন্তু দুইদিনেই বোধগম্য হচ্ছে, মৌনি তার বিপরীত। তবে ভিত্তিহীন কথা যে সে বলে না এই ব্যাপারটা উপভোগ্য। আহসান তাকে আরও প্রশ্ন করার সুযোগ করে দিয়ে বলল,
‘ রেন্ট দেয় না। তবে মালিকশ্রেণি চাইলে ব্যবহার করতে পারে।’
মৌনি সরু চোখে তাকিয়ে বলল,
‘ মালিক শ্রেণি! আপনি কি এই রিসোর্টের মালিকদের কেউ?’
আহসান হেসে ফেলে বলল,
‘ বাপরে! অতো ধনবান আমি নই। আমি আপাতত প্রবলভাবে বেকার একজন মানুষ। রিসোর্টটা আমার বড় ভাইয়ের।’
আহসান ভেবেছিল মৌনি আশ্চর্য হবে। কিন্তু তাকে বিস্মিত করে দিয়ে মৌনি খুবই বিরক্ত হলো। ত্যক্ত গলায় বলল,
‘ তাহলে আপনি এখানে না থেকে বাংলোতে কেন থাকছেন?’
মৌনির প্রশ্নের ধরন দেখে মনে হলো, আহসান বড় ভাইয়ের রিসোর্টে না থেকে বাংলোতে থেকে ভয়ংকর এক অপরাধ করে ফেলেছে। তার এই অপরাধের কথা ভাবলেই রাগে মৌনির মাথা ফেঁটে যাচ্ছে। পারলে বোধহয় সে গাড়ি থেকেই নেমে যেতো। আহসান ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। খুব সাবধানে মৌনিকে একবার পরখ করে নিয়ে বলল,
‘ আপনি কি রেগে গেলেন?’
মৌনি মহাবিরক্ত হয়ে বলল,
‘ আমি কেন রেগে যাব?’
আহসান উত্তর দেওয়ার মতো কিছু পেলো না। ছোট্ট করে ‘আচ্ছা!’ বলে একেবারে নীরব হয়ে গেল। মৌনি একবার আড়চোখে আহসানকে দেখল। তার জায়গায় অন্যকোনো লোক হলে হয়তো আলাপ বাড়িয়ে পরিবেশটা সহজ করার চেষ্টা করতো। সমস্যাটা ধরার চেষ্টা করতো। আহসান সেরকম কিছু না করে চোয়াল শক্ত করে গাড়ি চালাচ্ছে। রোদচশমায় ঢাকা চোখ রাস্তার দিকে নিবদ্ধ। মৌনি বলে যে কেউ তার পাশে বসে আছে তা যেন সেকেন্ডের মধ্যেই বিস্মৃত হয়েছে। মৌনি অস্বস্তি বোধ করলো। একটু আগে হুট করেই কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এখন এই শ্মশানপুরীর নীরবতাও বিরক্ত লাগছে। কিছুক্ষণ আগের ব্যবহারে কিছুটা সংকোচও হচ্ছে। মৌনি এই নীরবতা আর সংকোচ ভাঙতে ব্যাগ থেকে তার ক্যামেরাটা বের করে সহজ গলায় বলল,
‘ গাড়িটা একটু ধীরে চালাবেন প্লিজ। আমি কিছু ছবি তুলব।’
আহসান নীরবে গাড়ির গতি কমালো। পীচ ঢালা মসৃণ পথের দু'পাশে উঠে গিয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়। তাদের ঢালে নব বধূর অলংকারের মতোন সেজে আছে কচি, সবুজ চা বাগান। ছবির মতোন সুন্দর দৃশ্য। মৌনি ক্যামেরা তাক করে কিছুক্ষণ নির্জন পথ, মেঘমুক্ত আকাশ, মাথায় মাথাল পরে চা তুলতে ব্যস্ত চা শ্রমিকদের ছবি তুলল। মৌনিকে ছবি তুলতে দেখে এক শ্রমিক মুখ তুলে তাকিয়ে ঠাট্টা করে বলল,
‘ ছবি তুললে টাকা দিতে হবে আপু।’
চলন্ত গাড়ি থেকে টাকার পরিবর্তে এক টুকরো হাসি উপহার দিলো মৌনি। মেঘ নেই। বৃষ্টি নেই। চারপাশে গাছের ছায়া হওয়ায় রোদও সেভাবে লাগছে না। ঝিরঝিরে মিষ্টি একটা হাওয়া বইছে। চলন্ত গাড়িতে সেই হাওয়া লাগছে ঝড়ের মতো। পনিটেল করে রাখা চুলগুলো বাঁধন মুক্ত করে দিয়ে মৌনির নিজেকে কোনো রোমান্টিক সিনেমার নায়িকা বলে অভিমান হলো। আফসোস করে বলল,
‘ ইশ! আমাদের যদি কেউ এভাবে একটা ছবি তুলে দিতো!’
আহসান এতোক্ষণে মুখ খুলল। ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
‘ আমাদের ছবি তুলে কী হবে?’
‘ দৃশ্যটা কী সিনেম্যাটিক ভাবুন! নীরব, শান্ত পথের দু’পাশে নিরবিচ্ছিন্ন চা বাগান। তার মধ্যে দিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে ছুটে চলেছি আমরা। হাওয়ার দাপটে চুল উড়ছে। নিজেকে আমার হিরোইন মনে হচ্ছে।’
এতোক্ষণের গাম্ভীর্য কাটিয়ে এবার হেসে ফেলল আহসান। বলল,
‘ আপনি চাইলে আমি আপনার ছবি তুলে দিতে পারি।’
মৌনি সরু চোখে তাকিয়ে বলল,
‘ আপনি?’
তারপর কী ভেবে বলল, ‘ না, থাক।’
মৌনির সংশয়কে তোয়াক্কা না করে একটি সুন্দর জায়গা দেখে গাড়ি থামাল আহসান। গাড়ি থেকে নেমে এসে মৌনির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘ দিন, আপনার ক্যামেরাতেই তুলে দিচ্ছি ছবি।’
মৌনি একটু ইতস্তত করে ক্যামেরা এগিয়ে দিলো। আহসান খানিকটা দূরে সরে গিয়ে বলল,
‘ আপনি ড্রাইভিং সীটে গিয়ে বসুন মৌনি।’
তারপর কীভাবে, কোথায় হাত রাখলে ছবি আরও রিয়েলিস্টিক আসবে সেটাও বলে দিলো আহসান। ড্রাইভিং হুইলে এক হাত রেখে বাতাসে উড়তে থাকা চুল নিয়ে মৌনি যখন চওড়া হাসি সমেত ক্যামেরার দিকে তাকাল তখনই পরপর কয়েকটা ক্লিক করলো আহসান। ঠোঁট ফাঁক করে বলল,
‘ পার্ফেক্ট!’
মৌনিকে ক্যামেরাটা ফিরিয়ে দেওয়ার সময় বলল,
‘ ছবিতে আপনাকে আসলেই তূর্কি হিরোইনদের মতো লাগছে। ’
তূর্কি হিরোইন! খুশিতে বাক-বাকুম হয়ে নিজের ছবি দেখতে বসল মৌনি। ছবিগুলো আসলেই চমৎকার এসেছে। এগুলো কখন এডিট করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করবে তা নিয়ে ভেতর ভেতর শিশুদের মতোন উদগ্রীব হয়ে উঠল সে। আহসান রোদচশমার আড়াল থেকে আড়চোখে বেশ কয়েকবার মৌনিকে দেখল। প্রথম যখন মৌনির সঙ্গে দেখা হলো তখন তাকে ভারি গম্ভীর আর দাম্ভিক ভেবেছিল আহসান। তারপর মনে হলো, বড় বেশি কৌতূহলী। এখন তার আনন্দ দেখে মনে হচ্ছে, দশ বছরের শিশু। একই মানুষের মধ্যে এতো রূপ দেখে কিছুটা অবাক হলো সে।
চা বাগানের পথ ধরে যেতে যেতে মৌনি যখন বিশ্বাসই করে ফেলল এই পথের কোনো শেষ নেই ঠিক তখনই বাঁক ঘুরে একটা রিসোর্টের সামনে এসে গাড়ি থামাল আহসান। ভেতরে ঢুকে রিসোর্ট কতৃপক্ষের সঙ্গে কী সব গুরু গম্ভীর আলোচনা করলো। রিসোর্টটা ঘুরে ঘুরে দেখল। মৌনি এই প্রদর্শনীর কারণ নিয়ে কোনো কৌতূহল প্রকাশ করলো না। রঙিন প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে নিজের মতোন নানান জিনিসের ছবি তুলে সময় কাটাল সে। তার মনে তখন অন্যরকম হিসেব-নিকেশ। এতো চমৎকার প্রকৃতি! এখান থেকে একটা ছবিকেও যদি বিক্রি করার মতোন শৈল্পিক রূপ দেওয়া যায় ! রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে ওরা আবার ফিরে এলো শহরের দিকে। অনেক খুঁজে কয়েকটা লাইব্রেরির সন্ধান পেলো। কিন্তু সেখানে মৌনির পছন্দের বই পাওয়া মোটামুটি অসম্ভব। ততক্ষণে সূর্য ঢলে গিয়ে গোধূলির কনে দেখা আলোয় সয়লাব হয়ে উঠেছে চা বাগানের শহর। একটু পরই সন্ধ্যা নামবে। আর অপেক্ষা করা যায় না। একসময় বই না পেয়ে শূন্য হাতেই বাংলোর পথ ধরলো ওরা। কনে দেখা আলোয় মৌনির কোমল মুখটা ভার হয়ে রইল পুরোটা পথজুড়ে। দুপুরের আনন্দের লেশমাত্র নেই তার চোখে। বইয়ের জন্য তার এতো মন খারাপ দেখে আহসান ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ আপনি চাইলে আপনার বইয়ের তালিকাটা আমাকে দিতে পারেন। আমাদের… মানে আমার ভাইয়ের রিসোর্ট থেকে সপ্তাহে তিন-চারদিনই কেউ না কেউ সিলেট শহরে যায়। ওদের কাছে লিস্টটা দিলে সিলেট থেকে বইগুলো এনে দেবে ওরা। সেখানেও না পেলে ঢাকা থেকে আনানোর ব্যবস্থা করবে। এখনই না পেলেও দুই-একদিনের মধ্যে হাতে পেয়ে যাবেন আপনার বই।’
মৌনি মুখ ভার করে বলল,
‘ প্রয়োজন নেই। এমনিতেই আমি আপনাকে যথেষ্ট বিরক্ত করে ফেলেছি। আমি চাই না, কেউ আমার জন্য অহেতুক শ্রম দিক। ভাবছি আমি নিজেই একদিন সিলেট যাব।’
আহসান মাথা নেড়ে বলল,
‘ তা আপনি যেতেই পারেন। তবে ওরা আপনার জন্য অহেতুক শ্রম দিচ্ছে এই ভাবনাটা কিন্তু ভুল মৌনি। যদি ওরা কেবল আপনার বইয়ের জন্য শহরে যেতো তাহলে কথাটা সঠিক হতো। ওরা যাবে নিজেদের কাজে, ফেরার পথে আপনার কাজটাও করে দেবে। এতে তাদের আলাদা করে পরিশ্রমের দরকার হবে না। এতোটুকু সুবিধা আপনি নিতেই পারেন। আমরা সমাজে বসবাসই করি একে অপরের থেকে এরকম ছোটখাটো সুবিধা নিয়ে জীবনটাকে আরেকটু সহজ করার জন্য।’
বলে মৌনির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল আহসান। বলল,
‘ আপনি কিন্তু ভেবে দেখতে পারেন।’
আহসানের প্রস্তাবে মৌনি নিগূঢ় ভাবনায় ডুবে গেল। ওর চোখে-মুখে গভীর দুশ্চিন্তার ছাপ দেখে মনে হলো, ও তার জীবনের সবচাইতে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। এই সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করছে তার সমগ্র জীবন। আহসান তার এই চিন্তাক্লিষ্ট মুখ দেখে নিজের মনে হাসল। মেয়েটা ভারি ছেলেমানুষ তো!
—————
শাওনের যখন ঘুম ভাঙল তখন দুপুর। মাথায় চিনচিনে একটা ব্যথা। গত রাতে একদমই ঘুম হয়নি । নিজেকে এতো ক্লান্ত করে তোলার পরও কী এক অস্থিরতা রাতভর তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। সাহরির অনেক পর কিছুটা তন্দ্রাভাব এসেছে। তারপরও ছাড়া ছাড়া। শাওন ঘাড় ফিরিয়ে পাশে তাকাল। সৌমি বিছানার একপাশে মুখ ভার করে বসে আছে। হাতে ফোন। অন্যমনস্ক চেহারায় স্ক্রল করে চলেছে। শাওন হাত বাড়িয়ে এক ঝটকায় তাকে বুকের উপর টেনে এনে চিবুক ধরে গভীর দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকাল। বলল,
‘ দেখি। কী হয়েছে? পাখিটার এতো মন খারাপ কেন?’
সৌমির মুখে আরও আঁধার নামল। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,
‘ আমার খুব খারাপ লাগছে, শাওন।’
শাওন ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ কেন?’
‘ কেমন অস্থির লাগছে। বাবা এতো বিশ্বাস করেন আমাকে। অথচ আমি…এসব জানলে বাবা খুব কষ্ট পাবেন।’
বলেই চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল সৌমির। শাওনের ভারি মায়া হলো। সৌমির মাথাটা আলতো করে বুকে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
‘ কিচ্ছু হবে না। আমি তো আছি। ইট'স ওকে, জান।’
সৌমি মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,
‘ তুমি আছো?’
শাওন মিষ্টি করে হাসল। সস্নেহে সৌমির ললাট চুম্বন করে বলল,
‘ অবশ্যই আছি। তোমাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাবো, বলো?’
সৌমি করুণ চোখে তাকাল। মোমের মতোন ঝকঝকে সৌমির গায়ের রঙ। অল্প একটু কান্নাতেই আপেলের মতোন লাল হয়ে উঠেছে তার নাক আর টসটসে কপোল। পুরুষ্টু ঠোঁটদুটো রসের ভারে ন্যুব্জ। শাওন মুখটা এগিয়ে নিয়ে চুমু খেতে চাইল সৌমির কোমল ঠোঁটে। খুব কাছে গিয়েও হঠাৎ কী ভেবে সরে গেল আবার। ভালো লাগছে না। এই শারিরীক যুদ্ধও আর মন টানছে না। শাওন সৌমিকে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বলল,
‘ যাও, তৈরি হয়ে নাও। তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমি বাসায় ফিরব।’
সৌমি উঠে বসে বলল,
‘ আমি তোমাদের বাসায় যাব।’
‘ আমাদের বাসায়?’ ভেতর ভেতর একটু চমকে উঠল শাওন। ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,
‘ আমাদের বাসায় কেন?’
‘ ভাবছি আন্টির সঙ্গে দেখা করে যাব। খালামণিকে বলেছি, আমার এক বন্ধুর হলে থাকব। ওদের সঙ্গে আজকের ইফতার করে তারপর ফিরব। আমার হাতে সময় আছে। সমস্যা নেই।’
শাওন গম্ভীর গলায় বলল,
‘ অন্যদিন দেখা করো। আজ থাক।’
‘ কেন? আজ গেলে কী সমস্যা?’
শাওন বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ তোমার এই এক সমস্যা সৌমি। সব সময় তর্ক করতে থাকো। একটা কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মানতে পারো না?’
সৌমি জেদ ধরে বলল,
‘ তুমি আগে বলো, আজ গেলে কী সমস্যা? এমন তো নয় আন্টি আমার কথা জানেন না।’
শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে নিজেও জানে না, কেন সে সৌমিকে নিজের সঙ্গে বাড়ি অব্দি নিতে চাইছে না। তার অবর্তমানে সৌমি একবার বাড়ি গিয়েছিল। একা যাওয়া আর শাওনের সঙ্গে যাওয়া দুটো ভিন্ন কথা। শাওন সৌমিকে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া মানেই বাড়ির সকলের কাছে সৌমিকে একটা স্বীকৃতি দেওয়া। স্বীকৃতি দিলেই বা ক্ষতি কী? শাওন কি মনে মনে এখনও মৌনির ভালোবাসা প্রত্যাশা করছে? মৌনি কোনোদিন এলে তার জায়গায় সৌমিকে দেখে দুঃখ পাবে এই ভাবনা ভাবছে? শাওন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শাওন জানে, মৌনি কোনোদিন আসবে না। প্রবল আত্মসম্মান সচেতন মৌনি মরে গেলেও কারো জীবনে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে আর্বিভূত হবে না। শাওন প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলল,
‘ আম্মুর সঙ্গে আমার একটা ঝামেলা হয়েছে সেদিন। জানোই তো আজকাল কেমন মেজাজ খারাপ হয়ে থাকে আমার? মেজাজ হারিয়ে আম্মুর সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি। এখন তোমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে মা যদি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে? অযথা কষ্ট পাবে তুমি। তাছাড়া, সবার ধারণা আমি তোমার কারণেই পালিয়ে এসেছি। স্বাভাবিকভাবেই সবাই একটু ক্ষেপে আছে আমার প্রেম এবং প্রেমিকার ওপর। তার চাইতে পরিস্থিতিটা একটু স্বাভাবিক হোক। তারপর আমি নিজে তোমাকে নিয়ে যাব। প্রমিজ।’
শাওন মেজাজ খারাপ করে মায়ের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করেছে শুনে কোথাও একটা আনন্দিত বোধ করলো সৌমি। সম্পর্কের শুরু থেকেই সে জানে মায়ের প্রতি কী রকম দুর্বল শাওন। সেই মায়ের সঙ্গেই যদি সে মেজাজ হারিয়ে খারাপ ব্যবহার করে ফেলে তারমানে এটা তার ভালোবাসারই প্রদর্শন। কিছু মানুষ তো হয় এমন বাইরে ঠান্ডা অথচ কাছের মানুষের সঙ্গেই প্রকাশ করে যাবতীয় রাগ, ক্ষোভ। সৌমি এবার দ্বিগুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল,
‘ কিচ্ছু হবে না। আন্টি আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেই পারবেন না দেখো। আর করলেও আমি কিছু মনে করবো না। প্লিজ যাই? প্লিজ প্লিজ প্লিজ?’
শাওন আর তর্ক করার ধৈর্য পেলো না। হার মেনে নিয়ে বলল,
‘ ঠিক আছে, চলো।’
সৌমি খুশি হয়ে বলল,
‘ আন্টির জন্য কিছু শপিং করে নিয়ে যাই চলো।’
শাওন সৌমিকে নিয়ে গাজীপুরের এক রিসোর্টে এসেছে৷ ভালো মানের রিসোর্ট, একরাত আর একদিনের ভাড়া, খাওয়া-দাওয়ায় বেশ ভালো খরচা হয়ে গিয়েছে। আর কোনো খরচা বাড়াতে চাইল না সে। বলল,
‘ তার কোনো দরকার নেই।’
‘ দরকার আছে। আমি এমনিতেও চাইছিলাম আন্টিকে একটা উপহার দিতে। তুমি মানা করো না তো। আমার কাছে টাকা আছে।’
‘ টাকা থাকলেই খরচ করতে হবে? তুমি কি চাকরি করো? এসব জমানো টাকা অযথা খরচ না করে নিজের জন্য রাখো।’
সৌমি বলল,
‘ এতো জ্ঞানের কথা বলো না তো, শাওন।’
সৌমির মুখে বাক্যটা শুনে হঠাৎই চমকে উঠল শাওন। মৌনি! মৌনি ঠিক এভাবেই বলতো একসময়। পুরোনো কথা মনে পড়ে শাওন নিজের মনেই হেসে ফেলে বলল,
‘ ঠিক আছে, ম্যাডাম। আপনার যা ইচ্ছে হয় করুন।’
এতোদিন পর শাওনকে এতো ভালো মেজাজে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে তৈরি হতে গেল সৌমি। কাল রাতের ব্যাপারটা নিয়ে যে মন খারাপটা গ্রাস করে ছিলো দুপুর পর্যন্ত তা অচিরেই কেটে গেল। শাওনের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলেই জানে সৌমির টানেই ট্রেনিং থেকে পালিয়েছে সে। শাওনের পরিচিত মহলে নিজের একটা শক্ত অবস্থান টের পেয়ে মনে মনে খুশি হলো সৌমি। রাতের দুঃখ ভুলে গেল।
তার একটু আত্মত্যাগ যদি শাওনকে একটু সুখী করতে পারে তাহলে তাতে ক্ষতি কী?
সৌমিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের সামনে দাঁড়াতে ভারি লজ্জা লাগছিল শাওনের। সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে মা তার সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ করেছেন। এখন আচমকা সৌমিকে নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে কী বলবে ভেবে পেল না। সৌমি তার মুশকিল লাঘব করে দিয়ে ভেতরে ঢুকেই মাকে জড়িয়ে ধরলো। শাওনের মা দরজা খুলে মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মনে তার গভীর আঘাত তারপরও সৌমির এই আন্তরিক স্পর্শ তাকে শক্ত থাকতে দিলো না। হাজার হলেও ছেলের পছন্দের মানুষ। যদি তার রূঢ় ব্যবহারে সরে যায়? ছেলেটা তো তাহলে উন্মাদ হয়ে যাবে। সৌমি তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেই মধুর গলায় বলল,
‘ আন্টি আপনি কেমন আছেন?’
শাওনের মা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে সৌমির পিঠে মৃদু হাত বুলিয়ে বললেন,
‘ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো, মা?’
সৌমি চেহারায় কৃত্রিম মন খারাপ নিয়ে বলল,
‘ শাওন বলছিল, আপনি আমাদের দু'জনের উপরই খুব রেগে আছেন? কাল থেকে কেবল বলছিল, মা আমার প্রতি খুব রেগে আছে। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না। আমি কী করে মায়ের সামনে দাঁড়াব বুঝতে পারছি না। আন্টি, আপনি কি সত্যিই আমাদের উপর এতো রেগে আছেন? আপনি রেগে থাকলে আমরা কোথায় যাই বলুন তো? মায়েদের বুঝি সন্তানদের প্রতি এতো রাগ করতে আছে?’
শাওনের মা কী বলবেন বুঝে পেলেন না। সৌমি শাওনের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ তুমি আন্টিকে সরি বলো এক্ষুনি। কাল থেকে অস্থির হয়ে আছো অথচ ছোট্ট একটা সরি বলতে পারছো না?’
শাওন মৃদু গলায় বলল,
‘ সরি মা। সেদিন আমার মাথা ঠিক ছিল না।’
শাওনের মা কিছু বললেন না। সৌমির দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘ তুমি আসবে জানলে তো ভালো করে ইফতারের আয়োজন করতাম। মাত্র দু'জন মানুষ বলে তেমন কিছুই রান্না করিনি। বলো মা, ইফতারে কী খাবে?’
সৌমি স্বতঃস্ফূর্ত গলায় বলল,
‘ প্রতিদিন তো আপনিই ইফতার রেডি করেন। আজ আমি করবো, আপনি রেস্ট নিবেন। তার আগে এই শাড়িটা দেখুন তো? আপনার জন্য কিনেছি। কেমন হয়েছে?’
বলেই একটা ব্যাগ থেকে কচুপাতা রঙের চমৎকার এক শাড়ি বের করলো সৌমি। সৌমি অসম্ভব রূপবতী মেয়ে। অতি রূপবতী মেয়েদের ব্যবহার অধিকাংশ সময়ই কর্কশ হয়। সৌমির ব্যবহার তার রূপের চাইতেও বেশি মিষ্টি। শাওনের মায়ের মনটা ভরে গেল তার হৃদ্যতায়। শাওন তাদের দু'জনকে একলা ছেড়ে দিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতেই পাশের রুম থেকে বেরিয়ে এলো কাব্য। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
‘ এই শাওন ভাই! মৌপু ছবি পোস্ট করেছে…’
বলতে বলতেই সৌমিকে দেখে থেমে গেল কাব্য। থতমত খেয়ে বলল,
‘ ভাবি আপনি? কখন এলেন? কেমন আছেন?’
শাওনের মায়ের সামনে ভাবি সম্বোধনে লজ্জায় লাল হয়ে গেল সৌমি। বলল,
‘ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো কাব্য?’
কাব্য বোকার মতো হেসে মাথা নাড়ল। শাওন তখনও তার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে। এখনই ঘটে গিয়েছিল একটা ভজঘট। সৌমি শাওনের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল,
‘ মৌপু কে?’
সৌমি মৌনির নামটা অসংখ্যবার শুনলেও মৌনি থেকেই যে মৌ হয় সেই ব্যাপারটা ধরতে পারেনি বুঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল শাওন। দুই ভাই নীরবে একবার দৃষ্টিবিনিময় করে ছোট্ট করে বলল,
‘ আমার খালাতো বোন।’
তারপর কাব্যকে আরেকবার চোখ রাঙিয়ে ফ্রেশ হবার বাহানায় নিজের ঘরের দিকে চলে গেল শাওন। কাব্যও এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে দ্রুত জায়গাটা থেকে সটকে পড়ল। শাওন ঘরে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ফোনটা হাতে নিতেই দেখল কাব্য হোয়াটসঅ্যাপে মৌনির ছবি পাঠিয়ে রেখেছে। ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনের অনেকেই মৌনির প্রতি তার দুর্বলতার কথা আন্দাজ করলেও বিস্তারিত সকল কথাই জানে কাব্য। মৌনি যখন তাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করেছিল। দর্শন দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন থেকে মৌনি সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ছবি পোস্ট করলেই সেটা সেভ করে শাওনের কাছে পাঠানো ছিলো তার একান্ত কর্তব্য। সেই কর্তব্যের প্রতি কাব্য যে এখনো খুব নিষ্ঠাবান তার প্রমাণ পাওয়া গেল। শাওন মৌনির ছবিটা মনোযোগ দিয়ে দেখল। বিস্তৃত চা বাগানের বুক চিড়ে বেরিয়ে যাওয়া এক রাস্তায়, ছাদ খোলা জিপে বসে প্রাণভরে হাসছে মৌনি। সেই হাসির সুরেই যেন নাচছে তার রেশমের মতো চুল। ফোন হাতে ধরা অবস্থাতেই দরজায় উঁকি দিলো সৌমি। তারপর লাজুক মুখে এসে দাঁড়াল দরজার সামনে। শাওন ফোন থেকে মুখ তুলে সৌমির দিকে তাকাল। এই অল্প সময়ের মধ্যেই সৌমি শাড়ি পরে ফেলেছে। মায়ের জন্য আনা শাড়িটা তার গায়ে এতো চমৎকার মানিয়েছে! সঙ্গে স্বর্ণের চুড়ি, কানের দুল, নাকফুল। সবই শাওনের মায়ের। শাওন ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে হাসিমুখে সৌমির দিকে তাকিয়ে রইল। হাতের ইশারায় কাছে ডেকে বলল,
‘ কাছে আসেন। শাড়িতে তো আপনাকে খুবই সুন্দর লাগছে।’
সৌমির মোমের মতোন গালে লজ্জায় জাফরান রঙ ধরলো। একটু এগিয়ে এসে মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে রইল। সৌমির এতো লজ্জার বাহার দেখে হেসে নিজেই এগিয়ে এলো শাওন। চিবুক ধরে মুখটা একটু উঁচু করে বলল,
‘ ইশ! হঠাৎ এতো লজ্জা পাচ্ছেন যে? রেগে গেলে তো এখনই গালাগাল করে বাপের নাম ভুলিয়ে দেবে।’
সৌমি হেসে ফেলে বলল,
‘ তুমি গালাগাল করো না বুঝি?’
শাওন হাসল,
‘ তা তো করিই। আমি তো খুব পাজি।’
সৌমি বলল,
‘ আমি পাজি শাওনের বউ সেজেছি। আন্টি সাজিয়ে দিলো। বলো, আমাকে তোমার বউয়ের মতো লাগছে?’
শাওন তার মোমের মতো মুখটা আঁজলায় ভরে ললাট চুম্বন করে বলল,
‘ তুমি তো আমার বউই।’
সৌমি লজ্জায় মুখ নিচু করে বলল,
‘ আজ আমি রান্না করবো। কী খাবে বলো ইফতারে?’
শাওন একটু দূরে সরে গিয়ে বলল,
‘ আপনি যা রাঁধবেন তাই৷’
সৌমি মুখ তুলে তাকিয়ে বলল,
‘ তুমি কী খেতে পছন্দ করো সেটা বলো।’
শাওন সৌমির কোমর ধরে কাছে টেনে নিয়ে নিচু গলায় বলল,
‘ তোমাকে।’
শাওনের মা শাওনকে ডাকতে এসে ছেলে আর তার বান্ধবীকে এই অবস্থায় দেখে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। নীরবে বেরিয়ে গিয়ে এবার বাইরে থেকেই ডাকলেন,
‘ শাওন?’
শাওন চটজলদি সরে দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় বলল,
‘ হ্যাঁ, মা? ভেতরে আসো।’
শাওনের মা তড়িঘড়ি করে ভেতরে এসে ছেলের হাতে একটা লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
‘ মোড়ের দোকান থেকে এগুলো এনে দে তো।’
শাওন লিস্টটা একবার দেখে সৌমিকে বলল,
‘ তুমি আম্মুর সঙ্গে গল্প করো। আমি আসছি।’
সৌমি ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাতেই ওয়ালেট নিয়ে বেরিয়ে গেল শাওন। শাওনের মা রান্না শুরুর আগে সৌমিকে এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে বলে নিজের কাজে গেলেন। সবাই বেরিয়ে যেতেই ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল সৌমি। দেয়ালে শাওনের অনেকগুলো ছবি টাঙানো। ছবিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সে এসে দাঁড়াল টেবিলের কাছে। টেবিলের জিনিসগুলো নাড়াচাড়া করতেই একটা আলগা কাগজ এলো হাতে। কাগজটা খাতার ভাঁজে গুছিয়ে রাখতে নিতেই চোখ পড়ল কাগজের লেখায়। কেউ খুব সময় নিয়ে পুরো পাতাজুড়ে গুছিয়ে গুছিয়ে লিখেছে কেবল একটাই শব্দ, মৌনি। মৌনি। মৌনি।
—————
তখন গোধূলি। ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষা শেষ করে সৌধকে নিয়ে চকবাজারে টো টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল নাহিদ। অফিসে আজ তেমন কাজ নেই। ইফতারের পর একবার ঘুরে এলেই চলবে। ঘুরতে ঘুরতেই দেখা হয়ে গেল জলিল ভাইয়ের সঙ্গে। নাহিদ তাকে দেখেই সালাম দিয়ে বলল,
‘ ভাই, কেমন আছেন?’
জলিল ভাইয়ের সঙ্গে আরো কয়েকজন চ্যাংড়া ছেলেপেলে আছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে ইতোমধ্যেই বেশ খাতির জমে গিয়েছে নাহিদের। জলিল ভাই নাহিদকে দেখে হাসিমুখে বললেন,
‘ আল্লাহর অশেষ রহমতে ভালো আছি। থাকিস কই তুই? তোকে আজকাল খুব একটা চোখে পড়ে না এদিকে।’
নাহিদ নিরানন্দ কণ্ঠে বলল,
‘ আসিনি এদিকে। ভার্সিটিতে পরীক্ষা চলে। কিছুদিন একটু পড়াশোনার চেষ্টা করলাম ভাই।’
জলিল ভাই নাহিদের কাঁধে হাত রেখে তাকে নিয়েই সামনে এগোতে এগোতে বললেন,
‘ ভালো ছেলে হওয়ার চেষ্টা করছিস নাকি? হ। তুই আসলে ভালো ছেলেই। তোকে পড়াশোনা আর চাকরি বাকরিতেই ভালো মানায়। এটা কে? তোর বন্ধু?’
নাহিদ মাথা নেড়ে বলল,
‘ জি ভাই। ওর নাম সৌধ।’
‘ তোর মতো ভালো ছেলে?’
নাহিদ হেসে বলল,
‘ আমার চাইতেও ভালো ছেলে।’
জলিল ভাই হাসলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ভয়ংকর নির্দয় মানুষ। মায়া দয়া কোনো কিছুই তিনি পারতপক্ষে অনুভব করেন না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এক বছর পড়েছেন। তার মধ্যেই সূক্ষ্ম একটা কারণে একটি মেয়েকে খুন করেছেন। সাধারণ খুন নয় বিভৎস খুন। প্রথমে ধর্ষণ তারপর এসিডে গলিয়ে হত্যা। মরার সময় মেয়েটির খুবই কষ্ট হয়েছে তাতে তার হৃদয়ে কোনো ব্যথা অনুভব হয়নি। মেয়েটিকে না মারলেও চলতো। তারপরও মারলো। মারতে পেরে অদ্ভুত এক আনন্দ হয়েছে। মানুষ খুনের যে আনন্দ সে আনন্দ সচরাচর পাওয়া যায় না। এমন নির্দয়, পশু শ্রেণির হৃদয় নিয়েও নাহিদ ছেলেটির প্রতি তিনি আশ্চর্য মায়া অনুভব করেন। নাহিদ পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করে বলল,
‘ ভাই, আপনার জন্য ছোট্ট একটা উপহার।’
‘ আমার জন্য উপহার?’
অবাক হয়ে তাকালেন জলিল ভাই। প্যাকেট খুলে দেখলেন একটা আতরের শিশি। নাহিদ নির্মল হেসে বলল,
‘ আমি খেয়াল করেছি, আপনি একেক দিন একেক আতর মাখেন। সব আতরই ভালো ব্র্যান্ডের। তাই মনে হলো, আপনার সম্ভবত আতরের প্রতি দুর্বলতা আছে।’
জলিল ভাই নাহিদের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায় স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এতো বছরে তার আশেপাশে থেকেও যা কেউ ধরতে পারলো না সেই ব্যাপারটা দুই একদিনের সাক্ষাতেই আবিষ্কার করে ফেলল ছেলেটা! তিনি খুব একটা আবেগাপ্লুত হোন না বিধায় তার এই আবেগ প্রকাশে কী রকম আচরণ করা উচিত বুঝে উঠতে পারলেন না। নাহিদের কাঁধ চাপড়ে বললেন,
‘ আজ আরমান ভাইয়ের সঙ্গে ইফতার পার্টি আছে। তুই আর তোর বন্ধু আজ আমাদের সঙ্গে ইফতার কর।’
নাহিদ পিঠের কাছে দু’হাত বেধে বিনয়ের সঙ্গে মাথা নাড়ল। তারপর সন্তপর্ণে একবার তাকাল সৌধর চোখে। সৌধও তখন অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছে। আরমান ভাই পুরান ঢাকার খ্যাতিমান সন্ত্রাসী। চাঁদাবাজি, গুম, খুন সমস্ত কিছুর একচ্ছত্র কর্ণধার সে। সৌধ ভাবতেই পারছে না, কী অবলীলায় তারা একেকটা ভয়ংকর গ্যাঙের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে!
আরমান আর জলিল ভাইয়ের ইফতার পার্টিতে খাবার-দাবারের এলাহি আয়োজন। পুরান ঢাকার সমস্ত মুখরোচক খাবার এখানে উপস্থিত। আরেকটি জিনিস উপস্থিত তা হলো শরাব। সৌধ নাহিদ জীবনে প্রথমবার ইফতারের দাওয়াতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সুরা বিতরণ করতে দেখল। এই শরাব খাওয়া হবে ইফতারের পর। তার সঙ্গে আছে নাচে-গানে মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা। দুই বন্ধু একে অপরের দিকে তাকাল। ইবলিশের চাইতেও বড় শয়তান যে পৃথিবীতেই আছে তা যেন চাক্ষুষ দেখা হয়ে গেল। সৌধ আর নাহিদকে ইফতারের জন্য ডেকে নেওয়া হলো আরমান আর জলিল ভাইয়ের সঙ্গে বিশেষ কামরায়। এখানে হাতে গুণা কয়েকজন মানুষ বসে আছে। সকলেই নিশ্চয় উচ্চমার্গীয় সন্ত্রাসী। সৌধ আর নাহিদ মদ খায় না। তারা তাদের সুরার গ্লাসটা সরিয়ে রাখতেই ঘরের সকলেই নিঃশব্দে তাদের দিকে তাকাল। জলিল ভাই হাঃ হাঃ করে হেসে উঠে পরিবেশটাকে সহজ করে বললেন,
‘ ওরা ভদ্র ছেলে। এসবে অভ্যস্ত না। ওরা আমার গেস্ট।’
কেউ কিছু বলল না। আজান পড়ার পর সকলেই নীরবে ইফতার শুরু করল। ইফতারের শেষের দিকে অদ্ভুত দর্শন একটা জগ নিয়ে ঘরের পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকল এক তরুণী। নাহিদ খেতে খেতে আনমনে একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ফের তাকাল। তারপর অপলক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটির মুখের দিকে। তরুণী ঐশ্বরিয়া রায়ের রিপ্লেকা যেন কেউ ভুল করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গিয়েছে এখানে। ওমনই মুখ, পদ্মলোচন চোখ, গোলাপের পাঁপড়ির মতোন ঠোঁট। দীর্ঘ দেহে নব যৌবনের ভার। কোথাও বাড়তি কোনো সাজসজ্জা নেই। একেবারে সাদামাটা সাধারণ এক শাড়ি খুব সাধারণভাবে পরা। নাহিদের যে সেজেগুজে থাকা মেয়ে খুব একটা পছন্দ না তা এই মেয়েকে দেখে নতুন করে অনুভব করলো। নাহিদকে ওমন অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখে অদ্ভুত এক উপায়ে অল্প একটু হাসল মেয়েটি। সঙ্গে সঙ্গেই নাহিদের হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। নাহিদ নারী দেখেছে কিন্তু সৌন্দর্য আর যৌবন একসঙ্গে বিদ্রোহ করা এমন অপ্রতিরোধ্য রূপ আগে কখনো দেখেনি। এই নারীর পায়ের কাছে পৃথিবীর সমস্ত সুখ তুচ্ছ। সৌধও তার রূপে মুগ্ধ হয়েছিল। মুগ্ধ হওয়ারই বয়স তাদের। বিমুগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে নাহিদের চোখে এমন ধ্বংসাত্মক কামনা খেয়াল করে তার সমস্ত মুগ্ধতা কেটে গেল। বেপরোয়া, অস্থির নাহিদ শেষমেশ এই বারবনিতার প্রেমে পড়ে যাবে না তো? নাহিদকে ওমন স্তব্ধ হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হাসলেন জলিল ভাই। সেই বিকেল থেকে নাহিদকে কিছু একটা উপহার দেওয়ার অভিলাষ হচ্ছিল তার। এতোক্ষণে মনের মতোন একটি বস্তু পেয়ে খুশি হয়ে গেলেন তিনি। নাহিদের পিঠ চাপড়ে বললেন,
‘ কী রে? পছন্দ হয়?’
নাহিদ বহু কষ্টে মেয়েটির দিক থেকে চোখ সরিয়ে একবার জলিল ভাইয়ের দিকে তাকাল। তারপর আবার মুখ ঘুরিয়ে তাকাল মেয়েটির দিকে। মেয়েটিও বারবার আড়চোখে নাহিদকে দেখছে। নাহিদ চোখে পড়ার মতোন সুদর্শন। নিজের শরীরের উপর ওমন সুদর্শন পুরুষের বেহায়া চাহনি সম্ভবত খুব তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিলো সে। জলিল ভাই বললেন,
‘ ওর নাম রাণী। আমার খাস বাদী। আমি ছাড়া আর কারো সেবা করার অনুমতি নাই ওর। মাঝে মাঝে আরমান ভাইরে আপ্যায়ন করে। কোনো যুবক অতিথি পাওয়ার শখ বোধহয় ওরও কম না। আজ তোর জন্য ছেড়ে দিলাম। শরাপ না ছুঁইলি, নারী ছুঁয়ে দেখ। শরাপের চাইতেও বড় নেশা।’
তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘ এই রাণী? এই ছেলেটিকে সঙ্গে করে নিয়ে যা। আপ্যায়নের যেন কোনো কমতি না হয়। যা।’
নাহিদ আগের মতোই চুপ করে বসে রইল। সৌধ অস্থির হয়ে নাহিদের কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল,
‘ খবরদার নাহিদ! এই নষ্টা মেয়ে মানুষের সঙ্গে যাস নে। রোজার দিন এই কাজ করবি তুই?’
নাহিদ এতোক্ষণে যেন কথা ফিরে পেলো। বলল,
‘ এখন তো রোজা নেই। ইফতার করে ফেলেছি।’
কথাটা শুনেই মেজাজ গরম হয়ে গেল সৌধর। ওইদিকে ওই পতিতা কেমন নরম নরম চোখে তাকাচ্ছে। শালী! সৌধর ইচ্ছে হলো বারবণিতাটার চোখ গেলে দিতে। এই চোখে চোখে কথা বলেই তার বন্ধুকে ফাঁসিয়েছে। সৌধ নিশ্চিত একবার এই মেয়ের কাছে গেলে আর এই অভ্যাস ছাড়াতে পারবে না নাহিদ। এরা একেকটা মায়াবিনী। রাণী নাহিদের কাছে এসে কোমল গলায় বলল,
‘ আসুন।’
নাহিদ কলের পুতুলের মতো উঠে দাঁড়াল। সৌধ তার হাত টেনে ফের বসিয়ে দিয়ে বলল,
‘ আজকের রোজা শেষ হলেও রোজার মাস তো শেষ হয় নাই দোস্ত। তুই কী করতে যাচ্ছিস একবার ভাব। ভাবিকে কী করে মুখ দেখাবি বল তো?’
নাহিদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ কোন ভাবি?’
‘ সেদিন অতো টাকা দিয়ে শাড়ি কিনলি যার জন্য সেই ভাবি।’
নাহিদ এক মুহূর্তের জন্য থমকাল। ভ্রুর ভাঁজ সোজা হয়ে একটু ভাবুক হয়ে গেল তার মুখ। পরমুহূর্তেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ শি উইল নেভার লাভ মি।’
সৌধ প্রত্যুত্তরে কিছু বলার আগেই মেয়েটি ফের নরম গলায় ডাকল,
‘ আমার সঙ্গে আসুন।’
নাহিদ চোখ তুলে মেয়েটির দিকে তাকাল। সৌধর কথায় সত্যি সত্যিই এক মুহূর্তের জন্য নির্জীব হয়ে পড়েছিল সে। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে, তার লাজুক নিরাবরন মুখ দেখে ফের শরীরে অদ্ভুত এক তাড়না বোধ করলো। নীরবে সে হাঁটলো মেয়েটার পিছু পিছু। সৌধ নিরুপায় হয়ে বসে থেকে বন্ধুকে পতনমুখে ধাবিত হতে দেখল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………