আজ যেন শুধু মোড়ল বাড়ির মাথার ওপরেই সূর্য উঠেছে। সকাল থেকে আত্মীয় আপ্যায়নের প্রস্তুতির তোড়জোড় চলছে। সবাই ঘেমে একাকার। বাড়ির প্রতিটি মানুষ ব্যস্ত। মোর্শেদ হিমেল ও প্রান্তকে নিয়ে বাজার করে ফিরেছেন সূর্য ওঠার মাথায়। লাহাড়ি ঘরের পাশে বড়ো উনুন করা হয়েছে। সাধারণ চালের পরিবর্তে সুগন্ধি, সিদ্ধ চালের ভাত রান্না করা হয়েছে; সেই সঙ্গে রাজহাঁস আর দেশি মুরগি। বাড়িজুড়ে রমরমা ব্যাপার। একদিন আগের ঘটনা ধামাচাপা পড়েছে পঁচানব্বই ভাগ। ছোটো ছোটো দরিদ্র ছেলেমেয়েরা খাবারের ঘ্রাণ পেয়ে ছুটে এসেছে মোড়ল বাড়ি। সবার মধ্যেই নতুন উত্তেজনা, নতুন অনুভূতি। শুধু পূর্ণা এখনো সেদিনের ঘটনা থেকে বেরোতে পারছে না, চিত হয়ে শুয়ে আছে ঘরে। মনজুরা আর শিউলির মাকে কাজে সাহায্য করছিল পদ্মজা। হেমলতা ধমকে ঘরে পাঠিয়ে দেন। পদ্মজা ঘামে ভেজা কপাল মুছতে মুছতে ঘরে প্রবেশ করে। পূর্ণার দুচোখ জলে নদী যেন! পদ্মজা বিছানার ওপর পা তুলে বসে। বোনের উপস্থিতি টের পেয়ে, হাতের উলটো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছল পূর্ণা।
পদ্মজা কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে বলল, ‘চোখের জল কী শেষ হয় না?’
পূর্ণা নিরুত্তর। পদ্মজা অভিজ্ঞ স্বরে বলল, ‘দেখ পূর্ণা, এসব মনে রাখলে তোরই ক্ষতি। দেখছিস না, আমি অল্প সময়ের ব্যবধানে সব ভুলে হবু শ্বশুরবাড়ির মানুষদের জন্য রান্নাবান্না করছি। তুইও ভুলে যা। তোর বন্ধুরা আসছে। তুই নাকি তাদের ধমকে দিয়েছিস? এটা কিন্তু ঠিক না। ‘
পূর্ণা পদ্মজার দিকে তাকাল। দৃষ্টি ভীষণ শীতল। পদ্মজাকে বলল, ‘সত্যি ভুলতে পেরেছ আপা?’
পদ্মজা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ‘ভুলিনি। কিন্তু সহ্য করতে পেরেছি। তোর মতো চোখের জল অপাত্রে ঢালছি না।’
পূর্ণা উঠে বসে, একটা বালিশ বুকে জড়িয়ে ধরে দায়সারাভাবে বলল, ‘তুমি অনেক শক্ত আপা। আমি খুব দুর্বল, ভুলতে পারছি না।’
পদ্মজা আর কথা বাড়াল না। পূর্ণার গাঁ ঘেঁষে বসে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘গতকাল রাতে কী হয়েছে জানিস?’
‘কী হয়েছে?’
পদ্মজা চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘তোর নায়ক ভাইয়ের চিঠি আম্মার হাতে পড়েছে।’
পূর্ণা আঁতকে উঠে বলল, ‘সে-কী! কখন? কীভাবে?’
‘আর বলিস না! সেদিন তুই নানাবাড়ি ছিলি। তখন চিঠি দুইটা বের করেছিলাম। বারান্দার ঘরে বালিশের নিচে রেখে দিই। আর মনে নেই 1 এরপরেই অঘটন ঘটে। এরপর দিন বিচার বসল। চিঠির কথা ভুলেই গেলাম। বারান্দার ঘরে ছিলাম রাতে তবুও মনে পড়েনি। আর আম্মা পেয়ে গেল।’
উত্তেজনা-ভয়ে পূর্ণার গলা শুকিয়ে গেছে। প্রশ্ন করল, ‘আম্মা কী বলছে?’
পদ্মজা ঠোঁট দুটি উলটে কী যেন ভাবে। এরপর ব্যথিত স্বরে বলল, ‘তেমন কিছুই না। এজন্যই আরো ভয় হচ্ছে।’
‘কিছুই না?’
‘কখন হলো এসব—জিজ্ঞাসা করেছে। আমি বললাম, তুমি যা বলবে তাই হবে। এরপর আম্মা অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।’
‘তারপর?’
‘বলল, ঘুমা গিয়ে। শেষ।’
দুই বোন একসঙ্গে চিন্তায় পড়ে গেল। কপাল ভাঁজ করে কিছু ভাবতে শুরু করে। পূর্ণা বলল, ‘আম্মা তোমার মুখ দেখে বুঝে গেছে তুমি লিখন ভাইকে ভালোবাস না।’
পদ্মজা অন্যমনস্ক হয়ে বলল, ‘মনে হয়।
পূর্ণা খুব বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘লিখন ভাই এত সুন্দর, তোমাকে এত ভালোবাসে তবুও কেন ভালোবাসোনি আপা? লিখন ভাইয়ের চিঠি তো ঠিকই সময় করে করে পড়তে। বিয়ে করতে কী সমস্যা?’
‘আম্মা দিলে তো করবই। সমস্যা নেই।’
‘তোমার এই ন্যাকার কথা আমার ভালো লাগে না আপা।’
পূর্ণার রেগে কথা বলা দেখে পদ্মজা হেসে ফেলল।
পদ্মজা পূর্ণার এক হাত মুঠোয় নিয়ে বলল, ‘গতকাল রাতে আম্মা আব্বাকে কতটা ভালোবাসে আমাকে বলেছে। প্রথম দেখেই নাকি আপন- আপন লেগেছিল। আব্বার জন্য আম্মা দিনকে রাত, রাতকে দিন মানতেও রাজি ছিলো। এতটা ভালোবাসত! আমার তেমন কোনো অনুভূতি হয়নি তোর নায়ক ভাইয়ের জন্য। প্রথম প্রথম কোনো পুরুষের চিঠি পেয়েছিলাম, সবকিছু নতুন ছিল। তাই একটা ঘোরে গিয়ে নতুন অনুভূতির সাক্ষাৎ পাচ্ছিলাম। আম্মার ভালোবাসার কথা শোনার পর থেকে মনে হচ্ছে আমি উনাকে ভালোবাসিনি। সবটা মোহ ছিল। দূরে যেতেই উবে গেছে। তবে উনি খুব অসাধারণ একজন মানুষ। আম্মা উনার হাতে আমাকে তুলে দিলে কোনো ভুল হবে না। কিন্তু এটা এখন কল্পনাতীত। পরিস্থিতি পালটে গেছে। আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।’
পদ্মজার এত কথা উপেক্ষা করে পূর্ণা কটমট করে বলল, ‘তোমার কী কালাচাঁদরে দেখলে আপন আপন লাগে?’
পদ্মজা চোখ ছোটো ছোটো করে জিজ্ঞাসা করল, ‘কালাচাঁদ কে?
পূর্ণা মিনমিনিয়ে বলল, ‘তোমার হবু জামাই,’ তারপরই গলা উঁচিয়ে বলল, ‘আমিও কালা। কিন্তু আপা, তোমার জন্য লিখন ভাইয়ের মতো সুন্দর জামাই দরকার।’
পদ্মজা এক হাতে কপাল চাপড়ে বলল, ‘এখনও লিখন ভাই! যা তোর সঙ্গে তোর নায়কের বিয়ে দিয়ে দেব। এখন আয়, ঘর থেকে বের হ। মুক্তা, সোনামণি, রোজিনা এসেছে। তোর সঙ্গে কথা বলবে। আয় বলছি…আয়।’
পূর্ণাকে টেনে নিয়ে বন্ধুদের মাঝে বসিয়ে দিল পদ্মজা। ঘরে এসে আয়নায় নিজেকে দেখে থমকে দাঁড়াল, ছুঁয়ে দেখল গালের দাগটা। সে কী সত্যি নির্মম, নিষ্ঠুর মুহূর্তটি সহ্য করে নিয়েছে? না, করেনি। বুকের ভেতরটা খুব জ্বলে। এই অপমান মেনে নিতে গিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে মরে যাচ্ছে সে। কিন্তু আম্মা বা পূর্ণাকে সেটা বুঝতে দেয়া যাবে না। পদ্মজা দ্রুত চোখের জল মুছে একা হাসার চেষ্টা করল।
সূর্য মামার রাগ কমেছে। তাই মোড়ল বাড়ির মাথার ওপর থেকে সরে দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সদর ঘর ভরতি মানুষ। হাওলাদার বাড়ির মহিলারা এসেছে। যদিও তাদের আরো আগে আসার কথা ছিল। নানা কারণে তারিখ পিছিয়ে দিতে হয়েছে। হাওলাদার বাড়ির বউদের গ্রামবাসী শেষবার তাদের বিয়েতেই দেখেছে। আবার দেখার সুযোগ হওয়াতে দল বেঁধে মানুষ এসেছে। লোকমুখে শোনা যায়, হাওলাদার বাড়ির মেয়ে-বউদের সারা অঙ্গে সোনার অলংকার ঝলমল করে। মগা-মদনসহ আরো দুজন ভৃত্য মোড়ল বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। পদ্মজাকে শাড়ি পরাচ্ছেন হেমলতা। পদ্মজা এর আগে কখনো শাড়ি পরেনি। পূর্ণা-প্রেমা ছোটো হয়েও পরেছে। পদ্মজার কখনো ইচ্ছে করেনি। তাই সে হেমলতাকে বলল, ‘প্রথম শাড়ি তুমি পরাবে।’
শাড়ি পরানো শেষে, চোখে কাজল এঁকে দেন হেমলতা। ঠোঁটে লিপিস্টিক দিতে গিয়েও দিলেন না। মাথার মাঝ বরাবর সিঁথি করে চুল খোঁপা করতেই, পূর্ণা ছুটে আসে। হাতে শিউলি ফুলের মালা।
হেমলতা মৃদু ধমকের স্বরে বললেন, ‘এতক্ষণ লাগল!’
হেমলতার কথা বোধহয় পূর্ণার কানে গেল না।
পূর্ণা চাপা উত্তেজনা নিয়ে
তা আপাকে কী সুন্দর লাগছে!’
পদ্মজা লজ্জা পেল, চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ল লাল আভা। হেমলতা পদ্মজার খোঁপায় ফুলের মালা লাগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘শুধু রূপে চারিদিক আলোকিত করলে হবে না, গুণেও তেমন হতে হবে।’
পদ্মজা বাধ্যের মতো মাথা নাড়াল। তখন হুড়মুড়িয়ে সেখানে উপস্থিত হয় লাবণ্য। দৌড়ে এসে পদ্মজাকে জাপটে ধরে। এক নিশ্বাসে বলে উঠে, ‘আল্লাহ, পদ্ম তুই আমার ভাবি হবি। আমার বিশ্বাসই হইতাছে না। মনে হইতাছে স্বপ্ন দেখতাছি। ইয়া…মাবুদ, শাড়িতে তোরে পরি লাগতাছে। তোর রূপ দেখে বাড়ির সবাই অজ্ঞান হয়ে যাবে দেহিস।’
পদ্মজা কী বলবে ভেবে পেল না, শুধু হাসল। হেমলতা পদ্মজার মাথার ঘোমটা টেনে দিয়ে লাবণ্যকে বললেন, ‘তোমার সইকে নিয়ে যাও।’
পদ্মজা হেমলতার হাতে হাত রেখে অনুরোধ করে বলল, ‘আম্মা, তুমিও এসো।’
হেমলতা হেসে পদ্মজার মাথায় এক হাত রেখে বললেন, ‘কয়দিন পর থেকে এরাই তোর আপন। মা পাশে থাকবে না।’
পদ্মজার চোখ দুটি সজল হয়ে ওঠে। ছলছল চোখ নিয়ে সে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। পদ্মজাকে নতুন বউ রূপে দেখে হেমলতার বুকে ঝড় বইছে। মেয়েটা কয়দিন পর আলাদা হয়ে যাবে। দুই মাস আগে হলে তিনি সাত রাজার ধনের বিনিময়েও মেয়ের বিয়ে দিতেন না। তিনি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে বললেন, ‘আমি আসছি। লাবণ্য যাও তো নিয়ে যাও। পূর্ণা তুইও যা।’
লাবণ্য পদ্মজাকে নিয়ে যায়। পদ্মজার বুক ধড়ফড় করছে। মায়ের যেন কী হয়েছে! সে পেছন ফিরে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে হেমলতা অন্য দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে, তিনি দ্রুত তা মুছে ফেললেন।
সদর ঘর কোলাহলময় ছিল। পদ্মজা ঢুকতেই সব চুপ হয়ে গেল। লাবণ্য পদ্মজাকে ছেড়ে ভারী আনন্দ নিয়ে বলল, ‘আম্মা, কাকিম্মা, ভাবি, আপারা—এই যে পদ্মজা। আমার নতুন ভাবি।’
পদ্মজা চোখ তুলে তাকাল। অলংকারে জ্বলজ্বল করা পাঁচ জন নারীকে দেখে যেন চোখ ঝলসে গেল। সবাই তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। পদ্মজা চোখ নামিয়ে ফেলল। তখন কোত্থেকে আবির্ভাব হলো আমিরের সদর দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল পদ্মজা, হবু বউকে দেখে থমকে গেল সে। পদ্মজার পরনে খয়েরি রংয়ের জামদানি শাড়ি। শাড়িতে কোনো মেয়েকে এত সুন্দর মনে হতে পারে এর আগে কখনো অনুভব করেনি আমির। আমিরের লজ্জা খুব কম। সে উপস্থিত গুরুজনদের উপেক্ষা করে পদ্মজাকে বলল, ‘মাশাআল্লাহ। দিনের বেলা চাঁদ উঠে গেছে।’
লজ্জায় পদ্মজার রগে রগে কাঁপন ধরে। এত লজ্জাহীন মানুষ কী করে হয়! আমিরের মা ফরিনা ধমকের স্বরে বললেন, ‘বাবু, এইনে বয় আইসসা।’
আমির পদ্মজার ওপর দৃষ্টি স্থির রেখে মায়ের পাশে গিয়ে বসল। হেমলতা সদর ঘরে প্রবেশ করতেই আমির ধড়ফড়িয়ে উঠল। ছুটে এসে হেমলতার পা ছুঁয়ে সালাম করল। হবু শাশুড়ির প্রতি আমিরের এত দরদ দেখে ফরিনা খুব বিরক্ত হলেন। পাশ থেকে ফরিনার জা আমিনা ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘মেয়ের রূপ আগুনের হলকা। বাবু এইবার হাত ছাড়া হইলো বলে।’
আমিনার মন্ত্র ফরিনার মগজ ধোলাই করতে পারল না। পদ্মজার রূপে তিনি মুগ্ধ। আমির কালো বলে তিনি ছোটো থেকেই আমিরকে বলতেন, ‘বাবু, তোর জন্যি চান্দের লাহান বউ আনাম।’
সেই কথা রক্ষার পথে। তিনি শুধু পছন্দ করছেন না শাশুড়ির প্রতি আমিরের এত দরদ! কী দরকার ঝাঁপিয়ে পড়ে পায়ে ধরে সালাম করার? আমির হেমলতাকে ভক্তির সঙ্গে প্রশ্ন করল, ‘ভালো আছেন?’
হেমলতা মিষ্টি করে হেসে বললেন, ‘ভালো আছি। যাও গিয়ে বসো।’
আমির বাধ্যের মতো মায়ের পাশে গিয়ে বসল। মজিদ মাতব্বর, মোর্শেদের সঙ্গে বাইরে আলোচনা করছেন। আর কোনো পুরুষ আসেনি বাড়িতে। তারা বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত। মুহূর্তে পদ্মজার সারা অঙ্গ সোনার অলংকারে পূর্ণ হয়ে উঠল। রূপ বেড়ে গেল লক্ষ গুণ, যার কোনো সীমা নেই। যার সঙ্গেই পদ্মজা কথা বলেছে, সেই এগিয়ে এসে বালা নয়তো হার পরিয়ে দিচ্ছে।
কী অবাক কাণ্ড!
সবাই আড্ডা দিচ্ছে। তবে চুপ করে বসে আছে পদ্মজা। কেউ প্রশ্ন করলে জবাব দিচ্ছে। লাবণ্য একজনকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘রানি আপা, বাড়ির পেছনে যাইবা?’
রানি খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, ‘যাব।’
তার খুশির কারণ লাবণ্য কিছুটা ধরতে পেরেছে। রানির একজন প্ৰেমিক আছে। তাই শুধু সুযোগ খোঁজে দেখা করার। যেখানেই দাওয়াত পড়ে সেখানেই তার প্রেমিক উপস্থিত হয়। লাবণ্য সবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পদ্মজা-পূর্ণা, রানিকে নিয়ে বাড়ির পেছনে যায়। রানি বাড়ির পেছনে এসেই ছুটে যায় ঘাটের দিকে, সেই মুহূর্তেই একটা নৌকা এসে ভেরে সেখানে। নৌকায় কে ছিল দেখা যাচ্ছে না। রানি নৌকায় উঠে পড়ে। শোনা যায়, কারো সঙ্গে সে বিরতিহীন ভাবে কথা বলছে। পূর্ণা লাবণ্যকে প্রশ্ন করল, ‘লাবণ্য আপা, রানি আপা কার সঙ্গে কথা বলে?’
‘আবদুল ভাইয়ের সঙ্গে।’
‘কোন আবদুল?’
‘যার কথা ভাবছিস।’ কথা শেষ করে লাবণ্য চোখ টিপল। পূর্ণা অবাক হয়ে বলল, ‘মাস্টারের সঙ্গে!’
লাবণ্য হাসে। রানি এগিয়ে আসে। লাবণ্য বলল, ‘কথা শেষ?’
‘হ, চইলা গেছে।’
রানি পদ্মজার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মাশাআল্লাহ, তুমি এত সুন্দর। আমার কোলে নিয়া আদর করতে মন চাইতাছে।
পদ্মজা মুচকি হেসে বলল, ‘আপনি খুব শুকনো। আমাকে কোলে নিতে পারবেন না।’
‘শুকনা হইতে পারি। শক্তি আছে।’
রানির কথা বলার ঢংয়ে সবাই হেসে উঠল। পূর্ণা পেছনে ফিরে দেখে আমির আসছে। সে তাৎক্ষণিক পদ্মজার কানে কানে বলল, ‘আপা তোমার কালাচাঁদ আসছে।’
পদ্মজা পূর্ণাকে চোখ রাঙিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘কীসব কথা! উনার বোনরা আছে।’
আমির সেখানে এসেই বোনদের আদেশ করল, ‘লাবণ্য-রানি যা এখান থেকে।’
আমিরের আদেশ শুনে রানি-লাবণ্য খুব বিরক্ত হলো। রানি কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল, ‘দাভাই, থাকি না।’
আমির চোখ রাঙিয়ে ধমকের স্বরে বলল, ‘যেতে বলছি যা।’
লাবণ্য বিরক্তিতে, ইস বলে পদ্মজাকে বলল, ‘আয় অন্যখানে যাই।’
‘পদ্মজা থাকুক। তোরা যা।’
আমিরের কথা শুনে বেশি চমকাল পদ্মজা। লাবণ্য ফোঁসফোঁস করতে করতে বলল, ‘কেন? কেন?’
পদ্মজা-পূর্ণা অন্যদিকে ফিরে আছে। আমির দৃষ্টি কঠোর করতেই লাবণ্য-রানি চলে যায়। পূর্ণা চলে যেতে চাইলে পদ্মজা পূর্ণার হাত চেপে ধরে। পূর্ণা পদ্মজার হাত ছাড়িয়ে, ধীরকণ্ঠে বলল, ‘একা থেকে তোমার কালাচাঁদের ভালোবাসা খাও।’
‘ছি।’
পূর্ণা ছুটে চলে গেল। আমির পদ্মজার পাশে এসে দাঁড়াতেই পদ্মজা বলল, ‘বিয়ের আগে গুরুজনদের না জানিয়ে এভাবে একা কথা বলা ঠিক নয়।’
‘কী হবে?’
পদ্মজা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, ‘কলঙ্ক লাগবে।’
‘আর কী বাকি আছে?’
‘পরিমাণ না বাড়ানোই ভালো।’
পদ্মজার কথা বলতে একটুও গলা কাঁপেনি। বাড়ির ভেতর চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই আমির পদ্মজার এক হাত থাবা দিয়ে ধরে আবার ছেড়ে দিল। পদ্মজা ছিটকে সরে গেল দূরে।
আমির বলল, ‘তুমি সত্যি একটা পদ্ম ফুল, পদ্মবতী। এজন্যই লিখন শাহর মতো সুদর্শন যুবক তোমার প্রেমে পড়েছে।’
দেখা হওয়ার পর এই প্রথম পদ্মজা চোখ তুলে তাকাল। পরপরই চোখের দৃষ্টি সরিয়ে ছুটে বাড়ির ভেতর চলে গেল। আমির অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। এবার আত্মীয় বিদায়ের পালা। যাওয়ার পূর্বে লাবণ্য একটা কাগজ পদ্মজার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘দাভাই দিছে।’
ঘুমাবার আগে পদ্মজা কাঁপা হাতে কাগজটির ভাঁজটি খুলল। কাগজটিতে যত্ন করে লেখা—
সারা অঙ্গ কলঙ্কে ঝলসে যাক,
তুই বন্ধু শুধু আমার থাক।
·
·
·
চলবে……………………………………………………