কামিনী - পর্ব ৮৮ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          রাজা চর্যাপদের ভেতর উসখুস শুরু হয় প্রথম সুরসুন্দরীকে দেখার পর। প্রতিবার উনি কোথাও থেকে এলে সেখানে যা-ই হতো তা-ই ফিরে নিজের রানিকে বলতেন। একদম শুরু থেকে শেষের সমস্ত কিছু। একটা কথাও তিনি গোপন করতেন না। কারণ তার ধারণা ছিলো রানি রাজনীতিতে পাকা। যেকোনো সিদ্ধান্তেই তাকে সাহায্য করতে পারবেন তার রানি।
 কিন্তু সেদিন সেই নৃত্যে মনোরঞ্জন করে আসার পর তিনি সমস্তটাই লুকিয়ে গেলেন। রানি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, যাবর কী দেখার জন্য এত মরিয়া হয়ে উঠেছিলো। 
 তিনি তখন খুবই আলতো ভাবে কথা ঘুরিয়ে বলেছিলেন, সুন্দর একটি বৃক্ষ। পুষ্পবৃক্ষ। 

 রানি তখন ভ্রু কুঁচকে নিলেন। পুষ্প কিংবা বৃক্ষ দেখার লোভ যাবরের মনে এতটা প্রবল তা তার অদ্ভুত লাগল। তবুও তিনি বিশ্বাস করতেন কি-না রাজাকে! তাই মেনেই নিলেন। 

  প্রতিবেশী রাজ্য থেকে আসার পর নিজের ভেতরের এই ঝঞ্ঝাট রাজা ঝেড়ে ফেলতে চাইলেন। প্রথম দু'দিন তার নিদ্রা হলো না। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনদিন থেকে তিনি নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইলেন। নিজের রানির মুখশ্রীকেই মনে পুনরায় সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে শুরু করলেন। কিন্তু তার সেই সাজানোর চেষ্টা পণ্ডশ্রম হলো সপ্তাহ খানেকের মাথায়।
একদিন যাবর আবার এলো হন্তদন্ত হয়ে। হাতের তার পত্র। রানির অগোচরেই সে পত্রখানা ধরিয়ে দিল রাজার হাতে। রাজা তখন নিদ্রায় ঝিমুনি কাটছেন। পত্র দেখে তার বিশেষ পরিবর্তন হলো না। বরং অলস কণ্ঠেই বললেন,
 “কার পত্র? রেখে যাও। পরে দেখব। আর যে পত্র পাঠিয়েছে সে কি পত্রবাহক পাঠাননি? তোমার হাতে পত্র কেন?”

 যাবর কণ্ঠ নিচু থেকে সর্বনিম্ন মাত্রায় নামায়। উত্তর দেয়,
“পাঠিয়ে ছিলেন তো! যদি রানি দেখে ফেলেন সেই ভয়ে আর তাকে বেশিক্ষণ প্রাসাদে রাখিনি।”

 রানি দেখলে সমস্যা হবে এমন পত্র রাজার প্রাসাদে কখনোই আসেনি। সে-ই প্রথম ক্যামিলাস রাজ্যে রানির অগোচরেও পত্র এলো। রাজার বুঝতে বাকি নেই পত্রটি কোন বিষয়ে হতে পারে। তার যদিও বড্ড ইচ্ছে হচ্ছিলো পত্রটি খুলে দেখবার তবুও মনকে কিছুটা সংযত করলেন। কণ্ঠকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বললেন,
 “আমি আর কোথাও এসব মনোরঞ্জনের জন্য যাব না। কোনো রাজা পত্র পাঠিয়ে থাকলে তাকা দুঃখ প্রকাশ করে ফিরতি পত্র পাঠিয়ে দাও, যাবর।”

  যাবর মাথা চুলকালো। রাজা যে ভেতর ভেতর ইচ্ছে পোষণ করে রাখছেন ঠিক তা তার চেয়ে ভালো আর কে জানবে?
সে উৎসাহ নিয়ে তাই বলল,
“কোনো রাজাতো পাঠাননি পত্রটি।”

 “তবে!” রাজা এবার উঠে বসলেন। সরাসরি দৃষ্টি তার যাবরের মুখপানে। আগ্রহের যে বিন্দুমাত্র কমতি নেই তা সেই গোল গোল চাহুনিতেই স্পষ্ট। 
যাবর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে মুচকি হাসল। বাতাসের গতিতে বলল,
“সুরসুন্দরী স্বয়ং পাঠিয়েছেন। আপনাকে তার বাসস্থানে আমন্ত্রণ করেছেন যাওয়ার।”

 “সুরসুন্দরী! নিজে পাঠিয়েছেন! কেন!”

“তা আমি কেমন করে বলব, রাজা? নিশ্চয় তার আপনাকে আলাদা মনে হয়েছে।”
 যাবর রাজাকে খুশি করার আপ্রাণ চেষ্টায় মশগুল হয়ে উঠেপড়ে লাগল। রাজা নিজের সংযম বজায় রাখতে চাইলেন ভেতরে ভেতরে হওয়া তীব্র, চাপা বিস্ময় দমিয়ে রেখেই। পুনরায় নিদ্রার ভাণ করে বললেন,
“আমি যেতে পারব না, যাবর। আমার এসব নৃত্য দেখতে আগ্রহ আসে না।”

 “কিন্তু রাজা, এমন সুযোগ… “

“আমার এমন সুযোগের প্রয়োজন নেই, যাবর। তাই তুমি এখন আসো।” যাবরের কথা মাঝপথে থামিয়ে দিলেন রাজা চর্যাপদ। 
যাবর মুখটি শুকনো করে পত্রখানা বিছানার উপরে রেখেই বেরিয়ে গেলো। সে ধরেই নিয়েছে যে সত্যিই রাজা যাবেন না। কারণ রাজাতো আসলেই অমন মানুষ নন!

 যাবরের বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই কক্ষে উপস্থিত হলেন রানি। হাতে বাদামদুদ্ধের রূপোলী পাত্র। রানির পায়ের শব্দ পেতেই রাজা দুর্ধর্ষতার সঙ্গেই লুকিয়ে নিলেন পত্রখানা। অথচ তিনি সংযত থাকতে চেয়েছিলেন কিনা!
রানি এলেন আরাম-আয়েশ করেই। রাজার হাতে পাত্রটি ধরিয়ে দিলেন কী যত্নে। রাজা চিন্তিত দেখে বার দুয়েক প্রশ্নও করলেন। কিন্তু রাজা সত্যিটা বললেন না মোটেও। কথা ঘুরালেন বারংবার। কখনো রাজ্যের কথা, কখনো তার নবজাতক পুত্রের কথা। 
রানি তবুও বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ করলেন না। ঘুণাক্ষরেও টের পেলেন না যে তার সুখের সংসারে বাসা বাঁধতে শুরু করছিলো নিঃসঙ্গ শালিক। বিশ্বাসের আতুরগৃহে ধুঁকে মরতে শুরু করবে প্রতিশ্রুতি, এক সাথে থাকার সকল প্রতিজ্ঞা। 
 
—————

  গণিকালয়টির নাম- কামনা। যদিও গণিকালয় তবে সেটা ভদ্রপল্লীর মতোই। সেখানে রাজ, রাজত্ব পেতে বসেছেন সুরসুন্দরী। গণিকালয়টির মালিক ছিলেন একজন পুরুষ। পূর্ব রাজ্যের খোনো বণিক শ্রেণির লোক। এবং সুরসুন্দরীকে তিনিই অঢেল ধন-সম্পদের বিনিময়ে রাজা কেশবচন্দ্রের থেকে কিনে নিয়েছিলেন। 
তবে তার বিশেষ ক্ষতিও বোধহয় হয়নি সুরসুন্দরীকে নিয়ে। বরং লাভ হয়েছে অধিক। সুরসুন্দরীর গণিকালয়ে রোজ খদ্দের বাড়ছে বহু। রাজ, রাজারাও আসতে ভুলছেন না। রাজা কেশবচন্দ্র কেন যে এত লাভ ছাড়লেন! 

 কামনা পল্লীতে আজ বিশেষ আয়োজন। চারদিকে ধিক্ ধিক্ করে আলো জ্বলছে। বিশাল বিছানাটিতে শুয়ে আছেন সুরসুন্দরী। একটি হাত মাথার নিচে দিয়ে। তার সামনেই মেঝেতে বসা একেক বর্ষীয়া বেশ কতগুলো নারী। অল্প বয়সীও আছে আবার মধ্য বয়সীও আছে। 
 সুরসুন্দরীর পায়ে আলতা দিয়ে দিচ্ছে আরেকটি মেয়ে। আলতা দিতে দিতে সে এই অব্দি পায়ের প্রশংসা করেছে শ'খানেক বার বোধহয়। আবারও পুনরায় করল,
“আপনার শরীরের রঙ এত অদ্ভুত। আলতারও যেন সৌন্দর্যতা বেড়ে গিয়েছে আপনার দেহ পেয়ে! কী সুন্দর আপনি!”

 “তুই বুঝি আমার রূপ আজ ধ্বংসই করে দিবি তোর কুনজরে?”

 সুরসুন্দরীর ঠাট্টায় সকলে হেসে উঠল। বারান্দায় সেসময় ধূপগন্ধী দিচ্ছিলো সতেরোর ঘরের তাপসী। সুরসুন্দরী হাঁক ছেড়ে ডাকলেন তাকে, 
 “এই তাপসী না? এদিকে আয় তো।”

 তাপসী একটু থমথমে স্বভাবের। ধীরস্থির তার গতি। সুরসুন্দরীর ডাক পেয়ে সে এলো তবে রয়েসয়েই। মাথাটি নামানো। একদম থুতনি লেগে গিয়েছে বুকে।
 সুরসুন্দরী ওর নত মস্তকের দিকে তাকিয়ে রঙ্গ করে বললেন,
“মুখ নামিয়ে রেখেছিস কেন? জানিসই যখন বকব তাহলে অমন কাজ করিস কেন?”

 তাপসী চুপ করেই রইল। মেঝেতে বসে থাকা উপস্থিত মেয়েদের মাঝে একজন হাসতে হাসতে উত্তর দিল, “সন্ধ্যেতে ধূপ দিলে মঙ্গল হয় যে, তাই ও দেয়।”

“মঙ্গল! অতই যদি মঙ্গল করার হতো তাহলে তো তোদের জন্ম হতো কোনো রাজপ্রাসাদে। পুরুষ শাসন হতো তোর ক্ষমতা। অথচ এখন পুরুষ তোদের শুষে শেষ করে দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মনোরঞ্জনের জন্য সমস্তটাই করিস। জীবন বলতে চিনিস এই এক কামনা পল্লীকে। মঙ্গল আর হলো কোথায়? স্রষ্টাকে এত ডেকে কী হলো? এই নোংরা পল্লীতে স্রষ্টা আসেন না। ডাকও শুনেন না।”

  তাপসী এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে মুখে তুলে। ধীরে বলে, 
“স্রষ্টা সবখানেই থাকেন। দেহতো আজন্মই সবার পাপী। অন্তরের পবিত্রতা দিয়ে খুঁজলে স্রষ্টা সবাইকেই ধরা দেন, সুন্দরী।”

 সুরসুন্দরীকে সকলেই এখানে সুন্দরী বলেই সম্বোধন করে। তাপসীও তাই। তাপসীর কথা শুনে হেসে লুটোপুটি খেলেন সুরসুন্দরী। তাচ্ছিল্য করে বললেন,
“সতেরোই তো দেখেছিস সবে। সাতাশ অব্দি আয়। স্রষ্টার প্রতি প্রীতি যদি থাকে আরকি!”

 তাপসী আরও কিছু হয়ত বলতো কিন্তু বলল না। উপস্থিত একটি মেয়ে এমন করে চোখ রাঙালো যে তার আর কিছু বলবার সাহস হলো না। সুরসুন্দরীর আগপিছ সম্পর্কে তারা কিছুটা হলোও জানে তাই তর্ক করার সাহস দেখায় না। তাছাড়া অঞ্চলের মালিক স্বয়ং তাকে এইখানে রাজ করতে বসিয়েছেন কী দরকার শত্রু হওয়ার? তা-ও তো স্রষ্টা দু মুঠো খাবার জোগাড় করে দিচ্ছেন। এই পল্লী হারালে সেই খাবারটাও বা কোথায় পাবে? সুরসুন্দরীর ভাবনা যে ভুল। স্রষ্টা না থাকলে আজকের যতটুকু তার জীবন ততটুকুও কি জুটতো? 
 
  তাপসী বেরিয়ে গেলো আলগোছেই। পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক করতেই একটি মেয়ে বলল,
“বেশ ক’ একজন রাজাতো চলেই এসেছেন। কখন শুরু হবে সব?”

সুরসুন্দরী আরাম করে শোয়। পা নাড়াতে নাড়াতে বললেন, “ক্যামিলাস রাজ্যের রাজা আসুক। তারপর তো!”

 “আসবেন না বোধহয়। যাদের আসার তারা সেই মধ্যাহ্নের পর পরই চলে এসেছেন। আপনার কাছে আমার অজুহাত কেবল প্রয়োজন তাদের। সেখানে রাজা চর্যাপদ এখনও এলেন না। এমনিতেও লোকমুখে শুনেছিলাম তার বড়ো নাম। নিজের পত্নীর প্রতি তার অগাধ প্রেম।”

 সুরসুন্দরী অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন মেয়েটির কথা শুনে। যেন কী এমন বলে ফেলেছে হাসির। মেয়েটি ভ্যাবাচেকা খেলো। সে কোনো হাসির কথাতো বলেনি তবে সুন্দরী কেন হাসলেন? প্রশ্নও করতে ভয় হলো তার। 
 সুন্দরীর হাসতে হাসতে চোখে জল জমলো, 
“পত্নীর প্রতি প্রেম! বেশ হাস্যকর শোনালোরে। তোদের প্রেমিক রাজার পত্নীর প্রতি প্রেম কতটা দেখতে হচ্ছে তবে।”

 “না, আসলে উনাকে নিয়ে এমনটাই যে শুনেছিলাম তাই বললাম।”

 “শোনরে, পুরুষদের ভেতরে কোনো প্রেম থাকে না। যা থাকে তা হলো কাম। নারীদেহের প্রতি লোভ, তৃষ্ণা। কামনার পল্লীতে থেকে প্রেমকে বিশ্বাস করছিস এ তো সবচেয়ে হাস্যকর বিষয়। সত্যিই যদি প্রেম থাকত পৃথিবীতে তবে গণিকালয়ের জন্ম হতো না। তোর আর আমার নাম বেশ্যা হতো না, হতো প্রেমিকা। পৃথিবীতে সব আছে কেবল পুরুষদের মনে প্রেম নেই। ছিলো না। হবেও না।”
 কথা বলতে বলতে সুন্দরীর কণ্ঠ রূঢ় হয়ে উঠে আরও। 

 তখনই নিচ থেকে সংবা নিয়ে আসে দাররক্ষী। নত মাথায় সংবাদ পৌঁছায়, “সুন্দরী, রাজা চর্যাপদও চলে এসেছেন। আপনার জন্য বেশকিছু উপহারও এনেছেন। আপনি কখন আসবেন উনারা জিজ্ঞেস করছেন। বড়ো আকুলতা দেখাচ্ছেন। কী বলব?”

  সুরসুন্দরীর মুখে বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। গর্বের সাথে তাকালো মেঝেতে থাকা বাকিদের দিকে। বেপরোয়া ভাবে বলল,
“কী মেয়েরা? প্রেমিক রাজা এলেনতো? তা যাও প্রেমের পূজারীরা। দেখে আসো কাম বড়ো না প্রেম বড়ো।”

 সুন্দরীর ঠাট্টায় নত হয়ে এলো সেই মেয়েটির মুখ যে রাজাকে নিয়ে বড়াই করে বলেছিলো। তার মনেরও কোথাও একটা সত্যিই মনে হলো, পৃথিবীতে সমগ্র পুরুষের ভেতরেই বাস করছে কেবল দৈহিক তৃষ্ণা। 

 সুরসুন্দরী তার জলসাঘরে ঢুকলেন সেই নাটকীয় ভঙ্গিতেই। আসর জমে উঠল তীব্রতর ভাবেই। মন্ত্রমুগ্ধের মতোই ডুবে গেলো সমস্ত পুরুষ তার রূপে। নৈকট্য লাভ করল সুরসুন্দরী ও রাজা চর্যাপদের সম্পর্ক। 
 ক্যামিলাস রাজ্যে তখন ষড়যন্ত্রের প্রথম শুভারম্ভ ঘটল। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp