পদ্মজা - পর্ব ১৮ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
          ভিড় কমতেই কানে তালা লাগানোর মতো প্রচণ্ড শব্দে কাছে কোথাও বজ্রপাত হলো। হেমলতা একা পদ্মজাকে তুলতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মোর্শেদ এগিয়ে এসে দুই হাতে পাঁজকোলা করে তুলে নিলেন পদ্মজাকে। সেই সময় বিজলি চমকায়, সেই আলোয় পদ্মজার মুখটা দেখে মোর্শেদের বুক কেমন করে উঠল! কষ্টে চুরমার হয়ে গেল হৃদয়খানা। জন্মের দিন পদ্মজাকে কোলে নেয়ার পর যে অনুভূতি হয়েছিল ঠিক সেরকম একটা অনুভূতি হচ্ছে…এর নামই বোধহয় পিতৃত্ব!

প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাস বইছে। তারা ঘরে ঢুকতেই ভারি বর্ষণ শুরু হলো। মুহূর্তে দেখা দিল তাণ্ডবরূপি ঘূর্ণিঝড়; সেই তাণ্ডব ছুঁতে পারল না মোড়ল বাড়ির মানুষদের মন। ঝড়ের তাণ্ডবের চেয়েও বড়ো তাণ্ডবের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছে তারা। হেমলতা গরম পানি করে পদ্মজাকে গোসল করালেন, পালটে দিলেন জামাকাপড়। পদ্মজা ঠোঁট কামড়ে নীরবে শুধু কেঁদে গেল, অশ্রু আটকে রাখতে পারছে না কিছুতেই। ইচ্ছে হচ্ছে বাড়ির পেছনের আম গাছটার সঙ্গে ফাঁস লেগে মরে যেতে। হেমলতা পদ্মজার চুল মুছে কপালে চুমু দিলেন। তার চোখ থেকে পদ্মজার নাকে এক ফোঁটা জল পড়ল। পদ্মজা চোখ তুলে তাকাল মায়ের দিকে।

‘আম্মা আসছে? আম্মা কোথায়? আম্মা আসেনি?’

পাশের ঘর থেকে পূর্ণার চিৎকার শোনা যাচ্ছে। সেকেন্ড কয়েকের মধ্যে ছুটে এলো সে, হেমলতাকে দেখেই ঝাঁপিয়ে পড়ল বুকের ওপর। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। পূর্ণার শরীরকে আগ্নেয়গিরি মনে হচ্ছে। এত উত্তাপ! জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। পূর্ণার কান্না দেখে পদ্মজাও ডুকরে কেঁদে উঠল। হেমলতা স্তব্ধ হয়ে দুই মেয়ের কান্না শুনছেন। কাউকেই সামলানোর চেষ্টা করছেন না।

এদিকে মনজুরা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দরজার সামনে।

টিনের চালে ভারি বর্ষণের শব্দ হচ্ছে, জগৎ-সংসার একাকার হয়ে যাচ্ছে সেই শব্দে।

মাঝরাত। বাতাসের বেগ প্রচণ্ড। হেমলতা কালো রংয়ের শাড়ি পরে, একটা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ির বাইরে পা বাড়ান। মনজুরা বারান্দার ঘর থেকে উঁচু কণ্ঠে বললেন, ‘রাম-দা ব্যাগে ক্যান ঢুকাইছস? আর কোন কেলাঙ্কারি বাকি?’

হেমলতা বিদ্যুৎবেগে ফিরে দাঁড়ালেন মনজুরার মুখে দিকে এক লহমার জন্য, পরক্ষণেই নিঃশব্দে বর্ষণ মাথায় নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে উঠলেন মনজুরা, ছুটে গেলেন পদ্মজার ঘরে। পদ্মজা চুপচাপ শুয়ে আছে। মৃদু ফোঁপানোর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। পূর্ণা ঘুমাচ্ছে। তিনি ঘর ছেড়ে দ্রুত বারান্দা-ঘরে এলেন। বড্ড অস্থির লাগছে। জীবনে প্রথমবার সৃষ্টিকর্তার কাছে হেমলতার জীবন ভিক্ষা চেয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন! মেয়েটার যাতে কিছু না হয়।

ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে। বৃষ্টি থেমে গেছে। ধরণী শান্ত যেন কিছুই হয়নি। পদ্মজা ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। গেটের শব্দ পেয়ে উৎসুক হয়ে তাকাল। বিধ্বস্ত অবস্থায় হেমলতা ঢোকেন বাড়ির ভেতর। মনজুরা কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, পদ্মজা টের পায়নি। হেমলতা বাড়িতে ঢুকে কাঁধের ব্যাগটা মুরগির খোঁপে সামনে ছুঁড়ে ফেলেন। অন্ধকারের কারণে তার মুখ স্পষ্ট নয়। হেমলতা বাড়ির পেছনের দিকে চলে গেলেন। পদ্মজার অনুভূতিশূন্য, বিভীষিকাময় সন্ধ্যার স্মৃতি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে তাকে। সে ধীর পায়ে উঠানে এসে দাঁড়াল। পেছন পেছন গেলেন মনজুরা। পায়ের শব্দে চমকে তাকাল পদ্মজা, দেখতে পেল নানিকে। ধীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল, ‘নানু, আম্মা কোথায় গিয়েছিল?’

মনজুরা ক্ষণকাল নীরব থেকে বললেন, ‘জানি না।’

মনজুরার কণ্ঠে ভয়। পদ্মজা নিজের দুর্বল শরীর ঠেলে নিয়ে এলো বাড়ির পেছনে। দেখতে পেল, হেমলতা নদীতে নেমে গোসল করছেন। তিনি এক মুহূর্তে কয়েকটা ডুব দিলেন।

পদ্মজার মাথায় এবার দুশ্চিন্তা ভর করতে শুরু করে। ব্যস্ত পায়ে ঘাটের কাছে এসে সে ক্ষীণ স্বরে ডাকল, ‘আম্মা।’

হেমলতা ঘুরে তাকালেন। ঝড় শেষে আকাশ সাদা, অন্ধকার কাটার পথে। পদ্মজা বলল, ‘অসময়ে কেন গোসল করছ? ঠান্ডা লাগবে।’

হেমলতা গোসল শেষ করে উঠে এলেন ওপরে। পদ্মজাও আর কিছু বলল না। হেমলতা উঠানে এসে মনজুরাকে আদেশের সুরে বললেন, ‘পূর্ণাকে নিয়ে আসো আম্মা।’

পদ্মজা অবাক হয়ে শুধু দেখছে। পূর্ণা ধীর পায়ে হেঁটে আসে। তার জ্বর অনেকটা কমেছে। মনজুরা দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন। হেমলতা মৃদু হেসে পূর্ণাকে বললেন, ‘পদ্মজার পাশে এসে দাঁড়া।’

পূর্ণা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। সে বাধ্যের মতো এসে দাঁড়াল পদ্মজার পাশে। হেমলতা মুরগির খোঁপের পাশ থেকে কালো ব্যাগটা হাতে তুলে নিলেন, ভেতর থেকে বের করলেন একটা রাম-দা আর একটা কৌটা। পূৰ্ণা রাম-দা দেখে চমকে উঠল, চোখাচোখি হলো দুই বোনের।

রক্তেমাখা রাম-দা দুই মেয়ের পায়ের সামনে রাখলেন হেমলতা, শীতল কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, ‘মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তাই পৃথিবীতে সেরা মানুষগুলোরই বাঁচার অধিকার আছে। মানুষরূপী পশুদের না। যখন যেখানে কোনো মেয়েকে অসম্মান হতে দেখবি এক কোপ দিয়ে অমানুষটার আত্মা দেহ থেকে আলাদা করে দিবি। যে তোকে অসম্মান করেছে সে দোষী, তুই না। তার শাস্তি পাওয়া উচিত, তোর না। তাই আত্মহত্যার কথা কখনো ভাববি না। দোষীর আত্মা হত্যা করা উচিত। আর আমি মনে করি, এতে পাপ নেই। বরং পাপীকে বিনাশ না করা পাপ। আর আমার মেয়েরা যেন সেই পাপ কখনো না করে। সেই…’

‘মেয়েদের এসব কী কইতাছস তুই? মাথা খারাপ হইয়া গেছে তোর?’ মনজুরা হইহই করে উঠলেন।

হেমলতা ঢোক গিলে মনজুরার কথা হজম করে নিলেন। আবার মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি কখনো ছেলে চাইনি। মেয়ে চেয়েছি। প্রতিবাদী, দুঃসাহসি মেয়ে চেয়েছি। আল্লাহ আমাকে তিনটা মেয়ে দিয়েছেন। এখন সেই মেয়েরা যদি এইটুকুতে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে কীভাবে হবে? ঠিক আগের মতোই মাথা উঁচু করে বাঁচবি। যতদিন আমি আছি কেউ তোদের অসম্মান করে টিকতে পারবে না। আমি না হয় যতদিন বেঁচে থাকি তাদের শাস্তি দেব, পৃথিবী থেকে মুছে দেব; কিন্তু যখন থাকব না? তখন…তখন কী তারা বেঁচে থাকবে? বেঁচে থাকতে দেয়া ঠিক হবে? অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে নোংরামো করবে না, তার নিশ্চয়তা আছে? নেই। এখন থেকে নিজেদের শক্ত কর। মেয়েদের সাহস মেয়েদেরই হতে হয়। নিজেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিজের। গত রাতের স্মৃতি দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যেতে বলব না, মনে রাখ। প্রতিটি মানুষের ভেতর লুকানো হিংস্র শক্তি আছে। সবাই প্রকাশ করতে জানে না। চিনতে পারে না নিজেকে। গত রাতের ঘটনাটি মনে রেখে নিজের ভেতর লুকানো হিংস্র শক্তিটাকে জাগিয়ে হাতের মুঠোয় রাখ। যাতে সঠিক সময়ে হাতের মুঠো খুলে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারিস। আঘাতে, আঘাতে চুরমার করে দিতে পারিস পাপের জগত।’

এইটুকু বলে হেমলতা ক্লান্ত হয়ে দপ করে বসে পড়লেন। পদ্মজা ‘আম্মা’ বলে হেমলতাকে ধরতে চাইলে, হাত উঠিয়ে বললেন, ‘দাঁড়িয়ে থাক।’ সময় নিয়ে প্রাণ ভরে দম নিলেন তিনি, এরপর কৌটাটা খুলে ঠান্ডা তরল কিছু ঢেলে দিলেন দুই মেয়ের পায়ে। পূর্ণা কেঁপে উঠে দূরে সরে গেল। পদ্মজা আতঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কার রক্ত?’

রক্তের কথা শুনে ঘৃণা আর ভয়ে পূর্ণার সর্বাঙ্গ রি রি করে উঠল। তার মনে হচ্ছে পায়ে পোকা কিলবিল করছে। টাটকা তাজা লাল রক্ত! বমি গলায় এসে আটকে গেছে। হেমলতা জবাব দিলেন না, শুধু মৃদু হাসলেন। পূৰ্ণা এই ভয়ংকর দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারাল। দুই হাতে বোনকে জাপটে ধরল পদ্মজা। কী আশ্চর্য, এই ভয়ংকর ঘটনা তাকে একটুও বিচলিত করল না! হেমলতার গায়ে ভেজা শাড়ি। তাই তিনি পূর্ণাকে ধরলেন না। মনজুরাকে বললেন, ‘পূর্ণারে ঘরে নিয়ে যাও আম্মা।’

মনজুরা কঠোর চোখে চেয়ে আছেন হেমলতার দিকে। হেমলতা আবারো হাসলেন। ভেজা কণ্ঠে মনজুরাকে বললেন, ‘কালো বলে অবহেলা না করে বুকে আগলে রাখলে আমার জীবনটা, আমার মেয়েদের জীবনটা অন্যরকম হতে পারত আম্মা।’

হেমলতার কথায় মনজুরার সারামুখ বিষণ্ণতা ছেয়ে গেল। তিনি হেমলতার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলেন না, অপরাধবোধে মাথা নুইয়ে ফেললেন। পূর্ণাকে ধরে নিয়ে গেলেন ঘরে। হেমলতা সেখানেই পড়ে রইলেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেললেন। আলো ফুটেছে পুরোপুরি। পাখির কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে। তিনি পানি দিয়ে উঠানের রক্ত মুছে দিলেন চিরতরে। রাম-দা ধুয়ে লুকিয়ে রাখলেন লাহাড়ি ঘরে। শাড়ি পালটে উঠানে পা রাখতেই মগাকে দেখতে পেলেন। খবর এনেছে সে, বিচার বসবে দুপুরে। রাতের ঘূর্ণিঝড়ে গ্রামের বেশিরভাগ ঘরবাড়ি উড়ে গেছে, ফসল ও পশুপাখিসহ বিভিন্ন ক্ষতি হয়েছে। অনেক মানুষ আহত হয়েছে! এই খবর শুনে হেমলতার চোখ সজল হয়ে উঠল 1 প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। প্রকৃতি কখনো কাউকে ছাড়ে না! গ্রামবাসী অন্যায় দেখেও নিস্তব্ধ থেকেছিল। এ বুঝি তারই শাস্তি!

—————

মাথার ওপর সূর্য, তাপদাহও প্রচণ্ড। পূর্ণা, পদ্মজা ও হেমলতা কালো বোরখার আবরণে নিজেদের ঢেকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে অলন্দপুরের মাধ্যমিক স্কুলের উদ্দেশ্যে। খা খা রোদ্দুর, তপ্ত বাতাসের আগুনের হলকা। সবুজ পাতা নেতিয়ে পড়ার দৃশ্য পড়ছে চোখে। মোর্শেদ বাকিদের নিয়ে আসছে। রীনাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে করুণ কান্নার স্বর ভেসে আসে। পদ্মজা চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল, রীনার বাড়ির ছাদ উড়ে গেছে, গাছপালা ভেঙে পড়ে আছে উঠানে। হেমলতা পদ্মজাকে টেনে নিয়ে এগিয়ে যান।

বটের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছিল এক রাখাল ছেলে। সে হেমলতার মুখ দেখে বুঝে যায়, পেছনের দুটি মেয়ে পদ্মজা আর পূর্ণা।

রাখাল ছেলেটি ছুটে এসে পদ্মজাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘পদ্ম আপা, তুমি ডরাইও না। তোমার কিচ্ছু হইব না।’

চারদিকে নিঝুম, নিস্তব্ধ, ঝিমধরা প্রকৃতি। ঘামে দরদর তৃষ্ণার্ত রাখাল হাঁপিয়ে কথা বলছে। স্কুলে যাওয়ার পথে, মাঝে মাঝেই এই পনেরো বছর রাখালের সঙ্গে দেখা হতো পদ্মজার। পদ্মজার জন্য পাগল সে। বড়ো বোনের মতো মান্য করে। পদ্মজা

মৃদু হাসল। তবে মুখের ওপর পাতলা পর্দা আছে বলে, রাখালের চোখে তা পড়ল না। রাখালকে পেছনে ফেলে তিন মা-মেয়ে এগিয়ে চলল।

স্কুল মাঠে অনেক মানুষ জমেছে। রাতের ঘূর্ণিঝড়ের জন্য অলন্দপুরের বেশি অর্ধেক মানুষ আসেনি। তবুও উপস্থিত জনতার সংখ্যা শ-পাঁচেক তো হবেই! ঘটনা ঘটেছে আটপাড়ায়, আর তা ছড়িয়ে পড়েছে সব পাড়ায়! যথাসময়ে বিচার কার্য শুরু হলো। পদ্মজা এবং আমির দুজন দুই দিকে দাঁড়িয়ে আছে।

আমির একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে পদ্মজার দিকে, তার দুচোখ ভরতি মুগ্ধতা।

মাতব্বর ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘পদ্মজা-আমিরকে একসঙ্গে কারা কারা দেখেছেন?’

রমিজ আলী, কামরুল, মালেক হাত তুললেন। মজিদ মাতব্বর বললেন, ‘কী দেখেছেন? ব্যাখ্যা করুন।

রমিজ আগে আগে উঁচু কণ্ঠে বললেন, ‘আমি দেখছি ঝড়ের সন্ধ্যায় আপনের পোলারে পদ্মজার ঘর থেকে বাইর হইতে। বাড়িত আর কেউ আছিল না।’

আমির রেগে গিয়ে কিছু বলতে চাইলে মজিদ মাতব্বর হাতের ইশারায় আটকে দিলেন। আমির বাপের বাধ্য সন্তান, তাই থেমে গেল।

মজিদ মাতব্বর বললেন, ‘আপনি আমিরকে পদ্মজার ঘর থেকেই বের হতে দেখেছেন?’

রমিজ আলী দৃষ্টি অস্থির রেখে আমতা আমতা শুরু করলেন। দম নিয়ে বললেন, ‘তারে বারান্দা থাইকা বাইর হইতে দেখছি।’

মজিদ মাতব্বর মুহূর্তখানেক নীরব থেকে বললেন, ‘তাহলে কোন আন্দাজে আপনি বলছেন, তারা নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত ছিল?’

কথাটি শুনে পদ্মজার সর্বাঙ্গ রি রি করে উঠল, চোখ বুজে ফেলল সে। রমিজ আলী থমকে গিয়ে পরপরই হুংকার দিয়ে ওঠে, ‘একটা অচেনা ছেড়া খালি বাড়িত কোনো ছেড়ির কাছে কেন যাইব? আপনার নিজের ছেড়া বলে তার দোষ ঢাকতে পারেন না। আমার ছেড়ির বেলা কিন্তু ছাড়েন নাই।’

মাতব্বর রেগে গেলেন, যুক্তি দিয়ে কথা বলুন। আপনার মেয়েকে হাতেনাতে ধরা হয়েছিল। তার গায়ে কাপড় ছিল না। তারা একসঙ্গে একই ঘরের একই বিছানায় ধরা পড়েছে। আমির আর পদ্মজার বেলা সেটা হয়নি।’

মজিদ মাতব্বরের ক্ষমতা এবং কথার দাপটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে রমিজ আলীর। কামরুল চুপসে গিয়েছেন। সামনে নির্বাচন। মজিদ মাতব্বরকে খেপানো মানে নিজের কপালে দুঃখ বয়ে আনা।

ভিড়ের মাঝ থেকে কেউ একজন বলল, ‘তাহলে আপনার ছেলে একটা মেয়ের কাছে খালি বাড়িতে গেল কেন?’

মজিদ মাতব্বর উঁকি দিয়ে প্রশ্নদাতাকে খুঁজে বের করলেন। তারই প্রতিপক্ষ হারুন রশীদ! মজিদ মাতব্বর আমিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি মোড়ল বাড়িতে কেন গিয়েছিলে?’

আমির সহজ গলায় বলল, ‘বাড়ি ফিরছিলাম হঠাৎ ঝড় শুরু হলো সামনে মোর্শেদ কাকার বাড়ি ছিল। মোর্শেদ কাকা বাড়ি নেই আমার জানা ছিল না। জানলে বৃষ্টিতে ভিজতাম তবুও ওই বাড়ি যেতাম না। এই গ্রামের অনেকেই জানে আমার শ্বাসকষ্ট আছে। বাড়ির সবাই জানে বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যায়, শ্বাসকষ্ট হয়। তাছাড়া পদ্মজাকে এর আগে কখনো দেখিনি আমি। কেউ কী কখনো পদ্মজার সঙ্গে আমাকে দেখেছে?’ আমির জনতার উদ্দেশ্যে বলল, ‘বলেন, কেউ দেখেছেন? আমাদের আগে কখনো দেখাই হয়নি তাহলে সম্পর্ক কী করে হবে?’

হারুন রশীদ বললেন, ‘যখন দেখলা ছেড়িড়া বাড়িত একলা তখন বাইর হইয়া গেলা না ক্যান?’

আমির সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, ‘আমার মাথায় আসেনি এমন কিছু হতে পারে। আর…’

আমির পদ্মজার দিকে তাকাল। পদ্মজা সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিলো। আমির বলল, ‘আর…পদ্মজার মতো রূপসী আর একটাও নেই এটা সবাই স্বীকার করতে বাধ্য। আমি প্রথম দেখে অভিভূত হয়ে পড়ি। তাই মস্তিষ্কে একবারো কোনো বিপদের আশঙ্কা আসেনি। এমন নোংরা কিছু হতে পারে ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি।’

মজিদ মাতব্বর ছেলের দুর্বলতা বুঝতে পেরে অসন্তুষ্ট হলেন। তবুও স্বাভাবিক থেকেই বললেন, ‘গ্রামবাসী কোনো প্রমাণ ছাড়াই লাফিয়েছে। মেয়েটাকে অপদস্থ করেছে। প্রমাণ ছাড়া কারো বিরুদ্ধে নোংরা অপবাদ দেয়া অপরাধ।’ তিনি কামরুলের দিকে তাকিয়ে তাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘ছইদ, মজনুর ছেলে আরেকটা কে জানি? কোথায় তারা?’

কামরুল ধীরভাবে বললেন, ‘খুঁজে পাই নাই। মনে হয় ভয়ে কোনহানে লুকাইছে।’

রমিজ আলী হঠাৎ গমগম করে উঠলেন, ‘এইডা আমি মানি না। পদ্মজা- আমিররে আপনে ছাইড়া দিতে পারেন না। আপনের ক্ষমতা বেশি দেইখা আপনে এমনে নিজের ছেড়ারে ঢাইকা রাখতে পারেন না। আপনি বেইমানি করতাছেন।’

আমির রেগেমেগে রমিজ আলীকে ধরতে এলে, মজিদ গর্জন করে উঠলেন, ‘আমির!’

আমির কিড়মিড় করে রাগ হজম করার চেষ্টা করল। হারুন অতিশয় ধূর্ত লোক। তিনি রসিকতা করে বললেন, ‘সত্য হউক আর মিথ্যাই। বদনাম তো বদনামই।’

মজিদ সবার প্রশ্ন কথা উপেক্ষা করে উপস্থিত গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনাদের আমার বিচারের প্রতি বিশ্বাস আছে?’

সবাই আওয়াজ করে বলল, ‘আছে।’

মজিদ মাতব্বর তৃপ্তির সঙ্গে হাসলেন। ক্ষণকাল নীরব থেকে উঠে দাঁড়ালেন। গলার স্বর উঁচু করে বললেন, ‘মোর্শেদের মেয়েদের সঙ্গে খারাপ হয়েছে। পদ্মজার নামে অনেক প্রশংসা শুনেছি। সে খুবই ভালো মেয়ে। আর আমার ছেলেকেও সবাই চিনেন, সে কেমন। যারা যারা দোষ করেছে তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়া হবে। পদ্মজা আর আমির নামে যে পাপের অভিযোগ করা হয়েছে তার যুক্তিগত প্রমাণ নেই। আর প্রমাণ ছাড়া আমি কখনো কাউকে শাস্তি দেইনি। আজও দেব না। তবে আমি আজ সবার সামনে মোর্শেদ আর তার স্ত্রীর কাছে একটা প্রস্তাব রাখব।’

হেমলতা, মোর্শেদ সহ উপস্থিত সবাই কৌতূহল নিয়ে তাকাল। মজিদ মাতব্বর এক নজর আমিরকে দেখে বললেন, ‘পদ্মজাকে আমিরের বউ করে নিয়ে যেতে চাই।’

চারিদিকে কোলাহল বেড়ে গেল। সব কোলাহল সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে স্বপ্নাবিষ্টের মতো শুধু মজিদ মাতব্বরের প্রস্তাবটি পদ্মজার কানে বাজতে থাকল। জীবনের কোন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে সে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp