মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ফুঁড়ে ঝড় উঠেছে। উড়ন্ত বৃষ্টির জলে ভিজে গিয়েছে চারপাশটা। রাজার ফুলশয্যা সাজানো হয়েছে দক্ষিণ দিকের সবচেয়ে বড়ো কক্ষটিতে। তাজা ফুলের ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।
পুষ্পের প্রতি প্রেম নেই এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল। সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষটিও ফুল ভালোবাসে। বাতাসে ভেসে বেড়ানো সেই মিষ্টি সুবাসকে ভালোবাসে। কিন্তু রানি ভালোবাসতে পারলেন না। যে ফুলশয্যায় তার স্বামী অন্য নারীর হবে সেই ফুলকে কীভাবেই বা ভালোবাসবেন তিনি? কীভাবেই বা মুগ্ধ হবেন তিনি?
রাজার সাথে তার সংসারের গল্পটা যে রূপকথার মতোই সুন্দর ছিলো। তার পিতা নিজের কন্যাকে কত বিশ্বাস করেই না রাজা চর্যাপদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন! চর্যাপদ তখন বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন প্রাণ থাকতে এই হাত ছাড়বেন না। যদিও ছাড়েননি হাত কিন্তু অন্যকারো হাত যে ধরবেন সেটাতো রানি কোনোদিনও ভাবেননি। কখনোই না।
সেসব গল্প আজ বড়োই যন্ত্রণার স্মৃতি। তার দেহে বিঁধছে সেসব কাঁটার মতোই।
“ভিজে যাচ্ছেনতো!”
আচমকা মেয়েলি কণ্ঠে ধ্যান ভাঙে রানির। কেঁপে উঠেন খানিকটা। অন্য এক ভাবনার পৃথিবীতে ডুবে ছিলেন বলেই আচমকা ধ্যান চ্যুত হওয়ায় সামলাতে সময় নিলেন।
সুরসুন্দরী ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। রয়েসয়ে পুনরায় বললেন,
“কক্ষে যান। ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছেন।”
রানি সুরসুন্দরীর মুখপানে তাকান। বেশ অনেকটাদিন হয়েছে সুরসুন্দরী এই প্রাসাদে এসেছেন। রানি কখনোই তাকে সাদরে গ্রহণ করেননি। ইনিয়েবিনিয়ে কত কথা বলছেন। প্রতিত্তোরে শুনেওছেন কত কথা। তবুও স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। সুরসুন্দরীর এই অবস্থানকে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন…
এখন তার দমবন্ধ হয়ে আসছে। সুরসুন্দরীকে তিনি আর কোনো ক্রমেই মানতে পারছেন না যেন। স্বামীর অধিকার হারানোর সমস্ত দায়ভার তিনি সুরসুন্দরীর উপর চাপিয়ে দিয়ে ক্রোধান্বিত হলেন। কণ্ঠ অতিরিক্ত রুক্ষ করে বললেন,
“আমাকে ধ্বংস করার সমস্ত আয়োজন করে শান্তি পেয়েছেনতো?”
সুরসুন্দরী হেসে ফেললেন রানির কথায়। একপা, দু'পা করে তিনিও গিয়ে দাঁড়ালেন রানির পাশাপাশি। দৃষ্টি রাখলেন বাহিরের অঝোর বৃষ্টি ধারায়।
“সমস্ত দোষ আমার তবে?”
“তা নাহলে কার? আমার ললাটের?”
“আমার দোষ দিচ্ছেন, ললাটের দোষ দিচ্ছেন একটিবারও কি নিজের স্বামীর দোষ দিতে পারলেন না?”
“না, পারছি না। কারণ আমি জানি, আপনিই তাকে এই কাজটি করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। নয়ত রাজা কখনোই এমনটা করতেন না। ভালোতো বেসেছিলেন তিনি আমায়।”
“ভালোবেসে ছিলেন! ভালোবাসলে আমার কথাতেতো এমনটা করার কথা ছিলো না। আপনার কথা ভেবে বরং আপনার হয়ে থাকার কথা ছিলো।”
সুরসুন্দরীর শীতল কণ্ঠস্বর। রানির মনে হলো গলায় আটকে থাকা কান্নারা এখন বেরিয়েই যাবে। আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এই নারীটি তার সাথে এখনও হেঁয়ালি করছে? এখনও?
এইতো কিছুদিন আগেইতো এই সুরসুন্দরীই রানিকে প্রকাশ্যে বলেছিলেন রাজাকে চিরতরে রানির থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবেন। তার নাকি অতই ক্ষমতা। রানি তখন নিজের সমস্ত জেদ থেকেই এই আহ্বান সাদরে গ্রহণ করে ছিলেন। তার এতটুকু বিশ্বাস ছিলো, রাজা আর যাই করুক একজন চরিত্রহীন নারীকে নিজের সঙ্গিনী বানানোর মতো বোকামি করবেন না। কিংবা সুরসুন্দরীও বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার নারীটি নন।
অথচ সুরসুন্দরী সেই আহ্বানকে এতটাই গুরুতর ভাবে নিলেন যে ঠিকই তিনি রাজাকে আলাদা করেই ছাড়লেন। প্রত্যক্ষ ভাবে নিজের না করলেও পরোক্ষভাবে তো করলেন!
“আপনি, আপনি সেদিন বলেছিলেন আমাকে, রাজাকে আপনি এই সংসার থেকে আলাদা করবেন। আপনিই এইসব করেছেন আমি জানি। কিন্তু একটা সত্যি কথা কি বলবেন? আমি আপনার কী ক্ষতি করেছিলাম? কীসের রাগ ছিলো আপনার এত আমার প্রতি?” অসহায়, ব্যথাতুর কণ্ঠ রানির। কথা বলতে বলতে কতবার কণ্ঠ কাঁপল কান্না চেপে রাখার অদ্ভুত চেষ্টায়।
সুরসুন্দরী এবার রানির চোখে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না। রানির টলমলে চোখ, এই অসহায়ত্ব কোথাও একটা যেন তার খেলার জয়। আবার কোথাও যেন একটা হতাশা, পুরোনো ব্যথা বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কাজ করল। বুক ছেড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইলেও তিনি তা অগোচরেই গিলে নিলেন। মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“হ্যাঁ, আমিই করেছি এই সর্বনাশ। করার আগেও বলেছিলাম আপনি হার মেনে নিন। আপনি মেনে নিন যে আপনার পুরুষও বাকি পুরুষদের মতোই নারী লোভী। এক নারীতে আটকে থেকে জীবন কাটিয়ে দেওয়ার মতো পুরুষ নন তিনি। বলেছিলাম, আপনি মেনে নিন সংসারে এত মায়া, প্রেম দিয়েও আপনি পরাজিত। আপনি পারেননি এই পুরুষজাতিকে চিনতে। কিন্তু আপনি মানলেন না৷ আপনি আমাকে আহ্বান করলেন এই খেলায়। আপনি যে খেলায় নতুন আমি সে খেলায় বহুদিন ধরেই বিজয়ী।”
“আমার ভালোবাসার প্রতি অগাধ বিশ্বাস রাখা কি ভুল ছিলো? ভালোবাসলে তো মানুষ বিশ্বাস রাখবেই তাই না? আপনি রাখতেন না আমার জায়গায় থাকলে?”
রানির প্রশ্নে পুনরায় সুরসুন্দরী হাসেন,
“রেখেছিলাম। রেখেছিলাম বলেই আমি আজ কেবল বহু লোকের শয্যাসঙ্গী হয়েছি জীবনসঙ্গীনি আর হতে পারিনি। যা আমি পাইনি তা আমি অন্যকেও পেতে দিবো না। এই পুরুষ জাত ভীষণ নোংরা। এদের কাছে সন্তান, সংসার, ভালোবাসা, মায়া কিছুই নেই। এরা স্বার্থপর। আপনার রাজা চাইলেই আমাকে ছাড়তে পারতেন। তাপসীকে বিবাহ করার শর্তই ছিলো আমাকে রাখা। উনি আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে পারতেন না আমাকে ত্যাগ করতে? অথচ করেননি। বরং সাদরে আরও একটি নারীকেও গ্রহণ করে নিলেন। পুরুষের জীবনে কোনো নারীই একমাত্র হতে পারে না। দেখিয়ে দিলাম আপনাকে। বলেছিলেন আপনি দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল কারণ আপনি রানি। আমি রাতের মতোই অন্ধকার কারণ আমি নর্তকী, গণিকা। দেখুন আজ আপনার রাজার শয়নগৃহে যেই নতুন রানিটি সে-ও গণিকা, নর্তকী। দিনের আলোর সমকক্ষ হয়ে এখন দাঁড়াবে রাতের অন্ধকারও। আর কী চাই আমার? উপভোগ করুন এবার। আমার জয় উপভোগ করুন।”
সুরসুন্দরী খিলখিল করে হাসলেন। তার এই আনন্দ উল্লাসে রানির ভেতরটা ঘৃণায় ভরে গেলো। তিনি বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে সুরসুন্দরীকে চিরদুঃখী হওয়ার অভিশাপও দিয়ে গেলেন।
সুরসুন্দরীর মোটেও কি তাতে কিছু এলো গেলো? যে সাদরে নিজের দুঃখ উদযাপন করছে প্রতিটি দিন তাকে নতুন করে দুঃখের অভিশাপ দিয়ে আর কীইবা হবে?
বৃষ্টি বাড়ল আরও। সাথে বাড়ল রাত। সুরসুন্দরী দাঁড়িয়ে রইলেন বহুক্ষণ একই স্থানে। চোখে ভাসল তার কত দৃশ্য! রাজা কেশবচন্দ্রের পা অব্দি তিনি ধরেছিলেন একটু ভালোবাসা চাওয়ার তৃষ্ণায়। কিন্তু পাননি। তাকে কেবল ভোগ্য বস্তু বানিয়ে ছিলো রাজা। তার দেহজুড়ে কত নোংরা, দুর্নাম, কলঙ্ক লেপে দিয়েছে সেই রাজা। শেষমেশ ছেড়ে দিয়েছেন। সে নিজের নবজাতক শিশুটিকেও তাই ছুঁয়ে দেখেননি। কেন ছুঁয়ে দেখবেন? যেই রাজা কেশবচন্দ্র তার থেকে সব ছিনিয়ে নিয়েছেন সেই রাজার রক্তকে তিনি ছুঁড়ে এসেছেন সেই নরকেই। তিনি যা যা সহ্য করেছেন সেই নবজাতক যেন তা তা-ই সহ্য করে। রাজাকে তিনি ধ্বংস না করতে পারেন, রাজার রক্তের ঐ শিশুকে তো পেরেছেন। যতদিন শিশুটি তড়পাবে ততদিন তিনি শান্তিতে বসবাস করবেন।
—————
রাজপ্রাসাদের চিত্র বদলে গেলো রাজার বিবাহের পরপরই। যেই যেই স্থানে রানির দাপট ছিলো, সেই সেই স্থান অগোচরেই দখল করল তাপসী। লোকচক্ষুতে তাপসী থাকলেও অন্তরালে সেই সমস্ত কিছুই পরিচালনা করছিলেন সুরসুন্দরী। প্রতিদিন একটু একটু করে রানিকে তিনি একা করে দিতে লাগলেন। রানি যতটা একা হতে লাগলেন ততটাই সুরসুন্দরী নিজেকে জয়ী ভাবতে শুরু করলেন।
এক বনে যে দুই রাজা থাকতে পারে না। তাই একজনকে সরতেই হতো। রাজা চর্যাপদকে হারিয়ে সেই খেলাতে ধীরে ধীরে সরলেন রানি নিজেই।
একদিন বসার কক্ষে সকলেই বেশ আনন্দ করে উপস্থিত হয়েছিলো। রাজা চর্যাপদ যেখানটায় বসেন তার পাশেই বসতেন রানি। সেদিন তিনি কিছুটা দেরিতে এলেন সেই কক্ষে। বিমর্ষতায় অতিবাহিত হওয়া দিনগুলোতে তিনি খাওয়া দাওয়ার কথা প্রায় তখন ভুলতেই বসেছেন।
যাবরও উপস্থিত ছিলো সেখানে। তাপসীর সাথে তার আবার বেশ ভাব কি-না! তাপসী ভ্রাতা ডেকেছে তাকে শখ করে।
রানি কক্ষে উপস্থিত হওয়ার পর কিছুটা তাজ্জব বনে গেলেন। তার আসনে আজ বসেছে তাপসী। আয়েস করে বসেছে কেমন!
রানি দাঁড়িয়ে পড়লেন সেখানটাতেই। ধীরে ধীরে সবস্থান থেকে নিজেকে এমন ছিন্ন দেখতে দেখতে আজ বোধহয় সব সীমানা পার করে ফেলেছে সেটি।
সব হারিয়ে ফেলার পর মানুষ যেন প্রলয়ঙ্কারী সমুদ্র হয়ে উঠে। শেষবার এমনই ভয়ঙ্কর হয় যে সমস্ত কিছু তারা নিঃসংকোচে ভেঙে দেওয়ার মতোই শক্তিশালী হয়ে উঠে। রানিও তাই হলেন। তার রাগ, ক্ষোভ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। হুঙ্কার করে উঠলেন তিনি,
“তাপসী, তুমি আমার স্থানে বসার সাহস কীভাবে দেখালে? এতটা আস্পর্ধা পাও কোথায় তুমি? একজন সামান্য গণিকা, নগরের মনোরঞ্জন যার কাজ সে এত সাহস কোথা থেকে পায়? একমাত্র রাজা তোমাকে বিবাহ করেছিলেন বলে আমি কিচ্ছুটি বলিনি। কিন্তু আজ তুমি সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছো। আমার আসনে বসার দুঃসাহস দেখিয়ে তুমি বড্ড ভুল করেছো।”
তাপসী হুঙ্কারে ভয় পেলো। কাঁপলও। কিন্তু উঠল না মোটেও। আসনেই বসে রইল ঠাঁই। রাজা ততদিনে পুরুষত্ব হারিয়ে ফেলেছিলেন। নীরবেই সবেতে সম্মতি দিতেন। এই যে এতক্ষণ তাপসীর বসে থাকাতেও সম্মতি দিয়েছের এখন রানির রাগকেও যেন সম্মতি দিচ্ছেন।
যাবর পাশ থেকে ধীর স্বরে বলল, “রানি, উনিও তো রাজারই অর্ধাঙ্গিনী। তারও তো অধিকার…”
“খবরদার, যাবর। এই ভুল মোটেও করবে না। আমার মুখের উপর কথা বলার অধিকার আমি কাউকে দিইনি। স্বয়ং ক্যামিলাসের রাজাকেও না। তুমিতো সামান্যই।”
রানির এই তুচ্ছজ্ঞান করাতে যাবরের মুখ থমথমে হয়ে এলো। নত মস্তক তার নত হলো আরও।
সেই চিৎকার-চেঁচামেচিতে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে এলেন সুরসুন্দরী। উপস্থিত হয়ে রানির সেই অগ্নিঝরা রূপ দেখে অবাক হলেন। তাপসীকে তিনি ডাকলেন তাই,
“তাপসী, আসন ছেড়ে উঠে আয়। সামান্য আসন নিয়ে এ কী ছেলেখেলা!”
রানি ফুঁসে উঠলেন আরও অধিক। এবার তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল সুরসুন্দরীর উপর। এতটাই রাগ যে তিনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। দেহরক্ষীদের ডাকলেন হাঁক ছেড়ে। দেহরক্ষীরা আসতেই আজ্ঞা ছুঁড়লেন,
“এই দু'টোকে রাজ বৈঠকখানা থেকে বের করো এখুনিই। রাজা ও রাজ্যের জন্য রাজ বৈঠকখানা হলো পবিত্র স্থান। সেখানে কোনো চরিত্রহীন, গণিকার স্থান নেই। এখুনি এদের বের কর।”
সুরসুন্দরী রানির এই তীব্র রাগ আর বাড়াতে চাইলেন না বোধহয়। তাই ধীর-স্থিরেই তাপসীকে পুনরায় ডাকলেন,
“তাপসী, উঠে আয়। আমাকে কতবার বলতে হবে এক কথা?”
“ আমার সাথে মশকরা করছেন? আমার সাথে? এই মেয়েটি এখানে কার আশকারাতে এসে শেকড় গেঁড়েছে তা সবার অবগত। বের হোন এখান থেকে। নয়ত এই রাজপ্রাসাদেও আপনাদের স্থান হবে না।”
সুরসুন্দরী এই উগ্র রানিকে আর আগ বাড়িয়ে কিছু বললেন না। বরং আশ্চর্য হলেন তাপসীর আচরণে। তাপসী তার কথা অব্দি মানছে না? এতটাই সাহস বেড়েছে মেয়েটার!
তিনি কথা না বাড়িয়ে উঠে গিয়ে টেনে নিয়ে এলেন তাপসীকে। এরপর হনহনিয়েই বেরিয়ে গেলেন বৈঠকখানা থেকে। রানি তখনও ফুঁসছেন। চোখ দিয়ে গিলে নিবেন যেন রাজা ও যাবরকে। দাঁত কিড়মিড় করে শাসালেন যাবরকে,
“আমার উপর কথা বলছো। আমি দু'দিন চুপ কি ছিলাম ভেবেছিলে সকলেই আমাকে দাবিয়ে ফেলবে। ভুলে যেও না আমার পিতা এখনও জীবিত। এই রাজ্য আমার পিতা ধূলোয় মিটিয়ে দিতে দুদণ্ড সময় নিবেন না। আমাকে আমার সীমা লঙ্ঘন করতে তোমরা বাধ্য করো না।” শেষের কথাটিতে তিনি রাজাকেও বুঝালেন যেন।
কক্ষের বাহিরে দাঁড়িয়ে ছোটো শিশুটি মায়ের সেই রাগ, সেই অসহায়ত্ব দেখল বরাবরের মতোই
তাপসীকে নিয়ে নিজের শয়নগৃহে এসে প্রায় ছুঁড়ে মারলেন সুরসুন্দরী। এতটাই জোরে যে মেয়েটা ছিঁটকে গিয়ে পড়ল দূরে। ব্যথায় শব্দ করে উঠল।
সুরসুন্দরী গিয়ে বসলেন তার কেদারায়। পায়ের উপর পা তুলে। তাপসীর দিকে মুখ করেই তাকিয়ে রইলেন।
তাপসী মেঝেতে বসে নিজেকে সমালালো। হাতে ব্যথা পেয়েছে ভীষণ।
“কোথা থেকে তুই উঠে এসেছিস সেই পরিচয় আজকাল ভুলতে বসেছিস বোধহয়। তোকে কে এই প্রাসাদে উঠিয়েছে তা-ও মনে পড়ছে না? মনে করিয়ে দিবো? হ্যাঁ? করিয়ে দিবো?”
তাপসী ব্যথায় দাঁতমুখ খিঁচে বসে রইল। সুরসুন্দরীর কথায় উত্তর দিল না মোটেও।
সুরসুন্দরী পুনরায় বললেন,
“যেই আসন আমি দিয়েছি তা আমার ছিনিয়ে নিতে বেশিক্ষণ লাগবে না। আমার এক কথায় রাজ-রাজারা সব ছেড়ে দেয় আর তুই কে? তোকে ছুঁড়ে মারবেন রাজা এক নিমিষেই। তখন তুই বুঝে নিবি তোর স্থান কোথায়। আমার কথার অবাধ্য হোস? এত বড়ো তোর সাহস? তুই ওখানে বসেছিলে কেন? হ্যাঁ?”
এত জোরে সুরসুন্দরী চিৎকার করলেন যে তাপসী গুটিয়ে গেলো। তবুও সাহস সঞ্চয় করে বলল,
“আমিও তো রাজ্যের রানি। আমার কি অধিকার নেই সেই আসনের?”
“অধিকার? আরে রাজার সাথে এক পালঙ্কে শুলেই সে রানি হয় না। রানি হতে যোগ্যতা লাগে। রানি হতে শিক্ষা লাগে। রানি হতে ঐশ্বর্য লাগে। রাজার সাথে শুলেই যদি রানি হতো তাহলে সব গণিকাই রানির স্থান পেতো। আর কোনোদিন আমাকে অমান্য করলে তোর চিহ্নটুকু কেউ খুঁজে পাবে না মনে রাখিস।”
সুরসুন্দরীর শীতল হুঁশিয়ারীর পর আর কথা বাড়াল না তাপসী। চোখগুলো তার জ্বলজ্বল করল কেবল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………