আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৬৪ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          ছাদের কার্ণিশে তখন গোধূলির রঙ। ঘন্টাখানেক পরই ইফতারের আয়োজন শুরু হবে। শাওন মায়ের তালিকা দেখে দরকারি ইনগ্রেডিয়েন্টস্ কিনে বাড়ি ফিরে প্রথমেই মনে মনে সৌমিকে খুঁজল। বাইরে প্রচন্ড গরম পড়েছে। এতোটুকু হেঁটে এসেই অস্থির লাগছে। শাওন মায়ের হাতে জিনিসগুলো দিয়ে শার্টের উপরের বোতাম দুটো খুলতে খুলতে নিজের ঘরের দিকে গেল। ভেতরে উঁকি দিয়ে সৌমিকে না পেয়ে ফিরে এলো রান্নাঘরের দিকে। রান্নাঘরেও তাকে না পেয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলো, 
‘ সৌমি কোথায়, আম্মু?’ 
শাওনের মা তখন গরম তেলে বেগুনি ভাজছেন। ছেলের প্রশ্নে মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন,
‘ সৌমি তো চলে গেল। তোকে ফোন করেনি?’ 
শেষ প্রশ্নে কিঞ্চিৎ বিস্ময় খেলে গেল তার কণ্ঠে। শাওন হতচকিত হয়ে বলল,
‘ চলে গেছে মানে? ইফতারের আগমুহূর্তে কোথায় গেল? আমি তো কিছুই জানি না।’ 
শাওনের মা বললেন, 
‘ হঠাৎ এসে বলল বাড়ি থেকে ফোন এসেছে। এক্ষুনি যেতে হবে, ইমারজেন্সি। তোকে ফোন করে জানিয়ে দেবে বলে বেরিয়ে গেল। আমি তো ভাবলাম তুই জানিস।’ 
শাওনের ভ্রু কুঁচকে গেল। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল, ঘন্টাখানেকের মধ্যে সৌমির কোনো কল আসেনি। শাওন তৎক্ষনাৎ সৌমির নাম্বারে ডায়াল করলো। ফোন বন্ধ। একটু আগে জরুরি ফোন পেয়ে বেরিয়ে গিয়েছে এখন আবার ফোন বন্ধ! ঘটনা বুঝতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল শাওন। কোনো ঝামেলা হলো না তো? কী এমন ইমারজেন্সি হতে পারে? শাওন নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে আরও কয়েকবার ডায়াল করলো সৌমির নাম্বারে। প্রতিবার একই যান্ত্রিক আলাপ। দুশ্চিন্তায় অধীর হয়ে ক্রমেই মেজাজ খারাপ হতে লাগল শাওনের। সৌমির নির্বুদ্ধিতায় সে বিস্মিত। এই সন্ধ্যার মুখে হুট করে বেরিয়ে গেল, কোনো কিছু জানানোর প্রয়োজন বোধ পর্যন্ত করলো না। এখন আবার ফোন বন্ধ করে রেখেছে। ঢাকা শহর কতটা চিনে ও? ঠিক মতো বাসায় পৌঁছাতে পারল কিনা কে জানে! ঘরে ফিরে ফের সৌমির নাম্বারে ডায়াল করতে গিয়েই চোখ পড়ল টেবিলের উপর অবহেলায় পড়ে থাকা কাগজটির ওপর। শাওন এগিয়ে গিয়ে কাগজটি হাতে নিল এবং যথারীতি কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল তার শরীর। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চল দাঁড়িয়ে থেকে শাওন দ্রুত টেবিলের ড্রয়ার খুলল। যা ধারণা করেছে তাই, পেনড্রাইভ দুটো আর পুরোনো ফোনটা গায়েব। নিশ্চয় সৌমি সঙ্গে নিয়েছে? আসন্ন বিপদের উত্তেজনায় শাওন কী রকম প্রতিক্রিয়া দেবে বুঝতে না পেরে কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় বসে পড়ল। পেনড্রাইভ খুলে মৌনির ছবি দেখে সৌমির প্রতিক্রিয়া কেমন হবে ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে সবচাইতে মুসিবত হলো পুরোনো ফোনটা নিয়ে। 
 ওখানে কী আছে, কী নেই নিজেই মনে করতে পারছে না শাওন। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে অগ্রীম চিন্তাভাবনা ত্যাগ করে সৌমির ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে বসল সে। ঝামেলা যা হবে তা পরে দেখা যাবে আপাতত সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৌমির নিরাপত্তা। সৌমি যতবার ঢাকায় এসেছে প্রতিবার ওকে ওর খালার বাসার সামনে থেকে নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছে শাওন। একটু পরই সন্ধ্যা নামবে সৌমি কী একা রাস্তা চিনে বাসা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে? দুশ্চিন্তায় ইফতার গলা দিয়ে নামল না শাওনের। ইফতার করতে বসেও বারবার ফোন দেখছে দেখে মা জিজ্ঞেস করলেন, 
‘ কী রে? সৌমির বাড়িতে বড় কোনো ঝামেলা হয়েছে?’ 
শাওন দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল,
‘ জানি না, মা। ওর ফোনটা বন্ধ।’ 
ছেলের দুশ্চিন্তা দেখে শাওনের মাও খানিকটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবার। শাওন মাকে চিন্তিত হতে দেখে বলল, 
‘ চিন্তা করো না। হয়তো ফোনের চার্জ শেষ। একটু পরই যোগাযোগ করতে পারব।’ 
ইফতারের পরও সৌমির সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে বিকল্প মাধ্যম চিন্তা করলো শাওন। মনে পড়ল, সৌমির এক খালাতো বোনের নাম্বার ছিলো তার কাছে। কিন্তু মেয়েটার নাম মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে। চিন্তিত মুখে ফোনের কন্টাক লিস্ট ঘাঁটতে ঘাঁটতে অবশেষে মেয়েটার নাম মনে পড়ল তার। একবার রিং হতেই ফোনে পাওয়া গেল তাকে। শাওন গম্ভীর গলায় বলল,
‘ হ্যালো, সোহা? আমি তোমার শাওন ভাইয়া বলছিলাম।’ 
ওপাশ থেকে সোহা নামের মেয়েটি নিষ্প্রাণ গলায় বলল,
‘ জি ভাইয়া। ভালো আছেন?’ 
‘ এইতো চলছে। তোমার সৌমি আপু কি বাসায় পৌঁছেছে?’ 
‘ জি ভাইয়া। একটু আগেই বাসায় ফিরেছে আপু।’ 
তারপর একটু থেমে বলল,
‘ আপনাদের মধ্যে কি কোনো ঝামেলা হয়েছে ভাইয়া? আপু আসার পর থেকে থমথমে মুখ করে বসে আছে। কথা-টথা বলছে না।’ 
শাওন বলল,
‘ তেমন কিছু না। তোমার আপু একটু রেগে আছে আমার ওপর। ওকে একটু ফোনটা দিবে? ওর নাম্বার বন্ধ পাচ্ছি বিকাল থেকে।’ 
সোহা সম্মতি জানালেও কিছুক্ষণ পর অপ্রস্তুত গলায় বলল,
‘ আপু তো কথা বলতে চাইছে না, ভাইয়া।’ 
শাওন জানতে চাইল, 
‘ কী করছে তোমার আপু?’ 
‘ তেমন কিছু করছে না। আসার পর থেকে থম ধরে বসে আছে।’ 
এই মুহূর্তে নতুন করে কোনো বাকযুদ্ধে যাবার ইচ্ছে না থাকার দরুন সৌমিকে আর ঘাঁটাল না শাওন। তাকে তার মতো ছেড়ে দিয়ে ফোন রাখল। সৌমি যদি মৌনির ছবি দেখে ক্রোধান্বিত হয়ে তাকে ছেড়ে যেতে চায়, যাক। কোথাও না কোথাও শাওনের মনে হয় সৌমির তাকে ছেড়ে যাওয়াই উচিত। আজকাল জীবন নিয়ে সে খুব ক্লান্ত। সেই ক্লান্ত জীবনে সর্বক্ষণ আরেকজনকে আহ্লাদ করার, মানিয়ে চলার ক্ষমতা আর তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। সন্ধ্যা থেকে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকা মনটাকে খানিক আরাম দিতে উঠে গিয়ে কম্পিউটারে গেইম খেলতে বসল শাওন। সাহরি পর্যন্ত জেগে থেকে ঘুমাতে গেল ভোরে। ঘুমটা একটু গভীর হতেই ফোনের যান্ত্রিক আওয়াজে ঝনঝন করে উঠল চারপাশ। শাওন বিরক্ত হয়ে একবার ফোন কাটলেও ফের নতুন উদ্যমে ফোন বাজল। তিতিবিরক্ত হয়ে চোখ মেলে তাকাল শাওন। কল রিসিভ করার আগে আড়চোখে একবার সময়টা দেখে নিলো, তখন ভোর ছয়টা বাজে। ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে সৌমি ফুঁসে উঠে বলল,
‘ বারবার ফোন কাটছ কেন?’ 
শাওন ততোধিক বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ কেন কাটছি বুঝতে পারছ না? সাহরির পর ঘুমিয়েছি। অযথা এতো সকালে ফোন করার কোনো মানে হয়?’ 
প্রত্যুত্তরে কড়া কিছু কথা বলতে ইচ্ছে হলেও আজ আর তর্কে গেল না সৌমি। রুক্ষ গলায় বলল,
‘ তুমি এক্ষুনি আমার সঙ্গে দেখা করো, শাওন।’ 
‘ এখন?’ অবাক হলো শাওন।
 ‘ কয়টা বাজে দেখছ? পাগলে পেয়েছে তোমাকে?’ 
সৌমি ক্লান্ত গলায় বলল,
‘ আমি তোমার সঙ্গে আর তর্ক করতে পারছি না, শাওন। তুমি এক্ষুনি কার্জনের সামনে আসবে। আমি বেরুচ্ছি।’ 
বলেই কলটা কেটে দিলো সৌমি। শাওন কিছুক্ষণ অসন্তুষ্ট চোখে ফোনটির দিকে তাকিয়ে থেকে উঠে বসল। তপ্ত মেজাজ নিয়েই বাইরে বেরুনোর প্রস্তুতি নিলো। 

সৌমিকে ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করিয়ে শাওন যখন কার্জনের সামনে পৌঁছাল তখন গ্রীষ্মের রোদ ডানা মেলতে আরম্ভ করেছে মাথার উপর। সৌমি চোখে মুখে ছাইচাপা আগুন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক গ্রীষ্মের মধ্যদুপুরের মতো। রমজানের সকাল হওয়ায় আশেপাশে তেমন জনমানব নেই। শাওন রিকশা থেকে নেমে সৌমির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সৌমি তপ্ত গলায় বলল,
‘ কতক্ষণ ধরে আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি শাওন। তোমার কি আমাকে মানুষ বলে মনে হয় না?’ 
শাওন দায়সারা গলায় বলল,
‘ আসতে তো সময় লাগে নাকি? আমার তো আর পাখা নেই। বললে আর উড়াল দিয়ে চলে এলাম। রিকশা পেতে সময় লেগেছে।’ 
‘ রিকশা পেতে সময় লেগেছে! রিকশা পেতে কত সময় লাগলে তোমার বাসা থেকে এখানে আসতে দুই ঘন্টা লাগে শাওন? তোমার আমাকে বোকা মনে হয়?’ 
শাওন বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ এখন তুমি এটা নিয়ে ঝগড়া করবে? তোমার ধারণা আমি ইচ্ছে করে দেরি করে এসেছি?’ 
সৌমি জোর দিয়ে বলল,
‘ হ্যাঁ, তুমি ইচ্ছে করেই দেরি করে এসেছ।’ 
শাওন নিঃস্পৃহ গলায় বলল,
‘ তোমার তাই মনে হলে, তাই। ধরে নাও এটা তোমার শাস্তি। এই ভোরে আমাকে এতোদূর টেনে আনার খেসারত।’ 
সৌমি কয়েক মুহূর্ত বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত গলায় বলল,
‘ খেসারত! আমার জায়গায় মৌনি হলেও কি একই খেসারত চাইতে তুমি শাওন?’ 
মৌনির প্রসঙ্গে চকিতে সৌমির মুখের দিকে তাকাল শাওন। গম্ভীর গলায় বলল,
‘ আমাদের মাঝে মৌনির প্রসঙ্গ আসছে কেন, সৌমি?’ 
রাগে-দুঃখে টলমল করে উঠল সৌমির চোখ। রুদ্ধ গলায় বলল,
‘ আসছে কারণ তুমি তাকে আমাদের মধ্যে এনেছ।’ বলে শাওনকে কোনো প্রতিক্রিয়া করার সুযোগ না দিয়ে ব্যাগ থেকে পেনড্রাইভ দুটো বের করে ছুঁড়ে মারল শাওনের বুক বরাবর। ও দুটো শাওনের শক্ত বুকে আঘাত হেনে ছিটকে পড়ল মাটিতে। শাওন শান্ত চোখে পেনড্রাইভ দুটো দেখল। তারপর দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ এগুলো নিয়ে অযথা নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট করো না, সৌমি। এগুলো অনেক আগের। ফোন থেকে সরিয়ে প্যানড্রাইভে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম ডিলিট করার চাইতে কাব্যকে দিয়ে মৌনির কাছে পাঠিয়ে দিবো। তারপর আর খেয়াল ছিলো না। মৌনির সঙ্গে এখন আমার কোনো যোগাযোগও নেই। শি ইজ জাস্ট মাই কাজিন, নাথিং মোর।’ 
সৌমি হেসে ফেলল, 
‘ জাস্ট আ কাজিন?’ 
‘ হ্যাঁ, কাজিন।’ তারপর চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘পাস্ট ইজ পাস্ট, সৌমি। অতীতের গল্প থেকে বেরিয়ে আসো। তোমারও কি অতীত ছিলো না? সেগুলোকে বর্তমানে টেনে এনে নিজেদের মানসিক শান্তি নষ্ট করার কি কোনো মানে আছে সৌমি?’ 
সৌমি উত্তেজিত হয়ে বলল,
‘ পাস্ট! কতদিনের পাস্ট ও তোমার? বলো, কতদিন?’ 
‘ তুমি জানো না কতদিন?’ 
‘ না, জানি না। বলো, কতদিন।’ 
শাওন ভেতর ভেতর অস্থির হয়ে পড়লেও স্পষ্ট গলায় বলল,
‘ আড়াই বছর।’ 
সৌমি এবার হো হো করে হেসে উঠল। তার কথাবার্তা, আচরণে অদ্ভুত পাগলামোর ছাপ দেখে ভেতর ভেতর বেশ ঘাবড়ে গেল শাওন। সৌমি হাসি থামিয়ে বলল,
‘ আড়াই বছর?’ 
তারপর হঠাৎ গলার স্বর উঁচু করে বলল, 
‘ তাহলে এই পেনড্রাইভে কয়েক মাস আগের ছবি কোথা থেকে এলো শাওন? তোমার আমাকে বোকা মনে হয়? তোমার ভালোবাসায় অন্ধ বলে যা খুশি তাই বুঝাবে?’ 
শাওন বাতাস গিলল। তৎক্ষনাৎ কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে বলল,
‘ তুমি অযথা এতো রিয়েক্ট করছো সৌমি। এমন তো নয় যে তুমি জানো না – ইউ আর নট মাই ফার্স্ট লাভ। মৌনিকে আমি ছোটবেলা থেকে ভালোবাসতাম। মানুষ চাইলেই অভ্যাস থেকে বের হতে পারে না। তাই অভ্যাসবশত হয়তো দুই একটা ছবি সেইভ করে ফেলেছি।’ 
সৌমি এবার ব্যাগ থেকে শাওনের পুরোনো ফোনটা বের করে ছুঁড়ে মারল তার বুকে। তীব্র রোষ নিয়ে বলল,
‘ অভ্যাসবশত বুঝি প্রেমের কবিতাও লিখে ফেলেছ?’ 
ভারী ফোনটা বুকের কাছে এসে লাগায় এবার বেশ ব্যথা পেয়েছে শাওন। মাটিতে পড়ে ফোনেরও যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। শাওনের মেজাজ ধরে রাখা ক্রমেই মুশকিল হয়ে পড়ছে। সে নিচু হয়ে ফোনটা তুলে নিয়ে ক্রোধান্বিত গলায় বলল,
‘ আর ইউ ইনসেন?’ 
সৌমি আক্রমনাত্মক গলায় বলল,
‘ হ্যাঁ, আমি পাগল। কাল রাত থেকে আমার নিজেকে পাগলই মনে হচ্ছে। তোমাদের প্রেমময় কথোপকথন দেখে সারাটা রাত নির্ঘুম কেটেছে আমার। কয়েক মাস আগেও তোমাদের কথাবার্তার যে ধরণ ছিল তাতে কে বিশ্বাস করবে তোমরা কেবল কাজিন? প্রেম না হয়েও প্রেমিযুগলের মতোন গভীর তোমাদের কথাবার্তা। আর তুমি? মৌনির পায়ের কাছে পৃথিবী এনে লুটিয়ে দেওয়ার মতোন দুর্নিবার প্রেমিক। এতো আহ্লাদ তো তুমি আমাকেও কোনোদিন করোনি, শাওন?’ 
শাওন কিছু বলল না। পুরোনো ফোনে যে তাদের আগের হোয়াইটস্অ্যাপ চ্যাটিং রয়ে গিয়েছে মাথাতেই ছিলো না তার। তাছাড়া, এই ফোন সৌমির সামনে কখনো ব্যবহার করতো না বলে বিষয়টা নিয়ে কখনো দুশ্চিন্তাও হয়নি তার। এখন মনে হচ্ছে, দুশ্চিন্তা হওয়া উচিত ছিল। সৌমি ওর দিকে এক পা এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চেপে রোষাবিষ্ট গলায় বলল,
‘ কী দিয়ে ও এতো ভুলিয়ে রেখেছে তোমাকে বলো তো? আমার চাইতে রূপবতীও তো না। কী পেয়ে এতো মুগ্ধ হলে ওর প্রতি? শরীর?’ 
শাওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তৎক্ষণাৎ। চোখের মণি জ্বলে উঠল। সৌমির বাহু খামচে ধরে হিম ধরা গলায় বলল,
‘ আমাদের দু'জনের মধ্যে ঝামেলা হচ্ছে। সেটা আমাদের দু'জনের মধ্যে রাখো। খবরদার! মৌনিকে নিয়ে কোনো আজেবাজে কথা বলবে না।’ 
সৌমি জেদি গলায় বলল,
‘ কেন বলব না? সত্যি কথা বললেই গায়ে লাগে তাই না? ও করতে পারে আর আমি বললেই দোষ? তার কেমন চুমু চাই সেটা নিয়ে তো তোমাদের দু'জনের বিশ্লেষণের শেষ নেই। এটা কাজিনদের মতো ব্যবহার? কোনো কাজিন এরকম বিষয় নিয়ে আলোচনা করে? কল লগে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলার হিস্ট্রি। কলে নিশ্চয় মৌনি কীভাবে সেটিসফাইড হবে সে নিয়েও বিস্তর আলোচনা হতো তোমাদের? সে অনুযায়ী সুবিধাও দিতো নিশ্চয় মাঝে মাঝে? কী পরিমাণ ভ্রষ্টা হলে কাজিন কাজিন বলে মুখে ফ্যানা তুলে গা বিলিয়ে অন্যের প্রেমিককে মুঠোয় পুরা যায় সেটা এই মৌনি খুব ভালো করে জানে। কুলটা, মা* একটা।’ 
সময় বিশেষে সৌমির মুখের ভাষা খুবই জঘন্য হয় এ কথা খুব ভালো করে জানে শাওন। কিন্তু মৌনির ব্যাপারে সৌমির এই পরিচিত বাচনভঙ্গি সহ্যের অতীত হলো শাওনের কাছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘ মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ সৌমি। মৌনির সম্পর্কে কথা বলার সময় ভেবেচিন্তে কথা বলবে। সবাইকে নিজের মতো ভেবে ভুল করো না। ও তোমার মতো স্লাট না।’ 
সৌমি দু'চোখে ক্রোধের আগুন নিয়ে বলল,
‘ আমি স্লাট?’ 
শাওন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
‘ নও?’ 
শাওনের এই হাসি সহ্য হলো না সৌমির। ফলাফলস্বরূপ শক্ত এক চপটেঘাত পড়ল শাওনের গালে। শাওনও পিছিয়ে নেই। সৌমির এই দুঃসাহসের হিসেব মেটাতে তৎক্ষনাৎ কঠিন থাপ্পড়ে রক্তিম হলো সৌমির মোমরঙা গালও। সৌমি এবার উম্মাদ হয়ে উঠল। খ্যাপাটে হলো তার রূপ। আহত বাঘিনীর মতো হামলে পড়ে অনবরত চড়-থাপ্পড় মারতে লাগল শাওনের গালে। মুখে প্রলাপ বকার মতোন বুলি, 
‘ তুমি আমাকে মারলে! তুমি আমাকে মারলে!’ 
ততক্ষণে বেশ বেলা হয়েছে। আশেপাশে মানুষের চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে। কোলাহল দেখে অনেকে ইতোমধ্যেই ঘাড় ফিরিয়ে তাদের দিকে তাকাচ্ছে। শাওন ব্যাপারটা খেয়াল করে মুহূর্তেই আয়ত্তে আনলো তার মেজাজ। সৌমির এলোমেলো ছুটতে থাকা হাতদুটো শক্ত করে ধরে প্রতিহত করলো তাকে। পকেট থেকে নিজের মাস্কটা বের করে জোড় করেই পরিয়ে দিলো সৌমির মুখে। চাপা ধমক দিয়ে বলল,
‘ শান্ত হয়ে দাঁড়াও। মাথা গেছে তোমার? পরিবেশজ্ঞান ভুলে গেছ? এখানে দাঁড়িয়ে সিনক্রিয়েট করছো কেউ ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিলে মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হবে। এতে কার সম্মান নষ্ট হবে? আমার না তোমার? আমি পুরুষ মানুষ। আমার কিছুই হবে না। যা হবার তোমার হবে। চুপচাপ এখন বাসায় যাবে। যথেষ্ট হয়েছে।’ 
সৌমির তখন পরিবেশ জ্ঞান করার মতো মানসিক বোধ শক্তি নেই। সে শাওনের কোনো কথা বুঝল কিনা বুঝা গেল না। প্রলাপ বকার মতো করে বলল,
‘ আমি স্লাট? আমি? তাহলে তুমি কী? আমাদের দ্বিতীয় সাক্ষাতের সময় আমার অগোচরে হোটেল রুম বুক করেছিল কে? আমি জেনে যাবার পর কান্নাকাটির মুখে বিষয়টা পাশ কাটিয়ে গিয়েছিল কে? তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম বলে এতোবড় অপরাধও ক্ষমা করে দিয়েছিলাম আমি। তুমি যা বুঝিয়েছো তাই বুঝেছি। আর আজ আমি স্লাট?’ 
শাওন কিছু বলল না। সৌমিকে টেনে নিয়ে দ্রুত রিকশা নেওয়ার চেষ্টা করল। সৌমির শরীর ততক্ষণে ভেঙে আসছে। পৃথিবী দুলছে। এক পা হাঁটার শক্তিও মজুদ নেই দু’পায়ে। সৌমির এই দুর্বলতা শাওনের বিরক্তি বাড়াল। ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে মেজাজ গরম করে বলল,
‘ কী সমস্যা? আসছ না কেন?’ 
সৌমি দুর্বল গলায় বলল, 
‘ আমি হাঁটতে পারছি না, শাওন।’ 
শাওন বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ একদম নাটক করবে না সৌমি। তোমার এসব ন্যাকামো দেখার সময় আমার নেই।’ 
সৌমি প্রত্যুত্তরে বেদনার্ত চোখে তাকিয়ে রইল। শাওন এতো নিষ্ঠুর! এতো নিষ্ঠুর একটা মানুষকে সৌমি ভালোবেসেছিল কী করে? 

সৌমিকে তার খালার বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চোখ-মুখ শক্ত করে বাসায় ফিরে গেল শাওন। লম্বা সময় ধরে গোসল করে মাথার সমস্ত রাগ ধুয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করে যখন বেরুলো তখন প্রায় দুপুর গড়িয়েছে। তোয়ালেতে ভেজা চুল মুছতে মুছতে ফোনটা হাতে নিতেই একটা শীতল রক্তস্রোত বয়ে গেল তার মেরুদণ্ড বেয়ে। সৌমি একটা স্ক্রিনশট পাঠিয়েছে। সঙ্গে একটা ম্যাসেজ, 
‘ তুমি তো আমাকে বাঁচতে দিলে না শাওন। কী ক্ষতি করেছিলাম আমি তোমার?’ 
শাওন দেখল সৌমি তাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করেছে। ব্লক করাটা সমস্যা না, সমস্যাটা হলো স্ক্রিনশট। এই স্ক্রিনশট সৌমি কোথায় পেল? পুরোনো ফোন আর পেনড্রাইভ দুটোই তো এখন তার কাছে। তাছাড়া, এই স্ক্রিনশট তো ফোনে বা পেনড্রাইভেও থাকার কথা না। শাওন ফোন তুলে আবার স্ক্রিনশটের কনভারসেশনগুলো পড়ল। গোসল করার পরও কপালে ঠান্ডা ঘাম ছুটছে তার। দুশ্চিন্তায় নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। সৌমি এখন মানসিকভাবে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় আছে। এই সময় এই স্ক্রিনশট তার সামনে পড়ল। মেয়েটা আত্মহত্যার চেষ্টা করে বসবে না তো!

—————

পুবাকাশে এক ফালি ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ। ধূসর আকাশে মিটিমিটি হাসছে অসংখ্য তারকারাজি। তারই নিচে, রাস্তার পাশের সোডিয়াম আলো থেকে একটু দূরে সরে উবু হয়ে পেটের অবশিষ্ট অংশটুকুও উদগিরণ করতে ব্যস্ত এক যুবক। আলো-আঁধারিতে তার গৌর মুখটা দেখাচ্ছে ছাইবর্ণ। ছেলেটি কিছুক্ষণ বমি করে হাঁটুতে ভর দিয়ে ক্লান্ত শ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই রাস্তার ওপাশ থেকে ধপধপ শব্দ তুলে ছুটে এলো আরেকটি লম্বামতো যুবক। কণ্ঠে উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেসা করলো,
‘ কী হয়েছে তোর নাহিদ?’ 
নাহিদ উত্তর না দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আগের মতোই উবু হয়ে রইল। মুখের ভেতর কেমন টক টক লাগছে। সৌধ উত্তেজিত হয়ে বলল,
‘ ওই ভ্রষ্টা মেয়েমানুষ তোকে খারাপ কিছু খাইয়ে দেয়নি তো দোস্ত? নয়তো হঠাৎ এমন মুখ ভরে বমি করছিস কেন?’ 
এবারও কোনো উত্তর দিলো না নাহিদ। তার এই ক্ষুদ্র জীবনে সবচাইতে বিচিত্র হলো তার বন্ধুমহল। এখানে ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, নেশাখোর, বেখাটে যেমন আছে তেমনই আছে উন্নত মনের রুচিশীল মানুষ। সবার সঙ্গে যার যার হিসেব মতোই মিশে যেতে পারে নাহিদ। বিশেষ ভাবনা ভাবতে হয় না। সেই কারণেই হয়তো মনে মনে নিজের সম্পর্কে একটা উচ্চ ধারণা জন্মে গিয়েছিল তার। ভেবেই নিয়েছিল সে সর্বভুক। মানুষের জাত, পাত নিয়ে তার কোনো শুচিবায়ু নেই। কিন্তু আজ যখন বদ্ধ ঘরে রাণী তার বসন উন্মুক্ত করতে আরম্ভ করলো। দরজায় ছিটকিনি দিয়েই বুকের আঁচলটা সরিয়ে ফেলে নাহিদের দিকে অন্যরকম ইশারা নিয়ে তাকাল তখন নাহিদের মধ্যে অদ্ভুত এক ঘৃণা বুদবুদ করে উঠল। পেটে চাপ দিয়ে কী এক অস্বস্তি বুক বেয়ে উঠে আসতে চাইল গলার কাছে। নাহিদ কিছু না বলে ছিটকে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। হড়বড় করে বমি করে দিলো রাস্তার পাশে। বুঝল, রুচির সমস্ত অধঃপতন স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতে পারলেও শরীরবৃত্তীয় ব্যাপারে জোর খাটানো সম্ভব হবে না৷ কেবল রূপের মাধুর্য তাকে তুষ্ট করতে পারবে না। শরীর পর্যন্ত পৌঁছাতে নাহিদের প্রয়োজন নিখাদ রুচিবোধ সম্পন্ন কোনো নারী। যার বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা তাকে মুগ্ধ করবে। শিক্ষা, জ্ঞান, নিখুঁত আভিজাত্য তাকে মানসিক রসদ দিবে। শরীরবৃত্তীয় ব্যাপারে রূপকে এই মুহূর্তে খুবই গৌণ মনে হলো তার। হাঁটুর ভর ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল নাহিদ। নিজের বহুরূপ কলঙ্কে কলঙ্কিত জীবনের জন্যও অবচেতনে ফুলের মতো নরম, কোমল, পবিত্র কাউকে আশা করে দেখে নিজের মনেই ভারি বিস্মিত হলো। আশ্চর্য হলো এই ভেবে, মানুষ যতোই অধঃপতিত হোক সঙ্গী হিসেবে বরাবরই নির্বাচন করতে চায় সবচাইতে নির্মল মানুষটিকেই। মানব মনস্তত্বের এই নতুন দিক আবিষ্কার করে নাহিদ কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে রইল। 
‘ কী রে, কথা বলছিস না কেন? কী হলো ভেতরে?’ 
প্রশ্নটা করে বন্ধুকে নিবিড় চোখে পরখ করলো সৌধ। তাকে আগের তুলনায় সুস্থ দেখে দুশ্চিন্তা ভুলে মনটা বিদ্রুপের দিকে ঝুঁকে এলো। হাত ঘড়িতে সময় দেখে উপহাস করে বলল,
‘ ভেতরে গিয়েছিস মাত্র ছয় মিনিট হয়েছে। তাতেই বমি টমি করে অস্থির। এই তোমার স্ট্যেমিনা বন্ধু? এই স্ট্যেমিনা নিয়ে তুই শহরের সকল পুরুষকে হেমলক খাইয়ে মেরে ফেলতে চাস?’ 
বলে ডাকাতের মতো হো হো করে হেসে উঠল সৌধ। নাহিদ তার দিকে একবার কড়া চোখে তাকিয়ে সামনের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। সৌধ তার পিছু পিছু গিয়ে বলল,
‘ এরপর থেকে তোর মাখনের মতো চেহারা দেখে কোনো রূপবতী মোহিত হয়ে গেলে সবার আগে ছয় মিনিটের ব্যাপারটা বলবি, বুঝলি? এটা খুব দরকার। জেনেশুনে কোনো মেয়েকে আগুন ঝাঁপ দিতে দেওয়া ঠিক না।’ 
নাহিদ বিরক্ত চোখে তাকাল। রুক্ষ গলায় বলল,
‘ তোর সমস্যা কী?’ 
সৌধ নিরুদ্বেগ গলায় বলল,
‘ আমার কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা তোর। আমি তোর সংসার জীবন নিয়ে চিন্তিত। তোর নানা ব্যাপারটা না জেনে সত্যিই যদি একটা বিয়েশাদির ব্যবস্থা করে ফেলে তখন কী হবে বল তো? তবে, তুই চাইলে বন্ধু হিসেবে আমি তোকে সাহায্য করতে পারি।’ 
নাহিদ ত্যক্ত চোখে তাকাল। মুখের কাছে যোগ্য জবাব থাকা সত্ত্বেও একটিও কথা না বলে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। সৌধ কিছুক্ষণ একা একাই বন্ধুকে ত্যক্ত করার চেষ্টা করে উত্তর না পেয়ে একসময় চুপ হয়ে গেল। নাহিদ তখনও গভীর ভাবনায় মগ্ন। নিজের মধ্যে সে আজ অন্য এক সত্তাকে আবিষ্কার করেছে। সমস্ত জীবন ধরে নিজেকে আলাদা প্রমাণ করার যে গোপন গৌরব বা জেদ সে বয়ে বেড়িয়েছে তাতে আজ এক নির্মম ফাটল দেখা দিয়েছে। বুঝেছে, প্রত্যেক মানুষেরই কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। ছেলেবেলা থেকে নাহিদ এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে খেলেছে। কখনো অধঃপতনে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। নিজেকে রাস্তার কীটের কাছাকাছি এনে পরমুহূর্তেই তুলে নিয়েছে স্বউচ্চে। তারুণ্যের তপ্ত উন্মাদনায় নাহিদ একসময় ভেবেই নিয়েছিল এই পৃথিবীতে তার অজেয় কিছু নেই। চাইলেই উৎকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টের দলে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করতে পারে সে। আজ সেই গোপন গৌরব ভেঙে নাহিদের আনন্দ হলো নাকি দুঃখ বুঝা গেল না। তবে মানসিক ঝড়ের একটি ছাপ তার চেহারায় স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল।

রাণী রূপসী নারী। অপরাধের নিজস্ব কালো পৃথিবীতে তার রূপের দাম অনেক। অপরাধ জগতের উজির নাজির মাঝে মাঝেই তার কাছে প্রেমের দৈন্য নিয়ে আবির্ভূত হয়। নারী এমন এক মোহন সৃষ্টি যার কাছে পরাজিত হতে প্রস্তুত পৃথিবীর সমস্ত পাপী ও সাধু। নারী রূপের ইন্দ্রজালে বাঁধা পড়ে কত পুরুষ নিজেকে মেলে ধরে খোলা বইয়ের মতো। নাহিদের ভাবনায় ভুল ছিলো না। রাণী তেমনই এক নারী। যার কাছে আছে কিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন বইয়ের চাবি। নাহিদ নীরবে সেই চাবি পর্যন্ত পৌঁছাতে চেয়েছিল। রাণী যেমন কতগুলো বই গোপন করে রেখেছে নিজের বুকের ভেতর। নাহিদ তেমন ভাবেই রাণীর খুব কাছে গিয়ে তাকে পড়ার নামে ধীরে ধীরে পড়ে ফেলতে চেয়েছিল গোপন সব বই। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেল বিপত্তি। জেগে উঠল নাহিদের নীরব, ঘুমন্ত রুচিবোধ। যে রুচির বীজ বপন করা হয়েছিল নানাজানের ময়মনসিংহের বাড়ির হাওয়ায়, মেজাজে, সংস্কারে। নাহিদ প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল। আজকের পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও তার সুশীতল হাওয়ার ঝাপটায় একটা সুদৃঢ় ভাবনা অধিকার করে নিয়েছে তার মনোজগত। এই ভাবনা তার এতোদিনকার ভাবনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই ভাবনা তাকে শেখাতে চাইছে নিরপেক্ষতার আলো নিয়ে কেবল নিকৃষ্টের শেষ সীমানা পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা করলেই আলাদা হওয়া যায় না। পৃথিবী জয় করবার আরও একটি অস্ত্র আছে। 

—————

দাদাজানের তেতলা বাড়ির তেতলার বারান্দায় উদাসমুখে দাঁড়িয়ে আছে ইশতিয়াক। ঘড়িতে কেবল সন্ধ্যা পেরুলেও চারদিকে নিশুতি রাতের নীরবতা। আজকাল ইশতিয়াক স্থায়ীভাবেই গ্রামের বাড়িতে থাকছে। কিছুদিন হলো তার পোস্ট গ্রাজুয়েশন শেষ হয়েছে। আপাতত গ্রামের হাসপাতালে গাধার মতোন খাটতে হচ্ছে তাকে। দাদাজান গতকাল নোটিশ জারি করেছেন, তাকে দেশের বাইরে পড়তে যেতে হবে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি আরম্ভ করতে বলা হয়েছে। ইশতিয়াকের আর পড়াশোনার ইচ্ছে নেই। তার আসলে কোনো কিছুরই ইচ্ছা নেই। একা থাকতে থাকতে মানুষ একটা বয়সে এসে জীবনের প্রতি সমস্ত মাধুর্যতা হারিয়ে ফেলে সে সম্ভবত সেই বয়সেই আছে। ইশতিয়াক প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকাল। ঠিক তখনই বাড়ির অন্ধকার ফটকে এসে থামল একটি মোটরগাড়ি। গাড়ির শব্দে ভেতর বাড়ি থেকে ছুটে গেলেন মোহন চাচা। বিদ্যুতের হলদে বাতির নিচেও টর্চ জ্বেলে দাঁড়িয়ে রইলেন গাছের মতো। দাদাজান দৃপ্ত পায়ে গাড়ি থেকে নামলেন। আজ দুপুর দুই গ্রাম পেরিয়ে সপ্তগ্রামে এক বিচারসভায় নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন তিনি। আশেপাশের দশ গ্রামে যেকোনো বিয়ে, সালিশিতে দাদাজানের উপস্থিতি অপরিহার্যের মতো দরকারি। দাদাজান উপস্থিত থাকা মানেই সকল সমস্যার সমাধান। পারিবারিক কলহের নিষ্পত্তি। অথচ কেউ কি অনুমান করতে পারে? দাদাজানের নিজের পরিবারেই কত কলহ ডালপালা ছড়িয়ে রেখেছে চারদিকে। বাইরে থেকে সুষ্ঠু সুন্দর পরিবারটা দাদাজান কোন অদৃশ্য উপায়ে বেঁধে রেখেছেন ভেবে আশ্চর্য হয় ইশতিয়াক। আজকাল এই বাড়ির প্রতিটি ইটে ইটেও যেন বিরোধ টের পায় সে। এই টের পাওয়া কী তার একার? না তো! সেদিনের ইমতিও আজ তাকে জিজ্ঞেস করে বসল পরিচিত এক প্রশ্ন, 
‘ মৌপু মায়ের মতো দেখতে কেন ভাইয়া?’ 
ইমতি যে প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় না, সে যে আগেই উত্তরটা ধারণা করে নিয়েছে তা তার চোখের তারায় জ্বলজ্বল করছিল। অবশ্য এই বাড়ির সকলের কাছেই এই প্রশ্নের উত্তরটা এখন স্পষ্ট। 

এই বাড়িতে এমন আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর দাদাজানের বিচক্ষণতার জোড়ে নীরবে বালিচাপা দেওয়া গেলেও মৌনির ব্যাপারটা প্রাকৃতিকভাবেই দাদাজানের বলয় থেকে বেরিয়ে এসেছে নির্লজ্জভাবে। দাদাজানের সকল দান ভেস্তে দিয়ে বড় হতে হতে মৌনির চেহারায় আরও প্রবলভাবে ফুটে উঠছে মায়ের চেহারার প্রতিচ্ছবি। ইশতিয়াকের ঠিক মনে নেই। তখন সম্ভবত তার চার বছর বয়স। মা লন্ডনে গেলেন ডাক্তারি পড়া পড়তে। ইশতিয়াকের তখনও বোধশক্তি হয়নি। সাত-আট বছর বয়সে এসে সে বুঝল, তার মা মস্ত বড় ডাক্তার। বিদেশে আরও বড় ডাক্তার হতে গিয়েছেন। ইশতিয়াকের ডাক্তার মাকে দেখার খুব আগ্রহ হতো। সেই সময় দেশের বাইরে টেলিফোনে কথা বলার মতো ব্যবস্থা ছিল না। মা মাসে দুটো করে চিঠি পাঠাতেন বাবাকে। তার যে এক অথবা দুই লাইনে ইশতিয়াকের কথা থাকতো। বাবা সেটা তাকে পড়ে শোনাতেন। তারপর একদিন বাবাও গেলেন মায়ের কাছে। সঙ্গে চাচা আর চাচি। কেন তাদের ওই কৌতূহলের দেশে যাত্রা তখন বুঝতে পারেনি ইশতিয়াক। মাস দুয়েক পর বাবা আর চাচা ফিরে এলেন। ইশতিয়াক ভেবে নিলো, চাচিও বোধহয় ওখানে ডাক্তারি পড়া পড়বেন মায়ের সাথে। তার অনেকদিন পর ইশতিয়াক জানল, চাচির বাচ্চা হবে। বিদেশে হওয়া বাচ্চা নিশ্চয় বিদেশি বাচ্চা? ওরা ভাই-বোনরা খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল বিদেশি বাচ্চা দেখার জন্য। আরও কয়েক মাস পর চাচি বিদেশি বাচ্চা নিয়ে ফিরে এলেন। সাদা, ধবধবে পুতুলের মতো শিশু। এতো আদর! ইশতিয়াকের সারাদিন যখন ওই পুতুলের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে কাটতে লাগল তখনই খবর এলো বিদেশ বিভূঁইয়ে তার ডাক্তার মায়ের খুব অসুখ। ডাক্তারেরও আবার অসুখ হয় এই আশ্চর্য সত্যটা বিশ্বাস করে উঠার আগেই বাবা ফের গেলেন মায়ের কাছে। ফিরে এলেন কয়েক মাস পর। জানালেন মা সুস্থ আছেন। তার বছরখানেক পর মায়ের পড়া শেষ হলো। তিনি ফিরে এলেন দেশে। মানুষ যে এতো রূপবতী হতে পারে সেটা যেন মাকে দেখেই প্রথম জানল ইশতিয়াক। মা তাকে কাছে ডেকে খুব আদর করলেন। ইশতিয়াকের তখনও কী যে অস্বস্তি! অন্য মহিলা অন্য মহিলা ধরনের অস্বস্তি। মায়ের আদর পেয়ে লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারে না। ইশতিয়াকের মনে আছে, কী চমৎকার গান গাইতেন মা৷ এই চমৎকার গান গাওয়া মা আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার অসুস্থতা কমাতে চাচি মৌনিকে নিয়ে চলে গেলেন তার বাপের বাড়ি। ইশতিয়াক বুঝতে পারছিল না, মায়ের অসুখের সঙ্গে মৌনির কী সম্পর্ক? মৌনি কি অসুখ? ইশতিয়াকের বড় ভাই তখন ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। বুঝালেন, ওদের একটা বোন হওয়ার কথা ছিল। সে হওয়ার আগেই মারা গেছে তাই মায়ের মন খারাপ। মা সেই মন খারাপ কাটিয়ে উঠলেন বছর লাগিয়ে। তার মন খারাপ পুরোপুরি কাটাতে বছর সাতেক পর আবার মা অন্তঃসত্ত্বা হলেন। তাদের আরেকটা ভাই হলো। নাম রাখা হলো, ইমতিয়াজ। তখন ইশতিয়াকের সতেরো বছর বয়স। নতুন ছেলে পেয়ে মা খুশি হলেন কি-না বুঝা গেল না। তবে ইশতিয়াক এটা বুঝল, মৌনিকে তিনি পছন্দ করেন না৷ এমন পুতুলের মতো একটা মেয়ে, সারাদিন প্রজাপতির মতো উড়াউড়ি করে, ছলছলে চোখে তাকায় তাকে মায়ের কেন পছন্দ না ইশতিয়াকের বুঝে আসত না। তার কয়েক বছর পর, ইশতিয়াক হঠাৎ একদিন খেয়াল করলো, মৌনির চেহারার আদল কিছুটা তার মায়ের মতো।

অতীত ভেবে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে তারকাখচিত আকাশের দিকে তাকাল ইশতিয়াক। দাদাজানের অনেক কাজের তাৎপর্যই ধরতে পারে না সে। তিনি এইযে এই নাটকীয় একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। যার মধ্যে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে পড়েছে কয়েকটি জীবন। তার পেছনে কী ছিলো তার সত্যিকার অভিপ্রায়? কী চেয়েছিলেন তিনি? একই পরিবারের কয়েকটি মানুষকে একটি মানসিক অস্থিরতায় ফেলে কী লাভ হলো ওনার? কোথাও তো কোনো লাভ খুঁজে পায় না ইশতিয়াক। চারিদিকে কেবল ক্ষতির সমারোহ। বাবা যদিও এই ব্যাপারে নির্লিপ্ত। কিন্তু মায়ের পর্যাপ্ত ক্ষতি হয়েছে। চাচা-চাচির সম্পর্কের অসীম শীতলতা সকলের চোখ এড়িয়ে গেলেও ইশতিয়াকের চোখ এড়াতে পারেনি। সবচাইতে ক্ষতি হয়েছে মৌনির। ইশতিয়াক ছোট্ট শ্বাস ফেলল। এদের মধ্যে থেকে কার ভালো করতে চেয়েছিলেন দাদাজান? কার সুখের হিসেব করতে গিয়ে উল্টে গিয়েছে গণনা? নাকি এটা কেবলই প্রকৃতির এক ছলাকলা? দাদাজান যে বিশেষ কেউ নন। তিনিও মানুষ, তারও ভুল হতে পারে তারই একটি নজির? নাকি এসব কেবলই দাদাজানের একটি খেলা? যে খেলায় তারা সকলেই একেকটি গুটি। 
কে জানে, কী হবে এই খেলার সমাপ্তি! 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp