খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ০৭ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          চিরকুটটা হাতে নিয়ে ঠিক কতসময় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমার স্মরণ নেই। তবে ওই বাজে হাতের লেখার চিরকুটটা আমার পাওয়া প্রথম চিরকুট। আমি এখনো সেই চিরকুট খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছি। সেই শাড়িটা এখন পুরানো হয়ে গেছে রঙ জ্বলে গেছে পরতে পরতে। তবুও আমার আলমারীতে এখনো ঝুলছে। আমার আলমারীর সব শাড়ি সাহেবের দেওয়া। কারণ আমার নাকি পছন্দ ভালো না। তিনি আমাকে সবসময় কটাক্ষ করে বলেন, 
"পছন্দ তো শুধু আমি ই ভালো! বাকি সব ছ্যাদরভ্যাদর মার্কা!"

এজন্য আমার জামা থেকে জুতো এই বুড়ো লোকটাই কিনে দেয়। তার পছন্দের শাড়ি-ই আমি এখনো পরি। তবে এই শাড়িটা বিশেষ। সাহেবের দেওয়া প্রথম শাড়ি। শাড়িটা পরেছিলাম পরের দিন। লাল জমিনে লাল সুতোর কারুকাজ। শাড়ির উজ্জ্বল রঙ্গে আমাকে আরোও সুন্দর লাগছে। আমি আয়নায় নিজেকে দেখলাম। আমাদের বিয়ের আট মাস চলে তখন। এই লোকটাকে প্রথমদিন কি ভয়টাই না পেয়েছিলাম। ভয়টা যে একেবারে কেটে গেছে তা বলবো না। তবে সেই ভয়ের সাথে আরেকটা অনুভূতি একটু একটু আমার হৃদয়ে জড়ো হয়েছে। অনুভূতিটা শুধু শারীরিক নয়। এক বিচিত্র অনুভূতি। সাহেবের বকাঝকা আমার ভালো লাগে, তার কাছে আমার আবদার করতে দ্বিধা হয় না। ভরসার জায়গা মনে হয় এই মানুষটাকেই। মানুষটার সেই রাগী শ্যামমুখশ্রী যখন ঘুমে শান্ত হয়ে থাকে, আমি চোখ মুদে দেখি। তাকে দেখার সেই তৃষ্ণা আমার মিটে না। আমার মনে হয় তাকে দেখতে কখনো ক্লান্তি আসবে না। সাহেব সজাগ থাকলে সে আমাকে হাপুস নয়নে চাইতে দেয় না। অথচ এই লোকটার জল্পনা কল্পনাতেই আমার দিন কাটে। ঠিক কবে থেকে এই বদরাগী, গম্ভীর, কৃপাধারী হুতুম আমার অস্তিত্বে মিশেছেন আমি জানি না। তবে আমার জীবনের যে সে একটি বিশেষ অংশ না বলতে আমার দ্বিধা নেই। সারাদিনের ক্লান্তির পর তিনি যখন বাড়ি ফিরেন, মনে হয় তাকে বসিয়ে তার ঘামটুকু আঁচলে মুছে বলি,
 "শরবত বানিয়ে দেই?"

কিন্তু আহ্লাদের সুযোগ তো দেয় না মানুষটি। তার আহ্লাদ নকটামি লাগে। আচ্ছা! এসবকেই বোধ উপন্যাসিকরা ভালোবাসা বলেছেন। যদি তাই হয় আমি কৃপাধারী হুতুমকে অনেক বেশি ভালোবাসি। তিনি কি আমাকে ভালোবাসেন? কথাটা ভাবতেই আমার মনটা বিষন্ন হয়েছিলো। আয়নায় দেখলাম কাজলকালো চোখটা ঝাপসা। আমি দুহাতে ওই লাল চুড়িগুলো পরলাম। মালাটা তার জন্য রেখেদিলাম। আমার যে খুব শখ তার হাতে এই মালাটা পরার। সাজলাম মনের মতো করে। যখন লাল আঁচলটা মাথায় টানলাম মনে হচ্ছিলো আমি যেন নতুন বউ। এখন অপেক্ষা সাহেবের। 

সাহেব ফিরলেন রাতে। ক্লান্ত শরীরে ফিরেই হনহন করে ঘরে এলেন। ফ্যানের গতি বাড়িয়ে বসলেন বিছানাতে। টাইটা আলগা করেই হাক দিলেন,
 "আমার গোসলের পানি!"

আমি কোমড়ে আঁচল গুজে দরজার কাছটায় এসে দাঁড়িয়ে বললাম,
"বাথরুমেই দেওয়া।"

তিনি এবার চোখ তুলে আমাকে পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখলেন। তার কপালের বক্ররেখাগুলো মিলিয়ে গেলো। কেমন গভীর নয়নে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তার গাঢ় নয়নে আমার দেহ শিহরিত হচ্ছিলো। এতোটা তৃষিত নয়নে আগে কখনো দেখেছিলেন বলে মনে নেই। হুট করেই সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। গায়ের ঘামে ভেঁজা শার্টটা খুলে ঝুলানেন আলনায়। আমি পা টিপে টিপে দাঁড়ালাম তার পেছনে। তার পেছন থেকে উঁকি দিলাম। সাথে সাথে বড় কোমড় পর্যন্ত চুলগুলো বিছিয়ে গেলো গা ময়। তিনি একটু পেছনে ফিরে চমকালেন। গম্ভীর স্বরে ভ্রু নাঁচিয়ে শুধালেন,
 "কি?"
 "আমাকে কেমন লাগছে?"

আমার চোখ চকচক করছিলো। উনার দৃষ্টি বলে দিচ্ছিলো আমাকে খুব সুন্দর লাগছে। অথচ তার মুখে শোনার জন্য উতলা হয়ে ছিলাম। তিনি তীক্ষ্ণ চোখে চাইলেন। কপালে পড়লো গাঢ় ভাঁজ। বড্ড বেপরোয়া স্বরে বললেন, 
"পেয়ারার মত!"

বলেই গোসলে চলে গেলেন। আমার মনটা থিঁতিয়ে গেলো। তখন নতুন নতুন প্রেমে খাবি খাওয়া মনটা একেবারেই ভেঙ্গে গেলো। অভিমান হলো বড্ড। কি হত একটু প্রশংসা করলে। আমার এখন ভেবে এতো হাসি পায়! কি বাচ্চামোটাই না করতাম। মনের কষ্টে সে রাতে আমি খাব না বলে মনোস্থির করলাম। বিছানার এক পাশে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়লাম। সাহেব গোসল সেরে এসে আমাকে এমন শয্যাশায়ী দেখে কপাল কুঁচকালেন। গম্ভীর স্বরে শুধালেন,
"রাত দুপুরে এমন ভেটকি মাছের মতো শুয়ে পড়ার কি মানে? শরীর টরীর খারাপ হলে যেন আগে থেকে বলা হয়। আমি গভীর রাতে কোলে কোলে নিয়ে ঘুরতে পারবো না।"

আমি এবার তার দিকে চাইলাম। আমার চোখ লাল হয়ে আছে। টলমলে সেই চোখগুলোর দিকে একদফা চাইলেন সাহেব। তারপর একেবারে পাত্তা না দিয়ে গামছা ছড়িয়ে পাঞ্জাবী পরে নিলেন। তিনি এখন খাবেন। আমার তার এমন নির্লিপ্ততা সহ্য হলো না। উঠে বসে তার হাতটা সজোরে টেনে ধরলাম। তার হ্যাচকা টানে তিনি টাল সামলাতে না পেরে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লেন। তার চোখে মুখে দূর্বোধ্য বিস্ময়। কণ্ঠে তা একেবারেই প্রকাশ না করে কঠিন স্বরে শুধালেন,
 "কি?"

আমার চোখ টলমল করছে। তিনি আমার চোখের সেই অশ্রুর দিকে তাকিয়ে রইলেন বহুক্ষণ। আমিও জেদি। তার মাথায় তার প্রশংসা শোনার ভুত চেপেছে। একবুক সাহস নিয়ে হাতটা টেনে ধরে বসে রইলাম। তিনি আমাকে ধমকালেও আমি ছাড়বো না। তিনি আমার জেদ দেখলেন নিশ্চুপ নয়নে। তার ধাঁরালো দৃষ্টিতে আমার কোনো ভাবান্তর হলো না। অতঃপর সাহেব কঠিন স্বরে শুধালেন,
"কি হলো?"
"বলুন আমাকে কেমন লাগছে!"
"হ্যা?"
 "বললাম, কৃপা করে করে বলুন আমাকে কেমন লাগছে?"

সাহেবের মুখে তখন তীব্র বিরক্তি। চ সূচক শব্দ করে এক রাশ অসন্তোষ নিয়ে বললেন,
 "বলেছি না নকটামি ভালো লাগে না।"
"বললে কি হয়! আমি তো আপনার জন্যই সেজেছি। জানেন কতোটা আশা নিয়ে আমি সেজেছি? আচ্ছা, আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন না?"

আমার প্রশ্নে সাহেবের মুখখানা আরোও যেন গম্ভীর হয়ে গেলো। তিনি গম্ভীর ভঙ্গিতে শুধালেন,
 "ভালোবাসা কি?"
"মানে?"
 "মানে ভালোবাসার সংজ্ঞা কি? উদাহরণ সহ বলতে হবে?"

আমি উত্তর দিতে যেতেও আটকে গেলাম। এতোটা কষ্ট হলো যেন শরীরের প্রতিটা কোষ থেকে শুধু দুঃখ ঠিঁকরে উঠতে ঠোঁট আটকে নাকের পাঁটা ফুলিয়ে কান্না আটকাবার চেষ্টা করলাম। তার হাত ছেড়ে দিলাম। পিঠ ফিরে আবার শুয়ে পড়লাম। তিনি কঠিন স্বরে শুধালাম,
"আবার শোঁয়া হচ্ছে কেন?"

আমি উত্তর দিলাম না। আমার কান্না পাচ্ছে। ক্ষণে নাক টানছি। তিনি যে ভীষণ বিরক্ত হলেন তা বোঝা গেলো। দরাজ গলায় আবারোও বললেন,
"এখন কি অনশনে বসা হবে? দেবদাসী সাজা হবে? আমাকে এখন সেই গোসা ভাঙ্গাতে "ওলে আমার সোনা বাবুটা" বলতে হবে? যদি কেউ ভেবে থাকে আমি তার এইসব ছেলেমানুষী সহ্য করবো তাহলে ভুল!"
"এখন থেকে ভাববাচ্যে বলা কথার উত্তর আমি দিব না। কৃপা করে যদি আমার সাথে কথা বলতে হয় তবে আমার নাম ধরে ডেকে সরাসরি যেন কথা বলা হয়। ওমন দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বলা কথার উত্তর আমি দিব না। যার খেতে ইচ্ছে হচ্ছে সে খাক। আমাকে তোলার চেষ্টাও যেন না হয়!"

বলেই আমি গায়ে কাঁথা টেনে নিলাম। সাহেব কঠিন দৃষ্টির আঁচ তার দিকে না তাকিয়েও ঠিক পেলাম। তবুও আমি নড়লাম না। তিনি হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। আমার গোলাপের মালাটা ওভাবেই পড়ে থাকলো টেবিলে। আমি তাকিয়ে রইলাম মালাটির দিকে। কিশোরী মন তখন শুধু স্বপ্নই দেখে গেলো একদিন সাহেব আমাকে নিজ হাতে খোঁপায় গোলাপের মালাটা পরিয়ে দিবেন। 

—————

খাবার টেবিলে সাহেব কি বাহানা দিলেন সেই খবর আমার ছিলো না। শুধু ঘরে এসেই তিনি লাইট বন্ধ করে দিলেন। আমার চোখে ঘুম নেই অথচ আমি ঘুমের ভান করে পড়ে আছি। কালো আকাশে তখন রুপোর থালার মতো বড় একখানা চাঁদ। সেই আলো গলে পড়ছে জানালা দিয়ে। আমি টের পেলাম সাহেব আমার পাশে শুয়েছেন। আমি নড়লাম না। আমি জানি তিনি আমাকে কাছে টেনে নিবেন। কিন্তু আজ আমি তার ডাকে সাড়া দিব না। প্রচন্ড অভিমানে আমার মনের দোয়ারে তালা ঝুলিয়েছি। ভাদ্র মাসের শেষ। আকাশে তখন মেঘ নেই। রাতে গুমোট বাতাসে ঘরটাও কেমন গুমরে উঠেছে। সাহেবের দৃষ্টি আমার পিঠে। তিনি শান্ত স্বরে ডাকলেন,
 "পেয়ারা! পেয়ারা!"
"আমার নাম কানন!"

আমার উত্তর পেতেই একটা শক্ত হাত আমার কোমড় টেনে ধরলো। ঘাড়ে মুখখানা ডুবিয়ে গাঢ় স্বরে বললো,
 "কিন্তু তুমি আমার পেয়ারা।"

আমি রাগে চোখে তার দিকে চাইলাম। তিনি সেই চোখে আলতো করে চুমু আঁকলেন। আমি কঠিন গলায় বললাম,
 "যে আমাকে ভালোবাসে না, আমি তার আদর নিব না।"
"ভালোবাসা কি?"
"আবার প্রশ্নোত্তর! শুধু আবেগ এই বিছানাতেই আসে আপনার। একটু নরম গলায় দুটো প্রশংসা করা যায় না? ভালোবাসা মানে বউয়ের যত্ন নেওয়া, তাকে মিষ্টি করে দুটো কথা বলা!"
"কি কথা?"
 "এই যে কানন, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।"

তিনি আমার নাকের উপর জোরে একটা কামড় দিলেন। আমি আহ করে উঠতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, 
"সুন্দর না লাগলেও মিথ্যে বলতে হবে?"
"আবার ভাববাচ্যে কথা? আর সুন্দর না লাগলে আমার কাছে এসেছেন কেন? ছাড়ুন আমাকে ছাড়ুন।"
"যদি না ছাড়ি?"

আমার এতো রাগ হলো আমি ঠিক তার বুকের মাঝ বরাবর একটা কামড় বসালাম। তিনি নড়লেন না। একটু উহ পর্যন্ত করলেন না। আমার কোমড়টা টেনে আরোও কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
 "ভুল বলেছি, আমার পেয়ারাকে আজ শুকনো মরিচের মতো লাগছে। তাই তো এতো তেজ। রাগ মিটেছে?"
"না, আমি খুবই রেগে আছি।"

আমার ঠোঁটে গাঢ় একখানা চুমু এঁকে বললেন,
"তাহলে রাগটা শুষে নেই? কৃপা করে অনুমতিটুকু দেওয়া যাবে পেয়ারা?"

আমি তাকে নিজের থেকে সরাতে চাইলেও সরাতে পারলাম না। তিনি আমার মুখের প্রতিটি অংশে চুমু খেতে খেতে বললেন,
 "পেয়ারার রাগটাও পেয়ারা মাখার মতো। টক-মিষ্টি-ঝাল!"

—————

সাহেব আমাকে ভালোবাসেন কি না সেটা সেরাতে জানা হলো না। তবে তার আদরে আমার রাগটা টিকলো না। আমার জীবন আগের মতোই চলতে লাগলো। তিনি আমাকে চারুকলায় ভর্তি করালেন। আমার রেজাল্টে আমাদের বাসার স্যার আদনান ভাই খুব খুশি হলেন। মাহমুদকে দেখিয়ে বললেন,
 "শেখো, শেখো!"

মাহমুদ চুপ করে মাথা নত করে বসে থাকলো। মাহমুদের মধ্যে আমূল পরিবর্তন দেখা গেলো। সেটা হয় সাহেবের ভয়ে নয়তো আদনান ভাইয়ের ভয়ে। কারণ আদনান ভাইও খুব কড়া মানুষ। অনাথ মানুষটি জীবনের সাথে লড়তে লড়তে নিজেকে কঠিন করে ফেলেছে। বারবার একটুর জন্য তার চাকরিটা হয় না। ভাইভা বোর্ডে তার কাছে টাকা চাওয়া হয়। কিন্তু কোথা থেকে আনবেন এতো টাকা। তাই সরি বলেই বেরয়ে আসতে হয় তাকে। সেই কাঠিন্য তিনি আমাদের উপর দেখাতেন। শুধু একটা মানূষের সামনে তিনি হতেন নরম। সে মিষ্টি আপু। মিষ্টি আপুকে দেখলেই আদনান ভাইয়ের মুখটা কেমন উজ্জ্বল হয়ে যেত। শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকতেন। কখনো কথা বলতেন খুব একটা না। শুধু যতটা সময় মিষ্টি আপু থাকতেন তিনি গাঢ় চোখে চেয়ে থাকতেন। যেমনটা মাঝে মাঝে সাহেব আমার দিকে চাইতেন। মিষ্টি আপু যদি তাকে জিজ্ঞেস করতো,
 "আদনান ভাই, ভালো আছেন? আপনি তো শুকিয়ে যাচ্ছেন খাওয়া দাওয়া হচ্ছে না?"

তিনি খুব বিষন্ন ভঙ্গিতে হেসে বলতেন, 
"আমার যত্ন নেওয়ার মানুষের যে বড় অভাব!"

মিষ্টি আপু কিছুটা বিব্রত হতেন। মাঝে মাঝে বলতেন,
 "আমাদের বাসায় এসে খেতে পারেন না?"
"সেই সম্পর্ক আমাদের নেই যে! তুমি দাওয়াত দিলে আমি না করবো না। কিন্তু সবসময় তো আসা যায় না।"

মিষ্টি আপু কথা বাড়াতেন না। চায়ের কাপটা রেখে মিষ্টি আপু চলে যেতেন। আদনান ভাইয়া নিলীন চোখে তার যাওয়া দেখতেন। মিষ্টি আপুকে তিনি কি ভালোবাসতেন? এমন নীরব ভালোবাসাও হয় বুঝি? 

—————
 
একদিন ঘরের পুরোনো এলব্যাম গুছাতে যেয়ে আমি সাহেবের জন্মদিন জানতে পারলাম। আমার শ্বাশুড়ি মা ছবির পেছনে তারিখ এবং বয়স লিখে রাখতেন। সাহেবের একটি ন্যাংটু পুংটু ছবি পেতেই দেখলাম তার পেছনে লেখা "মুহাইমিন" "০৯/১০/১৯৬৬" "এক বছর ২ দিন" সেই থেকে বের করলাম উনার জন্মদিন অক্টোবরের সাত তারিখ। সেদিন ছিলো অক্টোবরের ছয়। মিষ্টি আপুকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন,
 "ভাইয়া তো জন্মদিন পালন করে না। এজন্য ভাইয়ার জন্মদিন যে কাল সেটাই ভুলে গিয়েছিলাম।"

অথচ মিষ্টি আপু বা মাহমুদের জন্মদিন পালনে কখনো কার্পন্য হয় নি। আমার বিয়ের পর ই মাহমুদের জন্মদিন পালিত হলো। আমার বড্ড খারাপ লাগলো। মানুষটি আমাকে ভালোবাসুক আর নাই বা বাসুক, আমি তো তাকে ভালোবাসি। তাই তার বিশেষ দিন আমি পালন করবো না! 

পরদিন সকালে আমি বিশেষ নাস্তা বানালাম যা তিনি ভালোবাসেন। টেবিলে গরু মাংস এবং পরোটা দেখে তার চোখ কপালে, অবাক গলায় শুধালেন,
 "আজ কি প্রেসিডেন্ট বুশ আসছে বাসায়? এতো রমরমা কেন?"
"তোমার জন্মদিন উপলক্ষে ভাবী রান্না করেছে।"

মিষ্টি আপুর কথায় সাহেব বিস্মিত চোখে আমার দিকে চাইলেন। কিছু বললেন না। চুপ করে খেলেন। অফিস যাওয়ার সময় শুধু বললেন,
 "ঝালটা এরপর থেকে জেলার জন্য না দিয়ে শুধু এই বাসার মানুষের জন্য দিলেই হবে।"

আমার ইচ্ছে করলো তার মাথাটা ফাঁটিয়ে দেই। খুঁত ধরা ছাড়া কি কিছুই পারে না লোকটা। কিন্তু নিজেকে বুঝালাম,
"আজ না, আজ না! সব কাল! সব কাল!"

—————

উপহার হিসেবে একটা ছবি দেবার পরিকল্পনা ছিলো আমার। পুরো একদিন লাগিয়ে সাহেবের ছবিটা আঁকা শেষ করে অফিস থেকে ফিরতেই আমি তার হাতে তুলে দিলাম। মিষ্টি করে বললাম,
"শুভ জন্মদিন"

টাই ঢিলে করতে করতে তিনি ছবিটাকে অনেকক্ষণ দেখলেন। অতঃপর বললেন,
"আমার চেহারা এতো বেঢপ জানা ছিলো না তো! অবশ্য পেয়ারার থেকে এর থেকে বেশি আশাও করা যায় না।"
"থাক, লাগবে না আপনার নেওয়া!"

আমি যেই কেঁড়ে নেবার জন্য হাত বাড়ালাম তিনি হাতটা উঁচু করে ধরলেন। আমার ছোট উচ্চতা তার হাত অবধি যেতেই পারলো না। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,
 "সেটা বললে তো হবে না। এই মুহাইমিন সরকারের কপালে যা একবার চলে আসে, তা হাজার চেষ্টা করলেও কেউ কাড়তে পারে না। তা ছবি হোক বা পেয়ারা! যা আমার তা আমারই।"

আমি হাল ছেড়ে দিলাম। এই লোকের সাথে ঝগড়া করা আর দেওয়া মাথা ঠুকানো একই। তবে মনে একটা শান্তি। আমি তার। শুধু তার-ই। 

—————

শ্বাশুড়ি মায়ের অসন্তোষের পরও আমার কলেজ যাওয়া যথাসময়েই হলো। তিনি বারে বারে বললেন,
"বউ কি চাকরি করবে নাকি? ওর এতো পরে কি হবে?"

সাহেব তখন নিরুত্তাপ উত্তর দিতেন,
 "ঘটে তো মালপাতি আছেই, তো জং ধরিয়ে কি লাভ! অন্তত আমার ছেলেমেয়েরা ভালো আঁকতে পারবে!"

কথাটা শুনে শ্বাশুড়ি মা আর কথা বাড়াতেন না। কিন্তু তার অসন্তোষ আমি ঠিক টের পেতাম। আমার কলেজটা ছিলো বাসা থেকে পনেরো মিনিট দূরে ছিলো। সকালে সাহেব দিয়ে যেতেন। আসার সময় রিক্সা করে আসতে হত। এটা ছিলো আমার রোজকার রুটিন। একদিন শীতের দুপুরে আমার রিক্সাওয়ালা মামাকে গেটে দেখতে পেলাম না। তখনকার সময়ে এতোটা মোবাইলের চল ছিলো না। আমি অনেক সময় কলেজের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। একা একা বাড়ি যাবো কি না সেটাও বুঝতে পারছিলাম না। কারণ সাহেবের কড়া নির্দেশ। সাহেবকেও জানানোর উপায় নেই। সময় পার হতে লাগলো। মাথার উপর থেকে সূর্য ঢলতে লাগলো। উপায় না পেয়ে আমি হাটা দিলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। দুপুরের সময় বলে রিক্সাও নেই। খা খা করছে রাস্তা। সবাই যেন একটু বিশ্রামের আসায় চোখ বুজেছে। লোকের সমাগম কম। আমি আমার চটের ব্যাগটা ঘাড়ে আস্তে আস্তে হাটতে লাগলাম। মোড় পার হয়ে চৌরাস্তায় উঠতেই আমার পা থেমে গেলো। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে এলো। আমার সামনে জড়ো হয়ে আছে কিছু মোটরসাইকেল। দুপুরের রোদেও তারা জড়ো হয়ে রাস্তার ধারে শকুনী চোখে চেয়ে আছে কোনো শিকারের জন্য। আমাকে দেখেই তাদের মধ্যে বিশ্রী হাসি ফুঁটে উঠলো। একজনকে খুব চিনি। ওয়ার্ড কমিশনারের চামচা বর্গীয়। নাম রবিভাই। ইনি হুমকি দিয়েছিলো আমাকে তুলে নিয়ে যাবেন।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp