বাড়ির গিন্নির মতো কোমরে ওড়নার আঁচল গুঁজে রান্নাবান্না করছে পদ্মজা। হেমলতার কোমরে ব্যথা। তিনি রান্না করতে চাইলেও পদ্মজা রাঁধতে দিল না। মোর্শেদও বললেন, ‘বেদনা লইয়া রান্ধা লাগব না। তোমার মাইয়া যহন রানতে পারে তে হেই রান্ধক।’
শেষ অবধি হেমলতা হার মানলেন। পদ্মজা মাটির চুলায় মুরগি গোশত রান্না করছে। খড়ি বা লাকড়ি হিসেবে আছে বাঁশের মুড়ো। আগুনের শিখার রং নীলচে। শীতের মাঝে রান্নার করার শান্তি আলাদা। মুরগি গোশত রান্না হওয়ার কারণ—আজ এতিম-মিসকিন খাওয়ানো হবে। হেমলতা বলেন, সামর্থ্য থাকলে মাসে একবার হলেও এতিম-মিসকিনদের খাওয়ানো উচিত, নয়তো ঘরে রহমত থাকে না। রান্না শেষ করে পদ্মজা হেমলতার কাছে এলো। বলল, ‘আম্মা রান্না শেষ।’
হেমলতা দৌর্বল্যমাখা কণ্ঠে বললেন, ‘তোর আব্বারে গিয়ে বল—আলী, মুমিন, আর ময়নাকে নিয়ে আসতে।’
পদ্মজা কিছু না বলে মাথা নিচু করে ফেলল। মোর্শেদের সঙ্গে আগবাড়িয়ে কথা বলতে তার ভয় হয়। অনেকদিন বাজে ব্যবহার করেন না। হুট করে যদি করে ফেলেন তো খুব কষ্ট হবে। হেমলতা মৃদু হাসলেন। বললেন, ‘কিছু বলবে না। যা তুই।’
পদ্মজা ধীর কণ্ঠে বলল, ‘সত্যি যাব?’
হেমলতা সামনে-পেছনে মাথা ঝাকিয়ে ইঙ্গিত করলেন যেতে। পদ্মজা মোর্শেদকে উঠানেই পেল, চেয়ারে বসে রোদ পোহাচ্ছেন। পদ্মজা গুটিগুটি পায়ে হেঁটে গেল। আব্বা ডাকতে গিয়ে গলা ধরে আসছে তার। ঢোক গিলে ডাকল, ‘আব্বা?’
মোর্শেদ ঘাড় ঘুরাতেই পদ্মজার মনে হলো বুকে কিছু ধপাস করে পড়ল। পদ্মজা দৃষ্টি অস্থির রেখে মিনমিনে গলায় বলল, ‘আম্মা বলেছে আলীদের নিয়ে আসতে।’
‘রান্ধন শেষ?’
‘জি, আব্বা।’
মোর্শেদ গলায় গামছা বেঁধে বেরিয়ে যান। পদ্মজা মোর্শেদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকল বেশ কিছুক্ষণ। অনুভূতিগুলো থমকে গেছে, ঝাপসা হয়ে আসছে পদ্মজার চোখ দুটো। অল্পতেই তার কান্না চলে আসে। সে তাড়াতাড়ি ডান হাতের উলটো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছল। গাছ থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ আসছে। পদ্মজা সেদিকে তাকাল। তখনি হেমলতা ডাকলেন, ‘পদ্ম।’
পদ্মজা ছুটে যায়, ‘কিছু লাগবে আম্মা?’
‘না। পূর্ণারা কোথায় গেল?
‘ঘাটে।’
‘কী করে?’
‘মাছ ধরে।’
‘বড়শি দিয়ে?’
‘জালি দিয়ে।’
‘এত বড়ো মেয়ে নদীতে নেমে জাল দিয়ে মাছ ধরে!’ কী মনে করে যেন আবার মেনে নিলেন, ‘আচ্ছা, থাক। তুই আয়। বস আমার পাশে।’
পদ্মজা হেমলতার পায়ের কাছে বসে পায়ে হাত দিল টিপে দেওয়ার জন্য। হেমলতা পা সরিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘লাগবে না।’ শাড়ির আঁচল দিয়ে পদ্মজার কপালের ঘাম মুছে দিয়ে বললেন, ‘কোমরের ব্যথাটা কমেছে চিন্তা করিস না। তোর আব্বা কিছু বলেছে?’
‘না, আম্মা। আচ্ছা আম্মা, আব্বা এত পালটাল কীভাবে?’ পদ্মজা নিজের আগ্রহ দমে রাখতে পারল না।
হেমলতা মৃদু হাসলেন। উদাস হয়ে টিনের দেয়ালে তাকিয়ে বললেন, ‘শুনেছিলাম তোর বাপ ভালো মানুষ। কিন্তু বিয়ের পর তার ভালোমানুষি ভুলেও দেখিনি। কারণ, তার কানে-মগজে মন্ত্র দেয়ার মানুষ ছিল। অন্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন আর কেউ নিয়ন্ত্রণ করে না তাই পালটাচ্ছে। তোর বাপের ব্যক্তিত্ব নেই। নিজস্ব স্বকীয়তা নাই। অন্যের কথায় নাচে ভালো।’
শেষ কথাটা হেমলতা হেসে বললেন। পদ্মজা কিছু বলল না। হেমলতা শুয়ে পড়লেন। আজ সারাদিন বিশ্রাম নিবেন। আগামীকাল অনেক কাজ। অনেকগুলো কাপড় জমেছে।
‘রূপ ক্ষণিকের, গুণ চিরস্থায়ী। এটা আব্বা শেষ বয়েসে এসে বুঝেছে।’
পদ্মজার শীতল কণ্ঠ এবং কথার তিরে হেমলতা ভীষণভাবে বিস্মিত হলেন। তিনি সেকেন্ড কয়েক কথা বলতে পারলেন না। পদ্মজা চলে যাওয়ার জন্য উঠতেই, হেমলতা অবিশ্বাস্য স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘এই খবর তুই কোথায় পেলি?’
পদ্মজা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘আমি তো তোমারই মেয়ে, আম্মা। তোমার এত বড়ো দুঃখ আমি জানব না?’
পদ্মজা চলে গেল। পেছনে রেখে গেল হেমলতার অবিশ্বাস্য চাহনি।
—————
বিকেলবেলা হেমলতা ঘর থেকে বের হলেন। শরীরে কিছুটা আরাম এসেছে। পূর্ণা বরই ভর্তা করছে, পাশে প্রেমা। পদ্মজাকে দেখা গেল না। নিশ্চয়ই ঘাটে বসে আছে। প্রান্তও তো নেই।
তিনি পূর্ণাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘প্রান্ত কোথায়?’
পূর্ণা কয়েক সেকেন্ড ভাবল কী উত্তর দিবে। এরপর ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, ‘জানি না, আম্মা।’
‘জানিস না কী?’ তিনি এবার প্রেমাকে ধরলেন, ‘প্রান্ত কোথায় রে প্রেমা?’ প্রেমা সহজ স্বরে বলল, ‘আমরা সবাই ঘাটে ছিলাম। প্রান্ত উঠানে ছিল। এরপর এসে দেখি নেই।’
হেমলতা গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘কোন মুখে বলছিস জানি না? একসঙ্গে নিয়ে থাকতে পারিস না। একা ছাড়িস কেন? কোথায় গেছে ছেলেটা।’
হেমলতার ধমক ঘাট অবধি পৌঁছে যায়। পদ্মজা বাড়ির পেছন থেকে ছুটে এসে প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে আম্মা?’
‘প্রান্ত বাড়ি নেই সেটা আমাকে কেউ বলল না! দেখ দুটোকে, বসে বসে বরই ভর্তা গিলছে। দিন দিন অবাধ্য হচ্ছে মেয়েগুলো।’
পূর্ণা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। প্রেমা হেমলতার ধমকে ভয় পাচ্ছে, কিন্তু অতটা না। হেমলতার মন কু গাইছে।
তিনি নিজ ঘরে যেতে যেতে পদ্মজাকে বললেন, ‘বের হচ্ছি আমি। সাবধানে থাকবি।
তখন দুজন লোক প্রান্তকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকল। প্রান্তর কপাল বেয়ে রক্ত ঝরছে। পদ্মজা উদগ্রীব হয়ে হেমলতাকে ডাকল, ‘আম্মা।’ এরপর দৌড়ে গেল উঠানে। প্রান্ত কাঁদছে। হেমলতা ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে আসেন। প্রান্তকে আহত অবস্থায় দেখে ভড়কে যান। বুকটা হাহাকার করে উঠে তার। ছুটে গিয়ে প্রান্তকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে লোক দুটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার ছেলের কী হয়েছে?’
একজন লোক বলল, ‘পলাশ মিয়ার ছেড়ার লগে মাইর লাগছিল। হেই ছেড়ায় পাথথর দিয়া ইডা মারছে কপালে আর ফাইট্টা গেছে।’
মোর্শেদ লাহাড়ি ঘরের সামনে গাছ কাটছিলেন। চেঁচামেচি শুনে চলে আসেন। প্রান্তকে এমতাবস্থায় দেখে লোক দুটিকে তেজ নিয়ে বললেন, ‘কোন কুত্তার বাচ্চায় আমার ছেড়ারে মারছে? কোন বান্দির ছেড়ার এত বড়ো সাহস?’
মোর্শেদ উত্তরের অপেক্ষা করলেন না। প্রান্তকে নিয়ে ছুটে চলে যান বাজারে। হেমলতা রয়ে গেলেন বাড়িতে। বাজারে আজ হাট বসেছে। মোর্শেদ হেমলতাকে নিষেধ করেছেন সঙ্গে যেতে। বাড়িতে থেকে হেমলতা হাঁসফাঁস করছেন। প্রান্ত একা বড়ো হয়েছে। কতবার কতরকম আঘাত পেয়েছে, দেখার কেউ ছিল না; সবসময় মিনমিনিয়ে কেঁদেছে। এমন বাচ্চা ছেলের এত বড়ো আঘাত পেয়ে চেঁচিয়ে কাঁদার কথা। কষ্ট তো আর কম পায়নি! দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছে। হেমলতার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। পদ্মজা ঘরে লুকিয়ে কাঁদছে। পূর্ণা-প্রেমা বাড়ির বাইরে বার বার উঁকি দিয়ে দেখছে, তাদের আব্বা প্রান্তকে নিয়ে ফিরল কি না!
—————
দেখতে দেখতে চলে এসেছে মেট্রিক পরীক্ষা। কেন্দ্র শহরে, যেতে লাগে ছয় ঘণ্টা। বাড়িতে থেকে পরীক্ষা দেয়া সম্ভব না। এদিকে কেন্দ্রের পাশেই মোর্শেদের মামা বাড়ি; মামা নেই, তবে মামাতো ভাইয়েরা আছে। কথাবার্তা বলে সেখানেই দেড় মাসের জন্য হেমলতা আর পদ্মজা উঠল। মোর্শেদ বাকি দুই মেয়ে আর প্রান্তকে নিয়ে বাড়িতে রয়ে গেছেন। হেমলতা পদ্মজাকে নিয়ে আসার পূর্বে নিজে এসে দেখে গেছেন, পরিবেশ কেমন। মোর্শেদের দুই মামাতো ভাইয়ের মধ্যে একজন রাজধানীতে থাকে। আরেকজনের বয়স হয়েছে অনেক। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়ে বউ নিয়ে একাই থাকেন। ছেলেরা শহরে চাকরি করে। পদ্মজার জন্য উপযুক্ত স্থান। তাই আর অমত করলেন না।
মোর্শেদের যে ভাইটি বাড়িতে আছেন তার নাম—আকবর হোসেন। বয়স ষাটের বেশি হবে। তবে আকবর হোসেনের স্ত্রী জয়নবের বয়স খুব কম, হেমলতার বয়সি। হেমলতা আকবর হোসেনকে ভাইজান বলে সম্বোধন করেন। দালান বাড়ি, বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে। ফলে পদ্মজা মন দিয়ে পড়তে পারছে। পরীক্ষাও ভালো করে দিচ্ছে।
হেমলতা অবশ্য আকবর হোসেনকে চোখে চোখে রেখেছেন। শীতল প্রকৃতির লোক, তবে বিশ্বাসী। রাতের খাবার আকবর হোসেনের সঙ্গেই খেতে হয়। হেমলতা দেড় মাসের খাওয়ার খরচ নিয়ে এসেছেন। আকবর হোসেন কিছুতেই আলাদা রাঁধতে দিচ্ছেন না। এভাবে অন্যের বোঝা হয়ে থাকতে হেমলতার আত্মসম্মানে লাগে। তিনি কথায় কথায় জানতে পারলেন, আকবর হোসেন এবং জয়নবের নকশিকাঁথা খুব পছন্দ। তাই তিনি কিছুদিন যাবৎ নকশিকাঁথা সেলাই করছেন। যতক্ষণ পদ্মজা পরীক্ষা দেয়, ততক্ষণ হেমলতা কেন্দ্রের বাইরে কোথাও বসে বা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন।
অনেক রাত অবধি পদ্মজা পড়ে, আজ অনেকক্ষণ ধরে কী যেন ভাবছে। হেমলতা ব্যাপারটা খেয়াল করে পদ্মজার পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ভাবছিস?’
পদ্মজা এক নজর হেমলতাকে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো। হেমলতা তাকিয়ে রইলেন জানার জন্য। পদ্মজা দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘রাগ করবে না তো?’
হেমলতা পদ্মজাকে পরখ করে নিলেন। বললেন, ‘কী জানতে চাস?’
পদ্মজা এদিক-ওদিক চোখ বুলায়। কীভাবে শুরু করবে বুঝে উঠতে পারছে না। দুই মিনিট পর নীরবতা ভেঙে বলল, ‘দুপুর থেকে আমার খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, হানিফ মামাকে কে মারল? তোমার সঙ্গে মামার কী কথা হয়েছিল? হানিফ মামাকে… মানে তুমি তো অন্য কারণে গিয়েছিলে কিন্তু ফিরে এলে। খুনও হলো। আমি সবসময় এটা ভাবি। কখনো উত্তর পাই না। মনে মনে অনেক যুক্তি সাজাই। কিন্তু যুক্তিগুলো মিলে না। সব যুক্তিই খাপছাড়া, এলোমেলো।’
‘কাল পরীক্ষা। আর আজ এসব ভেবে সময় নষ্ট করছিস!’
হেমলতার কণ্ঠ স্বাভাবিক। তবুও পদ্মজা ভয় পেয়ে গেল। তবে কিঞ্চিৎ আশা মনে ভীষণভাবে উঁকি দিচ্ছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………