ডেসটিনি - পর্ব ১৮ - সুহাসিনি মিমি - ধারাবাহিক গল্প

ডেসটিনি - সুহাসিনি মিমি
"মিস প্রিয়ন্তী! শেষমেশ কিনা আপনি আমার একুরিয়ামের মাছটাকেও ছাড়লেন না?আপনি পারলেন এটা করতে? শেষপর্যন্ত কিনা মাছ চুরির খাতায় নাম লিখালেন? শুধু শুধু কি সেদিন আপনাকে চোরের খেতাব দিয়েছিলাম?এভাবে যে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাবে—আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না!"

"আমি, আমি চুরি করিনি। আমি চোর নই!"

তাজধীর এগিয়ে এলো আরেক কদম। তীক্ষ্ণ 
চোখদুটোয় বিদ্ধ করার মতো দৃষ্টি নিঃক্ষেপ করে আওড়াল ফির,

"না? তাহলে কি মাছটা নিজে নিজেই হাঁটতে হাঁটতে আপনার রুমে গিয়ে উঠেছে?মিথ্যা বলার আগে অন্তত একটা যুক্তি সাজিয়ে নিতেন।"

"বিশ্বাস করুন, আমি..

“শশ্!একটা কথা জানেন, মিস প্রিয়ন্তী? আমি মিথ্যাবাদী মানুষ একদম সহ্য করতে পারি না। একেতো আমার বাড়ি থেকে আমারই একুরিয়ামের মাছ চুরি করে নিয়ে গেছেন। তার উপর আবার মুখের উপর দাঁড়িয়ে অস্বীকার করে যাচ্ছেন?ডাবল ক্রাইম।"

প্রিয়ন্তীর বুক ধড়ফড় করতে লাগল সমান তালে। কথারা তালগোল পাকিয়ে ফেলল। আমতা আমতা করে বলতে লাগল,

“আমি আমি চোর নই!"

“জানেন তো,একজন ডিফেন্স অফিসারের বাড়ি থেকে মাছ চুরি করার শাস্তি স্বরূপ আপনাকে আমি মামলায় জড়াবো! ডিফেন্সের লোকের বাসা থেকে কিছু চুরি করা—সেটা কিন্তু সাধারণ চুরি না।এটা সিকিউরিটি ব্রিচ।আর সিকিউরিটি ব্রিচের শাস্তি কী হতে পারে, আইডিয়া আছে?”

প্রিয়ন্তী মাথা নাড়ল ডানে বামে। মানে সে জানেনা। 
তাজধীর এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।বলল কাঠ কাঠ গলায়,

“মামলা। গ্রেফতার। জেল। আপনার বিরুদ্ধে আমি পার্সোনালি কেস ফাইল করব।এই শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে! নাহলে আমার মান-ইজ্জত কিছুই থাকবে না! লোকে বলবে নিজের বাড়ির মাছই যার নিরাপদ না, সে আবার দেশের নিরাপত্তা দিবে কীভাবে?আর আমার কাছে আমার ব্যক্তিত্ব আর আত্মমর্যাদার ঊর্ধ্বে কিছুই নেই।তাই একজন লেফটেন্যান্ট কমান্ডারের ঘরের মাছ চুরির দায়ে আপনাকে আমি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলাম।”

“না না প্লিজ। বিশ্বাস করুন আমি চোর নই। আমি চুরি করিনিতো!"

“বিশ্বাস? বিশ্বাস তো আপনি ভেঙেছেন, মিস প্রিয়ন্তী।
আমার ঘরের ভেতর ঢুকে আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসে হাত দিয়েছেন আপনি। তাও আবার নিজের সঙ্গে চুরি করে নিয়ে গেছেন সেটাকে। আপনায় তো আমি জেলের ভাত খাওয়াইবো। তার আগে আমায় আমার মাছ ফিরিয়ে দিন। আসছি আমি এখুনি। "

"না না আমি আমি চোর নই। বিশ্বাস করুন। আমায় মাফ করে দিন। ভুল হয়ে গেছে আমার। শুনছেন এবারের মত প্লিজ ছেড়ে দিন। আর জীবনেও মাছ চুরি করবো না আমি!"

"তারমানে অন্যকিছু করবেন?আপনি তো ভারী সেয়ানা লোক। আপনার শাস্তি এবার কনফার্ম। আমি আসছি এখুনি। রেডি থাকেন জেলে যাওয়ার জন্য!"

"নাহহ!"

আতঙ্কে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে পড়ল প্রিয়ন্তী। কপালে চটচটে ঘাম জড়ে জড়ে পড়ছে তখনো। নিঃশাসের তারতম্যয় বুক উঠানামা করছে অস্বাভাবিকভাবে।
অস্থির চোখে চারপাশে তাকাল একবার। সকালের আলোয় আলোকিত চিরপরিচিত কক্ষটা চোখে পরতেই দুম করে ছাড়ল স্বস্তির নিঃস্বাস।স্বপ্ন!স্বপ্ন ছিল এটা? কি ভয়ঙ্কর স্বপ্ন ভাবা যায়!লোকটা ওকে স্বপ্নেও শান্তি দিচ্ছেনা দূ দণ্ড। ব্যাটা নিরামিষের বাচ্চা।

বিছানার পাশের টেবিল থেকে গ্লাস তুলে এক ঢোক পানি খেলো। অমনি চোখে পড়ল বেডসাইড টেবিলের উপর রাখা ছোট্ট গোল একুরিয়ামটায়। যার অল্প স্বল্প পানিতে সাঁতার কাটছে একটি নীলচে আভা ছড়ানো ব্লু হাফমুন বেটা ফিশ। নির্ভার ভঙ্গিতে লেজ নেড়ে নেড়ে দিব্যি আরামসে ঘুরে বেড়াচ্ছে মাছটা।

গতকাল রাতেই পাভেল পরিবারসহ নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন অফিসের কাজ থেকে দূরে থাকায় কাজের পেন্ডিং জমেছে অনেক। আসার পথে রাগের মাথায় সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে, চিলেকোঠার ঘর থেকে খুঁজে খুঁজে প্রিয়ন্তী সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে মাছটা।এই ব্লু হাফমুন মাছটা তো লোকটার খুউব প্রিয়।কাউকে ছুঁতেও দেয় না, ধরতেও দেয় না।
আর তাইতো সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে, লুকিয়ে নিয়ে এসেছিলো সঙ্গে করে। ব্যাটা বুঝুক পছন্দের কারো অনুপুস্থিতে কিভাবে অন্তররা জ্বলে পুড়ে ছাই হয়। আচ্ছা এভাবে আনাকে তো চুরিই বলা হয়। তাহলে কি ও সত্যিই চোর? 

এহ। যদি সত্যিই ওই ব্যাটা মাছ চুরির দায়ে মামলা ঠুকে দেয়তো? তাহলে তো পুলিশ এসে ওকে ধরে নিয়ে যাবে। এরপর ওর ভাইকে উকিল হায়ার করতে হবে। লোকসম্মুখে করোনা ভাইরাসের মত ছড়াবে সেই নিউজ। ভাগ্যক্রমে ছাড়া পেয়ে গেলেও তো মানুষ দেখলে ওকে বলবে মাছ চোর। 

নিজের মাথা নিজেই ঝাঁকিয়ে উঠল প্রিয়ন্তী। ধুর! লোকটা জানবেই বা কী করে? নিজেকেই যুক্তি দিয়ে বুঝাতে লাগল,উনি তো বাসায় ছিলেন না। কিছুই দেখেনি। আর অন্য কেউও তো দেখেনি।তাহলে এত ভয় কেন পাচ্ছিস তুই প্রিয়?জিজ্ঞেস করলে বলে দিবি —আমি নেইনি। জানিই না।

ঘাম ভেজা কপাল হাতের উল্টো পিঠে মুছে যেইনা স্বস্তির নিঃস্বাস ছাড়তে যাবে অমনি নিচ থেকে ভেসে এলো চিল্লাচিল্লির শব্দ।পাভেল চেচাচ্ছে কারো সঙ্গে। সকাল বেলা ভাইয়ের ফলার হাঁকডাক শুনে উঠে দাঁড়ালো প্রিয়ন্তী। এগোলো খোলা বারান্দার দিকে। 
বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকাতেই দেখতে পেল—
পাভেল পুরো অফিস গেটআপে রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে দারোওয়ান এর উদ্দেশ্য চেচাচ্ছে।ভাইয়ের সামনে দারোয়ান লোকটাও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। রাগে ফুঁসছে পাভেল।

“কি হচ্ছে এগুলো? দিনের বেলায় বাড়ির জিনিস চুরি হয়ে যায়, আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখো?"

প্রিয়ন্তী ওপর থেকে ডাক দিল ভাইকে,

“কি হয়েছে ভাইয়া?”

পাভেল মুখ তুলে তাকাল ওপরে। বিরক্ত গলায় বলল,

“আর বলিস না! দুদিনের জন্য বাসায় ছিলাম না—আজ আসতে না আসতেই দেখি গেইটের সামনে রাখা ফুলের টবগুলো গায়েব! দিন-দুপুরে মানুষের বাড়ির জিনিস চুরি হয়ে যায়! এমন হলে এই দেশে মানুষ থাকবে কি করে?"

অমনি মেয়েটার মুখটা ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল আরেকদফা। চুরি শব্দটা হুড়মুড় করে এসে কানে বিধলো ওর। অজান্তেই কয়েকবার ঢোক গিলল।
নিচে দাঁড়িয়ে পাভেল তখনও চেঁচিয়েই যাচ্ছে।ওর ভাই আজ আর থামবে না। ফুলগুলো মিতালীর ভীষণ পছন্দের নাকি। উপর থেকে প্রিয়ন্তী আপনাপানি বিড়বিড় করে বলল তখন,

"গন্ডগোল তো একটা আমিও করে ফেলেছি ভাইয়া।বউয়ের পছন্দের টপ চুরির দায়ে এভাবে বকছো, তাহলে ব্যাটা আমায় নিজের অতি পছন্দের মাছ চুরির দায়ে আবার সত্যিই সত্যিই শুলে না চড়িয়ে দেয়।এইজন্যই বলে ভাবিয়া করিয়ো কাজ। করিয়া খাইয়ো না বাঁশ!"

—————

কোয়ার্টারের ভেতরটা তুলনামূলক বড্ড শান্ত আজ। 
অর্ণব আর ফাহিম ইতিমধ্যেই সোফা দখল করে বসে পড়েছে। রুমটা অবশ্যই তাজধীরেরই। কেন জানিনা সবার রুম ছেড়েছুড়ে ওরা উনার রুমে এসেই আড্ডার আসর বসায়। স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এখানেই ।পা তুলে hআরাম করে হেলান দিয়ে বসে আছে অর্ণব। দেখলে ভাববে এটা কোনো মিলিটারি কোয়ার্টার না, নিজেদের বাড়ির ড্রয়িংরুম বোধহয়।

“ভাই, একটা কথা বলি?”

“বল, আবার কী আইডিয়া মাথায় আসছে?”

অর্ণব গম্ভীর মুখ করে বলল,

“এই মিশন শেষ হইলে আমি বিয়ে করমু। ফাইনাল!"

“তুই আগে মিশন থেকে বেঁচে তো ফিরা আয়, তারপর বউয়ের কথা ভাবিস!”

অর্ণব গম্ভীর হয়ে বলল,

“না ভাই, লাইফের কোনো গ্যারান্টি নাই। তাই ভাবতেছি—আগে বউ, তারপর দেশ!”

“দেশের আগে বউ? সালা, তোরে কোর্ট মার্শাল করে দিবে শুনলে!"

“ বউও তো দেশেরই সম্পদ!”

মহান যুক্তি দার করাল অর্ণব তখন। বিছানার এক পাশে পা হেলিয়ে বসে আছে তাজধীর। কোলের উপর ল্যাপটপ, চোখ নিবদ্ধ স্ক্রিনে। অধীর মনোযোগ তার সেখানে। আঙুলগুলো কীবোর্ডে চালাচ্ছে অতি দ্রুত। মাঝে মাঝে ফাইল ওপেন করে নতুন , কিছু ইমেইল চেক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।
 
উপস্থিত দুজনের এহেন অপ্রাসঙ্গিক কথায় উত্তর দেয়া তো দূর মাথা ঘামালো না পর্যন্ত। আর সেই মুখ্যম সুযোগটাই লুফে নেয় অর্ণব, ফাহিম। জানে তাজধীর নিজের কাজে ডুবে থাকলে সামনে যুদ্ধ লাগলেও “হু” বলবে না।

সামনে যে ওদের একটা মস্ত বড় মিশন এঁটেন্ড করতে হবে সেদিকেও বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপটুকুও নেই। এর অবশ্যই কারণ ও আছে। তাজধীর। যেখানে পুরো দায়িত্বটা তাজধীরের কাঁধে সেখানে ওরা একবুক স্বস্তি নিয়ে অংশগ্রহণ করতে পারে নির্ধিদায়। জানে সে 
সবকিছু সামলে নেবে। অর্ণব আবার শুরু করল,

"আমার এই এক জীবনে ‘ব’-এর খুব অভাব বোধ করছি বুঝেছিস?"

ফাহিম ভ্রু কুঁচকে বিচলিত হয়ে জানতে চাইলো,

"মানে?"

“এই যে বিয়ে, বউ, বাসর! এই ‘ব’গুলা লাইফে মিসিং হয়ে জীবনটা নিরামিষ, পানসেটে বানিয়ে দিয়েছে!"

"উহুম একটা মিস্টেইক করেছিস, মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি আরেকটা 'ব্রেইন' হবে। ওটা মিসিং তোর। মিশনের বৃফটা পড়েছিস?"

হাত দিয়েই ল্যাপটপেরে মাউস স্ক্রল করতে করতে ঠান্ডা গলায় বলল বলে উঠে তাজধীর। কিছুসময়ের জন্য ভড়কে গেল উপস্থিত বাকি দুজন। কি সুন্দর এক খান আলোচনা চলছিল আর এই ছেলেটা সবকিছুর ভিতরে পা হাত ঢুকিয়ে দিলো। এটা যদিও নতুন কিছু নয়। তখনি দরজাটা ঠাস করে খুলে ঢুকল শেহরোজ। ঢুকেই একবার ঘরের সবাইকে স্ক্যান করল। বলল বিরক্তিতে,

“খুব ফ্রি টাইম চলছে বুঝি?”

ফাহিম আস্তে করে পা নামিয়ে বসল। অর্ণব সোজা হয়ে বসল। সেহরোজ সরাসরি তাজধীরের দিকে তাকাল। প্রশ্ন ছুড়ল,

“ফাইলগুলো চেক করছিস?”

তাজধীর চোখ না তুলেই জবাব দিল,

“হ্যাঁ।”

"ধরতে পেরেছিস কিছু?"

“কিছু মুভমেন্ট আছে।বাট নোট কনফার্ম ইয়েট।”

“তোরা এভাবে হাসাহাসি করছিলি কেন? বাইরে থেকে তোদের হাসির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। স্যার শুনলে কি ভাববে?"

শেহরোজের ধমকে কাজ হলো বোধহয়। বাদ দিলো সেই টপিক। তবে একটু পরপরই অর্ণব বারবার মোবাইলটা হাতে নিচ্ছে। স্ক্রিন অন করছে। আবার অফ করছে। ফাহিম আড় চোখে তাকিয়ে বলল,

“কিরে? বোমা ডিফিউজ করার টাইম গুনছিস নাকি ? এতবার টাইম চেক করছিস কেন?”

"তার থেকেও ইম্পরট্যান্ট!"

ঠিক সাত টা বাজতেই মোবাইলটা তুলে সঙ্গে সঙ্গেই কল লাগালো কাউকে। পাশ থেকে ফাহিম কে ইশারায় বলল চুপ থাকতে। কলটা ডিরেক্ট ভিডিও করা হয়েছে। ওপাশে কিছুক্ষণ রিং হতে কল রিসিভ করা হলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি হেংলা পাতলা মেয়ের চেহারা। দেখতে অনেকটা অর্ণবের মতোই। ভেজা চুল মুছতে মুছতে এগোচ্ছে সামনে। দেখে মনে হচ্ছে সবে ফ্রেশ হয়ে এসেছে।অর্ণব প্রশ্ন ছুড়ল সোজাসাপ্টা,

“কিরে? কি করছিস?”

ফারহানা চোখ উল্টাল। বলল বিরক্তিতে,

“আমি কি করছি জিজ্ঞেস করার জন্য তো ফোন দিস নাই তুই। যেটার জন্য ফোন দিস সেটা বল।”

“এই, তোরে কতবার বলছি আমি তোর বড় ভাই। একটু রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলবি। এই তুই-তোকারি বাদ দিবি।”

“পারবো না।অভ্যাস হয়ে গেছে।”

পাশে বসা ফাহিম মুখ চেপে হাসছে। অর্ণব চোখ রাঙাল বন্ধুকে। পরপর বলল আবার,

“ওইটা কই?”

ফারহানা বিরক্তিতে বলল,

“আপনার প্রাণপাখি সামনেই বসা।”

অর্ণব গম্ভীর হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। পাল্টালো মুখোভঙ্গি,

“ডাক। শুনতে পাচ্ছেনা?"

ফারহানা এবার ফোনটা ঘুরিয়ে দিল ব্যাক ক্যামেরায়।
স্ক্রিনে দেখা গেল—স্টাডি টেবিলে বইয়ের উপর মাথা হেলিয়ে দিব্যি আরামসে ঘুমাচ্ছে রুমু। অর্ণবের ফুপাতো বোন। এইবারের এস এস সী পরীক্ষার্থী।
অর্ণব চোখ স্থির করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর হঠাৎ বলে উঠল,

"এভাবে ঝিমুচ্ছে কেন?রাতে কি ঘুমায় নাই? পড়াশোনা করিস নাকি দুইজন বসে বসে ঝিমুস শুধু?"

ফারহানা তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

“আজকে ম্যাডামের মন খারাপ। এসে শোনলাম ফুপু বকছিল নাকি। কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে এসে।"

অর্ণব ভ্রু কুঁচকাল,

“কেন?”

“রেজাল্ট নিয়ে টেনশন করছে ফুপু। পড়া নিয়ে বকাঝকা করেছে বোধহয়।"

অর্ণব দাঁত চেপে বলল,

“আমার বউটারে এখুনি এত অত্যাচার করোস? পরীক্ষার আগেই রেজাল্ট নিয়ে এত টেনশন, বিয়ের আগেই তো তাহলে বাচ্চার জন্য আমায় হাই টেনশন দেয়া শুরু করবে এই মহিলা!"

"তোরে ফুপু মেয়ে দেয় কিনা সেটা দেখ আগে!"

"কানের নিচে দুটো লাগাবো কষিয়ে। ভালো কথা মুখ দিয়ে বের হয়না? সবকিছু রেডি রাখ। এইবার পরীক্ষাটা শেষ হইলেই এসে নিয়ে আসবো সঙ্গে করে। বউ ছাড়া থাকা যাচ্ছে নারে। কষ্ট হয় খুব!"

“আচ্ছা এখন রাখি? পড়াতে বসবো।”

“হুম। খেয়াল রাখিস ওর।”

বলে লাইন কেটে দিলো অর্ণব। অমনি পাশে থাকা ফাহিম চেঁচিয়ে উঠল,

“ওরে শালা!তলে তলে এত কিছু! এই জন্যই তো বলি—ভাত খাইতে ভুলিস, কিন্তু প্রতিদিন এই টাইমে ফোন দিতে ভুলিস না কেন। আজকে একবারে হাতেনাতে ধরা!"

অর্ণব গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,

“স্পেশাল কেইস, মামু। ওসব তোমরা বুঝবা না।"

“এইটা স্পেশাল না, ক্রিমিনাল কেইস! শেষমেষ কিনা পিচ্ছি কাজিনের উপর? তোর নামে তো বাল্যবিবাহের মামলা হবে সালা!"

“এই তোরা থামবি, বাল?”

শেহরোজের পরপর ধমকেও চুপ হলোনা অর্ণব। উল্টো গাঁ ছাড়া ভাব নিয়ে টেনে টেনে বলল,

"জ্বলে, জ্বলে, জ্বলে!"

"জ্বলবেই তো জীবনও আজ পর্যন্ত এরা দুজন কোনো রিলেশন তো দূর কোনো মেয়ে আগ বাড়িয়ে এদের সামনে আসছে কিনা আমার ডাউট। একটার তো মুখের নকশা দেখলেই মেয়েরা ভয়ে পালায়। আরেকটা ( তাজধীর কে ইশারা করে ) ঐটার সমস্যা তো আজও ধরতে পারলাম না। এক্সাক্সটলি মেইন প্রবলেম টা কই। চেহারা সুরুৎ দেখতে মাশাআল্লাহ। তারপরও মেয়ে দেখলে যেমন এলার্জির মত দূরদূর করে, আমার তো এখন এর আগাগোড়া নিয়ে টেনশন হচ্ছে।"

"দুইডাই সালা নিরামিষ। এইবার বাড়ি থেকে আসার পথে হারবাল নিয়ে আসবো। খেতে না চাইলেও জোড় করে খাওয়াবো। চাচা চুচা ডাক টাকও তো শুনতে হইবে এই জীবনে।"

"শাট আপ। ইডিয়েট!"

শেহরোজ পুনরায় গর্জে উঠলেও নিরুত্তর তাজধীর। বিশেষ কোনো হেলদুল লক্ষ্য করা গেলোনা ওদের কথার পরিপেক্ষিতে। আনমমা হয়ে বসে আছে। নিরামিষ কথাটা কানে যাওয়ার পর থেকেই এই আনমনা ভাব লক্ষ্য করছে সেহরোজ। নাহলে এতক্ষনে টার আগে সেই রাম ধমক দিয়ে উঠতো। ততক্ষনে কি মনে করে যেন তাজধীর পাশে থাকা ফোনটা হাতে তুলে নেয়। পরপর দুই সেকেন্ড নেড়েচেড়ে পুনরায় ফেলে রাখে বিছানায়। 

—————

আড্ডার আসরের ইতি ঘটিয়ে আপাতত গোল হয়ে বসেছে সবাই। তাজধীর আগের জায়গাতেই বসে। আদেশ দিলো সবাইকে,

“অপারেশন কোড“কালো জোয়ার। টার্গেট—কক্সবাজার উপকূলের বাইরে, ডিপ সি রুট।ইন্টেল বলছে—একটা আন্তর্জাতিক স্মাগলিং নেটওয়ার্ক এই রুট দিয়ে অস্ত্র চালান করছে। লোকাল সাপোর্টও আছে।”

ফাহিম ভ্রু কুঁচকাল,

“লোকাল মানে?”

“ভেতরের লোক।”

“এই অপারেশনের সবচেয়ে বড় সমস্যা—
টার্গেট ভিজিবল না।”

অর্ণব নিচু গলায় বলল,

“ঘাপটি মেরে আছে!"

“এক্সাক্টলি!"

তাজধীর মাথা নাড়ল। তারপর একে একে সবার দিকে তাকাল। বলল,

“অর্ণব।তোর কাজ—ডাটা ট্র্যাকিং। কমিউনিকেশন, সিগন্যাল, যেকোনো ডিজিটাল মুভমেন্ট—সব নজরে রাখবি। ওরা কোথা থেকে আসছে, কোথায় থামছে—আমি লাইভ আপডেট চাই সবকিছু। সবকিছু মিন্স এভরিথিং?"

অর্ণব মাথা ঝুঁকাল,

“ডান!"

"সেহরোজ তুই স্নাইপার কভার দিবি। দূর থেকে ক্লিন শট মারবি। কোনো মিস যেন না হয়। আর ফাহিম,তুই আন্ডারওয়াটার ইউনিটে থাকবি। যেখানে আমরা যেতে পারব না—সেখানে তুই যাবি।”

“বিষয়টা যতটা ইজিলি দেখাচ্ছিস ততটাও না কিন্ত। এটার সঙ্গে বড় কোনো চক্রের হাত রয়েছে। যার হাত সরাসরি আন্ডারওয়ার্ল্ড পর্যন্ত চলে!তাই কোনো ভুল চলবে না। গট দেট?"

—————

ঢাকার অভিজাত বিজনেস জোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে নজরকারা কাঁচে মোড়া সুউচ্চ ভবন "এ আর জে কর্পোরেশন”দেশের অন্যতম বিলাসবহুল কর্পোরেট অফিস।

দশ তলা এই বিল্ডিংটির ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখ আটকায় এর মার্বেল ফ্লোর, ক্রিস্টাল লাইটিং,আর দেয়ালে মিনিমালিস্ট আর্টে। টপ ফ্লোরের গ্লাস-এনক্লোজড কনফারেন্স রুমটা আজকের মিটিংয়ের জন্য প্রস্তুত। দীর্ঘ ওভাল টেবিলের চারপাশে বসে আছে বাংলাদেশের নামকরা কর্পোরেট প্রতিনিধি, সাথে বিদেশি ক্লায়েন্টরাও।

সবাই মূলত অপেক্ষায়,একজনের জন্য।কোম্পানির 
সিইও—জ্যানিফার রাজ। অবশেষে নির্দিষ্ট সময়েই তার পায়ের হাই হিলের শব্দ ভেসে এলো করিডোর জুড়ে।

অটোমেটিক সেলফ কন্ট্রোল কাঁচের দরজাটা খুলে গেল নিজে নিজেই। সাথে সাথে দৃষ্টিগোচর হলো কালো ফরমাল স্যুটে মোড়ানো এক নারী দেহে।
খোলা চুল গুলো মিডিয়াম সাইজের। ড্রেসের সাথে ম্যাচিং করা পায়ের জুতোর কালারটাও। নিউড মেকাপের আস্তরণে থাকা নারীকে প্রথম দেখায় বুঝার সাধ্যি নেই তার জন্মস্থান বাংলাদেশ। হলিউড সিনেমায় দেখানো অত্যন্ত বিত্তশালী পরিবারের কোনো রাজনৈতিক ঘরের একরগা, রুষ্টভাষী, গুরুগম্ভীর পার্সোনালিটি সম্পূর্ণ মেয়েই মনে হবে হয়তো।

তাকে দেখতেই কক্ষে উপস্থিত বয়সে ছোট বড় সকলেই একযোগে দাঁড়িয়ে গেল।মেয়ে হলেও এর মধ্যে হাতে গুনা দু একটা মেয়েলি বৈশিষ্ট ছাড়া লক্ষ্য করা যায়না অন্যসব কিছুই। স্বভাব ছেলেদের থেকেও এগিয়ে। জ্যানিফার এগিয়ে গিয়ে বসে সিটে। বসতে বসতে আওড়ায় গম্ভীর গলায়,

"সিট্!"

বলা সবেই বসে পরে যে যার জায়গায়। পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট পাশে ফাইল খুলে প্রস্তুত ততক্ষনে।
মিটিং শুরু হলো। প্রেজেন্টেশন চলছে, ডাটা শেয়ার হচ্ছে। কেউ অপ্রয়োজনীয় একটা শব্দও উচ্চারণ করলোনা। এর মাঝেই একজন বিদেশি ক্লায়েন্ট, সম্ভবত নতুন, ঠোঁট প্রসস্থ করে হেসে উঠে দাঁড়াল।

“নাইস টু ফাইনাললি মিট ইউ , মিস জ্যানিফের!”

বলে হাত বাড়িয়ে দিলো সম্মুখে হ্যান্ডশেকের উদ্দেশ্য।চারোপাশে উপস্তিত সকলের চোখ কপালে। পরিস্থিতি অস্বাভাবিকতা কিছুটা আচ করতে পেরেই রীতিমতো থমকে গেছেন প্রত্যেকে। জ্যানিফার তাকালো নির্লিপ্ত।তবে বাড়ালো না হাত। লোকটা তখন হাত বাড়িয়েই রেখেছে ওর অভিমুখে। ওর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, রণয়, সামান্য এগিয়ে এসে ভদ্র স্বরে জানাল তাকে,

“ম্যা'ম ডাজেন্ট ডু হ্যান্ডশেকস।"

লোকটি একটু ইতস্তত করে বসে পড়ল জায়গায়। 
 অপ্রস্তুত হাসি মেখে প্রত্তুত্তর করল,

“অহ আই সী!"

“শ্যাল উইই? "

জ্যানিফারের উক্ত বাণীতে থামিয়ে রাখা মিটিং শুরু হলো পুনরায়। সময় নিয়েই শেষ হলো কনফারেন্স। শেষ হতে না হতেই সবাই রুম ছাড়ল তাড়াহুড়ায়। কক্ষ থেকে বেরিয়ে হাফ ছাড়ল অনেকে। 

জ্যানিফার উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল নিজের পার্সোনাল কেবিনে। স্বভাবতই এটা এই অফিসের অন্যান্য 
অফিসের বাকি অংশের থেকেও বিস্তর আলাদা। 
বড় গ্লাস ওয়াল, কালো-সোনালি টোনে সাজানো পুরো ইন্টেরিয়র। এক কোণে মিনিমাল ডেকোর, আর মাঝখানে বিশাল ডেস্ক। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে সেখানে বসে সে। রুমে আসতেই চোখে পরে দুজন গার্ডসের আওতাভুক্ত থাকা একজনেতে।লোকটার নাম মুজাম্মেল জাফর। একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারী।কাজ করে যাচ্ছে বিগত নয় বছর যাবৎ। চেয়ারের এক কোণে গুটিয়ে বসে আছে লোকটা। মুখ দিয়ে ঘাম ঝরছে অনবরত। পকেট থেকে টিস্যু বের করে মুছে যাচ্ছে সেই অবিরাম ধরদর করে ধরা ঘামের রেশ। হাত কাঁপছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। বারবার নিজের আঙুল মুচড়ে যাচ্ছে অস্থিরতায়। কেন ডেকেছে এই আপদ তাকে?কিছু কি ভুল করেছে সে? মনে টু পড়ছেনা তেমন একটা। গত নয় বছর যাবত নিস্টার সাথেই পালন করে যাচ্ছে নিজের দায়িত্ব।

তার এই ভাবনা চিন্তার মাঝেই জ্যানিফার গিয়ে বসল তার নিজস্ব চেয়ারটায়। বসতে বসতে হাঁক ছাড়ল দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডসদের উদ্দেশ্যয়,

"মিঃ জাফর কে এখনো খাতির আপ্যায়ন শুরু করিসনি? এরজন্য ও কি তোদেরকে আলাদা করে ইনভাইটেশন পাঠাতে হবে?"

বলতে না বলতেই এতক্ষন যাবৎ প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে র্যাকা দুই গার্ড হঠাৎই ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার ওপর।

“ম্যাডাম, ম্যাডাম...

বাকিটুকু বোলার আর ফুরসৎ পেলোনা লোকটা। তার আগেই বলিষ্ঠদেহি ওই দুইজন এলোপাথারি মেরেই যাচ্ছে লোকটাকে। লাথি ঘুষি কোনোটাই বাদ যায়নি। 
নির্দয়ভাবে মা রতে শুরু করল তারা। লোকটার মুখ বিকৃত হয়ে গেল য ন্ত্রণায়।কাতরাচ্ছে, ছটফট করছে, চিৎকার করছে। নাক দিয়ে র ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তবুও আকুতি জানিয়ে বললো অস্পষ্ট,

“ম্যাম! ম্যাম প্লিজ! আমি কি করেছি? আমার ভুলটা তো অন্তত বলুন!"

জ্যানিফার এতটা সময় ফাইল চেক দিয়ে যাচ্ছিলো। কিছু কিছু জায়গায় তার সাইন লাগায় সেখানে সিগনেচার দিয়ে থামে সে। এতক্ষণের জন্য একবারও তাকায়নি সেখানে চোখ তুলে। লোকটার আহাজারীতে একটা সময় বিরক্তিতে রণয় কে হাতে ইশারা করতেই লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় রণয়। 

“ম্যাডামের অফিসে কাজ করিস, অথচ ম্যাডামের রুলস ভাঙার সাহস কোথা থেকে পেলি তুই?জানিস না ম্যাডাম এসব পছন্দ করেন না? "

“কি… কি করেছি আমি?”

অ্যাসিস্ট্যান্ট এবার আরও ঠান্ডা স্বরে বলল,

“গত কয়েকদিন ধরে যে অফিসে আসা নিউ এমপ্লয়ী কে উত্তক্ত করছিস, হ্যারাস করে যাচ্ছিস নিজের মেয়ের বয়সী মেয়েটাকে সেসব কি ম্যাডাম দেখবেনা ভেবেছিস?আর আজ তো তুই সব সীমানা অতিক্রম করেছিস। মেয়েটাকে বাজে ভাবে স্পর্শ করতে যাওয়ার ঘটনা জানতে পাড়ার পরও যে দিব্যি শ্বাস নিচ্ছিস তার শুকরিয়া কর অন্তত।"

জ্যানিফারের হাতে ধরা তখন একটা গোল স্পিনার। সেটা আঙুলের মাঝে রেখে ঘুরিয়েই যাচ্ছে সে। নির্লিপ্ত, শীতল দৃষ্টি তার স্থির সেদিকেই। লোকটার চিৎকার, কাকুতি কিছুই স্পর্শ করছে না তাকে।

“ম্যাম! প্লিজ আমি জানি না আমি..

পরপর আবারও গার্ডসের ঘুষিটে মাঝপথে থেমে লোকটা। নাক থেকে গড়গড় করে গড়িয়ে পড়ছে র ক্ত। মিশে যাচ্ছে তা মেঝেতে। অবশেষে প্রচন্ড বিরক্তিতে উঠে দাঁড়ালো জ্যানিফার। হাতের 
ইশারা বুঝালো ওদের থামতে। থামল গার্ডরা।গার্ডদের থামতে লোকটা মনে কিছুটা বল পেলো। সেই জোরে জানালো আকুতিভরা অনুরোধ। হাত জোড় করে মিনতি করল,

"ভুল হয়ে গেছে ম্যাডাম। মাফ করে দিন শেষবারের মত। আর কখনো করবোনা এমনটা। এই শেষবারের মত ক্ষমা করে দিন আমায়। আমার ঘরে ছোট ছোট দুটো বাচ্চা আছে।"

জ্যানিফার এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো লোকটার সামনে।
কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আকস্মিক নিজের পায়ের উঁচু হিলটা তুলে সরাসরি লোকটার ডান হাতের উপর চেপে ধরল ও। সেই হাত—যে হাত দিয়ে সে স্পর্শ করতে চেয়েছিল একটি নিরীহ মেয়েরবয়সী নারীকে।

“আআআআআআআআ!!!”

ভয়ঙ্কর এক আর্তনাদ বেরিয়ে এলো লোকটার বুক ফুঁড়ে। থামল না তখনো জ্যানিফার। বরং আরও জোরে চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো নিটল। শরীরেrর সমস্ত ভর ঢেলে দিলো ওই এক পায়েই। "Parda" ব্র্যান্ডের হিলের ধারালো প্রান্তটা মাংসের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে যেন। লোকটার ছটফটানি বাড়লো বহুগুনে। 
কিন্তু গার্ডদের শক্ত হাত তাকে চেপে ধরে রেখেছে।নড়তে দিচ্ছেনা।,

“জ্যানিফার রাজের পার্সোনাল ডিকশনারিতে ক্ষমা বলে কোনো শব্দসংখ্যা নেই।"

হাতের তালুর উপর পা ডাবিয়ে রেখেই ইশারায় রণয় কে বলল কিছু একটা দিতে। রণয়ের জন্য ওই ইশারাটুকুই যথেষ্ট। তৎজলদি টেবিলে থাকা একটি বিশেষ পেন এনে তুলে দিলো তার বাড়ন্ত হাতটায়।সিলভার রঙের দাঁড়ালো সরু পেনটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল একবার। এক ঝটকায় সামনে ঝুঁকে পড়ল এরপর। পেন্সিলটা সোজা করে লোকটার ডান চোখের কোণায় ঢুকাতেই যাবে, মাত্র ইঞ্চিপরিমান দূরত্ব কি অমনি রুমে প্রবেশ করে কেউ একজন। ডেকে উঠে পিছন থেকে অত্যন্ত উচ্ছ্বাসিত হয়ে,

"ম্যাম! একটা গুড নিউজ আছে আপনার জন্য। স্যার ব্যাক করেছে আগামীকাল। কোয়ার্টারেই আছেন আপাতত!"

বাড়ন্ত হাতটা থেমে গেল মাঝপথে। এতক্ষন যাবৎ থাকা গম্ভীর মুখটায় সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টিগোচর হলো একটুকরো স্নিগ্ধ, প্রশান্তির স্পর্শ। নরম হয়ে এলো মুহূর্তেই ভিতরটা। পেন টা হাতে চেপে ধরেই একবার লোকটার দিকে অসহায় চোখে চেয়ে আওড়াল,

“তোর ভাগ্য ভালো। অনেকদিন পর মনটা আমার তৃপ্ত হয়েছে। বুঁকের ভিতরে থাকা অধম্ম যন্ত্রণার ছটফটানি কমেছে। ভালো লাগছে ভীষণ। মনটাও ভালো। আপাতত তোকে আর স্পর্শ করে হাতটা নোংরা করতে চাচ্ছি না। যা!"

বলেই গার্ডসের ইশারায় বলল রুম ক্লিন করতে। সেই সাথে পায়ের জুতোগুলো খুলে রাখলো একপাশে। রণয় কে বলল জুতোর ব্যবস্থা করতে। পাশ থেকে ইয়ারপড গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা রণয় বিড়বিড় করে বলে উঠল,

“গতকালই কিনা আশি হাজার টাকার জুতো, শেষ! বড়লোকদের বড়লোক ব্যাপার সেপার। সমস্যা নাই 
ড্রাই ক্লিন করে সেল দিলেও মোটা অংকের এমাউন্ট পাওয়া যাবে!" 
Page 2
          তারপর? তারপর গুনে গুনে পেরিয়ে গেছে ঠিক ষোলোটা দিন। কতশত ঘন্টা, কতহাজার মিনিট! সবকিছু তো আগের মতোই আছে। আগের মত আছে প্রিয়ন্তী ও। প্রয়োজন মত হাসে, কথা বলে, স্বাভাবিক থাকার ভানও করে। কিন্তু ভেতরে? ভেতরে সেই দগদদে গাঁয়ের ক্ষতটা শুকোনি আজও।

কত চেষ্টা করেছে লোকটাকে ভুলতে। নিজের সঙ্গে জোড় করেছে, সংগ্রাম চালিয়েছে। তবে দিনশেষে হেরে গেছে ও। পারছেইনা। উহু, লোকটাকে ভুলার ক্ষমতা নয়,বরং লোকটার ওর প্রতি ঐরকম ব্যবহার, যেটা যাওয়ার আগে করে গেছে। সরাসরি প্রত্যাখ্যান এর বিষয়টা। তবে প্রিয়ন্তীর একটা হিডেন গুন আছে বলাবাহুল্য।কারো সামনে দুর্বল হয়ে পড়েনা মেয়েটা । বুঝতে দেয়না কাউকে কিছুই। এই একগুঁয়েমিটুকুই আঁকড়ে ধরে আছে গত ষোলোটা দিন যাবৎ!

সেদিন সকালটা ছিল পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে প্রিয়ন্তীর একটা সময় কত জল্পনা কল্পনা ছিল। কি কি করবে, কোথায় কোথায় যাবে দু মাস আগে থেকে বান্ধবীর সঙ্গে মিলে প্ল্যান কষা শেষ। তবে এবারের পহেলা বৈশাখও পারেনি প্রিয়ন্তীর মন রাঙাতে। নিত্যদিনের মত আজও নিজের রুমেই বসেছিল ও। বের হয়নি কোথাও।তখনি দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকে পাভেল।বলে,

"প্রিয় শোন!"

“জি ভাইয়া?”

“তিনদিন পর আমার এক ফ্রেন্ডের বোনের বিয়ে। আগামীকাল বাদ পরশু গায়ে হলুদ। তাই তোকে জানিয়ে গেলাম। খুব কাছের ফ্রেন্ড তো। আমাকে তো বলছে এখন থেকেই ওদের বাড়ি জয়েন করতে!"

খুব আস্তে করে মাথা তুলে বলল প্রিয়ন্তী,

"ও মানে, আমাকেও যেতে হবে? আমি না গেলে হয় না?”

পাভেল ভ্রু কুঁচকে বলে,

“এটা কেমন কথা প্রিয়? মাথা ঠিক আছে তোর? তোকে ছাড়া আমরা একা যাবো?আর যেতে চাচ্ছিস না কেন হঠাৎ? এই তোর কি হয়েছে বলতো আমায়? খুব করে দেখছি, বাড়ি থেকে বের হোস না। ভার্সিটিও যাস না। সারাটাদিন ঘাপটি মেরে রুমে করিস টা কি তুই?"

“এমনি ভাইয়া। ভালো লাগছে না তাই বলেছিলাম। আচ্ছা যাবো।"

“সবসময় নিজের মতো করে চলা যায় না, প্রিয়ু। এটা ফ্যামিলি ইনভাইটেশন।”

"বুঝেছি ভাইয়া!"

“আর শোন, আজকে মিতালীকে নিয়ে মার্কেটে যাবি। যা যা লাগবে,ড্রেস, জুয়েলারি সব কিনে আনবি দুজন একসঙ্গে গিয়ে।"

“আজকেই?”

“হ্যাঁ, আজকেই। আজকে না পারলে কাল যাবি!"

“ঠিক আছে ভাইয়া!"

"এখন নিচে যা তোর ভাবি ডাকছে তোকে। কি যেন বানিয়েছে বলল। কিরে উঠছিস না কেন?"

অগত্যা উঠে দাঁড়ালো প্রিয়ন্তী। ভাইয়ের কথা ফেলার সাহস ওর নেই। ভয় পায় যে খুব। বিষয়টা আসলে ভয় না, মান্য বলা চলে একপ্রকার। প্রবল ভালোবাসাও কাজ করে এখানে। পাভেল আর দাঁড়ালো না। বোনকে শাসিয়ে নেমে গেলো নিচে।

—————

সকালটা ভাইয়ার কথামতো ভাবীর সঙ্গে ব্যস্ততায় পাড় করলেও অলস দুপুরটা আবারও ওকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো সেই একই জায়গায়। বিছানার এক কোণে হেলান দিয়ে বসে বসে উপন্যাসের বই পড়ছে ও। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া রোদের সরু রেখাগুলো লম্বা হয়ে পড়েছে মেঝেতে। 

আজকাল আর তেমন একটা বাইরে বের হয় না ও।
অতি প্রয়োজন ছাড়া নয়ই বলা চলে। নিজের ঘরটাতেই এখন ওর সবচেয়ে বেশি স্বস্তি লাগে।
এই নিয়েই অবশ্য শ্রেয়ার রাগের শেষ নেই। কদিন পরপরই চড়াও হয় মেয়েটা। কেন এভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, কেন ভার্সিটি যাচ্ছে না—এসব নিয়ে হাজারো প্রশ্ন শ্রেয়ার। গত ষোলো দিনে মাত্র তিনদিন ভার্সিটিতে গিয়েছে প্রিয়ন্তী। বাইরে টুকটাক প্রয়োজনে একদিন-দুদিন বের হয়েছিল। এই পর্যন্তই।

এই অল্প ক’দিনেই ওর মনে বেশ কিছু সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে ব্যাপারটা খুব একটা আমলে নেয়নি প্রিয়ন্তী। ভেবেছিল ভ্রম বা হয়তো অতিরিক্ত ভাবনার ফল। কিন্তু সময়ের গতিতে অনুভূতিটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

ওর মনে হয় বাড়ি থেকে বের হলেই কেউ ওকে অনুসরণ করে।কারো দৃষ্টি ওর উপরই নিবদ্ধ থাকে। ও যখন ঘুরফিরে তাকায়, খুঁজে বেড়ায় কাউকে ওর আশেপাশে তখন কাউকেই খুঁজে পায়না ও। কিন্ত এসব তো বাস্তবে হয়না। উপন্যাসের পাতায় কত পড়েছে এসব। নিজের ভাবনায় নিজেরই হাসি পায় ওর আজকাল।

আর তারথেকেও অদ্ভুত বিষয়টা ঘটে রাতের বেলা। প্রতিদিন, একদম নিয়ম মেনে, একই সমিন নতুন নতুন অচেনা নাম্বার থেকে একটা মেসেজ আসে ওর। Mine! জাস্ট এতটুকুই। এর বেশি আর একটি শব্দও না। প্রথম প্রথম ভীষণ অবাক হয়েছিল প্রিয়ন্তী।
বারবার নম্বরগুলোতে কল ব্যাক করেছে। কিন্তু তাতে বিশেষ কোনো সুরাহা হয়নি। প্রতিবারই নম্বর বন্ধ পেয়েছে।

এই পুরো ব্যাপারটা এখনো কাউকে বলা হয়নি।
শ্রেয়াকেও না। কারণ কথাগুলো নিজের কাছেই কেমন অদ্ভুত শোনায় যে। মেয়েটা শুনলে নিশ্চই আগের বারের মত এবারও ওকে উল্টাপাল্টা লজিকে বুঝ দিতে আসবে।

—————

সকালের কড়া রোদটা এখন আর নেই। সেখানে ভর করেছে মেঘের আনাগোনা। বৈশাখের সেই চেনা আবহ এটা। ওই সময়ে বাড়িতে এসে হাজির হয় শ্রেয়া।মিতালী গিয়ে দরজা খুলতেই ঝড়ের মতো ভেতরে ঢুকে পরে মেয়েটা। লাল পাড়ের সাদাটে একটা সুতির শাড়ি পড়েছে। খোলা চুলে লাগিয়েছে বেলির মালা। মিলিয়ে মিলিয়ে কপালে একটা টিপ ও লাগিয়েছে। ভেতরে ঢুকেই চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলল,

“কোথায় সেই মহারানী?”

মিতালী হেসে বলল,

“উপরে, নিজের রুমে।”

“উঠেনি , তাই না?”

শ্রেয়া সোজাসুজি উঠে এলো বান্ধবীর ঘরে। রুমে ঢুকতেই বিছানায় হেলান দিয়ে বসে থাকা প্রিয়ন্তীকে দেখে কপাল কুঁচকে গেল ওর বিরক্তিতে। বলল,

"কিরে বিধবা মহিলা!"

“কি?”

“আজকে পহেলা বৈশাখ, আর তুই এইভাবে বসে আছিস?”

প্রিয়ন্তী নির্লিপ্ত স্বরে বলল,

“ভালো লাগছে না। কখন এসেছিস তুই?"

শ্রেয়া এবার সত্যিই ক্ষেপে গেল,

“ভালো লাগছে না মানে? কতবার বললাম, বাইরে যাবি। একটু ঘুরব—শুনলি সেসব?"

"আমার ঘুম পাচ্ছে দোস্ত। আবহাওয়া দেখেছিস? এই আবহাওয়ায় বের হয় কেউ?"

"বাইরে না বের হয়ে ভিতরে ধ্যানে বসলে দেখবি কিভাবে বের হয় কিনা? উঠ এখন। জলদি!"

প্রিয়ন্তী উঠতে না চাইলেও জোড় করে উঠালো শ্রেয়া। সোজা গিয়ে কাবার্ড খুঁজে খুঁজে বের করল একটা নীল রঙা শাড়ি। কালার কম্বিনেশনটা না গেলেও আপাতত তাতে হবেই ভেবে একপ্রকার জোড় করেই পড়িয়ে দিলো সেটা।

“আমি শাড়ি পরব না।”

“পরবি।”

“শ্রেয়া!"

“চুপ!”

এরপর শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে কাঁচের একথোকা নীল চুরি পরালো। চুলগুলো খুলে দিয়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে আসা বেলির মালাটা গুজলো সেখানে। এরপর টুকটাক সাজিয়ে ভালো করে ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষন পরখ করে নিয়ে বলল,

"একটা জিনিস মিসিং। তাকা আমার দিকে!"

প্রিয়ন্তী সাথে সাথে ফুসে গিয়ে আপত্তি জানাল,

"এই না না আমি কাজল দিবোনা"

“কেন?”

“পরে চোখের নিচে কালি পড়ে যায় তাতে!"

"ওটা মেয়েদের আরও সুন্দর্য্য বাড়ায়। একটু আকটু পড়লে কিছু হবেনা। স্থির হয়ে চুপচাপ বস।"

শেষমেশ শ্রেয়ার জোরাজোরিতে চোখে কাজল ও পড়ল ও। ঠোঁটে লাগালো পিঙ্ক লিপগ্লস। সবশেষে একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে শ্রেয়া নিজেই বলল,

“ওয়াও! একদম পারফেক্ট!এখন চল বাইরে যাই। "

“আমি কোথাও যাচ্ছি না।”

“কি?”

“ভালো লাগছে না। তুই গেলে যা।”

শ্রেয়া বিরক্ত হয়ে তাকাল। বাইরে ততক্ষনে মেঘের গর্জন আরও তীব্র হলো। আকাশটা পুরোটাই মেঘে ঢেকে গেছে। বৈরী বাতাস বইছে শু শা আওয়াজ তুলে।মিতালী নিচ থেকে উঠে এলো তখন,

" বাইরে গেলে বৃষ্টি হতে পারে।এরথেকে ভালো বাড়িতেও আড্ডা দাও তোমরা!"

শ্রেয়া একটু ভেবে হঠাৎ বলল,

“তাহলে ছাদে যাই ভাবি?"

প্রিয়ন্তী চোখের ইশারা করতেই শ্রেয়া আবার বলল,

“ছাদে যেতে সমস্যা কি?”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে শেষমেশ রাজি হলো। তিনজন একসাথে ছাদে উঠল। ছাদে দাঁড়াতেই এলোমেলো বাতাস এসে ছুঁয়ে গেল ওদের মুখ। মেঘলা আকাশটা অদ্ভুত সুন্দর আজ।শ্রেয়া উত্তেজিত হয়ে ফোন বের করে বলল,

“এইদিকে আয়, আগে ছবি তুলি।"

বলে গটাগট কয়েকটা ছবি তুলে ফেলল ওরা।
এরমধ্যেই মিতালী নিচ থেকে ট্রে করে চা নিয়ে এলো।
ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, মেঘলা আকাশের পানে চেয়ে চেয়ে চা খেলো অল্প স্বল্প।

—————

তিনজন বসে আছে নিরিবিলি। শ্রেয়া ফোন বের করে ভিডিও করছে ওয়েদারের। এই নিরবতার মাঝেই হঠাৎ কী যেন মনে পড়ল শ্রেয়ার।চোখ দুটো চকচক করে উঠল তাতে। আকস্মিক প্রিয়ন্তীর হাতে থাবা মেরে বলল,

“এই প্রিয়,একটা গান গা না।”

প্রিয়ন্তী চমকে তাকাল। কপাল কুঁচকে বলল,

“কি?”

“ গা না। অনেকদিন তোর গান শুনি না।এই ওয়েদারে তোর গলায় গান শুনলে একদম জমে ক্ষীর হয়ে যাবে ব্যাপারটা!"

"আমি আর গান? তাও এখন? অসম্ভব!"

“এখনই গাবি তুই। আমার কথা রাখবি না দোস্ত? তোর জন্য সবাইকে ফেলেফুলে বাড়ি আসলাম। এমনিতেই মনটা খারাপ। না করিসনা প্লিজ?"

“বললাম তো ভালো লাগছে না। গলায় সুর আসবেনা ভাই!"

শ্রেয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল,

“তোর কোনো কিছুই ভালো লাগে না এখন, তাই না?দুইদিন পর আমাদেরও ভালো লাগবেনা। তিনদিন পর তোর ভাই ভাবীকেও ভালো লাগবে না। চারদিন পর দেখা যাবে নিজেকেও ভালো লাগছেনা। পাঁচদিন...

"হয়েছে হয়েছে। থাম থাম। গাইবো। খুশি এবার?"

মিতালী এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল সবটা। পাভেলের মুখে বেশ কয়েকবার শুনেছিল প্রিয়ন্তী ভালো গান গাইতে পারে। ওর গানের গলা নাকি তার শাশুড়ির মত। ভদ্রমহিলা খুব সুন্দর গান গাইতেন। তবে সরাসরি কখনো শুনেনি এর আগে। কৌতূহলী চোখে বলল তাই,

"তুমি গান গাইতে পারো প্ৰিয়?”

“পারে না মানে! স্কুল-কলেজে কত প্রাইজ পাইছে এই মেয়ে জানেন? এত ভালো টেলেন্ট কেউ হাইড করে রাখে?"

মিতালীর চোখ যেন আরও বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে। বলল,

“ওমা সত্যি নাকি?"

প্রিয়ন্তী একটু অস্বস্তিতে পড়ল। বলল ইতস্তত করে,

"অমন কিছুনা ভাবি। ও সবসময় একটু বাড়িয়েই বলে।"

"তুমি জানো আমার গান শুনতে খুব ভালো লাগে। ভাইয়া তো আমায় একবার গানের ক্লাসে ভর্তি করেছিল। তবে সবাইকে দিয়ে আর কি সবকিছু হয়? আমার গলার স্বর সুন্দরনা। মোটা। তাই ছেড়ে দিয়েছি!"

প্রিয়ন্তীর মনটা কেমন নিগড়ে উঠে আকস্মিক। নিজেকে সামলা দিতে দিতে শুনতে পায় পাশ থেকে উঠে যাচ্ছে শ্রেয়া। একছুটে সোজা দৌড়ে নিচে পরোক্ষনে আবার হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে এলো। হাতে ধরা একটা গিটার। ওটা প্রিয়ন্তীরই। কয়েক বছর আগে পাভেল কিনে দিয়েছিলো সেটা। 

“এই নে।”

গিটারটা সরাসরি প্রিয়ন্তীর হাতে গুঁজে দিয়ে থামে শ্রেয়া।প্রিয়ন্তী একেবারে হতবাক তাকায়। বলে,

“তুই এটা এনেছিস কেন?"

“তো কি হয়েছে? আজকেই প্রথম ধরলাম নাকি এটা?"

“আমি গাইব না। সর!"

“প্লিজ দোস্ত!"

পাশ থেকে মিতালী ও অনুরোধ করল,

"গাও না প্রিয়। খুব ইচ্ছে হচ্ছে শুনতে।"

দুইজনের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল প্রিয়ন্তী। হাড় মানলো অবশেষে। গোল হয়ে গিটার টা হাতে নিয়ে বসল। আঙুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে গেল গিটারের চিকুন, সরু তারের উপর।
হাওয়াটা একটু জোরালো হয়ে উঠেছে ততক্ষনে। দ্রিম দ্রিম শব্দ তুলছে। দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকালোও বোধহয়। প্রিয়ন্তী শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে গান ধরল। ঝোড়ো বাতাসে খুলে রাখা চুলগুলো উড়ে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে মুখ।  

মেয়েটা গানের সুর ধরতেই এতক্ষন মুগ্ধ নয়নে পাশে বসে থাকা মিতালীর ধ্যান ভাঙলো। কি মনে করে যেন ফোন বের করে ভিডিও অন করে রাখল এই মুহূর্তটা ধরে রাখার জন্য। এত সুন্দর জিনিস ফোন বন্ধি না করে রাখা যায় কি? মেয়েটা গায়-ই এত সুন্দর। 

—————

দীর্ঘ,শ্বাসরুদ্ধকর এক অপারেশন শেষে অবশেষে ঘাঁটিতে ফিরেছে টিম "লেভায়াথান"। তখন বিকেলের আলো স্লান হয়ে এসেছে কেবল। মিশন শেষে ফেরার এই মুহূর্তটা প্রতিবারই অন্যরকম হয়। শরীরে বাসা বাধে ক্লান্তিরা। অচল হয়ে পরে একেকজন। জাহাজ থেকে নামতেই অপেক্ষমাণ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একে একে এগিয়ে এলেন। চোখে-মুখে চাপা গর্ব নিয়ে আহ্বান জানাচ্ছেন সকলকে। অপারেশন সফল হয়েছে। জয়ী হয়ে ফিরেছে টিম। আর সেই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে যে নামটা সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠে, সেটা হলো তাজধীর সিদ্দিক আযান।

একজন সিনিয়র অফিসার এগিয়ে এসে দৃঢ়ভাবে তাজধীরের কাঁধে হাত রাখলেন।প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বললেন,

“ইমপ্রেসিভ ওয়ার্ক, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার। এই লেভেলের এক্সিকিউশন, এটা সবাই পারে না। তোমার 
ওপর ভরসা করা যায়। প্রতিবারই প্রমাণ করে আমাদের আস্থা আরও বাড়িয়ে দাও তুমি। গ্রেইট জব!"

তাজধীর সংক্ষিপ্তভাবে মাথা ঝুঁকাল শুধু। তার মধ্যে আলাদা কোনো উচ্ছাসতা কাজ করলনা। আর তার এই স্বভাবটাই তাকে সবার থেকে আলাদা করে তোলে। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব, ফাহিম আর সেহরোজ। অল্প কিছুক্ষণ পর সবাই নিজেদের কোয়ার্টারে ফিরে এলো। আপাতত শরীরটা আরাম দিতে হবে। গভীর বিশ্রামের প্রয়োজন। কতদিন রাত জেগে জেগে পাড় করেছে সেই হিসাব রাখে কে।

তাজধীর নিজের রুমে ঢুকে ক্যাপটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর গিয়ে বিছানার পাশে হেলান দিয়ে বসল। এলিয়ে দিলো শরীরটা। মাথাটা পেছনে ঠেকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ রাখল।অমনি হুড়মুড় করে ঢুকে গেল অর্ণব, ফাহিম। অর্ণব ঢুকেই জুতা ছুঁড়ে দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে বলল। তাজধীর চোখ খুলে বিরক্তিতে বলল,

“এখানে কি চাই? তোদের থাকার জায়গায় নেই? সবাই যার যার রুমে গিয়ে রেস্ট নে!"

এইই রুমটায় কি পায় ওরা কে জানে। নিজেদের রুম ফাঁকা রেখেও এখানে এসে বসতেই ভালো লাগে সবার। সবাই বলতে অর্ণব আর ফাহিম। সেহরোজ ও আসে। তবে দরকার ছাড়া অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় থাকেনা সে। একান্ত দরকারেই এসে জড়ো হয় সেখানে। 

“আগে পাঁচ মিনিট আড্ডা মারি ভাই। মাইন্ডটা একটু রিফ্রেশ ও তো করতে হবে নাকি?"

"তো এটা কি সরকারি ক্যাফে পেয়েছিস? যা বের হো!রেস্ট করবো আমি!"

"এমন খেঁক খেঁক করছিস কেন? তুই বসেছিস বিছানায় আর আমরা সোফায়। তোর কোলের উপর তো উঠে আর বসিনি যে তোর প্রবলেম হবে!"

ফাহিম সায় মিলালো তাতে। বলল,

"তোর কি হয়েছে বলতো আগে। এইবার আসার পর থেকেই বেশ নোটিস করছি বিষয়টা।এমনে শেয়ালের মত খালি খেঁক খেঁক করতেই থাকিস। সেহরোজ এর ভাইরাসে ধরসে নাকি তোরে?"

"ধরতেই পারে। দুইটা তো এক গোয়ালেরই মাঝি। নিশ্চই কোনো ভালো কাজের রেজাল্ট হিসাবে আমাদের মত দুজন কে পাইসে।"

বলতে বলতেই পকেট হাতড়ে ফোন বের করল অর্ণব।সময় পরখ করে নিয়ে কল লাগায় বোনকে।তাজধীর যথারীতি নিজেকে শান্ত রাখতে চেষ্টা করে ফুস করে দম ছাড়ে। ওদিকে কলটা রিসিভ হতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল ফারহানার মুখ। ভাইকে কিছু বলতে না দিয়েই নিজেই বলতে লাগে,

“তোর প্রাণপাখি। বাসায় নাই।”

“মানে?”

“খালার বাসায় গেছে।”

"কিহ? কখন?"

“এইমাত্র গেছে।”

অর্ণব সোজা হয়ে বসে। ভ্রু টানটান করে সুধায়,

“তুই এখনই কল দিয়ে আসতে বল ওকে।"

“আমি কেন? তুই করতে পারিস না? "

“ইডিয়েট ওর কাছে ফোন আছে?"

"তাহলে আমি কিভাবে করবো?"

"ফুপী কে কল দিয়ে বল আসতে।"

"পারতাম না! এতে আমার লাভ?"

“শোন না বোন আমার। এবার আসলে যা চাস তাই কিনে দিবো। এখনই একটু দেখার ব্যবস্থা কর, না হলে আমি স্ট্রোক করে মা রা যাবো!”

"আচ্ছা দেখছি। অপেক্ষা কর। লেটেস্ট মডেলের ফোন চাই আমার এবার আসলে। দিবি কিনা আগে বল!"

"দিবো, দিবো!"

কল কেটে দিলো ফারহানা। পাশ থেকে খুব মনোযোগ দিয়েই বন্ধুর এহেন ছটফটানি দেখছিলো ফাহিম। চোখ কপালে তুলে বলল ছেলেটা,

“মাত্রই ফিরলি ব্যাটা। আগে গিয়ে রুমে রেস্ট করবি একটু রিলিফ নিবি। এত তাড়াহুড়ার কি আছে?মেয়েটা কি হারায়া যাচ্ছে?”

“ওসব তুই বুঝবি না। আগে কাউকে ভালোবাস, প্রেমে পর তারপর আর জিজ্ঞেস করারও দরকার পরবেনা। এমনিতেই বুঝে যাবি!"

এরপর শরীরটা এলিয়ে তপ্ত একটা শ্বাস ছেড়ে বলতে লাগল ফির,

“যতই ব্যস্ততা, কাজের কড়া সিডিউল থাকুক না কেন, ভালোবাসার মানুষটাকে এক নজর দেখলে সারাদিনের শরীরের সকল ক্লান্তি, সকল অসস্তি এক মুহূর্তে গায়েব হয়ে যায়। দুই ঘন্টা শাওয়ার নিলে, সারারাত ঘুমাইলেও—যেই রিলিফটা পাবো না ওরে এক নজর দেখলেই ওইটা পাই।"

“তুই শেষ। পুরো রোমিও হয়ে গেছিস।"

বলেই ফাহিম ডাকে ফির,

“আচ্ছা অর্ণব!”

“হুঁ?”

“তুই তো মেয়েটারে ভালোবাসিস তাই না?কবে থেকে পছন্দ করিস ওরে?”

অর্ণব এবার সোজা হয়ে বসল। খুব আগ্রহী দেখালো ছেলেটাকে হুট্ করেই। বললো ওভাবেই,

“কবে থেকে পছন্দ করি এইটা ঠিক করে বলতে পারব না। কারণ ওরে তো আমি দেখতেছি জন্ম থেকেই। প্রথমবার কোলেও নিসিলাম আমি।কিন্ত 
যেদিন প্রথম বুঝলাম ওর সামনে দাঁড়াইলে আমার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করে। কেঁপে উঠে সমস্ত অস্তিত্ব। ওর হাসি দেখলে মনে হয়—সবকিছু থেমে যাক, শুধু হেসেই যাক আমার প্রাণপাখিটা। 
আর আমি সারাজীবন মুগ্ধ হয়ে সেই হাসিটুকু দেখে যাই।ওর খানিকটা স্পর্শে আমার ভিতরটা শুদ্ধ টলমল করে উঠে। নাড়িয়ে দেয়। তখন থেকেই বুঝেছি। প্রেমে পরে গেছি আমি ওর। ওকে আমার লাগবেই। তবে মেয়েটা ছোট। কোনো রকম টাইনা টুইন্না এস এস সি টা দেয়াই আগে। এরপর সব ধৈর্য্য সহ্যর কুরবানী।"

“মেয়েটা জানে?”

অর্ণব মাথা নাড়ল। বলল,

“উহুম। বলিনি।”

“কেন?”

“আগে আরেকটু বড় হোক।এই বয়সে এসব বলার মানে নাই। বাচ্চা মানুষ। ভয় পাইবো উল্টো। এমনিতেই আজকাল বাড়ি গেলে সামনে আসতে চায়না।"

“যদি এর আগে অন্য কারো চক্করে পড়ে যায়?”

অর্ণব বিন্দুমাত্র দেরি না করে উত্তর দিল ফটাফট,

“পড়বে না।”

“এত কনফিডেন্ট?”

“ওর মা—মানে আমার ফুপু খুব স্ট্রিক্ট পার্সন। আর রাহিও ঐরকম মেয়ে না।"

“তোরে দেখে ভয় পায়, আর তুই আছিস বউ বানানোর ধান্দায় ?”

“এই ভয়টাই একদিন ভরসায় পাল্টাইবো। দেখিস।”

"বাপরে! দোয়া করি তোর প্রাণপাখিই যেন শেষমেশ তোর হয়।”

ফাহিম আকস্মিক চুপ থেকে ফট করে প্রশ্ন করে বসল আবার,

“আচ্ছা ভাই আমি কিভাবে বুঝবো যে আমিও কারো প্রেমে পড়েছি?"

“সালা আমারে কি তোর লাভ গুরু মনে হয়? "

"বলনা। তোর তো এক্সপেরিয়েন্স আছে।"

"সবার কথা তো বলতে পারিনা, তবে যখন তোর কাউকে ভালো লাগবে তখন সেটা সবার আগে তুই নিজেই বুঝতে পারবি। তোর মন বলে দিবে সেটা। তার আশেপাশে থাকলে দুনিয়ার সমস্ত ধ্যান, জ্ঞান, চিন্তা সবকিছু লোপ পেয়ে যাবে। তুই এমন এমন কাজ করে বসবি তার মুখে হাসি ফুটানোর জন্য যা তুই নিজেও উপলব্ধি করতে পারবি না। আদৌ সেসব তোর ক্যারেক্টতার এর সঙ্গে যায়কিনা। পরে নিজেই ভেবে ভেবে হাসবি। মানুষটার অনুপস্থিতিতে, দুনিয়াটা তোর কাছে রংহীন লাগবে, নিস্প্রান লাগবে। কোনো কিছুই ভালো লাগবেনা সে পাশে না থাকলে।মানুষটার সঙ্গে একটা দিন কথা না বললে দেখবি তোর দিনটা অসম্পূর্ণ লাগবে। চারপাশে সব কিছু থাকার পরও কেমন খালি খালি লাগবে।অকারণে বারবার মনে পরবে তাকে। হাজার মানুষের ভিড়ে ঠিকই তোর দুচোখ আটকাবে ওই মানুষটার মাঝে। আর তাকে না দেখতে পেলে মেজাজ খিট মিট করবে সার্বক্ষণিক। 

" আমাদের তাজধীরের মত?"

অর্ণব থামল। চোখ তুলে চাইলো বিছানায় নিলিপ্ত গা এলিয়ে ফোন স্ক্রোলিং করা তাজধীরের উপর।ছেলেটার আশেপাশে দুজন মানুষ যে নিজেদের একটা আলাদা ভালোবাসার দুনিয়া বানিয়ে রেখেছে সেদিকে হুসমাত্র ও নেই। ফাহিমের আকস্মিক কথার পরিপ্রেক্ষিতে দুই বন্ধুই এক সঙ্গে শব্দ করে হেসে দিল।

ফাহিমের প্রশ্নের পর অর্ণব একটু হেসে পিঠ ঠেকাল সোফার সাথে। ওদিকে একদম ভিন্ন জগতে ডুবে আছে তাজধীর। শার্টের বুকের দুটো বোতাম খোলা।
ক্লান্ত শরীরটা হেলান দিয়ে রেখেছে।
হাতে ফোন—আঙুল ধীরে ধীরে স্ক্রল করছে স্ক্রিনে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তার তেমন কোনো উপস্থিতি নেই।
পাঁচ বছর আগে খোলা একটা ফেসবুক আইডি—
নামেমাত্র। বন্ধু তালিকায় হাতে গোনা কয়েকজন।
পরিবার ছাড়া তেমন কেউ নেই। মেসেজ রিকোয়েস্ট, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট—সবকিছুই প্রায় অযত্নে পড়ে থাকে সবসময় ।চেক করার সময় আর আগ্রহ কোনোটাই নেই তার। হয়নি ও কোনোদিন। হঠাৎ কি মনে করে যেন ফেইসবুকে ঢুকে সে। কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছাড়াই। মিনিট খানেক স্ক্রল করল লাগাতার। কানের মাঝে তখনো অর্ণবের বলা একেকটা বাক্য ঘুরছে।

অস্তির হয়ে ফেইসবুক স্ক্রলিং করতে করতে আকস্মিক, একদম অপ্রত্যাশিত ভাবেই 
হঠাৎই থেমে গেল তার আঙুলদুটো। মেঘলা আকাশের নিচে ছাদে গোল হয়ে বসে আছে দুজন নারী।
গাঢ় নীল শাড়ি জড়িয়ে আছে তার শরীরে। ওই নীল শাড়িতে আবৃত নারীটিকে দেখেই আকস্মিক হৃদপিন্ডটা কেমন খামচে উঠল তার। ফর্সা গোলগোল হাত দুটোয় শোভা পাচ্ছে নীল কাঁচের চুড়িগুলো।
কপালে ছোট্ট টিপ। চুলগুলো খোলা, এলোমেলো হয়ে উড়ছে বাতাসের তালে তালে।অবাধ্য হয়ে বারবার এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে মুখ।এক হাতে গিটার আঁকড়ে ধরা।
অন্য হাতে ধীরে ধীরে স্ট্রাম করছে সে মহিয়সী। আর সেই নারীর গলায় বাজতে থাকা সুরতানে কেঁপে উঠে তার সমস্ত সত্তা,

“ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া এ সময়,
মেনে নেয় তার পরাজয়!
জীবন পরে ধুলোতে, হারিয়ে সঞ্চয়!
যার কথা ভাসে মেঘলা বাতাসে,
তবু সে দূরে তা মানিনা,
জানি না কেন তা জানি না, জানিনা 
কেন তা জানি না, জা নিনা..."

তাজধীর অনুভব করল তার বুকের কম্পিত সেই হৃদস্পন্দন। এই অনুভূতির সঙ্গে এর আগে কখনো, কোনোদিন পরিচিত হয়নি সে। একবারে 
অচেনা,অস্বস্তিকর সেই অনুভূতি। আশ্চর্য! তার হুট্ করে এমন লাগছে কেন? শ্বাস নিতেও কেমন যেন কষ্ট হচ্ছে মনে হচ্ছে। হাঁসফাঁস লাগছে ভিতরটা। অস্তির লাগছে কেন তার এতটা? বারবার কেন ঘুরফিরে মেয়েটার এই দৃশ্যটুকুই তার চোখে ভাসছে?একটু আগের বন্ধুর বলা অবহেলা, বিরক্তিতে শোনা প্রত্যেকটা শব্দই হুবহু মিলে যাচ্ছে। সেতো এমন নয়। 
এইসব আবেগ, অনুভূতি এসব তার জন্য না।তাহলে 
তার ভেতরটা এমন এলোমেলো করে দিচ্ছে কেন হঠাৎ?

“কে রে মেয়েটা? কোনো ভয়েস আর্টিস্ট?"

ফাহিমের ডাকে ধ্যান ভাঙে তার। ফাহিম আবারও বলে,

“এত সুন্দর গলা! দেখাতো একটু! যার গলা এত কোমল, মিষ্টি—সে দেখতে কেমন, নিশ্চই খুব সুন্দরী?"

বন্ধুর কথার পরিপেক্ষিতে চুপ করে রইলো তাজধীর। ঠোঁট কামড়ে কি মনে করে যেন ঢুকলো মেসেঞ্জারে। মাস খানেক আগে আসা সেই মেয়েলি আইডিটার মেসেজ বারে ক্লিক করতেই নিচে লেখা উঠল, this persons isn't available in mesengar"

চোখ দুটো আশ্চর্যে বড় হলো তাজধীরের। মেয়েটা ওকে ব্লক করেছে? সিরিয়াসলি? কিছু একটা ভেবে আকস্মিক উঠে দাঁড়ালো বিছানা ছেড়ে। সোজা গিয়ে দাঁড়ালো বারান্দায়। ফোনের ডায়াল অপশনে গিয়ে কল লাগালো কাউকে। রিং বাজতেই ওপাশে ভেসে এলো কারো কণ্ঠ,

“হ্যাঁ তাজধীর বলো।”

“স্যার, আমি একটা ইমেইল পাঠাচ্ছি।”

একটু থেমে আবার বলল,

“আমার আর্জেন্ট কিছুদিনের ছুটি লাগবে। বিস্তারিত মেইলে জানিয়ে দেব।”

ওপাশ থেকে অবাক কণ্ঠ ভেসে এলো তখুনি,

“সবেমাত্র তো এলে তুমি, তাজধীর! কি হলো হঠাৎ?
এত ঘন ঘন বাড়ি যাচ্ছ যে? ইজ এভরিথিং অলরাইট?"

"ইস্যুটা পার্সোনাল স্যার!"

“আচ্ছা, ঠিক আছে আমি ম্যানেজ করার চেষ্টা করবো। বাকি বিস্তারিত মেইলে পাঠিয়ে দিও।”

“ওকে স্যার। থ্যাংক ইউ।”

বলে কল কাটলো সে। তারপর চোখ তুলে তাকালো আকাশের পানে। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,

“মিস ব্লু হাফ মুন। একজন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার কে ব্লক করার শাস্তি আপনায় পেতে হবে। সেই শাস্তিই দিতে আসছি আমি। প্রস্তুত থাইকেন কিন্ত !"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp