ফাতিমা কাতর চোখে লিখনের দিকে তাকালেন। চোখে চোখ পড়তেই লিখন হাসার চেষ্টা করল। তার দৃষ্টি এলোমেলো। কী বলবে খুঁজে পাচ্ছে না। আমির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ‘আব্বা আসছি,’ বলে জায়গা ত্যাগ করল। শব্দর আলী হতভম্ব হয়ে গেছেন।
তিনি মজিদ মাতব্বরকে প্রশ্ন করলেন, ‘মজা করছেন?’
মজিদ মাতব্বর শব্দর আলীর চোখে চোখ রেখে জবাব দিলেন, ‘প্রথম পরিচয়ে মজা করার মতো মানুষ আমি না ভাইসাহেব।’
লিলি এক হাত লিখনের পিঠের ওপর রেখে ডাকল, ‘ভাইয়া।
লিখন লিলির হাতটা মুঠোয় নিয়ে ঢোক গিলল। বলল, ‘বিয়ে হবে না তো কী? বলেছি যখন দেখাবোই।’
‘ভাইয়া তোর চোখে জল,’ লিলির গলা ভেঙে আসছে।
লিখন দ্রুত হাতের উলটোপাশ দিয়ে চোখের জল মুছল। পরিবেশ থম মেরে গেছে। কেউ কিছু বলার মতো খুঁজে পাচ্ছে না। লিলি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তার ভাইয়ের দিকে। পদ্মজা নামের মেয়েটাকে নিয়ে কত গল্প শুনেছে সে। মেয়েটা তার বয়সি শুনে লিলি খুব হেসেছিল। তার ভাইয়া এত ছোটো মেয়ের প্রেমে পড়েছে! দিনগুলো কত যে সুন্দর ছিল! মেট্রিক পরীক্ষার সময় বার বার খোঁজ নিয়েছে কবে শেষ হবে পরীক্ষা। যেদিন শেষ হলো সেদিন থেকেই শুটিং শুরু হলো। কথা ছিল এক সপ্তাহ পর থেকে শুরু হবে। কিছু জরুরি কারণে আগে শুরু হয়ে গেল। তাই আসতে কয়েকদিন দেরি হয়েছে।
মজিদ মাতব্বর স্তব্ধতা কাটিয়ে বললেন, ‘বিয়েটা একটা দুর্ঘটনার জন্য খুব দ্রুত ঠিক হয়েছে।’
লিখন উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী দুর্ঘটনা?’
ফরিনা সন্দিহান গলায় বললেন, ‘তার আগে তুমি কও তো, পদ্মজার লগে কী তোমার প্রেম-ট্ৰেম আছিল?’
লিখন ফরিনার প্রশ্নে বিব্রতবোধ করল। ধীরকণ্ঠে জবাব দিল, ‘না। শুধু আমার পক্ষ থেকেই।’
লিখনের উত্তরে ফরিনা সন্তুষ্ট হলেন। শব্দর আলী কী দুর্ঘটনা ঘটেছিল জানতে চাইলেন। মজিদ মাতব্বর সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সব বললেন। সব শুনে লিখন আশার আলো দেখতে পায়। ভাবে, এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে বলে অন্য কেউ বিয়ে করবে না—এমনটা ভেবেই হয়তো পদ্মজার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সে যদি এখনি পদ্মজাকে বিয়ে করতে রাজি থাকে, তাহলে তাকে ফিরিয়ে না-ও দেওয়া হতে পারে। আর পদ্মজা কী বিন্দুমাত্র ভালোবাসে না তাকে? বাসে, নিশ্চয় বাসে। লিখন নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দেয়।
শব্দর আলী আফসোস নিয়ে বললেন, ‘কী আর করার! পরিস্থিতি এখন হাতের বাইরে।’
‘আপনারা কিন্তু বিয়ে শেষ করে তবেই যাবেন,’ বললেন মজিদ মাতব্বর।
ফাতিমা মতামত জানালেন দৃঢ়ভাবে, ‘না, না আজই চলে যাব। এই গ্রামে আর এক মুহূর্ত না। ‘
শব্দর আলী মৃদু করে ধমকালেন, ‘কী বলছ? কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা। এখন ট্রেন পাবে কোথায়? কাল ভোরে নাহয় চলে যাব।’
রিদওয়ান অনুরোধ করে বলল, ‘বিয়েটা শেষ হওয়া অবধি থেকে যান। দেখুন, মেহমান হয়ে এসেই অপ্রত্যাশিত খবর শুনলেন। এজন্য খারাপ লাগছে। কিন্তু কিছু তো করার নেই। মেয়েটা জলে ভাসবে বিয়েটা না হলে।
লিখন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলল, ‘পদ্মজাকে ফেলনা ভাবছেন কেন? কেউ অপবাদ দিলেই কী সে পঁচে যায়?’
রিদওয়ান কিছু বলতে গেলে মজিদ মাতব্বর কড়া চোখে তাকিয়ে থামতে ইশারা করেন। কাজের মেয়েকে ডেকে বললেন, ‘উনাদের ঘরে নিয়ে যাও। আর আপনারা না করবেন না। আমি আপনাদের অবস্থা বুঝতে পারছি। বিয়ে অবধি না থাকুন, রাতটা থেকে যান।’
বাধ্য হয়ে ফাতিমা থাকতে রাজি হলেন। তিনি রাগে ফোঁসফোঁস করছেন। সব রাগ হাওলাদার বাড়ির ওপর। মনে মনে এই বাড়ির বিনাশ চাইছেন তিনি। মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। লিখন তার চোখের মণি। নয়তো কী গ্রামের মেয়ে নিতে আসতেন! আর সেই ছেলের মন এভাবে ভাঙল! ঘরে ঢুকেই বিছানায় চোখের চশমা ছুঁড়ে ফেলেন। কটমট করে শব্দর আলীকে বললেন, ‘তোমার না এক বন্ধু আছে মেজর? তাকে কল করে বলো মেয়েটাকে তুলে এনে লিখনের সঙ্গে বিয়ে দিতে। আমার ছেলেকে হারতে দেখতে পারব না।’
‘আহ! চুপ করো তো। সব জায়গায় ক্ষমতা চলে না। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করো।
‘কীসের পরিস্থিতি? তুমি জানো, তোমার ছেলের ব্যক্তিগত ডায়রিতে আগে শুধু আমার নাম ছিল। সেখানে এখন বেশি পদ্মজা নামটা লেখা। কতটা পাগল এই মেয়ের জন্য। এখন মেয়েটাকে ছেড়ে শহরে চলে গেলে,
চলে গেলে, ছেলের দেবদাস রূপ দেখতে হবে। আর আমি তা পারব না।’
শব্দর আলী পায়ের মোজা খুলতে খুলতে অসন্তুষ্টি নিয়ে বললেন, ‘তোমার যা ইচ্ছে করো। আমি পারব না। ক্লান্ত আমি। শান্তি দাও।’
ফাতিমা কড়া কিছু কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। লিলি ঘরে ঢুকেছে। লিখন আসেনি। আমেনা লিলিকে বললেন, ‘লিখন কোথায়?’
‘কী জানি! ভাইয়া ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে বেরিয়ে গেল।’
—————
রোদের কঠিন রূপ শীতল হয়ে এসেছে। মৃদু বাতাস বইছে। তবুও লিখন ঘামছে। পদ্মজার বাড়ির দিকে যাচ্ছে সে। আতঙ্কে তার ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। মাথায় শুধু কয়টা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, ‘আমি কী পাগলামি করছি? এত আয়োজন ভেঙে ওর বাবা-মা কী আমার হাতে তুলে দিবে পদ্মজাকে? পদ্মজা আমাকে দেখলে কী কাঁদবে? ও কী আমাকে একটুও ভালোবাসেনি? মায়া নিশ্চয় জমেছে?’
লিখন আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আল্লাহর কাছে অনুরোধ করে, ‘আল্লাহ, সব যেন ভালো হয়
পূর্ণা বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে আছে। বয়স্ক কিছু মহিলা বাড়ির পেছনে গীত গাইছে। সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচছে দুই বুড়িসহ ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা। পুরো বাড়ি সাজানো হচ্ছে রঙিন কাগজ দিয়ে। উঠানের এক কোণে একটি লাল বড়ো গরু বাঁধা, বিয়ে উপলক্ষে জবাই করা হবে। চারিদিকের এত আনন্দ পূর্ণার মন ছুঁতে পারছে না। প্রথমত, সে স মানসিকভাবে বিপর্যস্ত! কিছুতেই স্থির হতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, পদ্মজার জন্য লিখন শাহ ছাড়া অন্য কাউকে তার পছন্দ হচ্ছে না। সব মিলিয়ে সে উদাসীন। চোখ ছোটো করে বাচ্চাদের খেলা দেখছে। হুট করে চোখের তারায় ভেসে উঠে লিখন শাহ। পূর্ণা দ্রুত চোখ কচলে আবার তাকাল। সত্যি তাই! খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ল সে, হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল পদ্মজার ঘরে। পদ্মজার কানে কানে গিয়ে বলল, ‘লিখন ভাই এসেছে। তুমি কিন্তু পালিয়ে যাবে আপা। এই বিয়ে কিছুতেই করবে না।’
কথা শেষ করে খুশিতে আবার ছুটে গেল বারান্দায়। এমন দিনে লিখনের উপস্থিতি পদ্মজাকে অপ্রস্তুত করে তুলল। গলা শুকিয়ে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
লিখন বাড়িতে ঢুকে হয়ে সব দেখে। কত আয়োজন! কত মানুষ! তার স্বপ্নের রানি পদ্মজার বিয়ে। কিন্তু তার সঙ্গে না! ভাবতেই লিখনের বুক ছ্যাঁত করে উঠল। মেয়েরা খুব আগ্রহ নিয়ে সুদর্শন লিখনকে দেখছে। লিখন পূর্ণাকে বারান্দায় দেখে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, ‘কেমন আছো-পূর্ণা?’
পূর্ণা খুশিতে উচ্চকণ্ঠে জবাব দেয়, ভালো, খুব ভালো। ভাইয়া আপনি…’
পূর্ণা থেমে গেল। অনেকে তার উচ্চ গলার স্বর শুনে তাকিয়ে আছে, তাই চুপসে গেল। আস্তে আস্তে বলল, ‘এত দেরিতে আসলেন কেন? আপার তো বিয়ে। আপনি আপাকে নিয়ে পালিয়ে যান।’
পূর্ণার এমন কথায় লিখন হাসল। আদুরে কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘আন্টি কোথায়?’
পূর্ণা ঝটপট করে বলল, ‘আপনি আসুন ঘরে। আমি আম্মাকে নিয়ে আসছি।’
লিখনকে সদর ঘরে বসিয়ে পূর্ণা ছুটে গেল রান্নাঘরে। হেমলতা রান্না করছিলেন। পাশে অনেকে আছে। পূর্ণা ইশারায় বাইরে আসতে বললে, হেমলতা তাই করলেন। পূর্ণা ফিসফিসিয়ে জানাল, ‘লিখন ভাই এসেছে।’
‘কোথায়? বসতে দিয়েছিস?’
‘হ্যাঁ, দিয়েছি। তুমি আসো।’
হেমলতা ব্যস্ত পায়ে হেঁটে সদর ঘরে যান। এসে দেখেন দুজন বয়স্ক মহিলা অনবরত লিখনকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে: সে কোত্থেকে এসেছে? এই বাড়ির কী হয়? পদ্মজার মতো চোখ কেন? পদ্মজার আসল বাপের ছেলে নাকি। এমন আরো যুক্তিহীন কথাবার্তা। হেমলতা সবাইকে উপেক্ষা করে লিখনকে বললেন, ‘লিখন, তুমি আমার ঘরে এসো।’
লিখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। হেমলতার পিছু পিছু চলে গেল, তা অনেকের নজরেই পড়ল। একজন আরেকজনের সঙ্গে আলোচনা করতে থাকল লিখন শাহকে নিয়ে। সবাই ভেবে নিয়েছে—পদ্মজা যার সন্তান, এই ছেলেও তার সন্তান। এজন্যই সবার মাঝ থেকে তুলে নিয়েছে হেমলতা, নয়তো কথায় কথায় ধরা পড়ে যাবে।
লিখনকে মোড়ায় বসতে দিলেন হেমলতা। লিখন কীভাবে কী শুরু করবে বুঝে উঠতে পারছে না। হেমলতা শুরু করলেন, ‘আমি জানি তুমি কী বলবে। তোমার দুটো চিঠি আমি পড়েছি।’
লিখন লজ্জা পেল। তবে স্বাভাবিক হয়ে গেল পরক্ষণেই। হেমলতা বললেন, ‘দেখো লিখন পরিস্থিতি আর হাতে নেই। অন্য সময় হলে আমি পদ্মজাকে তোমার হাতে তুলে দিতাম। তুমি নম্র-ভদ্র বুদ্ধিমান ছেলে। কমতি নেই কিছুতেই। কিন্তু এখন তা সম্ভব নয়। তবুও পদ্মজা তোমাকে নিজের মুখে যদি চায়, আমি তাৎক্ষণিক তাকে তোমার হাতে তুলে দেব। কিন্তু সে চাইবে না। কারণ, সে তোমাকে ভালোবাসে না। আমার কথাগুলো শুনে কষ্ট পেয়ো না। আমি সরাসরি কথা বলি। পদ্মজার দৃষ্টি, অনুভূতি আমার চেনা। সে তোমাকে ভালোবাসেনি কখনো। শুধু তোমার মন ভাঙবে ভেবে মায়া হচ্ছে, কষ্ট পাচ্ছে। তুমি বাড়ি ফিরে যাও। কষ্ট হবে ভেবেই বলছি, ফিরে যাও।’
লিখন কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল। তার চোখের দৃষ্টি রাখা মাটিতে। তারপর বলল, ‘আন্টি মেয়ের ভালোবাসা দেখছেন, অন্যের সন্তানেরটা দেখবেন না?’
‘অন্যের অনেক সন্তানই আমার মেয়েকে ভালোবাসে। সবার কথা ভাবা কী সম্ভব?’
হেমলতার কথায় ভীষণ আহত হয় লিখন। তার মনে হচ্ছে সে কঠিন পাথরের সঙ্গে কথা বলছে। দুই চোখ জ্বলছে ভীষণ। এখনি কান্নারা ঠেলেঠুলে বেরিয়ে আসবে। ছেলে হয়ে কাঁদা ভীষণ লজ্জার ব্যাপার। লিখন নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। হেমলতা কঠিন স্বরে বললেন, ‘তুমি পদ্মজার রূপের প্রেমে পড়েছো।’
লিখন সঙ্গে সঙ্গে চোখ তুলে তাকাল। বলল, ‘আন্টি ক্ষমা করবেন কিছু কথা বলি। পৃথিবীতে যে কয়টা সফল প্রেমের গল্প আছে তার মধ্যে নিরানব্বই ভাগ সৌন্দর্যের টানেই শুরু হয়। এরপর আস্তে আস্তে ভালোবাসা গভীর হয়। মানুষটাকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে, স্বপ্ন দেখতে গিয়ে ভালোবাসাটা আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। সময়ের ব্যবধানে সে মানুষটা শিরা-উপশিরায় বিরাজ করতে শুরু করে। তখন তার অন্যান্য গুণ চোখে ভাসে। ভালোবাসা আরো বাড়ে। কারো কারো তো দোষও ভালো লেগে যায়। অবস্থা এরকম হয় যে, রূপ নষ্ট হয়ে গেলেও মানুষটাকে আমার চাই। এজন্যই বুড়ো বয়সেও কুঁচকে যাওয়া মানুষটাকেও ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। অথচ শুরুটা হয় সৌন্দর্য দিয়ে। আন্টি, আমি পদ্মজার রূপে মুগ্ধ হয়ে ছিলাম এটা সত্যি। কিন্তু গত কয়েক মাসে সারাক্ষণ পদ্মজাকে ভাবতে গিয়ে আমি সত্যি সত্যি পদ্মজাকে ভালোবেসে ফেলেছি। পদ্মজার রূপ আগুনে ঝলসে গেলেও এমন করেই বাসব। প্লিজ আন্টি, কথাগুলো শুটিংয়ের ডায়লগ ভেবে উড়িয়ে দিবেন না। বাস্তব জীবনে মুখস্থ ডায়লগ আমি আওড়াই না।’
লিখনের কণ্ঠ গম্ভীর, অথচ চোখে জল ছলছল করছে। হেমলতা স্তব্ধ হয়ে যান। এখন কী জবাব দিবেন? ভালোবাসার বিরুদ্ধে কোন শক্তি কাজে আসে? আদৌ কি ভালোবাসার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যায়? তিনি সময় নিয়ে বললেন, ‘আমার পদ্মজা তোমার কাছে খুব ভালো থাকত লিখন। কিন্তু সমাজের কিছু সীমা আছে, যার মুখোমুখি আমি হয়েছি। জেনেশুনে আমার মেয়েকে সেসবের মুখোমুখি কী করে হতে দেই?’
লিখন হাতজোড় করে বলল, ‘প্লিজ আন্টি! ‘
হেমলতা একদৃষ্টে লিখনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। এমন তো কখনো হয় না। পদ্মজার জন্মের পর সিদ্ধান্তহীনতায় কখনো ভোগেননি। যেকোনো একটা পথ বেছে নিয়েছেন, আর তাতেই পদ্মজার মঙ্গল হয়েছে। এবার কেন এমন হচ্ছে? কেন তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছেন? পদ্মজার জীবন নিয়ে যেন ভেসে আছেন মাঝ নদীতে। চারদিকে স্রোত; মাঝি নেই, বৈঠা নেই। আমির না লিখন? কার কাছে ভালো থাকবে পদ্মজা? হেমলতার শরীর ভীষণ খারাপ লাগছে। তিনি দুর্বল কণ্ঠে বললেন, ‘এত বোঝো যখন, তখন নিজেকেও সামলাতে পারবে। বাড়ি ফিরে যাও।’
‘আন্টি, আমার বেঁচে থাকতে কষ্ট হবে।’
‘পদ্মজার সঙ্গে যা হয়েছে তবুও সে বেঁচে আছে। আর তুমি এইটুকু মানিয়ে নিতে পারবে না?
লিখন আর কথা খুঁজে পেল না। আহত মন নিয়ে উঠে দাঁড়াল। চলে যেতে ঘুরতেই হেমলতা দাঁড়াতে বললেন। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে, তবুও হেঁটে লিখনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নিজেকে শক্ত রেখো। তোমার এখনও অনেক পথ যাওয়া বাকি। কারো জন্য কারো জীবন থেমে থাকে না! ভাগ্যে যা থাকে, তাই হয়। সব যেহেতু আয়োজন হয়ে গেছে, তাই আর ভেবে লাভ নেই। তবে কবুল বলার আগেও যদি পদ্মজা বলে, তার তোমাকেই চাই…আমি সব ভেঙেচুরে পদ্মজাকে নিয়ে তোমার বাড়ি ছুটে যাব। আমি আমার মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবাসি, বাবা। এই মেয়েটার সুখের জন্য আমি স্বার্থপর হয়েছি। অন্যের সন্তানের কষ্ট চোখে ভেসেও ভাসছে না। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।’
হেমলতার চোখে জলের ভিড়। লিখন ভীষণ অবাক হয়ে দেখতে থাকল এই কঠিন মানুষটাকে। হেমলতা নিজের দুর্বলতা, নিজের কান্না কেন দেখালেন লিখনকে? জবাব খুঁজে পেল না লিখন। শুধু এইটুকু বুঝতে পারল যে হেমলতার কাছে জীবন মানেই পদ্মজা।
লিখন ভাঙা গলায় ‘আসি’ বলে চলে যায়। হেমলতা সব কাজ ভুলে গুটিসুটি মেরে বিছানায় শুয়ে পড়েন। চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা জল বেরিয়ে আসে। মনের শক্তি কমে গেছে। দুর্বল হয়ে পড়েছেন তিনি। নিজের উপর আস্থা কিংবা বিশ্বাস পাচ্ছেন না। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটুকু যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………