পদ্মজা - পর্ব ৫৩ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
          কোনো সাড়া নেই। পদ্মজা পেছনে ফিরে তাকাল। লিখন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। অন্ধকারে তার দিকে চেয়ে কী যে দেখছে! পদ্মজা আবার মুখ ঘুরিয়ে নিলো। কাটা কাটা গলায় বলল, ‘কিছু বলার নেই, আসি আমি।’

‘ভুলে গেছো আমায়? মনে পড়ে না?’ লিখনের কণ্ঠে ব্যাকুলতা।

পদ্মজার তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ, ‘না ভুলবার মতো কোনো সম্পর্ক কী আমাদের ছিল? ছিল না। আর এভাবে নির্জনে কথা বলা ঠিক হচ্ছে না। আপনি বুঝদার মানুষ, জ্ঞানী মানুষ। এতটুকু নিশ্চয়ই বুঝবেন।’

লিখন ম্লান হেসে বলল, ‘আচ্ছা, আজ আসো।’

‘একটা অনুরোধ ছিল।’

‘কী?’

পদ্মজা ফের তাকাল। সরাসরি লিখনের চোখের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে লিখনের বুক কেঁপে উঠল, সে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। পদ্মজা বলল, ‘নিজেকে এবার গুছিয়ে নিন। মরীচিকার পেছনে অনেক দৌড়েছেন, আর না। এবার নিজের জীবনটা নতুন করে সাজান। আপনার মনের জোর বাড়ান। মানুষ দ্বিতীয় প্রেমেও পড়ে। দ্বিতীয় বার কাউকে ভালোবাসে। মনপ্রাণ উজাড় করে ভালোবাসে। আপনি চেষ্টা করুন। আপনিও পারবেন। কেউ না কেউ আপনার জন্য অবশ্যই আছে।’

‘পদ্ম ফুল।’

পদ্মজা একটু সময়ের জন্য হলেও থমকায়। লিখন বলল, ‘এভাবেই ভালো আছি আমি। তুমিও এভাবেই সারাজীবন ভালো থেকো।’

পদ্মজা কী জবাব দেবে, বুঝে উঠতে পারছে না। এই লিখন শাহ তো এক ধ্যানেই পড়ে আছে। সে আর কথা দীর্ঘ করল না। যে বুঝেও বুঝতে চায় না, তাকে বুঝিয়ে লাভ নেই। সে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, ‘শুভ রাত্রি।’

লিখন পদ্মজার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল, তার চোখ অশ্রুসজল। তবে বুকে প্রশান্তি। জীবনের খরতাপ দহনে মায়াময় পদ্মজার কণ্ঠ, একটু দেওয়া সময় তার বুকে প্রশান্তির ঢেউ তুলেছে। এই…এইটুকু সময়ের স্মৃতি নিয়েই কয়েকটা রাত আরামে ঘুমানো যাবে। সে বিড়বিড় করল, ‘আমি মানতে পারি না তুমি অন্য কারো। আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

শেষের শব্দ তিনটে ঘোর লাগা কণ্ঠে ভেঙে ভেঙে বলল।

—————

পূর্ণাকে ঘরে এনে পদ্মজা ধমকে বলল, ‘এই ঠান্ডার মধ্যে সোয়েটার না পরে কীভাবে থাকিস? বাইরে বাতাসও হচ্ছে। আমার কোনো কথাবার্তাই কী শুনবি না?’

পূর্ণা অপরাধী স্বরে বলল, ‘আর হবে না, আপা। আগামীকাল সন্ধ্যার আজানের সঙ্গে সঙ্গে ঘরে চলে আসব।’

‘জি, না। বিকেল থেকেই ঘরে থাকবেন। এমনিতেই এই বাড়ির অবস্থা ভালো না। তুই দুই দিন পর বাড়িতে চলে যাবি।’

‘তুমি যাবে না?’

পদ্মজা আনমনে কিছু ভাবল। বলল, ‘যাব। কয়দিন পর। শোন, রাতে টয়লেটে যেতে ভয় পেলে আমাকে ডাকবি। চেপে রাখবি না।’

‘আচ্ছা।’

পূর্ণা খুক খুক করে কাশতে থাকল। পদ্মজা বিচলিত হয়ে বলল, ‘কাশিও হয়ে গেছে! কত ঠান্ডা বাঁধিয়েছিস। জ্বরও আছে নাকি দেখি।’

পদ্মজা পূর্ণার কপাল ছুঁয়ে তাপমাত্রা অনুমান করে বলল, ‘আছেই তো। তুই কী নিজের যত্ন নেয়া শিখবি না? সারাদিন নতুন শাড়ি পরে, সাজগোজ করে ঘুরে বেড়ালেই নিজের যত্ন নেয়া হয়ে যায়? স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হবে তো।’

পূর্ণা বাধ্য মেয়ের মতো বলল, ‘আচ্ছা নেব।’

‘তা তো সবসময় বলিস। তুই বস, আমি কুসুম গরম পানি নিয়ে আসছি। গড়গড়া কুলি করে এরপর ঘুমাবি।’

‘আপা–’

—তুই চুপ থাক। চুপচাপ লেপের ভেতর শুয়ে থাক। আমি আসছি।’

পদ্মজা রান্নাঘরে এসে দেখে বালতিতে পানি নেই। বাড়ির সবাই যার যার ঘরে আছে। হয়তো ঘুমিয়েও গেছে। আমির তো সেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। পদ্মজা ছোটো বালতি হাতে নিয়ে কলপাড়ে আসে। চারিদিক নির্জন, থমথমে। কোনো সাড়াশব্দ নেই। পদ্মজা আশপাশে চোখ ঘুরিয়ে নিলো। ঝাপসা আলোয় পুরো বাড়িটাকে রহস্যময় মনে হচ্ছে। যদিও এই বাড়িতে সবসময়ই রহস্য বিদ্যমান!

পদ্মজা বালতি রেখে কল চাপতে যাবে তখনই কানে একটা ঝনঝন শব্দ আসে। স্টিলের কিছু কাছে কোথাও পড়েছে। পদ্মজা থমকে দাঁড়াল। কান খাড়া করে বুঝতে পারল, শব্দটা রানির ঘর থেকে আসছে। রানি আপার কোনো বিপদ হলো না তো? পদ্মজা ছুটে আসে রানির ঘরের সামনে। কানে ক্রোধ মেশানো চাপা কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘তোমার লগে কয়বার হুতছি বইললা ভাইবো না সবসময় হুইতে দিয়াম। মাড়িতে যেভাবে এতদিন ছিলা, আজও থাকবা। বিছানাত ওঠার জন্য গাঁইগুঁই করবা না।’

‘মাডিত অনেক ঠান্ডা লাগে। আমারে এক কোনাত জায়গা দাও।’

‘তুমি মাডিত থাকবা মানে মাড়িত থাকবা। কামলা হইয়া মালিকের ছেড়ির লগে হুইবার সাহস আর করবা না।’

‘আমি বিছানাত ঘুমাইয়াম। তুমি আমার বউ লাগো।’

তুমি মাডিত ঘুমাইবা। আমি তোমারে জামাই মানি না।’

‘দেহো, রানি—’

এরপরই একটা আর্তচিৎকার ভেসে আসে। রানি-মদন তর্ক করছে। নিশ্চয় রানি মদনকে ধাক্কা দিয়েছে। মদন ব্যথা পেয়েছে। পদ্মজা একবার ভাবল, দরজায় কড়া নাড়বে। এরপর ভাবল, স্বামী-স্ত্রীর অনেক কথা সে শুনে ফেলেছে। আর না শোনাই ভালো। যেহেতু তারা কারো সামনে ঝগড়া করে না, রাতে নিজ ঘরে সবার অগোচরে ঝগড়া করছে তাহলে ব্যপারটা ব্যক্তিগত। পদ্মজা সরে আসে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। এই দাম্পত্য সংসারে কী ভালোবাসা, সুখ কখনো আসবে না? মদন তো দেখতে খারাপ না। শুধু এতিম আর এই বাড়ির একজন বাধ্য ভৃত্য। এ ছাড়া তো ভীষণ সহজ-সরল। সবার সঙ্গে হেসেখেলে কথা বলে। ঠোঁটে সবসময় লেগে থাকে হাসি।

লিখন আর মৃদুল একই ঘরে, একই বিছানায় শুয়েছে। লিখনের জন্য আলাদা ঘর ছিল বটে, কিন্তু সে মৃদুলের সঙ্গেই শুয়েছে। ছেলেটাকে খুব ভালো লেগেছে তার। সোজাসুজি কথা বলে। মনে কিছু চেপে রাখতে পারে না। এতক্ষণ বকবক করেছে। সবেমাত্র অন্যপাশে ফিরে চোখ বুজেছে। বোধহয় ঘুম পেয়েছে। লিখনের মনটা আনচান করছে। ইচ্ছে হচ্ছে, পদ্মজাকে দেখতে যেতে, একসঙ্গে বসে গল্প করতে। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। এই বাড়িতে আর আসা যাবে না। পদ্মজার সামনে এলেই মন বেপরোয়া হয়ে যায়। কত-শত ইচ্ছে জেগে ওঠে। লিখনের ব্যক্তিত্ব ভীষণ শক্ত। শুধু এই একটা জায়গাতেই সে দুর্বল। এভাবে চলতে পারে না। নিজের জায়গায় নিজেকে শক্ত থাকতে হবে। লিখন জোরে নিশ্বাস ছাড়ল। মৃদুল ফিরে তাকাল। বলল, ‘ভাইয়ের ঘুম পাইতাছে না?’

‘হু। তুমি ঘুমাও।’

মৃদুল মেরুদণ্ড সোজা করে শুয়ে বলল, ‘আপনি—’

‘আপনি না তুমি। একটু আগেই না আমাদের কথা হলো। তুমি আমাকে তুমি বলবে।’

মৃদুল হাসল। বলল, ‘তুমি যে মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করছো সে মেয়েটা পদ্মজা ভাবি। তাই না?’

লিখন অপ্রস্তুত হয়ে উঠল। পদ্মজা যে বাড়ির বউ সে বাড়ির আত্মীয়র সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলাটা নিশ্চয় অনুচিত! এতে পদ্মজার অসম্মান হবে। সে তো চায় না পদ্মজা কষ্ট পাক, তাকে নিয়ে কেউ দুই লাইন বেশি ভাবুক। পদ্মজা সবসময় ভালো থাকুক। লিখন জোরপূর্বক হাসল। তারপর বলল, ‘কী বলছো! তেমন কিছুই না। ঘুমাও এখন। আমারও অনেক ঘুম পাচ্ছে।’

লিখন অন্যদিকে ঘুরে শুয়ে পড়ে। মৃদুল হতাশ হয়ে চোখ বুজে।

পদ্মজা অন্ধকারে ধীরে ধীরে হাঁটছে। হাতে কাচের গ্লাস। তাতে কুসুম গরম পানি। সিঁড়িতে পা রাখতেই কারো পায়ের আওয়াজ কানে এলো। পদ্মজা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, আলমগীর চোরের মতো চারপাশ দেখে দেখে সদর দরজার দিকে যাচ্ছে। পদ্মজা দ্রুত সিঁড়ি থেকে নেমে চেয়ারের পেছনে লুকিয়ে পড়ল, গ্লাস রেখে দিল এক পাশে। তার স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। চোখ দুটি তীক্ষ্ণ হয়ে আলমগীরকে পরখ করছে। আলমগীরের পরনে পাঞ্জাবি। বাড়িতে ভদ্রলোকের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। শান্তশিষ্ট, চুপচাপ। মাঝেমধ্যে দেখা যায়…তবে কথা হয় না। প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়। নিজ ইচ্ছায় কথা বলে না।

সদর দরজা পেরিয়ে গেল আলমগীর। পদ্মজাও সাবধানে আলমগীরের পিছু নিলো। পায়ের জুতাগুলো হাঁটার তালে মৃদু শব্দ তুলছে। তাই পদ্মজা জুতোজোড়া খুলে দরজার পাশে রেখে দিল। আলমগীর অন্দরমহলের ডান দিকে এগোচ্ছে। ঝিঁঝি পোকার ডাক চারিদিকে। দূরে কোথাও শেয়াল ডাকছে। গা ছমছমে পরিবেশ। এদিক-ওদিক কোনো মৃদু শব্দ হতেই পদ্মজা উৎকর্ণ হয়ে উঠছে। কেমন গা কাঁটা দিচ্ছে। এত রাতে দীর্ঘদেহী এই লোক যাচ্ছে কোথায়? হাঁটতে হাঁটতে তারা বাড়ির পেছনে চলে আসে। আলমগীর অন্দরমহলের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। মনে হচ্ছে এটাই তার গন্তব্য। পদ্মজা কলাগাছের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। বাতাসে গা কাঁপুনি দিচ্ছে। আলমগীর চারপাশ দেখে নিলো টর্চ জ্বালিয়ে। তারপর মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত আওয়াজ করল। কাউকে ইঙ্গিত দিচ্ছে! পদ্মজার রগে রগে দামামা শুরু হয়।

কী হতে চলেছে? আজ কী দেখবে?

বিরক্ত হয়ে শোয়া থেকে উঠে বসল পূর্ণা। এতক্ষণ হয়ে গেল তার আপা আসছে না কেন? সে জুতা পরে নেমে এলো নিচ তলায়। রান্নাঘরে যাওয়ার পথে পায়ে কাচের গ্লাস লেগে পড়ে গেল। ভয় পেয়ে গেল পূর্ণা। এখানে গ্লাস কে রাখল? খানিকটা পানি লাগল তার পায়ে। মনে হচ্ছে, পানিটা গরম। এই রাতের বেলা গরম পানি এখানে…কীভাবে?

পূর্ণা ভাবল, তার আপার না পানি গরম করার কথা ছিল? কিন্তু গরম করে এখানে কেন রাখবে? তার কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তো! পূৰ্ণা রান্নাঘরে এসে দেখে—পদ্মজা নেই। আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সে। দরজার পাশে পদ্মজার জুতা দেখে ভয়টা আরো বেড়ে যায়। সে দৌড়ে আমিরের ঘরে গেল। গিয়ে দেখল, আমির ঘুমাচ্ছে। পদ্মজা নেই। পূর্ণা এবার ঘামতে থাকল। সে শুনেছে, এই বাড়িতে ভূত-জিন আছে। এরা মানুষের ক্ষতি করে। বিশেষ করে সুন্দর মানুষদের। তার মানে তার আপার গুরুতর বিপদ! পূর্ণা এক দৌড়ে রান্নাঘরে এসে জ্বালিয়ে নিলো একটা লণ্ঠন। অন্যসময় হলে ভয় কাজ করত। আজ করছে না। সে তার আপাকে জান দিয়ে হলেও বাঁচাবে। সে ভাবছে, কোনো পাজি জিন হয়তো আপার উপর ভর করে পুকুরপাড়ে নিয়ে গেছে।

পূর্ণা ঝটপট বেরিয়ে পড়ে। কাউকে ডাকার বুদ্ধি অবধি মাথায় আসেনি। সে আতঙ্কে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে। আয়তুল কুরসি পড়তে পড়তে পুকুরপাড়ের পথ ধরে।

—————

পদ্মজাকে চমকে দিয়ে তৃতীয় তলার একটা জানালা হাট করে খুলে যায়। সেখান থেকে একটা মোটা দড়ি ছুঁড়ে দেওয়া হয় আলমগীরের উদ্দেশ্যে। পদ্মজার ওষ্ঠদ্বয় আপনা থেকেই আলাদা হয়ে গেল, দুই চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে রইল সেদিকে। আলমগীর সেই দড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় উঠে গেল। দেখে মনে হচ্ছে: এর আগেও বহুবার আলমগীর কাজটা করেছে।

মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে গেল পদ্মজার। জানালা দিয়ে আলমগীর কার ঘরে গিয়েছে? তৃতীয় তলায় সে একবার গেছে বলে জানেও না, কোন ঘরে কী আছে। ঠান্ডা, শিরশিরে একটা অনুভূতি হচ্ছে পায়ের গোড়ালিতে। পদ্মজা এক হাত দিয়ে ছুঁতেই বুঝতে পারে জোঁকে ধরেছে। জোঁকে তার খুব ভয়। কিন্তু এখন ভয় করছে না। তার স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে আছে অন্যকাজে। সে জোঁক ছাড়িয়ে নিলো।

অনেকক্ষণ পার হয়ে গেলেও আলমগীরের দেখা নেই। দড়ি তো ঝুলছে! আবার কী নামবে? পদ্মজা কোমরে এক হাত রেখে তাকিয়ে রইল। আচমকা মনে পড়ে গেল—তৃতীয় তলায় রুম্পা আছে। ডান দিকের কোনো এক ঘরে। আর আলমগীর ডান দিকের কোনো ঘরের জানালা দিয়েই ঢুকেছে। মানে কী? রুম্পার কাছে গিয়েছে?

পদ্মজা বারংবার শুধু চমকাচ্ছে। আলমগীর দড়ি বেয়ে নামতে শুরু করল। তারপর ইশারায় অন্য কাউকে নামতে বলল। কাঙ্ক্ষিত সেই মুখটি দেখে চমকে গেল পদ্মজার পিলে। রূম্পা! শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে দড়ি বেয়ে নামছে। বার বার দড়ি থেকে হাত ছুটে যাচ্ছে তার। আলমগীর দুই হাত বাড়িয়ে রেখেছে যাতে রুম্পা পড়ে গেলে ধরতে পারে। পদ্মজার বুক দুরুদুরু করছে, যদি রুম্পা পড়ে যায়! এত ঝুঁকি কেন নিচ্ছে?

রুম্পার পা মাটিতে পড়তেই আলমগীর শক্ত করে রুম্পাকে জড়িয়ে ধরল। পরক্ষণেই ভেসে এলো রুম্পার কান্নার সুর। সঙ্গে সঙ্গে রুম্পার মুখ চেপে ধরে কিছু একটা বলল আলমগীর। টর্চের আলো ফেলে চারপাশ দেখে, রুম্পাকে এক হাতে শক্ত করে ধরে হাঁটা শুরু করল সামনে। তখন কোথেকে উদয় হয় একজন অদ্ভুত লোকের। লোকটা কালো, মোটা, লম্বা চুল। এক হাতে রাম-দা, অন্য হাতে লাঠি। অজানা বিপদের আশঙ্কা পেয়ে ভয় হলো পদ্মজার। পা থেকে কিছুটা দূরে থাকা কয়েকটা পাথরের মধ্যে বড়োসড় দেখে একটা পাথর হাতে নিলো, যেন বিপদে কাজে লাগানো যায়। পরক্ষণেই তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গেল আলমগীর আর অজ্ঞাত লোকটির মধ্যে। একসময় তা হাতাহাতিতে রূপ নিলো। রুম্পা ভয়ে জুবুথুবু হয়ে গেছে। অজ্ঞাত লোকটি রুম্পাকে ধরতে চাইছে। কিন্তু আলমগীর তা হতে দিচ্ছে না। পদ্মজার মনে হচ্ছে, এখন তার সামনে যাওয়া উচিত। আল্লাহর নাম নিয়ে সে কলাগাছের পেছন থেকে বেরিয়ে আসে। আলমগীর অজ্ঞাত লোকটির হাত থেকে রাম-দা নিয়ে দূরে ফেলে দিল, পরক্ষণেই দেখতে পেল পদ্মজাকে। চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘বোন, সাহায্য করো।’

অজ্ঞাত লোকটি পদ্মজাকে দেখে আরো বেশি হিংস্র হয়ে উঠল। ছুটে এসে ছোঁ মেরে রুম্পাকে ধরতে চাইল সে। আলমগীর ঝাঁপিয়ে পড়ল অজ্ঞাত লোকটির ঘাড়ে। দুই হাতে ঝাপটে ধরে রেখে রুম্পাকে বলল, ‘তুমি যাও, রুম্পা।

রুম্পা দৌড়ে পদ্মজার কাছে আসে। সে হাঁপড়ের মতো হাঁপাচ্ছে, ঘামছে ভয়ে। আলমগীর অজ্ঞাত লোকটিকে আটকে রাখতে পারছে না। সে অনেক কষ্টে অনুরোধ করে, ‘আমার রুম্পাকে ওরা মেরে ফেলবে। তুমি ওরে খালপাড়ে নিয়ে যাও পদ্ম। আমি আজীবন তোমার গোলাম হয়ে থাকব।’

পদ্মজা দুই হাতে আঁকড়ে ধরে রুম্পাকে। আলমগীরের হাত থেকে পড়ে যাওয়া টর্চের আলো অজ্ঞাত লোকটির মুখে পড়তেই পদ্মজার খুব চেনা মনে হয়। পারিজার খুনির বর্ণনাও ঠিক এমনই—ভাবতেই পদ্মজার রক্ত ছলকে ওঠে।

সেই মুহূর্তে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভাব ঘটে পূর্ণার। সে পুকুরপাড়ে যাচ্ছিল। টর্চের আলো পেয়ে এদিকে ছুটে এসেছে। অজ্ঞাত লোকটি রুম্পার উদ্দেশ্যে হাতের লাঠি ছুঁড়ে মারে। দ্রুত রুম্পাকে নিয়ে সরে যায় পদ্মজা, লাঠি গিয়ে সোজা পড়ে পূর্ণার কাঁধে। আপা বলে আর্তনাদ করে বসে পড়ে সে।

পদ্মজা দিকদিশা হারিয়ে ফেলল। কী করবে সে? মনে হচ্ছে রুম্পাকে কেউ খুন করতে চাইছে, তাই আলমগীর তাকে নিয়ে পালাচ্ছে। আর এই নাম না জানা লোক রুম্পাকে আঘাত করতে চাইছে কেন? পূর্ণাও আঘাত পেয়েছে। কী করবে পদ্মজা? রুম্পাকে নিয়ে খালের দিকে পৌঁছে দিবে? পূর্ণাকে এই ভয়ংকর পরিবেশ থেকে নিরাপদে নিয়ে যাবে?

নাকি পারিজার খুনি হিসেবে সন্দেহ করা লোকটিকে ধরবে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp