নুরজাহান শক্ত করে পদ্মজার হাত চেপে ধরে ক্ষীণ স্বরে বললেন, ‘ঘরে আহো, পরে কইতাছি।’
কান্নার শব্দ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। নুরজাহান পদ্মজাকে নিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন। আমির চেয়ার টেনে বসার জন্য প্রস্তুত হতেই নুরজাহান হইহই করে উঠলেন, ‘তুই বইতাছস ক্যান?’
আমির হকচকিয়ে গিয়ে বলল, ‘মানে?’
‘বউয়ের ধারে আর থাহন যাইবো না। আইজ কাইলরাত্রি।’
‘মুসলমানদের কালরাত্রি পালন করতে নেই। গুনাহগার হবেন,’ বলল পদ্মজা। তার মাথা নত। প্রথম দিন এসেই কথা বলা ঠিক হলো নাকি ভাবছে।
মুখের ওপর কথা শুনে নুরজাহান কড়া চোখে তাকালেন। পদ্মজা দেখার আগেই, কয়েকের সেকেন্ড মধ্যে চোখের দৃষ্টি শীতল রূপে নিয়ে এলেন। পদ্মজাকে প্রশ্ন করলেন, ‘গেরামের রেওয়াজ ফালাইয়া দেওন যাইব?’
নুরজাহানের কণ্ঠ স্বাভাবিক। পদ্মজা নির্ভয়ে চোখ তুলে তাকাল। বলল, যা পাপ তা করতে নেই দাদু। জেনেশুনে ভুল রেওয়াজ সারাজীবন টেনে নেওয়া উচিত না। আমার কথা শুনে রাগ করবেন না।’
তুমি কী আইজ জামাইয়ের লগে থাকতে চাইতাছ?’ নুরজাহানের কণ্ঠ গম্ভীর। এমন প্রশ্নে পদ্মজা লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠে। আমতা আমতা করে বলল, ‘ন…ন…না! তে…তেমন কিছু না।’
পদ্মজা আড়চোখে আমিরকে দেখে আবার চোখের দৃষ্টি নত করে ফেলল। আমির নুরজাহানকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি যাচ্ছি বুড়ি।’ এরপর পদ্মজার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে কোমল কণ্ঠে বিদায় জানাল, ‘আল্লাহ হাফেজ পদ্মবতী।’
পদ্মজা নতজানু অবস্থায় মাথা নাড়াল। আমির বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। পদ্মজা ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে নুরজাহানকে দেখল।
ঢোক গিলে বলল, ‘রাগ করেছেন দাদু?’
নুরজাহান হাসলেন। পদ্মজার এক হাত ধরে বিছানার কাছে নিয়ে বললেন, ‘আমার বইনে তো ঠিক কথাই কইছে। গুসা করতাম কেরে?’
পদ্মজা স্বস্তির নিশ্বাস নিলো। নুরজাহান বললেন, তুমি বও। আমি লতুরে ভাত দেওনের কথা কইয়া আইতাছি।’
‘আমি খেয়েছি দাদু। তখন খাওয়ালেন আম্মা।’
‘ব্যাগডা কই? শাড়িডা খুইলা আরেকটা পরো। সিঁদুর রঙেরডা পরবা।’ বলতে বলতে নুরজাহান ব্যাগ থেকে সিঁদুর রঙের শাড়ি বের করে এগিয়ে দিলে, পদ্মজা হাত বাড়িয়ে শাড়িটা নিলো। জানতে চাইল, ‘কোথায় পালটাব?’
‘খাড়াও দরজা লাগায়া দেই। ঘরেই পাল্ডাও। আমারে শরমাইয়ো না, বইন। তোমার যা আমারও তা।’
পদ্মজা শাড়ি হাতে নিয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে শাড়ি পালটানোর মতো উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে থাকল। পালঙ্কের পেছনে চোখ পড়ায় সেদিকে গিয়ে শাড়ি পালটে নিলো। এরপর নুরজাহানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, ‘দাদু তখন কাঁদছিল কে?’
নুরজাহান বিছানায় বসতে বসতে জবাব দিলেন, ‘আমার খলিলের বড়ো ছেড়ার বউ।’
পদ্মজা দুই কদম এগিয়ে আসে।
আগ্রহভরে জানতে চায়, ‘কেন কাঁদছিল? উনাকে কি ঘরে আটকে রাখা হয়েছে?’
‘বও। আমার ধারে বও।’
পদ্মজা নুরজাহানের সামনে ঝুঁকে বসে। নুরজাহান বললেন, ‘তোমার চাচা হউরের (শ্বশুর) বড়ো ছেড়ার বউ রুম্পার গত বৈশাখো আচম্বিক মাথা খারাপ হইয়া যায়। এরে-ওরে মারতে আহে। কেউরে চিনে না। নিজের সোয়ামিরেও না। আলমগীর তো এহন ঢাহাত থাহে। আমির তো গেরামে আইছে অনেকদিন হইলো। আলমগীর শহরে আমিরের কামডা করতাছে। এর লাইগগাই তো আলমগীর বিয়াতে আছিল না। রুম্পা তোমার হউরিরে দা নিয়া মারতে গেছিল।
‘এজন্য আপনারা ঘরে আটকে রাখেন উনাকে? হুট করে কেন এমন হলেন?’ পদ্মজা আঁতকে উঠে জিজ্ঞাসা করল।
নুরজাহান এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী যেন দেখলেন! এরপর সতর্কতার সঙ্গে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘বাড়ির পিছে বড়ো জঙলা আছে। দোষী জায়গা। ভুলেও ওইহানে যাইয়ো না। রুম্পা শনিবার ভরদুপুরে গেছিল, এর পরেরদিন জ্বর উডে। আর এমন পাগল হইয়া যায়। এগুলো তেনাদের কাজ! রাতে নাম লওন নাই। তুমি মাশাল্লাহ চান্দের টুকরা। ভুলেও ওইদিকে যাইয়ো না। ক্ষতি হইব।’
নুরজাহানের কথা শুনে পদ্মজার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে পড়ে। মনে মনে ভাবে, অবিশ্বাস্য! ভয় পেয়ে কারো মাথা খারাপ হয়ে যায়?
পদ্মজা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘উনাকে ডাক্তার দেখানো হয়েছে?’
‘হ। দেহানি হইছে। শহরে দুইবার লইয়া গেছে। কবিরাজ আইল। কেউই ভালা কইরা দিতে পারে নাই। আইচ্ছা এসব কথা বাদ দেও এহন। এই বাড়িত যহন বউ হইয়া আইছো সবই জানবা। খালি বাইরে কইয়ো না এই খবর। গেরামের কেউ জানে না। রাইত অইছে ঘুমাও।’ নুরজাহান শুতে শুতে বললেন, ‘হুনো জামাইয়ের কাছে কইলাম যাইবা না।’
‘না, না…যাব না।’
‘বুঝলা বইন, তোমার দাদা হউরে বিয়ার প্রত্তম রাইতে লুকাইয়া আমারে তুইলা নিজের ঘরে লইয়া গেছিল। আদর-সোহাগ কইরা ভোর রাইতে পাড়াইয়া দিছিল। আমি ছুডু আছিলাম। তাই ডরে কইলজা শুকায়া গেছিল।’
বলতে বলতে নুরজাহান জোরে হেসে উঠলেন। পদ্মজা মৃদু করে হাসে। নুরজাহান ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়েন। পদ্মজা ধীরে ধীরে এক কোণে কাঁচুমাচু হয়ে শুয়ে পড়ে।
কী অদ্ভুত সব! সাধারণত বিয়ের রাতে নতুন বউরা ঘুমানোর সুযোগ পায় না। জামাইয়ের বাড়ির মানুষেরা সারাক্ষণ ঘেঁষে থাকে। পদ্মজা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হারিকেনের আগুন নিভু নিভু করে জ্বলছে, নিভে যাবে যেকোনো মুহূর্তে। কেটে গেল অনেকক্ষণ। ঘুম আসছে না। দেহ এক তীব্র অনুভূতিতে ছেয়ে যাচ্ছে। আচমকা পদ্মজা ভ্রু কুঁচকে ফেলে। কান খাড়া করে ভালো করে শোনার চেষ্টা করে। আবার কাঁদছে! রুম্পা মিনমিনিয়ে কাঁদছে। পদ্মজা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। সঙ্গে সঙ্গে নুরজাহান পদ্মজার দিকে ফেরেন। জানতে চান, ‘ডরাইতাছো?’
‘উনি আবার কাঁদছেন।’
‘সারাবেলাই কান্দে। এইসবে কান দিয়ো না। ঘুমাইয়া পড়ো।’
পদ্মজা উসখুস করতে করতে শুয়ে পড়ল, নিভে গেল হারিকেন। নুরজাহান নাক ডাকছেন, ঘুমিয়ে পড়েছেন। নাক ডাকার তীব্রতা অনেক, যা পদ্মজার বিরক্তি বাড়িয়ে তুলছে। পদ্মজা ঘুমানোর চেষ্টা করল, হাজার ভাবনার ভিড়ে একসময় ঘুমিয়েও পড়ল। শেষ রাতে ঘুমের ঘোরে অনুভব করল, হাঁটুতে কারো হাতের ছোঁয়া। পদ্মজা চটজলদি চোখ খুলে ফেলল। মুখের সামনে কেউ ঝুঁকে রয়েছে। পদ্মজা ধড়ফড়িয়ে উঠে চিৎকার করে উঠল, ‘কে?’
সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ অবয়বটি ছুটে বেরিয়ে যায়। পদ্মজার শরীর কাঁপছে, শরীর বেয়ে ছুটছে ঘাম। ভয়ে ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
সে নুরজাহানকে ভয়ার্ত স্বরে ডাকল, ‘দাদু… দাদু।’
নুরজাহান একটু নড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। পদ্মজা আর ডাকল না। সে ঘন ঘন নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, চোখের দৃষ্টি দরজার বাইরে। দরজা তো লাগানো ছিল। বাইরে থেকে কেউ কীভাবে ঢুকল? নাকি এর মাঝে দাদু টয়লেটে গিয়েছিলেন? পদ্মজার বুক হাঁপড়ের মতো ওঠানামা করছে। সে জিহ্বা দিয়ে শুকনা ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো। একটু ভয় ভয় করছে। কে এসেছিল! এভাবে গায়ে হাত দিচ্ছিল কেন?
পদ্মজা চোখ-মুখ খিঁচে ছি বলে আগন্তুকের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে। বাকি রাতটুকু আর ঘুম হলো না তার। ভয়টা কমেছে। এই জায়গায় পূর্ণা থাকলে হয়তো পুরো বাড়ি চেঁচিয়ে মাথায় তুলে ফেলত। পদ্মজা মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, এরকম ঘটনা পূর্ণার জীবনে যেন না আসে। একদম গুঁড়িয়ে যাবে। উঠে দাঁড়াতে পারবে না। পূর্ণার কথা মনে পড়তেই পদ্মজার বুকটা হু হু করে উঠল। ভীষণ কান্না পাচ্ছে। অন্যদিন পাশে পূর্ণা থাকে। আজ নেই!
ফজরের আজান পড়তেই নুরজাহান চোখ খুললেন। বিছানা থেকে নেমে দেখেন, পদ্মজা জায়নামাজে দাঁড়িয়েছে মাত্র। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ওজু করলা কই?’
‘কলপাড়ে।’
‘চিনছো কেমনে?’
পদ্মজা হাসল। বলল, ‘খুঁজে বের করেছি।’
নুরজাহান চোখ-মুখ শক্ত করে বললেন, ‘নতুন বউ রাইতের বেলা একলা ঘুরাঘুরি কইরা কল খোঁজার কী দরকার আছিল? আমারে ডাকতে পারতা।’
পদ্মজার মাথা নত করে অপরাধী স্বরে বলল, ‘ক্ষমা করবেন, দাদু।’
‘কি কাল আইল। আইচ্ছা, পড়ো এহন। নামাজ পড়ো।’
নুরজাহান অসন্তুষ্ট ভাব নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
পদ্মজার দুই চোখ ছলছল করে উঠে। যখন টের পেল এখুনি কেঁদে দিবে, দ্রুত ডান হাতের উলটোপাশ দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলল।
—————
পদ্মজাকে কাতান শাড়ি পরানো হয়েছে। বউভাতের অনুষ্ঠান চলছে। সে এক বিশাল আয়োজন। বিয়ের চেয়েও বড়ো করে বউভাতের অনুষ্ঠান হচ্ছে। অলন্দপুরের বাইরে থেকেও মানুষ আসছে পদ্মজাকে দেখার জন্য। আটপাড়ার প্রতিটি ঘরের মানুষ তো আছেই। পদ্মজার চারপাশে মানুষ গিজগিজ করছে। রাতে ঘুম হয়নি। পরনে ভারি শাড়ি-গহনা। এত মানুষ চারিদিকে। সব মিলিয়ে পদ্মজার নাজেহাল অবস্থা। মাথা নত করে বসে আছে সে।
‘আপা।’
পূর্ণার কণ্ঠ শুনে মুহূর্তে পদ্মজার ক্লান্তি উড়ে গেল, চোখ তুলে তাকাল চকিতে। পূর্ণা-প্রেমা-প্রান্ত ঝাঁপিয়ে পড়ল পদ্মজার ওপর। পূর্ণা আওয়াজ করে কেঁদে উঠে বলল, ‘রাতে আমার ঘুম হয়নি আপা।
পদ্মজার গলা জ্বলছে। প্রেমা-পূর্ণা-প্রান্তকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে চাপা কণ্ঠে বলল, ‘আমারো ঘুম হয়নি বোন।’
‘আপা, বাড়ি চল।’
পেছন থেকে লাবণ্য বলল, ‘কাইল যাইব। আইজ না। এহন পদ্মজা আমরার বাড়ির ছেড়ি।’
সে পদ্মজার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। পূর্ণা রাগ নিয়ে বলল, ‘আমার বোন আমি নিয়ে যাব।’
‘আমাদের আপা আমরা নিয়ে যেতে এসেছি।’ বলল প্রান্ত।
রানি প্রান্তর কান টেনে ধরে বলল, ‘পেকে গেছিস তাই না?’
‘উ! ছাড়ো, রানি আপা। ব্যথা পাচ্ছি।’
‘ওরেম্মা! তুই শুদ্ধ ভাষাও কইতে পারস?’
রানি অবাক হয়ে জানতে চাইল।
প্রান্ত অভিজ্ঞদের মতো হেসে ইংরেজিতে বলল, ‘ইয়েস।’
যারা যারা প্রান্তকে চিনে সবার চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। প্রান্ত ইংরেজি বলেনি, যেন মাত্রই এখানে বজ্রপাত ঘটাল। রানি চোখেমুখে বিস্ময়ভাব রেখে বলল, ‘এইটা মুন্না না অন্য কেউ।
‘আমি মুন্না না আমি প্রান্ত, প্রান্ত মোড়ল।’ প্রান্তের বলার ভঙ্গী দেখে সবাই হেসে উঠল। পদ্মজা হাসতে হাসতে রানিকে বলল, ‘প্রান্ত অনেকগুলো ইংরেজি শব্দ শিখেছে।’
‘বউ মানুষ কেমনে দাঁত বাইর কইরা হাসতাছে দেখছ? বেহায়া বউছেড়া।’ কথাটি দরজার পাশ থেকে কেউ বলল। অন্য কেউ শুনতে না পেলেও পদ্মজা শুনতে পেল। সে সেদিকে তাকাল। অল্পবয়সি দুজন মহিলা এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন পদ্মজাকে চোখ দিয়ে গিলে খাবে। তাদের উদ্দেশ্যে কেবল হাসল পদ্মজা।
পদ্মজার হাসি দেখে থতমত খেয়ে গেল মহিলা দুজন। একে-অন্যেও দিকে চাওয়াচাওয়ি করে, আবার পদ্মজার দিকে তাকাল। পদ্মজা ততক্ষণে চোখ সরিয়ে নিয়েছে।
অতিথি আপ্যায়ন চলছে ধুমধামে। রমিজ আলী, কামরুল, রজব সবাই উপস্থিত হয়েছে। খাওয়া শেষে তারা আড্ডা শুরু করে।
রমিজ বললেন, ‘মনজুর ছেড়া, জলিল, ছইদ এরা কি আইছে?’
কামরুল দাঁতের ফাঁক থেকে যত্ন করে গরু মাংস বের করে উত্তর দিলেন, ‘না আহে নাই। হেদিন ছইদের বাপে আমার কাছে গেছিল।’
‘কেরে গেছিল?’
‘ছইদরে যাতে মাতব্বরের হাত থাইকা বাঁচায়া দেই।’
‘হেরা এহন কই আছে?’
‘আছে কোনহানে। কয়দিন পরপরই তো উধাও হইয়া যায়। এহনের ছেড়াদের দায়-দায়িত্ব নাই বুঝলা। আমার যহন দশ বছর তহন খেতে কাজ করতে যাইতাম।’
কামরুলের কথা উপেক্ষা করে রমিজ অন্য প্রসঙ্গ তুললেন, ‘ক্ষমতা যার বেশি হের সুখ বেশি। আমার মাইয়াডা নির্দোষ আছিল। তবুও কেমনডা করছিল সবাই? আইজ মাতব্বরের ছেড়া বলে কিছুই হইল না। বদলা আমরা বিয়া খাইতে আইছি।’
রমিজের অসহায় মুখখানা দেখে কামরুল, রজব, মালেক হো হো করে হেসে উঠলেন। রমিজের দৃষ্টি অস্থির। পেট ভরে খাওয়ার লোভে এসেছে সে, নয়তো আসার এক ফোঁটাও ইচ্ছে ছিল না।
—————
পদ্মজা কিছুতেই খেতে পারছে না। অথচ পেট চোঁ চোঁ করছে ক্ষুধায়। চোখের সামনে এত মানুষ থাকলে কী খাওয়া যায়? পূর্ণা ব্যাপারটা ধরতে পেরে লাবণ্যকে বলল। লাবণ্য সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলল বটে, তবে কেউই তার কথা গ্রাহ্য করল না। তাই সে ফরিনা বেগমকে নিয়ে এলো। ফরিনা বেগম সবাইকে বের করে, দরজা ভিজিয়ে দিয়ে যান।
ঘরে শুধু রানি, লাবণ্য, পদ্মজা, প্রেমা, পূর্ণা এবং প্রান্ত। খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো পদ্মজা।
পূর্ণা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল, ‘আপা আমি খাইয়ে দেই?’
পদ্মজা মায়াময় দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। ঠোঁটে ফুটে মিষ্টি হাসি। পূৰ্ণা অনুমতির অপেক্ষা না করে বাড়িয়ে দিল এক লোকমা ভাত। ছলছল করে উঠল পদ্মজার দুই চোখ। পূর্ণা কখনো খাইয়ে দেয়নি। এই প্রথম খাওয়াতে চাইছে। হাঁ করল পদ্মজা। লাবণ্য হেসে বলল, ‘আমার এমন একটা বইন যদি ত
‘আমি তোর বইন না?’ বলল রানি।
লাবণ্য চোখ-মুখ শক্ত করে বলল, ‘জীবনে খাইয়ে দিছস? আবার বইন কইতে আইছস যে।’
‘তুই খাইয়ে দিছস? পূর্ণা তো ছুটু। তুইও তো ছুটু।’
‘আগে পদ্মজা খাওয়াইছে। এরপর পূর্ণা।’
‘আইচ্ছা ভাত লইয়া আয়। খাওয়াই দিমু।’ রানি বলল।
‘এহন পেট ভরা।’
‘হ, এহন তো তোর পেট, নাক, মাথা সবই ভরা থাকব।’
দুই বোনের ঝগড়া দেখে পূর্ণা, পদ্মজা হাসল। কী মিষ্টি দুজন। ঝগড়াতেও ভালোবাসা রয়েছে। লাবণ্যের চেয়ে রানি বেশি সুন্দর। তবে লাবণ্যকে দেখলে বেশি মায়া লাগে। লাবণ্য যে রাগী দেখলেই বোঝা যায়। গতকাল কী রাগটাই না দেখাল! ঘরে ঢুকল আমির। আমিরকে দেখেই পদ্মজা সংকুচিত হয়ে গেল। রানি প্রশ্ন করল, ‘এইহানে কী দাভাই?’
‘পদ্মজাকে নিয়ে যেতে হবে। ওহ খাচ্ছে। আচ্ছা, খাওয়া শেষ হলে নিয়ে যাব।’ বলতে বলতে আমির পদ্মজার সামনে বসল। লাবণ্য জিজ্ঞাসা করল, ‘কই নিয়ে যাবা?’
‘আম্মার ঘরে।’
‘কেন?’
‘আম্মা বলছে নিয়ে যেতে।’
‘আম্মা একটু আগেই দেইখা গেল।’
আমির হকচকিয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, ‘ওহ তাই নাকি?’ রানি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমিরকে পরখ করে নিয়ে বলল, ‘দাভাই, মিথ্যে বলছ কেন?’
‘মি…মিথ্যে আমি? অসম্ভব। আম্মা না দাদু বলছে নিয়ে যেতে। এই তোরা যা তো। তোদের বান্ধবিরা আসছে। যা। হুদাই ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছিস।’
লাবণ্য কথা বাড়াতে চাচ্ছিল। রানি টেনে নিয়ে যায়। প্রেমা-প্ৰান্তও বেরিয়ে যায়। তারা বাড়ি থেকে পরিকল্পনা করে এসেছে, একসঙ্গে পুরো হাওলাদার বাড়ি ঘুরে দেখবে। পূর্ণা খাইয়ে দিচ্ছে। পদ্মজা আমিরের উপস্থিতিতে বিব্রত হয়ে উঠেছে। খাবার চিবোতে পারছে না। আমির পদ্মজাকে বলল, ‘বড়ো ভাবি বলল রাতে নাকি ঘুমাওনি।
‘না… হ্যাঁ। আসলে ঘুম আসেনি।’
‘ঘুমাবে এখন?’
‘না, না। কী বলছেন? বাড়ি ভরতি মানুষ।’
আমিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল পদ্মজা। আমিরের পলকহীন দৃষ্টি দেখে চোখ নামিয়ে নিলো।
আমির বলল, ‘আচ্ছা খাও। আমি আসছি।’
‘আপনি কি রাতে দাদুর ঘরে এসেছিলেন?’
আমির চলে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিল। এই কথা শুনে চমকে তাকাল পদ্মজার দিকে ঝুঁকে জানতে চাইল, ‘কেন? কেউ কি তোমার ঘরে এসেছিল?’
আমিরের এমন ছটফটানি দেখে পদ্মজা খুব অবাক হলো। সে অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ, এসেছিল। শেষ রাতে।’
‘আচ্ছা,’ বলেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল আমির। পদ্মজা পেছনে ডাকল, শুনল না আমির। হুট করে লোকটার পরিবর্তন পদ্মজাকে ভাবাতে লাগল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………