মেঘবন - পর্ব ২৮ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          চিলেকোঠার ছোটখাটো আয়নায় নিজেকে আপাদমস্তক তীক্ষ্ণ নয়নে পরখ করছে তারফান। তাকে দেখে তথাকথিত বিয়ের বর মোটেও লাগছে না। শেরওয়ানির বদলে সফেদ পাঞ্জাবি পরেছে সে। বুকের প্রথম দুটো বোতাম খোলা। স্পষ্ট শুভ্র ত্বক। চুল তখনো ভেঁজা, এলোমেলো। কাঁধের অংশটুকু অল্প ভিঁজে গেছে। তোয়ালে দিয়ে মাথার একপাশ মোছার সময় ক্যাচক্যাচ শব্দে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো তালহা। একপলক গম্ভীর দৃষ্টে চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘মাকে কি সত্যি নিয়ে যাবি না বিয়েতে?’

তারফান তালহার দিকে তাকালো না। একবাক্যে উত্তর দিলো, ‘না।’

দীর্ঘশ্বাস ফেললো তালহা। টেবিলের ওপর কিছু কাগজ অযত্নে পড়ে আছে। সেগুলো হাতে নিয়ে বললো, ‘আমাদের পক্ষ থেকে কেবল আমি, তামজিদ, ইখতিয়ার আর তুই যাচ্ছি।’

পাঞ্জাবির হাতা কনুই অব্দি গোটাতে গোটাতে তারফান বললো, ‘বিয়ের আগে ওদের জানানো হয়েছিল আমাদের কেউ নেই। ওরা খোঁজখবর নিয়ে বিয়েতে রাজি হয়েছে।’

‘যদি না হতো? এমন ছেলেদের মেয়ের বাপেরা মেয়ে দিতে চায় না। তোকে যে কিভাবে দিলো!’

একমুহূর্তের জন্য মনে হলো, আয়নার মধ্য দিয়ে তালহার দিকে তাকানো তারফানের কঠোর চোখজোড়া দুর্নিরীক্ষ্য হেসেছে, তাচ্ছিল্য করেছে। ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়ে তারফান সেভাবেই বললো, ‘এমনি এমনি তো আর মেরিনের বাপ-মাকে পটাইনি।’

হু? মানে? তালহা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকায়। পলক পড়ছে না। বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে গেছে, ‘কখন করলি? তারফান, মেরিনকে তুই কখন থেকে প্ল্যানে ঢুকিয়েছিস? ভালোবাসিস ওকে?’

তারফান উত্তর দেয় না। পারফিউম লাগাতে গিয়ে হাত থমকে যায়। কখন? কখন? কখন! মনে পড়ছে না। কেবল প্রতিশোধের নেশায় সে অন্ধ হয়ে গেছে৷। ভালোবাসা? মেরিনকে সে ভালোবাসে। অস্বীকার করবে না। একবার তাকালে চোখ ফেরানো দায় হয়ে যায়। বুকে কষ্ট চিড়ে খায়। কুৎসিত গলায় ফিসফিসিয়ে বলে, ‘মেরিনকে ছেড়ে যেতে দিস না, তারফান। নিজের দু:খে ওকেও বিলিয়ে দেয়। আকড়ে ধর।’

অথচ তারফান প্রথমে বুকপোড়া মনের কথা শুনতে চায়নি। মেরিনকে কষ্ট দিতে চায়নি। বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিল। কিন্তু…।
তারফান নিরেট গলায় বললো, ‘হায়দারের পতনের সবচে’ সহজ মাধ্যম মেরিন। আমি হাত ছাড়া করতে চাইনি।’

তালহা আশ্চর্য হয়। কপাল কুঁচকে ভীষণ ঘৃণা নিয়ে তাকায় তারফানের দিকে, ‘তুই এতটা হিপোক্রেট হয়ে গেছিস তারফান! এতটা সাইকো হয়ে গেছিস!’

তারফান গাঢ় গলায় বললো, ‘প্রথম প্রথম তোরাও মেরিনকে প্ল্যানে আনতে চেয়েছিলি।’

‘চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন আমরা মেরিনকে চিনতাম না। তুইও মানা করেছিলি। হঠাৎ করে, মেয়েটাকে ভালোবেসে, এতটা কাছ থেকে চিনে তুই ওই ছোট্ট, কোমল হৃদয় ভেঙ্গে দিবি? ওর কথা বাদ দে। তোর কষ্ট হবে না?’

নিশ্চুপ তারফান আয়নায় আবারও তাকালো। সরাসরি চোখের দিকে। শিরাগুলোতে রক্ত জমেছে। জ্বলছে। অথচ চোয়াল শক্ত। দৃষ্টি দৃঢ়। অর্থাৎ, যা কিছু হয়ে যাক। সে পিছু সড়ছে না। অনেকটা দেড়ি হয়ে গেছে।
তালহা ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো। পরাজয় মেনে নিয়ে ম্লান গলায় বললো, ‘ইখতিয়ার আর তামজিদ গাড়িতে অপেক্ষা করছে। চল, এমনিতেও দেড়ি হয়ে গেছে। মায়ের সঙ্গে একবার দেখা করে যেতে হবে। দুআ নিবি না?’

অনেক্ষণ চুপ থেকে তারফান আস্তে করে উত্তর দিলো, ‘নিবো।’

বড় চাচার বিশাল বাড়িতে ভীষণ স্বাচ্ছন্দ্যে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। তেমন জাঁকজমক নয়, তবে সুন্দর। স্বপ্নের মতো ঘোলাটে। তারফানের আগমনে ঘোলা ভাবটা উবে গিয়ে ব্যস্ততা যেন আরও খানিকটা বেড়ে গেল। এবার ছোট ছেলেপেলেরাও হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে। লোহার মূখ্য গেটে তাদের দমবন্ধ ভীড়। লাল রিবন দিয়ে যেন একটা অদৃশ্য অবরোধ তৈরি করেছে তারা। সামনের কাঠের টেবিলের ওপর মিষ্টি, শরবত। রীতি মতে এই শরবত গুলোর একটিতে মরিচ মেশানো আছে। বা'দিকের ট্যাং শরবতটা অন্যরকম লাগছে। তারফান চট করে পাশের গ্লাস নিয়ে একঢোকে পুরো শরবত খেয়ে নিলো। মুহূর্তেই যেন একটা হতাশ অভিযোগে মুখ লটকে গেল কনেপক্ষের। তাহসিন অবশ্য এসবে নেই। মা বলেছেন বলেই সে বাকিদের সাথে এখানে দাঁড়িয়ে আছে। কপাল কুঁচকে প্রত্যেকটা ডিটেইলস্ মুখস্ত করছে। কলি-মিলিও তাই। তবে তাদের ভালো লাগছে ব্যাপারগুলো। বাঙালি বিয়ে এত রঙিন!
ঝিঁকিমিকি জামা পরা একটা মেয়ে অচিরেই চেঁচিয়ে বললো, ‘দুলাভাই, মিষ্টিও খান।’

‘আমি মিষ্টি খাই না।’
গম্ভীর কণ্ঠ। অথচ বিনয়ী। কেউ আর দিরুক্তি করতে পারলো না। বরং নতুন করে এবার বায়নার সুরে বললো, ‘টাকা না দিলে কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারবেন না। বিয়ে করতে চাইলে দুলাভাইকে আগে টাকা দিতে হবে।’

তামজিদ বিরক্ত গলায় প্রশ্ন করলো, ‘কত টাকা?’

‘বিশ হাজার দেন। কমই চাইলাম।’

‘বিশ হাজার! জীবনে চোখে দেখেছো বিশ হাজার?’ চোখ-মুখ কুঁচকে কথাটা বলে তালহা আর ইখতিয়ারের দিকে আরক্ত চোখে তাকালো সে। যার অর্থ, ‘এ কেমন সার্কাস?’
তারা উত্তর দিতে পারে না। মিটিমিটি হাসে। মেয়েটা রেগে গিয়ে বলে, ‘দেখিনি কে বলেছে? আলবাদ দেখেছি! আপনারা গরিব সেটা বলুন। টাকা পয়সা না এনে বিয়ে করতে এসেছেন কেন?’

তামজিদ আবারও কিছু বলতে নিচ্ছিলো, তারফান থামিয়ে দিলো। তার স্থির দৃষ্টি ওইতো, অদূরের জরাজীর্ণ দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীটির ওপর। বারান্দার ওদিকটায় চুপি চুপি দাঁড়িয়ে আছে সে। লুকোচ্ছে। অথচ তারফান যে দেখে নিয়েছে, এখন?
তপ্ত, অশান্ত বুকে টুপ করে জেগে ওঠা ঝড় সামলে উঠতে পারলো না তারফান। ঢোক গিলে শুকিয়ে যাওয়া গলা ভেঁজালো। মেরিন ততক্ষণে হারিয়ে গেছে। পর্দার আড়াল কেবল ফাঁকা, নিঃস্ব। তবুও নির্নিমেষ ঘিয়ে রঙা পর্দার দাপুটে উড়োউড়ি দেখতে দেখতে তারফান ধীর গলায় বললো, ‘ওরা যা চায় দিয়ে দে, তামজিদ।’

—————

মৃদু, ভীষণ মৃদু গানের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তা তা তা! তারাআরা! কারো ফোনে বাজছে বোধহয়। মেরিন একটু একটু শ্বাস ফেলছে। পলক ফেলে বিস্ময় নিয়ে সবটুকু দেখতে গিয়ে হারিয়ে ফেলছে, সত্যিই কি আজ তারফান আর তার বিয়ে? কি অভাবনীয় ব্যাপার! মেরিন কখনো কল্পনা করেছিল কি? করেনি। এই লোককে সে দু’চোখে দেখতে পারতো না। এরপর ছোট ছোট যত্নে এমনতর তাকে ভুলিয়েভালিয়ে নিলো! মেরিন ঠোঁট চেপে হাসলো। খুশি খুশি, প্রাণবন্ত হাসি। তারফানের দিকে তাকাতেই দেখলো, তার খেয়াল এদিকে নেই। সে অদূরে থাকা বড় চাচার দিকে চেয়ে আছে। ক্ষুব্ধ চোখ, তীক্ষ্ণ, স্পষ্ট। তার দেখাদেখি মেরিনও এবার তাকালো। বড় চাচা কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বলছেন। গরমে শরীর ঘেমে গেছে। কি নিয়ে যেন বিরক্ত হচ্ছেন খুব। ননী সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনছেন।
মেরিন হঠাৎ প্রশ্ন করলো, ‘বড় চাচার সঙ্গে কথা হয়েছে আপনার?’

তারফান এবারও মেরিনের দিকে তাকালো না। থমথমে গলায় উত্তর দিলো, ‘হয়েছে।’

‘কি কথা বললেন? জানেন, বিয়ের কথা হবার পর থেকেই চাচা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিলেন। হুট করে যখন আংটি পড়াতে এলেন? তখনো তো আসতে পারেননি। দিনাজপুর বেড়াতে গিয়েছিলেন বড় চাচির ভাইয়ের বাড়িতে।’

তারফান উত্তর দিলো না। শুনে গেল। বিতৃষ্ণায় তার জিভ ভার হয়ে গেছে। হাত বাড়িয়ে আচমকাই মেরিনের বাম হাত শক্ত করে মুঠোয় নিলো। মিইয়ে গেল মেরিন। লুকানো গলায় বললো, ‘কি করছেন? কেউ দেখে ফেললে?’

‘মেরিন, তোমাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।’ রাখঢাকহীন কথা। মেরিন দু'তিনবার পলক ফেললো, ‘জি? এইজন্য তাকাচ্ছেন না আমার দিকে?’

তারফান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারলো না। আড়চোখে, চোরা চোখদুটো একপলক মেরিনের দিকে তাকাতেই নমনীয় হয়ে উঠলো। কোমলতা ভর করলো। ফিসফিসিয়ে, গভীর স্বরে বললো, ‘My love, you're looking so damn beautiful that I'm just losing my mind to you. You're perfect. Gorgeous, like stars flickering in the dark— making even the terrifying depths of the sky look breathtaking.’

তারফান বুঝি এভাবেও কথা বলতে পারে? কণ্ঠে মাদক মিশিয়ে? মেরিনের এলোমেলো দৃষ্টি অযথাই আশপাশে ঘুরলো। লজ্জায় গাল গরম হলো। চোখ গিয়ে আটকালো, ওই পুরুষালি ক্ষ তয় মোড়ানো হাতটির ওপর। তাকে শক্ত করে মোলায়েম বাঁধনে ধরে রাখা বলিষ্ঠ হাত। অনামিকা আঙুলে রুপালি সরল আংটি চোখে বিঁধছে। জানান দিচ্ছে, তারফান তার। শুধুই তার। 

রাস্তায় জ্যাম থাকায় কাজির আসতে একটু দেড়ি হলো। কাগজ-পত্র গুঁজিয়ে তিনি স্টেজের উলটো পাশে চেয়ার নিয়ে বসলেন। চোখে নিরেট ভদ্রলোকের মতোন চশমা। গালে সুন্নতি দাঁড়ি। নুরানী চেহারা। খুঁকখুঁক করে কেঁশে গলা পরিষ্কার করলেন তিনি। তারফানের দিকে একপলক তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার বাপের নামটা বলো বাবা।’

তারফান একবার ভীড় ঠেলে ইখতিয়ারকে খুঁজল। নেই। কেয়ারটেকারকে নিয়ে কোথায় যেন গিয়েছে সে। তামজিদ, তালহাকেও দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘আমার বাবা নেই। মা আছেন। রজনী রতন।’

ননী সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু ভাবির নাম না রজনী হায়দার?’

‘আসল নাম রজনী রতন। আমার নানার নাম রতন।’

মনে হাজারটা প্রশ্ন জাগলো ননী সাহেবের। তবে তা এমুহূর্তে গিলে নিলেন। যতটুকু তিনি জানেন, রজনী হায়দারের বাবার বাড়ি বলতে কেউ এখন আর বেঁচে নেই। তিনি তার বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন। দশ বছর আগে বাবা-মা দু'জনই পরপর মা রা গিয়েছিলেন। খোঁজ নিয়েছিলেন তিনি। তবে তারফানের দাদা বাড়ির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তারফানকে জিজ্ঞেস করলে সে খুব ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলেছিল, ‘বাবা আমাদের রেখে অন্য একজনকে বিয়ে করেছিলেন। মা তারপর থেকে যোগাযোগ রাখেননি। কেবল নামটাই রেখেছেন।’

ননী সাহেবের মায়া জেগেছিল তখন। ছেলে ভালো। ভালো চাকরি করে, চরিত্রে খুঁত নেই। দেখা হলে সালাম দেয়, খোঁজ রাখে। তারওপর টিউলিপ আক্তারও চাইছিলেন রজনী হায়দারের তিন ছেলের মধ্যে কারো না কারো সাথে মেরিনের বিয়ে দিতে। ননী সাহেব অনেক ভেবেছেন। একমুহূর্ত তার ভাবনা এসেছিল, বাহিরের জগত না চেনা তার মেয়ে তারফানকে বিয়ে করলে তার চোখের কাছেই থাকবে। দূরে যাবে না। 

কাজি খঁচখঁচ শব্দে কাগজে কালো কালির দাগ টানলেন। এরপর গম্ভীর, বিচক্ষণ গলায় কাগজ দেখে দেখে বললেন, ‘আমি, মেরিন খন্দকারের নিকট তারফান ওয়াহাজকে দুই লাখ টাকা নগদ ও আট লাখ টাকা বাকী দেনমোহরের বিনিময়ে সাক্ষীগণের উপস্থিতিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রস্তাব করছি। আপনি কি তাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করলেন?’

মেরিন অনুভব করলো, তার শরীর কাঁপছে। অস্বাভাবিক ভাবে বুকে ধড়ফড় আওয়াজ হচ্ছে। জিহ্বায় অসহনীয় ভার। একবার মায়ের দিকে তাকালো মেরিন। তিনি মুখ চেপে কান্না করছেন। বাবার দিকে তাকালো। ননী সাহেব শক্ত অথচ জল টইটম্বুর নয়নে চেয়ে আছেন। মেরিন ঘন ঘন শ্বাস ফেললো। তারফান সেই অনেক আগে মেরিনের হাত ছেড়ে দিয়েছে। মেরিন এবার তার কোমড়ের পাঞ্জাবিটুকু ভরসা ভেবে আঙুলে টেনে ধরলো। বড় চাচা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেরিনের মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘বল মা। ভয় পাস না। আমরা আছি না?’

বলতে বলতে কণ্ঠ রোধ হয়ে এলো তারও। মেরিন চোখ বুজলো, দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে চোখ খুললো। মনে সাহস সঞ্চার করলো যেন। তার পুরোটা জীবন ফুল বিদ্বেষী তারফান ওয়াহাজের নামে লিখে দিয়ে বললো, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি কবুল করলাম।’

কাজি তারপর তারফানকে একই কথা বলতেই তারফান আর দেড়ি করেনি। এক নিশ্বাসে বলেছে, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি কবুল করলাম। করেছি।’

পরের সময়টা দ্রুত কাটলো বোধয়। মোনাজাত শেষে মিষ্টি, খেজুর দেওয়া হলো সবাইকে। মেরিন তখনো কাঁপছিল। খুশি, উত্তেজনা, আনন্দ, কষ্ট— সব কিছুর মিলমিশ। আস্তে করে তারফানকে বললো, ‘শুনুন, আপনি আমার হাতটা একটু ধরুন না!’

তারফান বারবার হাত ঘড়ি দেখছে। মেরিন ডাকতেই অন্যমনস্ক গলায় জবাব দিলো, ‘হু?’

‘তখনের মতো আমার হাতটা ধরবেন?’
তারফান ধরলো। আগের চেয়েও গভীর ভাবে। অন্য হাতে তখনো সতেজ খেজুর মুঠোয় পুড়ে রাখা। তা দেখে মেরিন প্রশ্ন করলো, ‘খেজুর খাননি কেন? বিয়ের পর মিষ্টি খেতে হয়।’

তারফান উদাসীন গলায় উত্তর দিলো, ‘খাবো।’

অথচ তারফান খেলো না। কিসের যেন অপেক্ষা করতে লাগলো। এক মিনিট, দুই মিনিট, দশ মিনিট! হুট করে হাসোজ্জল পরিবেশ পালটে গেছে। একটা গুমোট চিৎকার-চেঁচামেচি কানে আসছে। গাড়ির তীব্র হর্ণের আওয়াজ, পদধ্বনি। কে যেন চিৎকার দিয়ে বললো, ‘পুলিশ! পুলিশ এসেছে!’

এরপরই পুলিশের একদল লোক বিয়ের মজলিসে বিনা আমন্ত্রণে হাজির হলো। ভরাট, গম্ভীর গলায় দাবি জানালো, ‘এখানে স্বপন হায়দার কে আছেন? উনার নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে।’

বড় চাচা কপালে ভাঁজ ফেলে এগিয়ে এলেন। দুশ্চিন্তায় তার মুখ শুকিয়ে গেছে। হতবিহ্বল গলায় বললেন, ‘মানে? কিসের জন্য?’

‘ইমন তালুকদারকে তো চিনেন? দেশের বড় ধরণের চোর। তার সঙ্গী সে। একাধিক মিথ্যা বিয়ের অভিযোগও আছে।’

কেয়ারটেকার স্বপন হায়দারের স্ত্রী দ্রুত ছেলের কানে হাত চাপা দিলেন। শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার কান্না এলো না। তিনি জানতেন, একদিন এসব হওয়ারই ছিল। কঠিন স্বরে বললেন, ‘আমি তাকে বাড়ির ভেতর ঢুকতে দেখেছিলাম।’

পুলিশের তিনজন এবার বাড়ির ভেতর গিয়ে খুঁজতেই উপরের একটা ঘরে স্বপনকে বাথরুমের ভেতর পেল। বাথরুমের দরজা বাহির থেকে লাগানো ছিল। স্বপন তাই চাইলেও পালাতে পারেনি। 
কাউন্টারে বসে জ্যুস খেতে খেতে ইখতিয়ার কপালের ঘাম মুছে বললো, ‘এমপি হয়েও কত কি যে করতে হয়!’

তালহা শব্দ করে হাসতে গিয়েও থেমে গেল। তার খুশি সীমা মানছে না। ফিসফিসিয়ে বললো, ‘ব্যাটা আমাদেরকে চিনে ফেলেছিল। তামজিদ না দেখলে পেছনের দরজা দিয়ে ভেগে যেত। শালা কু ত্তারবাচ্চা!’

‘শালা এত ভালো গালি ডিজার্ভ করে না। আরেকটু ডার্ক গালি দে, তালহা।’৷তালহা দেওয়ার পূর্বেই এবারের গালিটা তামজিদ দিলো। স্বপনকে টেনে হিঁচড়ে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে। শোক শোক মাহল। তামজিদ সেদিক থেকে নজর সরিয়ে মেরিনের দিকে তাকালো। বউ সাজে সুন্দর লাগছে। আতঙ্কিত নয়নে বারবার তারফানের দিকে তাকাচ্ছে মেয়েটা। তামজিদ বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারলো না। মাটির ময়লা মাখানো মেঝেতে একমনে তাকিয়ে খুব আস্তে করে আওড়ালো, ‘তালহা… মেরিনের বিয়ে হয়ে গেছে।’

সাদা সাদা মেঘমাদুরে একটু কালো মেঘের আর্তনাদ যেন। আফসোস, হতাশা। মেরিন কি জানে সেসব? জানে না। জানবে না। অতর্কিত চোখদুটো কেবল তারফানকে দেখছে। আশ্চর্য হচ্ছে। লোকটা বিয়ের পর এইটুকু হাসেনি। খেজুর খায়নি। অথচ এখন তার পুরু ঠোঁটে এত গাঢ় একটা টান! প্রশান্তি! স্বপনের টানাহেঁচড়া দেখতে দেখতে মুখে খেজুর নিতেই মেরিন থমকে গেল। একে একে সবকিছু স্বচ্ছ কাঁচের ন্যায় চোখের পর্দায় ধরা দিলো। নিশ্বাস আটকে প্রশ্ন জাগলো, ‘তারফান, আপনি আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন তো?’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp