আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ০৩ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
          লোকটিকে দেখে রাহার এমন মনে হচ্ছে— মাটি ফাঁকা হয়ে যাক, আর সে মাটির ভিতরে ঢুকে যাক। চোখের সামনে লোকটির এরূপ বিধ্বস্ত রূপ, আর বাড়ির এই অবস্থা দেখে তার ছোট্ট মাথায় কিছুই ঢুকছে না।

হকিস্টিকটি ফ্লোরের সাথে লাগিয়ে এক পা, দুই পা করে রাহার দিকে এগিয়ে আসছে লোকটি। স্টিকটি লোহার হওয়ায় ফ্লোরের সাথে ঘর্ষণে ভীতিকর আওয়াজ সৃষ্টি হচ্ছে। তার চোখের মনি দুটো হালকা বাদামী—হ্যাজেল (Hazel), যা এই মুহূর্তে ভীষণ গভীর, তীক্ষ্ণ আর ভয়ংকর দেখাচ্ছে।
যা দেখে রাহার কলিজায় পানি নেই বললেই চলে।

লোকটি যত এগোচ্ছে, রাহাও এক পা, দুই পা করে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে। ভয়ে তার হার্টবিট দ্রুত উঠানামা করছে। যেতে যেতে একসময় সিঁড়ির সামনে গিয়ে ঠেকে। আর পিছানোর কোনো উপায় নেই।
আরও একবার পিছাতে গিয়েই পা সিঁড়িতে আটকে যায়। পড়ে যেতে নিলেও শেষ মুহূর্তে রেলিং আঁকড়ে ধরে কোনো রকমে নিজেকে সামলে নেয়।

লোকটি তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে পাশ দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে যায়। প্রতিটা ধাপে তার পায়ের শব্দ যেন পুরো বাড়িটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।

চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো—যেন কেউ শ্বাস নেওয়ার শব্দটুকুও করতে ভয় পাচ্ছে।
রাহা যেন দম ছাড়ার সুযোগ পেলো। এতক্ষণ দম আটকে ছিল। আর কিছুক্ষণ থাকলে নির্ঘাত অক্কা পেত।

কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। বুক ধকধক করছে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে…
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই যেন বুঝেও কিছু বুঝতে পারছে না।

পিছনে রেখে গেলো কতগুলো মানুষের ভগ্ন আর জিজ্ঞাসু চেহারা—কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করার সুযোগটুকুও দেওয়া হয়নি।

ধীরে ধীরে রাহা সিঁড়ির দিকে তাকাল। উপরে অন্ধকার করিডোর—সেখানে লোকটির ছায়াটাও মিলিয়ে গেছে।
হঠাৎ করেই দোতলা থেকে জোরে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ ভেসে এলো—
“ধাম!”
শব্দটা শুনে রাহার সাথে সাথে সবাই কেঁপে উঠল।

রাহার বড় আব্বু গিয়ে সোফায় বসে পড়লেন। সাথে সাথে তার স্ত্রী আফসানা বেগম দৌড়ে এলেন।
সান্ত্বনা দিতে দিতে বললেন, “আমি ওর সাথে কথা বলব। দয়া করে আপনি হাইপার হবেন না, নেতা সাহেব।”

আহসান খানও এগিয়ে এলেন ভাইয়ের কাছে। কারণটা তারও অজানা—কি এমন হয়েছিল ৯ বছর আগে? ছেলেটা তো এমন ছিল না! কেনই বা ভাইজান তাকে জোর করে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন?

চোখের সামনে যেই বড় ভাইকে সবসময় শক্ত দেখেছেন—শুধু ছেলের বেলায় যিনি নরম হয়ে যান, তাকে এই অবস্থায় দেখে তার বুকটাও ফেটে যাচ্ছে।

তখনই আমান খান ধীর কণ্ঠে বললেন— “আমার একমাত্র ছেলে অভ্র, দীর্ঘ ৯ বছর পর দেশে এসেছে। সবার সাথে হাসিখুশি থাকার কথা—সেই ছেলেই কিনা কারও সাথেই কথা বলছে না।

তবে কি আজও সেই কষ্ট তার বুকে গেঁথে রয়েছে? ভুলতে পারেনি…?”
কথাগুলো বলতে বলতে তার গলাটা ভারী হয়ে এলো। চোখের কোণে জমে থাকা পানি লুকাতে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলেন।

আফসানা বেগম নিঃশব্দে স্বামীর পাশে বসে তার হাতটা আলতো করে ধরে বললেন— “সব ঠিক হয়ে যাবে, আপনি একটু ধৈর্য ধরুন।”

কিন্তু সত্যিই কি সব ঠিক হবে…?
নাকি এই বাড়ির দেয়ালেই লুকিয়ে আছে সেই অজানা অতীত—যার ভার নিয়ে আজও ফিরে এসেছে অভ্র?

শিফা এতক্ষণ তার বড় ভাইয়ের সবকিছু দেখছিল, আর চোখের পানি ফেলছিল। বাবা-মায়ের কান্না সে সহ্য করতে পারছিল না।
তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—কেউ কিছু বলছে না কেন?

—————

অভ্র নামটা শুনে রাহার মাথায় যেন বাজ পড়ল।
“এই তাহলে অভ্র ভাইয়া.....জিহাদ খান অভ্র!”

মনে মনে ভাবল সে। এতদিন শুধু নামই শুনেছে, কখনও দেখেনি। এত রাগী! বাবা রে বাবা! আমি তো আর কখনও উনার সামনে যাব না!

“উনার হাতেই তো আমি থাপ্পড় খেয়েছি—হায় খোদা! এখন যদি উনি বাড়ির সবাইকে বলে দেন, আমি তাকে ‘আই লাভ ইউ’ বলেছি, তাহলে তো সোজা বাড়ি থেকে বের করে দেবে!”

“না না… উনি নিশ্চয়ই কিছু বলবেন না,” নিজেকে শান্ত করল সে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভয় ফিরে এলো।

হঠাৎ পেছন থেকে পায়ের শব্দ পেতেই,
রাহার শরীর কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাতেই থমকে গেল—আবারও সিঁড়ি বেয়ে নামছে সেই মানুষটা।
কাপড় পরিবর্তন করে, একদম অন্যরকম লাগছে তাকে।

রাহার পাশ দিয়ে বাতাসের মতো চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বলল—
“আমার জন্য যেন কেউ অপেক্ষা না করে । আমার সময় হলে আমি নিজেই বাসায় আসব। আর বাড়ির মেয়েরা যেন কখনও একা বের না হয়—এমনকি ফ্রেন্ডসদের সাথেও না। মাইন্ড ইট।”

রাহার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের শরীর ছুঁইছুঁই দূরত্ব, তার শরীরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। কড়া ম্যানলি পারফিউমের গন্ধ নাকে আসতেই অদ্ভুত এক শীতলতা ছেয়ে গেল তার শরীরজুড়ে।

অভ্রের কথায় ধ্যান ভাঙল তার।
“কি বলল…? বাইরে যেতে পারব না?”
“এইরে গেলাম আমি… ফিনিশ!”
অভ্রের শেষ কথার মানে আর কেউ না বুঝলেও রাহা ঠিকই বুঝেছে।

—————

বাড়ির কাজের মেয়ে আয়েশা এসে সবকিছু পরিষ্কার করে আগের মতো করে দিল। এখন দেখলে মনেই হবে না যে, কিছুক্ষণ আগেও এখানে এত ভাঙচুর হয়ে গেছে।
সবাই কোনো কথা না বলে যার যার ঘরে চলে যায়—এসব নিয়ে পরে কথা হবে বলে।

রাহার ছোট আম্মু, মিসেস নাজিরা বেগম, তার ছোট দুই মেয়ে আয়রা ও জায়রাকে খাইয়ে দিলেন। তারা দুই জমজ বোন, বয়স ৮ বছর।
এছাড়া আর কারো খাওয়া হলো না।

রাহা, শিফা—তারাও খায়নি। বাড়ির বড়রা না খেলে, তাদেরও যে গলা দিয়ে খাবার নামবে না।

রাত ১০টা। শিফা তার বাবা-মায়ের রুমে এসে ডাকল—
“মা, আসবো?”

— “হ্যাঁ, আয়। কালকে তো রাহার জন্মদিন।”

--“আরে হ্যাঁ! মনে ছিল, কিন্তু সন্ধ্যার ঘটনায় মাথা থেকে বিষয়টা বেরিয়ে গেছিলো। কয়টা বাজে এখন?”

— “১০টা।”

“আচ্ছা মা, ভাই এমন করলো কেন? যখন বাসায় আসলো, তখনও কারো সাথে কোনো কথা বলেনি—শুধু একটু নিচে বসে ছিলো। আর রাহা অজ্ঞান হওয়ার পর তো বেরিয়ে গেলো।
আর বাসায় এসেই এভাবে ভাঙচুর করার কারণও বুঝতে পারলাম না। আমাদেরও বাইরে বের হতে নিষেধ করে দিলো…!”
উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলো শিফা—হয়তো কিছু বলবে।

কিন্তু আফসানা বেগম তখনও নিশ্চুপ।
কি উত্তর দেবেন তিনি? দেওয়ার মতো যে কিছু নেই। পুরনো অতীতের খাতা যে খুলতে চান না তিনি।
অবশেষে আফসানা বেগম বললেন—
“এসব ছাড় মা, সব ঠিক হয়ে যাবে। রাহার জন্মদিন নিয়ে ভাব। ১২টায় সবাই ওকে সারপ্রাইজ দিবো, আর কালকে বার্থডে পার্টি হবে। সবাইকে তো আজকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে।
সবাইকে বলে আয়—১২টার আগে যেন তৈরি থাকে।”

“ঠিক আছে মা,” বলে মলিন মুখে বের হয়ে গেলো শিফা—সবাইকে মনে করিয়ে দিতে।

এদিকে আফসানা বেগমের মুখটাও মলিন হয়ে যায়। চোখ ভরে ওঠে নোনা পানিতে। স্বামীর দিকে তাকাতেই তা ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ে।

তাদের সব কথোপকথন শুনছিলেন আমান খান। কিন্তু তার কাছেও যে উত্তর দেওয়ার মতো কিছু নেই।

বলতে গেলেই বেরিয়ে আসবে অনেক ঘটনা—
এমনকি তা হতে পারে এই পরিবারের ভাঙনের কারণ, যা তারা কেউই চায় না।

আফসানা বেগমের খুব সখের সংসার—
তিন জা মিলে বছরের পর বছর খুব মিলেমিশে একসাথে কাটাচ্ছেন। সুখ-দুঃখে একে অপরের পাশে থাকেন—ঠিক যেন মায়ের পেটের তিন বোন।

আমান খান তখন বললেন—
“চিন্তা করো না, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।”
হালকা করে মুচকি হাসলেন তিনি।

আফসানা বেগমও স্বামীর কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন, আর মৃদু হাসলেন।

—————

রাহা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে ভাবছিল—
“অভ্র ভাই এমন কেনো…!”
উনি দেখতে তো মাশাল্লাহ—সত্যিই খুব সুন্দর, হ্যান্ডসাম,, কিন্তু এত রাগী কেনো!
একটু হাসলেই কি এমন হয়?গোমড়া মুখ করে থাকার মানে কি!
সে যাই হোক, আমার কি! উনি রাগী হলেই বা কি, না হলেই বা কি..!

কিন্তু আমার তো বাইরে বের হওয়া—
বলতে বলতেই হঠাৎ—
“আআআআআ!” করে কেঁদে উঠল।

আর সাথে সাথে অবন্তিকাকে বকতে শুরু করল—কেন তখন তার কথা শুনতে গিয়েছিল!
রাহা তো চিনতেই পারেনি—এই লোকটাই তার অভ্র ভাই!
চিনলে সাথে সাথেই মাফ চেয়ে নিতো। কিনা কি মনে করবে তাকে এখন।কীভাবে বুঝাই তাকে..!

 আর চিনবেই বা কীভাবে? বড় হওয়ার পর তো আর দেখেইনি।
শুধু জানে—তার বড় আব্বুর একটা ছেলে আছে। ছোটবেলায় একটা ছবি দেখেছিল, কিন্তু বড় হয়ে আর কোনো ছবিই দেখেনি। কারণ এতদিন তাদের ছেলের সাথে কোনো যোগাযোগই ছিল না।

১৩ বছর বয়সে অভ্রকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল।
কারণটা আজও বাড়ির বড়রা ছাড়া কেউ জানে না। তারা যেহেতু কিছু বলেনি, তাই কেউ আর প্রশ্নও করেনি।

দুই-একবার শিফা জিজ্ঞেস করলেও উত্তর পাওয়া যেত—
“পড়াশোনার জন্য গেছে, সময় হলে ফিরে আসবে।”

মায়ের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে তাই আর কিছু জিজ্ঞেস করত না শিফা।

রাহা চুল বেঁধেই শুয়ে পড়ল।
আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—
“থাপ্পড়ের বদলা তো আমি নেবই, চান্দু! আমাকেও আপনি চিনেন না—হুঁ!”

বলেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমাল।

—————

রাত ১১টা ৩০ মিনিট…
কেউ একজন খুব ধীরে ধীরে রাহার রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো......!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp