মাহিরের চেতনা একবারে ফিরল না। প্রথমে তার মস্তিষ্কের চারপাশ জুড়ে নিরেট অন্ধকার ছিল। তার মনে হয় সে অনেক গভীরে পানির তলদেশে আটকে আছে, কোনোভাবেই ওপরে উঠতে পারছে না। বুকভরে শ্বাস নিতে পারছে না।
এরপর এল ব্যথা। ব্যথাটা ধীরে নয়, সপাটে আঘাত করল। চোখ খোলার আগেই মাথার ভেতরে তীব্র দপদপানি শুরু হলো। প্রতিটা হৃৎস্পন্দনের সাথে সাথে মনে হতে থাকে খুলির ভেতরে কিছু একটা দুমড়েমুড়ড়ে যাচ্ছে।
হাতের গভীর জ্বালাপোড়া আর আড়ষ্ট ভাব কনুই থেকে আঙুল পর্যন্ত চাবুকের মতো খেলে গেল। হাতটা শক্ত করে মোড়ানো, নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই। শুধু আঙুলগুলো একটু নাড়ানোর চেষ্টা করতেই পুরো হাত বেয়ে যন্ত্রণার স্রোত বয়ে গেল।
ঘটনা মনে পড়তেই মাহিরের মনে আতঙ্ক দানা বাঁধল।
অবশেষে চোখের পাতা দুটো অনেক কষ্টে খুলে গেল। বাইরের আলো তিরের মতো চোখে এসে বিঁধল। সব ঝাপসা দেখাচ্ছে। সে স্থির হয়ে গেল। অপেক্ষা করল।
নিঃশ্বাস… নিঃশ্বাস… নিঃশ্বাস…
ধীরে ধীরে সবকিছু একটু থিতু হতে শুরু করল। অন্তত এইটুকু বোঝার জন্য যথেষ্ট যে সে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। বাতাসের গন্ধটাই সেটা নিশ্চিত করে দিল। ডেটল, ওষুধ আর ধাতব গন্ধ বাতাসে মিশে আছে।
হৃৎস্পন্দন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এল, কিন্তু বুকের ভার কমল না। তার নিজেকে অসহায় ও নিরুপায় মনে হলো। পৃথিবীটা তার জন্য এতো কঠোর কেন? বিশাল ধরিত্রীতে তার জন্য একটুও সুখ, শান্তি ও সুরক্ষা থাকতে পারে না?
সহসাই মাহির টের পেল সে একা নয়। পাশে কেউ একজন আছে। খুব কাছে আছে। ঝাপসা দৃষ্টির ভেতর দিয়েই সে দেখতে পেল তাকে। বিছানার পাশে বসে থাকা একটা অবয়ব। মাথা ক্লান্তিতে হেলান দিয়ে রেখেছে।
মাহিরের মনে হলো এটা হয়তো বিভ্রম। মনের কোনো কারসাজি অথবা স্বপ্নের কোনো রেশ। কারণ, আয়না কেন এখানে থাকবে?
কিন্তু এরপর দৃষ্টিটা আরেকটু পরিষ্কার হলো। সবকিছু সত্যি হয়ে ধরা দিল।
আয়না সত্যিই আছে। এত কাছে যে তার উপস্থিতিটা মাহিরের শরীরের যন্ত্রণার চেয়েও বেশি গভীর হয়ে অনুভূত হতে লাগল। আর তারপরই সে অঘটন ঘটালো!
আয়না মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে আছে। মাহির নিশ্চিত, সে শয্যাশায়ী না হলে এই মেয়ে সাথে সাথে চলে যেত। তাও মাহিরের ভালো লাগছে। সামান্য গ্লানি আছে, তবে আয়নার তার সামনে দাড়িয়ে নীরব অভিমানটুকুও ভালো লাগছে।
পরীক্ষায় কোনোদিন চিট না করলেও, সংসারের অগ্নিপরীক্ষা নীতি ধরে রাখা যায় না। সে অস্ফুট স্বরে কাতরে উঠলো। আয়না মন্দ্র স্বরে বলে, নড়াচড়া কেন করছো? মাত্র ক্যানুলা খোলা হয়েছে।
-খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। হাতটা তুমি ধরলে মনে হয় ব্যাথাটা কমে যাবে, একটু চেষ্টা করে দেখবে?
আয়না তাও ভ্রু কুঁচকে রাখল। মাহির দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে আয়নাকে কাছে আনার চেষ্টা করল, একই সাথে ব্যাথাতুর ভঙ্গিও ছাড়ল না।
আয়না হার মেনে ধপ করে তার পাশে বসল, বেশ কাছেই বসল। মাহিরের হাতটা বেডে নামিয়ে বলল, হয়েছে আর বাচ্চামি করতে হবে না। চোখ বন্ধ করে রেস্ট নাও।
-আই ডোন্ট ট্রাস্ট ইউ! একটু আগেও তো বেরিয়ে গিয়েছিলে!
-তোমার সেন্স ফিরেছে তা জানাতে হতো না?
মাহির প্রতি উত্তর করল না। আয়নার হাত এখন তার আয়ত্তে। এতোটা জোরে ধরেছে যে আয়নার মৃদু স্বরে বলতে হয়, হাতে ব্যাথা পাবে তো!
মাহির বলল, সরি! আমি আসলে এরকম পরিবেশে তোমাকে দেখে উইয়ার্ড বিহেইভ করেছি। তোমাকে কে জানিয়েছে?
আয়না ছোট করে বলল শফিক সাহেবের কথা।
মাহির বলল, বুঝেছি। আসলে টেনশনের কিছু নেই। এক্সিডেন্ট তো এরকম হতেই থাকে। তুমি কি ভয় পেয়েছিলে?
আয়না মুখ গম্ভীর করে বলল, মোটেই না। চিল মুডে ছিলাম।
তার বলার ভঙ্গি শুনে মাহির হেসে উঠল আর তার পরমুহূর্তেই ব্যাথায় ককিয়ে উঠল। আয়না বিড়বিড় করে বলল, হাড়গোড় ভেঙ্গে একসার করেছো তাও ভাব দেখাচ্ছে কিছুই হয়নি।
এই লোক যে কি ধাতু দিয়ে তৈরি, তা জানতে ইচ্ছুক আয়না!
সে বলল, তোমার কলিগরা বাইরে আছে। কথা বলবে বোধহয়। আমি ফার্মেসী থেকে ঔষধ নিয়ে আসি।
-আয়না?
-কি?
মাহির নিরীহ ভঙ্গিতে আমতা আমতা করে বলল, চুলের খোঁপা খুলে গেছে তো। দ্রুত একটু বেঁধে ফেলো না?
আয়না নিরীহ ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ফিক করে হেসে চুল খোঁপা করতে ব্যস্ত হলো।
—————
ফার্মেসি থেকে ফেরার পথে আয়নার হাত দুটো অবশ হয়ে আসছিল। ইনজেকশন, ট্যাবলেট, স্যালাইন এত সব এখন মাহিরের রোজদিনের সঙ্গী হবে। রাতের সেই আতঙ্কটা ভোরের আলোতে ফিকে হয়ে গেছে।
জেনারেল ওয়ার্ডের দরজার কাছে এসে আয়না হঠাৎ থমকে গেল। পর্দার ওপাশ থেকে বেশ কয়েকজনের কথা বলার শব্দ আসছে। মাহিরের সাথে কয়েকজন লোক কথা বলছে সম্ভবত তার অফিসের সহকর্মীরা।
আয়না ভেতরে ঢুকতে গিয়েও এগোলো না। ভেতরের আলোচনার স্বর খুব নিচু, কিন্তু টানটান উত্তেজনা স্পষ্ট। সে পা না বাড়িয়ে আড়ালে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
-বারো লাখ টাকার ক্যাশ ছিল তোমার কাছে, তাই না মাহির?
শফিক সাহেবের কণ্ঠ। কথাটা তীরের মতো এসে আয়নার কানে বিঁধল। ১২ লাখ টাকা। আয়নার আঙুলগুলো ওষুধের ব্যাগের ওপর শক্ত হয়ে বসল।
ভেতর থেকে মাহিরের গলা শোনা গেল, হ্যাঁ।
আরেকজন দ্বিধা নিয়ে বলল, ম্যানেজমেন্ট ব্যাপারটা নিয়ে খুব সিরিয়াস। অফিসের টাকা। এইটা ছোটখাটো কোনো অ্যামাউন্ট না মাহির ভাই।
আরেকজন দ্রুত বলে উঠল, দমবন্ধ পরিস্থিতিটা সামাল দিতে চাইছে,
-আমি আশেপাশে খোঁজ নিয়ে দেখেছি। ফুটপাথের ওরা বলল চারজন ছিল মনে হয়। হঠাৎ করেই ঘিরে ফেলেছিল। ব্যাগটা নিয়ে টানাটানি শুরু করতেই মাহির ভাই শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন, ছাড়েননি। ধারালো অস্ত্র ছিল সবার কাছে তারপর পেছন দিক মাহির ভাইয়ের থেকে মাথায় আঘাত করে। একটা বাইকও ছিল ওরা পালানোর সময় ধাক্কা দিয়ে চলে যায়...
আয়নার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তাহলে এটা কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা ছিল না। টার্গেটেড অ্যাটাক। ছিনতাইয়ের চেষ্টা। আর মাহির একাই ছিল মাঝখানে।
ভেতরে আবার মাহিরের গলা শোনা গেল, যা হয়েছে, হয়ে গেছে। এটা নিয়ে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।
কথাটা শান্ত শোনালেও যেন সে ইচ্ছে করেই আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চাইছে।
আরেকজন ধীর গলায় বলল, তবুও... থানায় তো একটা স্টেটমেন্ট দিতে হবে। আর এই টাকাটা? কি যে মরার বিপদ আসলো লসের মধ্যে!
-আমি সামলে নেব।
মাহির মাঝপথেই তাকে থামিয়ে দিল। স্বরে ক্লান্তি আর হতাশা স্পষ্ট।
আর কোনো কথা হলো না। আয়না আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক মনে করল না। সে পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকল।
তাকে দেখামাত্রই মাহির সরাসরি তাকাল। ওর চোখে এক ঝলক বিস্ময় ফুটে উঠল, পরক্ষণেই সেটা মিলিয়ে গিয়ে স্বাভাবিক হয়ে গেল। ঘরের বাকি লোকগুলো চুপ হয়ে গেল। কেউই কিছু বলল না। না মাহির, না আয়না।
আয়না নিঃশব্দে বিছানার পাশের টেবিলে ওষুধগুলো নামিয়ে রাখল। একটার পর একটা ফাইল সাজাতে লাগল সে। হাতগুলো স্থির দেখালেও তার ভেতরে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছিল।
একজন সহকর্মী এগিয়ে এসে বলল, ভাবী, আপনি অনেক কষ্ট করেছেন রাতে। আমরা তো আসতাম, কিন্তু খবরটা পেতে দেরি হয়ে গেল..
আয়না শুধু হালকা মাথা নেড়ে তাকে থামিয়ে দিল। কথা বাড়ানোর মানসিকতা তার নেই। শফিক সাহেব সান্ত্বনার সুরে বলল, আপনি ভয় পাবেন না ভাবী। মাহির ভাইয়ের অবস্থা এখন স্টেবল।
আয়না এবার খুব শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল, ডাক্তার দেখে কী বলেছেন?
মাহির উত্তর দিল না। অন্য একজন সহকর্মী বলল, অবজারভেশনে রাখতে বলেছেন। অন্তত আরও একটা দিন।
ঠিক তখনই ওয়ার্ডের ডাক্তার ঢুকলেন। তিনি ফাইলটা কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে দেখলেন, তারপর মাহিরের দিকে তাকালেন।
কেমন লাগছে এখন?
-ম্যানেজেবল।
মাহির ছোট করে উত্তর দিল।
ডাক্তার মাথা নাড়লেন,
হেড ইনজুরি হয়েছে। মাইল্ড কনকাশন। হাতের ফ্র্যাকচার আর পাঁজরের চোট এগুলো হেলাফেলা করার মতো না। অন্তত চব্বিশ ঘণ্টা আপনাকে কড়া নজরে রাখতে হবে।
একটু থেমে তিনি আবার যোগ করলেন,
আজ ডিসচার্জের কথা ভুলেও ভাববেন না।
মাহির কোনো কথা বলল না। ডাক্তার বেরিয়ে যেতেই সে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করল। তার কপালে ব্যথার রেখা ফুটে উঠলেও কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক।
-আমি আজই বাড়ি যাব।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নার্স চমকে উঠে বললেন, কিন্তু স্যার, এটা একদমই সেফ না।
মাহির সপাটে কেটে দিল, আমি দায়িত্ব নিয়েই ডিসচার্জ চাইছি।
সহকর্মীদের একজন অনুরোধ করল, মাহির ভাই, জেদ করবেন না। একটু থেকে যান না। অফিসের দিকটা দেখি যদি আমরা সামলে নিতে-
মাহির চোখ তুলে তার দিকে তাকাল,
আমি বলেছি আমি ঠিক আছি। আমাকে বাড়ি যেতে হবে। আপনারা প্লিজ দুশ্চিন্তা করবেন না।
তার গলার স্বরে অটল জেদ ছিল যে আর কেউ কথা বলার সাহস পেল না। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আয়না এতক্ষণ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে কিছু বলেনি। প্রথমে তার মনে হয়েছিল এটা মাহিরের চিরচেনা জেদ। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে না। এটা কেবল জেদ নয়। এর পেছনে কোনো হিসাব আছে। হাসপাতালের বিল? অফিসের খোয়া যাওয়া টাকা? নাকি দুটোরই চাপ?
মাহির কিছুই বলছে না, কিন্তু আয়না যেন তার না বলা কথাগুলো পড়তে পারছিল।
আয়না মাহিরের বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কোনো তর্কে গেল না সে। উল্টো খুব নিঃশব্দে জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করল। ওষুধগুলো ব্যাগে ঢোকাল, চাদরটা ভাঁজ করল। সে বুঝে গেছে যে এই হাসপাতালে থাকা এখন মাহিরের জন্য শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাহির এক দৃষ্টিতে আয়নার হাতের কাজ দেখছিল। সে চুপ করে রইল। একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। শুধু কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় নিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে নিল। এক অদ্ভুত নীরব বোঝাপড়া যেন ওই মুহূর্তেই তাদের মধ্যে তৈরি হয়ে গেল।
আয়না বলল, আমি বিল ক্লিয়ার করে আসি।
মাহির ব্যস্ত হয়ে বলল, আমি রামিনকে আসতে-
আয়না বলল, কাউকে ডাক প্রয়োজন নেই। আমি করতে পারব। বাড়ি যেতে চাইলে আর কোন কথা বোলো না।
—————
মাহিরকে বাড়িতে দেখে সবাই বেশ অবাক হলো। মনসুর আলম বললেন, ডিসচার্জ দিয়ে দিলো? আমি মাত্রই বেরোতে নিয়েছিলাম। হাঁটুর ব্যাথার জ্বালায় শ্বাস ফেলতে পারছিলাম না।
মাহির বলল, ঔষধ কিন্তু কিনে রেখেছিলাম, ক্রিমটাও আছে।
সাহেরা বানু আহত নাতিকে দেখে হা-হুতাশ করলেন, যেই জালিম এক্সিডেন্ট ঘটিয়েছে তার মা-বাপের সাথে বিচারের দিনে বোঝাপড়া করার অঙ্গীকার করলেন। জালিমের নানা-দাদাকেও শাপশাপান্ত দিতে কমতি রাখলেন না। নিশ্চয়ই বংশের দোষ এটা!
রামিন বলল, কবর থেকে চোদ্দগুষ্টিকে গালাগাল করা বাদ রয়ে গেছে বুড়ি।
তিনি তার দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। আয়না বলল, ওকে রুমে নিয়ে যাই। রেস্টে থাকতে হবে।
-এখানে বসবে না?
-না, একবারে ঘরে যাওয়াই বেটার। কেউ দেখতে চাইলে উপরে আসলেই হবে।
রামিন সাহায্য করল মাহিরকে। আয়নার হাতে হাসপাতালের একগাদা জিনিসপত্র। এতটুক সিঁড়ি বাইতে মাহিরের ঘাম ছুটে গেল। কিভাবে দুইদিনের মধ্যে অফিস জয়েন করবে এই ভেবে তার দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল।
রামিন চলে যাওয়ার পর আয়না জানালাগুলো খুলে দিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দুপুরবেলার এই সময়টায় প্রখর রোদ উঠেছে আর সাথে আছে অসহ্যকর ভ্যাপসা গরম। মাহির তাকে ছোটাছুটি করতে দেখে বলল, তুমি একটু বসবে? বসো তো! নাহলে কিন্তু নিজেও অসুস্থ হবে।
আয়না টেচিল ফ্যান এনেছে দোতলা থেকে, সেটা মাহিরের দিকে ফিক্সড করে তার কাছে বসল, একটু পানি খাবে?
মাহির না সূচক মাথা নাড়ল। মাহির বলল, রিসিটগুলো দেখালে না কিন্তু?
আয়না বলল, সেটা খুব জরুরী কিছু নয়। পরে দেখলেও চলবে। কেন এতো ভাবছো?
মাহির কি করে তা বলবে! আয়নার টাকা খরচের ব্যাপারটা সে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে না। অপরাধবোধ কাজ করে। তাহলে কি সেও তাকে খুব কাছের ভাবতে পারছে না? তার নিজস্ব ভাবনার মধ্যেও ত্রুটি আছে।
আয়না বলল, হসপিটাল ছাড়া নিয়ে জেদ করাটা খুবই চাইল্ডিস ছিল। বাড়িতে থাকলে সন্ধ্যা নামলেই তোমার পা শিরশির করবে পেন্ডিং কাজগুলো ধরতে। সেরকম কিছুর আশা রেখো না। কমপ্লিট বেড রেস্ট মানে কমপ্লিট রেড রেস্ট! নাথিং লেস!
মাহিরের অধরে তৃপ্তির হাসি। সে চোখ বন্ধ করে বলল, তুমি খেয়াল করেছো এখন তুমি আমার সাথে কতো কথা বলো?
আয়না বলল, কি বলতে চাও? আগে বলতাম না?
-কম বলতে! দায়সারা ভাবে বলতে! প্রাণহীন শোনাতো, যেন কথাটা শেষ করতে পারলেই মুক্তি। দায়িত্ব থেকে মুক্তি, আশা থেকে মুক্তি, মাহিরের থেকে মুক্তি।
আয়না বিব্রত হলো। সে জানতে চাইল, আর এখন?
মাহির বলল, এখন? এখন তোমার কপতী নদীর কলকল ধ্বনির মতো শোনায়, সুরেলা পাখির কিচিরমিচিরের মতো মনো হয়। যা কিছু শুনতে মিষ্টি লাগে, আপন লাগে, ঠিক একদম সেসবের মতো শোনায়।
আয়না অপলক তাকিয়ে থাকে। ভদ্রলোকের মুখ খুলেছে অনেকদিন হলো। এরপর থেকে শুধু উন্নতি হচ্ছে। অবলীলায় কি কি যেন বলে আয়নাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেয়।
-আমি একটু ঘুমাবো। তুমি এখানেই থাকবে, কেমন?
আয়না বলল, ঠিক আছে। যাবো না কোথাও।
-কাজে ডাকলেও যাওয়ার প্রয়োজন নেই, ঠিক আছে?
-যাব না। আই উইল স্টে উইথ ইউ মাহির। নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারো তুমি।
—————
মিনি উঁকি দিয়ে বলল, ভাইয়া এখনো ঘুমাচ্ছে?
আয়না বলল, হুম। কথা বলতে এসেছিলে মিনি?
-গভীর ঘুমে মনে হচ্ছে।
-টায়ার্ড যে! তবে একটু পরেই ডেকে তুলব, টাইমলি ঔষধ খেতে হবে।
-ঠিক। বুড়ি বলল ভাইয়ার খোঁজ নিতে, সে তো সিড়ি চড়তে পারে না। সবাই খুবই টেনশন করছিল।
আয়না তা নিয়ে কোনো উত্তর দিল না। শুধু বলল, ওনাকে বলো এখন একটু ভালো। তবে স্ট্রেস নেওয়া যাবে না।
মিনি বলল, জানো ভাবী ভাইয়াকে কখনো আমি সিক দেখিনি। যখন থেকে আমাদের বাড়িতে আসলো, সবসময় ফিট দেখতাম। এখন এরকম সিক দেখে খুব খারাপ লাগছে।
-আগে তোমার ভাইয়া কোথায় থাকতো?
-তাদের বাসায়। সেখানে চাচ্চু-চাচীর সাথে থাকতো। আমার মনে নেই তাদের কথা। মাও কিছু বলে না।
-কেন বলে না কেউ, জানো?
-নাহ! আর আমার ও তেমন কোনো স্মৃতি নেই তাদের নিয়ে। খুব ছোট ছিলাম তো। বাড়িতে কখনো জিজ্ঞেস করলে বকা খেতে হতো।
রায়হান ভাইয়া বলতো অনেকদিন পর্যন্ত নাকি রিপোর্টাররা ঘুরঘুর করতো, মা-বাবাকে জ্বালাতন করতো। ভাইয়াকে তো স্কুলেও তাকেও এরজন্য কথা শুনতে হতো। তাইতো সে মাহির ভাইয়াকে পছন্দ করতো না একদম। আসলে সবার জীবনই স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লেগে যায়।
আয়না প্রশ্ন করার আগেই মিনি কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, জানো না তাই না? ছোট চাচ্চু তো সুইসাইড করেছিল। কোনো এক্সিডেন্ট ছিল না। বুড়ি তোমায় ভুলভাল বলেছিল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………