পবনপত্র - পর্ব ০৭ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          লাইব্রেরির এক কোণে বসে আছে মৌমিতা। লোডশেডিংয়ের কারণে আজ কলেজেও বিদ্যুৎ নেই। মাথার উপরের ফ্যানটা স্থির হয়ে আছে। তবে আলোর অভাববোধ হচ্ছে না। পাশের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে টেবিলে। সেখানে বসে মৌমিতা মনোযোগ দিয়ে একটা বই পড়ছে। কলেজের এই একটা জায়গাই তার ভীষণ প্রিয়। ক্লাস চলাকালীন সময়ে সে কেবল টিফিন পিরিয়ডের ঘণ্টার জন্য অপেক্ষা করে, এই সময়েই সে পুরোনো লাইব্রেরিতে আসে।
মৌমিতার একটা অভ্যাস আছে। নিজের সব প্রিয় জিনিস আর প্রিয় জায়গাগুলোতে সে নাম লিখে রাখে। লাইব্রেরির এই টেবিলটা তুলনামূলক মসৃণ, তাই এখানে পুরো নামটা লেখা সম্ভব হয়নি। অনেক ঘষাঘষি করে শুধু ‘মৌ’ লেখা সম্ভব হয়েছে।

আজকে তামান্না আসেনি কলেজে। মেয়েটা প্রায় প্রায় অনুপস্থিত থাকে। সে না এলে মৌমিতা পুরো কলেজে উদ্দেশ্যহীনের মতো হাঁটাহাঁটি করে। তামান্নার উপস্থিতি তার ভালো লাগে না, আবার অনুপস্থিতিটাও অসহ্য লাগে। একটু বেশিই ফাঁকা ফাঁকা লাগে। হয়তো এটাও মৌমিতার বদ অভ্যেস। বিরক্তিকর মানুষগুলোকে সে অযথাই মনে জায়গা দেয়। কখনো কখনো তার মনে হয়, এই কারণে তার জীবনে একসময় বড় কোনো ঝামেলা হবে।

কয়েক মিটার দূরে রাখা ডাস্টবিনটার দিকে তাকায় মেয়েটা। সপ্তাহ খানেক আগে তার ডায়েরিটা ওখানেই ফেলা হয়েছিলো। পরে যখন সে বুঝতে পেরেছে, কতো বড় বোকামি ছিলো কাজটা, তখন এসে ডায়েরিটা অনেক খুঁজেছিলো। পায়নি। কোথায় যে হারিয়ে গেলো জিনিসটা। এই বিষয় নিয়ে তার দুশ্চিন্তা করা উচিত ছিলো। কিন্তু আজকাল সে একটু বেশিই উদাসীন হয়ে থাকে, কিছুই গায়ে লাগে না। ঘণ্টার বিদঘুটে শব্দটা কানে আসে, টিফিনের সময় শেষ।

মারুফ দুপুরে বিরতি নিয়েছেন। খাওয়া-দাওয়া সারতে বাড়িতে এসেছেন। নিজের জুতো খুলতে গিয়ে সামনে রাখা জীর্ণ জুতোজোড়ার দিকে তাকালেন তিনি, তার মনে পড়ে যায়, মৌমিতাকে নতুন জুতো কিনে দেয়া হয়নি। মাধ্যমিকের সময় কিনে দেয়া জুতোই সে কলেজের জন্যে ব্যবহার করছে। মারুফ সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, বারান্দার দরজার সামনে দাঁড়িয়েই ডাকতে লাগলেন, “মৌ মা?”

ভেতরের ঘর থেকে আওয়াজ আসে, “জ্বী আব্বা?”

“এদিকে আসো।”

নতুন ডায়েরিটা নিয়ে মৌমিতা এখনও কিছু বলেনি। তার আব্বা তাকে নিজে থেকে কিছু জিজ্ঞাসাও করেননি। তবে আদতেই মেয়েটার কাণ্ডজ্ঞান খুবই কম। অন্তত একটা ধন্যবাদ তো জানানো উচিত ছিলো।
মারুফ আবার জুতোর দিকে তাকালেন। মৌ এই জুতো পরে কলেজে যায়, আর বাবা হয়ে তিনি তা একদিনও খেয়াল করলেন না, ব্যাপারটা ভাবতেই অস্বস্তিবোধ হচ্ছে। তার বড় মেয়ে আবার নিজের বেশভূষা নিয়ে খুবই উদাসীন। অবশ্য শুধু বেশভূষা নয়, আশেপাশের কোনোকিছুতেই তার আগ্রহ নেই। পৃথিবী একদিকে, সে অন্যদিকে!
মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মৌমিতা চৌকাঠে এসে দাঁড়ায়, “কী হয়েছে আব্বা?”

“তোমার কি নতুন জুতো লাগবে?”

মৌমিতা ডানে বামে মাথা নাড়ে। মারুফ তার জুতোর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “জুতোর যে এই অবস্থা?”

জুতোজোড়ার দিকে চুপচাপ ঘুরে তাকালো সে, আসলেই সেগুলোর অবস্থা ভালো না। ছোটও হয়ে গেছে। পায়ে দিলে আঙুল ভাঁজ করে রাখতে হয়। মারুফ পকেট থেকে ওয়ালেট বের করলেন, তারপর ব্যস্তভাবে আদেশ করলেন, “তুমি যাও, রেডি হও। আজকে আমার হাতে একটু সময় আছে। ভালো দেখে দুটো নতুন জুতো—”

“না আব্বা, লাগবে না।”

তিনি মেয়ের দিকে তাকালেন, “লাগবে না মানে? এরকম জুতো পরে আবার কলেজে যাওয়া যায় নাকি? কতো পুরাতন হয়ে গেছে এগুলো।”

“আর কয়েকটা দিন পরেই তো কলেজ শেষ। এতোটুকু সময়ের জন্য আবার নতুন জুতা কিনবো?”

“নয়তো কি এই জুতো পায়ে দিয়েই কলেজে যাবে নাকি? মানুষ মনে করবে, এই মেয়ের বাবার কোনো টাকা-পয়সা নেই! এরকম জুতো পরিয়ে কলেজে পাঠায় মেয়েকে।”

মৌমিতা বেশ বিরক্ত হলো, “সবাই আপনার মতো এমন উদ্ভট চিন্তা ভাবনা করে না। আর যদি কেউ করেও, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”

“মানুষ যদি তোমার আব্বাকে ভিখারি ভাবে, তাতেও কিছু যায় আসে না?”

“আরে! মানুষ ভাবলেই কি আপনি ভিখারি হয়ে যাবেন? আর সামান্য দুইটা জুতার জন্য কেউ আপনাকে ভিখারি ভাবতে যাবে কেন? কোন কথা কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আপনি?”

মৌমিতার গলাটা এবার স্বাভাবিকের চেয়ে একটু উঁচু শোনায়। রাবেয়া তরকারির চামচ হাতে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন, “কী হলো?”

“আমার জুতা দেখে নাকি মানুষ আব্বাকে ভিখারি বলবে! তাই আব্বা মাত্র কয়েক দিনের জন্য আবার নতুন জুতা কিনতে চাচ্ছেন। আমার জুতা কেনাটা বড় কথা নয়, মানুষ কী ভাবলো– সেটাই বড় কথা।”

রাবেয়া ধমক দিলেন, “এসব কেমন কথা, মৌ? তোমার আব্বা কি লোক দেখানোর জন্য এতো কষ্ট করেন? তোমার এটাই মনে হয়? এই যে মানুষটা তোমাদের জন্য দিনরাত খেটে যাচ্ছেন তবু কোনো কৃতজ্ঞতা—”

মৌমিতা হতাশ ভঙ্গিতে বললো, “আপনারা তো আমার কথাই বোঝেন না।”

কথাটা বলার পর সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না সেখানে, ক্ষিপ্রগতিতে নিজের ঘরে চলে গেলো। মেয়ের এমন একগুঁয়ে আচরণ দেখে মারুফ একটু বিরক্ত হলেন, ব্যথিতও হলেন কিছুটা।

“দেখো, কী রকম আচরণ তোমার মেয়ের!” স্ত্রীকে খোঁটা দিয়ে তিনি আবার জুতোর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, “বাস্তব জ্ঞান বলতে কিচ্ছু নেই। পোশাকেও মানুষের ব্যক্তিত্ব থাকে। কিন্তু খালি পোশাক কেন? দুনিয়ার কোনোকিছু নিয়েই ভাবে না তোমার মেয়ে। সারাদিন কী যে ভাবে, কোন দুনিয়ায় যে থাকে। এভাবে থাকলে চলার পথে কতো হোঁচট খেতে হবে, ধারণা আছে? এসব নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। ঐ একটা ঘরের এক কোণে ঘোড়ার ডিমে বসে থাকে সারাদিন।”

রাবেয়া হাত নেড়ে স্বামীকে থামিয়ে দিলেন, “বাদ দেন তো। ওকে পরে বুঝাবো আমি।”

“হ্যাঁ, বোঝাও। এই জুতো পরে যেন মৌ কলেজে না যায়।”

কপাল কুঁচকালেন রাবেয়া, নরম স্বরে বললেন, “আপনার মেয়ে, আপনার মতোই। গতবার ঈদে একটা নতুন পাঞ্জাবি কিনতে বললাম, কিন্তু আপনি মৌয়ের জন্য গল্পের বই কিনে টাকাগুলো নষ্ট করলেন। ঐ এক পাঞ্জাবি আর কতো পরবেন? কতোদিন ধরে বলছি, এই পুরাতন ঘড়িটা বিক্রি করে নতুন একটা কেনেন। কিন্তু আপনি তো আপনার এই পাকিস্তান আমলের ঘড়ির মায়াই ছাড়তে পারেন না। মৌ আপনার স্বভাবটাই পেয়েছে। বোঝেন এখন, কেমন লাগে!”

স্বামী কিছু বলার আগেই তিনি রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন, তর্ক করতে গিয়ে তরকারিটাই পুড়ে গেলো বোধহয়! মারুফ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। বাম হাতখানি বুকের কাছে তুলে হাতঘড়ির দিকে তাকালেন। ঘড়ির কাচটা পরম মমতার শার্টে ঘষে পরিষ্কার করলেন তিনি, তারপর ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

—————

“জুন, ১৯৯০:
আমার আব্বার একটা পুরোনো ঘড়ি আছে। বছর সাতেক আগে কিনেছিলেন। সেটা সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে, আম্মা এই ঘড়িটা একেবারেই পছন্দ করেন না। কয়েকদিন আগে রিপন মামা তার জমানো টাকা দিয়ে আব্বাকে একটা নতুন হাতঘড়ি কিনে দিয়েছিলেন। আব্বা সেটা আলমারিতে তুলে রেখেছেন, একদিনও ব্যবহার করেননি। ঐ পুরোনো ঘড়ি ছাড়া তিনি আর কিছুই বোঝেন না। আম্মা এটা নিয়ে মন খারাপ করেছিলেন। তবু আব্বা কথা শুনলেন না। পুরোনো হাতঘড়িটা প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়। তখন আবার আব্বা ঠিকই টাকা খরচ করে সেটা ঠিক করিয়ে নেন।
মার্কেটে একটা নতুন ঘড়ি বেরিয়েছে দেখলাম সেদিন। ডায়ালটা বড়, চেইনটা একটু চওড়া। রূপালি রঙের। আম্মার ধারণা, আব্বার নাদুস-নুদুস হাতে ঘড়িটা খুব মানাবে। কিন্তু আব্বার কোনো আগ্রহ নেই। এটা নিয়ে আমার একটা ইচ্ছে আছে। আমি যখন চাকরি করব, আমার প্রথম বেতনটা দিয়ে আব্বাকে একটা নতুন ঘড়ি কিনে দিব। তখন নিশ্চয়ই আরও ভালো ভালো হাতঘড়ি পাওয়া যাবে বাজারে। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, আমার কেনা ঘড়িটা আব্বার পছন্দ হবে না।”

আমজাদ পাশ ফিরে শুতে গিয়ে দেখলো, বাদলের টেবিলে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি। তার বিপরীতে মুখ করে বাদল নিজ চৌকিতে শুয়ে শুয়ে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা পড়ছে। এতো রাতে না ঘুমিয়ে কী পড়ছে ছেলেটা? এমন পড়ুয়া তো সে কখনোই ছিলো না। আমজাদ ঢুলুঢুলু চোখে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো তাকে। তারপর গমগমে স্বরে বলে উঠলো, “বাদল? কী পড়িস এতো রাতে?”

ছেলেটা চমকে উঠলো। ডায়েরি বন্ধ করে বালিশের পাশে রাখলো, “কিছু না।”

“আলো নিভিয়ে দে। চোখে লাগছে।”

বাদল উঠে বসে, ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দেয়। অন্ধকারে তলিয়ে যায় ঘরটা। আমজাদ চিৎ হয়ে শোয়, “ডায়েরিটা কি মেয়ে মানুষের?“

কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না। তবে সে হাল ছাড়লো না, একটু উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলো, “কী লেখা আছে ওখানে? গল্প নাকি?”

কেউই কোনো কথা বললো না কিছুক্ষণ। এরপর বাদল জবাব দেয়, “না।”

“তাহলে কী? গান, কবিতা?”

বাদল মুখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। আমজাদ ভাইয়ের এমন জেরা করা– তার ভালো লাগছে না। সে চোখ বুজে বড় বড় শ্বাস নেয়, ঘুমানোর চেষ্টা করে। রাশেদের কণ্ঠ শোনা যায়, “অন্য কারও ডায়েরি এভাবে পড়ে ফেলা কি ঠিক হচ্ছে বাদল?”

এবার আর চুপ করে থাকতে পারলো না সে, রুক্ষ স্বরে ধমকালো, “তুই আবার কথা বলিস কেন? এখন চুপ করে থাকতে পারলি না? অসময়ে কথা বলে! ঘুমা!”

ঘরটা আবার শান্ত হলো।
অন্ধকার চোখে সয়ে এসেছে। জানালার ওপাড় থেকে খুব অল্প আলো এসে ঢুকেছে ঘরের ভেতর। চাঁদ উঠেছে নাকি? আমজাদের নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। রাশেদ জেগে আছে কিনা–বোঝার উপায় নেই। বাদল চোখ মেলে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো। ঘুম নেই ঐ চোখে। মাথায় অজস্র প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
মৌমিতা খন্দকার দেখতে কেমন? হাতের লেখা তো সুন্দর। একটা মানুষের চেহারা কি তার চিন্তা ভাবনা কিংবা হাতের লেখার মতোই হতে পারে? ডায়েরির ভেতর মেয়েটার একটা ছবি থাকলে ভালো হতো। কষ্ট করে কল্পনা করতে হতো না বাদলকে। অবশ্য সত্যিকারের মানুষটা তার কল্পনার মতো হবে কিনা, সেটাও সন্দেহের বিষয়।

বাদল কাত হয়ে মাথার নিচে হাত রাখে। খুব গরম পড়েছে। তার উপর মফস্বল নাটোরের লোডশেডিং। মরার উপর খাঁড়ার ঘা! এই বিষয়ে তার মনোযোগ বেশিক্ষণ থাকলো না। মনটা খুব দ্রুত আবার সেই অজানা অচেনা মেয়েটার দিকে ছুটতে লাগলো।
মৌমিতাকে খুঁজে বের করতে হবে। ডায়েরির আর মাত্র দুই-তিন পৃষ্ঠা বাকি, তারপরে সব সাদা পাতা। বাদল এমনিতেও কোনোকিছু অতো তাড়াতাড়ি পড়তে পারে না। এই ডায়েরিটা সে আরও ধীরগতিতে পড়ে যাচ্ছে। পৃষ্ঠা ফুরিয়ে গেলেই যেন মানুষটা তার নাগালের বাইরে উড়াল দেবে। এই কয়েক পৃষ্ঠা শেষ হওয়ার আগেই তার ডায়েরির মালিককে চাই! বিনা অনুমতিতে ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ার দায়ে মেয়েটা যদি আবার রাগ করে? করুক!
ছেলেটা নেতিবাচক সব ভাবনাকে মাথা থেকে ঠেলে সরিয়ে দিলো। বয়সে সামান্য বড় একটা মেয়েকে নিয়ে এতো কল্পনা জল্পনা করা অন্যায় নয় কি? বাদল জোর করে চোখ বন্ধ করলো। বয়সে বড় হোক আর যাই হোক, মৌমিতা তার জীবনে আসুক! অসামাজিক, অহংকারী, কম কথা বলা, নিজেকে ঘৃণা করা মেয়েটা আসুক বাদলের জীবনে। কেবল ডায়েরি থেকে এভাবে কল্পনা করাটা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার বটে।

আজকে সকাল থেকেই আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। মাঝে মাঝে আবার মেঘের গর্জনও শোনা যাচ্ছে। রোদ নেই। মাঠে পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলো বাতাসের দাপটে দিগ্বিদিক ছুটছে। ঝড় আসতে পারে। কয়েকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে ঝড় হবে। টানা বৃষ্টিপাত হবে—এমন কথাও বলছে অনেকেই। হলে মন্দ হয় না। গরমটা কেটে যাবে। দিনপঞ্জি অনুসারে এখন শরৎকাল। তবু আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা।

একাদশ শ্রেণির ছুটি হয়ে গেছে। দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান শাখার ব্যবহারিক ক্লাস চলছে এখন। কলেজ ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমজাদ আর রাশেদ বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে, সন্ধ্যা হয়ে গেছে, অথচ এখনও বিকেল হয়নি। আমজাদ হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে বললো, “আজকে বাইরে কোথাও বের হবো না। সেই একটা ঘুম দেওয়া যাবে।”

রাশেদ মাঠের দিকে চোখ রেখেই মাথা দোলায়। আজকের আবহাওয়া আরামদায়ক। বৃষ্টি আসুক বা না আসুক, এমন পরিবেশে গায়ে চাদর জড়িয়ে ঘুমানোর ব্যাপারটা বেশ শোনাচ্ছে। আমজাদ এদিক ওদিক তাকায়, “বাদল আবার কই গেলো?”

রাশেদ পেছনে ঘুরলো। দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস চলছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ক্লাসে উঁকি দেয়ার চেষ্টা করছে বাদল। তার এই কাণ্ডকারখানা দেখে বাকি দু'জন পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। তারপর আমজাদ চেঁচালো, “বাদল! এদিকে আয়।”

বাদল বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠে পেছনে ঘোরে, তারপর দ্রুত হেঁটে তাদের কাছে আসে, “কী হয়েছে?”

“তোর মাথা! ওখানে কী করিস তুই?”

বাদল ভ্রু কুঁচকে মাথা নাড়লো, অকারণে বিরক্তি দেখালো, “ঐ যে... কী যেন একটা বিক্রিয়া করাচ্ছে, ওটাই দেখতে গেলাম। বাদ দেন। এখন কি হলে যাবেন?”

সরু চোখে তাকালো আমজাদ, “তোর মতিগতি ভালো ঠেকছে না আমার কাছে। আচ্ছা, তুই ভালো করে বল তো, তোর কী হয়েছে? এরকম আচরণ করছিস কেন?”

বাদল নিজের অপ্রস্তুত অবস্থা চাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে জোর করে একটু হাসে, “কী রকম আচরণ?”

সে দেখলো, বাকি দু'জন এখনও গম্ভীর মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার হাসি মিলিয়ে গেলো মুহূর্তেই। সে আর কথা না বাড়িয়ে শুকনো মুখে বললো, “ডায়েরিটা ফেরত দেবো।”

কথাটা স্পষ্টভাবে না বুঝলেও রাশেদ ঘুরে দাঁড়ালো, আগ্রহ দেখালো, “কীভাবে ফেরত দিবি?”

“খুঁজে বের করবো ওনাকে। তারপর ফেরত দেবো।”

আমজাদ বলে, “খুঁজে বের করবি কেমনে? নাম জানিস?”

“হুম। মৌমিতা। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।”

“মৌমিতা?” আমজাদ কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করলো, “কিসে পড়ে? সায়েন্স, আর্টস, নাকি কমার্স?”

“সেটা জানি না।”

“আমাদের ক্লাসে একটা মেয়ে আছে, মৌমিতা নামের। আর্টসে। এতোক্ষণে মনে হয়, বাড়ি চলে গেছে।”

বাদল কথা বললো না। ডায়েরিটা ফেরত দেয়ার কোনো ইচ্ছে নেই তার। পুরোটা এখনও পড়া হয়নি। কিন্তু মৌমিতাকে যদি খুঁজে পাওয়া যায়, তবে ডায়েরি ফিরিয়ে দিতে তার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। তার মধ্যে এখন শুধু একটাই ভয় কাজ করছে—কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে মেয়েটা?
রাশেদ বলে ওঠে, “আজকে নাহয় থাক। কালকে দেখা যাবে। বাদল? চল, হলে যাই।”

—————

এই সপ্তাহে মার্জিয়ার দুটো পরীক্ষা আছে, পড়া ভালোভাবে শেষ হয়নি এখনও। সে বিছানার এক কোণে বসে গুনগুন করে পড়ছে। মৌমিতা ঘরে ঢুকেই পড়ার টেবিলের সামনে গিয়ে বসলো, ব্যাগটা মেঝেতে নামিয়ে রাখলো। পা দুটো ব্যথা করছে, একটানা দাঁড়িয়ে ক্লাস করতে হয়েছে অনেকক্ষণ। রাস্তায় আবার কোনো যানবাহনও নেই। সে ক্লান্ত স্বরে বললো, “মার্জু? ফ্যানটা দে তো।”

মার্জিয়া বই থেকে চোখ খুললো, “বাইরে তো অনেক ঠাণ্ডা। তবু ফ্যান লাগবে?”

“আমার গরম লাগছে।”

“গোসল করবা না আজকে?”

“ফ্যান দিতে বললাম, দে। এতো কথা বলিস কেন?”

মার্জিয়া বইয়ের দিকে তাকায়, “আমার তো গরম লাগে না। আমি দেবো কেন?”

মৌমিতা অভিব্যক্তিহীন মুখে বোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। কোনো প্রতিবাদ না পেয়ে মার্জিয়া আরও স্পষ্ট করে বললো, “তুমি দাও ফ্যান!”

“তোকে দিতে বলেছি না? পাশেই তো সুইচ বোর্ড, একটা ফ্যান চালু করতে গেলেই কি তোর হাত খসে পড়বে?”

“আমি পড়ছি।”

“আমি কি তোকে পড়তে মানা করেছি?”

মার্জিয়া বই থেকে চোখ সরায়নি, তবে কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পড়েছে। তাকে এমন পাথরের ন্যায় বসে থাকতে দেখে মৌমিতা আরও রুক্ষ স্বরে বলে, “মার্জু!”

মার্জিয়া বই নিয়ে উঠে দাঁড়ালো, ফ্যান চালু না করে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। মৌমিতা আরেকবার ডাকতে গিয়েও ডাকলো না তাকে। রাগে কটমট করে সে হাতের তালুতে কপাল ঠেকিয়ে বসে রইলো। গায়ের ঘাম শুকিয়ে গেছে তর্ক করতে করতে।
মার্জিয়া খুব অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আব্বা-আম্মা তো তার কোনো খুঁত ধরবেন না। যতো রাগারাগি এই এক মৌমিতার সঙ্গেই! পরিবারের বড় সন্তান হওয়ার চেয়ে অন্যকিছু হতে পারলে ভালো হতো। অন্য যেকোনো কিছু। নিজের অবস্থান, পরিচয়–সবটাই অসহ্য লাগছে তার কাছে।

মার্জিয়া বই খাতা নিয়ে খাওয়ার ঘরে এসেছে। ডাইনিং টেবিলের ওপর গালে হাত দিয়ে বসে আছে। বারান্দার দরজাটা খোলা, বাইরে জোরে জোরে বাতাস বয়ে চলেছে। পড়ায় মনোযোগ আসছে না। ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে বারবার। সে নড়েচড়ে বসে, চোখ বড় বড় করে বইয়ের দিকে তাকায়। অনেক পড়া বাকি। এভাবে ঝিমিয়ে গেলে চলবে না। তবে মনোযোগ দেয়াটা তার ভাগ্যে নেই! সে দেখলো, জুনায়েদ এদিকে আসছে।
বারান্দার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় ছেলেটা, “মার্জিয়া?”

“জ্বী?”

“রিপন কি আছে বাসায়?”

“না, মামা বাইরে।”

জুনায়েদ ভ্রু কুঁচকে ঘুরে দাঁড়ালো, যেভাবে এসেছিলো, সেভাবেই চলে গেলো। মার্জিয়া আবার বইয়ের দিকে তাকালো। তার মনটা যদিও ঐ দমকা বাতাসের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া ছায়াটাতেই পড়ে রইলো।
নবম শ্রেণিতে শখ করে বিজ্ঞান নিয়েছে, এখন আর এইসব পড়া ভালো লাগছে না তার। সে ভাবছে, কলেজে উঠে মানবিকেই ভর্তি হবে। জুনায়েদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র। মার্জিয়ার যদি কোনো পড়া বুঝতে অসুবিধা হয়, তাহলে সেটা জুনায়েদ ভাইয়ের কাছ থেকেই বুঝিয়ে নিবে।

মেয়েটা আবার হাতের ওপর গাল রেখে বারান্দার দিকে তাকায়। এরপরই তার মনে পড়ে রিপন মামার কথা। রিপনও মানবিকের কোনো একটা বিষয় নিয়েই পড়ছে, তবে কোন বিষয়–তা ভালোমতো মনে পড়লো না। বাড়ির মানুষকে ডিঙিয়ে জুনায়েদের কাছে পড়তে যাওয়াটা ভালো দেখাবে না। এই পরিকল্পনা বাতিল।
মার্জিয়া বই বন্ধ করলো, সব গুছিয়ে নিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালো। তার পক্ষে আপাতত পড়ায় মন দেয়া সম্ভব হবে না এখন।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp