পদ্মজা - পর্ব ৪০ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
          রানির অবস্থা বেগতিক। খলিল হাওলাদার দরজা বন্ধ করে এলোপাথাড়ি মেরেছেন। কারো কথা শোনেননি। রিদওয়ান বাড়ির কাজের মানুষদের হুমকি দিয়েছে, রানি গর্ভবতী এই খবর বাইরে বের হলে সব কয়টাকে খুন করবে। মগা, মদন, লতিফা, রিনু ভয়ে আধমরা। তারা নিশ্বাস নিতেও ভয় পাচ্ছে। কেউ যদি বাইরে এই খবর বের করে, নিশ্চিত সবাই তাদেরই ভুল বুঝবে। রানি মারের চোটে অজ্ঞান হয়ে গেছে। সারা গায়ে মারের দাগ। ঠোঁট থেকে রক্ত ঝরছে। আমিনা রানিকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছেন। খলিল হাওলাদারকে বার বার পাষাণ বাপ বলে আখ্যায়িত করছেন। পদ্মজা পরিষ্কার কাপড়, পানি এনে ফরিনার হাতে দিল। ফরিনা রানির মুখে পানি ছিটিয়ে দেন। রানি কিছুতেই চোখ খুলছে না। লাবণ্য ফুঁপিয়ে কাঁদছে। রানির সঙ্গে তার সবসময় ঝগড়া হয় ঠিক, তবে ভালোও তো বাসে। দরজার বাইরে থেকে রানির চিৎকার শুনেছে। রানি চিৎকার করে ডাকছিল, ‘আম্মা, দাভাই, লাবণ্য কই তোমরা? আব্বা মাইরা ফেলতাছে। বাঁচাও তোমরা আমারে। লাবণ্য, কই তুই? আম্মা…।’

দরজায় সবাই মিলে অনেক ধাক্কা দিয়েছে, ডেকেছে…খলিল হাওলাদার সাড়া দেননি। এক নিশ্বাসে মেয়েকে এলোপাতাড়ি মেরে গেছেন। রানিকে মাটিতে ফেলে জোরে জোরে লাথি মেরেছেন। রাগের বশে রানির তলপেটে বেশি আঘাত করেছেন। রানি আকাশ কাঁপিয়ে কেঁদেছে। কেউ পারেনি ঘরের ভেতর প্রবেশ করতে। পদ্মজা আমিরের পাঞ্জাবি দুই হাতে খামচে ধরে কান্নামাখা কণ্ঠে বারংবার অনুরোধ করেছে, ‘আল্লাহর দোহাই লাগে আপনি এসব থামান। একটু চেষ্টা করুন।’

আমির অনেক চেষ্টা করেছে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করার জন্য, পারেনি। যখন করাত আনার জন্য প্রস্তুত হয় তখন খলিল হাওলাদার ক্লান্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছেন। রানির গলার স্বর থেমে যায়, শোনা যাচ্ছে না। সবাই ভেতরে প্রবেশ করে দেখে, রানি উপুড় হয়ে পড়ে আছে। শরীর রক্তাক্ত। আমিনা ‘রানি’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। ছুটে যান রানির কাছে। মগাকে পুনরায় কবিরাজকে নিয়ে আসতে পাঠানো হয়েছে। এত কিছু হয়ে যাচ্ছে, নুরজাহান একবারও নিচে নেমে আসেননি। রানি গর্ভবতী শুনে সেই যে ওপরে গিয়েছেন তো গিয়েছেনই! আর আসার নাম নেই। এত চেঁচামিচি শুনেও কী আসতে ইচ্ছে হয়নি?

এতই কঠিন মন!

কবিরাজ আসার অনেকক্ষণ পর রানি চোখ খুলল। ফরিনা আমিনাকে বললেন, ‘ছেড়ির বিয়া দিতে কইছিলাম। দিলি না। ছেড়ির কথা হুনছিলি তোরা। এহন তো মজা বুঝতেই হইব। বিশ বছরের যুবতী ছেড়ি বাপের ঘরে থাহে? না লাংয়ের ঘরে?’

আমিনা কিছু বলতে পারলেন না। আঁচলে মুখ লুকিয়ে শুধু কাঁদছেন। মজিদ ঘরে প্রবেশ করে ফরিনাকে বললেন, ‘তোমাদের মেয়েকে জিজ্ঞাসা করো, এই আকাম কে করেছে! বেজন্মাটা কে?’

পদ্মজা ধীরপায়ে পালঙ্কের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মাথায় ঘোমটা টানা। ফরিনা রানিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাচ্চার বাপ কেডায়?’

রানি কিছু বলছে না। ঠোঁট কামড়ে কাঁদছে। চোখ বেয়ে জলের ধারা নামছে। ফরিনা তেজ নিয়ে বললেন, ‘কী রে ছেড়ি? এহন কথা আয় না কেন? বাচ্চার বাপের নাম ক? কইবি তো। বিয়া তো দেওন লাগব।’

তবুও রানি চুপ। তার কান্নার বেগ বেড়ে গে ওন লাগব মজিদ হাওলাদার লাবণ্যকে ডাক দিলেন, ‘লাবণ্য?’

লাবণ্য কেঁপে উঠল। মজিদ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোর তো জানার কথা। একসঙ্গে থাকিস। কার সঙ্গে রানির সম্পর্ক ছিল?’

লাবণ্য মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে। আড়চোখে রানিকে দেখে। রানি অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। লাবণ্য বুঝে উঠতে পারছে না, তার কি বলা উচিত? মজিদ ধমকে উঠলেন, ‘লাবণ্য, সত্য বল। কিছু লুকানোর চেষ্টা করবি না। তাহলে তোরও এই দশা হবে।’

লাবণ্য ভয়ের চোটে গড়গড় করে বলতে থাকল, ‘আপার সঙ্গে আবদুল ভাইয়ের প্রেম আছে। দুইজনে প্রায়ই দেখা করে বাড়ির পেছনে। খালের পাড়ে। অনেক বছর হইছে প্রেমের।’

রানির কান্নার শব্দ বেড়ে যায়। ফরিনা ঝাঁঝালো কণ্ঠে রানিকে বললেন, ‘এই ছেড়ি চুপ কর! এহন মেলাইতাছস কেরে? কুকাম করার সময় মনে আছিল না? আমরারে কইতে পারলি না তোর আবদুলরে পছন্দ। আর আবদুলই কেমন ধাঁচের বেড়া মানুষ হইল? প্রস্তাব লইয়া আইতে পারে নাই? তোরে ডাইকা লইয়া কুকাম কইরা বেড়াইছে।’

নিজের বাড়ি বানায়া প্রস্তাব লইয়া আইব কইছিল।’ রানি কাঁদতে কাঁদতে বলল। ফরিনা পালটা বললেন, ‘কয়দিন তর সয় নাই? শরীর গরম হইয়া গেছিল বেশি? খারাপ ছেড়ি কোনহানের।’

আমির ঘরে ঢুকতেই মজিদ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘আবদুলরে ধরে নিয়ে আয়।

আমির অবাক হয়ে বলল, ‘আবদুল করছে এই কাজ? ও তো এমন না।’

‘মুখ দেখে বোঝা যায়, কে কেমন?’

আমির উত্তরে কিছু বলল না। রানি আহত, দুর্বল শরীর নিয়ে দ্রুত বিছানা থেকে নামে। আমির ঘর থেকে বেরোনোর জন্য পা বাড়িয়েছে মাত্র—রানি আমিরের পায়ে ধরে বসে আকুতি করে বলল, ‘দাভাই, উনারে কিছু কইরো না। উনারে মাইরো না। আমি তোমার পায়ে পড়ি। ও কাকা, আমারে মারো। উনারে মাইরো না।’

‘কী পাগলামি করছিস? পা ছাড়।’ বলল আমির।

‘দাভাই, দোহাই লাগে।’

আমির রানিকে দুই হাতে তুলে দাঁড় করাল। কোমল কণ্ঠে বলল, ‘কিছু করব না। শুধু নিয়ে আসব। বিয়ে পরিয়ে দেব।’

‘সত্যি, দাভাই?’

‘সত্যি।’

হাতের উলটোপাশ দিয়ে চোখের জল মুছল রানি, আমির বেরিয়ে গেল। মজিদ চোখ-মুখ কঠিন অবস্থানে রেখে ঘর ছাড়েন। রানি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যেতে নিলেই পদ্মজা ধরে ফেলে। আমিনা, ফরিনা এগিয়ে আসেন। সবাই মিলে রানিকে ধরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। বিয়ে হবে শুনে ভেতরে ভেতরে রানির খুব আনন্দ হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগের সব মার, ব্যথা তুচ্ছ মনে হচ্ছে। রানি আবদুলকে এত বেশি ভালোবাসে যে, আবদুলের এক কথায় সে বিয়ের আগে ঘনিষ্ঠ হতে রাজি হয়ে গিয়েছে। যখন যেখানে যেতে বলেছে, তখন সেখানেই গিয়েছে; দ্বিতীয়বার ভাবেনি। অন্ধভাবে ভালোবেসেছে। কতদিনের স্বপ্ন! কত আশা! পূরণ হবে অবশেষে। রানি নিজের অজান্তে হাসে। তৃপ্তির হাসি! কিছু পাওয়ার হাসি!

উপস্থিত আর কেউ খেয়াল না করলেও, সেই হাসি পদ্মজা খেয়াল করল। এই হাসি বেশিক্ষণ থাকল না। বিকেলবেলা আমির দুঃসংবাদ নিয়ে ফিরল। আবদুল খুন হয়েছে গত রাতে! মাদিনী নদীতে লাশ পাওয়া গেছে। আবদুলের বাড়িতে পুলিশের ভিড়! রানির কানে কথাটা আসতেই গগন কাঁপানো চিৎকার দিয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে, নিভে গেল জীবনের সুখের আলো…নিভে গেল স্বপ্ন পূরণের ইচ্ছের প্রদীপ।

পদ্মজা এই খবর শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রতিটা মৃতদেহ নদীতেই কেন পাওয়া যায়? এতে কি প্রমাণ পানির সঙ্গে ধুয়ে যায়? আগের খুনগুলোর খুনি কি এই আবদুলের খুনি? পদ্মজা চেয়ার টেনে বসল। মাথা ব্যথা করছে খুব। রগ দপদপ করে কাঁপছে। চোখ বন্ধ করে ভাবল, এই অলন্দপুরে পাপের সাম্রাজ্য কারা তৈরি করেছে? ভাবতে গেলে শরীর কেমন করে! শূন্য হাত নিয়ে ভাবনা থেকে বের হতে হয়। কূল-কিনারা পাওয়া যায় না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp