পিটপিট করে চোখ খুলতেই দেখলো সাদা সিলিংয়ে ফ্যান ঘুরছে। মাথাটা ভার হয়ে আছে।আবারও কিছুক্ষণ সময় নিয়ে চোখ বন্ধ করে আবার খুলল।
মেয়ের জ্ঞান ফিরেছে দেখেই রাহার মা, মিসেস “সাথী বেগম”, তাড়াতাড়ি ছুটে এসে মেয়ের শিয়রে বসলো,
আর জিজ্ঞেস করলো—
“কেমন লাগছে মা আমার?”
রাহা কিছুক্ষণ তার মায়ের দিকে অবুঝের মতো তাকিয়ে রইল। চোখে যেন বুঝাতে চাইছে— তার কী হয়েছিল!
রাহার জ্ঞান ফিরেছে শুনে একে একে বাড়ির সবাই ছুটে এলো। সবাই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে।
সবার দৃষ্টি অনুভব করতেই হঠাৎ রাহার মনে পড়ে গেল অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্তটা। আর সঙ্গে সঙ্গে ভয় জেঁকে ধরল তাকে।
সে কী দেখেছিল তখন? কেন দেখেছিল? সত্যি ছিল, নাকি বেশি দুশ্চিন্তার ফল?
সবকিছু পাশে সরিয়ে রেখে নিজেকে বোঝাল— এগুলো শুধু দুশ্চিন্তার ফল, আর কিছু না।
কিন্তু রাহা বুঝতেই পারল না, দরজার আড়াল থেকে দু’টি চোখ তার দিকেই নিবদ্ধ।
রাহা সবাইকে শুধু এটুকুই বলল—
“এত গরমের মধ্যে শপিং করে এসেছি, তাই মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল। রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
একথা শুনে সবাই তাকে একটু স্পেস দিয়ে চলে গেল।শুধু থেকে গেল তার মা আর তার চাচাতো বোন শিফা। রাহা তাদেরও যেতে বলল। কারণ তার ভালো লাগছিল না— একটু একা থাকতে চায়। তাই ঘুমানোর কথা বলে ওদের পাঠিয়ে দিলো।
এইদিকে বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে মনে করতে লাগল আজ তার সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা।
—---------------
কাল তার জন্মদিন,,,, কিছু কেনাকাটা বাকি ছিল, তাই দুই বান্ধবীকে নিয়ে বেরিয়ে ছিলো রাহা।
কেনাকাটা শেষ করে শপিংমল থেকে বেরিয়ে কিছুটা সামনে তারা একজন সুদর্শন লোককে দেখতে পেল—
লোকটি উল্টো দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে ছিলো।
হঠাৎ করেই অবন্তিকার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চলে এলো।
“রাহা, শোন…”
রাহা— “হুম, বল।”
“তোকে একটা ডেয়ার দেবো। কমপ্লিট করলে তোর জন্মদিনে আমি তোকে ট্রিট দিবো।”
রাহা আর সাফা দুজনেই হতবাক।
এই কিপটা অবন্তিকা ট্রিট দেবে— বিশ্বাসই হচ্ছে না!
তবুও কৌতূহল সামলাতে না পেরে রাহা বলল—
“বল, কী করতে হবে? তাড়াতাড়ি বল, বাসায় যেতে হবে।”
অবন্তিকা একটু হাসল—
“দাঁড়া দাঁড়া… সামান্যই কিছু। ওই যে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে শুধু ‘আই লাভ ইউ’ বলে দৌড় দিবি।”
“কি?!” — রাহা চমকে উঠল।
অবন্তিকা হেসে বলল—
“কি না জ্বি!”
রাহা— “অসম্ভব!”
“আরে জাস্ট বলেই চলে আসবি। তুই কি সত্যি সত্যি ভালোবাসবি নাকি, পাগলি?
তোর তো উনার মুখও দেখতে হবে না!”
সাফাও এবার যোগ দিল—
“বলে দে না রে! এমন চান্স বারবার আসে নাকি?”
রাহা একটু ইতস্তত করল… তারপর হঠাৎ বলল—
“ঠিক আছে! কিন্তু পরে পিছু হটবি না যেন।”
অবন্তিকা— “প্রমিজ!”
রাহার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
ধীরে ধীরে সে এগিয়ে গেল লোকটার দিকে।
তার পা যেন কেমন ভারী হয়ে যাচ্ছিল…
অজানা একটা অস্বস্তি কাজ করছিল ভেতরে।
লোকটার একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়াল সে।
“আই… লাভ… ইউ…” — খুব দ্রুত বলে ফেলল রাহা।
বলে যেই দৌড় দিতে যাবে—
ঠিক তখনই…
লোকটা ফট ঘুরে দাঁড়িয়ে তার হাত চেপে ধরলো।
আর তারপর থেকে তো তার এই অবস্থা।
ভাবতে ভাবতে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।
(বোকা মেয়েটি হয়তো জানতেই পারলো না, তার আড়ালে কতকিছু হয়ে গেলো।)
_______ Time skip ______
সময় বিকেল ৫টা, ঘুম ভাঙলো মহারাণীর।
মোবাইলে সময় দেখে হতাশার শ্বাস ফেলে নিজেই নিজেকে বললো—
“এতো সময় ঘুমিয়েছি!”
যাক, তাও হালকা লাগছে। গোসল দিলে আরও ভালো লাগবে— ভেবেই চলে গেলো ওয়াশরুমে।
দীর্ঘ ৪০ মিনিট পর বের হলো।
ক্ষুধা ও পেয়েছে ভীষণ। তখনই দরজায় ডাক পড়ল—
“রাহা, ঘুম হলো তোর?”
— “হ্যাঁ আপু, ভিতরে আসো।”
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়িয়ে ,মুখে একটু। ময়েশ্চারাইজার ক্রিম লাগিয়ে নিলো।
শিফা বললো—
“চল, খাবি এখন। আর তো কিছু খাসনি। বিকেল শেষে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। মেজো আম্মু ডাকছে।”
— “হুম্, তুমি যাও আমি আসছি।
- শিফা ও বেরিয়ে যেতে যেতে বলতে থাকে তাড়াতাড়ি আসবি। ভাইয়াটা ও যে কোথায় গেলো এখনও আসার নাম নেই।
রাহা ভালো মতো শুনতে পায়নি।কিসের ভাইয়া ,,কি বললো আপু...!
এসব কিছু ঝেড়ে ফেলে আগে খেয়ে নেই। পেট ডাকছে।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে দেখলো হলরুমে তার বড় আব্বু “আমান খান” আর ছোট আব্বু “আহসান খান” একসাথে বসে চা খাচ্ছে, আর কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।
রাহার বাবা “আরমান খান” বেঁচে নেই। গাড়ি এক্সিডেন্ট করে মারা গেছে আরও ১৩ বছর আগে। যদিও তার মৃত্যুর রহস্য এখনও মীমাংসিত হয়নি।
রাহার মা তার মেয়ের জন্য দ্বিতীয় বিবাহের সিদ্ধান্ত নেয়নি। মেয়েই তার কলিজার টুকরা— তার একমাত্র সম্বল।
রাহা হলো খান বংশের মেয়ে। রাহার পুরো নাম “আশফিয়া খান রাহা”।
তার বড় আব্বুর এক ছেলে, এক মেয়ে। রাহা তার বাবার একমাত্র মেয়ে, আর ছোট আব্বুর দুই মেয়ে।
সবার মধ্যে তারা রাহাকেই চোখে হারায়, বলতে গেলে। সারাদিন দুষ্টুমি করে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখে। বাবা নেই তো কী হয়েছে— কেউ যেন সেই অভাবটা বুঝতেই দেয় না।
তার বড় আব্বুর কড়া আদেশ—
“যা-ই হয়ে যাক, কেউ যেন তার রাহা মাকে কিছু না বলে। তাহলে তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা আছে।”
খান বংশের টাকা-পয়সায় কমতি নেই। তবুও তাদের নেই কোনো অহংকার, না আছে দাম্ভিকতা।
সবাই খুবই অমায়িক। তাদের বংশমর্যাদা খুবই প্রখর— ভালোর সময় ভালো, আর কেউ অন্যায় করলে তার ছাড় নেই।
রাহার বড় আব্বু একজন স্বনামধন্য চেয়ারম্যান।
একনামে এলাকার সবাই তাকে চেনে। আমান খান নাম শুনলেই মনে হয়— তাদের মনে শান্তি বিরাজ করে।
আর ছোট আব্বু হলেন বিশিষ্ট শিল্পপতি।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও তাদের ব্যবসার কদর আর নাম সমানতালে এগিয়ে রয়েছে।
“Raha's Fashion World” নামে তাদের কোম্পানি রয়েছে, যা এখন বিশ্ববাজারে নামীদামি ব্র্যান্ডের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। ইতালিতে তাদের নিজস্ব শোরুম রয়েছে।
—————
সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে আসা রাহার পানে তাকিয়ে তারা অনেক আদর-সোহাগে কাছে ডাকলেন—
“আয় রাহা মা, এখানে আয়।”
— “কেমন লাগছে এখন, আমার মায়ের?”
— “ভালো লাগছে, বড় আব্বু।”
আহসান খানও বললেন—
“ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করো না, আম্মু? শরীর এত দুর্বল কেন?”
— “ছোট আব্বু, তুমি কখন ফিরেছো? আমার তো খুবই আনন্দ লাগছে। সবাই একসাথে— আজকে অনেক মজা হবে!”
— “এইতো আম্মু, কিছুক্ষণ হলো। এসেই শুনলাম তুমি নাকি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে। রেস্ট করছিলে, তাই আর যাইনি।”
“আগে যাও, কিছু খেয়ে নাও। তারপর কথা হবে। শিফা মা, ওকে নিয়ে যাও।”
খাবার টেবিলে বসতেই হরেক রকমের খাবারের গন্ধে রাহার পেট উগলে আসলো।
হয়তো শরীর ভালো না, তাই। যে মেয়ে রোস্ট হলে আর কিছু লাগে না, সে-ই সেটা দেখেও খেতে পারছে না।
রাহার বড় আম্মু আফসানা বেগম বলে উঠলেন—
“কি হয়েছে রাহা? খাচ্ছিস না কেনো?”
— “আসলে বড় আম্মু, আমার কেনো যেনো কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। আমাকে ডাল আর আচার দাও শুধু।”
“আর এত আয়োজন কিসের আজকে? কে নাকি আসার কথা? তাড়াহুড়োয় তো কালকে শুনতেও পারিনি কে আসবে, আর আজও তো দেখলাম না কাউকে!”
“সে কি! তুই এখনও জানিস না? আর দেখবিও বা কী করে— তখন তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলি!”
আমার ছেলে তোর অ.. ভ....
রাহা ও বড় আম্মুর কথা শুনতে শুনতে যেই এক লোকমা ভাত মুখে দিয়েছে, অমনি ড্রয়িং রুম থেকে কাঁচ ভাঙার শব্দ পেল।
বিকট শব্দে আফসানা খান তার কথা শেষ করতে পারলেন না। আর রাহা ও স্তব্ধ হয়ে গেলো।
সবাই ছুটে গেল সেদিকে।
রাহাও খাবার রেখে গেল।
গিয়েই দেখলো—
এক লোক, এক হাতে হকিস্টিক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আর পুরো ফ্লোর জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে টি-টেবিলের ভাঙা কাঁচ
দেখামাত্র রাহার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরো শরীর ভয়ে কাঁপতে শুরু করলো…
এই লোকটা এখানে কেনো..!
ভাবার মধ্যেই—
রাহা আর লোকটির চোখে চোখ পড়তেই রাহার প্রাণ যায় যায় অবস্থা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………