হাওরে বিশাল জলরাশি। কখনো ঢেউয়ে উথাল-পাতাল, আবার কখনো মৃদু বাতাসে জলের ওপর চাঁদের প্রতিচ্ছবির খেলা। নৌকা বাজারের দিকে যাওয়ার পথ ধরেছে। তাই মোর্শেদ নিস্তব্ধ বৈঠক ভেঙে বৈঠা নিয়ে বসেন, নৌকা নিয়ন্ত্রণে এনে যেতে থাকেন রাধাপুর হাওড়ের দিকে। ওড়নার ঘোমটার আড়ালে কখন খোঁপা খুলে গেছে, পদ্মজা খেয়াল করেনি। হেমলতা দেখেন পদ্মজার চুল হাওড়ের জলে ডুবে আছে। তিনি মৃদু স্বরে পদ্মজাকে বললেন, ‘চুল ভিজে যাচ্ছে পদ্ম।’
পদ্মজা দ্রুত সামলে নিলো। খোঁপা করে ঘোমটা টেনে নিয়ে বলল, কখন খুলে গেছে খেয়াল করিনি।’
অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। হেমলতা চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন একমনে।
পদ্মজা ডাকল, ‘আম্মা?’
হেমলতা অশ্রুভরা চোখে তাকালেন। পদ্মজা কিছু বলার আগে তিনি বললেন, ‘পূর্ণা গল্প শুনবি?’
পূর্ণা গল্প বলতে পাগল, শুনতে খুব ভালোবাসে। খুশিতে বাকবাকুম হয়ে বলল, ‘শুনব।’
‘কষ্টের গল্প কিন্তু।’
‘গল্প হলেই হলো।’
হেমলতা হাসলেন। পদ্মজা নড়েচড়ে বসল। সে আন্দাজ করতে পারছে তার মা কোন গল্প বলবে। হেমলতা দুই হাতে জল নিয়ে মুখ ধুয়ে নিয়ে একবার মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। পেছন ঘুরে বসে প্রশ্ন করলেন ‘মুখ না দেখে গল্প শুনতে ভালো লাগবে?’
পূর্ণা মুখ গোমড়া করে না বলতে যাচ্ছিল। পদ্মজা এক হাতে খপ করে ধরে আটকে দিল। মাকে বলল, ‘যেভাবে ইচ্ছে বলো।’
হেমলতা বড়ো করে দম নিয়ে বলা শুরু করলেন, আব্বার প্রথম স্ত্রী মারা যায় অল্প বয়সে। আব্বা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন; একজন বুদ্ধিমান, উদার মনের মানুষ। অন্যদিকে আম্মাকে যৌতুকের জন্য মুখে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল তার প্রথম স্বামী। বাপের সংসারে এসে সমাজের তোপে পড়তে হয় আম্মাকে। আব্বার উদার মন ছিল, তাই তিনি অবলা-অসহায় আম্মাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। আমার নানার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। নানা সানন্দে রাজি হয়ে যান। রাজি হবেনই না কেন? স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া বিবাহিত নারীকে কে-ই বা বিয়ে করতে চায়? আম্মা-আব্বার বিয়ের বছর দেড়েক হতেই হানি আপার জন্ম হয়। তার দুই বছরের মাথায় আমার আগমন ঘটে।’
কথার মাঝে পদ্মজা পুলকিত হয়ে বলল, ‘সেদিন নিশ্চয় গাছে গাছে ফুল মাঝে ফুটেছে?’
হেমলতা ম্লান হেসে বললেন, ‘শুনেছি আমার গায়ের রং দেখে আম্মা নাক কুঁচকেছিল। আমার বয়স যখন তিন মাস, তখন আম্মার আগের স্বামী আম্মাকে ফিরিয়ে নিতে আসে। আব্বার তখন আর্থিক সমস্যা ছিল। দিনে দুইবেলা খাওয়াতেও হিমশিম খেতেন।
‘তাই বিপদে পাশে থাকা আব্বাকেসহ আমাদের দুই বোনকে ছেড়ে স্বার্থপর মা পালিয়ে যায় তার প্রথম স্বামীর কাছে। আব্বা ছোটো ছোটো দুই মেয়েকে নিয়ে মাঝ নদীতে পড়েন। কিন্তু আল্লাহ সহায় ছিলেন। আব্বার ফুফু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, চলে আসেন আমাদের কাছে; আপা আর আমার দায়িত্ব নেন। হুট করেই আব্বার আর্থিক অবস্থা উন্নত হতে থাকে। গৃহস্থিতে রহমত ঝরে পড়ে। পাঁচ বছর পর আম্মা ফিরে আসে। বিধ্বস্ত অবস্থা, ফরসা মুখ মারের চোটে দাগে দাগে বিশ্রি হয়ে গেছে। তবে একা আসেনি, দুই বছরের এক ছেলে নিয়ে ফিরে এসেছে। তখন আমাদের কুঁড়ে ঘরের বদলে বিশাল বাড়ি হয়েছে। আব্বা প্রথম মানেননি। আম্মা আব্বার পায়ে পড়ে কাঁদে, ক্ষমা চায়। আব্বা আবার আগের ভুল করেন। মেনে নেন আম্মাকে। আম্মার ছেলের নাম বিনোধ ছিল, আব্বা নতুন নাম দেন হানিফ। আম্মা আমাকে সহ্য করতে পারত না। কিন্তু আব্বার চোখের মণি ছিলাম। আব্বার আড়ালে আম্মার দ্বারা নির্যাতিত হয়েছি প্রতিদিন। ছয় বছর হতেই স্কুলে ভরতি করে দেন আব্বা। হানি আপা তখন স্কুলে পড়ে। আমি…’
‘থামলে কেন, আম্মা?’ অধৈর্য হয়ে বলল পদ্মজা।
হেমলতা ভ্রুকুটি করে বললেন, ‘আম্মার ব্যাপারে আর বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। সে এখন অনুতপ্ত। আফসোস করে, কাঁদে। বলতে ভালো লাগছে না।’
শীতল বাতাসে সবার শরীর কাঁটা দিচ্ছে। চাঁদটা ছোটো হয়ে গেছে অনেক। মোর্শেদ এক ধ্যানে বৈঠা দিয়ে জল ঠেলে নৌকা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সামনে। হেমলতা আবার বলতে শুরু করলেন, ‘মেট্রিক দেয়ার পর আম্মা পড়াতে চাচ্ছিল না। আব্বার জন্য ঢাকার কলেজে পড়ার সুযোগ পাই হোটেলে উঠি। আব্বা নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। জানিস পদ্ম, কলেজে আমি সবার ছোটো ছিলাম। সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকত। শাড়ি পরতাম বলে একটু বড়ো লাগত অবশ্য। সবসময় সুতি শাড়ি পরে বেণী বেঁধে রাখতাম। কারো সঙ্গে মিশতাম না। ভীষণ ভীতু ছিলাম। রিমঝিম নামে খ্রিষ্টান এক মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। মেয়েটা এত সুন্দর ছিল দেখতে, ঠিক তোর মতো সুন্দর। চোখের মণি ছিল ঘোলা। তার নাকি শ্যামলা মানুষ ভালো লাগে; তাই নিজে যেচে আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। কয়েকদিনের ব্যবধানে আমরা খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ি। ইংলিশে যাকে বলে বেস্ট ফ্রেন্ড। রিমঝিমের সঙ্গে মাঝে মাঝে ওর বড়ো ভাই আসত। নাম ছিল—যিশু
যিশু একদম রিমঝিমের আরেক রূপ। চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য ছিল দুই ভাই-বোনের। যিশু ভাইয়া বলে ডাকতাম তাকে। যিশু ভাইয়া মজা করে বলতেন, ধর্ম এক হলে হেমলতাকেই বিয়ে করতাম। পদ্মজা-পূর্ণা খারাপ লাগছে শুনতে?’
‘না, আম্মা, এক স্বরে বলল দুজন।
পদ্মজা বলল, ‘পরে কী হলো?’
‘তখন অলন্দপুর থেকে রাজধানীতে চিঠি পৌঁছাতে দুই সপ্তাহ লাগত। একদিন কলেজ ছুটির পথে হানি আপার চিঠি পেলাম। পাশে রিমঝিম ছিল যিশু ভাই সবেমাত্র এসেছেন রিমঝিমকে নিয়ে যেতে। চিঠি পড়ে জানতে পারি, আব্বা হাওড়ে গিয়েছিলেন মাছ ধরতে। আব্বার নৌকার চেয়ে কয়েক হাত দূরের নৌকায় সুজন নামে এক ছেলে ছিল। তখন ভারি বর্ষণ হচ্ছিল। বজ্রপাত হচ্ছিল একটার পর একটা। একটা বজ্রপাত সুজনের ওপর পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা ঝলসে যায়। আব্বা ছিটকে পড়েন জলে। দূর থেকে এক দল জেলে ঘটনাটি দেখতে পায়। তারা আব্বাকে তুলে নিয়ে যায় বাড়িতে। এরপর থেকেই আব্বা কানে শুনতে পান না, ঠিক করে হাঁটতে পারেন না; মস্তিষ্ক অচল হয়ে পড়ে। এই খবর শোনার পর হাউমাউ করে কান্না শুরু করি। কখনো একা অলন্দপুর আসিনি, আব্বা গিয়ে আনতেন। খুব অসহায় হয়ে পড়ি, কী করে বাড়ি যাব? যিশু ভাই সব শুনে, আমার কান্না দেখে বললেন, বিকেলের ট্রেনে অলন্দপুর নিয়ে যাবেন। আমি তখনো কাঁদছিলাম। একবার শুধু অলন্দপুর যেতে চাই। আব্বাকে দেখতে চাই। যদিও জানতাম, অনেকদিন হয়ে গেছে এই দুর্ঘটনার।
‘আটপাড়া পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যায়। বাড়ি এসে দেখি সদর ঘরের দরজায় তালা মারা, কেউ নেই বাড়িতে। মুরগি আর গরু-ছাগল ছাড়া। বারান্দার ঘরে দরজা ছিল না। শুধু একটা চৌকি ছিল। বড্ড ক্লান্ত ছিলাম। চৌকিতে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙে আম্মার চেঁচামেচিতে। যিশু ভাইও নিজের অজান্তে আমার পাশে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতে পারেনি। দীর্ঘ যাত্রার কারণে আমার মতোই তিনি ক্লান্ত ছিলেন। আমার জন্মদাত্রী মা গ্রামবাসী ডেকে চেঁচাতে থাকেন, যেন হাতেনাতে চোর ধরেছেন। অবস্থা বেগতিক দেখে ভড়কে যাই। কিছু বলতে পারিনি। যিশু ভাই সবাইকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে, কেউ বুঝেনি। তখন নিয়ম খুব কঠিন ছিল। যিশু ভাই খ্রিষ্টান শুনে সবাই আরো ক্ষেপে যায়। আব্বার সামনে গ্রামবাসী আমাদের দুজনের মাথা ন্যাড়া করে দিল। কোমর সমান চুল ছিল আমার। মাথা ন্যাড়া করতে গিয়ে মাথার চামড়া ছিঁড়ে ফেলে। রক্ত বের হতে থাকে গলগল করে। আমার করুণ অবস্থা দেখে আম্মার তখন হুঁশ আসে। গ্রামবাসীর হাত থেকে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে কিন্তু পারেনি। গায়ের রং কালো, তার ওপর রক্তাক্ত ন্যাড়া মাথা। কী যে বিশ্রি রূপ হয়েছিল!
‘আমি আমার একমাত্র ভরসার আব্বাকে চিৎকার করে ডেকে কেঁদেছিলাম। আব্বা শোনেননি, আমার দিকে শুধু হাঁ করে তাকিয়েছিলেন। কিছু লোক যিশু ভাইকে অনেক মারধর করে। সেদিন রাতেই উনাকে রক্তাক্ত অবস্থায় ছুঁড়ে ফেলে আসে নদীর পাড়ে। গরুর ঘরে গোবরের ওপর বেঁধে রাখে আমাকে। দূরদূরান্তরের মানুষ দেখতে আসে। আমি তখন নিশ্বাসে নিশ্বাসে নিজের মৃত্যু কামনা করেছি। একবার বাঁধনছাড়া হতে পারলে আত্মহত্যা করব বলে পণ করি। হাত বাঁধা ছিল, তাই দাঁত দিয়ে নিজের হাঁটুতে বোকার মতো কামড় দিতে থাকি একটার পর একটা…যাতে মরে যাই। যেই দেখতে আসত সেই বিশ্রি গালি দিয়ে যেত। কেউ কেউ লাথি দিয়েছে। রাধাপুরের হারুন রশীদ আছে না? উনার আব্বা তখন অলন্দপুরের মাতব্বর ছিলেন। উনার গোয়ালঘরেই বন্দি ছিলাম। দুই দিন পর আমাকে ছাড়ে। ছাড়া পেয়েই ইচ্ছে হচ্ছিল, গলায় কলসি বেঁধে ছুটে গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেই। কিন্তু পারিনি। শরীরে একটুও শক্তি ছিল না। দৌড়ে পালাতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি গোয়ালঘরের বাইরে। ধারাল কিছু একটা ছিল মাটিতে। মাটিতে পড়তেই হাতের বাহু ছিঁড়ে গলগল করে নামে রক্তের ধারা। এই যে আমার বাহুর দাগটা, এটা সেদিনই হয়েছে।’
হেমলতা মেয়েদের দাগটা দেখানোর জন্য ঘুরে তাকান। দেখেন তার দুই মেয়ে মুখে হাত চেপে কাঁদছে।
হেমলতা হাসার চেষ্টা করে বললেন, ‘তোরা মরাকান্না শুরু করেছিস কেন?’
হেমলতার কথা শেষ হতেই ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুই মেয়ে ছুটে আসে তার দিকে। নৌকা দুলে ওঠে। হেমলতা চমকে গিয়ে দ্রুত নৌকা ধরে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করলেন। চিৎকার করে ওঠেন, ‘আরে…’
কথা শেষ করার পূর্বেই বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুই মেয়ে। জড়িয়ে ধরেই আম্মা আম্মা বলে কাঁদতে থাকে। দুই মেয়ে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে যে হেমলতার মনে হচ্ছে এখনি দম বেরিয়ে যাবে। তাদের কান্না থামার কোনো লক্ষণ নেই। হেমলতা দুজনের পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন। কিছুতেই কিছু হলো না।
তারা কেঁদেই চলেছে।
হেমলতা কঠিন স্বরের ভান করে মোর্শেদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘নৌকা ঘুরাও। এদের আর কিছু বলব না।’
পদ্মজা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে বলল, ‘আর কাঁদব না। পূর্ণা আর কাঁদিস না। তোমাকে শুধু জড়িয়ে রাখি?’
হেমলতা পদ্মজার মাথায় চুমু দিয়ে বললেন, ‘রাখ।’
পূর্ণা নাক টানছে। হেমলতা বলছেন, ‘আমাদের এক ঘরে করে দেওয়া হলো। বাজারে ভেষজ উপায়ে আব্বার চিকিৎসা চলছিল। সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। কেউ পরিবারের মুখও দেখতে চায় না। দেখলেই এটা-ওটা ছুঁড়ে দিত। বলা হয়নি, সেদিন রাতে আব্বা-আম্মা মামার বাড়ি ছিল। ওই বাড়ির পাশে এক ডাক্তার থাকত, আব্বাকে দেখাতে গিয়েছিল। হানি আপার বিয়ে দেয়ার জন্য আম্মা উঠেপড়ে লাগে। তখন হিমেল আম্মার পেটে, সাত মাস চলে। আমার ওপর আম্মার মার প্রতিদিন চলতেই থাকে। আমার জন্য পরিবারের এত ক্ষতি হলো…হানিফ স্কুলে যেতে পারে না…সবাই দূর দূর করে…হানি আপার বিয়ে হয় না…আব্বার চিকিৎসা হয় না… বিপদ-আপদে কেউ পাশে আসে না…ওদিকে হিমেল আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে…কোনো দাত্রী আসেনি।
‘আম্মা একা যুদ্ধ করে হিমেলকে জন্ম দেয়। সব মিলিয়ে আমাদের জীবন নরক হয়ে ওঠে। বছর দুয়েকের মধ্যে আব্বা কিছুটা সুস্থ হন আল্লাহর রহমতে, হাঁটাচলা করতে পারেন…আগের মতো সবকিছু না বুঝলেও মোটামুটি বুঝতেন। হানি আপার বিয়ে ঠিক হলো। বনেদি ঘর থেকে প্রস্তাব এসেছিল। শর্ত একটাই—পাঁচ বিঘা জমি দিতে হবে। আমাদের জমি ছিল সাড়ে পাঁচ বিঘা। আম্মা পাঁচ বিঘা জমি দিয়েই হানি আপার বিয়ে দিলেন। সবকিছু স্বাভাবিক হলো। যদিও মাঝে মাঝে অনেকে কথা শুনিয়েছে। একসময় আমার বিয়ের প্রস্তাবও এলো। তোদের আব্বার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে জানতে পারি তোদের আব্বার দ্বিতীয় স্ত্রী আমি।’
শেষ কথাটা হেমলতা মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে বললেন। মোর্শেদ চোখের দৃষ্টি নত করে ফেলেন। পূর্ণা খুব অবাক হয়ে তাকাল মোর্শেদের দিকে। হেমলতা পূর্ণাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘তোর আব্বাকে ভুল বুঝিস না মা। ভালোবাসার ওপর কিছু নেই। সে তার প্রেমিকাকে ভালোবেসে লুকিয়ে বিয়ে করেছিল। কাউকে জানতে দেয়নি আমাকে তার পছন্দ ছিল না। একসময় বিরক্ত হয়ে অনেক মারধোর করে। ভীষণ বদমেজাজি আর জেদি ছিল তোদের আব্বা। জোর করে তোদের দাদা বিয়ে করিয়েছিলেন, তাই রাগ মেটাত আমার উপর। বাদ সেসব কথা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। জান বাঁচানোর তাগিদে মানুষ যেদিকে পারে পালাতে থাকে। অলন্দপুরে পাকিস্তানি ক্যাম্প তৈরি হয়। শহর থেকে একটা দল আসে, যারা যুদ্ধ করতে চায় তাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে। তোদের আব্বা তার প্রথম স্ত্রীর কাছে বেশি থাকত। আবার তোর দুই চাচা যুদ্ধে চলে যায়। আমি একা ছিলাম খালি বাড়িতে। চারিদিকে অত্যাচার, জুলুম। ইচ্ছে করে দেশের জন্য কিছু করতে। মনে সাহস নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি কমান্ডার আবুল কালামের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। প্রধান শিক্ষক গোপনে গ্রামের যুবক-যুবতীদের অনুপ্রেরণা দিতেন যুদ্ধের জন্য। এ খবর একসময় পাকিস্তানিরা পেয়ে গেল। তিনি শহিদ হলেন।
‘ট্রেনিং-এ অংশ নিয়ে হয়ে উঠলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা। প্রথম অপারেশনে আমরা সফল হই, উড়িয়ে দিই অলন্দপুরের ক্যাম্প। এরপর চলে যাই আরেক এলাকায়। হাতে রাইফেল নিয়ে পরবর্তী অপারেশনে নামি। তখন ধরা পড়ে যাই পাকিস্তানিদের হাতে। বন্দি করে কারাগারে। স্বচক্ষে দেখি ধর্ষণ, শারিরীক অত্যাচার। কী বর্বরতা তাদের! রড দিয়ে পিটিয়েছে। পিঠের দাগগুলো এখনো আছে। আরো কয়দিন থাকলে হয়তো আমিও ধর্ষিত হতাম। তার আগেই আবুল কালামের বুদ্ধির কাছে হেরে গেল তারা। ফেরার আগে চোখ বন্ধ করে এক নিশ্বাসে দুইজনকে ছুরি দিয়ে হত্যা করে আসি।
‘দেশ স্বাধীন হয়। চারিদিকে স্বাধীনতার উল্লাস। আমি তখন হাসপাতালে, চিকিৎসাধীন। আরো অনেকে ছিল। সেই হাসপাতালেই যিশু ভাইয়েরও চিকিৎসা চলছিল। তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। রিমঝিমের সঙ্গে ফের দেখা হলো। এক মাস লাগল সুস্থ হতে। ফেরার সময় সঙ্গে আসে রিমঝিম আর যিশু ভাই। পথে বার বার করে বললাম, তোমাদের মতো দেখতে যেন আমার একটা মেয়ে হয়। অলন্দপুরের বাজারে নামিয়ে দিয়ে ওরা আর আসেনি, ফের যদি গ্রামের লোক দেখে ফেলে। কিন্তু আমার আশঙ্কাই ঠিক হলো। অনেকে যিশু ভাইয়ের সঙ্গে আমাকে দেখে ফেলে। বাড়িতে ফিরে দেখি তোদের আব্বা এসেছে। তিন মাস পর জানতে পারি আমি মা হব। মনে প্রাণে একটা সুন্দর মেয়ে চাইতে থাকি আল্লাহর কাছে। ঘুমালে স্বপ্ন দেখি রিমঝিমকে। আমার মন খুব চাইত রিমঝিমের মতো সুন্দর মেয়ে। ঠিক তাই হলো।
‘কিন্তু রটে গেল বদনাম। অনেকে বলে তারা যিশুর সঙ্গে আমাকে দেখেছে, এতদিন যিশুর কাছে ছিলাম; তারই সন্তান পদ্মজা। সেজন্যই এত সুন্দর। আর এত মিল! তোদের আব্বাও বিশ্বাস করল। আল্লাহ চাইলে সব পারে কেউ বিশ্বাস করল না। কিন্তু জানিস, পদ্ম? তোর জন্মের পর থেকেই আমি অলৌকিকভাবে খুব শক্ত আর কঠিন হয়ে পড়ি। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়ে দেই। তোর সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে আসলে দা নিয়ে তেড়ে যাই। এ খবর ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়। তার মধ্যে কমান্ডার আবুল কালাম আসেন অলন্দপুরে। গ্রামের অনেকে যুদ্ধে গিয়েছিল। আমি ছাড়া আর একজন ফিরেছিল, বদর উদ্দিন নাম। বদর উদ্দিন এবং আবুল কালামের কাছ থেকে গ্রামবাসী জানতে পারে আমিও যুদ্ধ করেছি। হেমলতা একজন মুক্তিযোদ্ধা। এ খবর শোনার পর থেকে সবাই মোটামুটি সমীহ করে চলতে থাকে। একটা শক্ত জায়গা দখল করে বাঁচতে থাকি। প্রতিটি ঘটনা আমাকে ভেতরে ভেতরে শক্ত করেছে। তুই জন্মের পর বুঝেছি, আমি অনেক কিছু পারি। একা চলতে পারি।’
কথা শেষ করে হেমলতা হাঁফ ছাড়েন। চাঁদ ডুবে গেছে অনেকক্ষণ আগে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফজরের আজান পড়বে। পদ্মজা-পূর্ণা স্তব্ধ।
‘এই দুনিয়ায় বাঁচার দুটি পথ—চুপ থাকো, নয় প্রতিবাদ করো। কিন্তু আমার নিয়ম বলে, সামনে চুপ থেকে আড়ালে আবর্জনাটাকে ছুঁড়ে ফেলে দাও। যাতে এই আবর্জনার প্রভাবে আর কিছু না পঁচে।’
হেমলতার শেষ কথাগুলো পদ্মজার রগে রগে শিহরণ জাগাল। সে দূরে চোখ রেখে কিছু ভাবতে থাকে। মানুষের জীবনে কত গল্প! কত যন্ত্ৰণা! হেমলতা নৌকা ঘোরাতে বললেন। মোর্শেদ তাই করলেন, বাড়ি ফিরতে হবে। আজ পদ্মজার গায়ে হলুদ। নৌকা চলছে ঢেউয়ের তালে তালে। আগের উত্তেজনাটা আর কাজ করছে না। একটা ইঞ্জিন ট্রলারের শব্দ পাওয়া গেল। চারজন চকিতে তাকাল সেদিকে। ট্রলারে একজন লোক, একজন ভেতর থেকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো কিছু একটা নিয়ে বেরিয়ে এলো। আবছা আলোয় সাদা কাপড়ে মোড়ানো বস্তুটি দেখে পিলে চমকে উঠল পূর্ণার। মানুষ মরার পর সাদা কাপড়ে যেভাবে মোড়ানো হয়, ঠিক তেমন। এক মুহূর্তে পরেই লোক দুটি মোড়ানো বস্তুটি ছুঁড়ে ফেলে পানিতে।
মোর্শেদ চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘কে রে?’
লোক দুটি একবার মোর্শেদের নৌকাটির দিকে দৃষ্টিপাত করে দ্রুত ট্রলারের ভেতর চলে গেল। মোর্শেদ তড়িঘড়ি করে বৈঠা চালিয়েও তাদের ধরতে পারল না। ট্রলারটি চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেল। যেখানে সাদা কাপড়ে মোড়ানো বস্তুটি ফেলা হয়েছে, সেখানে মোর্শেদের নৌকাটি পৌঁছাতেই হুট করে হেমলতা ঝাঁপিয়ে পড়েন পানিতে।
পদ্মজা আকস্মিক ঘটনায় চমকে গেল। আতঙ্ক নিয়ে ডাকল, ‘আম্মা!’
হেমলতার দেখা নেই। পদ্মজা নৌকা থেকে ঝাঁপ দিতে যাবে তখনি হেমলতা ভেসে উঠলেন। হাতে সাদা কাপড়ে মোড়ানো বস্তুটি। হেমলতা মুখ তুলে মোর্শেদ ও মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘লাশ।’
পূর্ণা লাশ শুনেই কাঁপতে থাকে। অথচ পদ্মজা স্থির, ঠান্ডা।
অন্যদিকে হেমলতা এই শেষ রাত্রিরে নদীর জলে ভেসে আছেন দুই হাতে মৃত মানুষ জড়িয়ে ধরে!
·
·
·
চলবে……………………………………………………