আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৬৫ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          দলছুট মেঘের মতো টুকরো রোদের কণা ঝরে পড়েছে আবছায়া জানালায়। সোনা রঙা রোদে ঝলমল করছে দূরের পাহাড় চূড়া। জানালার কাছে আরাম কেদারায় বসে একমনে বই পড়ছিল মৌনি। মনটা প্রসন্ন। পঞ্চগড় থেকে ফেরার পর যে বিষাদ চারদিক থেকে ল্যাপটে ধরেছিল; শ্রীমঙ্গলের বিশুদ্ধ হাওয়ায় সে বিষাদেরা অবৈতনিক ছুটি নিয়েছে। মৌনি তৃপ্তি নিয়ে বই পড়তে পারছে। চাইলেই রঙের ঝাঁপি খুলে বসতে পারছে। চাইলেই লিখে ফেলতে পারছে অধ্যায়ের পর অধ্যায়। মৌনি বই থেকে মুখ তুলে একবার আয়নার পাশে রাখা ক্যানভাসটির দিকে তাকাল। কাল সারাদিন ধরে এই পেইন্টিংটির সমাপ্তি টেনেছে সে। চায়ের কাপ আর পূর্ণিমার চাঁদকে ঘিরে নানান রঙের মিশেলে এবস্ট্রাকট আর্ট। মৌনি ছবিটির নাম দিয়েছে- ‘When Tea kisses The moon. আঁকার সময় অতো ভাবনাচিন্তা না করলেও আঁকার পর ছবিটি চমৎকার এসেছে। শ্রীমঙ্গল আসার পর থেকে তার রঙতুলিতে আশ্চর্য এক জাদু ভর করেছে। যা আঁকছে তাই মনোমুগ্ধকর হচ্ছে। মৌনি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঢাকায় ফিরে শ্রীমঙ্গলে আঁকা ছবিগুলো একটা এক্সিবিশনে পাঠাবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় খানিকটা পরিচিতি থাকার সুবাদে গুটিকয়েক কপটহীন শুভাকাঙ্ক্ষী তার হয়েছে। তার মধ্যে থেকে কেউ কেউ অনেক বছর ধরে তার আর্টগুলিকে এক্সিবিশনে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করে আসছে। মৌনি সে অনুরোধ গায়ে মাখেনি। নিজের আঁকা নিয়ে অবচেতনেই একটা হীনমন্যতা আছে তার। তার ধারণা, আঁকার উপর কোনোরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া সে যা ছেলেমানুষি আঁকা আঁকে তা নিয়ে আর যাই হোক এক্সিবিশন সম্ভব না। কিন্তু এবার এই সাহসটুকু করে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। মৌনি ক্যানভাস থেকে চোখ সরিয়ে ফের বইয়ে মনোযোগ দিতেই কোথা থেকে দমকা হাওয়ার মতোই উড়ে এলো ছুটকো কোলাহল। মৌনি কান পাতল। বাইরে বাংলোর ছেলেরা হৈ-চৈ করছে। মৌনি উৎসুক মনে বই হাতেই বেরিয়ে এলো ঝুল বারান্দায়। পশ্চিমে, গাছের জটলার ওপাশে ছেলেরা কিছু একটা নিয়ে হাসাহাসি করছে। সকলেই খুব উচ্ছ্বসিত। গাছের নিশ্ছিদ্র দেওয়াল ভেদ করে ওপাশে আহসানকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মৌনিও অসীম কৌতূহলে এগিয়ে গেল সেদিকে। গাছ আর পাহাড়ি ঝোঁপ পেরিয়ে সরু রাস্তা ধরে মৌনিকে হেঁটে আসতে দেখে ঠোঁটে আন্তরিকতার হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো আহসান। কাছাকাছি আসতেই মৌনি জানতে চাইল, 
‘ এখানে কী হচ্ছে?’ 
আহসান আর মৌনি দু'জনেই উচ্ছ্বসিত ছেলেদের দলটির দিকে তাকাল। সেদিকে চোখ রেখেই আহসান বলল,
‘ পাখির ডিম সংগ্রহের প্রস্তুতি চলছে। আজ সন্ধ্যায় পাখির ডিম দিয়ে বিরিয়ানি রান্নার পরিকল্পনা ওদের।’ 
পরিকল্পনাটা মৌনির ভারি অপছন্দ হলো। অসন্তুষ্ট গলায় বলল,
‘ বলছেন কী! সবাই মিলে এরকম একটা নিষ্ঠুর কাজ করতে চলেছে আর আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন? নিষেধ করছেন না কেন?’ 
আহসান বলল,
‘ নিষ্ঠুর হবে কেন?’ 
‘ মা পাখির ডিম পেড়ে অন্যায়ভাবে খেয়ে ফেলবেন, এটা নিষ্ঠুরতা না?’ 
‘ তাহলে তো মুরগীর ডিম খাওয়াও নিষ্ঠুরতা।’ 
মৌনি কটমট করে তাকাল, 
‘ দুটো এক বিষয় নয়।’ 
‘ কোয়েল পাখির ডিমও তো খাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।’ 
মুরগীর ডিম আর কোয়েল পাখির ডিম বানিজ্যিক কারণে বিক্রি করা হয়। অনেকে এসবের খামার বানায়। তার সঙ্গে কি পাহাড়ি বন্য পাখির তুলনা চলে? মৌনি আর তর্ক করতে চাইল না। খানিকটা মন খারাপ নিয়ে বলল, 
‘ প্লিজ, অপ্রগতিশীল মানুষের মতো কথা বলবেন না। আপনাকে আমি ভালো মনে করেছিলাম।’ 
আহসান নির্বিকার গলায় বলল,
‘ আপনি আমাকে ভালো মনে করেছেন কেন? আমি যে ভালো এই ধরনের কিছু তো আপনাকে বলিনি।’ 
আহসানের বক্র শব্দবিন্যাসে মেজাজ তপ্ত হলো মৌনির। এই লোককে যতটা সাধু ভেবেছিল, ততটা সাধু সে নয়। কী রকম মুখের উপর তীর্যক কথা ছুঁড়ে দিলো! মৌনির চোখ-মুখ শক্ত হয়ে যেতে দেখে আহসান প্রসঙ্গ বদলে বলল,
‘ তারপর, লেখকের লেখালেখি কেমন চলছে?’ 
মৌনি থমথমে কণ্ঠে বলল,
‘ লেখালেখি চলছে না। বইগুলো হাতে পেলে আবার লেখা আরম্ভ করবো। আপাতত ছবি এঁকে আর বই পড়ে সময় কাঁটছে।’ 
আহসান এক পলক মৌনির হাতের বইটির দিকে তাকাল। তার হাতে বিভূতিভূষণের লেখা, সুন্দরবনের সাত বছর। আহসান বই থেকে মুখ তুলে বলল,
‘ আশা করছি পরশুর মধ্যে সব বই পেয়ে যাবেন। আপনি চাইলে এই দুইদিন শ্রীমঙ্গল ঘুরে বেড়াতে পারেন। ছোট্ট শহর শ্রীমঙ্গল, ঘুরে দেখতে দুইদিনের বেশি লাগবে না।’ 
মৌনি হাতের বইটা বুকে জড়িয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ ভাবছি সিএনজি ড্রাইভার লোকমান ভাইকে ফোন করবো। উনি গাইড হিসেবে কাজ করবেন। গাইড ছাড়া একা ঘুরে দেখা কঠিন হবে আমার জন্য।’ 
আহসান মৌনির দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে প্রস্তাব দিলো,
‘ আপনি চাইলে আমার সঙ্গে যেতে পারেন। এমনিতেও আমাকে শ্রীমঙ্গল জুড়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। কাজের ফাঁকে আপনাকে বিখ্যাত স্পটগুলোও ঘুরিয়ে আনতে পারব। আপনার ঘোরা, আমার কাজ দুটো একসঙ্গেই হয়ে যাবে।’ 
মৌনি একবার জিজ্ঞেস করতে চাইল, কার মাথার দিব্যিতে আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন শ্রীমঙ্গলজুড়ে? কিন্তু একটু আগের অভিমানে প্রশ্নটা করার প্রয়োজনবোধ করলো না। আহসান ওর চোখে-মুখে উপচে পড়া অভিমান পরখ করে বলল,
‘ আপনাকে কি সবাই খুব আহ্লাদে রাখে?’ 
মৌনি ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল। আহসান খুবই উদ্ভট প্রশ্ন করেছে এমন মুখভঙ্গি করে বলল,
‘ সবাই! সবাই কে? আমি আমাকে আহ্লাদে রাখি। আই অ্যাম মাই ওন এভরিওয়ান।’ 
প্রত্যুত্তরে এই আত্মগুণাভিমানী মেয়েটির দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল আহসান। মেয়েটি আত্মবিশ্বাসী, আত্মাহংকারী, নির্বিক একইসঙ্গে প্রবল অনুভূতিপ্রবণ। আহসান ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ বেশ! তাহলে কাল সকালে তৈরি থাকবেন।’ 

 সকালের মিঠে মিঠে রোদ বোল পালটে রৌদ্রমূর্তি নিয়েছে। প্রচণ্ড গরম। ভ্যাপসা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে চা বাগানের তিতকুটে গন্ধ। মৌনি বই পড়তে পড়তে কখন যে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল টের পায়নি। তন্দ্রা কাটল ফোনের বাজখাঁই আওয়াজে। গরমে চুলের গোড়া ভিজে উঠেছে। মৌনি তন্দ্রালস কাটিয়ে অনুভূতিশূন্য চোখে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে নিরবিচ্ছিন্ন কল আসছে। মৌনির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিলো, ফোনটা তুললেই শাওনের গলার স্বর শুনতে পাবে। বহুদিন শাওনের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। মৌনিরই যোগাযোগ রাখার ইচ্ছে হয়নি। আজ কী মনে করে ফোনটা তুলল। পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা হবার একটা আনন্দও হলো বুকের ভেতর। মৌনি যতটা উচ্ছ্বাস নিয়ে জানতে চাইল, 
‘ আরে শাওন! কেমন আছো?’ 
শাওন ততটাই নির্লিপ্ত গলায় বলল,
‘ ভালো আছি। আমাকে একটা সাহায্য করতে পারবে মৌনি?’ 
শাওনের কণ্ঠে ভীতি। এতোদিন বাদে ফোন করেই সরাসরি সাহায্য চেয়ে বসায় কিছুটা বিভ্রান্ত হলো মৌনি। মনোক্ষুণ্ণও হলো সম্ভবত। জানতে চাইল, 
‘ কী রকম সাহায্য?’ 
শাওন একটু ইতস্তত করে বলল,
‘ আমার হয়ে সৌমিকে একটা কল করতে পারবে, মৌনি? কল করে বলবে, তোমার আর আমার মধ্যে কাজিনের বাইরে কোনো সম্পর্ক নেই। সৌমি সন্দেহ করছে তোমার সঙ্গে আমার গোপন সম্পর্ক আছে। আমি কিছুতেই ওকে বিশ্বাস করাতে পারছি না।’ 
অপমানে মৌনির ভেতরটা ঝনঝন করে উঠল। গোপন সম্পর্ক বলতে কী বুঝাতে চাইছে সৌমি? তাদের দু'জনের সম্পর্কের কথা জানা সত্ত্বেও সে শাওনের সঙ্গে একটা নিষিদ্ধ সম্পর্ক তৈরি করেছে, এটা? গোপন সম্পর্ক বলতে তো এরকমই বুঝাচ্ছে। মৌনিকে নিয়ে যার এতো নীচ ধারণা তাকে ফোন করে মৌনি নিজের চরিত্রের সাফাই গাইবে? এতো আত্মসম্মানহীন মৌনি? মৌনি চোয়াল শক্ত করে কঠিন গলায় বলল,
‘ সৌমিকে বলোনি, আমি অন্যকারো সঙ্গে কমিটেড?’ 
শাওন বলল,
‘ বলেছি। কিন্তু তারপরও ও বিশ্বাস করছে না। তুমি যদি একটু ফোন করে এক্সপ্লেন করতে।’ 
মেজাজ গরম হলো মৌনির। শাওনের স্পর্ধা দেখে সে বিস্মিত। তার প্রেমিকার সাহস কী করে হয় মৌনিকে নিয়ে এতো নীচ চিন্তা করার? সে আরেকজনের সঙ্গে কমিটেড হয়ে তার প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে চাইবে? এতো নীচ তার চরিত্র? মৌনির কণ্ঠের শীতলতা টের পেয়ে শাওন বলল,
‘ প্লিজ মৌনি। খুব বিপদে না পড়লে আমি তোমাকে অনুরোধ করতাম না।’ 
মৌনি থমথমে গলায় বলল,
‘ যে আমাকে নিয়ে এরকম ধারণা রাখে। তার কাছে নিজেকে নিয়ে এক্সপ্লেনেশন দেওয়াই তো আমার জন্য অপমানজনক শাওন। তোমার প্রেমিকা আছে জানার পরও আমি তোমার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক কেন তৈরি করবো? ভাবতেই তো ঘেন্না হচ্ছে, ছি!’ 
শাওন বলল,
‘ সেটা আমি বুঝতে পারছি। সৌমি বুঝতে পারছে না। ওর মাথা ঠিক নেই। তুমি ওকে একটু কল করো। এই সাহায্যটুকু আমাকে করো। প্লিজ!’ 
পুরোনো বন্ধুর কাতর অনুরোধ ফেলতে পারল না মৌনি। অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো বাধ্য হয়েই রাজি হলো। বলল, সৌমির ফোন নাম্বারটা পাঠাতে। তৎক্ষনাৎ দুটো মোবাইল নাম্বার পাঠাল শাওন। নাম্বার দুটোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তীব্র অনিচ্ছা নিয়ে একটি নাম্বারে কল করলো মৌনি। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর সৌমিকে ফোনে পাওয়া গেল। মৌনি সালাম দিয়ে কোমল গলায় বলল,
‘ সৌমি বলছেন? আমি মৌনি।’ 
রিনরিনে, বিষণ্ণ মধুরতায় সালামের জবাবটা নিলেও মৌনির পরিচয় পেয়ে বদলে গেল সৌমির কণ্ঠস্বর। রুক্ষ গলায় বলল,
‘ আপনি! আপনি আবার কোন নাটক করতে ফোন করছেন?’ 
প্রথম পরিচয়েই এরকম আক্রমণ পেয়ে থমকে গেল মৌনি। তার সঙ্গে কেউ কোনোদিন এরকম করে কথা বলেনি। তারপরও মৌনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ফোন করার আগে সে মেয়েটির দিক থেকে গোটা ব্যাপারটা ভেবেছে। তার জায়গায় দাঁড়িয়ে তার ব্যবহার খুব একটা অন্যায্য নয়। মৌনি মৃদু হেসে বলল,
‘ আপনার রাগ আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার সম্পর্কে আপনার বোধহয় কোনো মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে, সৌমি। আপনি আমাকে চিনেন না। আমাকে ভালো করে জানলে বুঝতেন, আমি একদমই ওই ধরনের মেয়ে নই। যেমনটা আপনি ভাবছেন।’
 মৌনির চমৎকার বাচনভঙ্গির কারণে নাকি অন্য কোনো কারণে জানা নেই সৌমি হঠাৎই শান্ত হয়ে গেল। বিষণ্ণ গলায় বলল,
‘ আই এ্যাম সরি, আপু। আমি আসলে খুব ডিস্টার্বড এজন্য এরকম ব্যবহার করে ফেলেছি। আপনাকে আমি চিনি। আমি জানি আপনি ওরকম নন।’ 
মৌনি বলল,
‘ দেখুন সৌমি, অতীতে হয়তো শাওনের দিক থেকে আমার প্রতি একটা ভালো লাগার মতো ব্যাপার ছিলো। এটা একদমই ভালোবাসা নয়। একসঙ্গে বড় হলে কাজিনদের মধ্যে এরকম ইনফ্যাচুয়েশন তৈরি হয়। আমিও হয়তো কিছুটা প্রশ্রয় দিয়েছিলাম একসময়। কিন্তু আপনার সঙ্গে শাওনের সম্পর্কের কথা জানার পর শাওনের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগই নেই। কারো সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি হবো এরকম ব্যক্তিত্বহীন আমি নই। আপনি বিশ্বাস করতে পারেন, আমি আপনাকে মিথ্যা বলছি না।’ 
সৌমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ আমি আপনাকে বিশ্বাস করছি। কিন্তু চোখের সামনে যে প্রমাণগুলো দেখেছি সেগুলো কী করে অবিশ্বাস করি আপু? শুধু যদি আপনার ব্যাপারটা দেখতাম আমি মেনে নিতাম। আমি জানি শাওন আপনার প্রতি দুর্বল ছিলো। কিন্তু বাকিসব!’ 
বলতে বলতে রুদ্ধ হয়ে গেল সৌমির কণ্ঠস্বর। ধরা গলায় বলল,
‘ আমি আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না, আপু। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।’ 
মৌনি ভারি মায়া বোধ করলো। জিজ্ঞাসা করলো, 
‘ কী হয়েছে? কী করেছে শাওন?’ 
‘ বিশ্বাস করুন? এতোদিন ঝগড়া-ঝামেলা যাই হোক না কেন? আমি শাওনকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছি। কিন্তু সেদিন আমি ওর পুরোনো দুটো পেনড্রাইভে আর মোবাইল পেয়েছি। পেনড্রাইভ ভর্তি আপনার ছবি। আপনার স্কুল জীবনের ছবি থেকে শুরু করে বর্তমান কোনো ছবিই বাদ রাখেনি ও। আপনাদের মধ্যকার সাত-আট বছর আগের চ্যাটের স্ক্রিনশট ও যত্ন করে রেখে দিয়েছে। ফোনে কয়েক মাস আগেও আপনার সঙ্গে ওর আবেগঘন ম্যাসেজ। অথচ ওর সঙ্গে আমার আড়াই বছরের সম্পর্ক। এগুলো দেখে আমার ঠিক থাকা সম্ভব? আমি ওকে এসব নিয়ে চার্জ করলে ও আমাকে মুখের উপর বলে, আমি ওর প্রথম ভালোবাসা নই। আপু আপনি বলুন, আড়াই বছরের প্রেমের সম্পর্কের পর কোনো প্রেমিকা তার প্রেমিকের কাছে এই উত্তর আশা করে?’ 
তাদের এই বিষাদকথনে প্রচ্ছন্নভাবে সে নিজে জড়িয়ে থাকায় ভীষণ বিব্রত বোধ করলো মৌনি। কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। সৌমি বলল,
‘ এসব নিয়ে ঝামেলা হলে এক পর্যায়ে ও কার্জনের সামনে আমার গায়ে হাত তুলে। হ্যাঁ, আমার দোষ ছিলো। আমারও মাথা ঠিক ছিলো না। আমিও ওকে মেরেছি।’ 
তারপর ধীরে ধীরে সেদিনের সমস্ত ঘটনা খুলে বলল সৌমি। সৌমির অসুস্থতায় শাওনের কটাক্ষে বিস্মিত হলো মৌনি। এই শাওন তার দেখা শাওনের একদম বিপরীত। সৌমি এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলে বলল,
‘ শুধু আপনি ঘটিত ব্যাপার হলে আমি মেনে নিতাম আপু। আমি তো জানতাম, ও আপনার প্রতি কত দুর্বল ছিলো। কিন্তু ওর পুরোনো ফোনে অসংখ্য মেয়ের সঙ্গে ফ্লার্টের চিত্র। অথচ তখনও আমরা সম্পর্কে ছিলাম।’ 
মেয়েদের সঙ্গে ফ্লার্টের ব্যাপারে অবাক হলো না মৌনি। শাওন যে মেয়েদের সঙ্গে ফ্লার্ট করে এই ব্যাপারে মৌনি অবগত। কত কত দিন গেছে দুইজন এইসব নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি করেছে। সৌমি যেন সুযোগ পেয়ে আড়াইবছরের জমানো বিষোদগার ঢেলে দিলো মৌনির কাছে। শাওন যে সুযোগ পেলেই কত গালিগালাজ করে সে কথা জানাল। মৌনি এতেও বিস্মিত হলো না। শাওন নিজেই একদিন বলেছিল, তার অনেক রাগ। রেগে গেলে তার ভাষার ঠিক থাকে না। মৌনি এই নিয়ে অনেক চাপাচাপি করলেও শাওন তার সামনে কোনো খারাপ কথা উচ্চারণ করতে পারিনি বলে মৌনি ভেবেই নিয়েছিল শাওন নিষ্পাপ। 
‘ আপনি জানেন? শাওন আমাদের দ্বিতীয় সাক্ষাতের সময় হোটেল রুম বুক করেছিল। আমি ব্যাপারটা জেনে ভয়ে অপমানে কেঁদে ফেললে শাওন বিষয়টা চেপে যায় আমাকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে। এবং আমি বোকা সেটা মেনেও নেই।’ 
মৌনি এবার বিস্মিত হলো। শাওন এরকম কোনো কাজ করতে পারে বিশ্বাস হতে চাইল না বলেই হতবাক কণ্ঠে বলল,
‘ কী বলছেন!’ 
সৌমি হু হু করে কেঁদে ফেলে বলল,
‘ আমি ওকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করেছিলাম আপু। আমি পাগল ছিলাম, বোকা ছিলাম। ওর পেনড্রাইভের সমস্ত ডকুমেন্টস আমি কপি করে নিজের কাছে রেখেছিলাম। কালকে ঘাটতে গিয়ে দেখি আমাদের প্রেমের সেই সময়টা নিয়ে ওর বন্ধুদের সাথে ওর উচ্ছ্বসিত কথোপকথন। বন্ধুদের গ্রুপে আমাকে নিয়ে, আমার শরীর নিয়ে নানান ফ্যান্টাসির কথা। এসব আমাকে দেখতে হয়েছে আপু! আপনি ভাবতে পারছেন, আমাকে নিয়ে ওর চিন্তা কেমন ছিলো? ওর উদ্দেশ্য কী ছিলো? সেদিন সত্যিই হোটেলে সময় কাটালে ওদের আলোচনার বিষয়বস্তু কী হতো? যে বন্ধুদের সঙ্গে ওর প্রেমিকা পরিচয়ে অসংখ্যবার স্বতঃস্ফূর্ত দেখা করেছি, কথা বলেছি তাদের সঙ্গে ও একসময় আমাকে নিয়ে এরকম নোংরা আলোচনা করেছে! ভাবলেই আমার গা ঘিনঘিন করছে। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমি কী করবো আপু? আমার তো মরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।’ 
মৌনি এবার স্তব্ধ হয়ে গেল। ছেলেবেলা থেকে দেখা আসা নরম, কোমল, সরল শাওনের এই রূপ সে বিশ্বাস করতে পারল না। অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
‘ শাওন সত্যিই এই কাজটা করেছে! সত্যিই?’ 
সৌমি প্রত্যুত্তরে সশব্দে কাঁদতে লাগল। মৌনির বিশ্বাসের পৃথিবীটা যেন চুরমার হয়ে গেল। মানুষ এরকমও হয়? এতো রূপও মানুষের থাকে? মৌনি বুকের ভেতর চূর্ণ বিচূর্ণ হওয়ার ধ্বনি নিয়ে বলল,
‘ তুমি ওর সঙ্গে এখনও সম্পর্ক রেখেছ কেন সৌমি?’ 
সৌমি সেকথার উত্তর দিলো না। তার ফোনে সম্ভবত ক্রমাগত কল আসছে। সৌমি একটু নীরব থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
‘ আমি শাওনের নাম্বার ব্লক করেছি। ও বারবার ওর বন্ধুদের দিয়ে কল দেওয়াচ্ছে। আপু, প্লিজ ওকে বলুন এখন যেন আমাকে কেউ কল না করে। এদের কলে আমি আরও ভেঙে যাচ্ছি। আমার নিজেকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। আপু, আমার বোধহয় মরে যাওয়াই উচিত। আমি এতো গাধা, এতো বোকা! এতো অন্ধ আমি! এতো অন্ধ ভালোবাসার বিনিময়ে আজ আমি স্লাট! আপু আমি কী করবো? আপনি বলে দেন আমাকে!’ 
মৌনি বাক্যরহিতের মতো চুপ করে রইলো। সৌমি ওপাশে পাগলের মতো কাঁদছে। ওর কান্নার শব্দে মৌনির চোখ ভিজে আসতে চাইছে। শাওনের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে এসে এই মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। মৌনি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে বলল, 
‘ তুমি এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসো সৌমি। যে তোমাকে সম্মান করে না, তার প্রতি কীসের ভালোবাসা? ভালো তো বাসতে হয় আগে নিজেকে। যা হয়ে গিয়েছে তা হয়েছে। এখন নিজের সঙ্গে জাস্টিস করো। আমি বুঝতে পারছি না, এতোকিছুর পরও তুমি কেন এই সম্পর্কে আছো?’ 
সৌমি প্রত্যুত্তরে কেবল আচ্ছন্নের মতো কাঁদল। ফোন রাখার পর মৌনি কলের পুতুলের মতো স্থির বসে রইল। জগৎ দুনিয়া তখন দুলছে। একটা চেনা মানুষের মুখোশ উন্মোচনে এই পৃথিবীর মুখোশটাই যেন বদলে গিয়েছে। মৌনির ঝিম ধরা ভাবনার মাঝেই শাওনের ফোন এলো। মৌনি যন্ত্রের মতো ফোনটা রিসিভ করলো। শাওন জানতে চাইল, 
‘ সৌমিকে বলেছ মৌনি? সৌমি বিশ্বাস করেছে?’ 
মৌনি সে কথার উত্তর না দিয়ে নিস্পৃহ গলায় জানতে চাইল, 
‘ সৌমি যা বলেছ তা কি সত্য? তুমি কি আসলেই ওরকম শাওন? ওই হোটেল, বন্ধুদের আলোচনা সব সত্য?’ 
শাওন থমকে গেল। কয়েক সেকেন্ড নিশ্ছিদ্র নীরবতার পর বলল,
‘ হ্যাঁ, সত্য।’ 
মৌনি আর কথা বলার শক্তি পেল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ এখন সৌমিকে ডিস্টার্ব করো না, শাওন। ওকে একটু সময় দাও। ও নিজেকে সামলে নিক। বারবার ফোন দিয়ে ওকে বিরক্ত করো না।’ 
শাওন ভীত গলায় বলল,
‘ যদি ও সুইসাইড করে বসে, মৌনি?’ 
মৌনি সে কথার উত্তর দিলো না। নিষ্প্রাণ গলায় বলল,
‘ তুমি আমাকে আর কখনো ফোন দিও না, শাওন। তোমার নতুন রূপ আমি মেনে নিতে পারছি না। আর কোনোদিন ফোন দিও না।’ 
শাওন কিছুক্ষণ নীরব রইল। বেশকিছুক্ষণ সময় নিয়ে ওপাশ থেকে ভেসে এলো কেবল একটাই শব্দ, 
‘ আচ্ছা।’ 

—————

 গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর। চিরচেনা কাকটা ফের এসে বসেছে ছাদের পাঁচিলে। একটু পর পর তারস্বরে ডেকে হাঁকডাক ফেলে দিচ্ছে। নাহিদ জানালার পাশের টেবিলে বসে উদাম শরীরে বই পড়ছে। গরমের তাণ্ডবে গায়ে জামা রাখা মুশকিল৷ নাহিদ বই থেকে মুখ তুলে ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে কাকটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টি ঘোলাটে, যেন মাথায় গভীর কিছু চলছে। নাহিদের এই স্থবিরতার মাঝেই ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল সৌধ। হাতে পরোটা আর ভাজির প্যাকেট। খাবারটা টেবিলের উপর রেখে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ফ্যানের সামনে বসল। ছাদের ঘর ; ফ্যানের হাওয়া থেকেও যেন আগুন বেরুচ্ছে। সৌধ বিরক্ত হয়ে বলল, 
‘ বাসাটা চেঞ্জ করতে পারিস না, বাল!’
নাহিদ কিছু বলল না। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে সে পুনরায় ফিরে গিয়েছে বইয়ের পাতায়। নাহিদের ছোট্ট ঘরের একপাশটা বোঝাই হয়ে গিয়েছে নানান ধরনের বইয়ে। দিন-রাত এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করে, ম্যাগাজিনের কাজ সামলেও কী করে যেন আজকাল বই পড়ার সময় বের করে ফেলছে নাহিদ৷ প্রচুর পড়াশোনা করছে। হঠাৎ তার এই পরিবর্তনের কারণ ধরতে পারছে না সৌধ। সৌধ একটু ঠান্ডা হয়ে টেবিলের দিকে তাকাতেই দেখল একটা এঁটো টিফিন বাটি। তাতে অর্ধেক পরোটা, তরকারি। সৌধ এগিয়ে গিয়ে বাটিটা তুলে জিনিসটা ভালো করে পরখ করে ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ জিনিসটা কী?’ 
নাহিদ মুখ না তুলেই বলল,
‘ আলুর পরোটা আর গরুর মাংস।’ 
নাহিদের বলতে দেরি হলেও সৌধর মুখে পুরতে দেরি হলো না। গাল ভরে নিয়ে আয়েশ করে চিবোতে চিবোতে বলল, 
‘ কোথা থেকে আনালি? আমাকে আগে বললে ফাও রুটি কিনে আনতাম না।’ 
নাহিদ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে নির্বিকার গলায় বলল,
‘ আনাইনি।’ 
থমকে গেল সৌধ। সন্দিহান গলায় বলল,
‘ তাহলে?’ 
‘ দিয়ে গেল।’ 
‘ কে?’ হতভম্ব গলায় প্রশ্ন করলো সৌধ। 
নাহিদ এবার চোখ তুলে তাকিয়ে চোখে হাসি নিয়ে সিঁড়ির দিকে ইশারা করলো। সৌধ তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলে বলল,
‘ ওই চিঠিওয়ালী? তোর থেকে তিনটা বাচ্চা চাওয়া মেয়েটি?’ 
ওর সম্বোধন শুনে হেসে ফেলল নাহিদ। সৌধ বাকি পরোটা শেষ করায় মনোযোগ দিয়ে আফসোসের গলায় বলল,
‘ আহারে! সরল মেয়েটা! সে কী আর জানে, যতোই পরোটা খাওয়াক তোর সময় তো ওই ছয় মিনিট। ওই ছয় মিনিটে ছানাপোনা আসা দুঃসাধ্য!’ 
নাহিদ মুখ তুলে খুব খারাপ একটা কথা বলতে গিয়েও নিজেকে সংবরণ করলো। সৌধ ওর পলিশ করা মেদহীন ঝরঝরে শরীরটা একবার পরখ করে দেখে বলল,
‘ এই সুন্দর চেহারা দেখিয়ে আর কত মেয়েদের সর্বনাশ করবি বল তো? আজ আবার জামাকাপড় খুলে বসে আছিস। মেয়েটা এসে এমনই দেখেছে?’ 
নাহিদ এবার একটু লজ্জা পেল। দরজা উন্মুক্ত ছিলো। মেয়েটা হুট করেই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। নাহিদ হঠাৎ তার ঘরে কোনো নারীকে আবিষ্কার করে এতোই অপ্রস্তুত হয়েছিল যে টি-শার্ট পরার সময় পায়নি। নাহিদের মুখের অপ্রতিভ ভাব দেখে মন্তব্য করার প্রস্তুতি নিতেই টেবিলে পড়ে থাকা আইইএলটিএস এর বইয়ের উপর চোখ পড়ল সৌধর। খাবারের বাটিটা নামিয়ে বইটা হাতে নিয়ে অবাক কণ্ঠে বলল,
‘ তুই আইইএলটিএস দিচ্ছিস নাকি?’ 
নাহিদ বইটির দিকে এক নজর তাকিয়ে বলল,
‘ দিচ্ছি না। দিবো ভাবছি। চিন্তা করছি, গ্রাজুয়েশনটা শেষ হলে মাস্টার্সটা দেশের বাইরে থেকে করার চেষ্টা করবো।’ 
সৌধ বজ্রাহতের মতো স্তব্ধ হয়ে বলল,
‘ তুই চলে গেলে ম্যাগাজিনের কী হবে? এতো পরিশ্রম করে মাঝপথে ছেড়ে দিবি এটাকে?’ 
নাহিদ হেসে বলল,
‘ ধুর পাগল! যাব বলেছি বলে আজকেই যাচ্ছি নাকি। গ্রাজুয়েশন শেষ হতে আরও মাস ছয়েক বাকি। তাছাড়া কিছু সেভিংসও দরকার। এক দুই বছর পর আস্তেধীরে যাব। ততদিনে ম্যাগাজিন দাঁড়িয়ে যাবে। আর আমি তো সারাজীবনের জন্য যাচ্ছি না। ডিগ্রিটা নিয়েই ফিরে আসব। সেই প্রস্তুতিস্বরূপ এখন থেকেই ম্যাগাজিনটাকে ওভাবে তৈরি করবো, ওরকম লোকই নিয়োগ করবো যেন আমি দূরে গেলেও খুব একটা অসুবিধা না হয়।’ 
সৌধর মন মানলো না। নাহিদকে ছাড়া দিনগুলো ভেবেই কেমন পানসে লাগল জীবন। মন খারাপ করা গলায় বলল,
‘ এখানেই ভালো একটা ইউনিভার্সিটি দেখে মাস্টার্স করে ফেল না? বাইরে যেতে হবে কেন?’ 
 সৌধর মন খারাপের বহর দেখে নাহিদ হেসে ফেলে বলল,
‘ এজন্য তোকে আমার বউ বলি, শালা। কবে গ্রাজুয়েশন শেষ হবে, আইইএলটিএসে ভালো স্কোর হবে কিনা, বাইরের ইউনিভার্সিটিতে ফুল স্কলারশিপ পাবো কিনা কোনোকিছুর ঠিক নেই আগেই মন খারাপ করে বসে আছিস।’ 
সৌধ শ্রাগ করে বলল,
‘ ওসব যে তোর হবে আমি জানি। একবার মন থেকে চাইলেই পারবি। আর তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে, মন থেকেই চাচ্ছিস।’ 
নিজের প্রতি সৌধর এরকম সংশয়হীন আত্মবিশ্বাস দেখে হাসল নাহিদ। দুষ্টুমি করে বলল,
‘ মন খারাপ করিস না। গেলে বউ নিয়েই যাব। তুইও প্রিপারেশন নে। দুজনেই বাইরে থেকে মাস্টার্সটা করে আসি।’ 
সৌধ কথাটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘ ধুর! আমাকে দিয়ে ওসব হবে না। এতো কম্পিটিশনে আমি টিকতে পারব না।’ 
‘ চেষ্টা করলেই হবে। না হওয়ার তো কিছু নেই। যারা টিকে যাচ্ছে তারাও আমাদের মতোই মানুষ। তারা পারবে আমরা কেন পারব না, এটা দেখার জন্য হলেও তো চেষ্টা করে দেখা উচিত।’ 
সৌধ ঠোঁট উল্টে বলল,
‘ বাইরে মাস্টার্স করে লাভ কি হবে, ভাই?’ 
নাহিদ গম্ভীর গলায় বলল,
‘ অনেক লাভ হবে, সৌধ। অনেক লাভ। আমি একটা বিষয় বুঝেছি, এই জীবনে জ্ঞানের ব্যাপারে কারো উপর নির্ভর করতে নেই। জ্ঞানকে কুক্ষিগত করতে পারলেই কেবল জীবনের সব রহস্য ভেদ করা সম্ভব।’ 
সৌধ বন্ধুর কথা কতটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারলো বুঝা গেল না। তবে খানিকটা সময় অন্যমনস্ক মুখে বসে রইল। নাহিদ উঠে এসে বন্ধুর কাঁধ চাপড়ে দিয়ে বলল, 
‘ লেটস্ ক্রাশ ইট, দোস্ত।’ 
সৌধ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
‘ বেশ তো, চল।’ 
সৌধর বলার ধরনে মনে হলো, এ আর এমন কী? বাড়ির কাছের বাজারে বেঁচা মোয়া। বন্ধু চাইলে অতোটুকু পথ সে অনায়াসে পাড়ি দিবে। দিতেই হবে। বন্ধু চাইলে কী না করা যায়? প্রত্যুত্তরে নাহিদ তার মুখের দিকে তাকিয়ে নির্ভরতার হাসি হাসল। 

—————

কিছুদিন ছুটি কাটিয়ে ফের কাজের সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছে মিথি। হাতে কিছু বিজ্ঞাপনের কাজ আছে । তার মধ্যেই একটা থ্রিলার সিরিজ নিয়ে কাজ শুরু করতে চাইছে সে। সারাদিন বিজ্ঞাপনের কাজ করে রাতভর স্ক্রিপ্টে সময় দিতে হচ্ছে। প্রথম কয়েকদিন বাড়িতে ইফতার করলেও এরপর আর এগারোটার আগে বাড়ি ফেরা সম্ভব হয়নি তার। মাথার উপর এখন মালিকপক্ষের হুঙ্কার নেই। মিথি চাইলেই শুটিং প্যাক-আপ করে বাড়ি ফিরতে পারে ইফতারের আগে। কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত আবেগের কারণে কাজের কোনো ক্ষতি করতে রাজি নয় সে। একটা দিন শুটিং বাড়ানো মানে দ্বিগুণ খরচা। সামান্য আবেগের জন্য পয়সা, সময় কোনোটির অপচয়ই মিথি বরদাস্ত করতে পারে না। আজও শুটিং শেষ হতে হতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। হৃদয় মিথির আশেপাশে একটু গাঁইগুঁই করলেও তার কঠিন দৃষ্টির সামনে কিছু বলার সাহস পেল না। সেটেই শুটিং টিমের সকলের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হলো। তাদের আজকের শুটিংয়ে কাজ করছে লাক্স তারকা মুমতাহিনা। মেয়েটি সারাদিন মুখে মেকাপ ঘঁষলেও আচরণ ভালো। অন্যান্য তাড়কাদের মতো সর্বক্ষণ আহ্লাদে রাখতে হচ্ছে না। তারপরও তার জন্য আলাদা নাস্তার ব্যবস্থা করতে বলল মিথি। তাদের আজকের শুটটা চলছিল এফডিসিতে। মিথি সমস্ত কাজ শেষ করে, সকলকে বিদেয় দিয়ে যখন বেরুলো তখন রাত্রি নয়টা বাজে। আকাশের অবস্থা যথেষ্ট খারাপ। সারাদিন গুমোট গরমের পর এখন ঠান্ডা হওয়া ছাড়ছে। যেকোনো সময় শুরু হবে বৃষ্টি। মিথি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে। হৃদয় কয়েকটি ফাইল হাতে তার পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। মিথি মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? অনেক রাত হয়েছে, চলে যাও।’ 
হৃদয় মিনমিন করে বলল,
‘ আকাশের অবস্থা তো ভালো না আপু। আপনাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসি?’ 
মিথি প্রত্যুত্তর করার আগেই এফডিসি থেকে বেরিয়ে এলো সাফাত আর তার এসিস্ট্যান্ট। রাস্তার পাশে তার গাড়িটা হেডলাইট জ্বেলে অপেক্ষা করছে। মিথি এতোক্ষণ লক্ষ্য করেনি। সাফাত দ্রুত পায়ে চলতে চলতে আবছা অন্ধকারে মিথিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়াল। মিথির পরনে রোজকার মতো শাড়ি। আজকাল মেয়েটা নিয়মিত শাড়ি পরে। চেহারায় পুরোনো ক্লান্তি থাকলেও চোখে একটা দ্যুতি এসেছে। চেহারায় অদ্ভুত এক লাবণ্য ঝলমল করে সর্বক্ষণ। সাফাতের এখানে একটা শুটিংয়ের কাজ ছিলো। হাওয়ায় ভাসা খবরের মতো শুনেছিল, মিথির শুটিংও এখানের একটি ফ্লোরেই হচ্ছে। সাফাত এগিয়ে গিয়ে বলল,
‘ কী অবস্থা মিথি? কেমন আছো?’ 
সাফাত 'আপনি' থেকে কবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে 'তুমি'-তে নেমে এসেছে খেয়াল করেনি মিথি। সে হেসে বলল,
‘ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন ভাইয়া?’ 
সাফাত নির্মল হেসে বলল,
‘ চমৎকার আছি। তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে আরও ভালো হয়ে গেলাম। শুনলাম নতুন একটা কাজ ধরতে চাইছ?’ 
মিথি প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসল। সাফাত জানতে চাইল, 
‘ আমি সুযোগ পাবো নাকি পাবো না?’ 
মিথি ইতস্তত করে বলল,
‘ আপনার যা ব্যস্ত শিডিউল! তাছাড়া আপনি করতে পারবেন এরকম ডাইনামিক ক্যারেক্টার সম্ভবত এই গল্পে থাকবে না ভাইয়া।’ 
সাফাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ চরিত্র থাকবে না? নাকি তুমি আমাকে নিতে চাচ্ছ না?’ 
‘ কী যে বলেন না ভাইয়া!’ 
ছদ্ম হেসে কথাটা বলে প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল মিথি। সাফাতের সঙ্গে নাম জড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনো যে উত্তেজনা চলছে সে ব্যাপারটা খেয়াল করে সচেতন মস্তিষ্কেই সাফাতকে এড়িয়ে চলতে চাইছিল সে। কাজের বাইরে অযথা লাইমলাইট বা আলোচনার বিষয়বস্তু হওয়া তার একেবারেই পছন্দ নয়। সাফাত তাকে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
‘ বাড়ি ফিরছ? চলো, তোমাকে পৌঁছে দেই।’ 
মিথি তৎক্ষনাৎ আপত্তি করে বলল,
‘ না, না। তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি যাব কলাবাগান। আপনাকে শুধু শুধু কষ্ট করে ওদিকে যেতে হবে না। আমি একটা রিকশা বা সিএনজি পেলেই চলে যাব। আপনি চলে যান, ভাইয়া।’ 
তারপর হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ তুমিও যাও হৃদয়। আর অপেক্ষা করে থেকো না।’ 
হৃদয় দ্বিধা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মিথিকে এই রাতে একা ফেলে যেতে মন সায় দিচ্ছে না। সাফাত একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ আবহাওয়ার অবস্থা বিশেষ ভালো না। আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। কলাবাগান যেতে খুব একটা সমস্যা হবে না। চরিত্রে না নিলেও , বাসায় পৌঁছে দিতে দাও এটলিস্ট। নাকি আমি তারও যোগ্য না?’ 
এভাবে বললে নিষেধ করা দুষ্কর। মিথি খুব অপ্রস্তুত বোধ করলো। হৃদয়কে বিদায় দিয়ে চোখে মুখে বিব্রতভাব নিয়ে গাড়িতে উঠল৷ মিথি গাড়িতে উঠতেই আকাশ ছাপিয়ে বর্ষা নামল। গাড়ির ভেতর কোমল আলোয় মিথির মুখটি ফুটন্ত ফুলের মতোই মনোহর দেখাচ্ছে। যেন ভরা বর্ষায় সদ্য ফোটা কদম। ওই কুসুম কোমল মুখের দিকে তাকিয়ে এই কালবৈশাখের ঝড়ও সাফাতের কাছে দারুণ উপভোগ্য মনে হলো। মিথিকে নীরবে বাইরে তাকিয়ে থাকতে দেখে সেও কিছুক্ষণ খুশি মনে বাইরের বর্ষণ দেখল। জানতে চাইল, 
‘ বৃষ্টি বোধহয় তোমার খুব পছন্দ?’ 
মিথি ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে মৃদু হাসল। বৃষ্টি কোনোদিনই পছন্দ ছিলো না তার। কিন্তু এই অপছন্দের বৃষ্টিতেই সাব্বিরের সঙ্গে তার যত দেখা, যত কথা। মিথির কাছে এখন বৃষ্টি মানেই সাব্বিরের দেওয়া কদম। আর কদম মানেই ওই দিঘি চোখের ছেলেটা। 

মিথি যখন সাব্বিরের কলাবাগানের বাড়িটির সামনে এসে পৌঁছাল তখন ঘড়িতে প্রায় দশটা বাজে। বিদ্যুৎ নেই। অন্ধকার মাথায় নিয়ে রাস্তার ধারে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। নিরবিচ্ছিন্ন বৃষ্টিতে জল জমে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। সাফাত একবার চাইল তাকে ভেতর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে। মিথির নিষেধ আর জলের ফোয়ারায় ইচ্ছেটা বেশিক্ষণ টিকলো না। মিথি গাড়ি থেকে নেমে সাফাতকে বিদায় দিয়ে মূল ফটক পর্যন্ত আসতেই ভিজে গেল বেশ খানিকটা। রাস্তা থেকে বাড়িটা নিঝুমপুরি মনে হলেও দক্ষিণের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গাড়ির হেড লাইটের আলোয় রাস্তার এই দৃশ্যটা স্পষ্ট দেখতে পেল সাব্বির। বৃষ্টি শুরু হতেই মিথির অপেক্ষায় অধীর হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলো সে। বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করেছে, মিথির ফোন নাম্বারটা তার কাছে নেই। মিথিকে ছুটে গেইটের ভেতর ঢুকতে দেখেই বারান্দা থেকে সরে গেল সাব্বির। মিথি সাফাতের সঙ্গে ফিরেছে এই মন খারাপটা গিলে ফেলে একটা মোম নিয়ে এগিয়ে গেল সদর দরজার দিকে। হাতে একটি শুকনো তোয়ালে। মিথি দরজায় নক করতেই দরজাটা খুলে তোয়ালেটা এগিয়ে দিয়ে বলল, 
‘ আপনার ফোন নাম্বারটা দিন তো, মিথি। আমার কাছে আপনার নাম্বারটা নেই।’ 
মিথি দরজার মুখেই এমন প্রশ্নে যতটা না বিভ্রান্ত হলো তার চাইতে বিস্মিত হলো সাব্বিরের কণ্ঠের শীতলতা টের পেয়ে। কাঁধের ব্যাগটা কফি টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে তোয়ালেতে গা, চুল মুছতে মুছতে মোমের আলোয় সাব্বিরের চেহারার গাম্ভীর্য মাপার চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনো প্রশ্ন করলো না। সাব্বির একসময় নিজে থেকেই বলল,
‘ আপনি কি আজ সাফাত সাহেবের সঙ্গে ইফতার করেছেন, মিথি?’ 
মিথি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সাব্বিরের গাম্ভীর্যের কারণ অনুধাবন করে মনে মনে ভারি কৌতুকবোধ করলেও মুখে প্রকাশ করলো না। হেঁটে খাবার টেবিলের সামনে গিয়ে এক গ্লাস পানি ভরে ছদ্ম গাম্ভীর্য নিয়ে বলল,
‘ করলেই বা কী?’ 
সাব্বিরের মুখ আরও গম্ভীর হলো। মিথি পানিটুকু খেয়ে টেবিলের উপর নতুন একটি প্লেট দেখে বলল,
‘ এটা নতুন কিনেছেন নাকি? আগে তো ছিল না।’ 
সাব্বির মুখ গোমড়া করে বলল,
‘ এটা আমাদের না।’ 
মিথি কপাল কুঁচকে জানতে চাইল, 
‘ তাহলে কাদের?’ 
‘ বৃষ্টিদের।’ 
তৎক্ষনাৎ তপ্ত চোখে তাকাল মিথি। কৌতুকভাবটা উবে গিয়ে কঠিন গলায় বলল,
‘ ওদের প্লেট এখানে এলো কী করে?’ 
‘ আজ সন্ধ্যায় ইফতার দিয়ে গিয়েছে তাই।’ 
মিথি দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
‘ ইফতারটা নিশ্চয় আপনার প্রাণের বৃষ্টি দিয়ে গিয়েছে, তাই না?’ 
সাব্বির মিথির দিকে তাকাল। তার চোখে-মুখে তখনও উপচে পড়ছে ছেলেমানুষি অভিমান। সে মিথির মতো করেই বলল, 
‘ দিয়ে গেলেই বা কী?’ 
মিথি ক্ষেপে গিয়ে বলল,
‘ দিয়ে গেলেই বা কী, মানে? আপনাকে বলেছি না ওর আশেপাশে যাবেন না? ও কী আপনাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে? দেখলেই ছুটে চলে যান।’ 
সাব্বির নিজের উপর আসা একের পর এক অন্যায় অভিযোগে স্তব্ধ হয়ে গেল। এই প্রথম সে একটু উষ্মার সঙ্গে প্রত্যুত্তর করল। বলল, 
‘ আপনিও তো সাফাত সাহেবের সঙ্গে ইফতার করেছেন। আমি কিছু বলেছি?’ 
সাব্বিরের এই ছেলেমানুষি রাগে ভেতর ভেতর কৌতুকবোধ করলেও রাগটা ধরে রাখল মিথি। সাব্বিরের দিকে এগিয়ে এসে তার জামার কলার মুঠোয় পুরে কাছে টেনে এনে বলল,
‘ আপনি কেন কিছু বলবেন? আপনি আমাকে ভালোবাসেন? আমি আপনাকে ভালোবাসি। তাই সকল রেস্ট্রিকশন আমি দেব। আপনার কাছে আমি থাকলেও যা না থাকলেও তা। এক মিথি গেলে আরেক বৃষ্টি আসবে। আপনি কেন রেস্ট্রিকশন দিবেন আমায়?’ 
সাব্বির এ কথায় ব্যথিত চোখে তাকাল। মন খারাপ করা গলায় বলল,
‘ এসব বলে আমাকে আরও ছোট করে ফেলবেন না মিথি। আপনি নিজেও জানেন, আমার জীবনে আপনার চাইতে বড় কিছু নেই।’ 
মিথি প্রত্যুত্তরে গভীর চোখে তাকাল। সাব্বিরও মোমের হলদে আলোয় মিথির পান পাতার মতো টলটলে মুখটির দিকে তাকিয়ে রইল নিষ্পলক। মিথির চোখ, মিথির পুরুষ্টু সুন্দর ঠোঁট। সাব্বিরের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ব্যথা হলো। সে কাতর গলায় আচ্ছন্নের মতো বলল,
‘ মিথি! আপনি এতো সুন্দর কেন মিথি?’ 
মিথি কোনো উত্তর দিলো না। সাব্বির তার করতলে মিথির মুখটা সযত্নে আগলে নিয়ে মোমের আলোয় আরও খেয়াল করে দেখল। তার চোখে অকৃত্রিম মুগ্ধতার সঙ্গে ফুটল দৈব্যিক এক বিষণ্ণতা। কণ্ঠে বিষাদ নামিয়ে সে বলল,
‘ আপনাকে দেখলে মাঝে মাঝে আমার অস্থির লাগে, মিথি। বুকে কেমন অসহ্য ব্যথা হয়। আপনি এতো সুন্দর! এতো সৌন্দর্য পেলাম আমি। আপনাকে আমি কোথায় রাখবো? এতো সৌন্দর্য তো আমি আর কোনোদিন দেখিনি মিথি!’ 
মিথির চোখে এবার জল জমলো। সাব্বির আনমনেই চুমু খেলো মিথির জলভরা চোখে। মোমবাতিটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে কখন যেন সেই চুমু নেমে এলো মিথির পুরুষ্টু ঠোঁটে। ফুলের গায়ে একটুও দাগ না ফেলে যেরকম করে মধু শুষে নেয় মৌমাছি। ঠিক সেভাবেই ফুলের মতোন যত্নে তার ঠোঁট চুম্বন করলো সাব্বির। মিথির কী হলো কে জানে! বুক ফেঁটে বেরিয়ে আসতে চাইল হাহাকার ভরা কান্না। ওকে ফুঁপিয়ে উঠতে দেখে সাব্বির চমকে উঠে বলল,
‘ ব্যথা দিয়ে ফেললাম? কী হয়েছে মিথি?’ 
যত্রতত্র কেঁদে ফেলা মিথির স্বভাবের বিপরীত। সে আজ স্রোতের বিপরীতেই গা ভাসলো। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে বলল,
‘ আপনি কেন আমাকে এতো যত্ন করেন সাব্বির? আমি এই পৃথিবীতে একা ঘুরে বেড়িয়েছি কত কতদিন! কেউ তো আমার দিকে এতো যত্ন করে তাকায়নি।’ 
সাব্বির ব্যথিত চোখে তাকাল। মিথিকে টেনে নিলো নিজের কাছে। বুকে জড়িয়ে ধরে গভীরভাবে চুমু খেলো তার ঠোঁটে। ফিসফিস করে বলল,
‘ আপনি আমার মিথি। আর কেউ কেন তাকাবে আপনার দিকে?’ 
মিথি উত্তর দিলো না। সাব্বির অবশ্য উত্তরের অপেক্ষাও করলো না। প্রবল আবেগে সে ডুবে যেতে লাগল এক সুগন্ধি ফুলের অভ্যন্তরে। এক সময় থেমে গিয়ে ভীত চোখে তাকাল মিথির দিকে। করুণ গলায় বলল,
‘ যদি আমি আপনাকে আঘাত করে ফেলি মিথি?’ 
মিথি হাসল। সাব্বিরের গলা জড়িয়ে ধরে গাঢ় চুমু খেল তার কপালে। আশ্বাস দিয়ে বলল,
‘ আমি আছি তো। সামলে নেবো। ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু হোল্ড ব্যাক।’ 
সাব্বির আশ্বস্ত হলো। হাওয়ার ঝাপটায় কখন যে মোমের আলো নিভে গেল ওদের আর খেয়াল রইল না। রাত্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণ হলো তাদের ঘনিষ্ঠতা। মিথি এই অন্ধকারে সাব্বিরের উষ্ণ স্পর্শে মোমের মতো গলে যেতে যেতে বলল, 
‘ আপনার ট্রমার আজ কী হলো বলুন তো? এতো ছাড় দিচ্ছে। থামাথামির নাম গন্ধ নেই।’ 
এমন একটা পরিস্থিতিতেও মিথির দুষ্টুমিতে বিরক্ত হলো সাব্বির। গম্ভীর গলায় বলল,
‘ চুপ করুন মিথি।’ 
মিথি জানতে চাইল, 
‘ কেন? এই সময় কথা বলে নিষেধ?’ 
সাব্বির একটু সময় নিয়ে উত্তর দিলো, 
‘ আমার লজ্জা লাগছে।’ 
সে কথায় কাঁচের চুড়ির মতো রিনঝিন শব্দ তুলে হেসে উঠল মিথি। বলল, 
‘ আপনার আমার বউ হওয়া উচিত ছিলো সাব্বির। আর আমি হতাম আপনার বর। তাহলে কী যে করতাম আমি আপনাকে!’ 
সাব্বির লজ্জায় আরক্ত হয়ে ছদ্ম ধমক দিয়ে বলল,
‘ চুপ!’ 
মিথি এবার সত্যিই চুপ করলো। অনুভূতির আতিশয্যে তাকে ঝড় পরবর্তী পরিবেশের মতোন নীরব হয়ে যেতে হলো। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp