রুশমি
স্টেসির মা অসুস্থ। এই যাত্রায় স্টেসি আমাদের ফার্মহাউজে আসতে পারছে না। লিও আর ছোট্ট এমিলি অবশ্য আসছে কাল বিকেলে। প্ল্যান পুরোটাই ক্যানসেল হয়ে গিয়েছিল। আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে বলে ওরা আবার প্ল্যান অন করল। ঠিক হলো লিও বাচ্চাসহ দুটা দিন আমার এখানে থাকবে। ফার্মের ফ্রেশ সবজি খাবে, লেকের পানিতে সাঁতার কাটবে, মাছ ধরে বারবিকিউ করবে, ঘোড়ায় চড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবে, হরিণ শিকার করবে। নভেম্বরে এদিককার পানি উষ্ণ থাকে। সাঁতার কেটে তৃপ্তি আছে। পাখি দেখার জন্যও জায়গাটা উত্তম। অন্যান্য স্টেট্ থেকে শীতের প্রকোপে তাড়িত হয়ে বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা এখানকার জঙ্গলে এসে আশ্রয় নেয়। লিও এবং তার কন্যা, দুজনেই বেশ একসাইটেড এই ভ্রমণ নিয়ে। ওদিকে স্টেসি থাকবে ভার্জিনিয়ায়। নিজের মাকে সময় দেবে। মায়ের সাথে একদম একান্তে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে সে আনন্দিত।
আম্মুজান নিউইয়র্কে আছে। ছোট আর মেজোর সাথে। থ্যাংকস গিভিং এর আগে ওদের এদিকটায় আসা হবে বলে মনে হয় না। আজ বিকেলে আমার মেক্সিকান কর্মচারি মেরির সাথে জঙ্গলে গিয়েছিলাম শিকার করতে। আমি এ ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ। শিকারের লাইসেন্সও নেই আমার। তবে মেরি একজন দক্ষ শিকারী। এই কাজ সে আগেও বহুবার করেছে। এদিকের জঙ্গল গুলো লংলিফ পাইন গাছ দিয়ে ভর্তি। রেড উল্ফ, ব্ল্যাক বিয়ার, স্কাঙ্ক, হোয়াইট টেইলড ডিয়ার, ইত্যাদি জীবজন্তু এই অরণ্যে ঘুরে বেড়ালেও শিকারের জন্য নিরীহ হরিণই আমাদের প্রথম এবং একমাত্র পছন্দ। ঝোপঝাড় আর গাছের গুঁড়ির আড়ালে বসে কী করে পশুপাখির জন্য ফাঁদ পাততে হয় এসব নানা কৌশল শিখছি ওর কাছ থেকে। তবে নিজের বিনোদনের জন্য নিরীহ হরিণ মারতে আমার কষ্ট হয়। হরিণ ছাড়া এদিকে আর আছে কী? শেয়াল মেরে লাভ নেই। খাওয়া তো যাবে না। এর চেয়ে বরং মৎস্য শিকার উত্তম কাজ। একটি মাঝারি হরিণ থেকে প্রায় পঞ্চাশ পাউন্ডের মতো মাংস হয়। এতো মাংস আমি করব কী? মেরির অবশ্য লোভ আছে। সে পারলে পুরোটাই নিয়ে যায় নিজের পরিবারের জন্য। ফার্মের বুচার রুমে বসে পুরো হরিণটার চামড়া ছাড়িয়ে মেশিন দিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটেছে। আমার এখানে বর্তমানে মোট পাঁচটি ছেলেমেয়ে কাজ করে। ক্ষেতের কাজের তদারকি আমি নিজেই করি তবে সব কাজ একার পক্ষে করা সম্ভব হয় না। ম্যানুয়ালি তো কিছু করতে হয় না আজকাল। এটা তো ব্যাক ইয়ার্ডের বাগান নয়। ক্ষেতের জমিতে মডার্ন ইরিগেশন সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট চালানো জানতে হয়। এসব আয়ত্ব করতে বিস্তর পড়াশোনা করতে হয়েছে আমাকে। তাছাড়া গরুর দেখাশোনা করা, দুধ দোয়ানো, গোসল দেয়া, মুরগির খামারের দায়িত্ব পালন করা, মুরগি জবাই করা, মাংস কাটা এসব কাজের জন্য কর্মঠ এবং দক্ষ লোকের প্রয়োজন। কর্মচারীদের মধ্যে তিনজন মেক্সিকান। একটি ছেলে মাত্র বিশদিন হলো গুয়াতেমালা থেকে এসেছে। তার এখনো ওয়ার্ক পারমিট হয়নি। আমাকে খুব করে অনুনয় বিনয় করল বলে কাজে নিতে হলো। তবে কয়েকমাসের মধ্যে কাগজপত্র ঠিক করতে না পারলে চাকরি থেকে ছাটাই করা হবে বলে জানানো হয়েছে। লেজলি ফ্লোরিডার মেয়ে। পি এইচ ডি করেছে এগ্রিকালচার নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার। পাশাপাশি আমার ফার্মেও কাজ করে সপ্তাহে তিনদিন। কাছেই ওর বাড়ি। কোভিড নাইনটিন সিচুয়েশনের জন্য গত কয়েকমাস যাবৎ সে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। ক্যাম্পাসে যাচ্ছে না। তাই রোজই একবার ফার্মে এসে ঢুঁ মেরে যায়।
আজ সন্ধ্যের পর ওরা সকলে মিলে হরিণের মাংস বারবিকিউ করল। ব্যাক ইয়ার্ডে চলল গান বাজনা, মদ্যপান এবং পোড়া মাংস ভক্ষণ। সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা ফল করে। বাতাসে ঠান্ডা স্পর্শ মিশে যায়। আমি গায়ে একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে ডেকের সিঁড়িতে বসে আছি। আমার মাথায় হিজাব। মেয়েদের সামনেও এখন আমি হিজাব খুলি না। বরং মুখের ডান পাশটার অনেকাংশ ঢেকে রাখি হিজাব দিয়ে। একটু অসতর্ক হলেই পোড়া দাগ বেরিয়ে পড়ে। লোকে ভয় পায়। চোখ বড় বড় করে তাকায়। অস্বস্তি লাগে।
সেলফোনটা বাজছিল। আম্মুজানের কল। ধরতেই বলল,
—‘তুমি কি ব্যস্ত? একটু জরুরি কথা আছে। বলব এখন?’
—‘বলো, ব্যস্ত নই।’
—‘তোমার ছোটবোন হাইস্কুল প্রমে যেতে চায়। ফেব্রুয়ারিতে হবে মনে হয়। প্রমে যাবার জন্য সে ড্রেস অর্ডার করেছে অনলাইনে। ওকে বোঝাও, যে এসব হবে না। তোমার বাবাজান বেঁচে থাকলে আজ কী কষ্টটাই না পেত এসব দেখে।’
আমি একটু সাবধানী গলায় বললাম, ‘ওর যদি খুব শখ হয় তো যেতে দাও না। আমরা যাইনি বলে যে সেও যেতে পারবে না এমন তো কোনো কথা নেই।
আম্মুজানের আমার কথাটা পছন্দ হলো না। খিটখিটে গলায় বলল, ‘কী বলছ এসব? তোমার বাবাজান বেঁচে থাকলে কি এই পারমিশন কখনো দিত?’ আমি চুপ করে রইলাম কয়েক সেকেন্ড। তারপর কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললাম, ‘দেখো আম্মু, প্রমে গেলেই তোমার মেয়ে খারাপ হয়ে যাবে ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। ওখানে সব ফ্রেন্ডসদের সাথে দেখা হবে। যাদের সাথে এতদিন একসাথে ক্লাস করেছে, পড়াশোনা করেছে তাদেরকে অফিশিয়ালি গুডবায় বলার সুযোগ পাবে। ও যদি খুব করে চায় প্রম অ্যাটেন্ড করতে তাহলে না করাটা ঠিক হবে না। আমি আর মেজো যাইনি, কারণ আমাদের ইচ্ছে করেনি। বোরিং মিউজিক, ইউজলেস নাচানাচি, এসব আমাদের পছন্দ ছিল না। তাছাড়া আমার ফ্রেন্ড হেইলি, ওর আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল সেই সময়। প্রম ড্রেস কেনা, টিকেটের পেছনে পঞ্চাশ ষাট ডলার খরচ করা, এসব ওর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। ওর জন্য আমরা কেউই যাইনি। কিন্তু আম্মু আমাদের তো এখন এতটুকু অ্যাফর্ড করার এবিলিটি আছে। আলহামদুলিল্লাহ।’
—‘আমার একটু ও ভালো লাগছে না এসব। তোমার বাবার মুখটা শুধু ভেসে উঠছে চোখের সামনে। মনে হচ্ছে আমার ওপর কোনো কারণে সে অসন্তুষ্ট হয়ে আছে।’
—‘এগুলো তোমার মনের ভুল আম্মু। বাবাজান যেখানেই আছে, ভালো আছে এবং আমাদের ওপর খুব সন্তুষ্ট হয়ে আছে। তুমি অযথা চিন্তা করো না।’
আম্মু একটা দীর্ঘ হতাশাজনিত শ্বাস ফেললো। তারপর কণ্ঠস্বরে স্থিরতা ফিরিয়ে এনে বলল, ‘শোন, আমাদের এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয়র ছেলে কদিন হলো নিউইয়র্কে এসেছে। ইংলিশ টিংলিশ পারে না। এখানকার এক প্রসারি শপে কাজ নিয়েছে কিন্তু সেই কাজ তার ভালো লাগছে না। আমাদের ফার্ম আছে শুনে ফার্মে কাজ করতে আগ্রহী হয়েছে। আমি ঠিকানা দিয়ে দিয়েছি। কদিনের মধ্যে হয়তো তোমার সাথে দেখা করতে যাবে। কথাবার্তা বলে দ্যাখো। দেশি মানুষ সঙ্গে থাকলে ভালোই লাগবে।’
—‘হুম, আচ্ছা ঠিক আছে। আসুক। কথা বলে দেখি।’
—‘শোন রুশমি, আরেকটা জরুরি কথা আছে তোমার সাথে।’
—‘হুম বলো। শুনছি।’
—‘ঝুম্পার বর, মানে তোমার দুলাভাই একটা বিয়ের প্রস্তাব এনেছে তোমার জন্য।’
ভ্রু কুঁচকে গেলো, ‘মানে কী?’
আম্মুজান মিনমিন করে বলল, ‘না মানে এক পাকিস্তানি ভদ্রলোক আছেন। ঝুম্পার বরের কলিগ। ভদ্রলোকের স্ত্রী গত হয়েছে দেড় বছর হলো। দুটি যমজ সন্তান আছে। বয়স পাঁচ। তো ভদ্ৰলোক…’
—‘আম্মু চুপ করো তো!’
আমার কর্ণমূল ঝাঁঝাঁ করে উঠেছে। রাগে দপদপ করছে মাথার রগ। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি। আমার চড়া গলার আওয়াজ শুনে সহকর্মীরা আমোদ ভুলে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে আছে আমার দিকে। ফোন কানে চেপে ধরে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। আম্মুজান বলছে,
—‘তুমি অল্পেই উত্তেজিত হয়ে যাও রুশমি। কোনো কথা বোঝার চেষ্টা করো না। এটা কিন্তু খুব খারাপ!’
আমি দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠছি। কাঠের সিঁড়ি মড়মড় করছে আমার পায়ের আঘাতে। আজকাল আমি অল্পে উত্তেজিত হয়ে যাই কথাটা মিথ্যে নয়। অতি মাত্রায় সত্য। কিন্তু এর জন্য আমি দায়ী নই। দায়ী আমার শারীরিক অসঙ্গতি। হরমোনের অস্বাভাবিকতা।
—‘কী বোঝার চেষ্টা করব? এখানে বোঝার কী আছে শুনি?’
বেডরুমের দরজাটা দড়াম শব্দে বন্ধ করে বললাম।
—‘মাথা ঠান্ডা করে আমার কথা শোনো। একা একা একজন মেয়ের পক্ষে জীবন কাটানো অসম্ভব। আমি আর কদিন বাঁচব? আমি চলে গেলে তো তোমার মাথার ওপর কোনো গুরুজন থাকবে না। আমি যাবার আগে তোমাদের তিনবোনকে প্রতিষ্ঠিত দেখে যেতে চাই। আমি চাই তোমাদের একটা স্থায়ী ঠিকানা হোক, পরিবার হোক, সংসার হোক।’
রাগে আমার সারা গায়ে আগুন জ্বলছে। ঘরে এসেই মাথার হিজাব ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় দগ্ধ মুখ এবং ঘাড়ের অনেকখানি প্রতিফলিত হয়ে আছে। সেদিকে চেয়ে বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বললাম, ‘তা তোমাদের সেই ভদ্রলোক কি জানে যে আমি দেখতে কুৎসিত? আর আমার শরীরের একটা মেজর অর্গান মিসিং?’
আম্মুজান ক্লেশ জর্জরিত কণ্ঠে বলল, ‘আহ! এভাবে বলো না! তুমি কুৎসিত হবে কেন? এসব কথা বলতে তোমাকে নিষেধ করেছি না?’ এটুকু বলে আম্মুজান চুপ করল। সে এখন হাঁপাচ্ছে। তার বড় বড় শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি ফোনের ভেতর দিয়ে। ঢকঢক করে পানি পান করার আওয়াজ পেলাম। তারপর আগের চাইতে ধীরস্থির গলায় বলতে শুনলাম, ‘লোকটা সবকিছু জেনেশুনেই এগোতে চায়। তুমি রাজি থাকলে আমি তাকে এই থ্যাংকস গিভিং এ আমাদের ফার্মহাউজে দাওয়াত দেব।’
আমার ভেতরে বিস্ফোরণ হচ্ছে। এই অপমান কি আমার প্রাপ্য ছিল? কেন ঘুরেফিরে লোকে এই একই প্রসঙ্গ টেনে আনে? লন্ডনে বেশ তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল একবার। কলেজ যাবার পথে রোজ একটা পার্শিয়ান ছেলে ফলো করত। বাসে চান্স পেলেই পাশে বসে পড়ত। এটা সেটা বলে আলাপ জমানোর চেষ্টা করত। সে আমার কলেজে পড়ে না। একটি আইটি কোম্পানিতে জব করে। কলেজের পাশেই তাদের অফিস। মাস ছয়েক এভাবে চলার পর একদিন সে আমাকে কফির দাওয়াত দিল। সেই দাওয়াত আমি সাদরে গ্রহণ করলাম। তো কথায় কথায় ছেলেটি আমাকে ভালো লাগার কথা জানালো। আমি মনে মনে হাসছি। কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আমার অতীত সম্পর্কে জানতে পারার পর এই ছেলে লেজ গুটিয়ে পালাবে। হলোও তাই। মুখের পোড়া দাগটা দেখিয়ে বললাম, ‘দ্যাখো আমার শরীরের সর্বত্র এরকম বীভৎস দাগের ছড়াছড়ি। এবং আমার জরায়ুতে ক্যানসার হয়েছিল বিধায় ওটা কেটে ফেলে দিতে হয়েছে। এবং আমার আগে একবার বিয়ে হয়েছিল।’
ছেলেটা এত চমক একসাথে এর আগে কখনো পায়নি বোধহয়। চেহারা হয়েছে দেখার মতো। চোখজোড়ায় দুকূল ছাপানো বিস্ময়, ভয় এবং শঙ্কা। পাথরের মতো বসে আছে। কোনো কথা বলতে পারছে না। আমিই মুক্তি দিলাম তাকে। বললাম, ‘ইটস ওকে। তুমি তো আর জানতে না আমার অতীত সম্পর্কে। তুমি এসো। আমার সাথে আর কখনো দেখা করার চেষ্টা করো না।’
ছেলেটা আমার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। পরবর্তীতে আর কোনো যোগাযোগ রাখেনি। আজ হঠাৎ সেই ঘটনাটা মনে পড়ল। রাগে আমার ব্রহ্মতালু ফেটে যাচ্ছে। দাঁত কিড়মিড় করে বললাম, ‘তোমাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। বোধ বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। কী বলছ নিজেরাও জানো না। কেন আমাকে এভাবে অপমান করতে চাইছ?’
আম্মুজানের গলার স্বর সপ্তমে চড়ল এবার, ‘অপমানের কী আছে হ্যাঁ? মানুষের জীবনে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে না? লোকটার সাথে একবার দেখা করলে কী এমন ক্ষতি হবে তোমার? এতো জিদ তো ভালো না। জিদের কারণেই আজকে তোমার এই অবস্থা।’
আমার ভেতরটা ফুটন্ত পানির মতো টগবগ করছে। একটা তীব্র চিৎকারে ফেটে পড়ে যদি ভেতর থেকে সব রাগ, ক্ষোভ, অপমান উগরে ফেলে দিতে পারতাম তবে হয়তো শান্তি লাগত। কিন্তু আমি চিৎকার করছি না। বরং রাগে গজগজ করতে করতে বলছি, ‘তোমরা ভুলে গেছ যে আমি এখনো বিবাহিতা।’ এটুকু বলবার পর হঠাৎ আমার কণ্ঠস্বর রোধ হয়ে এলো কান্নায়। অনেক কষ্টে কান্নার ঢোঁক গিলে আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম, ‘আমাদের এখনো ডিভোর্স হয়নি এবং আমার স্বামী এখনো জীবিত আছে। এই কথাটা কখনো ভুলে যেও না!’
লাইন কেটে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম বিছানার ওপর। তারপর বহুদিন বাদে আমি পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। আম্মুজান আবার ফোন করছে। রিংটোন বাজছে। আমি ফোন ধরার কোনো তাগিদ অনুভব করছি না। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছি। অপমানে কাঁদছি না, নিজের দুরবস্থার কথা চিন্তা করেও কাঁদছি না। কাঁদছি কারণ আমার এই মুহূর্তে একটাবারের জন্য ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। ওর সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে জানতে ইচ্ছে করছে, ‘শিহাব! তোমার কি কখনও মনে পড়ে? তোমার রুশানিয়াকে?
শিহাব
তিন ঘণ্টা আটান্ন মিনিট টানা ড্রাইভ করলাম। প্রায় দুশো মাইল রাস্তা। রুট টোয়েন্টি থ্রি হয়ে আটলান্টায় পৌঁছেছি। এখানে আমার বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব আছে যাদের বাড়িতে চাইলেই আশ্রয় নেয়া যায় একরাতের জন্য। কিন্তু জোয়ানাকে সঙ্গে নিয়ে কারো বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করছে না। গদির ওপর পা গুটিয়ে বসে, জ্যাকেট দিয়ে মুখ ঢেকে, আরামসে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে মেয়েটা। ঠিক নাক ডাকা নয় তবে ওর নিঃশ্বাসে একটা ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে। এক্সিট নিয়ে হাইওয়ে থেকে বেরিয়ে এসেছি। গাড়ি থামিয়েছি রেস্ট এরিয়ায়। এখানে বেশ কিছু ফাস্টফুডের দোকান আছে। কোনোটাতেই বসে খাবার খাওয়া যাবে না। শুধু ড্রাইভ থ্র সেকশন খোলা। একটি মাত্র রেস্টুরেন্টে চেয়ার টেবিলে বসে খাবার ব্যবস্থা আছে। সেই রেস্টুরেন্টের পোর্চে একাধিক আউটডোর ডাইনিং টেন্ট রয়েছে। প্লাস্টিকের পর্দা ঘেরা তাঁবুর ভেতর বসে খাবার খাচ্ছে মানুষ। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। কতটা কোভিড সেফ হতে পারে এই প্রচেষ্টা, আমার জানা নেই। ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে দেখি জোয়ানার ঘুম ভেঙেছে।
—‘কী খাবে?’
চোখ কচলে চারপাশটা একবার দেখল মেয়েটা। ঘুম ঘোর আক্রান্ত কণ্ঠ নিয়ে বলল, ‘এখন সকাল নাকি সন্ধ্যা?’
আমি হাসলাম, ‘কী মনে হচ্ছে?’
জোয়ানা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখদুটি কিছু সময় আমার মুখের ওপর স্থিরভাবে ধরে রেখে বলল, ‘তোমাকে হাসলে কী ভীষণ ভালো দেখায়! সব সময় হাসবে।’
—‘এটা তো আমার প্রশ্নের উত্তর হতে পারে না। জানতে চেয়েছি তুমি কী খেতে চাও?’
জোয়ানা দায়সারা গলায় বলল, ‘এনিথিং!’
ড্রাইভ থ্র থেকে কিছু খাবার কিনে নিলাম। বার্গার, কোক এসব হাবিজাবি। জোয়ানার যদিও আমার খাবারের কসট বেয়ার করার কথা ছিল কিন্তু এ পর্যন্ত একটাবারের জন্যও তাকে পার্স থেকে কার্ড বের করতে দেখলাম না। দাম দেবার সময় হয় সে মনোযোগ দিয়ে মোবাইল টেপে, নয় জানালা দিয়ে চেয়ে থাকে সুদূরপানে।
আমরা খাবার নিয়ে কাছাকাছি একটা পার্কে এসে বসলাম। এই পার্কের নাম কী আমি জানি না। জানার প্রয়োজনও বোধ করিনি। সবুজ ঘাসে ঘেরা পরিপাটি মাঠ, আর বসার বেঞ্চ দেখেই নেমে পড়েছি। সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশে সূর্যের শেষ আলোটা নীলচে হয়ে লেপ্টে আছে। যে বেঞ্চে আমরা বসেছি তার সামনেই পার্কের ওয়াক ওয়ে। শীতকাল বলে পথচারীর সংখ্যা কম। তবুও কেউ কেউ কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছে। জোয়ানা ওর সেলফোনটা আমার মুখের সামনে ধরে বলল, ‘এই দ্যাখো আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে গালাগাল করে যাচ্ছে সমানে।’
—‘করাই উচিত।’
—‘মানে?’
—‘তুমি ওর সাথে প্রতারণা করেছ।’
—‘কে বলল এসব কথা তোমাকে?’
—‘কে বলবে আবার? আমি নিজের চোখে দেখলাম।’
জোয়ানা খিকখিক করে হাসতে লাগল, ‘তুমি কিছুই জানো না। ও খুব খারাপ একটা লোক। ক্লাবে পরিচয় হয়েছিল। অনেক রিচ। টাকা দেখেই পছন্দ করেছিলাম। কিন্তু মদ খেয়ে মাতাল হলে দ্যাট বিচ কী করে ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া।’
—‘কী করে?
—‘মারে, একবার তো মেরে মাথা ফাটিয়ে দিল। রক্তারক্তি কাণ্ড। যে বন্ধুর বাসায় যাচ্ছিল সেই বন্ধু আরো বদ। আমাদের ক্লাবের একটা মেয়েকে রেপ করেছিল ওই বাস্টার্ড। পুলিশ খুঁজছে ওকে। পালিয়ে বেড়াচ্ছে।’
আমি প্রত্যুত্তরে কিছু বললাম না। চুপচাপ বার্গার খেতে লাগলাম। বুঝতে পারছি এরা খুব একটা সুবিধার লোক না। মেয়েটা অন্যদের নামে নিন্দা করে বেড়াচ্ছে। ওর ব্যাকগ্রাউন্ড ঘেঁটে দেখলে এর চেয়ে খুব ভালো কোনো রেকর্ড বেরোবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। যাক গে, আমার কী! আমার বরং ভাবা উচিত ফ্লোরিডার পর আমার গন্তব্য কোথায় হবে? মায়ামিতে স্কুল লাইফের এক বন্ধু থাকে। তার সাথে কি দেখা করা যায়? ওহ না, এই করোনাকালীন সময়ে কারো বাসায় যাওয়া ঠিক হবে না। কী দিন পড়ল! প্রকৃতি এখন
মানুষকে, মানুষের সঙ্গটুকু থেকেও বঞ্চিত করতে চায়। মনুষ্যজাতির এর চেয়ে বড় শাস্তি বোধহয় আর হয় না।
—‘তোমার স্ত্রীর কী হয়েছে? বললে না তো!’
খাবার গিলতে গিয়ে হোঁচট খেলাম। কাশি উঠে গেলো। জোয়ানা তড়িঘড়ি করে আমার দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিল। পানি পান করার পর সময় নিয়ে একটা বড় শ্বাস টেনে নিলাম, বললাম, ‘আমাকে ছেড়ে চলে গেছে!’ জোয়ানা বোধহয় এ ধরণের কিছু আশা করেনি। সন্ধ্যার নীলচে আবছা আলোয় ওর চোখ দুটো আমি স্পষ্টরূপে পূর্ণব্যাদিত হয়ে উঠতে দেখলাম।
—‘আনবিলিভেবল! তোমার মতো একটা মানুষকে কেন কেউ ছেড়ে যাবে?’
—‘আমার মতো মানুষ বলতে কী বোঝাতে চাইছ? আমাকে তুমি কতটা চেনো?’
—‘আই ক্যান রিড পিপল এক্সট্রিমলি ওয়েল।’
কটাক্ষ করলাম, ‘এ জন্যেই তো রিলেশন করার আগে বোঝোনি যে তোমার বয়ফ্রেন্ড ভালো লোক নয়।’
—‘ওহ, না সেটাও আমি আগেই টের পেয়েছিলাম। কিন্তু ওর মধ্যে অন্য ব্যাপার ছিল। মানে ও বিছানায়…’
—‘হ্যাঁ বুঝেছি। নো নিড টু এক্সপ্লেইন।’
—‘আচ্ছা তোমার ওয়াইফ তোমাকে কেন ছেড়ে গেলো? তুমি তো অনেক ভালোবাসতে তাকে।’
খাওয়া শেষ হয়েছে। বেঞ্চের পাশেই ট্র্যাশ বিন রাখা। বার্গারের ঠোঙা ট্র্যাশ করে আস্তেধীরে একটা সিগারেট ধরালাম। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে আমার ভালো লাগে না। আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো যাদের স্বভাব, তাদের সাথে ইচ্ছাকৃত ভাবেই দূরত্ব রচনা করেছি। আমার স্ত্রী প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে গেছে এই ঘটনার আলোচনা কিংবা সমালোচনা কোনোটিই আমার জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। আমি ছোট করে জোয়ানাকে বললাম, ‘শী চিটেড অন মি।’
—‘ওহ স্যরি!’ এটুকু বলে জোয়ানা থামল। আবার বলল, ‘বাট ইউ স্টিল লাভ হার! আই ক্যান রিড ইওর মাইন্ড!’
আমার বুক থেকে একটা বিষণ্ণ দীর্ঘশ্বাস আর্তনাদের মতো বেরিয়ে এলো। হাও ক্যান আই লাভ সামওয়ান হু হ্যাজ বিট্রেড মি! ইট হ্যাজ নো পয়েন্ট অ্যাট অল! একজন তরুণী বেশ হৃষ্টপুষ্ট এক ডালমেশিয়ান কুকুর নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল সরু পথটা দিয়ে। কুকুরটা খাবার সময় আমার পায়ের কাছে মুখ নামিয়ে এনে খেলার ছলে কী যেন বলতে চাইল। আমি ওর মাথায় হাত রেখে আদর করে দিলাম। একটা কুকুর পালার শখ আমার অনেকদিনের! মমের কুকুরভীতি এবং শুচিবায়ুর কারণে হয়ে ওঠেনি কখনো। এবার ভাবছি একটা কুকুর দত্তক নেব।
জোয়ানা বলল, —‘তুমি জানো তোমার স্ত্রী এখন কোথায় আছে?’
ডালমেশিয়ান ওর মনিবের সাথে হেঁটে হেঁটে দূরে সরে যাচ্ছে। সেদিকে চেয়ে থেকে নিস্তরঙ্গ গলায় উত্তর দিলাম, ‘না।’
—‘কতদিন দেখা হয় না?’
—‘পাঁচ বছর।’
—‘ওয়াও! লং টাইম! তুমি কি এখনো তার অপেক্ষায় আছ?’
—‘যে আমার সাথে প্রতারণা করেছে, যে আমাকে চায় না, তার অপেক্ষায় আমি কেন থাকব?’
শেষের প্রশ্নটা জোয়ানাকে নয়, নিজেকেই করা! মাথার ওপর অসংখ্য তারকার মেলা। আকাশটাকে ভ্যানগগের আঁকা ‘স্টারি নাইট’ মনে হচ্ছে। আদিগন্ত বিস্তৃত সেই নক্ষত্ররাজির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আমার মনে হলো, যে মেয়েটা একদিন আমার চোখে চোখ রেখে বলেছিল আমি তার সবকিছু! সেই মেয়েটা আজ আমাকে ছাড়া কী করে নিশ্বাস নিচ্ছে? কী করে বেঁচে আছে? এমন আশ্চর্য ঘটনাও বুঝি ঘটতে পারে এই পৃথিবীতে? অঞ্জন দত্তের একটা গান মনে পড়ছে আমার।
আমি বৃষ্টি দেখেছি, বৃষ্টির ছবি এঁকেছি
আমি রোদে পুড়ে
ঘুরে ঘুরে অনেক কেঁদেছি
আমার আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখার খেলা থামেনি
শুধু তুমি চলে যাবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
—‘তুমি ওকে যতটা ভালোবেসেছিলে এতটা ভালো যদি কেউ আমাকে বাসতো! আই উড গিভ আপ মাই এন্টায়ার লাইফ, টু বি দ্যাট মাচ লাভড়!’ জোয়ানা মনে হয় স্বগতোক্তি করল। আমি ওর কথার প্রত্যুত্তরে কিছু বললাম না। গুনগুন করে গানের কলি আওড়াতে লাগলাম।
আমি অনেক ভেঙ্গেচুরেও
আবার শুরু করেছি
আবার পাওয়ার আশায় ঘুরে মরেছি
আমি অনেক হেরে গিয়েও
হারটা স্বীকার করিনি
শুধু তোমায় হারাবো
আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
— ‘ধরো হঠাৎ একদিন তোমার সাথে ওর দেখা হয়ে গেলো এতগুলো বছর পরে। কেমন হবে ব্যাপারটা? কী করবে তুমি?’
আমার গানের সুর থেমে গেলো। কোনো চিন্তাভাবনা না করেই দৃঢ় চিত্তে বললাম, ‘খুন করব নিজ হাতে!’
রুশমি
শনি রবিবারে ফার্মের কাজ বন্ধ থাকে। তবুও পশু-পাখিগুলোর যত্নআত্তি করতে হয়। একজন কর্মচারী সকালে আর বিকেলে এসে ঘুরে যায়। গরু আর ঘোড়াগুলোকে মাঠে চড়ায়, খাওয়ায়, গোসল দেয়, তারপর চলে যায়। লিও আর ছোট্ট এমিলি যথা সময়ে পৌঁছে গেছে। এমিলি বাবা-মায়ের দেখাদেখি আমাকে নাম ধরে ডাকে। আন্টি ডাকার বালাই নেই। তবে ও আমার খুব ভক্ত। এই ছোট্ট পরিটাকে লন্ডনে ফেলে চলে আসার সময় কষ্টে কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। আমার ফার্মহাউজ এমিলির ভীষণ পছন্দ হয়েছে। সে তার মাকে ভিডিও কলে পুরো বাড়ি ঘুরেঘুরে দেখিয়েছে। এবং সাফ জানিয়ে দিয়েছে এই বাড়ি ছেড়ে আপাতত সে কোথাও যাচ্ছে না। বিকেলটা ঘরে বাইরে দৌড়াদোড়ি করে সন্ধ্যের মুখে মুখেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে দস্যি পরিটা। এখন ব্যাক ইয়ার্ডে বাবার কোলে গুটিশুটি হয়ে ঘুমোচ্ছে। ও হ্যাঁ, এমিলি এখন অবধি তার বায়োলজিক্যাল ফাদারের দেখা পায়নি। সেই লোক মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে কয়েক বছর হলো। এমিলি লিওকেই বাবা হিসেবে জানে এবং মানে।
লেকের পানির ওপর ডুবন্ত সূর্যের লালিমা খেলা করছে। কয়েকটা বুনো হাঁস প্যাকপ্যাক শব্দে ডাকাডাকি করে সাঁতার কাটছে পানিতে। একজন বৃদ্ধ লোক জলে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে নৌকায় বসে। এদিকে লেকের বুকের আঁশটে গন্ধ সঙ্গে নিয়ে হু হু করা ঠান্ডা বাতাস আমাদের ছুঁয়ে দিয়ে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে রেডহিলসের পাইনগাছের জঙ্গলে। লিওর সাথে ফার্মের কাজকর্ম এবং করোনাকালীন দুর্ভোগ নিয়ে কথা বলছিলাম। খুব পছন্দের একটা রেস্টুরেন্ট কোভিড নাইন্টিনের কারণে ব্যবসা মন্দা যাওয়ায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। লিও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। একটা বিল্ডার্স কোম্পানিতে জব করে। জানালো গত মাসে ওদের অফিস থেকে তিনজনকে ছাটাই করা হয়েছে। ওর চাকরিটা বেঁচে গেছে ভাগ্য জোরে। এছাড়াও ইলেকশনের ফলাফল নিয়ে গোটা মার্কিন মুলুক এখন উত্তাল। বিভিন্ন জায়গায় গণ্ডগোল হচ্ছে, রায়ট হচ্ছে। ট্রাম্পের অনুসারীরা করোনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাস্ক ছাড়াই রাস্তায় নেমে পড়েছে প্রতিবাদ জানাতে। ওয়াশিং ডিসিতে প্রোটেস্টর এবং কাউন্টার ডেমোন্সট্রেটরদের মধ্যে ক্ল্যাশ হচ্ছে। হানাহানি, ধ্বস্তাধস্তি হচ্ছে। অগণিত মানুষ আহত হচ্ছে। পুলিশের ধাওয়া খাচ্ছে। সব মিলিয়ে নাগরিক জীবনে নেমে এসেছে বিশৃঙ্খলতা। মনে হচ্ছে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। এদিকে বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষ আপনজন হারাচ্ছে। মৃত্যুর সময় প্রিয়জনের পাশে থাকার সৌভাগ্যটুকুও হচ্ছে না কারো। পৃথিবীর তাবৎ সাম্রাজ্য আজ ছোট্ট এক ভাইরাসের কাছে পরাজিত। এই ভাইরাস তো মানুষে মানুষে পার্থক্য বোঝে না, ধনী গরিব মানে না। অন্ধের মতো যাকে সামনে পায় তাকেই আক্রমণ করে বসে। আমরা দুই বন্ধু সন্ধ্যের ধুপছায়া আকাশের নিচে বসে থেকে মানুষের এই জীবনমরণ সংকট নিয়ে কথা বলছিলাম। এতো বড় বড় সমস্যার সামনে নিজেদের ব্যর্থতা আর অতৃপ্তি গুলো কতই না মূল্যহীন হয়ে ধরা দেয়! কিন্তু কথায় কথায় তুচ্ছ ব্যক্তিগত বিষয় চলে আসে। বিয়ারের ক্যানে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ লিও অপ্রাসঙ্গিক ভাবে বলে ওঠে,
—‘তুমি কি জানো? শিহাব অ্যান্ড সাশা…, দে আর লিভিং টুগেদার!’
অনেকদিন পর হঠাৎ কারো মুখে ওর নামটা শুনতে পেয়ে আমি নিজের অজান্তেই যেন কাঠের পুতুল বনে গেলাম। চুপ করে চেয়ে রইলাম লিওর দিকে। বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেলাম না।
—‘তোমার মন খারাপ হয়েছে কথাটা শুনে?’ লিও প্রশ্ন করল।
আমি হাসার চেষ্টা করলাম, ‘নাহ, মন খারাপ হবে কেন? ওকে তো বাঁচতে হবে তাই না? মুভ অন তো করতেই হবে! আমি খুশি!’
এরপর আমি শব্দগুলো বারবার নিবিষ্ট মনে আওড়াতে লাগলাম, আই অ্যাম হ্যাপি! আই অ্যাম হ্যাপি!
সাশা শেষ পর্যন্ত পেরেছে। এই খবর শুনে আমার তো সত্যিই খুশি হওয়ার কথা। এটাই তো চেয়েছিলাম! তবুও যেন আমি আমার মন চরাচরের আবহাওয়া ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারছি না। যে মুহূর্তে লিও ওর নামটা উচ্চারণ করল, সেই মুহূর্ত থেকে আমার ভাবনঘরটা কেমন ঝড়ের কবলে পড়া ছনের কুটিরের মতো নড়বড় করছে। মনে হচ্ছে আরেকটু হলেই ভেঙে পড়বে। সেই রাতে আমাদের গল্প জমল না। ওদের বাবা মেয়েকে দোতলায় আমার পাশের ঘরটায় থাকতে দিয়েছি। লিও টায়ার্ড ছিল। বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। ওর ঘুমন্ত ভারী নিশ্বাসের শব্দ পাশের ঘর থেকে অনায়াসে ভেসে আসছে আমার কানে। আজকে আমার ঘোড়াগুলোর কী হয়েছে কে জানে, সন্ধ্যে থেকেই অকারণে ডাকাডাকি করছে। ওদের ডাকাডাকিতে তিতির গুলোও ঘুমাতে পারছে না। তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। আমার বাড়ি থেকে খামার পর্যন্ত আধ মাইলের মতো রাস্তা হবে। সন্ধ্যের পর চারপাশ এতো বেশি নীরব হয়ে যায় যে আধ মাইল দূরে বসবাসরত পশুপাখির হাঁকডাক আমি সহজেই শুনতে পাই। ওদের উপস্থিতি আমার একাকিত্ব দূর করে দেয়। খোলা জানালা দিয়ে এ বাড়ির সামনের উঠোনটা দেখা যায়। উঠোনের পরেই সরু মেঠো পথ। তারপর কয়েকটা ঝোপঝাড় আর পাইন গাছ নিয়ে পথটা উত্তাই হয়ে নেমে গেছে নিচে। নিচে গ্যাস স্টেশন, কফিশপ আর পশু হাসপাতালের সমন্বয়ে একটি ছোট মার্কেট প্লেস আছে। মার্কেটের সাথে লাগোয়া দুই লেনের রাস্তা। রাস্তার ওপারে আমার সবজির ক্ষেত, ফুলের বাগান আর সবুজ মাঠ। জানালায় দাঁড়ালে আমার ক্ষেত দেখা যায়। ক্ষেত সংলগ্ন মাঠে গরু, ঘোড়া যখন নিশ্চিন্ত মনে চড়ে বেড়ায়, তখন আমি মাঝেমাঝে জানালায় দাঁড়িয়ে দূর থেকে ওদের দেখি।
আজ কেন যেন ঘুরে ফিরে উইলো ফরেস্টের কথা মনে পড়ছে। সারি বাঁধা গাছ, সুঁড়ি পথের বুনো ফুল, ক্রিকের ধারের পাথরের ওপর আছড়ে পড়া জলের শব্দ, ঝাঁক ঝাঁক সিকাডার সম্মিলিত ডাক আর শিহাবের সেই প্রেয়সী চেরিগাছটা, যাকে ও ভালোবাসত। সেই গাছটাও তবে আমার মতই একলা হয়ে গেলো? আমার শ্বশুর-শাশুড়ি নিশ্চয়ই সাশাকে মেনে নেয়নি। নেবেও না। তাই হয়তো ওদেরকে ভার্জিনিয়া থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে। আমি অন্ধকার ঘরে বিছানার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছি। আমার মনে পড়ছে সেই দিনটার কথা যেদিন সাশাকে প্রথম দেখেছিলাম। দেখামাত্র বুঝেছিলাম ও শিহাবকে ভালোবাসে। বুঝতে পেরে মোটেও খুশি হইনি। বরং দিনকে দিন মেয়েটি আমার চক্ষুশূল হয়ে উঠছিল। অথচ ভাগ্যের পরিহাস কী নির্মম! শেষটায় সাশা জিতে গেলো আমি হেরে গেলাম! মাঝে মাঝে মনে হয় ওই বোবা কালা মেয়েটি আসলে সেদিনই জিতে গিয়েছিল, যেদিন সে শিহাবকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবেসেছিল।
একটা চামচিকা ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতর। ঘুরপাক খাচ্ছে সিলিং এর কাছে। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, সাশাকে আমার এখন হিংসে হচ্ছে। ছিঃ রুশমি, ছিঃ তুমিই তো মেয়েটাকে বলেছিলে শিহাবের টেক কেয়ার করতে। তুমি মনে প্রাণে চেয়েছিলে শিহাবের জীবনের দ্বিতীয় নারীটি যেন সাশা ভিন্ন অন্য কেউ না হয়। আজ যখন বেচারি তোমারই সিদ্ধান্ত মোতাবেক, তোমারই দেখানো পথে হেঁটে হেঁটে অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছল, তখন তুমিই তার এই সাফল্য সহ্য করতে পারছ না। তোমার মনটা একদম হিংসেয় ভরা! ধিক তোমাকে… ধিক!
আচ্ছা সাশাকে কি ও ভালোবাসে?
ভেতর থেকে কে যেন খটোমটো গলায় বলে ওঠে, তাতে তোমার কী? নিশ্চয়ই বাসে। সাশা তো ভালোবাসার মতোই মেয়ে, তাই না?’
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই, ঠিক ঠিক, ভালোবাসার মতোই মেয়ে! কিন্তু শিহাবের কি আমাকে মনে পড়ে না, একটাবারের জন্যও?
—‘না পড়ে না!’
—‘তুমি কে? তুমি এতো নিষ্ঠুর কেন?’
—‘আমি তোমারই ভেতরকার সত্তা। আমি সত্য কথা বলি, তাই শুনতে খারাপ লাগে।
—‘তুমি চলে যাও। সত্য কথা শুনতে আমার ভালো লাগছে না।’
—‘তুমি ওদেরকে ছেড়ে দাও, ওদেরকে নিয়ে আর ভেবো না।’
—‘ভাবি না তো! কিন্তু জানো? গতকাল থেকে কী যে হয়েছে, পুরোনো কথা বারংবার স্মৃতির অলিন্দে ভিড় জমাচ্ছে। আমার অতীত যেন নিশ্চল হয়ে পাথরের মতো চেপে বসে আছে বুকের ওপর। ওকে খুব মনে পড়ছে। ওর মুখ নিঃসৃত কথা, ওর রাগ, অভিমান, ভালোবাসা, প্রেম!’
—‘এগুলো ফালতু কথা। ভুলতে চাইলেই ভোলা যায়। ন্যাক্যামো ছাড়ো!’
—‘ন্যাকামো নয়। আমার ভারী কষ্ট হয়। বুকের ওপর চেপে বসা ভারী
পাথরটা নামতেই চায় না!’
–‘বাজে বোকো না!
—‘আচ্ছা বকবো না। তুমি যাও তোমাকে আমার ভালো লাগছে না!’
কে ছিল, কে গেলো তার কিছুই জানি না। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে কে যেন অন্তর কাঁপানো কণ্ঠে ‘রুশানিয়া’ বলে ডেকে উঠল 1 চমকে জেগে উঠলাম। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘরে। ঘুম এলো না আর। ওর জন্য মন কেমন করতে লাগল। কেমন আছে মানুষটা? সত্যিই ভালো আছে তো? একবার যদি চোখের দেখা দেখতে পেতাম! অশান্ত মনকে শান্ত করার আর কোনো উপায় নেই নামাজ পড়া ছাড়া। ওযু করে জায়নামাজে বসে পড়লাম। কী চাইব আমি আমার প্রিয় আল্লাহর কাছে জানি না! শুধু কাঁদতে লাগলাম। আমার যে এখনো সেই মানুষটার জন্য মন পুড়ে, হৃৎপিণ্ডে রক্তক্ষরণ হয়, কলিজা ছিঁড়ে যায় কষ্টে। ওর প্রতি আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম, আমার অনুভূতি যে পরম সত্য, অক্ষয় এবং অবিনাশী এই বাস্তবতাটুকু আমার চাইতেও বেশি জানেন যিনি, তিনিই আমার আল্লাহ, আমার রব, আমার সৃষ্টিকর্তা। তাঁর কাছে তো গোপন কিছুই নেই! তাই নিজেকে যখন আমি সম্পূর্ণরূপে তাঁর কাছেই সঙ্গে দিলাম, তখন তিনি আমাকে নির্দ্বিধায় আশ্রয় দিলেন। আমার অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদলোকের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ কেটে গেলো, পালিয়ে গেলো অবসাদ, দিকে দিকে জ্বলে উঠল আলোর দিশারি। ঝিরঝিরে স্নিগ্ধ বাতাসে জুড়িয়ে যেতে লাগল দেহের প্রতিটি রক্তকণিকা। বুকের হৃৎপিণ্ডে, একটু আগে যেখানে ছিল প্রজ্জ্বলিত বহ্নিশিখা, সেখানটায় এখন শুধুই শান্তির বর্ষণ! তারপর জায়নামাজ ছেড়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে, গভীর রাতের তমসাময় অন্তরীক্ষের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আমি বহুদিন পরে নিজের জন্য, শুধুমাত্র নিজের জন্য তাঁর কাছে কিছু চাইলাম। আমি প্রার্থনা করলাম, মানুষটাকে যেন মৃত্যুর আগে অন্তত আর একটাবারের জন্য হলেও দেখতে পাই!
পরবর্তী দিনটা খুব ব্যস্ততায় কেটে গেলো। ট্রাক ভর্তি সবজি সাপ্লাই দিলাম কাছাকাছি তিনটা গ্রসারি স্টোরে। নভেম্বরে বিটস, কেইল, ব্রাসেল স্প্রাউট, র্যাডিশ ইত্যাদির ফলন ভালো হয়। আমেরিকার সর্বত্রই অর্গানিক সবজির চাহিদা তুঙ্গে। গ্রসারি স্টোরের লোক এসে সবজি নিয়ে যায়। ফার্মের কর্মচারীরা ট্রাকে তুলে দেয়। এসব কাজের তদারকি অবশ্য আমাকেই করতে হয়। লিও আর এমিলিকে একটুও সময় দিতে পারিনি আজ সারাদিন। ওরা বাবা মেয়ে নিজেদের মতো ঘুরে বেড়ালো। খাওয়া দাওয়াও সেরে নিল বাইরে। দুপুরে একবার ব্যাংকে যেতে হলো আমাকে। বাজার সদাইও করার ছিল। এমিলির জন্য কিছু উপহার কিনেছি। লেগো সেট, ক্যান্ডি ইত্যাদি। সব কাজ সেরে সারাদিন পর বাড়ি ফিরেও কর্মবিরতি নেবার উপায় নেই। এয়ারবিএনবির গেস্ট আসবে রাতে। ঘর সাফ করা, বিছানার চাদর পাল্টানো, জানালায় নতুন পর্দা দেয়া, শেল্ফের বইপত্র গুছিয়ে রাখা এসব করতে করতেই রাত প্রায় দশটা বেজে গেলো। ক্লান্ত শ্রান্ত শরীর নিয়ে শোবার ঘরে ফেরার মুখে লিওর সাথে দেখা।
—‘আজ সারাদিন তুমি আমাকে এড়িয়ে চলেছ। কাল সন্ধ্যায় তো চলেই যাচ্ছি।’
আমার মনে অপরাধবোধ টলটল করে উঠল, ভারী বিনীতভাবে বললাম, ‘ভীষণ দুঃখিত। কী যে ব্যস্ত ছিলাম সারাদিন তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।’
লিও ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, ‘এসব ব্যস্ততার গল্প শুনিয়ে লাভ নেই। কালকের সকালটা আমার আর আমার মেয়ের জন্য বরাদ্দ করে ফেলো, কেমন?’
—‘নিশ্চয়ই, আগামীকাল পুরো দিন তোমাদের সাথে কাটাচ্ছি।’
এমিলি ঘুমিয়ে পড়ার পর লিও আমার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো। দরজা ধাক্কাতে হলো না। এই নির্জনতায় পায়ের শব্দ শুনেই প্রতিটি প্রাণীর গতিবিধি বোঝা যায়। লিওর পা জোড়া আমার ঘরের সামনে এসে থামতেই আমি শোয়া থেকে উঠে এলাম। দরজা খুলে দেখি ও অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে।
—‘কী ব্যাপার?’
—‘ঘুম আসছে না। তোমার কাছে অ্যালকোহোল জাতীয় কিছু হবে?’
—‘ডাইনিং এর ফ্রিজে আছে।’
লিও হলওয়ের বাতি জ্বালালো।
—‘তোমার কি মন খারাপ?’
—‘নাতো!’
—‘আমরা এসেছি বলে তুমি খুশি হওনি?’
একথা শুনে ভারী অপ্রতিভ বোধ করলাম। নিশ্চয়ই আমার আদর আপ্যায়নে কোনো কমতি পড়ে গেছে, যে কারণে লিওর মনে হচ্ছে তাদের আগমনে আমি আনন্দিত নই।
—‘ভীষণ খুশি হয়েছি, বিশ্বাস করো! আমার ফার্মে তো খুব বেশি কর্মচারী নেই তাই এক হাতে অনেক কাজ সামলাতে হয়। এ কারণে হয়তো…’
লিও আমাকে থামিয়ে দিল, ‘সেটা কোনো বিগ ডিল নয়। আমার মনে হচ্ছে গতকাল শিহাব আর সাশার ব্যাপারটা জানার পর থেকে তোমার মুড অফ হয়ে গেছে। আমি কি ঠিক বলছি?’
চুপ করে গেলাম। কী বলব? কোনো উত্তর নেই তো আমার কাছে! দরজার চৌকাঠে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি। লিও ওর নীল চক্ষুদ্বয় তীক্ষ্ণ ভাবে মেলে ধরেছে আমার অবনমিত মুখের ওপর। কী যেন খুঁজছে ব্যাকুল ভাবে। কয়েকটা সেকেন্ড কাটার পর ও স্তিমিত গলায় বলল,
—‘কথা বলতে চাও এই ব্যাপারে?’
একটা বড় শ্বাস পড়ল আমার বুক চিরে। আমেরিকা ফিরে আসার পর থেকেই কী হয়েছে জানি না, স্মৃতির যে টানেলটা সিলগালা করে রেখেছিলাম এতকাল, সেই টানেলের মুখ দৈবদুর্বিপাকে পড়ে যেন উন্মুক্ত হয়ে গেছে। তারপর বহুকাল বন্দি দশায় থাকা স্মৃতিগুলো অন্ধকার কবর থেকে মুক্তি প্রাপ্ত প্রেতাত্মার মতো দিনরাত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। লিও ঠিকই বলেছে। আমার মনের অবস্থা নিশ্চয়ই কাউকে খুলে বলা উচিত। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে বললাম, লেটস টক!
নিচতলা থেকে একটা ভদকার বোতল নিয়ে এসে আমরা লিওর ঘরে বসলাম। অতিথিদের জন্য এসব রাখতে হয়। লিও ব্লু টুথে গান বাজিয়ে দিল। এমিলির শব্দের মধ্যে ঘুমোনোর অভ্যাস আছে। স্টেসি উদ্দেশ্যমূলক ভাবেই বাচ্চাকে খুব ছোটবেলা থেকে এই অভ্যাস করিয়েছে। আমি মদ খাই না। কোকের ক্যান নিয়ে বসেছি। জানালার ধার ঘেঁষে একটা ছোট গোল টেবিল। আমরা মুখোমুখি বসেছি। ঘর অন্ধকার। লো ভলিউমে স্প্যানিশ মিউজিক বাজছে।
—‘তুমি কি এখনো শিহাবকে ভালোবাসো?’
ঠিক সেই সময় উঠোনে একটা গাড়ি এসে থামল। চাকার শব্দ শুনতে পেলাম। হেডলাইটের আলো এসে পড়ল জানালায়। লিওর প্রশ্নের উত্তরটা আমার দিতে ইচ্ছে করছিল না। একদিক দিয়ে বেঁচে গেলাম। বললাম, ‘গেস্ট এসে গেছে।’
—‘তাতে তোমার কী? একটু কমার্শিয়াল হও বুঝছ? তোমার ভাব দেখে মনে হয় এরা এয়ারবিএনবির গেস্ট নয়। তোমার রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়স্বজন।’
আমি লিওর কথার প্রত্যুত্তর না করে জানালায় ছুটে গেলাম। গাড়ির লাইট তখন নিভে গেছে। অন্ধকারে কিছুই ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না। কী গাড়ি, গাড়ির রং কী এসব কিছুই বোঝার উপায় নেই। কেউ একজন নামল গাড়ি থেকে। একটি মেয়ে বোধহয়। এমিলি কাঁদছিল ঘুমের মধ্যে। মায়ের নাম ধরে ডাকছে। বেচারির মনে হয় মায়ের জন্য মন পুড়ছে। আমি জানালা থেকে সরে এলাম। লিও এমিলিকে কোলে তুলে নিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। চেয়ারে এসে বসলাম। অন্ধকারে ঢাকা লিওর আবছা মুখের দিকে চেয়ে বললাম, ‘এখনো ভালোবাসি ওকে! সবসময় বাসব!’
শিহাব
টালাহাসি পৌঁছুলাম রাত নয়টার দিকে। জোয়ানা একটা এয়ারবিএনবি ভাড়া নিয়েছে এক রাতের জন্য। একটু আগে এয়ারবিএনবির হোস্টের সাথে ফোনে কথা হয়েছে তার। হোস্ট জানিয়েছে রাত বারোটায় চেকইন করলেও কোনো সমস্যা নেই। গাড়িতে একটানা বসে থাকতে থাকতে জোয়ানার নাকি মাজা ব্যথা করছে। কথা সত্য। আমারও হালকা পাতলা ব্যাকপেইন হচ্ছে। টানা পাঁচদিন বিছানায় শোয়া হয় না। এবার সত্যিই বিরতি প্রয়োজন। টালাহাসি থেকে জোয়ানার গ্র্যান্ডমার আবাসস্থল আরো ঘণ্টা চারেকের পথ। আজ রাতটা কোথাও কাটিয়ে আগামীকাল ভোরে ফ্রেশ স্টার্ট করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এয়ারবিএনবির লোকেশন দেয়া আছে জোয়ানার ফোনের গুগল ম্যাপে। গুগল নির্দেশিত পথ ধরেই এগোচ্ছি এখন। গন্তব্যের কাছাকাছি এসে আবিষ্কার করলাম রাস্তার দুধারে কেবলই আবাদভূমি। মনে হচ্ছে গুগল বুঝি আমাদের কোনো ফার্মহাউজে নিয়ে যাচ্ছে। আমার ধারণা সঠিক প্রমাণিত হলো মিনিট তিনেক পরেই। মেইন রোড থেকে একটা সরু লাল মাটির রাস্তা ডান দিকে এঁকেবেঁকে কিছুটা ওপরে উঠে গেছে। সাইনবোর্ডে একটা গরুর মুখ আঁকা। নামধাম কিছু লেখা নেই।
—‘এটা কি ফার্মহাউজ নাকি?’
জোয়ানা ঠোঁট উল্টে বলল, ‘হু নোজ!’
গাড়ি ঘুরিয়ে নিলাম ডান দিকে। ধূলো ধূসরিত মাটির রাস্তা। গাড়ির চাকা চলতেই চারপাশে ধূলো উড়তে শুরু করেছে। কিছুদূর যাবার পর দেখলাম ডানপাশে ঘোড়ার আস্তাবল, বাম পাশে গরুর গোয়ালঘর এবং মুরগির খামার। গুগল ম্যাপ বলছে গন্তব্যে পৌঁছুতে আরো দুমিনিট সময় লাগবে। চলতে থাকলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, রুশমির একটা ফার্মল্যান্ডের স্বপ্ন ছিল! ও বলেছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, লইয়ার এর কোনোটাই সে হতে চায় না। হতে চায় ফার্মগার্ল! জানি না কেন, আচমকা আমার মনটা কেমন হু হু করে উঠল। রুশমি এখন কোথায় আছে? কেমন আছে? ফার্মগার্ল হবার স্বপ্ন কি পূরণ করতে পেরেছে?
খামারের পরপর জংলা জায়গার শুরু। জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে রাস্তাটা। কিছুদূর যাবার পর সরু রাস্তাটা গিয়ে মিশল এক চৌকো উঠোনের সাথে। গাড়ি উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতেই গুগল বলে উঠল, ইওর ডেস্টিনেশন ইজ অন দ্যা রাইট! কোনো এক রহস্যময় অবিদিত কারণে গুগলের মাত্র বলা কথাটা আমার ক্লান্ত মস্তিষ্কে বেশ কয়েকবার চরকির মতো ঘুরপাক খেলো, ইওর ডেস্টিনেশন ইজ অন দ্যা রাইট! ঘাড় ঘুরিয়ে একনজর দেখলাম নির্জন অরণ্যবাসের স্থিরচিত্র আঁধার ঢাকা বাড়িটাকে। দোতলার জানালায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে মুখ দেখা যায় না। কিন্তু বোঝা যায় ছায়ামূর্তিটি একটি মেয়ের। চুলগুলো ফিনফিনে বাতাসে অল্প অল্প উড়ছে। রুশমির চুল ছিল কোমর পর্যন্ত। বাতাসে যখন ওর খোলা চুল উড়ত… কী আশ্চর্য! এখানে আসার পর থেকেই আমার কারণে অকারণে ওকে মনে পড়ছে কেন? দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখলাম জানালা শূন্য। কেউ নেই। গাড়ি পার্ক করে রাখলাম উঠোনে। সদর দরজার পাশের দেয়ালে একটা কম্বিনেশন লক বক্স লাগানো আছে। এই বাক্স বিশাল বড় সাইজের একটা তালা। তালার ভেতর চাবি সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা আছে। জোয়ানা মোবাইল থেকে কোডটা দেখে নিল। তারপর কোড অনুযায়ী নম্বর প্রেস করল লক বক্সে। ঢাকনা খুলে যাবার পর দেখা গেলো একটি মাত্র চাবিই আছে ভেতরে। জোয়ানা চাবি তুলে নিয়ে দরজা খুলল। ভেতরটা একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার নয়। ঢুকতেই প্রশস্ত হলওয়ে। হলওয়ের দেয়ালে ঝুলছে বেশ বড়সড় ক্যান্ডেল শ্যান্ডেলিয়ার। প্রায় সাত আটটা মোমবাতি একসাথে জ্বলছে। ডানদিকে লিভিংরুম আর ডাইনিং। জোয়ানা বামদিকের পথটা দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘এদিকে এসো।’
আমি ওর পেছন পেছন এগিয়ে গেলাম। হলওয়ের শেষ প্রান্তে পাশাপাশি দুটি ঘর। জোয়ানা একটি ঘরের দরজা খুলতে খুলতে বলল, ‘আমি একটামাত্র ঘর ভাড়া নিয়েছি। তোমার সমস্যা হবে না তো?’
আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘নাহ। কোনো সমস্যা নেই!’
ভেতরটা সুগন্ধে ভরে আছে। বাতি জ্বালাতেই চোখের সামনে একটা সাজানো গোছানো পরিপাটি ঘরের চিত্র ভেসে উঠল। আরাম লাগল দেখে। মনে হচ্ছে এয়ারবিএনবির হোস্ট বেশ রুচিশীল। কাঠের মেঝের ওপর গোল লাল কার্পেট, দেয়ালে দামি পেইন্টিং, খাটের পাশে রাখা নাইটস্ট্যান্ডের ফুলদানিতে তাজা ফুল আর সেন্টেড মোমবাতি, বইয়ের তাকে সাজিয়ে রাখা সারি সারি বই। মোমবাতির গন্ধটা সুন্দর। কাছে গিয়ে দেখলাম, ওশেনমিস্ট! রুশমির ফেভারিট সেন্ট! ইশ! আবারও রুশমি কেন? ধ্যাৎ …
—‘তুমি শাওয়ার নিতে পারো।’
জোয়ানার কথায় ঘোর ভাঙল। সময় নষ্ট না করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলাম। গোসল সেরে বেরিয়ে দেখি জোয়ানা বিছানায় বসে আরাম করে কফি খাচ্ছে। আমাকে দেখেই বলল, ‘হোস্ট খুব ভালো মানুষ। নিজের হাতে কফি বানিয়ে দিল।’
—‘তাই?’
—‘হ্যাঁ, এতো জেনারাস হোস্ট আমি এই প্রথম দেখলাম।’
—‘গুড ফর ইউ!’ প্রত্যুত্তর করলাম। কফি খাওয়ার ইচ্ছে এখন একেবারেই নেই। ডিনার আমরা পথেই সেরে নিয়েছিলাম। জোয়ানা ওয়াশরুমে ঢোকার পর আমি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। সিগারেট শেষ করে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। আরামে চোখ বুজে আসলো। এই ঘরে একটাই বিছানা। কোনো কাউচ টাউচও নেই। আমি বিছানা দখল করে ফেললে জোয়ানার কী উপায় হবে? এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমে চোখ লেগে এসেছিল জানি না। ঘুম ভাঙল জোয়ানার ডাকে। ওর মুখটা আমার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে। ভেজা চুল থেকে পানি ঝরে পড়ছে আমার টিশার্টের কলারের ওপর। সুন্দর একটা ঘ্রাণ ভেসে আসছে ওর চুল থেকে। আমি এই প্রথমবারের মতো জোয়ানার মুখটা ভালোভাবে লক্ষ্য করলাম। গোলগাল আদুরে চেহারা। কোঁকড়ানো কালো চুল। মুখের ত্বক ফর্সা এবং মসৃণ। সবুজ রঙের ব্লাউজ আঁটোসাঁটো হয়ে লেগে আছে শরীরের সাথে। ব্লাউজের গলাটা এতো বেশি চওড়া যে ওর বুকের ভাঁজ এখন আমার চোখের সামনে প্রকট ভাবে দৃশ্যমান।
—‘আমি তোমার পাশে ঘুমোলে কি তুমি মাইন্ড করবে?’
একটু অপ্রস্তুতভাবে চুপ করে রইলাম কিছুক্ষণ। একটা সময় ছিল যখন সুন্দরী মেয়েরা আশেপাশে থাকলে অন্যরকম ভালো লাগত। আমার সেই মনটা মরে গেছে। আজকাল আর কোন কিছুতেই উত্তেজনা টের পাই না। বললাম, ‘তোমার চুল থেকে পানি ঝরছে, মুছে নাও।’
জোয়ানা উঠে বসল। আমি একটু নড়েচড়ে খাটের একপ্রান্তে সরে আসলাম। চোখ বন্ধ করার আগে বললাম, ‘তোমার যেখানে ইচ্ছে শুতে পার। আই ডোন্ট মাইন্ড!’
খানিক বাদে হেয়ারড্রায়ারের সাঁইসাঁই শব্দ এসে কানে লাগল। জোয়ানা নিশ্চয়ই ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকোচ্ছে। শব্দটা শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম নিজেও জানি না।
রুশমি
এমিলির ঘরময় ছুটে বেড়ানোর চঞ্চল পদশব্দে ঘুম ভাঙল। কাঠের মেঝে ওই ছোট্ট পায়ের আঘাতে মড়মড়িয়ে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। আজ ব্রেকফাস্টের পর আমাদের জঙ্গলে যাবার কথা শিকারের উদ্দেশ্যে। মেরিকে আসতে বলেছি। সে বন্দুক টন্দুক নিয়ে হাজির হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। ঘড়িতে ভোর পাঁচটা বাজে। বাইরে এখনো আধো অন্ধকার। কককক করে মোরগ ডাকছে, ডাকছে তিতির I সেই সাথে অজস্র পাখির কিচিরমিচির। আমাদের বাড়ির ছোট্ট পাখিটাও অবশ্য কিচিরমিচিরে কম যায় না। একটু পরপর আমার দরজায় হানা দিচ্ছে সেই পাখি, মিহি স্বরে বলছে, হেই রুশ, ওয়েক আপ! ইটস টাইম!
ওযু করে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। ওরা বাপ মেয়ে জেগে উঠেছে অনেকক্ষণ হলো। নিশ্চয়ই খিদে পেয়ে গেছে। জামা কাপড় পাল্টাতে গেলে সময় নষ্ট হবে ভেবে নাইটির ওপরেই হিজাবটা জড়িয়ে নিয়ে নিচে নেমে এলাম। এমিলি আমার গালের পোড়া দাগ দেখলে ভয় পায়। ওর সামনে তাই ডানগালটা খুব ভালোমতো ঢেকে রাখতে হয়। সাধারণত আমি এয়ারবিএনবির গেস্টদেরকেও ফ্রিতে ব্রেকফাস্ট অফার করি। কিন্তু গতকাল গেস্টরা এসে পৌঁছেছে প্রায় মাঝরাতে। ঘুমোতে নিশ্চয়ই দেরি হয়েছে। তাই বেলা করে ওঠার সম্ভাবনাই বেশি। ওদের চেক আউট টাইম এগারোটা। সে সময় আমি বাড়িতে থাকব না। না থাকলেও সমস্যা নেই। টাকা পয়সার লেনদেন আগেই মিটে গেছে অনলাইনে। যাবার সময় শুধু চাবিটা বুঝিয়ে দিয়ে যাবে।
ব্রেকফাস্টের টেবিল রেডি করতে খুব বেশি সময় লাগল না। পেঁপের জুস আর এগ ওমলেট বানালাম। রুটি টোস্ট করলাম। ক্রসান্ট, সিরিয়াল এগুলো কেনাই ছিল। লিও এখনো নিচে নামতে পারেনি। এমিলিকে বাইরে যাবার জামা কাপড় পরিয়ে তৈরী করতেই সময় লাগছে। গতরাতে আসা অতিথি মেয়েটি দেখলাম এর মাঝেই জেগে উঠেছে। সুতি কাপড়ের সবুজ ব্লাউজ আর হাফপ্যান্ট ওর পরনে।
—‘ব্রেকফাস্ট চাই?’ ওকে দেখতে পেয়ে প্রশ্ন করলাম।
—‘শুধু কফি হলেই চলবে।’
—‘শিওর! তুমি কি একাই এসেছ? দুজন সদস্যের কথা বলেছিলে।’
—‘না একা নই। আমার সাথে আমার বন্ধু আছে।’
—‘বয়ফ্রেন্ড?’
—‘নোপ, অ্যাকচুয়েলি ইটস কমপ্লিকেটেড।’
আমি আর কথা বাড়ালাম না। একই রুমে রাত কাটালো আবার বলে কমপ্লিকেটেড! যাই হোক, কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানো একেবারেই সমীচীন কাজ নয়। প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম, ‘প্লিজ তুমি আমার সাথে ব্রেকফাস্ট করো। আমি খুব খুশি হবো তোমার সঙ্গ পেয়ে।
মেয়েটি ঝলমলে হাসল, ‘ঠিক আছে। একটু অপেক্ষা করো। আমি আমার ব্রাউন আইড এক্সট্রিমলি হ্যান্ডসাম ফ্রেন্ডটাকে ডেকে আনি।’
ব্রাউন আইড! শব্দ দুটো ঝনঝন করে বাজতে লাগল কানে। একজন ব্রাউন আইড মানুষকেই আমি চিনতাম এ জীবনে। কিন্তু পৃথিবীর ভাণ্ডারে নিশ্চয়ই কোটি কোটি ব্রাউন আইড মানুষ গচ্ছিত আছে। ক্যাবিনেট থেকে কফির মগ নামাতে গিয়ে অঘটন ঘটিয়ে ফেললাম। হাত ফসকে মগটা পড়ে গেলো মেঝেতে। ভেঙে চুরমার অবস্থা। নিজের অন্যমনস্কতায় নিজেরই রাগ হচ্ছে। তেজের হল্কা ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে। হঠাৎ করেই কেমন যেন অস্থির লাগছে আমার। পরীক্ষার হলে বা ইন্টারভিউ রুমে ঢোকার আগে যেমন অকারণ একটা উত্তেজনায় পেয়ে বসে মানুষকে, ঠিক সেরকম উত্তেজনায় জমে আসছে হাত পা। আশ্চর্য!
মেয়েটা চলে যাবার মিনিট তিনেকের মধ্যেই দেখি লিও এমিলিকে কোলে নিয়ে নেমে এসেছে নিচে। মেঝেতে পড়ে থাকা কাচের টুকরো গুলো ট্র্যাশ করে আমি এমিলিকে বেবি চেয়ারে বসালাম। সে ব্রেকফাস্টে শুধু ডিমের ওমলেট খাবে। আদতে খাবে না কিছুই, খাওয়ার নামে অন্ন ধ্বংস করবে। কিছু একটা বলছিল লিও। আমি শুনছি আবার শুনছি না। দায়সারা উত্তর দিচ্ছি। জানি না কেন, আমার ভেতরটা একটা অদ্ভুত অস্থিরতায় গাঁট হয়ে আছে। ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্ক ভাবে জার থেকে পাপায়া জুস ঢালছিলাম গ্লাসে। হঠাৎ টের পেলাম একটা লম্বা ছায়ামূর্তি আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘুরে তাকালাম।
শিহাব
আকাশে সূর্যের আবছা আলো ফুটেছে সদ্য। রাত্রি মিশেছে ভোরের সাথে। এটাকেই বলে রাতভোর। ঘরটা এখনো অন্ধকারে ছেয়ে আছে। জোয়ানা ঘরের বাইরে। দরজাটা একটু খোলা। কয়েকটা অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। আমি জানালার সামনে দাঁড়িয়েছি। এদিক থেকে বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডটা দেখা যায়। খুব কাছেই লেকের ঘাট। ইয়ার্ডে একটা নৌকো বাঁধা আছে। আছে বেশ বড়সড় বারবিকিউ গ্রিল। গাছের ডালে বাঁধা হ্যামক। আমি সেলফোনটা অন করেছি একটু আগে। মমের বেশ কয়েকটা মিসড কল আছে। কী বলতে ফোন করেছিল কে জানে। এতো সকালে কলব্যাক করাটা ঠিক হবে না। ঘুমোচ্ছে নিশ্চয়ই। হঠাৎ জানালার পাশে রাখা বইয়ের শেল্ফটায় চোখ পড়ল। ভোরবেলার ফিকে সাদাটে আলোয় একটা হৃষ্টপুষ্ট বইয়ের মলাট নজর কাড়ল আমার। এগিয়ে এসে বইটা হাতে নিলাম। মলাটের ওপর বইয়ের নাম লেখা ‘অ্যান অফ গ্রিনগেবলস।’ এই বইটার কথা আমাকে রুশমি বলেছিল। রহস্যটা কী? এখানকার সবকিছু রুশমির পছন্দের সাথে মিলে যাচ্ছে কেন? পরমুহূর্তেই দ্বিতীয় তাকে সাজিয়ে রাখা দুটি বই দেখে একটা অব্যাখ্যেয় শিহরণে আমার অন্তরাত্মা থরথর করে কেঁপে উঠল। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ এবং সংসদ বাংলা অভিধান! এই বাড়ির মালিক কি তবে বাঙালি?
জোয়ানা দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি ওকে দেখেও দেখছি না যেন। আমার চারপাশটা বিচিত্র এক রহস্যময় ধোঁয়ায় আবৃত হয়ে আছে। বিধ্বংসী প্রলয়ে আলোড়িত হচ্ছে অগ্র-পশ্চাৎ, পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ! খোলা দরজা দিয়ে ডাইনিং থেকে ভেসে আসছে একটি নারীকণ্ঠ। পাশাপাশি একটি পুরুষ এবং শিশুর কণ্ঠও শুনতে পাচ্ছি। নারী এবং পুরুষ, উভয়ের কণ্ঠস্বরই আমার চেনা। জোয়ানা দরজায় দাঁড়িয়ে আমার মুখপানে দৃষ্টিপাত করে কিছু একটা বলছে। জানি না কী বলছে মেয়েটা। এই মুহূর্তে শুধু নিজের হৃৎপিণ্ডের অবিশ্রান্ত ধুকপুকানি ছাড়া অন্য কোনো শব্দ শ্রবণে সম্পূর্ণ অপারগ আমি।
বইটা হাতে নিয়েই কম্পনরত, অবাধ্য পা-জোড়া সামনে এগিয়ে দিলাম। জোয়ানাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। হলওয়েটা যেন সমুদ্রের চেয়েও বড়। যেন প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল পাগল স্রোত আমাকে ডুবিয়ে নিতে চাইছে জলের অনেক গভীরে। আমি জলের চাপ ঠেলে উপরে উঠতে চাইছি। পারছি না। কানে পানি ঢুকে চিঁচিঁ শব্দ হচ্ছে। ফুসফুসে নোনা জল আটকে যাচ্ছে। এখুনি যেন প্রাণপাখিটা বেরিয়ে পড়বে খাঁচা ছেড়ে। কিন্তু তার আগেই বুঝি কেউ একজন আমাকে উদ্ধার করল। জলের আকর্ষণ ভেদ করে ডাঙায় চড়লাম। দেখতে পেলাম একটি মেয়ে ডাইনিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে চেয়ারে বসা যুবকের সাথে। মেয়েটির পরনে লম্বা জামা। মাথায় হিজাব। আমি বশীভূতের মতো এগিয়ে গেলাম। দাঁড়ালাম তার মুখোমুখি। তারপর কোনো এক অলৌকিক কুদরতে আমার সম্মুখ থেকে শত সহস্র বছরের অভিশপ্ত জীর্ণ কালো পর্দা হটে গেলো। যবনিকা পাত হলো অনেকদিনের লাগাতার দুর্ভিক্ষের। খরাময় নিদাঘ পিঙ্গল আকাশে সঞ্চারিত হলো নিকষিত নীল মেঘ। মুমূর্ষু পৃথিবীর বুকে প্রাণের ফুলঝুরি হাতে নিয়ে নিঃশব্দে দৃশ্যমান হয়ে উঠল সেই জন্মকাজল আঁকা দুটি ঐশ্বরিক চোখ!
রুশমি
Where there is great love there are always miracles.
—Willa Cather
—————
আমি স্তব্ধ, নির্বাক এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট! চকিত-বিস্ময় চোখে চেয়ে আছি সামনে। ক্ষুরধার বিদ্যুতের আঘাতে তরঙ্গায়িত আমার সর্বাঙ্গ। পায়ের তলায় মাটি নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই, বিস্ময়ের প্রমত্ত ঝড়ে যেন আমার পৃথিবীটা ভেঙে যাচ্ছে, গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে! সেই মুহূর্তের মানসিক অবস্থার সঠিক চিত্রায়ণ বোধহয় শব্দ দ্বারা সম্ভব নয়। যে মানুষটার কাছ থেকে এতকাল পালিয়ে বেড়িয়েছি। যার কাছ থেকে নিজের সত্য আড়াল করার জন্য সর্বোচ্চ লড়াই লড়ে গেছি। সেই মানুষটা কোনো রকম হুঁশিয়ারি ছাড়াই আচমকা আমার চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কী অদ্ভুত! কী আকস্মিক! কী আশ্চর্য!
দাঁড়ানো থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম। লিও আমাকে ধরে ফেলেছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। বুক উথালপাতাল! লিও আমাকে ধরে ধরে কোনদিকে যেন নিয়ে যাচ্ছে। আমি হাঁটতে পারছি না। সংকোচ, ভয়, বিস্ময় এবং উত্তেজনায় আমার শরীর বাস্তবিক অর্থে অবশ হয়ে এসেছে। লিও আমাকে শুইয়ে দিয়েছে ড্রইংরুমের সোফায়। আমি চোখ খুলতে পারছি না। পৃথিবী ভনভন করে ঘুরছে লাটিমের মতো। হাতে পায়ে ঝিমঝিম নিয়ে দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ে আছি সোফার ওপর। হৃদযন্ত্র এমন হতচ্ছাড়ার মতো পাগল নৃত্য নেচে যাচ্ছে বুকের খাঁচায়, যে ইচ্ছে করছে ওটাকে এই মুহূর্তে গলা টিপে মেরে ফেলি। এ আমি কী দেখলাম? কাকে দেখলাম? কী করে দেখলাম? বুকের গহনে যে মানুষটার ছবি ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায় সারাক্ষণ, সেই অদৃশ্য, হারিয়ে যাওয়া সত্তা কী করে রক্তমাংস সম্বলিত দেহ নিয়ে আকস্মিক উপস্থিত হলো আমার সামনে? কী করে সম্ভব? এই ধাক্কা আমার জীর্ণ শরীর সইতে পারবে কি? আমি জ্ঞান হারাচ্ছি না তো আবার? শরীর এখন আগের চাইতে অনেক বেশি দুর্বল। আমি এক রোগক্লিষ্ট, জীর্ণ, শীর্ণ অসুস্থ মানুষ। ওষুধপত্রের ওপর নির্ভর করে জীবন চলছে। একটু নিয়মের এদিক সেদিক হলেই হাঁপর উঠে যায়। এই যাত্রায় জ্ঞান হারালে বাঁচব কিনা তার সন্দেহ আছে। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, গত পাঁচটা বছর ধরে যে আমি মৃত্যুকে একফোঁটা ভয় পাইনি। বীরযোদ্ধার মতো লড়াই করে গেছি মৃত্যুর সাথে প্রতিনিয়ত, সেই সাহসী, নির্ভীক আমিটা হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেছে। মৃত্যু ভয় আজ আমাকে বিষাক্ত জোঁকের মতো জেঁকে ধরেছে চারপাশ থেকে। খানিক আগে চোখের সামনে ঝিলিক দিয়ে ওঠা মুখখানা আরো একবার খুব কাছ থেকে দেখতে পাবার জন্য আমার শরীরের প্রতিটি কোষে কোষে কিলবিল করে ছড়িয়ে পড়ছে জীবনলিপ্সা। আমি বাঁচতে চাই, আমি বাঁচতে চাই! ওর সাথে আমার শেষবারের মতো একটা কথা বলার আছে। মরার আগে সেই কথাটা বলে যেতে চাই!
ইয়া আল্লাহ! তোমার লীলাখেলা বুঝার সাধ্য নেই আমার মতো নিকৃষ্ট মানুষীর। বুঝার চেষ্টাও করছি না। আজ আমি জানি যে, মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন বিবেক বুদ্ধি যুক্তিতর্ক সমস্তকে দূরে ঠেলে দিয়ে শুধু মন দিয়ে ভাবতে হয়। আর চোখ বন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করতে হয় অদৃষ্টে। আমি সারাটা জীবনভর একটা মিরাকেলের অপেক্ষায় ছিলাম। শেষমেশ আমার জীবনে মিরাকেল ঘটে গেলো। ঘটে যাবার পর এক গা ছমছমে অনুভূতিতে বুঁদ হয়ে গেলো আমার সমস্ত সত্তা। আমি জানি না এখন আমার কী করণীয়। তাই চুপ করে শুয়ে আছি, চোখ বুজে। লিও আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কপালে হাত রেখে বলছে, ‘রুশ ওঠো। পানি পান করো। ভালো লাগবে।’
শিহাব
প্রাথমিক ধাক্কাটা কেটে যাবার পর আমি ওই ব্লন্ড যুবককে আবিষ্কার করতে পেরেছি। বছর পাঁচেক আগের একটা খণ্ড চিত্র স্মৃতির পর্দায় চলচ্চিত্রের মতো সরব হয়ে উঠেছে। রুশমি আমাকে বলেছিল, আই হ্যাভ নেভার লাভড ইউ শিহাব! ইট ওয়াজ অলওয়েজ লিও! ক্ষণকাল আগে আমার যে মনটা ওই জন্মকাজল আঁকা চোখদুটি দেখতে পেয়ে আনন্দে শিস দিয়ে উঠেছিল সেই মনটাই এখন ঘেন্নায় রিরি করে উঠল। হঠাৎ আমার নজর পড়ল হাই চেয়ারে বসে থাকা সোনালী চুলের বাচ্চা মেয়েটার ওপর। বড়বড় চোখ মেলে আমার দিকেই চেয়ে আছে। ওই শান্ত সুশ্ৰী কোমল মুখের দিকে চোখ পড়তেই এক অনির্বচনীয় আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে এলো বুক। মায়া হলো না একটুও, বরং ক্রমশ এক নারকীয় বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠতে লাগল বাতাস। দম আটকে আসতে লাগল। রুশমি তো সুখেই আছে। স্বপ্নের ফার্মল্যান্ড, ভালোবাসার মানুষ, ছিমছাম সাজানো গোছানো সংসার, ফুটফুটে সন্তান, চমৎকার! আর আমি? আমি কী করলাম বিগত পাঁচটা বছর? নিজের পরিবারকে দূরে ঠেলে দিয়ে, চাকরি বাকরি ছেড়ে, সম্পূর্ণ উন্মাদ উদ্বাস্তুর মতো যাযাবর জীবন কাটিয়েছি। আমার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়ে এই দুই প্রবঞ্চক নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। সংসার গড়েছে। স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছে। কী অবিশ্বাস্য! কী সাংঘাতিক! কী মারাত্মক! এতবড় প্রতারণার স্বীকার হবার পরেও যে মানুষ দিব্যি হেঁটে চলে বেড়ায়, সে আসলে মানুষ না, জন্তুর চেয়েও অধম। নিজেকে আমার এই মুহূর্তে জন্তু ভাবতেও লজ্জা হচ্ছে। নিজের হাস্যকর অস্তিত্বের ওপর একটা হাহা রিঅ্যাকট দিতে মন চাইছে। পাগল পাগল লাগছে।
আমি দ্রুত পায়ে ফিরে এলাম ঘরে। জোয়ানাকে বললাম, ‘আমি বেরোচ্ছি। তুমি চাইলে আমার সাথে আসতে পার।’
জোয়ানা হকচকিয়ে গেছে, ‘এখনই? এতো আর্লি কেন? চেকআউট তো বেলা এগারোটায়।’
আমি ওর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নিতে লাগলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলাম উঠোনে। জোয়ানা আমার পেছন পেছন আসছে। কী যেন বলছে উঁচু স্বরে। একটা প্রচণ্ড ধমকে ফেটে পড়লাম, ‘আমি যাচ্ছি! তোমার ইচ্ছে হলে থাকো। ইচ্ছে হলে জাহান্নামে যাও!’
ড্রাইভিং সিটে উঠে বসেছি। সিট বেল্ট বাঁধতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো, এ আমি কী করছি? দুর্ধর্ষ প্রতারকদের চোখের সামনে জীবন্ত পেয়েও কাপুরুষের মতো ছেড়ে দিচ্ছি? পালিয়ে যাচ্ছি? আমার তো উচিত এদেরকে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া। প্রয়োজনে খুন করা। ঝোঁকের মাথায় প্রস্থান করাটা ঠিক হবে না। আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার চড়া দাম দিতে হবে ওদের। জোয়ানা গাড়ির জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর চোখমুখ কাঁদো কাঁদো, অসহায়। একটা বড় শ্বাস টেনে নিলাম। ধাতস্থ হতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। নামলাম গাড়ি থেকে। জোয়ানার দিকে না তাকিয়েই হনহন করে হেঁটে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। মাথায় দাউদাউ করে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। বাড়িতে ঢোকার পর করিডোর ধরে সোজা ডাইনিং এ ফিরে এলাম। কেউ নেই। আমি কিছুক্ষণ ডাইনিং এর চেয়ারে বসে অপেক্ষা করলাম। পাশেই ড্রইংরুম। ওটাও ফাঁকা। কিছুক্ষণ ঘরের মাঝে পায়চারি করে বাইরে বেরিয়ে এলাম। উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটাহাঁটি করলাম। খামার এলাকাটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। যত দেখছি ততই ঘৃণায় মন বিষিয়ে উঠছে। ঘৃণা যতটা না রুশমির ওপর তার চেয়ে বেশি নিজের ওপর। আমার সাথেই কেন এমন হলো? কী করে এতো বোকা হলাম আমি? কেন একজন ব্যাভিচারিণী নারীকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসলাম?
একটা বোবা কষ্টে আমার বুক পিষে যাচ্ছে। নার্ভগুলো যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। অসহায় যন্ত্রণায় অবশ হয়ে আসছে চেতনা! পাগলা ষাঁড়ের মতো ফোঁসফোঁস নিশ্বাস ফেলে এলোমেলো ত্রস্ত পায়ে আবারও বাড়ি ফিরে এলাম। এবার ডাইনিং এ সবাইকে একযোগে পাওয়া গেলো। জোয়ানা বাচ্চাটার পাশের চেয়ারে বসে টোস্টে কামড় দিচ্ছে। দেখলাম রুশমি দাঁড়িয়ে আছে। মাথাটা নিচু। আমি ঘরে এসে দাঁড়াতেই চোখ তুলে তাকালো। ভালোবাসার মতো অলৌকিক বস্তু বোধহয় পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। যে মেয়েটা আমাকে চরম ভাবে ধোঁকা দিয়েছে, তাসের ঘরের মতো অবহেলায় ভেঙে দিয়েছে আমার সাজানো গোছানো পরিপাটি জীবন, সেই মেয়ের সামনে বুকভর্তি ঘৃণা আর গভীর বিদ্বেষ নিয়ে দাঁড়াবার পরেও কোনো ভাবেই কঠিন হতে পারছি না। বিগত কয়েকবছর আমার মনটা আদিম গুহাস্থিত জন্তুর মতো কঠোর হয়ে গিয়েছিল। আজ এতো কাল পরে যেন সেই পাশবিক মনে হঠাৎ একটা মানুষ এসে ভর করেছে। অপ্রতিরোধ্য আবেগে ভেসে যাচ্ছে ভেতরটা। সর্বাঙ্গ কাঁপছে থরথর করে। অভিমান, ক্রোধ, হিংসা এই সমস্ত অনুভূতি দলা পাকিয়ে পাথরের মতো আটকে আছে গলার কাছে। ঢোঁক গিলতে কষ্ট হচ্ছে। লিও কথা বলল, ‘বসো প্লিজ! ব্রেকফাস্ট করো আমাদের সাথে।’
এই ছেলের গলার আওয়াজ শোনামাত্র আমার কান ঝাঁঝাঁ করে উঠল। রাগে চিড়বিড়িয়ে উঠল মন। ঠান্ডা চোখে একবার তাকালাম তার দিকে। সে বন্ধুসুলভ হাসি হাসলো। কতবড় স্পর্ধা! আমার বৌ নিয়ে পালিয়ে গিয়ে আবার আমারই সামনে বুক চিতিয়ে বসে আছে। সৌজন্যতার হাসি হাসছে! টেবিলে একটা ফলকাটার ছুরি রাখা আছে। চকচকে এবং ধারালো। ছুরিটা তুলে নিয়ে ছেলেটার গলায় বসিয়ে দিলে কেমন হয়?
—‘তোমাদের মেয়ের বয়স কত?’ জোয়ানা প্রশ্ন করল।
লিও বলল, ‘চার বছর হলো এবার।’
চার বছর! এর মানে আমাকে ছেড়ে যাবার সময় রুশমি অন্তঃসত্ত্বা ছিল? হঠাৎ একটা জটিল সমীকরণ চোখের সামনে ভেল্কি দিয়ে সমাধান হয়ে গেলো। আমার জাপান যাত্রার পরপরই ওদের মাঝে ঘনিষ্টতা হয়েছিল। এ কারণেই অতি অল্প সময়ের মধ্যে কাউকে কিছু না জানিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। অনেকদিনের দুর্ভেদ্য রহস্যটা ভেদ হয়ে যাবার পর আমার মনে স্বস্তি এলো না। বরং ভয়ঙ্কর একটা কষ্ট চারদিক থেকে জাপটে ধরল। বুক চিরে বিষণ্ণতার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। স্বপ্ন ছিল রুশানিয়ার মতো আশ্চর্য সুন্দর চোখের একটা মেয়ে হবে আমার! আজ সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে এ কথা ভেবে যে জীবনের একমাত্র পবিত্র এবং সত্য প্রেম আমি তুলে দিয়েছি অপাত্রে। এই বোকামির কোনো ক্ষমা হয় না। ফল কাটার ছুরিটার দিকে আরেকবার তাকালাম। পরমুহূর্তেই মনে হলো ছুরির কী প্রয়োজন? আমার গাড়িতেই তো গুলি সম্বলিত বন্দুক রয়েছে। করোনাকালীন সময়ে আমেরিকানরা হুমড়ি খেয়ে পড়ল বন্দুক কেনার জন্য। আমিও এক কলিগের দেখাদেখি কিনে ফেললাম। আপাতত একটা দুটা মানুষ খুন করা আমার জন্য কোনো ব্যাপারই না!
—‘কার মতো হয়েছে তোমার বাচ্চা? আমি তোমাদের কারো চেহারার সাথেই মিল খুঁজে পাচ্ছি না।’ জোয়ানা বলল। আমি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ওর পাশে বসেছি। বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম জোয়ানার কথা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। রুশমির চোখ, চুল কিছুই পায়নি মেয়েটা। এমনকি বাবার মতো নীল চোখও তার নয়। অন্যরকম চেহারা।
রুশমিকে বলতে শুনলাম, ‘এমিলি আমার মেয়ের মতোই বাট টেকনিক্যালি শি বিলংস টু মাই ফ্রেন্ড।’
থমকে গেলাম ভেতরে ভেতরে। জোয়ানা বলল, ‘এটা তোমার মেয়ে নয়?’
—‘না আমার মেয়ে নয়। এইযে আমার বন্ধুকে দেখছ, ওর মেয়ে।
চকিত বিস্ময়ে মুখ তুলে তাকালাম লিওর দিকে। আমার চোখে হয়তো হাজারো প্রশ্ন গিজগিজ করছিল তাই কোনো শব্দ উচ্চারণ করার আগেই সে উত্তর দিল, ‘আমি স্টেসিকে বিয়ে করেছি। এমিলি আমাদের মেয়ে।’ এটাও প্রহসনের কোনো অংশ নয়তো? এমিলি যদি লিও আর স্টেসির মেয়ে হয়ে থাকে তাহলে ওরা এখানে কী করছে? স্টেসি কোথায়? লিও জোয়ানার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আসলে আমার ওয়াইফের মা খুব অসুস্থ। তাই এবার আসতে পারেনি আমাদের সাথে।’
রুশমি
আশ্চর্য ব্যাপার এই যে অনেক চেষ্টার পরেও আমি ওর সাথে এখন অবধি একটা কথা বলতে পারিনি। কী বলব জানি না তবে মনে হচ্ছে কিছু একটা বলা দরকার। মনে মনে বারবার কথা গুছিয়ে নিচ্ছি কিন্তু যে মুহূর্তে ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছি একটা গা ছমছমে ভয় আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে, শব্দেরা হারিয়ে যাচ্ছে। ওর পরনে নেভিব্লু রংয়ের একটা টি-শার্ট। এই শার্ট বানানা রিপাবলিক থেকে কিনেছিল ওর মা। আমি তার সঙ্গে ছিলাম সেদিন। দামটাও মনে আছে, এগারো ডলার নিরানব্বই সেন্টস। ওর গায়ের রং আগের চাইতে ময়লা হয়ে গেছে। এরকম হলো কেন? রোদে রোদে ঘোরে নাকি খুব? ওজনও কমে গেছে মনে হচ্ছে। চুল দাড়ি কামায় না বোধহয় অনেকদিন। চুল বারবার কপালে এসে পড়ছে। হাত দিয়ে সরাতে হচ্ছে। শুকিয়ে যাবার কারণে ওর চোয়াল এখন আগের চাইতেও প্রখর। ও কিছু খাচ্ছে না। চুপচাপ বসে আছে মেঝের দিকে তাকিয়ে। মুখ থমথমে গম্ভীর। আমি ওর মুখোমুখি বসেছি। আমার কুনুইটা টেবিলের ওপর রাখা। হাতের তালুর ওপর চিবুক। একদৃষ্টে চেয়ে আছি ওর দিকে। এতকাল বাদে আমি যে তাকে একনজর দেখতে পাচ্ছি এটা আমার জন্য কত বড় পাওয়া তা কী করে বোঝাই? এই মহিমাময় প্রাপ্তিকে সংজ্ঞায়িত করার মতো কোনো যোগ্যতা আমার নেই। শব্দহীন, ভাষাহীন অজস্র কৃতজ্ঞতা জানাই সেই এক এবং অদ্বিতীয় সত্তাকে যিনি এই মানুষটাকে আরেকবার দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন আমার ক্ষুদ্র জীবনে। আমি সেই সত্তাকে এখন আরো বেশি করে ভালোবাসছি। আমার মনে হচ্ছে এখানটায় বসে না থেকে আমার নিশ্চয়ই এই মুহূর্তে আমার রবের প্রতি মাথানত করা উচিত, সিজদা করা উচিত। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। দোতলায় এসে ওযু করে নফল নামাজ পড়লাম। তারপর ভাবতে বসলাম এখন আমার ঠিক কী করণীয়?
একথা সূর্যের আলোর মতো ঝকঝকে পরিষ্কার যে শিহাব আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি। না পারাটাই স্বাভাবিক। আমার প্রতি ওর রাগ এবং ঘৃণা নিশ্চয়ই এতদিনে প্রকট শক্তিশালী রূপ ধারণ করেছে। ওর মা ভেবেছিল আমি তার ছেলের জীবন থেকে সরে পড়লেই সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। মহিলা বুঝেনি যে কিছু ক্ষত চিরস্থায়ী হয়। হাজার চেষ্টা করলেও সেই ক্ষতর দাগ রাবার দিয়ে ঘষে তোলা যায় না। আমার কাছ থেকে পাওয়া আঘাত বা প্রতারণা ও এখনো ভুলতে পারেনি। আজ থেকে অনেক বছর আগে মানুষটাকে ছেড়ে দেবার সময় যে অসহনীয় মর্মান্তিক যন্ত্রণার ছাপ তার মুখে দেখেছিলাম, আশ্চর্যজনক ভাবে আবিষ্কার করলাম সেই যন্ত্রণার ছাপ এখনো ওর দুটি চোখের মধ্যে নিশ্চল এবং নিরূপিত হয়ে আছে। এসব কথা ভাবতে গিয়ে আমার বুক মোচড় দিয়ে উঠছে। সত্যিই মানুষটাকে অনেক বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। আমি আগুনে পুড়ে ঝলসে গেছি আর ওই মানুষটা আগুনে না পুড়েও ক্রমাগত দগ্ধ হয়েছে। আমি নিজের আত্মসম্মান বাঁচানোর জন্য স্বার্থপরের মতো অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি। কিন্তু দোষটা আমার একার নয়। শিহাবের মায়ের প্ররোচনা না থাকলে কি এতো বড় সিদ্ধান্ত আমার পক্ষে নেয়া সম্ভব হতো? তবে ওর মা ভুল কিছু বলেনি তো! একথা অতিমাত্রায় যৌক্তিক এবং সমীচীন যে আমার দুর্ভোগের কথা জানতে পারার পর মানুষটার মনে আমার জন্য যে করুণার উদ্রেক হবে, সেই করুণাই আমাদের ভালোবাসাকে সমাধিস্থ করার জন্য যথেষ্ট। আমি ধুঁকে ধুঁকে মরে যেতে রাজি আছি। তবুও ওর চোখে নিজের জন্য ভালোবাসার স্থলে করুণা কৃপা কিংবা অনুকম্পা দেখতে রাজি নই।
আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। কপালের কাছে চুল অনেকটা কমে গেছে। কেমো দেবার পর থেকেই চুল পাতলা হতে শুরু করেছিল। আজ হঠাৎ অনেকদিন পর নিজেকে একটু সাজাতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে সময় নিয়ে গোসল করি, ভালো একটা জামা পরি, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দেই কিন্তু এসবে কী হবে? ওই দ্যাখো ডান গালের পরে চিবুকটা যেখানে শুরু হয়েছে ঠিক সেখানেই দগদগে পোড়া দাগ। খসখসে চামড়া। কালো, বাদামি কোথাও আবার সাদা। ওই দাগ চিবুক থেকে নেমে গলা বেয়ে বুক পার হয়ে কোমর ছুঁয়েছে। কী বিচ্ছিরি! ইশ বাবাজানের কথা মতো প্লাস্টিক সার্জারি করলে হয়তো ভালোই হত। কিন্তু সদ্য ক্যান্সার থেকে মুক্তি পাওয়া এই শরীর অত বড় সার্জারির ধকল কি সইতে পারত? পারত না। বাবাজানটাও চলে গেলো। কে আর আমার সার্জারির জন্য টাকা দেবে? আমার সামর্থ কোথায়? এই ফার্ম লিজ নিলাম লোনের টাকায়। পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঋণের বোঝা চেপে আছে। আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি আর আমার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রুজল ঝরে পড়ছে। ঋণের কথা চিন্তা করে কাঁদছি না। ব্যবসা একবার দাঁড়িয়ে গেলে সবটা ম্যানেজ হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ। আমি কাঁদছি নিজের চেহারা দেখে। ও আগের মতোই সুন্দর আছে, আর আমাকে দ্যাখো। এই আমাকে দেখার পর, জানার পর আমার প্রতি ওর মনের মধ্যে জমে থাকা ঘৃণা যদি আরো বেশি বলপ্রাপ্ত হয়ে ওঠে? যদি লন্ডনের সেই পার্সিয়ান ছেলেটার মতো সেও ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়? তখন কী হবে? কী হবে তখন? আমার একটা মন এসব ভাবছে, আবার অন্য মনটা বলছে দ্যাখো তোমার রব যা করেন নিশ্চয়ই ভালোর জন্যই করেন। তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনেই নিগূঢ় কারণ আছে। তোমার দুর্বল মস্তিষ্ক সেই কারণ অনুধাবনে অপারগ। তিনি তোমাকে শারীরিক কষ্ট দিলেন, তোমাকে সন্তান ধারণে অক্ষম করে দিলেন কিন্তু ভেবে দ্যাখো এই পার্থিব যন্ত্রণা তোমাকে আরো বেশি করে তাঁর কাছাকাছি নিয়ে গেছে। তোমার বাইরের আবরণ এখন যতটা কুৎসিত ভেতরটা তার চাইতে হাজার গুন বেশি সুন্দর। এই সৌন্দর্য অনেক দাম দিয়ে কিনতে হয় রুশমি! সবার ভাগ্যে হয় না।
আমি চোখের জল মুছে নিলাম। হাতমুখ ধুয়ে জামা পাল্টে নিলাম। বলতে কী, নিজের পছন্দে জামা কাপড় অনেকদিন কেনা হয় না। মেজো শপিং করতে ওস্তাদ। অনলাইনে প্রায়ই নিজের জন্য এটা সেটা অর্ডার করে। ওর বদৌলতে আমার ভাগ্যেও কিছু নতুন কাপড় জোটে আর কি। আজকে একটা নতুন জামা পরলাম। গোলাপি রংয়ের স্কার্ট, সাদা ফুল হাত টপ। লিওর সাথে শিকারে যাবার কথা ছিল। এই ড্রেস শিকারে যাবার জন্য উপযুক্ত নয়। তবুও পরলাম। পরতে ইচ্ছে হলো তাই। সবচেয়ে ভালো হতো লিও যদি শিকারের প্ল্যানটা ক্যানসেল করত। আমার একটুও মন চাইছে না। হঠাৎ মনে পড়ল বেলা এগারোটায় অতিথিদের চেকআউট টাইম। শিহাব চলে যাবে না তো আবার? কী করে ওকে আটকাবো? হিজাব দিয়ে মাথা ঢেকে, পায়ে স্যান্ডেল চড়িয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এলাম। ডাইনিং ফাঁকা। কোথায় গেছে সব? গেস্টরুমে এসে দেখি জোয়ানা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মুখে প্রসাধন মাখছে। বিছানা এলোমেলো। চাদর কুঁচকানো। কম্বলের অর্ধেক মাটিতে পড়ে আছে। আমার বুকটা কেমন জ্বলে উঠল হঠাৎ। সন্দেহের মেঘ জমল মুখে। কোনো ভূমিকা ছাড়াই জোয়ানাকে প্রশ্ন করলাম, ‘ডিড ইউ স্লিপ উইদ হিম?’
জোয়ানা একটুও অবাক হলো না আমার প্রশ্ন শুনে। খুব নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ‘আই রিয়েলি ওয়ান্টেড টু, বাট হি ওয়াজ স্লিপিং লাইক আ লগ। হি ইজ প্রবাবলি নট ইনটু মি।’
উত্তর শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। সন্দেহের মেঘ সরল মন থেকে। এসব অনুভূতির কোনো অর্থ হয় না। বিগত পাঁচ বছর মানুষটা কোথায় ছিল, কার কার সাথে শুয়ে এসেছে এসব তথ্য কি আমি জানি? তার প্রতি তো আমার কোনো ধরণের অধিকার অবশিষ্ট নেই। জোয়ানার সাথে শুয়ে থাকলেও আমার কিছুই বলার নেই। তবুও ব্যাপারটা হয়নি জানতে পেরে ভালো লাগছে। আমি বিছানা গুছাতে লাগলাম। সাবধানে প্রশ্ন করলাম, ‘ছেলেরা কোথায় গেলো?’
— জানি না, ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম। বেরিয়ে দেখি সবাই উধাও।’ একটু থেমে জোয়ানা আবার বলল, ‘তুমি মাথায় সবসময় এটা বেঁধে রাখো কেন?’
আমি হাসলাম। কোনো উত্তর দিলাম না। আমেরিকানরা আজকাল হিজাবী নারী দেখে অভ্যস্ত। অনেকেই পছন্দ করে না। মুসলমান দেখলেই ভ্রু কুঁচকে ফেলে। টেরোরিস্ট ভেবে দশ হাত দূরে পালায়। কেউ কেউ অপমান করে বসে। হেইট ক্রাইমের ঘটনারও কমতি নেই। তবে ব্যতিক্রম আছে। অনেক উদার মানসিকতার মার্কিনীদের আমার চেনা আছে, জানা আছে। তারা ধর্ম কিংবা পোশাক দিয়ে মানুষকে বিচার করে না, মনুষ্যত্বটাই তাদের কাছে বড়। জোয়ানা কোন কাতারে পড়বে আমি জানি না। তবে মেয়েটিকে আমার সাদাসিধে সরল বলে মনে হচ্ছে। মনের মধ্যে প্যাঁচঘোচ নেই। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল,
—‘আমি নোটিস করেছি তুমি আমার বন্ধুকে বারবার দেখছিলে। আমি জানি সে সুদর্শন, কিন্তু তোমার তাকানোটা অন্যরকম ছিল। প্রথম পরিচয়ে কেউ এভাবে তাকায় না। তোমরা কি পূর্ব পরিচিত?’
আমার হাত থমকে গেছে। বুক কাঁপছে হালকা। মেয়েটাকে সত্য বলাই যায়। কিন্তু কেন যেন বলতে ইচ্ছে করছে না এই মুহূর্তে। একটা কথার পেছন পেছন হাজারটা কথা চলে আসবে। কী দরকার অপরিচিত একজন মানুষের সাথে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করার। আমি প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম
—‘তোমরা চাইলে আজকের পুরো দিনটা আমার ফার্মে কাটাতে পার। দুপুরে আমরা একসাথে লাঞ্চ করব। কেমন?’
শিহাব
আগের চাইতে কিছুটা শান্ত বোধ করছি। ক্ষণকাল আগেও বুকটা দুর্দান্ত জ্বালায় পীড়িত হচ্ছিল। এখন সেই জ্বালা থেমে গেছে। রুশমি লিওকে বিয়ে করেনি এবং শিশুটি তার নয় এই কথা জানার পর আমার ভেতর আশ্চর্য স্বস্তি নেমে এসেছে। তবুও যেন এক স্থূল প্রাচীর-বেষ্টিত দুর্জ্ঞেয় রহস্য এখনও আমাকে চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রেখেছে। অপরিসীম কৌতূহল এবং নানাবিধ কূট সন্দেহে আলোড়িত হচ্ছে চিন্তারাজ্য। লিও যদি স্টেসিকেই বিয়ে করে থাকে তাহলে রুশমির সাথে ওর সম্পর্কটা কী? রুশমি মিথ্যেবাদী কিংবা প্রতারক হতে পারে কিন্তু দুশ্চরিত্রা কোনোভাবেই নয়। আর যদি লিওর সাথে ওর কোনো হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক না থাকে তাহলে পাঁচ বছর আগে আমাকে ছেড়ে দিয়ে লিওর হাত ধরে কেন পালিয়ে গিয়েছিল? কেন বলেছিল আমাকে সে কখনো ভালোবাসেনি, লিওকেই বেসেছে।
আমার গলা দিয়ে খাবার নামছে না। একটা পাউরুটি গেলার চেষ্টা করছিলাম অনেকক্ষণ ধরে। রুশমি এখান থেকে সরে গেছে। জোয়ানা আর লিও পরস্পরের সাথে কথা বলছিল। একটা সময় জোয়ানা উঠে পড়ল। লিও আমাকে বলল, ‘চলো তোমাকে ফার্মটা ঘুরে দেখাই। রুশ সত্যিই হার্ড ওয়ার্ক করছে। তুমি দেখলে অবাক হবে।’
আমি এক পলক তাকালাম ছেলেটার দিকে। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘চলো!’
আকাশ শান্ত নীল। রোদ চড়েনি সেভাবে। একটু মেঘলা ভাব বিরাজ করছে। এ সময়ে ফ্লোরিডা আসার মজা হলো এখানে শীতের প্রকোপ একেবারেই নেই। অনেকটা বাংলাদেশের শীতকালের মতো আবহাওয়া। বেশ আরামদায়ক। লিও ওর মেয়েকে স্ট্রলারে বসিয়েছে। স্টলার ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। আমরা উঠোন পেরিয়ে ধূলিধূসরিত লাল মাটির বুনো পথে উঠে এলাম। রেডহিলসের বৈশিষ্ট হলো এই লাল মাটি। উঁচুনিচু পাহাড়ি ভূমির কারণেই এই জায়গাটা ফ্লোরিডার অন্যান্য স্থান থেকে একটু অন্যরকম।
—‘তোমার পরিচিতদের মধ্যে কেউ করোনায় ইনফেক্টেড হয়েছে?’ লিও প্রশ্ন করল।
—‘না,’ এক শব্দে উত্তর দিলাম। আমি জানি আলোচনা করার মতো অজস্র বিষয় আছে। করোনা, ইলেকশন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, গান ল’জ কিংবা গান ভায়োলেন্সের মতো চাঞ্চল্যকর নানা বিষয়। কিন্তু লিও হয়তো বুঝতে পারছে না এই মুহূর্তে ফার্মল্যান্ড ঘুরে দেখা কিংবা পৃথিবীর সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করার মতো মানসিক দৃঢ়তা বা স্থিরতা আমার নেই। ও জানে না যে আমার কী ভয়াবহ সর্বনাশ হয়ে গেছে এবং সেই সর্বনাশ কতটা গভীর। আমি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে বললাম, ‘শোনো লিও, তোমার সাথে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে। আশা করি যা জানতে চাইব তার সঠিক উত্তর তুমি আমাকে দেবে।’
লিও আমার কথা শুনে বিব্রত হলো না। বরং খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল, ‘আমরা কি হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে পারি? কারণ হাঁটা থামালেই এমিলি কান্না শুরু করবে। কোলে উঠতে চাইবে।’
—‘নিশ্চয়ই। হাঁটতে আমার কোনও সমস্যা নেই।
খামার এলাকায় চলে এসেছি। একটি মেক্সিকান ছেলে ঘোড়াকে ঘাস খাওয়াচ্ছে। তার মাথায় বিশাল বড় কাউবয় হ্যাট। হাঁটু ছোঁয়া লম্বা বুট। মুরগির খামারের ওদিকটায় মধ্যবয়স্ক দুজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে একজন কর্মচারীর সঙ্গে। ভদ্রলোক দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে ভারতীয়। কে জানে বাংলাদেশিও হতে পারে। খামার এলাকা পার হয়ে রাস্তায় উঠে এলাম আমরা। এই রাস্তার দুপাশে সবজির ক্ষেত। ব্রাসেলস স্প্রাউট আর বিটের চাষ করা হয়েছে। বেশ বড় জায়গা। কয়েক একর তো হবেই। মাথার ওপর বিস্তৃত নীল আকাশ। মাঠের শেষ প্রান্তে বহু দূরে কিছু বাড়িঘর দেখা যায়। এমিলি স্ট্রলারে আর বন্দি থাকবে না। হাত পা ছুঁড়ে কান্না জুড়ে দিয়েছে। লিও মেয়েকে স্ট্রলারের বন্ধনমুক্ত করে কোলে তুলে নিল। আমি এবার ওর দিকে চেয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলাম, ‘তুমি রুশমিকে বিয়ে করোনি কেন?’
এমিলির সামনে কথাটা বলে ফেলায় লিও বোধ করি একটু বিব্রত হলো। মেয়ের বয়স চার হলে কী হবে, প্রশ্নটা সম্ভবত সে বুঝতে পেরেছে। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে আমার দিকে।
—‘রুশমি আমার বন্ধু। বিয়ে করব কেন ওকে?
একটা বোবা রাগে আমার শরীর থমথম করছে। ক্রুর দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বললাম, ‘তাহলে সেদিন রুশমি কেন বলেছিল যে ও তোমাকে ভালোবাসে? আমাকে ছেড়ে তোমার সাথে পালিয়ে গিয়েছিল কেন?’
লিও এমিলিকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘দ্যাখো তো এই মাঠে কোনো বাটারফ্লাই আছে নাকি হানি? বেশি দূর যেও না কেমন?’
এমিলি কোল থেকে ছাড়া পেয়ে তিড়িং বিড়িং করে ছুটে গেলো মাঠের দিকে। লিও একটু অন্যরকম গলায় বলল, ‘দ্যাখো শিহাব, রুশ কখনোই আমার সাথে পালায়নি। বন্ধু হিসেবে আমি ওকে সাহায্য করেছিলাম শুধু।’
—‘কীসের সাহায্য?’
—‘সবটা বলার পারমিশন নেই। বন্ধুকে করা প্রতিজ্ঞা আমি ভাঙতে পারব না।’
আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙে যাচ্ছিল। অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে উঠলাম, ‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। প্লিজ পুরো বিষয়টা খুলে বলো।’
—‘আমার বলাটা ঠিক হবে না। রুশ নিজেই তোমাকে বলবে। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই যে তুমি কিছুতেই এ যাত্রায় ওকে ছেড়ে যেও না। আমার মনে হচ্ছে এই ইউনিভার্স চায় না তোমাদের মিলন হোক। নইলে একই আকাশের নিচে তোমরা থাকো, একজন আরেকজনকে এতো ভালোবাসো, তবুও কেন এতদিনে তোমাদের একটাবার দেখা হলো না? অবশেষে যেহেতু দেখা হলো, এই সুযোগটা তুমি হাতছাড়া করো না প্লিজ। রুশমিকে সরাসরি প্রশ্ন করো। এমন ভাবে প্রশ্ন করো যেন সে উত্তর দিতে বাধ্য হয়।’
আমি বিভ্রান্ত গলায় বললাম, ‘এর মানে তুমি বলতে চাইছ রুশমির তোমার প্রতি কোনো ফিলিংস নেই?’
—‘প্রশ্নই ওঠে না। আমরা লাস্ট কয়েক বছরে খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছি। অনেকটা ভাইবোনের মতো।’ একটু থেমে লিও আমার হতবুদ্ধি কিংকর্তব্যবিমুঢ় মুখের ওপর চোখ রেখে খুব দৃঢ় গলায় বলল, ‘রুশ তোমাকেই ভালোবাসে। তোমার কোনো আইডিয়া নেই বিগত কয়েকটা বছর মেয়েটার ওপর দিয়ে কী গেছে। ওর তোমাকে প্রয়োজন। আমরা অনেকবার ভেবেছিলাম তোমার সাথে কন্ট্যাক্ট করব, সবকিছু খুলে বলব। কিন্তু রুশের কড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। আমরা চাইনি ওকে কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে।
লিওর কথাগুলো শোনা মাত্র এক অদ্ভুত ব্যাপার হলো। আমি দেখলাম চোখের সামনে একটা বদ্ধ কপাট দমকা হাওয়ায় ঝট করে খুলে গেলো। স্বর্ণভূষণ স্ফূরিত আলোকছটা ফোঁয়ারার মতো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ধাবিত হলো আমার বুকের পরে’। ডুবিয়ে দিয়ে গেলো আকণ্ঠ। আলোর বন্যায় ভাসতে ভাসতে আমি নীল অন্তরীক্ষের দিকে চোখ তুলে তাকালাম। বুক ভরে টেনে নিলাম একটা গাঢ় শ্বাস! যেন বহুদিন পরে আমার মাঝে প্রাণের সঞ্চার হলো। বুকের ভেতর থেকে দৈববাণীর মতো কে যেন বলে উঠল, তোমার রুশানিয়া তোমাকেই ভালোবাসে! অন্য কাউকে নয়!
আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে লিওকে ধন্যবাদ দিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। জোয়ানা ডাইনিং এ বসে আছে। আমাকে দেখামাত্র বলল, ‘তুমি কি এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে চাও?’
কী বলব জানি না। দৌড়ে এসেছি বলে হাঁফ ধরে গেছে। বড় বড় শ্বাস নিচ্ছি। নভেম্বরেও ফ্লোরিডা বেশ উষ্ণ থাকে। আজকের তাপমাত্রা সত্তর ডিগ্রি ফারেনহাইট। গরম লাগছে। টেবিলের ওপর পানির জগ রাখা ছিল। গ্লাসে পানি ঢেলে নিলাম। চুমুক দিয়ে পান করার সময় লক্ষ্য করলাম রুশমি কিচেন থেকে বেরিয়ে আসছে। এর মাঝেই পোশাক পাল্টেছে ও। এখন আগের চাইতে পরিপাটি, সুবিন্যস্ত। ডাইনিং এ পা রাখা মাত্র আমার দিকে একবার তাকালো। আমি গ্লাস নামিয়ে রাখলাম টেবিলের ওপর। কী বলব খুঁজে পেলাম না। অথচ আমার বলার এবং জানার ছিল অনেক কিছু! আশ্চর্য ব্যাপার হলো এই মুহূর্তে কোন প্রশ্ন না করে, কোন কথা না বলে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতে আমার ভালো লাগছে। অনেক কিছু না জেনে না বুঝেও যে কতকিছু বুঝা যায় তা আমি অনুধাবন করতে পারলাম তখন, যখন রুশমি মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আমার চোখের ওপর অপলক নেত্রদ্বয় স্থাপন করল। আমার মন ধীরেধীরে শান্ত হয়ে এলো, সারা দেহ সঞ্জীবিত হয়ে উঠল এক স্বর্গীয় স্নিগ্ধতায়। আমার আর কিচ্ছু চাই না। রুশানিয়া, তুমি আমার কাছে থাকো, সামনে থাকো, তোমার ওই অলৌকিক সুন্দর দুটি চোখের দিকে শুধু চেয়ে থেকে আমি আমার বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই।
— দুপুরের খাবার খেয়ে যেও তোমরা।’ রুশমি বলল জোয়ানাকে।
—‘লেট হয়ে যাবে। আমার গ্র্যান্ডমা ওয়েইট করছে।’ জোয়ানার উত্তর রুশমি বিব্রত। চোখের পাতা ব্লিংক করছে ঘনঘন। এটা ওর পুরনো অভ্যাস। নিশ্চয়ই কিছু একটা বলতে চাইছে কিন্তু কথা গুছিয়ে নিতে পারছে না। আমি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। স্থিরতার সাথে জোয়ানাকে বললাম, ‘আমি আজকের দিনটা এখানে থাকতে চাইছি। আগামীকাল তোমার গ্র্যান্ডমার বাসায় গেলে কি খুব অসুবিধা হবে?’
জোয়ানার ভ্রু কুঁচকে গেছে। বিস্ময় নিয়ে বলছে, ‘হঠাৎ কী হলো?’
এই প্রশ্নে কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত বোধ করলাম। উত্তর খুঁজে পেলাম না। রুশমি জোয়ানার দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি চাইলে তোমার যাবার ব্যবস্থা করতে পারি।’
জোয়ানা বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। মনে হচ্ছে একটু রেগে গেছে সে। রুশমির কথার প্রত্যুত্তরে একটু কঠিন সুরে বলল, ‘ডোন্ট ওরি। আই উইল ফিগার আউট সামথিং!’
কথাটা বলেই হনহন করে হেঁটে ডাইনিং থেকে বেরিয়ে গেলো। আমি মেয়েটার পিছু নিলাম। গেস্টরুমে এসেই তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ গোছাতে শুরু করেছে। আমি ঘরের দরজাটা আটকে দিয়ে বললাম, ‘লিসেন জোয়ানা, দেয়ার ইজ সামথিং ইউ নিড টু নো।’
—‘ইটস ফাইন, আই আন্ডারস্ট্যান্ড। ইউ হ্যাভ চেন্জড ইওর মাইন্ড
—‘অবশেষে আমি ওকে খুঁজে পেয়েছি!’
সুটকেস বেডের ওপর রাখা ছিল। আমার কথাটা শেষ হওয়া মাত্র জোয়ানার হাত থেমে গেলো। বিছানার সামনে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে স্যুটকেসের ভেতর কাপড় গুছিয়ে রাখছিল সে। আমার কথাটা শুনতে পেয়ে প্রথমে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো থমকানো চোখে। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কী বলছ?’
— ‘ঠিকই বলছি। এই মেয়েটিই আমার স্ত্রী। যে আমাকে পাঁচ বছর আগে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। অতএব, বুঝতেই পারছ একটা ফয়সালা না করে আমি এখান থেকে সরতে পারছি না।’
রুশমি
লিও সেই কখন হাওয়া হয়েছে এখন অবধি খবর নেই। ফোন করে জানতে পারলাম মেয়েকে নিয়ে শপিং মলে গেছে। ফিরতে দেরি হবে। বুঝতে পারলাম শিকারে যাবার প্ল্যানটা ইচ্ছাকৃত ভাবেই ক্যানসেল করেছে। যেন শিহাবের সাথে আমি সময় কাটানোর সুযোগ পাই। এদিকে আমার ফার্মের একটি ঘোড়া অসুস্থ। কিছুক্ষণের মাঝেই ডাক্তার আসার কথা। ডাক্তারের সাথে আমার কথা বলাটা খুব জরুরি। লিওর ফ্লাইট দুপুর তিনটায়। বেলা একটার মধ্যে রিপোর্টিং করতে হবে। অভুক্ত অবস্থায় তো তাকে বিদায় করা যাবে না। লাঞ্চের ব্যবস্থা করতে হবে। জোয়ানা মেয়েটা আমার কথায় অসন্তুষ্ট হয়েছে। ওর মুখে অপমানের ছায়া দেখেছি। ঘরে আসা অতিথিকে অপমানিত করে আমার মোটেও ভালো লাগছে না। মনটা তেতো হয়ে আছে।
বেলা এগারোটার সময় খবর পেলাম ডাক্তার এসেছে। খামারে যাবার জন্য বেরোতে যাচ্ছি, হলওয়েতে জোয়ানার সাথে দেখা। হাস্যোজ্বল মুখে বলল, ‘আমি বাসে করে চলে যেতে পারব। তুমি চিন্তা করো না।’
ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেলাম। ছিঃ মেয়েটা বুঝে গেলো আমি ওকে তাড়িয়ে দিতে চাইছি। অপ্রতিভভাবে বললাম, ‘যাবে কেন? আজকের রাতটা থেকে যাও না!’
জোয়ানা হাসে, ‘সেটা হচ্ছে না। তবে লাঞ্চটা কিন্তু তোমার এখানেই করছি।’
ভেটেরনারি ডাক্তার বিদেয় হবার পর তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরে এলাম। ঘোড়াকে ইনজেকশন দেয়া, ডায়েট চার্ট রেডি করা, ব্যায়াম করানো এসবের পেছনে প্রায় এক ঘণ্টার ওপর সময় লেগে গেছে। ডাইনিং ফাঁকা। কেউ নেই। ড্রইংরুমের দরজায় উঁকি দিয়ে দেখলাম শিহাব সোফায় বসে আছে। ওর হাতে রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা। মুখোমুখি জোয়ানা বসেছে। একটু সময় লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ওদের কথোপকথন শুনলাম। শিহাব রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলছে জোয়ানাকে। কিছু লাইন ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিচ্ছে। ওর কণ্ঠে ফুটে উঠছে আকাশস্পর্শী অহং। আমি জানি বাংলা ভাষাটাকে সে ভালোবাসে। এই একটা জায়গায় বাবাজানের সাথে ওর দারুণ মিল। আমার বাবাজানের নিয়ম ছিল, বাড়িতে কেউ ইংরেজিতে কথা বললেই শাস্তি পেতে হবে। একদিন দুপুরবেলা আমরা তিনবোন মনের আনন্দে গল্প করছি। মেজো আর ছোট বাংলায় বেশ দুর্বল। বাবা আম্মু বাসায় নেই। এখন তো বাংলা বলার কোনো প্রশ্নই আসে না। আমরা ইংরেজিতেই কথা বলছিলাম। সেই মুহূর্তে হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বাবাজান হাজির হলো একগাদা বাজার সদাই নিয়ে। কলিং বেল নেই বলে বাবার আগমন আমরা টের পাইনি। ধরা খাবার পর বাড়ির মধ্যে ইংরেজি বলার জন্য শাস্তি পেতে হলো। পাঁচশত বার বাংলায় লেখা,
আমি দুঃখিত। বাড়িতে অবস্থান কালে বাংলা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় কথা বলব না। বাংলা এই বাড়ির রাষ্ট্রভাষা।
স্মৃতি গুলো মনে পড়ছে আর বাবাজানের জন্য আমার মন কেমন করছে। আজকে বাবাজান বেঁচে থাকলে…! একটা বড় নিশ্বাস চাপা দিয়ে আমি কিচেনে এসে কাজ শুরু করলাম। শিহাব মুরগির কোরমা পছন্দ করে। শিখেছিলাম আমার শাশুড়ির কাছ থেকে। ভাবছি ওই রান্নাটাই করব আজ। লিওর ও খুব পছন্দ চিকেন কোরমা। ঝাল নেই বলে বাংলাদেশি খাবারের মধ্যে এটা ওর পছন্দের তালিকায় প্রথম। জানালার বাইরে আলো ছায়ার খেলা চলছে। নীল আকাশে উড়ছে ধোঁয়া ধোঁয়া সাদা মেঘ। বাড়ির ভেতর এয়ারকন্ডিশন চালু করা আছে তবুও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আমার। হিজাব পরে রান্নাঘরের কাজ করাটা বেশ কষ্টের। মাথা গরম হয়ে যায় আজকাল। কিন্তু পোড়া দাগটার জন্য মেয়েদের সামনেও হিজাব খুলতে পারি না। ইচ্ছে হয় না।
শিহাব কথা বলছে। ওর কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। ভালো লাগছে আমার। মনোবীণায় বেজে চলেছে সুখের শঙ্খধ্বনি। একজোড়া নর্দান কার্ডিনাল জানালার কার্নিশে বসে গান গাইছে। ওরাও বুঝি জেনে গেছে যে বহুদিন বাদে আমার হৃদয়েশ্বর প্রাণনাথ সুখের স্ফুরণ হাতে নিয়ে প্রবেশ করেছে হৃদয়পুর মাঝে। মিঠা মিঠা প্রেমময় সুগন্ধি বাতাসে ভরে গেছে আমার নির্জন নির্জীব অরণ্যবাসের এই একাকী জীবন। এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ অন্যরকম ভাবনা এসে ধাক্কা দেয় বুকে। কী হবে সত্যটা যদি কোনোভাবে জেনে যায় শিহাব? এখনো ওর চোখের তারায় আমার জন্য যে অনুভূতিগুলো জলজ্যান্ত রূপে ধকধক করে, সত্য জানার পর সেই অনুভূতি আর অবশিষ্ট থাকবে কি? নাকি অনুকম্পার সুশীল আত্মপ্রকাশের আড়ালে হারিয়ে যাবে সত্যিকারের ভালোবাসা?
শিহাব
লাঞ্চের পর আমি জোয়ানাকে বাস স্টেশনে নামিয়ে দিলাম। লিওকে ড্রপ করলাম এয়ারপোর্টে। ওরা দুজন বেশ একটু তাড়াহুড়ো করেই প্রস্থান করল। কারণ ওদের ধারণা হচ্ছিল তৃতীয়পক্ষের উপস্থিতি আমার এবং রুশমির মধ্যে দূরত্ব রচনা করছে। আমরা কিছুতেই একজন আরেকজনের সামনে সহজ হতে পারছিলাম না। কেমন যেন অস্থির লাগছিল। একথা কিছুটা হলেও সত্য যে তৃতীয়পক্ষ উপস্থিত না থাকলে হয়তো এই অস্থিরতাটা এতক্ষণে কেটে যেত। লিও, জোয়ানা দুজনেই আমাদের ব্যাপারটা জানে বলেই আরো বেশি অস্বস্তি হচ্ছিল। আড্ডায় মন বসছিল না। হাজার রকম প্রশ্নবাণে জর্জরিত হচ্ছিল ভেতরটা। নার্ভে চাপ পড়ছিল। ছোট্ট এমিলির প্রতি যে বিরূপ আচরণটা শুরুতেই করে ফেলেছিলাম তার জন্য মনে মনে ভীষণ অনুতপ্ত হয়ে পড়লাম। এয়ারপোর্ট যাবার পথে ওর জন্য কিছু উপহার কিনে নিলাম। শেষটায় বেশ খাতির হয়ে গেলো আমাদের।
ওদেরকে ড্রপ করে রুশমির ফার্মহাউজে যখন ফিরেছি, তখন ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা। উঠোনে গাড়ি পার্ক করে চাবি দিয়ে সদর দরজা খুললাম। ড্রইং রুমে রুশমি বসে আছে। হাতে বই। পরনে হালকা গোলাপি রংয়ের হিজাব আর স্কার্ট, সাদা টপ। আমি নিঃশব্দে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। ও এমনভাবে বইয়ের ওপর মুখ ঝুঁকিয়ে রেখেছে যেন আমার অস্তিত্ব টের পায়নি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আমি ওর মুখোমুখি সোফায় বসলাম। এখনো নীরব, নিথর এবং নিশ্চল পাথর হয়ে আছে। যেন তার চলন শক্তি হরণ হয়ে গেছে।
—‘কেমন আছ?’ শব্দ দুটো উচ্চারণ করতে গিয়ে কেন যেন আমার একটু গলা কেঁপে গেলো। চারপাশে আবছা একটা জালের বুনন হচ্ছে। ঝাপসা চোখে দেখছি আমি রুশমিকে। হঠাৎ হঠাৎ মনে হচ্ছে এই দৃশ্য বুঝি বাস্তব নয়, এ আমার ভ্রম, আমার স্বপ্ন। অথবা আমি লৌকিকতার অনেক উর্ধ্বে চলে এসেছি। আমার অন্তর গিয়ে ঠেকেছে এমন এক অত্যুৎকৃষ্ট অতিমানবিক স্থানে, যেখানে সূচনা বা সমাপ্তি বলে কিছু নেই, কাল বা সময় বলে কিছু নেই। এটা কেবল মাত্র এক অনন্ত অক্ষয় অকাট্য সত্য যে রুশানিয়া আমার মুখোমুখি বসে আছে, চোখ তুলে তাকিয়েছে এবং ক্ষীণ গলায় বলেছে, ‘আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?’
একটা ঢোঁক গিললাম, ‘যেমন রেখে গিয়েছিলে। পাঁচ বছর আগে।’
ও চোখ নিচে নামিয়ে নিল। বইটা হাত থেকে সোফার ওপর রেখে বলল, ‘কফি চাই?’
— ‘না।’
—‘চলো ব্যাকইয়ার্ডে গিয়ে বসি।’
আমি কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ড্রইং রুমের সাথে লাগোয়া ব্যাকইয়ার্ডের দরজা। ছোট্ট উঠোনের মাঝখানে একটি কাঠের গোল টেবিল। তিনটা চেয়ার। টেবিলের ওপর কাচের ফুলদানি। মাটিতে কয়েকটা টবশুদ্ধ ফুলগাছ। কাছেই লেক। লেকের পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটা লম্বা লম্বা পাইন গাছ। গাছের ছায়ায় সবুজ হয়ে আছে জল। ঘাটে একটা নৌকো বাঁধা। সবুজ ছায়াঘেরা স্বচ্ছ পানিতে ঢেউ খেলাচ্ছে বাতাস। কয়েকটা হাঁস সাঁতরে বেড়াচ্ছে পানিতে। রুশমি আমার দিকে চেয়ার এগিয়ে দিল। আমি বসলাম। ও বসল উল্টো দিকের চেয়ারে। মাথাটা এমন ভাবে হিজাব দিয়ে ঢেকে রেখেছে যে ওর কপালটাও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। শুধু চোখ, নাক, ঠোঁট আর ঠোঁটের নিচের কালো তিলটাই দৃশ্যমান হয়ে আছে। যাকে একনজর দেখার জন্য এতকাল ধরে তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মতো ঘুরে বেরিয়েছি দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে। সেই কাঙ্ক্ষিত মানবী এখন আমার সম্মুখে মাত্র কয়েক হাত দূরে বসে আছে। কত দিন পর ওকে দেখছি! আমার ভেতরটা কাঁপছে থরথর করে। বাইরে থেকে এই কম্পন টের পাওয়া যায় না।
—‘কী করে এলে এখানে? হঠাৎ?’ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে প্রশ্ন করে।
—‘লোকেটর স্পেলের মাধ্যমে।
ও মৃদু হাসল, ‘স্পেল ক্যাস্ট করল কে? জোয়ানা?’
—‘না, এই ইউনিভার্স! তুমি লিওকে বিয়ে করোনি কেন?’
—‘লিওকে কেন বিয়ে করব?’
—‘বলেছিলে ওকে ভালোবাসো।’
—বন্ধু হিসেবে তো ভালোবাসিই।’
—‘তাহলে আমাকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলে কেন ওর সাথে?’ কণ্ঠস্বর উঁচুতে উঠে যাচ্ছে। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।
—‘পালাবো কেন? আমার জীবন। সিদ্ধান্তও আমার।’
এটুকু বলে ও একটু থামে। ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভেবে নেয়। দূরে চোখ রেখে বলে, ‘আমার ভালো লাগছিল না ওখানে থাকতে। তাই আমেরিকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম।’
হঠাৎ আমার মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। বিদ্যুৎ খেলে গেলো শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরায়। টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিটা প্ৰচণ্ড আক্রোশে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম মাটিতে। আক্রোশে ফেটে পড়ে বললাম, ‘ইউ আর স্টিল লায়িং। তোমার সমস্যাটা কী? হোয়াই দ্যা হেল আর ইউ প্লেয়িং দিজ ইনসেইন গেম উইদ মি?’
উত্তেজনার বশে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। ফুলদানি ছুঁড়ে মারার পর হাতের দশ আঙুল টেবিলের ওপর রেখে ঝুঁকে এগিয়ে গিয়েছিলাম রুশমির দিকে। রুশমি ভয় পেয়ে পেছনে সরে গেছে। ওর মুখ ফ্যাকাশে, চোখে আতঙ্ক। ঠোঁট কম্পনরত। সেই অবস্থায়ই বলল, ‘দ্যাখো আমার অতীত সম্পর্কে কিছু জানতে চেও না। এসব নিয়ে কথা বলতে আমার ভালো লাগছে না।’
আমার নাক দিয়ে ড্রাগনের মত ধোঁয়া বের হচ্ছিল। অনেক কষ্টে রাগটাকে দমানোর চেষ্টা করে বললাম, ‘তুমি কি চাইছ আমি চলে যাই?’
রুশমি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। মাটিতে পড়া চূর্ণবিচূর্ণ ফুলদানির অংশবিশেষ তুলে নিচ্ছে হাতে। আমার দিকে না তাকিয়েই বলল,
—‘আমার কিছুই চাওয়ার নেই। তুমি থাকলে থাকতে পারো। যেতে চাইলে যেতে পারো।’
অনির্বচনীয় এক কষ্টে আমার বুকটা ভেঙে যেতে লাগল। কণ্ঠরোধ হয়ে এলো অপমান এবং অভিমানে। এতো নিষ্ঠুরও মানুষ হয়? কাতর চোখে চেয়ে রইলাম ওর দিকে। কিছু বলতে পারলাম না। খানিকবাদে ফুলদানিটা ট্র্যাশ করে ও চেয়ারে ফিরে এসে বসল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………