ভোর বেলার সূর্য উদয়ের সময় চার পাশে ছড়িয়ে পড়ল মৃদু সূর্যালোক। ট্রেনের জানালা দিয়ে সূর্যের আগুনরঙা আলো পদ্মজার মুখশ্রী ছুঁয়ে যাচ্ছে। ফজরের নামাজ পড়ে ট্রেনে উঠেছে তারা। গন্তব্য অলন্দপুর। পদ্মজার মেট্রিক শেষ হলো আজ তিন দিন। হেমলতার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজল পদ্মজা। পুরো দেড় মাস পর পূর্ণা-প্রেমা-প্রান্তর দেখা পাবে। খুশিতে আত্মহারা সে।
মাঝে একটু জিরিয়ে ফের চলছে ট্রেন। হেমলতা জানালার বাইরে তাকিয়ে আকাশ দেখছেন। কারণে-অকারণে তিনি এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। শুষ্ক চক্ষুদ্বয় যখন-তখন সজল হয়ে উঠে। কিছুতেই বারণ মানে না, নীল আকাশের বুকে যেন সেদিন রাতের স্মৃতি আকার নিয়ে ভেসে উঠল। ছেলেটার বয়স তেইশ-চব্বিশ বছর হবে। অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল। দেখতে-শুনতে বেশ ভালো। হেমলতা পদ্মজাকে আড়াল করে কঠিন স্বরে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কে তুমি?’
ছেলেটি হেমলতার কথার ধরনে বিব্রতবোধ করল।
ইতস্তত করে বলল, ‘মুহিব, মুহিব হোসেন।’
হেমলতার টনক নড়ল। তিনি সাবধানে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বারেক হোসেন তোমার বাবা?’
মুহিব ভদ্রভাবে বলল, ‘জি।’
হেমলতা কী যেন বলতে চেয়েছিলেন, পারলেন না। তার আগেই মুহিব অপরাধী স্বরে বলল, ‘বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। আমি আসছি।’ এরপরই হন্তদন্ত হয়ে চলে গেল। সেদিন আর রাত জাগা হলো না। ছাদ থেকে নেমে গেল মা-মেয়ে। গোপন বৈঠকে একবার বাধা পড়লে আলোচনা চালিয়ে যেতে আর মন সায় দেয় না। অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে যায়।
পরদিন জানা গেল—মুহিব তার পিতার সঙ্গে রাগ করে ঢাকা ছেড়ে চাচার বাড়ি উঠেছে। এখনকার ছেলে-মেয়েদের ক্ষমতা খুব। তারা খুব সহজ কারণে মা-বাবার সঙ্গে রাগ করে দূরে সরে যেতে পারে। হেমলতা অবজ্ঞায় কপাল কুঞ্চিত করতে সঙ্কোচবোধ করলেন না। পরে অবশ্য বুঝেছেন, মুহিব খুবই ভালো ছেলে। নম্র, ভদ্র, জ্ঞানী। মেধাবী ছাত্র, বিএ পড়ছে। সবচেয়ে ভালো গুণ হলো, মুহিবের নজর সৎ। হেমলতা চোখের দৃষ্টি চিনতে ভুল করেন না। ঠিক সতেরো দিন পর বারেক হোসেন ছেলেকে নিতে আসেন। যেদিন আসেন পরদিন রাতেই হেমলতার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। মুহিবের বউ হিসেবে পদ্মজাকে নিতে চান। হেমলতা অবাক হোন। মুহিব মনে মনে পদ্মজার প্রতি দুর্বল, অথচ তিনি একটুও বুঝতে পারেননি!
নিঃসন্দেহে মুহিব পাত্র হিসেবে উপযুক্ত। মুহিবের বড়ো দুই ভাই—মুমিন ও রাজীব। দুজনই চাকরিজীবী। মুমিন বিয়ে করে বউকে ডাক্তারি পড়াচ্ছে। বউয়ের পড়াশোনার সমর্থনে আছে পুরো পরিবার। বোঝা যাচ্ছে, পরিবারের প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্ক, ভাবনা উচ্চ মানের। বারেক হোসেন বিয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে এটিও বলেছেন, ‘আমার মেয়ে নেই। ছেলের বউরাই আমার মেয়ে। আপনার মেয়ের যতটুকু ইচ্ছে পড়বে। কোনো বাধা নেই।’
হেমলতা প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন না। তিনি আনন্দ সাথে জবাব দিলেন, ‘পদ্মজা আইএ শেষ করুক। এরপরই না হয়।’
বারেক হোসেন হেসে বললেন, ‘তাহলে এটাই কথা রইল।’
স্মৃতির পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন হেমলতা। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। গলাটা কাঁপছে। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। ব্যাগ থেকে বোতল বের করে পানি পান করলেন।
—————
অলন্দপুর।
প্রেমা-প্রান্ত বাড়ির বাইরে সড়কে পায়চারি করছে। পূর্ণা গেটের আড়াল থেকে বার বার উঁকি দিয়ে দেখছে দূরের পথ। হেমলতা ও পদ্মজাকে আনতে মোর্শেদ যে সেই কখন গঞ্জে গেলেন, এখনো আসছেন না! পুরো দেড় মাস পর মা-বোনের সাক্ষাৎ পাবে তারা। হৃদপিণ্ড দ্রুতগতিতে চলছে। মিনিট পাঁচেক পর কাঁচা সড়কের মোড়ে মোর্শেদের পাশে কালো বোরখা পরা দুজন মানুষকে দেখা যায়। পূর্ণা লাজলজ্জা ভুলে আগে আগে ছুটতে থাকে। পেছনে প্রান্ত এবং প্রেমা। দৌড়ে গিয়ে মা-বোনকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরে প্রবল কণ্ঠে কেঁদে উঠল পূর্ণা। হেমলতা পূর্ণাকে ধমক দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। মাঝে মাঝে একটু বাড়াবাড়ি করা দোষের নয়। পদ্মজার চোখ বেয়েও টপটপ করে জল পড়ছে। প্রায় প্রতিটা রাত সে ভাই-বোনদের কথা মনে করেছে। বিশেষ করে পূর্ণাকে মনে পড়েছে বেশি। মনে হচ্ছে, কত শত বছর পর দেখা হলো! পদ্মজাকে জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছে পূর্ণা। প্রতিটি দিন সে বাড়ির আনাচে-কানাচে পদ্মজার শূন্যতা অনুভব করেছে। পূর্ণা অশ্রুসিক্ত চোখ মেলে বোনের দিকে তাকাল। এরপর আবার জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপা, আমার এত আনন্দ হচ্ছে! আগে কখনো এমন হয়নি।
পদ্মজার কোমল হৃদয়, পূর্ণার ভালোবাসা দেখে বিমোহিত হয়ে উঠল সে স্নেহমাখা কণ্ঠে বলল, ‘আমার সোনা বোন। আর কাঁদিস না।’
পূর্ণা দ্রুত চোখের জল মুছে প্রফুল্লচিত্তে বলল, ‘আপা, আমি তোমার পছন্দের চিংড়ি মাছ দিয়ে লতা রেঁধেছি।’
পদ্মজা অবাক চোখে তাকাল। এদিকে এক বোনের প্রতি আরেক বোনের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে হেমলতা প্রশান্তিদায়ক সুখ অনুভব করছেন। আনন্দে বাকহারা হয়ে পূর্ণার দুই গালে চুমো দিল পদ্মজা। মোর্শেদ দৃশ্যটি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন, মানুষজনকে আসতে দেখে তাড়া দিলেন, ‘দেহো মাইয়াডির কারবার। মানুষ আইতাছে। আর হেরা রাস্তায় কান্দাকাটি লাগাইছে। হাঁট, সবাই হাঁট।’
বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে সবাই খেতে বসে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চার ভাই-বোন আশ্রয় নিলো ঘাটে। এই ঘাট হচ্ছে তাদের বৈঠকখানা। দেড় মাসে কী কী হলো, না হলো সব পূর্ণা বলছে। প্রেমা পূর্ণার নামে বিচার দিল। প্রান্ত প্রেমার নামে বিচার দিল। প্রান্ত কেন বিচার দিল তা নিয়ে আবার বাকবিতণ্ডা লাগিয়ে দিল প্রেমা। সে কী কাণ্ড! তুমুল ঝগড়ায় লিপ্ত হয় দুজন। এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে বিচার নিয়ে ছোটো দুজন গেল হেমলতার কাছে।
তখন পদ্মজা শুষ্ককণ্ঠে পূর্ণাকে বলল, জানিস পূর্ণা, আম্মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।’
পূর্ণা ভীষণ চমকাল। চমকিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘কবে? কার সঙ্গে?’
‘যে বাড়িতে ছিলাম ওই বাড়ির ছেলের সঙ্গে। বিএ পড়ছে। আমার আইএ শেষ হলে বিয়ের তারিখ পড়বে।’
‘আপা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আম্মার না ইচ্ছে তোমাকে অনেক পড়াবে। তোমার চাকরি হবে।’
পদ্মজা চুপ থাকল ক্ষণকাল। তারপর বলল, ‘আম্মার কী যেন হয়েছে। পালটে গেছেন।’
‘কী রকম?’
‘আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। বেশিরভাগ কথা এড়িয়ে যান। আমার ভবিষ্যত নিয়ে আগের মতো আগ্রহ দেখান না। আমি কথা তুললে এড়িয়ে যান। গল্প করেন না। আম্মা আগের মতো নেই পূর্ণা।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে পদ্মজার গলা কিঞ্চিৎ কাঁপল।
‘কী বলছ!’
‘সত্যি।’
‘কিছু হয়েছে ওখানে?
‘না। আমি যতটুকু জানি তেমন কিছুই হয়নি।’
পূর্ণা সীমাহীন আশ্চর্য হয়ে চিন্তায় ডুবে গেল। পদ্মজা শূন্যে তাকিয়ে রইল। লিখন শাহ নামে মানুষটার কথা মনে পড়ছে। তিনি যখন শুনবেন এই খবর, সহ্য করতে পারবেন? সত্যি ভালোবেসে থাকলে সহ্য করতে কষ্ট হবে নিশ্চয়ই। পূর্ণা দ্বিধাভরে প্রশ্ন করল, ‘আপা, লিখন ভাইয়ের কী হবে?’
পদ্মজা ক্লান্ত ভঙ্গিতে তাকাল। বলল, ‘আমি তাকে বলেই দিয়েছি, আম্মা যা বলবেন তাই হবে।’
পূর্ণার মনজুড়ে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। তার আপার মতো সুন্দরীকে শুধুমাত্র লিখন শাহর পাশেই মানায়। লিখন শাহ আর পদ্মজাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখল সে।
সব স্বপ্নে গুড়ো-বালি!
পূর্ণা কাতর কণ্ঠে বলল, ‘লিখন ভাইয়ের সঙ্গে তোমার বিয়ে না হলে আমি কষ্ট পাব খুব।’
‘আমি তো আম্মার কথার বাইরে যেতে পারব না।’
পূর্ণা গলার স্বর খাদে এনে বলল, ‘যদি লিখন ভাই রাজি করাতে পারে?’ পদ্মজা অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। সেই দৃষ্টি যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে, হওয়ার নয়! পূর্ণা কপাল কুঁচকে ফেলল। বিরক্তিতে বলে উঠল, ‘ধ্যাত! ভালো লাগছে না।’
—————
বাতাসটা গরম ঠেকছে, ক্রমশ বেড়ে চলেছে মাথাব্যথা। এত এত গাছগাছালি চারিদিকে, তবুও এতটুকুও শীতলতা নেই। হেমলতা আলমারির কাপড় গুছিয়ে বিছানার দিকে তাকালেন। মোর্শেদ এই রোদ ফাটা দুপুরে কখন থেকে ঝিম মেরে বিছানায় বসে আছেন। মুখখানা বিমর্ষ, চিন্তিত হেমলতা প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘কী হয়েছে?’
মোর্শেদ তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলেন। হেমলতা তাকিয়ে রইলেন জবাবের আশায়। ক্ষণকাল সময় নিয়ে মোর্শেদ বললেন, ‘বাসন্তী এই বাড়িতে থাকবার জন্য আইতে চায়।’
হেমলতার চোখ দুটি ক্রোধে জ্বলে উঠে আবার নিভে গেল।
তিনি নির্বিকার কণ্ঠে বললেন, ‘তোমার ইচ্ছে হলে নিয়ে এসো। বাড়ি তো তোমার।’
মোর্শেদ চকিতে তাকালেন। তিনি ভেবেছিলেন হেমলতা রাগারাগি করবে। মোর্শেদের চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ রূপ নিলো। কিড়মিড় করে হেমলতাকে বললেন, ‘আমি তারে চাই না।’
হেমলতা ঠাট্টা করে হাসলেন। বললেন, ‘বিশ বছর সংসার করে এখন তাকে চাও না! আমি হলে মামলা ঠুকতাম।’
মোর্শেদ আহত মন নিয়ে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তার চোখ দুটিতে অসহায়ত্ব স্পষ্ট। হেমলতা নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে সেখান থেকে সরে পড়েন। মোর্শেদ তখন কপট রাগ নিয়ে নিজে নিজে আওড়ান, ‘বাসন্তী আমারে ডর দেহায়! মায়াডারে খুন করতে পারলে জীবনে শান্তি পাইতাম।’
হেমলতা দরজার ওপাশ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে মোর্শেদকে পরখ করছেন। রাগে ছটফট করছেন মোর্শেদ। বাসন্তীর প্রতি তার এত রাগ কেন?
হেমলতা পুনরায় ঘরে এসে বললেন, ‘ভালোবাসার মানুষকে এভাবে গালি দিয়ে ভালোবাসা শব্দটির সম্মান খুইয়ে দিয়ো না।’
‘আমি তারে কোনোকালেও ভালোবাসি নাই। বাসলে তোমারে বাসছি।’ হেমলতা ভীষণ অবাক হয়ে তাকালেন। চোখের তারায় জ্বলজ্বল করে কিছু একটা যেন ছুটতে শুরু করে।
ভোঁতা অনুভূতিগুলো মুহূর্তে নাড়াচাড়া দিয়ে উঠে। মোর্শেদ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। তিনি বিছানা থেকে নেমে গটগট পায়ে বেরিয়ে যান। হেমলতা মোর্শেদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকেন ঝাপসা চোখে।
মানুষটার থেকে এই একটি শব্দ শোনার জন্য একসময় কত পাগলামি করেছেন, কত কেঁদেছেন। আকুতি-মিনতি করেছেন। মোর্শেদের মুখে ভালোবাসার সত্য স্বীকারোক্তি শুনে হেমলতার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। বয়সটা কম হলে আজ তিনি অনেক পাগলামি করতেন, অনেক!
—————
পূর্ণার গা কাঁপানো জ্বর। তাই পূর্ণাকে নানাবাড়ি রেখেই পদ্মজা বাড়ি ফিরল সঙ্গে এলো হিমেল-প্রান্ত-প্রেমা। তিন ভাইবোন মিলে বাড়িজুড়ে ছোটাছুটি করে লাউ, শিম, লতা, পুঁইশাক বন্দোবস্ত করল। বাজার থেকে মাছ নিয়ে এলো হিমেল। বাড়িতে শুঁটকি ছিল। আজ হেমলতা আর মোর্শেদ ফিরবেন। তাই এত আয়োজন। দুই দিন আগে তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। হেমলতার বড়ো বোন হানির মেজো মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। হানি বলেছেন, হেমলতা না গেলে তিনি বিয়ের তারিখ ঠিক করবেন না। তাই বাধ্য হয়ে হেমলতা গেছেন। তবে পদ্মজার শুরু থেকে খটকা লাগছে। তার মা তাকে রেখে পাশের এলাকায় যেতেও আপত্তি করেন। আর আজ দুই দিন ধরে তিনি মাইলের পর মাইল দূরে পদ্মজাকে ছাড়া রয়েছেন! অবশ্য এসব এখন ভাবার সময় নয়। পদ্মজা যত্ন করে কয়েক পদের রান্নার প্রস্তুতি নিলো। সকাল থেকে সূর্যের দেখা নেই। পরিবেশ ঠান্ডা, স্তব্ধ। এ যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। প্রান্ত-প্রেমা উঠান জুড়ে মারবেল খেলছে। হিমেল শুধু দেখছে, মাঝে মাঝে প্রবল কণ্ঠে হেসে হাত তালি দিচ্ছে। রান্না শেষ হলো বিকেলে প্রেমা, প্রান্ত ও হিমেলকে খাবার বেড়ে দেয় পদ্মজা।
খাওয়াদাওয়া শেষ হলে বলল, ‘মামা, তুমি আর প্রান্ত গিয়ে পূর্ণাকে নিয়ে আসো। সন্ধ্যা হয়ে যাবে একটু পর। আম্মা-আব্বাও চলে আসবে।’
হিমেল-প্রান্ত বের হতেই পেছন পেছন ছুটে গেল প্রেমা। পদ্মজা একা হয়ে গেল। রান্নাঘর গুছিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ, বাতাস বইছে প্রবলবেগে। বাতাসের দাপটে পদ্মজার চুল ও ওড়না উড়ছে। পরিবেশ অন্ধকার হচ্ছে ধীরে ধীরে। তার মনটা কু গাইতে লাগল। সে এক হাত দিয়ে অন্য হাতের তালু চুলকাতে চুলকাতে গেটের দিকে বারংবার তাকিয়ে দেখছে, কেউ এলো কি না! যতক্ষণ কেউ না আসবে শান্তি মিলবে না। বিকট শব্দ তুলে কাছে কোথাও বজ্রপাত পড়ল। ভয়ে পদ্মজার আত্মা শুকিয়ে যায়। চারিদিক কেমন গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে! ঘোমটা টেনে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। বিকট বজ্রপাত, দমকা হাওয়া সঙ্গে বড়ো বড়ো ফোঁটার বৃষ্টি, যেন প্রলয়ঙ্কারী ঝড় বইছে। লাহাড়ি ঘরের মাথার ওপরে থাকা তাল গাছগুলো অবাধ্য বাতাসের তেজে একবার ডানে আরেকবার বাঁয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। পদ্মজার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল আতঙ্কে, ছুটে গেল নিজের ঘরে। বিছানার উপর কাঁচুমাচু হয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। টিনের চালে ধুমধাম শব্দ হচ্ছে। পদ্মজা অনবরত প্রার্থনা করে যাচ্ছে, যেন বৃষ্টি কমে যায়।
কিন্তু বৃষ্টির বেগ কমার বদলে উলটো বাড়ল! এতসব শব্দ ভেদ করে আরেকটি শব্দ এসে থেমে গেল পদ্মজার কানের কাছে, সদর ঘরে কিছু একটা পড়েছে। ভয় পদ্মজাকে আরো বেশি করে গ্রাস করে ফেলল।
পরক্ষণেই খুশিতে সে আওড়াল, ‘আম্মা এসেছে?’
বিছানা থেকে নেমে হন্তদন্ত হয়ে সদর ঘরে যায় পদ্মজা। ঘরটা অন্ধকারে তলিয়ে আছে। জানালা দিয়ে আসা ঈষৎ আলোয় দেখল একজন পুরুষের অবয়ব। সঙ্গে সঙ্গে তার সর্বাঙ্গ অসাড় হয়ে পড়ল। জায়গায় স্তব্ধ হয়ে গেল দুটো পা।
পদ্মজা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘কে আপনি? খালি বাড়িতে কেন ঢুকেছেন? কোনো জবাব এলো না। পদ্মজা অনুরোধ করে ভেজা কণ্ঠে বলল, ‘বলুন না, কে আপনি?’
একটি ম্যাচের কাঠি জ্বলে উঠল। সেই আলোয় দুটি গভীর কালো চোখ বিভ্রম নিয়ে তাকিয়ে রইল পদ্মজার দিকে।
শীতল-স্পষ্ট কণ্ঠে চোখের মালিক বলল, ‘আমির হাওলাদার।’
পুরুষালী কণ্ঠটি শুনে আরো ভড়কে গেল পদ্মজা। রগে-রগে, বরফের মতো ঠান্ডা আর সূক্ষ্ম কিছু একটা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। এক হাত দরজায় রেখে, পদ্মজা আকুতি করে বলল, ‘আপনি চলে যান। কেন এসেছেন?’
উত্তরের আশায় না থেকে পদ্মজা দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল, ভেতরে ঢুকেই লাগিয়ে দিল দরজা। তার মস্তিষ্ক জমে গেছে, কাজ করছে না। লোকটা যদি সম্মানে আঘাত করে বা গ্রামের মানুষ যদি দেখে ফেলে খালি বাড়িতে অচেনা পুরুষের সঙ্গে…কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। সে আর ভাবতে পারছে না।
করাঘাত শুনে পদ্মজা ঘরের সব আসবাবপত্র ঠেলেঠুলে দরজার কাছে নিয়ে এলো। শরীর কাঁপছে, মাটিতে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল সে। দুই হাত মাথায় রেখে আর্তনাদ করে ডাকল, ‘আম্মা, কোথায় তুমি? আমি খুব একা, আম্মা। আম্মা…।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………