পদ্মজা - পর্ব ১৯ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
          সূর্যের প্রখর তাপে সমস্ত প্রকৃতি যেন নির্জীব হয়ে ওঠেছে। উপস্থিত সবার মধ্যে চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। রমিজ আলি আর হারুন রশীদ নামক ধূর্ত মানুষগুলোর চোখ ছানাবড়া। মজিদ মাতব্বর ধীর শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আপনারা চাইলে সময় নিতে পারেন। আজ এখানে…’

হেমলতা কথার মাঝে আটকে দিয়ে বললেন, ‘আপনি বিয়ের তারিখ ঠিক করুন।’

মজিদ মাতব্বরের প্রস্তাবের চেয়ে এই প্রস্তাবে হেমলতার রাজি হওয়াটা যেন কোলাহল মুহূর্তে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল। পদ্মজা হতবাক, বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়! মোর্শেদ চোখ বড়ো করে হেমলতার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। আশপাশ থেকে ফিসফিসানি ভেসে আসছে। মজিদ মাতব্বর মৃদু হাসলেন। আনন্দের সঙ্গে সবাইকে নিমন্ত্রণ করলেন, ‘আগামী শুক্রবার আমার ছেলের সঙ্গে মোর্শেদের বড়ো মেয়ের বিবাহ। আপনাদের সবার নিমন্ত্রণ রইল।’ কথা শেষ করে হেমলতার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘দিন তারিখ ঠিক আছে?’

হেমলতা সম্মতি জানালেন। মোর্শেদ অবাকের চরম পর্যায়ে, কোনো কথা আসছে না মুখে। পদ্মজা ঢোক গিলে ব্যাপারটা হজম করে নিলো মুহিবের সঙ্গে যখন তার বিয়ের আলোচনা হলো তখন সে ভারি অবাক হয়েছিল। লিখন শাহ নামে একটা মানুষকে মনে পড়েছিল। এখন তেমন কিছুই হচ্ছে না, অনুভূতিগুলো ভোঁতা। যা হওয়ার হবে। সেসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই।

বিচার সভা ভেঙে গেল। মজিদ মাতব্বর আলাদা করে মোর্শেদের সঙ্গে কথা বললেন। তিনি আগামীকাল নিজ স্ত্রী এবং বাড়ির অন্যান্য বউদের নিয়ে পদ্মজাকে দেখতে আসবেন। মোর্শেদ, হেমলতা সমস্বরে অনুমতি দিলেন বাড়ি ফেরার পথে অনেকের কটু কথা কানে আসে। পদ্মজা আর আমির দুজনেরই চরিত্র খারাপ। এজন্যই বিয়ে হচ্ছে। মাতব্বর ক্ষমতাবান বলে পুরো ব্যাপারটা ঘুরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তলে তলে তো নিজেরা জানে তাদের ছেলেমেয়ে কেমন। তাই তাড়াতাড়ি করে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। কেউ একজন খুব বিশ্রীভাবে পদ্মজাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘কে জানে, মনে কয় তো ছেড়ি পেট বাঁধাইছে। রাইতে বাপ-মারে দিয়া পায়ে ধরাইয়া বিয়া ঠিক করছে।’

পদ্মজার মন তিক্ত হয়ে ওঠে, হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এত নোংরা মন্তব্য সহ্য করা খুব কঠিন। মিথ্যে অপবাদ চারিদিকে। বোরখার আড়ালে পদ্মজার চোখ দুটি ছলছল করছে। খুব কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে।

হেমলতা পদ্মজার একহাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। মানুষদের ছায়া ছেড়ে খেতের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে বললেন, ‘জীবন খুব ছোটো। এই ছোটো জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে। যে ভালো তার সঙ্গে যে শুধুই ভালোই হবে তা কিন্তু ঠিক না, উচিতও না। ভালো খারাপে মিলিয়েই জীবন। তাই বলে সেই খারাপকে পাত্তা দিয়ে সময় নষ্ট করতে হবে—তার কোনো মানে নেই। খারাপটাকে পাশে রেখে ভালো মুহূর্ত তৈরি করার চেষ্টা করবি। ভালোটা ভাববি। শুধুমাত্র কয়জনের কথায় কী আসে যায়? পুরো গ্রামবাসী জানে, তুই কেমন। পুরো অলন্দপুরের যত মানুষ আজ এসেছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই মনে মনে তোর গুণগান গেয়েছে। তারা মনে মনে বিশ্বাস করে তুই নির্দোষ। কিন্তু চুপ ছিল। যারা খারাপের দলে তারা সংখ্যায় কম বলে কোলাহল করে নিজেদের দাপট দেখাতে চেয়েছিল। সবার অগোচরে বোঝাতে চেয়েছিল, আমরা অনেকজন। কিন্তু পারেনি। কোলাহল কোনো কিছুর সমাধান নয়। এখন যারা নিন্দা করল তারা নিজেদের নিচু মনের পরিচয় দিয়েছে, সেই সঙ্গে আমলনামায় পাপের সংখ্যা বাড়িয়েছে। তাদের শাস্তি পৃথিবী এবং আখিরাত—দুটোতেই হবে। একদিন এদের শাস্তি হবেই এই কথাটা ভেবে খুশি হ। সব ভুলে যা, বাকি জীবন পড়ে রয়েছে। তা নিয়ে ভাব। চোখের জল অতি আপনজন এবং আল্লাহর জন্য ফেলা উচিত। এদের মতো অমানুষদের জন্য না।’

পদ্মজা হুহু করে কেঁদে উঠল। আচমকা হেমলতাকে মাঝপথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, কান্নামাখা কণ্ঠে বলল, ‘তুমি জাদুকর আম্মা। তুমি জাদু জানো।’

হেমলতা পদ্মজার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। মোর্শেদ পদ্মজাকে কান্না থামাতে বলতে চাইলে হেমলতা ইশারায় চুপ করিয়ে দেন। পাশেই বিস্তীর্ণ ক্ষেত। গ্রীষ্মের দুপুরের রূপ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। মোর্শেদের কপাল বেয়ে ঝরঝর করে ঘাম ঝরছে। তার দৃষ্টি থমকে আছে হেমলতার দিকে। একটা অপ্রিয় সত্য সম্ভাবনার কথা মনে হতেই চোখ দুটি ছলছল করে উঠল। তিনি দ্রুত চোখ সরিয়ে বড়ো করে নিশ্বাস ফেলেন। জীবনের লীলাখেলায় তিনি নিঃস্ব। পদ্মজার কান্না থামার লক্ষণ নেই। হেমলতা ছদ্ম গাম্ভীর্যের সহিত বললেন, ‘এত কাঁদলে কিন্তু মারব।’

—————

আকাশ জুড়ে তারার মেলা। জানালা গলে চাঁদের আলো পদ্মজার মুখশ্রী ছুঁয়ে দিচ্ছে। বারান্দার ঘরে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে, বুকটা কেমন কেমন করছে; কাঁপছে অনবরত। হেমলতার উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত উঠে বসল। হেমলতা পদ্মজার দিকে মুহূর্তকাল তাকিয়ে রইলেন।

‘ঘুম আসছে না?’ জানতে চাইলেন তিনি।

পদ্মজা মাথা দুই পাশে নাড়াল। হেমলতা আর কিছু বললেন না। নীরবতা কাটিয়ে বলল, ‘মেজো আপার বিয়ের তারিখ পড়েছে?’

হেমলতা পদ্মজার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলেন। বিছানার ওপর বসে ইশারায় পদ্মজাকে কোলে শুতে বললেন। পদ্মজা শুয়ে পড়ল। মায়ের কোলটা তার এখন ভীষণ দরকার ছিল। হেমলতা পদ্মজার প্রশ্ন এড়িয়ে অন্য কথা তুললেন।

বললেন, ‘জানি না কোনো মা তার মেয়ের সঙ্গে নিজের বিয়ের গল্প করেছে কি না। কিন্তু আমি আমার বিয়ের গল্প তোকে বলতে চাই। শুনবি?’

পদ্মজা সায় দিল। হেমলতা পদ্মজাকে বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার জন্য নিজের অতীতে নিয়ে যান, ‘সেদিন রাতে আব্বা এসে বলল, তিনদিন পর আমার বিয়ে। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। কষ্ট হয়েছিল। আমি আরো পড়তে চেয়েছিলাম। এরপর শুনলাম—যার সঙ্গে আমার বিয়ে হচ্ছে তার পড়াশোনা নেই, জ্ঞানও যথেষ্ট কম; রাগচটা লোক। এসব তথ্য জেনে রাগ কিংবা মন খারাপ কিছুই হয়নি। ভয় হয়েছিল—না জানি কেমন হবে সংসার!

‘বিয়ের দিন ঘনিয়ে এলো। তোর আব্বাকে তখনো আমি দেখিনি। বিয়ের দিন আয়নায় প্রথম দেখি। কালো একটা মুখ। চোখ দুটি গভীর। কখনো না দেখা মানুষটাকে, প্রথম দেখেই মনে হয় আমার সবচেয়ে আপন একজন মানুষ। সব ভয় কেটে গেল। বিদায়ের সময় সবাই বলেছিল দুজনকে খুব মানিয়েছে, রাজযোটক। একজন হিন্দু দিদি বলেছিলেন, সাক্ষাৎ রাম- সীতা। আটপাড়ায় যদি একজন ছয় ফুট লম্বার মানুষ থাকে তবে সেটা তোদের আব্বা ছিল। বিয়ের পর জানতে পারি, তোর আব্বাকে বিয়ে করার জন্য অনেক মেয়েই পাগল ছিল। নিজেকে খুব সৌভাগ্যবতী মনে হতো। অশিক্ষিত ভেবে নাক কুঁচকেছিলাম। সেই আমি তোর আব্বার জন্য দিনকে রাত, রাতকে দিন মানতে রাজি ছিলাম। তোর আব্বার প্রতি এতটাই ভালোবাসা সৃষ্টি হয়েছিল, যদি ছুরি নিয়ে রক্তের আবদার করত আমি আমার বুক পেতে দিতাম।’

পদ্মজা মাঝপথে আটকে দিয়ে বলল, ‘তাও তো আব্বা তোমাকে ভালোবাসেনি।’

হেমলতার হাসি উজ্জ্বল মুখটা সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল। অপ্রতিভ হয়ে উঠলেন। তিনি এলোমেলো দৃষ্টিতে দূরের দিকে চেয়ে বললেন, ‘তাকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়েছিল।’

পদ্মজা চুপ করে রইল। হেমলতাও নিশ্চুপ। দরজার পাশে মোর্শেদ বসে বসে বিড়ি ফুঁকছিলেন। হেমলতার প্রতিটি কথা বুড়ো হয়ে যাওয়া মনটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। তিনি বিড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান চৌরাস্তার উদ্দেশ্যে। চৌরাস্তার পাশে একটা বড়ো ব্রিজ আছে, ওখানে দখিনা হাওয়ার তীব্রতা খুব। সেখানেই এসে দাঁড়ান। ফেলে আসা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ চোখ খুঁজে মনে করার চেষ্টা করেন।

বেশ কিছুক্ষণ পর পদ্মজা বলল, ‘আম্মা, প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর প্রশ্ন করব না। তবুও…’

‘বলব একদিন।’

পদ্মজা নিশ্চুপ হয়ে গেল। একমুহূর্ত স্থির থেকে হেমলতা বললেন, ‘পূর্ণা খুব কান্নাকাটি করে দেখলাম। মেয়েটা এত দুর্বল কী করে হলো?’

পদ্মজা হেমলতার এক হাত মুঠোয় নিয়ে আশ্বস্ত করল, ‘আমি আছি আম্মা। সামলে নেব।’

‘ঘরে যা। রাত হয়েছে অনেক।’

পদ্মজা উঠে বসল। ওড়নাটা ভালো করে টেনে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। হেমলতা বিছানার শেষ প্রান্ত থেকে বালিশ টেনে নিতে গিয়ে বালিশের তলায় ভাঁজ করা দুটি চিঠি দেখতে পেলেন। তিনি হাত বাড়িয়ে চিঠি দুটো নিয়ে পদ্মজার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘পদ্মজা, এগুলো কী?’

পদ্মজা ফিরে তাকাল। হেমলতার হাতে লিখনের চিঠি দুটি দেখে সর্বাঙ্গে বৈদ্যুতিক কিছু একটা ছড়িয়ে পড়ে শরীর কাঁপিয়ে দিল। মাটি যেন টেনে ধরল দুই পা। হেমলতা প্রথম চিঠিটির ভাঁজ খুলে প্রথম লাইন পড়ে বেশ অবাক হোন, পদ্মজার দিকে একবার চকিতে তাকান। এরপর এক নিশ্বাসে দুটো চিঠি পড়ে শেষ করলেন।

পড়া শেষে থম মেরে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। ভয়ে পদ্মজার দুই চোখ জ্বলছে। মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে সে। হেমলতা ধীর পায়ে হেঁটে পদ্মজার কাছে এসে দাঁড়ান। দুই ভ্রু প্রসারিত করে, শান্ত অথচ ধারাল কণ্ঠে বললেন, ‘এসব কবে হয়েছে? আমাকে জানাসনি কেন?

পদ্মজা বলল, ‘যখন উনারা শুটিং করতে আসেন।’ ওর মনে হচ্ছে এখুনি অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। মনে মনে প্রার্থনা করছে, যাতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। তাহলে এই লজ্জা থেকে বেঁচে যাবে।

হেমলতা পদ্মজাকে পরখ করলেন, পদ্মজা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে; বার বার কামড়ে ধরছে নিচের ঠোঁট।

পদ্মজা হেমলতাকে চুপ থাকতে দেখে বলল, ‘তুমি যা বলবে তাই হবে আম্মা। আমার ওপর রাগ কোরো না।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp