হেমলতার ধারাল দৃষ্টি তিরের ফলার মতো পদ্মজার গায়ে বিঁধছে। সে কাঁপা স্বরে জানিয়ে দিল, ‘শুটিং দলের একজন এসেছিল।’
হেমলতার ঠোঁট দুটো ফুলে উঠল প্রচণ্ড আক্রোশে। পদ্মজা সবাইকে চেনে না। তাই তিনি পূর্ণাকে প্রশ্ন করলেন, ‘পূর্ণা, কে এসেছিল?’
পূর্ণা দুই সেকেন্ড ভাবল। এরপর নতমুখে বলল, ‘কালো দেখতে যে… মিলন।’
পদ্মজা আড়চোখে পূর্ণার দিকে তাকাল। তার ভয় হচ্ছে: মা যদি এখন বলে, মিলন তো তার সামনেই ছিল…তাহলে কী হবে? পূর্ণা মিথ্যে বলল কেন! সত্য বললেই পারত। হেমলতা বিশ্বাস করেছেন নাকি করেননি সেটা দৃষ্টি দেখে বোঝা গেল না। পূর্ণা মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল অপরাধীর মতো। হেমলতা বারান্দা অবধি এসে আবার ঘুরে তাকালেন। মনটা খচখচ করছে। মনে হচ্ছে, ঘাপলা আছে। নাকি তার সন্দেহবাতিক মনের ভুল ভাবনা? কে জানে!
—————
রাতে পদ্মজা খেতে চাইল না। বিকেলের ঘটে যাওয়া ঘটনা তাকে ঘোরে রেখেছে। চিঠিটা পড়তে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হচ্ছে না। তবুও কেমন-কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে। অচেনা, অজানা অনুভূতি। পদ্মজার হাব-ভাব হেমলতার বিচক্ষণ দৃষ্টি এড়াতে পারল না, তিনি ঠিকই খেয়াল করেছেন। কিন্তু মেয়েরা স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া অন্য সবার থেকে কথা লুকোনোর ক্ষমতা নিয়ে যে জন্মায় তা তো অস্বীকার করা যায় না। যেমন তিনি এই ক্ষমতা ভালো করেই রপ্ত করতে পেরেছেন। পদ্মজাকে জোর করে খাইয়ে দিলেন। কোনো প্রশ্ন করলেন না।
রাতের মধ্যভাগে মোর্শেদ হেমলতাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে হেমলতা এক ঝটকায় সরিয়ে দেন। চাপা স্বরে ক্রোধ নিয়ে বললেন, ‘তোমার বাসন্তীর কী হয়েছে? সে কী তোমাকে ত্যাগ করেছে? সেদিন ফিরে এলে কেন?’
মোর্শেদ চমকালেন, অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন যেন। হেমলতা বাসন্তীকে চিনল কী করে? এই নাম তার গোপন অধ্যায়। অবশ্য হেমলতার মতো মহিলা না জানলেই বোধহয় বেমানান লাগত। মোর্শেদ বিব্রত কণ্ঠে বললেন, ‘হে আমারে কী ত্যাগ করব। আমি হেরে ছাইড়া দিছি।’
হেমলতা বাঁকা হাসলেন। অন্ধকারে তা নজরে এলো না মোর্শেদের।
‘বিশ বছরের সংসার এমন আচমকা ভেঙে গেল যে!’
হেমলতার কণ্ঠে ঠাট্টা স্পষ্ট, তবে চাপা দীর্ঘশ্বাস রয়ে গেল গোপনে। মোর্শেদের শরীরের পশম দাঁড়িয়ে পড়ে। এ খবরও হেমলতা জানে? এতকিছু…কীভাবে? হেমলতার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠেছে, তিনি চাদর গায়ে দিয়ে চলে গেলেন বারান্দায়। রাতে বেশ ঠান্ডা পড়ে মোর্শেদের কোনো কৈফিয়ত তিনি শুনতে চান না। তাই বারান্দার ঘরে এসে বসলেন।
কতদিন পর রাতের আঁধারে বারান্দার ঘরে এসেছেন! বিয়ের এক বছর পরই জানতে পেরেছিলেন, মোর্শেদ তাকে বিয়ে করার ছয় মাস আগে বাসন্তী নামে এক অপরূপ সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেছেন। স্বামীর ঘর ছাড়া আর পথ ছিল না বলে এত বড়ো সত্য হজম করে নিয়েছিলেন।
বাসন্তীর মা বারনারী। আর একজন বারনারীর মেয়েকে সমাজ কিছুতেই মানবে না। মোর্শেদের বাবা মিয়াফর মোড়ল টাকার বিনিময়ে দেহ বিলিয়ে দেওয়া একজন বারনারীর মেয়েকে ছেলের বউ হিসেবে মানতে আপত্তি করেন। ততদিনে মোর্শেদ বিয়ে করে ফেলেছে, যদিও সে খবর মিয়াফর মোড়ল পাননি। তিনি মোর্শেদের মন ফেরাতে শিক্ষিত এবং ঠান্ডা স্বভাবের হেমলতাকে বেছে নিলেন। কুরবান হলো হেমলতার! তখন কলেজে ওঠার সাত মাস চলছিল! এরপর পড়াটাও আর এগোল না। জীবনের মোড় করুণ- রূপে পালটে গেল।
—————
পরদিন সকাল সকাল স্কুলে রওনা হলো দুই বোন। পূর্ণা পথে চিঠিটা পড়ার পরিকল্পনা করেছিল। পদ্মজা হতে দিল না। সেয়ানা দুইটা মেয়ের হাতে কেউ চিঠি দেখে ফেললে? ইজ্জত যাবে। পদ্মজার প্রতি বিরক্তবোধ করছে পূর্ণা। চিঠিটা তার কাছে। পথে নতুন করে পরিকল্পনা করল সে, ক্লাসে বইয়ের চিপায় রেখে চিঠি পড়বে। কিন্তু তাও হলো না। পর পর দুই দিন কেটে গেল। সুযোগ পেলেও পড়তে দিতে চাইত না পদ্মজা, সারাক্ষণ যেন হাতে জান নিয়ে থাকে। এই বুঝি মা এলো! দুই দিন পর পূর্ণা মোক্ষম সুযোগ পেল। প্রান্ত ও প্রেমাকে নিয়ে হেমলতা বাপের বাড়ি গিয়েছেন। যদিও কয়েক মিনিটের পথ, দ্রুতই ফিরবেন।
চিঠি পড়ায় পদ্মজার চেয়ে পূর্ণার আগ্রহ বেশি। সে চিঠি খোলার অপেক্ষায় ছিল। আজ খুলতে গিয়ে মনে হলো, যার চিঠি তার খোলা উচিত এবং আগে তারই পড়া উচিত। তাই পদ্মজার দিকে বাড়িয়ে দিল চিঠিটা I
পদ্মজা চিঠি খুলতে দেরি করছিল বলে পূর্ণা তাড়া দিল, ‘এই আপা, খোলো না। লজ্জা পাচ্ছো কেন? জিনিসটা চিঠি, কারো গায়ের কাপড় না।’
পদ্মজা বিস্মিত নয়নে তাকাল, যেন পূর্ণা কাউকে খুন করার কথা বলেছে। বলল, ‘কীসব বলছিস পূর্ণা?’
আচ্ছা, মাফ চাই। আর বলব না।’
পদ্মজা ভাঁজ করা সাদা কাগজটা মেলে ধরল চোখের সামনে। প্রথমেই বড়ো করে লেখা ‘প্রিয় পদ্ম ফুল’।
পূর্ণা পাশে এসে বসল। চিঠিতে দুজনের পূর্ণ মনোযোগঃ—
প্রিয় পদ্ম ফুল,
আমি কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না, অনুগ্রহ করে এই চিঠিটি একবার পড়ো। জানো পদ্ম, হঠাৎ করে নিজেকে চিনতে পারছি না। আমার হৃদয়-মস্তিষ্ক যেন অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে। আজ চলে যাব ভাবতেই বুকের ভেতর তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। তার কারণ—তুমি। যেদিন তোমাকে প্রথম দেখি, থমকে গিয়েছিল আমার নিশ্বাস ও কণ্ঠনালী। এতটুকুও মিথ্যে বলিনি। সেদিন শুটিংয়ে সংলাপ বলতে গিয়ে ভুল করেছি বারংবার। না চাইতেও বার বার চোখ ছুটে যাচ্ছিল লাহাড়ি ঘরের দিকে। বুকে থাকা হৃদপিণ্ডটায় শিরশিরে অনুভূতি শুরু হয় সেই প্রথম দেখা থেকেই। তোমাকে দ্বিতীয় বার দেখার আশায় প্রতিটা ক্ষণ গুণেছি। দ্বিতীয় বার দেখা পাই যখন বেগুন নিতে আসো। সেদিন কথা বলার লোভ সামলাতে পারিনি। টমেটোর অজুহাতে শ্রবণ করি পদ্ম ফুলের কণ্ঠ। মনে হচ্ছিল, এমন রিনরিনে গলার স্বর এই ইহজীবনে আর কখনো শুনিনি। রাতের ঘুম আড়ি করে বসে। তোমায় প্রতিনিয়ত দেখার একমাত্র পন্থা তোমার স্কুল। সবার অগোচরে কতবার তোমার পিছু নিয়েছি। তুমি বোকা, ধরতে পারোনি একবারও। সুন্দরীরা বোকা হয় আবার প্রমাণ হলো। এই, বোকা বলেছি বলে রাগ কোরো না যেন।
এরই মধ্যে জানতে পারি, তোমার মায়ের ইচ্ছে তুমি অনেক পড়বে। তোমার জন্য অনেক উঁচু বংশ থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। তাও তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন। সেখানে আমি অতি সামান্য, অযোগ্য পাত্র। তবুও সাহস করে তোমার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি। পদ্ম ফুলটাকে যে আমার চাই। তিনি রাজি হয়নি। সিনেমায় অভিনয় করা নায়কের সঙ্গে আত্মীয়তা নাকি করবেন না। এটাও বললেন, তোমার অনেক পড়া বাকি। তোমার মা কিছুতেই রাজি হবেন না। আহত মনে দু-পা পিছিয়ে আসি। ভেবেছি, তোমার কলেজ পড়া শেষ হলে পরিবার সঙ্গে করে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসব। তোমার মা সম্পর্কে যা জেনেছি- বুঝেছি, তাতে এতটুকু বিশ্বাস আছে, তিনি অভিনেতা বলে আমাকে এড়াবেন না। তিনি বিচক্ষণ মানুষ।
সময় নেই আর। যা এতদিন বলতে চেয়েছি কিন্তু সুযোগ পাইনি আজ বলতে চাই—আমি তোমায় ভালোবাসি পদ্ম ফুল। আমার ভালোবাসা বর্ণনা করার জন্য শব্দগুলো কম হতে পারে তবুও আমি বলছি, যদি আমি আকাশ হই তুমি সেই সূর্যের রশ্মি, যে রশ্মি থেকে নতুন করে আলোকিত হয়েছি আমি।
ইতি
লিখন শাহ্
পদ্মজার মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। পূর্ণা হাসছে। ভ্রু উঁচিয়ে পদ্মজাকে বলল, ‘আপা রে, লিখন ভাইয়ার সঙ্গে তোমাকে যা মানাবে! কী সুন্দর করে লিখেছে।’
পদ্মজা লজ্জায় চোখ তুলতে পারছে না। পূর্ণা বলল, ‘আল্লাহ! একদম বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে দিয়েছে! আপা, তুমি কিন্তু বিয়ে করলে লিখন ভাইয়াকেই করবে।’
‘আর কিছু বলিস না।’ পদ্মজা মিনমিনে গলায় বলল।
পূর্ণা শুনল না। সে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে, ‘আমার ভাবতেই কী যে খুশি লাগছে আপা। নায়ক লিখন শাহ আমার বোনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে! একদিন বিয়ে হবে।’
‘চুপ কর না।’
‘এই আপা, লিখন ভাইয়াকে ফেরত চিঠি দিবে না?’
পদ্মজা চোখ বড়ো করে তাকাল। অবাক স্বরে বলল, ‘কীভাবে? ঠিকানা কোথায় পাব? আর আম্মা জানলে? না, না।’
পূর্ণা আর কিছু বলতে পারল না। হেমলতার উপস্তিতি টের পেয়ে চুপ হয়ে গেল। পদ্মজা দ্রুত চিঠিটা ভাঁজ করে বালিশের তলায় রাখল…
…বুক ধুকপুক করছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………