পদ্মজা - পর্ব ১২ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
          বট গাছের সামনে চিন্তিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে লিখন। শীতের শুষ্কতায় বটগাছের অধিকাংশ পাতা ঝরে পড়েছে। লিখনের কাছে শীতকাল খুবই অপছন্দের ঋতু। শীত চরম শুষ্কতার রূপ নিয়ে প্রকৃতির ওপর জেঁকে বসে থাকে যা সহ্য হয় না লিখনের। ঠান্ডা লেগেই থাকে। ছোটো থেকে কয়েকবার নিউমোনিয়ায় ভুগেছে। সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে রুক্ষতা, তিক্ততা ও বিষাদের প্রতিমূর্তি শীতকাল।

লিখন এক হাতের তালু দিয়ে আরেক হাতের তালু ঘষে উত্তপ্ততা সৃষ্টি করে। ভীষণ ঠান্ডা লাগছে। তখন পদ্মজা এত দ্রুত হাঁটছিল যে মনে হচ্ছিল, সে পালাতে চাইছে। লিখন আর এগোয়নি। পালাতে দিল পদ্মজাকে। মগা বলেছে, পদ্মজার লোকসমাজের ভয় খুব। তাই লিখন এই নির্জন মাঠের পাশে বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। পদ্মজা এ পথ দিয়েই বাড়ি ফিরবে। তখন যদি একটু কথা বলা যায়।

পদ্মজা জড়োসড়ো হয়ে হাঁটছে। ভয়ে ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। বার বার জিহবা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছে।

পদ্মজা মিনমিনে গলায় পূর্ণাকে ডাকল, ‘পূর্ণা রে…’

পূর্ণা তাকাল। পদ্মজা এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, ‘আমার ভয় হচ্ছে। উনি মাঝপথে দাঁড়িয়ে নেই তো?’

পূর্ণা চরম বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘থাকলে কী হয়েছে? খেয়ে ফেলবে?’

পদ্মজা আর কথা বলল না। পূর্ণার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। তখন লিখন শাহকে পাত্তা না দেয়ার জন্য পূর্ণার খুব রাগ হয়েছে। পদ্মজা বরাবরই মাথা নিচু করে হাঁটে। তাই লিখন শাহকে দেখতে পেল না। পূর্ণা দূর থেকে দেখতে পায়। কিন্তু এইবার আর পদ্মজাকে আগে থেকে বলল না। সে উত্তেজিত হয়ে ভাবছে, লিখন শাহ্ যখন আপার সামনে এসে দাঁড়াবে কী যে হবে!

—————

লিখন-পদ্মজার দূরত্ব মাত্র কয়েক হাত…তখন পদ্মজা আবিষ্কার করল লিখনের উপস্থিতি। সে দ্রুত ওড়নার ঘোমটা চোখ অবধি টেনে নিলো। ভয়ে- লজ্জায় তার সর্বাঙ্গে কাঁপন ধরে গেছে। লিখনের পাশ কাটার সময় পুরুষালি কণ্ঠটি ডেকে উঠল, ‘পদ্ম।’

পদ্মজা দাঁড়াতে চায়নি। তবুও কেন যেন দাঁড়িয়ে গেল। লিখন দুয়েক পা এগিয়ে আসে। পূর্ণা ঠোঁট টিপে সেই দৃশ্য গিলছে। লিখন উসখুস করতে শুরু করে, কথা গুলিয়ে ফেলেছে। পদ্মজা লিখনকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। লিখন হতভম্ব হয়ে অবাক চোখে শুধু চেয়ে রইল।

পূর্ণা বলল, ‘আমাকে বলুন, আমি বলে দেব।’

লিখন পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে অনুরোধ স্বরে বলল, দয়া করে, তোমার বোনকে দিয়ো। আমি কাল বিকেলে ঢাকা চলে যাব।’

পূর্ণা হাসিমুখে চিঠিটি হাতে নিয়ে বলল, ‘আপা আপনার আগের চিঠিটা প্রতিদিন পড়ে।’

কথাটি শুনে লিখনের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। পূর্ণা চিঠি নিয়ে দৌড়ে ছুটে যায় পদ্মজার দিকে। লিখন আর পিছু নিলো না। পূর্ণা আসতেই পদ্মজা ধমকে উঠল, ‘কী কথা বলছিলি এত? কেউ দেখলে কী হতো? তুই আম্মার কথা কেন ভাবছিস না?’

পদ্মজার কাঁদো-কাঁদো স্বরে পূর্ণা চুপসে গেল। সত্যি কী সে বেশি করে ফেলল? পূর্ণা আশপাশে তাকিয়ে দেখে, কেউ আছে নাকি। সত্যি কেউ দেখে থাকলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। পূর্ণা চোখ নামিয়ে চুপচাপ হেঁটে বাড়ি চলে আসে। হঠাৎ সৃষ্টি আতঙ্কের কারণে চিঠির কথা আর পদ্মজাকে বলা হয়ে উঠে না।

—————

গোধূলি বিকেল। হেমলতা পদ্মজাকে ফরমায়েশ দেন, ‘পদ্ম, কয়টা টমেটো নিয়ে আয়।

‘আচ্ছা, আম্মা।’

পদ্মজা লাহাড়ি ঘরের ডান দিকে যায়। দুমাস আগে মোর্শেদ এদিকের সব ঝোপজঙ্গল সাফ করে টমেটোর ছোটোখাটো খেত করেছেন। লাল টকটকে টমেটো। হেমলতা রান্নার ফাঁকে বারান্দার দিকে উঁকি দিলেন। মোর্শেদ আর প্রান্ত কিছু নিয়ে বৈঠক করছেন।

হেমলতা ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লেন। বাসন্তী নামক মানুষটিকে কী কারণে ত্যাগ করলেন মোর্শেদ? জানতে ইচ্ছে করলেও হেমলতা এই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করলেন না। তবু এতটুকু বুঝেছেন মোর্শেদের বাইরের ঘোর কেটে গেছে, যার ফলস্বরূপ সংসারে তার মন পড়েছে। হেমলতাকে খুব সমীহ করে চলেন। তবে হেমলতা জানেন, মোর্শেদ পদ্মজাকে নিজের মেয়ে হিসেবে এখনো মেনে নেননি। তা নিয়ে মাঝেমধ্যেই খোঁচা দেন। এত অবিশ্বাস মানুষটার!

পদ্মজা সাবধানে খেতের মধ্যখানে গেল। টমেটো ছিঁড়তে গিয়ে মনে পড়ে গেল তার লিখনের কথা। মনে মনে ভাবল, কেন এসেছেন উনি? কী-ই বা বলতে চেয়েছিলেন?

জানার জন্য ব্যকুল হয়ে হয়ে ওঠে পদ্মজার মনটা 1

‘আপা, একটা কথা বলি?’

পদ্মজা চমকে পেছনে তাকাল, হঠাৎ পূর্ণার আগমনে ভয় পেয়েছে। বুকে ফুঁ দিয়ে বলল, ‘বল।’

রাগ করবে না তো?’

পদ্মজা চোখ ছোটো ছোটো করে তাকাল। বলল, ‘করব না।’

পূর্ণা লিখনের দেয়া চিঠিটি দেখিয়ে বলল, ‘লিখন ভাইয়ার চিঠি।’

পদ্মজা ছোঁ মেরে চিঠিটি নিলো। তার এহেন ব্যবহারে পূর্ণা অবাক হলো বটে, সেই সঙ্গে মনে মনে খুশি হলো বোনের আকুলতা দেখে। পদ্মজা দ্রুত চিঠির ভাঁজ খুলল। পূর্ণা বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখছে, কেউ আসছে নাকি পদ্মজা পড়া শুরু করল।

প্রিয় পদ্ম ফুল,

চার মাস কেটে গেল। চার মাসে একটুও অবসর মেলেনি। কিন্তু মনে ছিল এক আকাশ ছটফটানি। তোমার মনের কথা তো জানাই হলো না। তোমাদের অলন্দপুরের প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছেলের স্বপ্ন তোমাকে ঘরে তোলার। তাই সারাক্ষণ ভয়ে ছিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে কেউ তুলে নেয়নি তো! তিন দিনের সময় নিয়ে চলে এসেছি। শুধু একবার দেখতে আর জানতে, তুমি কি আমার জন্য অপেক্ষা করবে? মেট্রিক পরীক্ষা অবধি অপেক্ষা করলেই হবে। এরপর আমি মা আর বাবাকে নিয়ে তোমার মায়ের কাছে আসব। উনার কাছে অনুরোধ করব, তোমার পড়া শেষ হলে যেন আমার সঙ্গেই বিয়ে দেন। উনি কথা দিলে অনেকটা নিশ্চিন্ত হতে পারব। এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছি। আমি গুছিয়ে লিখতে পারছি না আজ। কয়েকটা চিঠি লিখেছি। একটাও মনমতো হয়নি। অনুগ্রহ করে তুমি মানিয়ে নিয়ো। ভুলত্রুটি মার্জনা কোরো।

ইতি
লিখন শাহ্

বাড়ির সবাই ঘুমে। পদ্মজা চুপিচুপি উঠে বসে পড়ার টেবিলে। রাত অনেক, গাছের পাতায় নিশ্চয় শিশির বিন্দু জমছে। এরপর ভোররাতে টিনের চালে শিশিরকণা বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টির মতো ঝরবে। গাঁ হিম করা ঠান্ডা, তা উপেক্ষা করে পদ্মজা হাতে কলম তুলে নিলো। সাদা কাগজে লিখল, অপেক্ষা করব। এরপর কাগজটা ভাঁজ করে বালিশের তলায় রেখে শুয়ে পড়ল।

ফজরের নামাজ আদায় করে চার ভাইবোন পড়তে বসে। পড়ায় মন টিকছে না পদ্মজার। বই আনার ছুতোয় পদ্মজা ঘরের ভেতর চলে গেল। রাতের লেখা কাগজটা ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে দিল জানালার বাইরে। এরপর আবার নতুন করে লিখল: আমার আম্মা যা চান তাই হবে।

পড়াশেষে অভ্যাসবশত ঘাটে যায় পদ্মজা। হাতের মুঠোয় তিনটে চিঠি—দুটো লিখনের, একটা তার লেখা। পূর্ণাও পাশে। প্রেমা- প্ৰান্ত বাড়িজুড়ে ছুটাছুটি করছে। সামনের কোনোকিছু ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। সবকিছুই অস্পষ্ট। কুয়াশার স্তর এত ঘন যে, দেখে মনে হচ্ছে সামনে কুয়াশার পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। সেই পাহাড় ভেদ করে একটা নৌকা এসে ঘাটে ভেরে। নৌকায় লিখন আর মগা। আকস্মিক ঘটনায় পিলে চমকে উঠল পদ্মজার। পালানোর মতো শক্তিটুকু পেল না।

লিখন মায়াভরা কণ্ঠে পদ্মজার উদ্দেশ্যে বলল, ‘আমি বাধ্য হয়ে এসেছি। আজ বিকেলে চলে যাব। মগা বলল, প্রতিদিন সকালে নাকি তুমি ঘাটে বসো। তাই এসেছি।’

পদ্মজা মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়ছে। ভয়ে বুক দুরুদুরু করছে। মা দেখে ফেললে কী হবে? বা অন্য কেউ? একটু সাহস জড়ো হতেই নিজের লেখা চিঠি সিঁড়িতে রেখে পদ্মজা ছুটে চলে গেল বাড়ির ভেতর। পূর্ণা বড়ো বড়ো চোখে শুধু দেখল। লিখন নৌকা থেকে নেমে চিঠিটা হাতে তুলে নেয়। ভাঁজ খুলে একটা লাইন পেল শুধু। বিষাদের ছায়া নেমে আসে লিখনের মুখে।

পূর্ণার কৌতূহল হলো চিঠিতে কী আছে জানার জন্য। তবে তা প্রকাশ বল না। শুধু বলল, ‘আপা আপনার কথা প্রতিদিন ভাবে।’

—————

১৯৯৬ সাল। পদ্মজা থেমে থেমে কাঁপছে। মুখ লুকিয়ে রেখেছে হাঁটুর ওপর। তুষার কালো চাদর টেনে দিল তার গায়ে। পদ্মজা চোখ তুলে তাকাল। বিষাদভরা কণ্ঠে বলল, ‘সেদিন আমার লেখা প্রথম চিঠিটা কুটিকুটি কেন করেছি জানি না। ইচ্ছে হয়েছিল তাই করেছি। তবে জানেন, আমি একদম ঠিক করেছিলাম। সেদিন যদি আমি কথা দিয়ে দিতাম। আমার কথা ভঙ্গ হতো।’

পদ্মজা হাসল। তুষার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পদ্মজার দিকে।

বলল, ‘লিখনের সঙ্গে আর দেখা হয়নি?’

পদ্মজা হাতের কাটা জায়গায় ফুঁ দিয়ে বলল, ‘হয়েছিল।’

‘তাহলে কথা ভঙ্গ হতো কেন বললেন?’

তুষারের দিকে তাকাল পদ্মজা, এরপর হাঁটুতে মুখ লুকালো। এক মিনিট, দুই মিনিট, তিন মিনিট করে…কেটে গেল দশ মিনিট। পদ্মজার সাড়া নেই। তুষার ডাকল, ‘পদ্মজা? শুনতে পাচ্ছেন?’

‘পাচ্ছি।’

‘আপনার কী কষ্ট হচ্ছে?’

‘হচ্ছে।’

‘মুখ তুলে তাকান।’

পদ্মজা ছলছল চোখে তাকাল। তুষার উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, ‘কোনো সমস্যা হচ্ছে?’

তুষারের প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে পদ্মজা ভেজা কণ্ঠে বলল, ‘আমার আম্মা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কেন করল?’

তুষার ভেতরে ভেতরে চমকাল। হেমলতা নামে মানুষটার সম্পর্কে যা জানে এবং জানল, তাতে তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শব্দটা যায় না পরপরই নিজেকে সামলে নিলো।

ভালো মানুষের খারাপ রূপ—এমন কেইস শত শত আছে।

তুষার সাবধানে প্রশ্ন করল, ‘কী করেছেন তিনি?’

পদ্মজা উত্তর দিল না। মেঝেতে শুয়ে চোখ বুজল। তুষার গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। পদ্মজা এখন আর কিছু বলবে না, সে ক্লান্ত; অতীত হাতড়াতে গিয়ে মনের অসুস্থতা বেড়ে গেছে। তুষার তাকাল মেয়েটার মুখের দিকে। আঁচল সরে গেছে তার বুকের ওপর থেকে, চাদরের অংশ পড়ে আছে মেঝেতে। তুষার চাদরটা টেনে দিতে গিয়ে আবিষ্কার করল, পদ্মজার গলায় কালো-খয়েরি মিশ্রণে কয়টা দাগ। কেউ শক্ত হাতে চেপে ধরেছিল গলা! হুংকার ছাড়ল সে, ‘ফাহিমা?’

ফাহিমা কাছেই ছিল, তাই ছুটে এলো। তুষার বলল, আপনি আসামির গলা টিপে ধরেছেন?’

ফাহিমা চট করে বলল, ‘না, স্যার। প্রথম থেকেই গলায় দাগগুলো দেখছি। প্রশ্নও করেছি। মেয়েটা উত্তর দিল না।’

কপাল ভাঁজ করে ফেলল তুষার। হাজারটা প্রশ্ন মাথায় ভনভন করছে, মস্তিষ্ক শূন্য প্রায়। পদ্মজা যতটুকু বলেছে, তার পরের সাত বছরের কাহিনি জানা পর্যন্ত শান্তি মিলবে না। মাথা কাজ না করলে তুষার সিগারেট টানে। তাই সে বেরিয়ে গেল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp