পদ্মজা - পর্ব ২৪ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
          বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে পদ্মজা। তার পরনে শাড়ি রয়ে গেছে। আকাশের বুকে থালার মতো একখান চাঁদ। চাঁদের আলোয় চারদিক ঝিকমিক করছে। চারপাশ থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিপোকার ডাক।

‘পদ্ম…’

পদ্মজা কেঁপে উঠে পেছনে ফিরে তাকাল। মোর্শেদকে দেখতে পেয়ে হাঁফ ছাড়ল গোপনে। মোর্শেদ বললেন, ‘তোর মায়ে কী আর উডে নাই?’

‘না, আব্বা।’

মোর্শেদ চিন্তিত ভঙ্গিতে কিছু ভাবলেন। বললেন, ‘তুই হজাগ ক্যান? যা ঘরে গিয়া ঘুমা। আমি ঘাটে যাইতাছি।’

‘আচ্ছা, আব্বা।’

মোর্শেদের যাওয়ার পানে পদ্মজা তাকিয়ে রইল। সে ভাবছে…কিন্তু কী ভাবছে তা নিজেই ধরতে পারছে না। কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে উদাসীনতা কেটে গেল। শাড়ির আঁচল টেনে সাবধানে হেঁটে ঢুকল সদর ঘরে, ওখানে পাটি বিছিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়রা ঘুমাচ্ছে। তাদের ডিঙিয়ে পদ্মজা হেমলতার ঘরে এলো। হেমলতা ঘুমাচ্ছেন বেঘোরে। শুনেছিল, লিখন শাহকে নিয়ে মা নিজ ঘরে এসেছিলেন। এরপর কী হলো কে জানে! সন্ধ্যার পর পূর্ণা জানাল, আম্মা ঘুমাচ্ছে। হেমলতা কখনো সন্ধ্যা সময় ঘুমান না। তাই পদ্মজা ঘোমটা টেনে হেমলতার ঘরে ছুটে আসে। মাকে এত শান্তিতে ঘুমাতে কখনো দেখেনি পদ্মজা। তাই আর ডাকেনি। কেউ ডাকতে আসলে তাড়িয়ে দিয়েছে। ঘুমাচ্ছে যখন, ঘুমাক নাহয়। এখন মধ্য রাত। হেমলতার মুখের সামনে মাটিতে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে মাকে দেখছে পদ্মজা, তার গলা কাঁপছে।

শ্বশুর বাড়ি কীভাবে থাকবে সে! মাকে ছাড়া দুইদিন থাকতে গিয়ে এত বড়ো ঝড় বয়ে গেল। আর এখন কিনা সারাজীবনের জন্য মায়ের ছায়া ছেড়ে দিতে হবে! এই মুখটা না দেখলে তার দিন কাটে না…এই মানুষটার আদুরে শাসন ছাড়া দিন সম্পূর্ণ হয় না। পদ্মজা বিছানায় মাথা ঠুকে ফুঁপিয়ে উঠল। অস্ফুট করে ডাকল, ‘আম্মা।’

সঙ্গে সঙ্গে হেমলতা চোখ খুললেন। পদ্মজা খেয়াল করল না। সে কাঁদতে কাঁদতে চাপা স্বরে বলছে, ‘তোমাকে ছাড়া কীভাবে থাকব আম্মা! বিয়ে করাটা কী খুব দরকার ছিল?’

‘ছিল।’

পদ্মজা চমকে গিয়ে মাথা তুলল। গলার স্বর আগের অবস্থানে রেখে বলল, ‘কেন আম্মা?’

‘সব জানতে নেই, মা।’

পদ্মজা মাথা নত করে নাক টানছে। হেমলতা বললেন, ‘বিয়ে হতেই হবে। বর বদল হলে সমস্যা নেই। তোর কী আর কাউকে পছন্দ?

প্রশ্নটি শুনে পদ্মজা বিব্রত হয়ে গেল। হেমলতাও প্রশ্নটা করতে গিয়ে অস্বস্তি বোধ করছিলেন। পদ্মজা মাথা দুই পাশে নাড়িয়ে জানাল, তার আলাদা করে কাউকে পছন্দ নেই। হেমলতা উঠে বসেন। চুল খোঁপা করতে করতে প্রশ্ন করলেন, ‘রাত কী খুব হয়েছে? কারো সাড়া নেই যে।’

‘মাঝ রাত।’

‘আর তুই জেগে থেকে কাঁদছিস?’ মৃদু ধমকের স্বরে বললেন।

পদ্মজা নিরুত্তর। হেমলতা জানালার বাইরে চেয়ে দেখলেন চাঁদের আলোয় চারিদিক উজ্জ্বল। আজ জ্যোৎস্না রাত। চাঁদের আলো গলে ঘরের মেঝেতে এসে পড়ছে। তিনি বিছানা থেকে নামতে নামতে পদ্মজাকে তাড়া দিয়ে বললেন, ‘শাড়ি পালটে সালোয়ার-কামিজ পরে নে।’

‘কেন আম্মা?’

‘যা বলছি কর।’

পদ্মজা ঘরে গিয়ে শাড়ি পালটে নিলো। উঠানে এসে দেখে হেমলতার হাতে বৈঠা। পদ্মজা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘হাতে বৈঠা কেন?’

‘পূর্ণাকে নেব? নেওয়া উচিত। যা ওকে ডেকে নিয়ে আয়। প্রান্ত-প্ৰেমা যেন টের না পায়।’

পদ্মজা অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। হেমলতা তাড়া দিলেন, ‘যা তো!’

হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল পদ্মজা, কয়েক মিনিটের মধ্যে ফিরল পূর্ণাকে নিয়ে; বেচারি ঘুমে ঢুলছে। হেমলতা ঘাটে এসে দেখেন মোর্শেদ নৌকায় বসে বিড়ি ফুঁকছেন

‘নৌকা ছাড়ো।’

মোর্শেদ দুই মেয়ে আর বউকে দেখে হকচকিয়ে গিয়েছেন। তার মধ্যে হেমলতা যেভাবে বললেন, নৌকা ছাড়ো—তা শুনে আরো ভড়কে গেলেন। চোখ বড়ো বড়ো করে প্রশ্ন করলেন, ‘ক্যান? কী অইলো?’

মোর্শেদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পদ্মজা-পূর্ণাকে নিয়ে হেমলতা নৌকায় উঠে স্থির হয়ে বসলেন। বৈঠা মোর্শেদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মিষ্টি করে হেসে বললেন, ‘জ্যোৎস্না রাতের নৌকা ভ্রমণে বের হয়েছি আমরা। তুমি এখন আমাদের মাঝি।’ হেমলতা থামলেন। এরপর আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘লও, মাঝি, বৈঠা লও। ছাড়ো তোমার নৌকা। যত সিকি চাইবা তুমি ততই পাইবা।’

একসঙ্গে চারটা দুঃখী মানুষ হেসে উঠে। মোর্শেদ বৈঠা হাতে নিয়ে নৌকা ছাড়লেন। হুট করেই যেন অনুভব হচ্ছে, যুবক কালের রক্ত শরীরে টগবগ করছে।

এই তো তার সংসার, এই তো তার আনন্দ।

—————

রাতের নির্মল বাতাস বইছে। মাদিনী নদীর স্বচ্ছ জলে চাঁদের প্রতিচ্ছবি। কচুরিপানারা ভেসে যাচ্ছে। সবকিছু সুন্দর, মুগ্ধকর। পূর্ণার বুকের ভারটা খুব হালকা লাগছে। পদ্মজা প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো, রগে রগে যেন বয়ে গেল শান্তি। আল্লাহ তায়ালা যেন প্রকৃতির সৌন্দর্যে যেকোনো দুঃখী মানুষকে সুখী অনুভব করানোর মন্ত্র ঢেলে দিয়েছেন।

‘মোর্শেদ নাকি গো?’ হিন্দুপাড়া থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে ডাকল।

মোর্শেদ এক হাত তুলে জবাব দিলেন, ‘হ দাদা, আমি।’

রাইতের বেলা যাইতাছ কই?’

‘মেয়ে-বউ লইয়া জ্যোৎস্না পোহাইতে বাইর হইছি দাদা।’

‘তোমাদেরই দিন মিয়া।

মোর্শেদ আর কিছু বললেন না, হাসলেন। ওপাশ থেকেও আর কারো কথা শোনা গেল না। নৌকা আটপাড়া ছেড়ে হাওড়ে ঢুকে পড়েছে। সা সা করে বাতাস বইছে। গায়ের কাপড় উড়ছে। হেমলতা দুই মেয়ের মাঝে এসে বসলেন, চাদর নিয়ে এসেছেন। দুই মেয়েকে দুইহাতে জড়িয়ে ধরে ঢেকে দিলেন চাদরে। বাতাসে চাদর উড়ে প্যাতপ্যাত আওয়াজ তুলছে। চাঁদটা একদম মাথার ওপর। তাদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে! মোর্শেদ মনের সুখে গান ধরলেন—

লোকে বলে বলেরে
ঘর-বাড়ি ভালা নাই আমার
কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরও মাঝার।।
ভালা কইরা ঘর বানাইয়া
কয়দিন থাকমু আর
আমি কয়দিন থাকমু আর
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি
পাকনা চুল আমার।

পাকনা চুল আমার বলতেই পূর্ণা ফিক করে হেসে ফেলল। পদ্মজাকে ফিসফিসিয়ে বলল, আব্বা বোধহয় এখনো জোয়ান থাকতে চায়।’

পদ্মজা হেসে চাপা স্বরে বলল, ‘চুপ থাক। আব্বা কী সুন্দর গায়!’

মোর্শেদ গেয়ে যাচ্ছেন —

এ ভাবিয়া হাসন রাজা
হায়রে, ঘর-দুয়ার না বান্ধে
কোথায় নিয়া রাখব আল্লায়
কোথায় নিয়া রাখব আল্লায়
তাই ভাবিয়া কান্দে।।
লোকে বলে ও বলেরে
ঘর-বাড়ি ভালা নাই আমার।।
জানত যদি হাসন রাজা
হায়রে, বাঁচব কতদিন
বানাইত দালান-কোঠা
করিয়া রঙিন।।
লোকে বলে ও বলেরে
ঘর-বাড়ি ভালা নাই আমার।

মোর্শেদ থামলেন। তিন মা-মেয়ে একসঙ্গে হাতের তালি দিল, সেই আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ। এত সুন্দর রাত বার বার ফিরে আসুক। মোর্শেদ হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন সামনে থাকা তিনটা মানুষের দিকে। তাদের চোখেমুখে খুশি ঝিলিক মারছে। অথচ তিনি জানেন একেকজন কতটা দুঃখী। মোর্শেদ ঢোক গিলে লুকায়িত এক সত্যের কষ্ট পুনরায় লুকিয়ে যান। হেমলতা আর তিনি ছাড়া এই কলিজা ছেঁড়া কষ্ট কেউ জানে না। মোর্শেদ হেসে বললেন, ‘এই অভাগা মাঝিকে কী আপনারা আপনাদের মাঝে জায়গা দেবেন?’

মোর্শেদের কণ্ঠে শুদ্ধ ভাষায় মিষ্টি আবদার শুনে পদ্মজা পুলকিত হয়ে উঠল। আজ সব কিছু কত সুন্দর! পূর্ণা বলল, ‘দেব। এক শর্তে, নৌকা চালানোর বিনিময়ে সিকি যদি না নেন।’

মোর্শেদ মেয়ের রসিকতা শুনে হা হা করে হাসেন। সেই হাসি বার বার প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে কানে। তিনি বৈঠা রেখে হেমলতার সামনে এসে বসেন। নৌকা নিজের মতো যেদিকে ইচ্ছে ছুটে চলছে।

মোর্শেদ হেমলতাকে বললেন, ‘দুইডা ছেড়িরে খালি তুমি ধইরা রাখবা? ছাড়ো তো এইবার। আয় রে, তোরা আমারে ধারে আইয়া ব।’

পদ্মজা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। হেমলতা যেতে বললেন। পদ্মজা মোর্শেদের ডান পাশে বসল, আর পূর্ণা বাঁ-পাশে। মোর্শেদ পূর্ণাকে এক হাতে, পদ্মজাকে আরেক হাতে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠেন 1 অপরাধী স্বরে বললেন, ‘আমি বাপ হইয়া পারি নাই আমার ছেড়িদের বেইজ্জতির হাত থাইকা রক্ষা করতে। আমারে মাফ কইরা দিস তোরা।’

মোর্শেদ কখনো এত আদর করে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরেননি। এই প্রথম ধরেছেন, আবার কাঁদছেনও! পদ্মজার চোখ দুটি জলে ভরে ওঠে। হেমলতা মোর্শেদের পায়ের কাছে বসলেন। মোর্শেদের হাঁটুতে মাথা রেখে, দুই মেয়ের হাত চেপে ধরলেন। কেটে যায় অনেকগুলো মুহূর্ত। নৌকা হাওড়ের পানির স্রোতে একবার এদিক, তো আরেকবার ওদিক যাচ্ছে। বাতাসে চারজনের চোখের জল শুকিয়ে মিশে গেছে ত্বকের সঙ্গে।

নিস্তব্ধতা ভেঙে পদ্মজা বলল, ‘আজ আমি বুঝলাম জীবনে সুখ বা দুঃখ—কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়। দুঃখে মর্মাহত না হয়ে সুখের সময়টা তৈরি করে নিতে হয়। তাহলেই জীবনে সুখকর মুহূর্ত আসে। আবার সুখ সর্বক্ষণ সঙ্গে থাকে না। দুনিয়ার লীলাখেলার শর্তে দুঃখ বার বার ফিরে আসে।’

হেমলতা পদ্মজার দিকে না তাকিয়ে পদ্মজার ডান হাতে পরম মমতায় চুমু খেলেন। চাঁদটা অর্ধেক হয়ে এসেছে। খুব তাড়াতাড়ি আকাশে মিলিয়ে যাবে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp