এই মুহূর্তে তারা দুজন যাচ্ছে মুস্তাফিজ ডাক্তারের বাড়ির দিকে। উদ্দেশ্য, এ বাড়ি থেকে কিছু মুরগি চুরি করা। এ ছাড়া আর কোনো উপায় এখন নেই। মুকুলের বউ মিনা রাগ করে তার যাত্রাদলের কস্টিউম ছিঁড়ে ফেলেছে। এখন নতুন কস্টিউম বানানোর পয়সা সে কোথায় পাবে? অথচ এই সপ্তাহে তাদের পালা আছে। এই অভাবের দিনে কারও বাড়িতে চুরি করতেও বিবেকে লাগে। গ্রামের বড়লোকদের একটা লিস্টি করেছে দুজন মিলে। তাদের মধ্যে একজনের মুরগির খোপ কাজের লোকেদের ঘরের বারান্দায়। বাইরে থেকে যাওয়ার উপায় নেই। আরেকজন মুরগি পালে না, গরু-ছাগল পালে। কিন্তু গরু-ছাগল ম্যালা টাকার ব্যাপার, অত টাকার তাদের দরকার নেই। আর চেয়ারম্যানের বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লে বিপদ, তাই সে-ও বাদ। বাকি রইল আমিন মুন্সি আর মুস্তাফিজ ডাক্তার। কিছুদিন ধরে মুকুলের বড় ভাই আমিন মুন্সির বাড়িতে কাজ করছে, সেই বাড়িতে চুরি করাটা ঠিক হবে না। অবশেষে ডাক্তার বাড়ির মুরগিই চুরি করতে হচ্ছে। কাদায় পা আটকে যাচ্ছে বারবার। বিরক্তির শেষ নেই।
মুকুল ফিসফিস করে বলল, ‘কী যে আহোইজ্জা পোলাপানের লাহান কাম করল বউডা! রাগ দেহাবি, তয় মাইরা হাত-পাও কিছু ভাইঙ্গা দে, নায় চুল কয়ডা ছিঁড়ড়া দে। হ্যানা কস্টিউম ছিঁড়ড়া দিলি! এমন কামও কেউ করে?’
ফয়েজের কাছে দুঃখ করে এসব কথাই বলছিল মুকুল। ফয়েজ ফিক করে হেসে দিল।
মুকুল চোখ পাকিয়ে বলল, ‘তোর দেহি মনে ম্যালা সুখ, কাহা। ক্ষেতি তো আর তোর অয় নাই।’
ফয়েজ বলল, ‘এইয়ার লাইগ্যাই তো বিয়া করি না। তোরা তো হগলডি কও খালি বিয়া হরো বিয়া হরো। বিয়া হরলে অইবেডা কী? এইয়াই তো অইবে।’
‘এ ব্যাডা! মোরে তো বিয়া করাইছে ছোডকালে। হেকালে কি আর অত কিছু বুঝি?’
দুজনের কথোপকথনের তালে পথ ফুরিয়ে গেল। অতি সন্তর্পণে পা ফেলে বাড়ির পেছন দিকের উঠোনে গেল। মুরগির খোপ খুলে একটা হাত ঢুকিয়ে দিল। এরপর হাতের কাছে যে মুরগিটাকে পেল, গলা বরাবর চাপ দিয়ে ধরল। এই পদ্ধতিতে ধরলে মুরগি চিৎকার করতে পারে না। গুনে গুনে তিনটি মুরগি নিয়ে খোপ আটকে দিল। এগুলো বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে, তাতে কস্টিউম বানানো হয়ে যাবে।
রেনুর শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তার- কবিরাজ সাধ্যমতো দেখানো হচ্ছে। ওষুধপাতিও কমবেশি চলছে। কিন্তু কেউ রোগ সারাতে পারছে না। আজও শরীর খারাপ লাগছিল। তবু সবাই ঘুমিয়ে পড়ার কারণে জেগে বসে আছে সে। মুকুল যে ফেরে নি! রেনু যখন এ বাড়িতে বউ হয়ে আসে, তখন মুকুল-মামুন ছোট। ওদের কোলেপিঠে করে বড় করেছে। দুজনকে নিজের ছেলের মতো দেখে। মুকুল মাঝরাতে বাড়ি ফিরতেই রেনু তাকে ভাত খেতে ডাকল।
মুকুল বলল, ‘ও কি ভাবি, তুমি এহনো হজাগ ক্যা?’
রেনু ধমকে বলল, ‘তয় কে হজাগ থাকপে? তোর বউ তো সন্ধ্যাকালেই ঘুমাইছে। আর তোর মায়ের তো তুই খাইলেও কিছু যায়-আহে না, না খাইলেও না। সব দায় ঠেকছি একলা মুই।’
মাঝে মাঝে মুকুলের রাত করে বাড়ি ফেরা আর তার জেগে বসে থাকা আজ নতুন কিছু নয়। তাই রেনুর মেজাজ সপ্তমে থাকার আলাদা কোনো কারণ রয়েছে। সেই কারণটা জানতে পারলে সুবিধা হতো। কিন্তু এখন রেনুর কাছে কিছু জিজ্ঞেস করাটা বিপজ্জনক।
মুকুল ভয়ে ভয়ে বলল, ‘মোর কাম আছিল, ভাবি। ভাত বাইড়্যা রাইখ্যা তুমি ঘুমাইয়া পড়তা।’
রেনু আবার গর্জে উঠল, ‘হ, ভাত বাইড়্যা রাখলে কুত্তায় খায়, নাইলে বিলইতে খায়, এ কতা তুই জানো না?’
মুকুল আর কথা বলার সাহস পেল না। হাতমুখ ধুয়ে চুপচাপ খেতে বসল।
রেনু এবার পাশে বসে চাপা গলায় বলল, ‘তোর বউরে কবি মোর লগে মেজাজ না দেহাইতে। মোর লগে তার মেজাজ দেহানের কারণ কী? তুই কি মোর পোলা যে কামকাইজ না করলে তোরে মুই পিডামু? তোর মায় মোর লগে মেজাজ দেহায়, তোর বাপে মেজাজ দেহায়, তোর বউও মেজাজ দেহায়। এ মুই কি তোগো বেবাকটির মেজাজ রাহোনের ভাণ্ড? খালি তোর ভাইজান মেজাজ দেহায় না, ওই মানুষটার লাইগ্যা এই ছাতার সংসারে এহনো পইড়া রইছি, নাইলে এত দিনে বাপের বাড়ি যাইতাম যাইয়া।’
চমকে উঠল মুকুল, ‘মিনা কি তোমার লগে খারাপ ব্যবহার করছে? অর হইয়া আমি মাফ চাইতাছি। তুমি মনে কষ্ট নিয়ো না, ভাবি।’
‘বেইন্যাকালে তোর মায় একশডা কতা হুনাইছে মিনারে। এ তুই কামকাইজ করো না, এই লাইগ্যা তোর মায় অরে কতা হুনাইবে ক্যা? তোরে কইতে পারে না?’
মুকুল মাথা নিচু করে বলল, ‘কাম তো পাই না, ভাবি।’
রেনু গজগজ করে বলল, ‘যাত্রাদল ছাড়ো হেলেই পাবা।’
মুকুল চুপ হয়ে গেল। এ কথার পৃষ্ঠে বলার মতো কিছু নেই আসলে তার।
·
·
·
চলবে……………………………………………………