আবুল জাহেদকে আহত অবস্থায় দেখে সবাই চমকে গেল। তার কপাল বেয়ে রক্ত ঝরছে।
ফার্স্ট এইড বক্স আনতে একজন দৌড়ে যায় বাড়ির ভেতর। লিখন কিছু সময়ের জন্য থমকাল। আবুল জাহেদের ক্ষতটা ব্যান্ডেজ করার পর তাকে একটা চেয়ারে বসতে দেয়া হয়। হেমলতা একহাতে লাঠিতে ভর দিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন।
লিখন বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছিল? আপনি উনাকে আঘাত করেছেন কেন?’
হেমলতা স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, ‘এই অসভ্য লোক আজ চারদিন ধরে মাঝরাতে এখানে ঘুরঘুর করে। তার উদ্দেশ্য খারাপ।’
লিখন চোখের কোণ দিয়ে পদ্মজাকে দেখে আবুল জাহেদকে প্রশ্ন করল, ‘উনি যা বলছেন, সত্যি?’
আবুল জাহেদ গমগম করে উঠল, ‘এখানে আমি আজই প্রথম এসেছি। ঘুম আসছিল না তাই হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি। বলা নেই, কওয়া নেই হুট করেই উনি আক্রমণ করে বসলেন। কী ব্যথা!’ কপালে হাত রাখল সে।
হেমলতা প্রতিবাদ করলেন দৃঢ় স্বরে, ভুলেও মিথ্যে বলবেন না।’
আবুল জাহেদ কিছুতেই তার উদ্দেশ্য স্বীকার করল না। তর্কে-তর্কে ভোরের আলো ফুটল। হেমলতা কঠিন করে জানিয়ে দিয়েছেন, আজই এই বাড়ি ছাড়তে হবে। হেমলতার সিদ্ধান্ত শুনে দলটির মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তীরে এসে নৌকা ডুববে নাকি! সিনেমার শেষ অংশটুকু এখনো বাকি। শর্ত অনুযায়ী আরো দশদিন সময় আছে। দলের একজন বয়স্ক অভিনেতা এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলে হেমলতা জবাব দিলেন, ‘আমার তিনটা মেয়ের নিরাপত্তা দিতে পারবেন? একটা পুরুষ মানুষ রাতের আঁধারে যুবতী মেয়েদের ঘরের পাশ দিয়ে ঘুরঘুর কেন করবে? কীসের ভিত্তিতে?’
কাউকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সবাইকে এড়িয়ে লাহাড়ি ঘরে চলে গেলেন হেমলতা। এদের সঙ্গে তর্ক করে শুধু সময়ই নষ্ট হবে। আবুল জাহেদের ধূর্ত চাহনি তার নজরে এসেছে বারংবার। প্রথম রাতে পায়ের আওয়াজ শুনে চিনতে পারেননি। পরদিন সন্দেহ তালিকায় থাকা চার-পাঁচ জনকে অনুসরণ করে তিনি নিশ্চিত হোন: রাতে কে লাহাড়ি ঘরের পাশে হেঁটেছিল। ঘরের ডান পাশে পলিথিন কাগজ দিয়ে ঢাকা তুষের স্তূপ রাখা আছে। অসাবধানতায় আবুল জাহেদের কাদা-মাখা জুতা তুষের স্তূপে পড়ে যায়, তাই তুষ লেগে যায় জুতায়। হেমলতা বাড়ির বারান্দায় সেই জুতাজোড়া দেখতে পান। তুষ বাড়ির আর কোথাও নেই, তাই ব্যস্ত হয়ে তুষের স্তূপের কাছে এসে দেখেন; একজোড়া জুতার ছাপ! সেই জুতা যখন আবুল জাহেদ পরল তখন তিনি পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত হলেন, শেয়ালটা আসলে কে!
শুটিং দলটার মধ্যে একটা হাহাকার লেগে গেছে। বেশ কিছুকক্ষণ তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলল। হেমলতাকে কিছু বলে লাভ নেই, তা প্রত্যেকে বুঝে গেছে; তাই সবাই মোর্শেদকে ধরল। বিনিময়ে তারা আরো টাকা দিতে রাজি আছে। হেমলতার ধমকের ভারে তখন চুপ হয়ে গেলেও, টাকার কথা শুনে মোর্শেদের চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে ওঠে। ঘরে এসে হেমলতার সঙ্গে ধুন্ধুমার ঝগড়া লাগিয়ে দেন। হেমলতা প্রথমে কিছুতেই রাজি হোননি। তবে শেষ অবধি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারলেন না। দলের কিছু ভালো মানুষের অনুরোধ ফেলতে বেশ অস্বস্তিবোধ করছিলেন। দশদিনের বদলে পাঁচ দিনের সময় দিলেন। যতক্ষণ এরা বাড়ি না ছাড়বে তিনি শান্তি পাবেন না। তবে একটা স্বস্তির নিশ্বাসও ফেললেন।
ভাগ্যিস কোনো ঘটনা ঘটার আগে ব্যাপারটা সামলানো গেছে।
বেশ গরম পড়েছে আজ। পদ্মজা পাটিতে বসে মনোযোগ দিয়ে মুন্নাকে শেখাচ্ছে; কাকে কী ডাকতে হবে।
‘আমায় ডাকবি বড়ো আপা। পূর্ণাকে ছোটো আপা। আর প্রেমা তো তোর সমান। তাই প্রেমা ডাকবি। দুজন মিলেমিশে থাকবি। বুঝেছিস?’
‘হ, বুঝছি।’
‘আম্মাকে তুইও আম্মা ডাকবি। আমাদের আম্মা-আব্বা এখন থেকে তোরও আম্মা-আব্বা, বুঝেছিস?
মুন্না বিজ্ঞ স্বরে বলল, ‘হ, বুঝছি।’
হেমলতা রান্না রেখে উঠে আসেন। মুন্নাকে বললেন, ‘শুদ্ধ ভাষায় কথা বলবি। তোর পদ্ম আপা যেভাবে বলে।’
মুন্নার সরল স্বীকারোক্তি, ‘কইয়ামনে।’
পদ্মজা বলল, কইয়ামনে না। বল, আচ্ছা বলব।’
মুন্না বাধ্য ছেলের মতো হেসে বলল, ‘আচ্ছা, বলব।’
হেমলতা হেসে চলে যান। পূর্ণা রুম থেকে মুন্নাকে ডাকল, ‘মুন্না রে?’
‘হ, ছুডু আপা।’
পদ্মজা মুন্নার গালে আলতো করে থাপ্পড় দিয়ে বলল, বল—জি, ছোটো আপা।’
মুন্না পদ্মজার মতো করেই বলল, ‘জি ছোটো আপা।’
পদ্মজা হাসল। পূর্ণা বলল, ‘তোর নাম পালটাতে হবে। আমি তোর নতুন নাম রেখেছি।
‘কেরে? নাম পালডাইতাম কেরে?’ পদ্মজা কিছু বলার আগে মুন্না প্ৰশ্ন করল, ‘আইচ্ছা এই কথাডা কেমনে কইতাম?’
পদ্মজা হেসে কপাল চাপড়ায়, এই ছেলে তো আঞ্চলিক ভাষায় বুঁদ হয়ে আছে। পূর্ণা বলল, ‘তুই এখন আমাদের ভাই। আমাদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তোর নাম রাখা উচিত। উচিত না?’
মুন্না দাঁত কেলিয়ে হেসে সায় দিল, ‘হ।’
‘এজন্যই তোর নাম পালটাতে হবে। আজ থেকে তোর নাম প্রান্ত মোড়ল। সবাইকে বলবি এটা। মনে থাকবে?’
‘হ, মনে রাহাম।’
‘বল, আচ্ছা মনে রাখব।’
‘আচ্ছা, মনে রাখব।’
দুপুর গড়াতেই হাজেরা এলো। সঙ্গে নিয়ে এসেছে বানোয়াট গল্প আর বিলাপ। ইশারা-ইঙ্গিতে সে লাউ চাইছে। মোর্শেদ গতকাল সব লাউ বাজারে তুলেছেন, গাছে আর একটা ছিল। এদিকে ঘরে চিংড়ি মাছ আছে, প্ৰান্ত লাউ দিয়ে চিংড়ি খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে বলে হেমলতা ছেলের ইচ্ছে পূরণ করতে হাসিমুখে শেষ লাউটা ছিঁড়ে এনে ঘরে রেখেছেন। এখন আবার হাজেরারও লাউ চাই! কেউ কিছু চাইলে হাতে থাকা সত্ত্বেও হেমলতা ফিরিয়ে দেননি। আজও দিলেন না। তিনি হাজেরাকে হাসিমুখে লাউ দিয়ে দিলেন। হাজেরা সন্তুষ্টি প্রকাশ করে চলে গেল। পদ্মজা মায়ের দিকে অসহায় চোখে তাকাল। প্রান্ত এই বাড়িতে এসে প্রথম যা চাইল, তাই পেল না। মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না তো! হেমলতা পদ্মজার দৃষ্টি বুঝেও কিছু বললেন না। প্রান্তকে ডেকে কোলে বসালেন। ছেলেটাকে দেখতে বেশ লাগছে। দুপুরে তিনি গোসল করিয়েছেন। মনে হচ্ছিল, কোনো ময়লার স্তূপ পরিষ্কার করা হচ্ছে। জন্মদাতার মৃত্যু প্রান্তের উপর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলল না। এজন্য কেউই অবাক হয়নি। বাপ-ছেলের শুধু রাতেই একসঙ্গে থাকা হতো। অনেক রাত প্রান্ত একা থেকেছে। এইটুকু ছেলে কত রাত ভয় নিয়ে কাটিয়েছে! হেমলতা আদুরে কণ্ঠে বললেন, ‘একটা গল্প শোনাই। শুনবি?’
‘হুনাও।’
পদ্মজা প্রান্তের ভাষার ভুল ধরিয়ে দিল, ‘হুনাও না। বল, শোনাও, আম্মা।’
প্রান্ত মাথা কাত করে হেমলতাকে বলল, ‘শোনাও, আম্মা।’
আম্মা ডাকটা শুনে হেমলতা বুক বিশুদ্ধ ভালোলাগায় ছেয়ে গেল। তিনি কণ্ঠে ভালোবাসা ঢেলে বললেন, ‘আমাদের একদিন মরতে হবে জানিস তো?’
‘হ।’
‘জান্নাত-জাহান্নামের কথা কখনো কেউ বলেছে?’
প্রান্ত মাথা দুই পাশে নাড়াল, কেউ শোনায়নি। হেমলতা এমনটাই সন্দেহ করেছিলেন। প্রান্ত এ সম্পর্কে জানে না। তিনি ধৈর্য নিয়ে সুন্দর করে জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনা দিলেন। জান্নাতের বর্ণনা শুনে প্রান্তের চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে উঠল। প্রশ্ন করল হাজারটা। হেমলতাকে জানাল, সে জান্নাতে যেতে চায়; জাহান্নামে যেতে চায় না। হেমলতা বললেন, ‘আচ্ছা, এখন গল্পটা বলি। মন দিয়ে শুনবি।’
প্রান্ত মাথা কাত করে হ্যাঁ সূচক সম্মতি দিল। হেমলতা বলতে শুরু করলেন, ‘একজন মহিলা একা থাকত বাড়িতে। না, দুটি ছেলেমেয়ে থাকত তার সঙ্গে, খুব ছোটো ছোটো; খুব অভাব তাদের। ছোটো একটা জায়গায় মাটির ঘর। ঘরের সামনে শখ করে একটা লাউ-চারা লাগায়। লাউ গাছ বড়ো হয়, পাতা হয় অনেক। এই লাউ পাতা দিয়ে দিন চলে তাদের। কখনো সিদ্ধ করে খায়। নুন-মরিচ পেলে শাক রেঁধে খায়। তো একদিন একজন ভিক্ষুক এলো। ভিক্ষুকটি খায় না দুই দিন ধরে। লাউ গাছে পাতা দেখে তার ভীষণ খেতে ইচ্ছে করে। লাউ গাছের মালিককে ভিক্ষুক বলে, লাউ পাতা দিতে, রেঁধে খাবে। খুব অনুনয় করে বলে। মহিলাটির মায়া হয়। ভিক্ষুক মহিলাকে কথা শোনাতে শোনাতে কয়েকটা লাউ পাতা ছিঁড়ে দেয়। তার কয়দিন পর লাউ গাছের মালিক মারা গেল। গ্রামবাসীসহ মসজিদের ইমাম মিলে দাফন করে তাকে। বুঝতে পেরেছিস প্রান্ত?’
‘হ।’
প্রান্ত মনোযোগ দিয়ে শুনছে, মনোযোগী শ্রোতা সে। হেমলতা বাকিটা শুরু করলেন, ‘গ্রামের ইমাম একদিন স্বপ্ন দেখেন, যে মহিলাটিকে তিনি দাফন করেছেন তার চারপাশে আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। কিন্তু তার গায়ে আঁচ অবধি লাগছে না। মহিলাটিকে ঘিরে রেখেছে লাউ পাতা! তাই আগুন কাছে ঘেঁষতে পারছে না। ওই যে সে এক ভিক্ষুককে নিজের একবেলা খাবারের লাউ পাতা দান করেছিল? সেই লাউ পাতা এখন তাকে কবরের শাস্তি থেকে বাঁচাচ্ছে। জাহান্নাম থেকে বাঁচতে আমাদের অনেক ইবাদত করা উচিত। তার মধ্যে একটি হলো দান। সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা উচিত। কাউকে ফিরিয়ে দেয়া উচিত না। বোঝা গেছে?’
‘হ, বুঝছি। আমিও অনেক দান করাম।’
‘হুম। করবি। অনেক বড়ো হবি জীবনে। আর অনেক দান-খয়রাত করবি। আচ্ছা, প্রান্ত এখন যদি কোনো অভাবী এসে বলে, তোর লাউটা দিতে। তুই কী করবি?’
প্রান্ত গম্ভীর হয়ে ভেবে বলল, ‘দিয়া দিয়াম।’
‘একটু আগে একজন মহিলা এসেছিল, দেখেছিস?’
‘হ, দেখছি।’
‘সে খুব গরিব। বাড়িতে ছোটো ছোটো বাচ্চা আছে। এসে বলল, লাউ দিতে। তাই তোর লাউটা দিয়েছি। এজন্য কী এখন তোর মন খারাপ হবে?’
‘লাউড়া তো তুমি দিছো। তাইলে তোমারে আগুন থাইকা বাঁচাইব লাউডা?’
‘লাউটা আমি দিলেও, তোর জন্য ছিল। তুই এখন খুশি মনে মেনে নিলে লাউটা তোকে আগুন থেকে বাঁচাবে।’
হেমলতার কথায় প্রান্তর চোখেমুখে দীপ্তি ছড়ায়। পরপরই মুখ গম্ভীর করে প্রশ্ন করল, ‘একটা লাউ কেমনে বাঁচাইব আমারে?’
প্রান্তর নিষ্পাপ কণ্ঠে প্রশ্নটা শুনে হেমলতা-পদ্মজা-পূর্ণা হেসে উঠল পদ্মজা বলল, ‘কয়টা পাতা অনেকগুলো হয়ে মহিলাটাকে বাঁচিয়েছিল। তেমন একটা লাউ অনেকগুলো হয়ে তোকে বাঁচাবে।’
প্রান্ত একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। হেমলতা হেসে হেসে তার উত্তর দিচ্ছেন। পদ্মজার হুট করেই প্রান্তের থেকে চোখ সরে হেমলতার ওপর পড়ে।
মা হাসলে সন্তানদের বুকে যে আনন্দের ঢেউ উঠে তা কী মায়েরা জানেন? পদ্মজার আদর্শ তার মা। সে তার মায়ের মতো হতে চায়। হুবহু মায়ের মতো!
পাঁচদিন শেষ। শুটিং দলের মধ্যে খুব ব্যস্ততা। সবকিছু গোছানো হচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে পাঁচ দিনে শেষ করা হয়েছে শুট। লিখন উঠানে চেয়ার নিয়ে বসে আছে। চিত্রা এসে তার পাশে বসল, কাশির মতো শব্দ করল লিখনের মনোযোগ পেতে। তাকাল লিখন, ম্লানমুখে প্রশ্ন করল, ‘সব গোছানো শেষ?’
হুম, শেষ। তুমি তো কিছুই গুছাওনি!’
‘বিকেলে রওনা দেব। আমার আর কী আছে গোছানোর? দুপুরেই শেষ করে ফেলব।’
‘মন খারাপ?’
লিখন কিছু বলল না, তাকাল লাহাড়ি ঘরের দিকে; দৃষ্টিতে শূন্যতা, কিছু ফেলে যাওয়ার বেদনা। বুকের বাঁ পাশে চিনচিন করা ব্যথাটা আর সহ্য হচ্ছে না। চিত্রা হাতঘড়ি পরতে পরতে বলল, ‘ছোটো বোনের সমান বলে ঠোঁট বাঁকিয়ে ছিলে। এখন তার প্রেমেই পড়লে।’
লিখন কিছু বলল না, তবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল একটা। চিত্রা বলল, ‘পদ্মজা কিন্তু অনেক বড়োই। শুনেছি, আগামী মাসে ওর সতেরো হবে। এই গ্রামে সতেরো বছর বয়সি অবিবাহিত মেয়ে হাতেগোনা কয়টা। পদ্মজার নব্বই ভাগ সহপাঠী বিবাহিত। তাছাড়া খুব কম মেয়েই স্কুলে পড়ে।’
চিত্রার কথা অগ্রাহ্য করে লিখন বলল, ‘তোমার বিয়েটা কবে হচ্ছে?’
‘ভগবান চাইলে বছরের শেষ দিকে।’
কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই ঢাকা রওনা দেবে। হেমলতা-মোর্শেদ বিদায় দিতে এসেছেন। দলটার তিন-চার জনের চরিত্রে সমস্যা থাকলেও, বাকিরা খুব ভালো। তারা হেমলতার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। নিজের বাড়ি মনে করে থেকেছে, বাড়ির দেখাশোনা করেছে। লিখন হেমলতার আড়ালে একটি সাহসিকতার কাজ করে ফেলল। ব্যস্ত পায়ে চলে গেল লাহাড়ি ঘরের দিকে
বারান্দায় বসেছিল পদ্মজা। লিখনকে দেখে ভয়ে কেঁপে উঠল তার বুক। পদ্মজাকে কিছু বলতে দিল না লিখন। সে দ্রুত বারান্দায় উঠে পদ্মজার হাতে একটা চিঠি গুঁজে দিয়ে জায়গা ত্যাগ করল।
প্রবলভাবে কাঁপছে পদ্মজা। এমনকি পূর্ণাও চৌকি থেকে ব্যাপারটা খেয়াল করে হতভম্ব। খোঁড়ার মতো ধীর পায়ে হেঁটে এলো সে। ততক্ষণে পদ্মজার সারা শরীর বেয়ে ঘাম ছুটছে, হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে গেছে। হাত থেকে পড়ে গেল চিঠি, সেই চিঠিটি দ্রুত কুড়িয়ে নিলো পূর্ণা।
পদ্মজার মনে হচ্ছে—এখনই সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে! হেমলতা এসে দেখেন পদ্মজা হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে বসে আছে। কেমন দেখাচ্ছে যেন। তিনি উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘পদ্ম? শরীর খারাপ?
মায়ের কণ্ঠ শুনে পদ্মজা ভয় পেল। বাতাসে অস্বস্তি, নিশ্বাসে অস্বস্তি; চোখ দুটি স্থির রাখা যাচ্ছে না, নিশ্বাস এলোমেলো। পূর্ণা পরিস্থিতি সামলাতে বলল, ‘আম্মা, আপার মাথাব্যথা।’
‘হুট করে এমন মাথাব্যথা উঠল কেন? পদ্ম রে, খুব ব্যথা?’
পদ্মজা অসহায় চোখে পূর্ণার দিকে তাকাল। আকস্মিক ঘটনায় সে ভেঙে পড়েছে। ডান হাত কাঁপছে অনবরত। হেমলতা চোখ ঘুরিয়ে দুই মেয়েকে দেখলেন। এদের হাবভাব হঠাৎ সন্দেহজনক লাগছে। তিনি কঠিন স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কী লুকোচ্ছিস দুজন? কেউ এসেছিল?’
মায়ের প্রশ্নে পদ্মজার চেয়ে পূর্ণা বেশি ভয় পেল। হাতের চিঠিটা আরো শক্ত করে চেপে ধরল সে।
কী লেখা আছে না পড়ে এই চিঠি হাতছাড়া করবে না সে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………