কামিনী - পর্ব ৯১ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          রাত সবে গাঢ় হয়েছে। সুরসুন্দরীর চোখে নিদ্রা নেই। কেদারায় বসে দুলছেন তিনি। মনের ভেতর হাজারও জল্পনা কল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছে। এভাবেই তো আর জীবন পাড় করা যায় না। এভাবে আর এক জায়গায় কতদিন থাকবেন? অনেকতো হলো। যেই উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলেন তা তো সফল হলোই। এবারতো ফেরা উচিত। 
তপ্ত শ্বাস ফেলতেই তার কক্ষে উপস্থিত হলো তাপসী। আজকাল তার দেখা পাওয়াই ভার! রাজ্যের রানি হতে কিছু বাদ রাখছে না। ক্ষমতা পেলে বানরও যে বাঘ হতে চায় সেটার যেন জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ সে। মাটিতে পা ফেলছে না এতটাই তার পা উঁচু হয়েছে। 

 “আমায় ডেকেছিলেন?”
 তাপসী প্রশ্ন করেই সুরসুন্দরীর মুখ পানে তাকাল। সুরসুন্দরী উত্তর দিলেন না। এতে যেন ধৈর্যহারা হলো তাপসী আরও, অধিক। 
“কিছু বলবেন?”

 “কেন? কিছু না বললে কি তোকে ডাকা যাবে না? বড়ো তাড়া দেখছি তোর!”
 সুরসুন্দরীর রুক্ষ স্বরে তাপসী মুখ ভার করল। তার চোখে-মুখে সুরসুন্দরীর প্রতি বিরক্তি যেন উপচে পড়ছে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে কিছু সংশয় থাকায় সে বাহানা দিলো, 
“রাজা কক্ষে তো। আমাকে যেতে বলেছেন। আমাকে চোখে হারান কি-না।”

  তাপসীর কথায় আপনা-আপনি ভ্রু কুঁচকে গেলো সুরসুন্দরীর। মাথা ঘুরিয়ে এবার সোজাসাপ্টা ভাবেই তাকালেন তাপসীর দিকে,
“কী? চোখে হারান?”

 “হ্যাঁ। চোখেই হারাচ্ছেন। যতই হোক আমি তো তার সহধর্মিণী। অন্য কিছুতো আর না। বৈবাহিক বন্ধন।”
খুব সুক্ষ্ম ভাবেই যেন সে সুরসুন্দরীর দিকে ইঙ্গিতটি করল। সুরসুন্দরী কি আর সেই বোকাটি যে ইঙ্গিত বুঝবেন না? তিনি ঠিক ইঙ্গিত বুঝলেন। এবং এইটুকু মেয়ের এমন চতুরতা দেখে হেসে খু ন হলেন। সে কী অট্টহাসি! চারপাশ যেন তার হাসির তোপে কাঁপতে লাগল।

  “তুই অন্যকিছু কি আমায় বুঝালি? বড়ো চতুরতা দেখাচ্ছিস তাই না? বড়ো পতী ভক্তি জাগছে মনে? একটি লাথি মেরে তোর চতুরতা আমি বের করে দেবো। আমার সাথে কুটিলতা দেখানোর সাহসও করিস না। আমি রাজা চর্যাপদের রানির মতো নই। আমি কোনো সাবধান বাণী দিয়েই চুপ থাকব না। এমন করে কে টে জলে ভাসিয়ে দিবো যেন পরের জন্মেও আমার নাম না ভুলিস।”

 তাপসীর মুখটা শক্ত হয়ে আসে আরও। কিন্তু সে আরও কিছু বলার আগেই বাহির থেকে রাজার হুঙ্কার ভেসে আসে। সে কী গগণ কাঁপানো হুঙ্কার! 
সুরসুন্দরী ও তাপসীর কথোপকথন থেমে যায় সেখানেই। এতদিন যাবত তারা এই প্রাসাদের রাজার একটু উঁচু কণ্ঠও শুনেনি সেখানে আজ রীতিমতো রাজা চিৎকার করছেন! 
 তাপসী প্রথমে ছুটল। পেছন পেছন সুরসুন্দরীও বের হলেন। 

 —————

 থরথর করে কাঁপছেন রানি। এর আগে কখনো তাকে এতটা বিধ্বস্ত দেখা যায়নি। চুল এলোমেলো, চোখ দু'টো অসার। আপ্রাণ চেষ্টা করছেন কিছু বলার কিন্তু মুখে শব্দ আসছে না। 
 রাজা চর্যাপদের রাগে শরীর উষ্ণ হয়ে গিয়েছে। চোখগুলো হলদেটে দেখাচ্ছে। কণ্ঠে তীব্র তাচ্ছিল্যতা,
“আমার রাজপ্রাসাদে এমনও দিন দেখতে হবে তা কি আমি কখনোই কল্পনা করেছিলাম? তুমি আমার রানি হয়ে কীভাবে এমন কাজটি করলে? শয়নগৃহে কি-না অন্য পুরুষ প্রবেশ করালে? ছি!”

  রানির চোখ-মুখ ম্লান হয়ে আছে। কক্ষে উপস্থিত সুরসুন্দরী, তাপসী, যাবর ও রানির ছোটো চার বছরের শিশু হেমলক। সে নিজের মাতাকে ধরে রেখেছে আষ্টেপৃষ্টে। পিতার এমন তীর্যক কথা বুঝতে না পারলেও মাতার বিধ্বস্ততা যেন বুঝতে পারছে। পিতার ধমকে সে-ও কেঁপে কেঁপে উঠছে। 

  তাপসী আগ বাড়িয়ে এলো। হতভম্বের মতো রানির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনাকে তো আমি অন্যরকম ভেবেছিলাম। আপনার কথাবার্তা, চালচলন, আচরণ যেন এক ভিন্ন নারীকে দেখেছিলাম। কিন্তু আপনি এমনটা করলেন শেষমেশ?”

 তাপসীর কথায় রানির শরীরে যেন আগুনের মতো লাগছিলো। জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিলো যেন তার শরীরটা। তিনি শেষ মুহূর্তেও নিজের সেই আত্মমর্যাদা ধরে রেখে ধমকে উঠলেন,
“তুমি খবরদার আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলবে না। তোমার সেই যোগ্যতাই নেই আমাকে নিয়ে কথা বলার। খবরদার।”

  “আমার না-হয় যোগ্যতা নেই আমি মেনে নিলাম। কিন্তু আপনি তো যোগ্য ছিলেন! আপনার পিতার নাকি বিরাট রাজ্য। আপনার ক্ষমতার জৌলুশ তাই বিরাট। সেই আপনি কীভাবে পরপুরুষ কক্ষে প্রবেশ করালেন?”

“তাপসী, থাম। এখানে তোকে কথা বলতে বলেনি কেউ। আগে পুরো ঘটনা বুঝতে হবে এরপর দোষারোপ।”

“আমার সংসারে আমি কথা না বললে কি আপনি বলবেন?” তীক্ষ্ণ স্বরে তাপসী প্রশ্ন ছুঁড়ল সুরসুন্দরীর উদ্দেশ্যে। এমন বিদঘুটে বলার ভঙ্গিতে রাগ বাড়ল সুরসুন্দরীর। দোর থেকে হনহনিয়ে এসে আচমকাই গলা চেপে ধরলেন তার। এতটাই আচমকা যে কেউই বুঝে উঠতে পারল না। 
 দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব তোর। বড়ো দাপট বেড়েছে না? বড্ড সংসার চিনে নিয়েছিস? তোর চোখ ফোটালাম আমি আর তুই আমাকে সেই চোখ দিয়ে গিলে নিতে চাচ্ছিস? এত তোর কথার জোর? এগুলো আমার টেনে ছিঁড়ে নিতে এক মুহূর্তও লাগবে না।”

 এত তীব্র ভাবেই তিনি তাপসীকে ধরলেন যে তাপসীর চোখ উল্টে যাওয়ার উপক্রম। দমবন্ধ হয়ে মুখ দিয়ে লালা পড়তে শুরু করল। রাজা গিয়ে সুরসুন্দরীকে আগলে নিয়ে, ছাড়িয়ে দিলেন জোরপূর্বক তাপসীকে। তার একটি হাত দিয়ে সুরসুন্দরীর বাহু চেপে রাখলেন। তার সেই উচ্চকণ্ঠ সুরসুন্দরীর কাছে এসে হয়ে গেলো শীতল। কী আহ্লাদ করে বলল,
“ছেড়ে দাও তাকে। তারও বড়ো কথা বেড়েছে যে। তোমাকে ছোটো করতে দু'বার ভাবে না। তার ব্যবস্থা আমি করব তুমি যা বলো তা-ই।”

 সুরসুন্দরীর রাগ তখন তুঙ্গে। ফুঁসছেন তিনি। রাজা চর্যাপদ তেমনই আগলে ধরে রেখেছেন। যেন ছোটো শিশুটির প্রতি স্নেহের আলিঙ্গন। 
রানি দূরে দাঁড়িয়ে সেসবই দেখলেন চোখ মেলে। দেখল ছোটো শিশু হেমলকও। তার পিতা তার মাতাকে এমন তীব্র অপমান করে কীভাবে অন্য একটি নারীকে আগলে ধরে রেখেছেন!

 রানির ঘৃণায় মুখ তেঁতো হয়ে গিয়েছি। এতক্ষণ নিজেকে যতটুকু কলঙ্ক থেকে বাঁচানোর আগ্রহ ছিলো ততটুকুও নিভে গেলো অন্তর থেকে। কাকে তিনি নিজের চরিত্রের শুচিতার কথা বলবেন? এই রাজাকে? যেই রাজা তারই সামনে রক্ষিতাকে জাপটে ধরে রেখেছেন? যেই রাজা নিজের স্ত্রীর চরিত্রের প্রতি আস্থা না রেখে পুরো প্রাসাদকে শুনিয়েছেন স্ত্রী পরপুরুষ কক্ষ আনে। বলে কী হবে? এত বছরের সংসার জীবনে যে এতটুকুই চিনল না নিজের রানিকে তাকে আর মুখ ফুটে বলে, চিনিয়ে কী লাভ? আর চেনাতে যাবেনই বা কেন রানি? কীসের আশায়? এই সংসার, এই প্রাসাদ, এই রাজ্য, এই রাজা কিছুই যে তার নেই! তাহলে আর নিজের চরিত্র বাঁচানোর চেষ্টা কীসের জন্যও বা করবেন?

  সুরসুন্দরীর মাথা চাড়া দিয়ে উঠা রাগ কিছুটা দমে আসলেই তিনি তাপসীর দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে শাসালেন। অতঃপর রানির দিকে তাকিয়ে এ যাবতকালের সবচেয়ে মোলায়েম স্বরে বললেন,
 “রানি, আপনি বলুন আপনি কী বলতে চান? আপনার কক্ষ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সেই পুরুষটি কে ছিলেন? তিনি আপনার কক্ষে প্রবেশ করেও বা ছিলেন কেন? আপনি যা বলতে চান, বলুন। আমি কথা দিচ্ছি এই তাপসী আর একটা শব্দও করবে না।” 

  সুরসুন্দরীর মোলায়েম কণ্ঠ রানির কাছে যেন তাচ্ছিল্যের মনে হলো। তিনি বেশ ভালো করেই জানেন তার সাথে আজ এসব করেছেন কে। নিশ্চয় এই সুরসুন্দরী। তাকে সবদিক থেকে শেষ করে শান্তি হয়নি বলে আজ দুর্নাম দিয়ে শেষ করতে চেয়েছেন। তিনি বেশ ভালো করে জানেন। তিনি হিংস্র হয়ে উঠলেন। ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন,
 “আমাকে আপনি হারিয়ে দিয়েছেন। আমি হার মেনে নিলাম। আর আমার সাথে অভিনয় করবেন না। আপনার মতো এমন নির্দয় নারী আর একটিও হয় না। আপনাকে আমি শাপ দিলাম, আপনি কখনো ভালো থাকবেন না। আপনিসহ আপনার আগামী সকল প্রজন্ম একাকীত্ব নিয়ে বাঁচবেন। একা, দুর্নাম, কলঙ্ক নিয়ে বাঁচবেন। ভালোবাসাহীন জীবন নিয়ে বাঁচবেন। আমি শাপ দিলাম। স্রষ্টা যদি থেকে থাকেন তবে তিনি আমার কথা শুনবেন। মিলিয়ে নিয়েন। মিলিয়ে নিয়েন।”

  কথা বলতে বলতে রানি বসে পড়লেন মেঝেতে। তার যেন আর কথা বলার শক্তি নেই। 
সুরসুন্দরী চোখ বন্ধ করে নিলেন এক নিমিষেই। তিনি এ জীবনে অনেক সংসার ভেঙেছেন, অনেক অভিশাপ মাথা পেতেই নিয়েছেন কিন্তু আজকের অভিশাপ যেন তার অন্তর চূর্ণ করে ফেলছে। তিনি কি এতটাই দুঃখ দিয়ে ফেলেছেন তবে? এতদিন তো কারো অভিশাপ তার অন্তর অব্দি পৌঁছায়নি তবে আজ কেন?

 রানির অভিশাপের তীব্র প্রতিবাদ করলেন রাজা, “খবরদার। নিজে অসৎ কর্ম করে অন্যের উপর সেই দায় গছিয়ে দিবে না। খবরদার রানি। নিজের কক্ষে পরপুরুষ প্রবেশ করিয়েছো দৈহিক তাড়নায় আর সেই দায় কি-না ওকে দিচ্ছো?”

  রানি হাসলেন রাজার কথায়। এই মানুষটার সঙ্গে কি-না তিনি সংসার করেছেন? এই মানুষটার সঙ্গে? যে এমন ভরা মজলিসে তার চরিত্রের নিলাম করতে উঠেপড়ে লেগেছে? বাহিরের দাসদাসী, রক্ষীদের জানাচ্ছেন যে তার স্ত্রী চরিত্রহীন? এই কালি কি রাজা ইচ্ছে করেই এত বেশি করে লাগালেন যেন তার নিজের চরিত্র আরেকটু শুদ্ধ হয়ে উঠে? এতই স্বার্থপর হন পুরুষমানুষ? সুরসুন্দরী তাহলে ভুল কিছুতো বলেননি। আজ যে সেসকল জলের মতোই স্বচ্ছ! 

  সুরসুন্দরী থামিয়ে দিলেন রাজাকে। রানিকে কাছে গিয়ে কোমল স্বরে বললেন, “আমি বিশ্বাস করি না রানি এমন করেছেন। আপনার পুরুষমানুষ বড়োই বিশ্বাসঘাতক জাত। যার সাথে ঘর করলেন তাকেই দোষারোপ করতে দু'বার ভাবেন না, রাজা চর্যাপদ। কিন্তু আমি রানিকে বিশ্বাস করি। আমি জানি উনি কিছু করেননি।”

  বলতে বলতে যেই না সুরসুন্দরী রানির বাহু ধরতে যাবেন তখন রানি ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন। এতটাই জোরে যে সুরসুন্দরী ছিটকে পড়ল। 
রাজা সেই প্রথম রানির কেশগুচ্ছ চেপে ধরলেন। এতটাই জোরে যে ব্যথায় শব্দ করে উঠলেন রানি। সঙ্গেতো অকথ্য ভাষা ছিলোই।

“নিজে চরিত্র ভাসিয়ে এখন তার উপর দোষ দিচ্ছো? এত আস্পর্ধা তোমার? এত? চরিত্রহীন, নষ্ট নারী।”

  ঘৃণায় চোখে জল জমল রানির। কিন্তু তিনি আর কিচ্ছুটিই বললেন না। ফ্যালফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে রইলেন তার ভালোবাসার মানুষটির দিকে। এইতো সেই মানুষ যাকে তিনি কতই না যত্ন করে ভালোবেসেছিলেন। কত স্বপ্ন দেখেছিলেন। সব স্বপ্ন আজ হাসছে তাচ্ছিল্য করে। সব স্বপ্ন ভেসে যাচ্ছে উন্মাদ স্রোতে। এত ভুল মানুষকে ভালোবাসলেন তিনি? তার চরিত্রে কলঙ্ক লেগেছে সেটার আফসোস হচ্ছে না। আফসোস হচ্ছে তার ভালোবাসায় কলঙ্ক লাগার। এমন মানুষকে তিনি ভালোবাসলেন শেষমেশ? এমন মানুষ যে তার গায়ে হাত দিতে দু'বার ভাবল না?

 শিশু হেমলক চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। পিতার থেকে ছাড়াতে চাইল মাতাকে। কিন্তু তার সেই কান্নায় পিতার মন গলল না। 
এমন বিশৃঙ্খল পরিবেশ, শিশুটির ভীত চোখ সুরসুন্দরী সহ্য করতে পারল না। রাজাকে ছাড়িয়ে আনলো নিজেই। তারও রাজার প্রতি রাগ হচ্ছে আরও। রাগ আরও অধিক হচ্ছে পুরুষজাতটির উপর। এই জাতটি এত অসভ্য, এত হিংস্র, এত পাষাণ! রানির জন্য করুণাও হচ্ছে তার। এই রাজার জন্যই রানি কতই না ঘৃণা করল সুরসুন্দরীকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঘৃণা কার প্রাপ্য ছিলো?

  রাজা তখন রাগে অগ্নিশর্মা। তেড়ে তেড়ে আসতে চাচ্ছেন।
“ছাড়ো আমায়, সুরসুন্দরী। ছাড়ো। তার এত সাহস আসে আমার প্রাসাদে পুরুষ প্রবেশ করানোর? এতো?”

  "মানলাম সে পুরুষ ঢুকিয়েছে তাই সে খারাপ। আর আপনি যে রক্ষিতা প্রবেশ করিয়ে ছিলেন? বিবাহও করেছেন, সে বেলা? রাজা যখন বিবাহ করেন একের অধিক, প্রাসাদে বাইজি রাখেন, গণিকা রাখেন, খাসদাসীও রাখেন অনেক তখন রাজার ঐশ্বর্য বৃদ্ধি পায়। কারণ রাজা যে পুরুষ। নারীকে উপভোগ করাই তার পুরুষত্ব। কিন্তু রানির কক্ষে যদি একজন পুরুষের ছায়াও পাওয়া যায় তবে রানি চরিত্রহীন। কারণ সে যে নারী। চরিত্র যে কেবল নারীদেরই থাকে। চরিত্রহনন কেবল নারীরই হয়। কলঙ্ক শব্দটিকেও বিধাতা কেবল নারীদের জন্যই তৈরি করেছেন। তাই না?"

 সুরসুন্দরীর একের পর এক প্রশ্নে রাজা দমে আসতে নারাজ। হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলেন তাই। যাওয়ার আগে রানিকে বলেও গেলেন তার বিচার হবে আগামীকাল। তার পিতাকেও আনানো হবে। যেই নাগরকে এনেছিলেন সেই নাগর বেশিদূর পালাতে পারবে না, তাকেও খুঁজে আনা হবে। 
রানি প্রতিত্তোরে একটি কথাও বললেন না। নিশ্চুপ রইলেন। যেন ঝড়ে সব হারিয়ে পথের কাঙ্গালিনী হয়ে গিয়েছেন তিনি।

—————

 রাত গভীর হয় আরও। দূর বন থেকে ভেসে আসে কত বন্য পশুর ডাক। নির্ঘুম রানি হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়ান প্রাসাদের বাহিরে। যেন বোবা হয়ে গিয়েছেন তিনি। কথা হারিয়েছেন বিনা যুদ্ধে। 
এই সংসার তাকে এভাবে প্রত্যাখ্যান করবে তিনি তা ভাবতেই পারেননি। তার এত শখের সংসার! তার এত সাজানো সবকিছু! শেষমেশ কি-না তাকে চরিত্রটুকু নিয়ে বাঁচতে দিলো না?

  চারপাশে অত্যাধিক বাতাস ও গভীর অন্ধকারে রানি গিয়ে দাঁড়ালেন মোটা বৃক্ষটির সামনে। তিনি যখন বধূ হয়ে এলেন তখন এই বৃক্ষটির নিচেই তাকে বরণ করা হয়। এই মাটি, এই বৃক্ষ তার বড়ো আপনার। 
রানি বৃক্ষটিতে হাত বুলান। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন। 
“ও মাটি, ও বৃক্ষ আমার যে কিচ্ছুটি রইল না। আমায় যে সর্বশান্ত করে দিলো ওরা। আমায় যে নিঃশেষ করে দিলো। আমায় তুমি গ্রহণ করো। আমি সত্যি বলছি আমি অপবিত্র নই। আমায় গ্রহণ করলে তোমার পাপ হবে না, তুমি অশুচি হবে না।”

 রানির আর্তনাদের বিপরীতে বৃক্ষটি নীরব রইল। তার যদি কণ্ঠ থাকতো, ক্ষমতা থাকত তবে সে-ও বোধহয় রানিকে সান্ত্বনা দিত। আগলে নিতো বুকের ভেতর। কিন্তু তার কি আর সেই ক্ষমতা আছে?
 সেই অমোঘ রাতেই রানিকে বৃক্ষ অধিকার দিলো তার ডালে ঝু লে পড়ার। এই পৃথিবীর স্বার্থপরতা থেকে বিদায় নেওয়ার। রানি ছটফট করলেন। শেষবেলাতেও রাজপ্রাসাদের সেই দিকটাতে তাকালেন যেই দিকটায় রাজার কক্ষ আছে। ভালোবাসা, প্রেম কি আর এক লহমায় রাজার মতো তিনি মুছতে পরেন? পারেন না যে। তিনি তো স্বার্থপর পুরুষজাত নয়। তিনি যে নারী। আর নারীর ধর্মই যে শেষবেলা অব্দি প্রেম, মায়া দিয়ে যাওয়া। তিনিও তাই দিলেন। শেষবেলা অব্দি রাজাকে ভালোবেসেই বিদায় নিলেন। মৃত্যু তাকে চির পবিত্রতা দিয়ে জড়িয়ে নিলো। পরম আলিঙ্গনে। যার কেউ হয় না, মৃত্যু তারও হয়। মৃত্যু যে ভেদাভেদ জানে না। 

  রানি ছটফট করতে করতে থেমে গেলেন। পা দু'টো ঝুলল হাওয়ায়। ক্যামিলাসের অপবিত্রতা মোচন করে দিয়ে গেলেন। নিজের সমস্ত কলঙ্ক লেপে দিয়ে গেলেন রাজার ললাটে। তার মৃত চোখগুলো দিয়ে তখনও অশ্রু ঝড়ল। সুরসুন্দরী আবারও জিতলো। পুরুষ জাত নিমকহারাম সেই খেলায় রানিই সুরসুন্দরীকে জিতিয়ে দিয়ে গেলেন। 

 [ক্যামিলাসের ইতিহাস সমাপ্ত]
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp