দুদন্ড স্থির হয়ে বসতে পারছেনা প্রিয়ন্তী। বিগত মিনিট ত্রিশ যাবৎ অস্থির হয়ে লাগাতার পায়চারি চালিয়েই যাচ্ছে। ঘরের এক কোণ হতে আরেক কোণ পায়চারি করতে করতেই মাথায় পাকাছে একের পর এক প্রশ্নের সমারোহ। আচ্ছা লোকটা চায়টা কি?কেন করছে আবারও এমনটা?কেন পুরোনো ক্ষত না শুকাতেই সেখানে নতুন ঘা তৈরী করতে উঠে পড়ে লেগেছে সে? আচ্ছা বজ্জাত মানুষতো একটা! বারবার এইরকম আচরণ করার মানে কি দাঁড়ায়? ও কি মানুষ নয়? নাকি ওর মন নেই? খারাপ লাগেনা ওর? আগেরবার যাওয়ার আগে কাঠকাঠ গলায় বিন্দুমাত্র ভাবান্তর না এনে লোকটা যে ও-কে সরাসরি না বলে দিয়েছিল সেই অনুতপ্তবোধ টুকু ও কি নেই? তাহলে এখন আবার কেন এমনটা করছেন তিনি? এভাবে বারবার মজা নেওয়ার মানেটা কি? এই মজার ছলে আটকেই তো এত বড় একটা ছেকা খেয়েছিলো সেইবার। ভাবতে ভাবতেই প্রিয়ন্তী থেমে দাঁড়ালো। তারপর হঠাৎই রাগে ফুঁসে উঠে বলল বিড়বিড় করে,
“নিজেকে কি ভাবে সে? হুঁ? সবসময় কেন এমন করবে? প্রথমে মানুষকে কনফিউজ করবে, তারপর আবার নিজের মতো করে সরে যাবে!ব্যাটা জোচ্চোর, খাটাস, নিরামিষ, বান্দর, হনুমানের বাচ্চা!"
নিজের অজান্তেই আরও কয়েকটা অর্ধেক উচ্চারিত গালি বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে। রাগের কারণে বুকটা ওঠানামা করছে দ্রুত। অস্থির হয়ে গিয়ে টেবিলের উপর রাখা ফোনটা তুলে নিয়ে কল লাগাতে গেল শ্রেয়া কে। কল বাটনের উপর চাপতে গিয়েও কি মনে করে যেন থেমে গেল। এ-কি করতে যাচ্ছিলো ও?
না, না।এই মেয়েটাকে জানালে নিশ্চই মেয়েটা আগের বারের মতো এবারও ওকে উল্টাপাল্টা লজিকে বুঝ দিতে আসবে। একটা বিরক্ত শ্বাস ফেলে ফোনটা আবার রেখে দিল টেবিলে। দুই হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরল। এভাবে থাকা যাচ্ছে না।এই বাড়িতে থাকলেই তো লোকটার সামনে পড়তে হবে।
আর সেটা চায় না ও। একদমই না।যে অনুভূতিটাকে এত কষ্ট করে চাপা দিয়েছে, ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে সেই অনুভূতি আবারও পুনরুৎজীবিত করতে চায়না প্রিয়ন্তী।কিন্তু করবেটা কি?ভাবি অসুস্থ।
এই অবস্থায় ছেড়ে চলে যাওয়াটা নিশ্চই শোভনীয় দেখায় না।প্রিয়ন্তী চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শ্বাস নিল। এভাবেও থাকতে পারবেনা যে ও। ফট করেই মাথায় একটা আইডিয়া আসতেই হন্তদন্ত হয়ে দরজার দিকে ছুটলো ও। দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল করিডোরে। সোজা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়াল ভাবীর রুমের সামনে। দরজাটা ভিরিয়ে রাখা। ওর ভাবি নিচে মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। উপরে আপাতত ওর ভাই একাই। ভেতরে পাভেল তখন তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম ছেড়ে বেরিয়ে আসছে।
প্রিয়ন্তী আস্তে করে নক করল দরজায়,
"ভাইয়া আসবো?"
“কি রে? কিছু বলবি?”
“ভাইয়া একটু কথা ছিল।”
পাভেল বিছানার ধারে বসে তোয়ালেটা পাশে রাখল।বলল,
“হুম, বল। শুনছি।”
প্রিয়ন্তী থামল এক সেকেন্ড। গলা শুকিয়ে আসছে যেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আমি মানে, আমি ভাবছিলাম এখানে না থেকে বাড়িতে ফিরে যাই ভাইয়া?"
কথাটা বলেই চোখটা নামিয়ে ফেলল ও।পাভেল তৎক্ষণাৎ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে বলল,
“কেন?”
“ সামনে তো আমার পরীক্ষা। প্রিপারেশন নিতে হবে। আর বইও তো সাথে করে নিয়ে আসিনি।"
“আর কোনো সমস্যা নেই তো?”
তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়িয়ে বলল প্রিয়ন্তী,
“না ভাইয়া! আর কিছু না। পরীক্ষা সামনে তো। পড়তে হবে। আর বইও আনিনি সাথে করে এভাবে হুট্ করে চলে আসলাম না? তাই বলছিলাম কি, ভাবি নাহয় থাকুক, আমি আর দাদি ছলে গেলে..
“পড়া তোর এমনেতেও হবে না এখন।”
“মানে?”
পাভেল শান্ত গলায় বলতে শুরু করল,
“কাল রাতে আমরা এখান থেকেই গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে যাচ্ছি। আমার ফ্রেন্ডের বোনের বিয়ে ভুলে গেছিস? এখান থেকে গেলে রাস্তাটা আরও ইজি হবে।নাহলে দেখা যাবে আরও দূর জার্নি করে যেতে হচ্ছে। তাই আমি ভেবেছি পুরো ফাংশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবো।”
প্রিয়ন্তীর মুখের রঙ ফিকে হয়ে এলো পাভেলের কথা শুনতেই।পাভেল আবার বলল,
“একেবারে বিয়ে শেষ হলেই সবাই একসাথে ফিরব বাড়ি। তিন-চার দিন তো লাগবেই। মেনেজ করে নে। এছাড়া আর কোনো সমস্যা নেইতো?"
বলে এক ভ্রু কুঁচকে তাকালো পাভেল। প্রিয়ন্তী তড়িঘড়ি মাথা নেড়ে না বুঝালো। বিয়ের ব্যাপারটাতো পুরোপুরি মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল ওর। এমনকি পাভেলের আগ থেকে বলে রাখা, শপিং যাওয়া সেটাও মাথা থেকে সরে গিয়েছিলো।সবকিছু মিলিয়ে মাথাটা ভনভন করতে লাগল ওর। নিঃসব্দে মাথা নেড়ে বেরিয়ে এলো প্রিয়ন্তী রুম ছেড়ে। করিডোরে দাঁড়িয়েই একবার চোখ বন্ধ করল। তিন-চার দিন! আরও তিন-চার দিন এই বাড়িতে থাকতে হবে। মুখোমুখি হতে হবে ওই লোকটার? কিভাবে পারবে ও নিজেকে সামাল দিতে? উপরন্তু লোকটা ওর পিছে যেভাবে লেগে আছে তাতে না আবার রেগে গিয়ে দূ চারখানা কঠোর বাক্য ছুড়ে দেয়। আজ যদি এই লোকটার জায়গায় অন্য কেউ হতো নিশ্চই প্রিয়ন্তী এভাবে নিঃশব্দে এতকিছু মেনে নিতো না? সম্পর্কের দিক থেকে যে ও আটকা। ভাবীর বড় ভাই হয় সে। প্রিয়ন্তী চায়না ওদের মধ্যে যে বিষয়টা নিয়ে ভুলবুঝাবুঝি হয়েছে সেটা নিয়ে ওর ভাই ভাবীর মধ্যে কোনো প্রকার জামেলার সৃষ্টি হোক।
—————
সেদিন রাতটা প্রিয়ন্তী নিজেকে ঘরবন্দি করে রাখল। বেরোলো না আর। ডিনারটা পর্যন্ত করেনি মেয়েটা।
রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করেই বিছানায় গা এলিয়ে দিল।নিচে গেলে যে লোকটার সম্মুখীন হতে হবে ওকে। যেটা প্রিয়ন্তী একদমই চায়না আর। এমনিতেই লোকটাকে দেখলে পুরোনো স্মৃতি কিরবির করে উঠে। মাথাচারা দেয় মস্তিস্ক জুড়ে। যতই হউক।জীবনের প্রথম ভালোলাগা ওর। ভালোবাসাও তো ছিল। একদমই ভালোবাসিস না প্রিয়ন্তী তুই। ছি। এতোটাও দুর্দশা হয়নি তোর। যে তোকে প্রত্যক্ষভাবে রিজেক্ট করেছে তাকে নিয়ে ভাবার কোনো প্রশ্নই আসে না। ব্যাটা নিরামিষ একটা। মানুষকে এভাবে বিব্রত করে কি মজা পায় কে জানে। মনে মনে নিজেকে নিজেই হাজার ধমকে ধামকে শান্ত করতে চাইলো।
ওদিকে নিচতলায় তখন রাতের খাবারের প্রস্তুতি শেষ।
মোহনা বেগম নিজে হাতে সব গুছিয়ে রেখেছেন।
টেবিলে একে একে বসেছে সবাই। মিতালী, পাভেল, তাজধীর, দাদি।মোহনা বেগম প্লেট সাজাতে সাজাতে হঠাৎ বললেন,
“প্রিয়ন্তীকে ডাকিসনি?”
মিতালী বলল,
“ডেকেছিলাম আম্মু, প্রিয় বোধহয় ঘুমিয়ে গেছে। রুমের লাইট অফ ছিল।”
মোহনা বেগম থামলেন।চোখ তুলে বললেন,
“এই সময় ঘুমিয়ে গেছে? খাবেনা মেয়েটা?”
পাভেল বলল,
“ভার্সিটি থেকে আসার সময় নাকি ফ্রেন্ডদের সঙ্গে খেয়েছিল। খুদা নেই বলল।"
"ওহ!"
সবাই মনোযোগ দিলে খাবারে। খাবারের পুরোটা সময় আর একটা বাক্যও ব্যায় করল না তাজধীর। চুপচাপ যেভাবে এসেছিলো সেভাবে খেয়েই চলে গেল উপরে।
—————
ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল প্রিয়ন্তীর। মেয়েটা খুদা সহ্য করতে পারেনা। প্রথমে ঘুমালেও শেষ রাতের দিকেই ঘুম ভেঙে যায় ওর। পেটের মধ্যে ইঁদুর হাতুড়ি পিটা করছে। পরপর দুই গ্লাস পানি খেয়েও শান্ত থাকতে পারছেনা। মাত্র বাজে সকাল ৭ টা। পেটে কিছু না যাওয়া অব্দি শান্তি পাবেনা ভেবেই একপর্যায়ে উঠে বসে ও। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো নিচে নেমে টুকটাক কিছু খেয়ে নিবে। এত সকালে নিশ্চই ওই নিরামিষ ব্যাটা ঘুম থেকে উঠবে না। যেই ভাবা সেই কাজ। কোনোরকম ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই চোখে পড়ল বড় সোফাটায় আরামসে বসে বসে সকালের পত্রিকা পড়া মোহনা বেগমে। প্রিয়ন্তীকে নামতে দেখেই চোখ তুলে বললেন তিনি,
“আরেহ প্রিয়ন্তী, এত ভোরে উঠলে যে?"
প্রিয়ন্তী অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে নামতে নামতে বলল,
“ঘুম ভেঙে গেছে আন্টি।”
"পেট খালি থাকলে ঘুম কিভাবে আসবে? নিশ্চই ক্ষুদা পেয়েছে?"
প্রিয়ন্তী ইতস্তত করে আমতা আমতা করে বলল,
"ওই মানে একটু পেয়েছে আরকি।"
ভদ্রমহিলা উঠে সোজা কিচেনের দিকে হাঁটা দিলেন। প্রিয়ন্তী অপ্রস্তুত হয়ে আস্তে আস্তে নামল নিচে। কাজের মেয়েটা তখন সকালের নাস্তা বানানোর কাজে ব্যস্ত। মোহনা বেগম নিজের হাতেই পরোটা ছেকে এনে টেবিল সাজালেন। গরুর মাংস গরম করলেন। টেবিলে আগে থেকেই জুস্, ব্রেড রাখা ছিল। প্রিয়ন্তী খানিকটা লজ্জায় দুনোমুনো মনে গিয়ে বসল টেবিলে। বারকয়েক না করল মোহনা বেগম কে এতটা হাইপার হতে হবেনা। যা আছে তাতেই হবে। ভদ্রমহিলা শুনলে তো। প্রীতিন্তীর মাঝে মাঝে খুব অবাক লাগে, মা এত ভালো, ওর ভাবি ওতো কত মিশুক ভালো। তবে ওই নিরামিষ ব্যাটা কার মতো হয়েছে কে জানে।
কাজের মেয়েটা ডিম পোস করে এনে প্রিয়ন্তী কে দেখে অবাক হয়ে বলল,
“আপা! এত সকালে উঠছেন যে? খিধায় ঘুম আসেনাই মনে হয়। না খাইয়া শোন্ কিসের জন্য? আমার মা বলতো না খাইয়া সুইলে শরীর থেইকা হাফ কেজি মাংস নাকি কৈমা যায়। আপনার চেহারাটাও হের লাইগা কেমন শুকনা শুকনা লাগাতাসে।"
প্রিয়ন্তীর লজ্জায় মাথা কাঁটা যাওয়ার মতো অবস্থা। এরকম বিব্রতকর অবস্থায় কোনো শুত্রুও না পড়ুক। ইশ!
—————
সকালের কোমল রশ্মিটুকু সরে গিয়ে ধাবিত হয়েছে খরক্ষরে রৌদ্দুর। সিদ্দিক কুঞ্জের ছাদটা বেশ বিস্তৃতই।চারপাশে নিচের বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায় এখান থেকে। সামনে পুরোটা জুড়ে সাজানো বাগান। গোলাপ, গাঁদা, আর নানা রঙের অচেনা ফুলে ভরা বাগানটা। মাঝখানে ছোট্ট ফোয়ারা। যেখান থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। এইসব কিছুই পূর্ণ মনোযোগে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে প্রিয়ন্তী।
পরনে ওর গাঢ় পেস্ট রঙের লিনেনের একটা পাকিস্তানি লং থ্রি-পিস। বাতাসে ওড়নাটা আস্তে আস্তে দুলছে। চুলগুলো কাঁটা দিয়ে এলোমেলো ভাবে পেঁচিয়ে রাখা। রুমে থাকতে দমবন্ধ লাগছিলো। তাই উঠে এসেছে ছাদে। খোলা হাওয়ার নিচে থাকলে হয়তো কিছুটা ভালো লাগবে। নিয়মমতো গতকাল রাতেও একই নাম্বার থেকে ওর ফোনে মেসেজ এসেছে। প্রতিদিনের মতো সকালে উঠে সেই ফোনে কল ব্যাক করলেও কোনো লাভ হয়নি। বরাবরের মতো সুইচ অফ এসেছে। প্রিয়ন্তীর আজকাল একটু বেশিই অস্বস্তি লাগে। কেন যেন খুব ভয় ও হয়। দিন দিন সে ভয়ের মাত্রাটা বাড়ছে বৈকি কমছে না। একবার মন চায় বিষয়টা ওর ভাইকে শেয়ার করতে। তবে অনেক কিছু ভেবেই পরবর্তীতে পিছ পা হয়ে যায় ও। শুধু শুধু এসবে ওর ভাইকে জড়ালে দেখা যাবে ওকে নিয়ে অতিরিক্ত টেনশন করবে।
“মিসের কি মন খারাপ নাকি?”
পেছন থেকে ভেসে এলো অতিপরিচিত ভারিক্কি, পুরুষালি গভীর সেই কণ্ঠখানা। প্রিয়ন্তী পিছন ঘুরল না। আর নাতো কোনো উত্তর দিলো। এই লোকটার জ্বালায় দুদন্ড শান্তিতে শ্বাস টাও ফেলা মুশকিল যেন। ঠিক যেখানে সেখানে এসে হাজির! গত রাত থেকে কতভাবে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে—ডিনার পর্যন্ত স্কিপ করেছে। না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। সকালে সবার আগে উঠে খেয়ে পালিয়েছে শুধুমাত্র লোকটার মুখোমুখি না হতে।
ওদিকে তাজধীর কয়েক পা এগিয়ে এলো। এসে দাঁড়ালো কাছাকাছি। লোকটা দাঁড়াতেই পুরুষালি ওই শরীর থেকে ভেসে আসা মিষ্টি সুবাসটা ভুরভুর করে বাতাসের সঙ্গে এসে নাকে ভারি খেল প্রিয়ন্তীর। ততক্ষনে লোকটা আরও কাছে এসে, গলা খানিকটা নামিয়ে আবার বলল,
“মিস বোধ হয় কোনো কারণে আমার ওপর রেগে আছেন?”
বারবার! বারবার একই কথা! এইবার প্রিয়ন্তীর ধৈর্য ভাঙল। জমে থাকা বিরক্তিটা আর চেপে রাখতে পারল না। টগবগ করা চোখে স্ফুলিঙ্গ ঝরে পরল যেন,
“আচ্ছা আপনার আমাকে নিয়ে ইন্টারেস্ট কেন? হ্যা? আপনার তো আবার মেয়েদের ব্যাপারে ইন্টারেস্টই নেই। আপনার ইন্টারেস্ট থাকার কথাতো অন্য কিছুতে…”
প্রথমের কথাটা খানিকটা উচ্চ বাক্য বললেও শেষের কথাটুকু নিজ মনে বিড়বিড় করে করে থামে প্রিয়ন্তী। আড় চোখে তাকাতেই বন্ধি করে নিলো লোকটার গেট আপ। ব্যাটা নিশ্চই সকালের ফ্রেশ শাওয়ার নিয়ে এসেছে। পরনে একটা কালো রঙা ট্রাওজার আর লেমন কালার টি শার্ট। উজ্জ্বল ফর্সা গায়ে লোকটাকে বোধহয় সবকিছুতেই কেমন অদ্ভুত ভাবে মানিয়ে যায়। তুড়ন্ত চোখ সরিয়ে নেয় প্রিয়ন্তী। ছিঃ! নির্লজ্জ মেয়ে। তাকাবি না। একদম তাকাবি না। মনে নেই লোকটা তোকে কিভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভেবেই কঠোর হলো প্রিয়ন্তী। সিদ্ধান্ত নিলো এখানে আর এক সেকেন্ড ও না। চলে যাবে নিচে।
ততক্ষনে লোকটা যে এসে একদম পাশে দাঁড়িয়েছে—প্রিয়ন্তী টেরই পায়নি। সে-ও রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল। দৃষ্টি স্থির নিচের বাগানে। তারপর সামান্য ঝুঁকে, খুব স্বাভাবিক স্বরেই বলল,
“ইন্টারেস্ট তো থাকতেই হবে, মিস প্রিয়ন্তী! না হলে আজকাল যেভাবে চোরের উপদ্রব বেড়েছে,কখন না জানি বাড়ির মানুষকেই চুরি করে নিয়ে যায়।”
প্রিয়ন্তী কপাল কুঁচকে তাকাল এবার।বলল অনিচ্ছায়,
“মানে?”
“মানে আর কি! স্বয়ং লেফটেন্যান্ট কমান্ডারের বাড়ি থেকে তার অতি প্রিয় মাছ চুরি হয়ে যায় আজকাল। এটা কি কোনো সাধারণ চোরের কারসাজি বলুন? এই চোর নিশ্চই দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রফেশনাল কোনো চোর টোর-ই হবে।নাহলে দিন দুপুরে চুরি? তাও কিনা আমারই বাড়ি থেকে? এসব কি মানা যায় বলুন?সাহসটা কল্পনা করতে পারছেন? সরাসরি নেভির একজন অফিসারের বাড়ির অ্যাকুয়ারিয়ামে হাত দেওয়া!”
পা থেকে মাটি সরে যাওয়ার জো প্রিয়ন্তীর। গলা শুকিয়ে গেছে ইতিমধ্যে। মাথায় প্রচন্ড জোরে বাজ ভেঙে পড়ল বিনামেঘেই। ইশ! ইশ! ওতো ভুলেই বসেছিল ব্যাপারটা। মাথা থেকেই তো বেরিয়ে গিয়েছিলো বিষয়টা। এখন কি হবে? পরপর বলে গেল লোকটা,
“লোকজন যদি শোনে কি বলবে বলুন তো?
যে নিজের বাড়ির একটা ছোট্ট অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছই নিরাপদে রাখতে পারে না সে নাকি সমুদ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে! হাসবে না আমায় নিয়ে?আজেবাজে কথাওতো রটাবে।"
তিরটা ঠিক জায়গাতেই লাগল।প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠল।হাতের আঙুলগুলো থরবর করে কেঁপে উঠল। শুষ্ক গলায় ঢোক গিলল। মনে মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। তাহলে কি লোকটা জেনে গেছে?যে ওই চুরি করেছে মাছটা?পরের সেকেন্ডেই নিজেকে থামাল সে। নিজেকেই ধমকাল মনে মনে। লোকটা তো জানেই না কে নিয়েছে! তাহলে ও এত ঘাবরাচ্ছে কেন? স্ট্রং হ প্রিয়ন্তী। ডোন্ট বি প্যানিকড। কিছু হয়নি। গভীর একটা শ্বাস নিল প্রিয়ন্তী। মুখের অভিব্যক্তি শক্ত করল জোর করে।প্রিয়ন্তী নিজের ভেতরের অস্থিরতা চেপে রেখে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলে উঠল,
“একদম ঠিক করেছে!"
তাজধীর কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।তারপর আকস্মিক শব্দ করে হেসে উঠল লোকটা। আশ্চর্য। এ ব্যাটার আবার কি হয়েছে। পাগলের মতো এভাবে হাসছে কেন হঠাৎ? এমা কিছু বুঝে ফেলেছে নাকি আবার?
“আনফরচুনেটলি ঐযে, ওইখানে একটা সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছিলাম কোনো একদিন।উম শুধু এখানে না, বাড়ির প্রায় প্রতিটা কোণেই লাগানো হয়েছিল আরকি। দুর্ভাগ্যবশত প্রতিটি সিসি ক্যামেরাই সচল। মানে একদম ঠিকঠাক আরকি।"
পাশে দাঁড়িয়েই সামান্য ঝুঁকে আঙুল তুলে নিচের গেটের দিকে ইশারা করে বলল কথাগুলো। প্রিয়ন্তীর বুক ধড়ফড় করে উঠল আচমকাই।গেছিস প্রিয়, তুই গেছিস এবার।পরপর শুনতে পেল আবারও,
“কি করব বলুন? বাড়িতে তো আর থাকি না। আম্মু একা থাকেন, মিতালীও তখন ছিল। মা-বোনের নিরাপত্তার দায়িত্বটা তো আমারই। কাজের দোহাই দিয়ে তো এসব দায়িত্ব থেকে পালানো যায় না, তাই না?”
প্রিয়ন্তীর গলা শুকিয়ে কাঠ। ঢোক গিলল বহু কষ্টে।
মনে হচ্ছে গলা দিয়ে শব্দই বের হবে না।চোখ-মুখ কুঁচকে, মিনমিন করে বলল,
“তো আমাকে এসব বলছেন কেন আপনি?চুরি কি আমি করেছি নাকি?নাকি আমি শুনতে চেয়েছি?”
তাজধীর ভ্রু গোটালো। তারপর একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ট্রাউজারের পকেট আচমকাই ওর ফোনটা বের করল। স্ক্রিন অন করল। একটু স্ক্রল করে থামল কোথাও একটা। তারপর একটা ভিডিও প্লে করে ফোনটা প্রিয়ন্তীর দিকে এগিয়ে ধরল সেটা। বলল বড্ড স্বাভাবিক গলায়,
“দেখেন তো এনাকে চিনেন কিনা। আমার কাছে কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে।মেয়ে মানুষের প্রতি আমার ওইরকম কোনো ইন্টারেস্ট নেই তো। অভিজ্ঞতাও কম। আপনি বোধ হয় চিনবেন। দেখুন না। একটু ভালো করে দেখুন চিনেন কিনা?"
প্রিয়ন্তী প্রথমে তাকাতে চাইল না। কিন্তু পরিস্থিতি এমন—না তাকিয়েও উপায় নেই। ভয়ে ভয়ে চোখ তুলল। স্ক্রিনে দৃষ্টি পড়তেই চোখ দুটো একদম কপালে উঠল বিস্ময়ে। বাকরুদ্ধ, কিংকত্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে রইলো কতক্ষন। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—
চারপাশ ফাঁকা দেখে চুপিচুপি ছাদে উঠছে একটা মেয়ে। পায়ের শব্দ কমানোর জন্য প্রায় টিপটো করে হাঁটছে। দরজার কাছে এসে একবার ডান-বাম তাকাল।তারপর অতি সপ্তপর্ণে চিলেকোঠার দরজাটা খুলে ঢুকলো ভিতরে।সোজা এগিয়ে গেল অ্যাকুয়ারিয়ামের সামনে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল—
মাছটার দিকে তাকিয়ে। তারপর আবার চারপাশে তাকাল একবার।আকস্মিক টপ করে হাত ঢুকিয়ে দিল পানির ভেতর! পরের সেকেন্ডেই হাত ছিটকে বের হলো। মাছটা ছটফট করছে মেয়েটার হাতে।
ভিডিওর মেয়েটা আঁতকে উঠে প্রায় লাফ দিয়ে পিছিয়ে গেল। আবার চারপাশে তাকাল ভয়ে।
তারপর কষ্ট করে আবার ধরল মাছটা। এইবার সাবধানে একটা ছোট কাঁচের বয়ামে ঢুকাল ব্লু হাফমুন ফিশটা। ঢুকানোর পরও বয়ামটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে—
মুখে এমন ভাব, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ করে ফেলেছে! শেষে আবার টিপটো করে দৌড়ে পালাল ঘর ছেড়ে। দরজা বন্ধ করতে গিয়েও একবার পিছলে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল! জাস্ট এতটুকুই। ভিডিও শেষ। প্রিয়ন্তীর মুখের রং ফ্যাকাসে। ঠিক চোর ধরা পড়ার মতোই হয়ে আছে। পুরো শরীর বরফ হয়ে জমে আছে জায়গাতেই।শেষ! মান সম্মান যা ছিটেফোঁটা বেঁচে ছিল সেটাও শেষ আপাতত। ধরা পড়ে গেছে সে।
একেবারে হাতে-নাতে। একটা কাজ ও ঠিকঠাক মতো করতে পারিস না? হতচ্ছাড়ি গাধী তোকে শ্রেয়া এমনিতেই বলে? একবার তো ভালো করে দেখে নিবি কোথাও কিছু আছে কিনা। মনে মনে নিজেকেই গাল দিতে ইচ্ছে করছে ওর। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে একপ্রকার। এই মুহূর্তে যদি ছাদের রেলিংটা একটু নিচু হতো—হয়তো সত্যিই লাফ দিয়ে পালাত! আর সবকিছুর চেয়েও বড় কথা
এই লোকটার সামনেই কেন বারবার এমন অবস্থা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে তোর ?কেন?কেন?কেন?
তবে প্রিয়ন্তী তো প্রিয়ন্তীই। সহজে হার মানার মেয়ে সে মোটেও নয়।মুহূর্তেই সমস্ত লজ্জা, অস্বস্তি সব চাপা দিয়ে গলা শক্ত করল ও। ঠোঁট শক্ত করে, ঘাড় টানটান করে বলে উঠল উল্টো,
“একদম ঠিক করেছি। চুরি করেছি।কি করবেন আপনি?আমার সাথে এরকম ইয়ার্কি করলে ভবিষ্যতে আরও করব।”
"তা আমার অতি পছন্দের মাছটাই চুরি করার কারণটা জানতে পারি কি?"
প্রিয়ন্তী ভ্রু তুলে তাকাল। বলল কাঠকাঠ,
“কারণ লাগবে কেন?সম্পর্কটা তো আমাদের ওইরকমই, তাই না?আমি তো সম্পর্কে আপনার বেয়াইন হই আর আপনি বেয়াই।বেয়াই বেয়াইনের মধ্যে এরকম একটু আকটু মজা হয়েই থাকে।"
নিশ্চুপ তাজধীর এপর্যায়ে ভ্যাবাচেকা খেলো।প্রিয়ন্তী আর দাঁড়ালোই না। উল্টো ঘুরে পা বাড়ালো সামনে। ছাদে থেকে নেমে সিঁড়ির দিক ধরতে ধরতে বলল,
“আর শুনুন, ভবিষ্যতে আমার সাথে এরকম ইয়ার্কি করলে এখন তো একটা মাছ নিয়েছি! তখন কিন্তু আরে একটা মাছও আস্ত রেখে যাবোনা। সবগুলো নিয়ে চলে যাব। তাই সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি ঘরের তালাটাও মজবুত করে রাখবেন নেক্সট টাইম থেকে!"
বলেই গটগট পায়ে নামতে শুরু করল সিঁড়ি ধরে।
ছাদে একাই দাঁড়িয়ে রইল তাজধীর।অতীব মাত্রায় আশ্চর্য হয়ে থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকলো কীয়তক্ষণ ওভাবেই। তারপর আচমকাই শব্দ করে হেসে উঠল সে। প্রিয়ন্তীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দূ হাত দিয়ে অর্ধ ভেজা চুলগুলো পেছনে ঠেলতে ঠেলতে বলে উঠল,
“ইন্টারেস্টিং!"
Page 2
দুপুরের খাবার শেষে ভাতঘুম দিয়েছেন মোহনা বেগম। দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতা আর দামি ওষুধের প্রভাবে জীবনযাপন নিখুঁত নিয়মের বাঁধনে আবদ্ধ তার। একটুও এদিক-সেদিক হওয়ার কোনো উপায় নেই। আপাতত ড্রয়ইং রুমের সোফায় বসে আছে ননদ, ভাবি। দেয়ালে এটাস্ট করা বড় টিভিটা অন থাকলেও কারো তেমন মন নেই সেদিকে। প্রিয়ন্তী ব্যস্ত তার ভাইয়ের অনাগত ছেলেমেয়েদের নাম ঠিক করতে। মেয়ে হলে কি নাম রাখবে সেটা ঠিক করতে পারলেও বিপত্তি বাধে ছেলেদের নাম ঠিক করতে গিয়ে। মনে মনে ঠিক করে রেখেছে যদি আগে ভাইয়ের ঘরে ছেলে সন্তান আসে, আর পরে তার নিজের ঘরে মেয়ে, তবে সেই ভাইপোর সঙ্গেই একদিন বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করবে নিজের মেয়েকে।
মিতালী আপেলের টুকরোয় কামড় বসাচ্ছে। যাওয়ার আগে মোহনা মেয়েকে এক প্লেট ফ্রুটস ধরিয়ে দিয়ে গেছেন। কড়া গলায় বলেছেন, সবগুলো শেষ করতে।একটাও যেন অবশিষ্ট না থাকে। হঠাৎই কিছু মনে পড়ার মতো করে কপালে হাত ঠুকল মিতালী,
"ইশ! আমি তো ভুলেই বসেছিলাম, প্রিয়!"
“কি হলো, ভাবি?"
“আমার মাথা থেকেই একদমই বের হয়ে গেছে ব্যাপারটা।তোমার ভাই যে বারবার ফোন করে বলে গেছে আজ সন্ধ্যায় আমাদের নিতে আসবে!আমরা যেন রেডি হয়ে থাকি আগে থেকেই। অথচ দেখো,আমাদের তো এখনো শপিং করাই হয়নি! আসার সময় তাড়াহুড়ায় বাড়ি থেকেও তো কিছু আনা হয়নি। হায় আল্লাহ এখন কি হবে?"
"আল্লাহ! আমার মাথাতেও তো ছিলোনা, ভাবি। ইশ!ভাইয়া তো বহু আগে থেকেই শপিংয়ের কথা বলে দিয়েছিলো আমায়।এখন কি হবে?"
“সেটাই তো বলছি ! আমারও তো কিছু কেনা হয়নি। কিছু সঙ্গে করে নিয়েও আসিনি!এই প্রিয়, তুমি বরং যাওনা একটু। আমাদের বাড়ি থেকে শপিং মল খুব একটা দূরে নয়। আর এখনো ৬-৭ ঘন্টার মতো বাকি আছে। তাতেই হয়ে যাবে!"
"আমি,আমি একা যাবো?"
চমকে উঠে বলল প্রিয়ন্তী। মিতালী অসহায় মুখ করে বলল,
"আমার শরীরটা ভালো লাগছেনা। নাহলে তোমার সঙ্গে আমিই যেতাম। এখন গেলে রাতে আর হলুদে যাওয়া হবেনা। শরীর কুলিয়ে উঠতে পারবেনা এতসব একসঙ্গে।তুমি বরং এক কাজ করো,ভাইয়া কে নিয়ে যাও। ভাইয়া তো বাড়িতেই আছে।আমি বললে ভাইয়া না করবেনা। আর তাছাড়া ভাইয়ার পছন্দ কিন্ত মারাত্মক সুন্দর, জানো তো!"
"অসম্ভব ভাবি। কি বলছো এসব। আমি, আমি উনার সঙ্গে? মানে কিভাবে কি?সমস্যা নেই। তারচেয়ে ভালো বরং আমি একাই যাই।"
"আরেহ না! তুমি একা গেলে তোমার ভাই জানতে পারলে আমায় খুব বকবে। আর তাছাড়া তুমি তো এখানের কিছু চিনোও না তেমন করে!"
প্রিয়ন্তী পড়ল মহা ফ্যাসাদে। এখন কি করবে ও? ভাবিকে কি বলে বুঝ দিবে। মরে গেলেও তো ওই নাক উঁচু লোকটার সঙ্গে একসঙ্গে কোথাও যাবেনা আর প্রিয়ন্তী। আর ওই লোকটাই কি যাবে নাকি যেচে পড়ে? অসম্ভব। তোর চিন্তা করার দরকার নেই প্রিয়ন্তী। দেখবি লোকটা নিজে থেকেই না করে দিচ্ছে। তখন তুই নাহয় একটা মলিন, অসহায় মুখ করে উল্টো ভাবীর কাছ থেকে সিম্পেথি নিতে পারবি। বেশ কয়েকটা কটু বাক্যও ছুড়তে পারবি লোকটাকে উদ্দেশ্য করে। এই ভেবেই প্রিয়ন্তী চুপ হয়ে গেল। আর ঘাটাল না। তাজধীর নেমে এলো তখনই। কাজের মেয়েটাকে বলল এক কাফ গ্রিন টি করে দিতে। মিতালী ভাইকে নিচে দেখতেই ডাকল।
"ভাইয়া, তুমি কি ফ্রি আছো?"
প্রিয়ন্তীর দিকে একপল তাকিয়ে দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয় তাজধীর। বোনের কথার পিঠে গমগমের সরে উত্তর করে,
"আপাতত! কেন কিছু লাগবে তোর?"
“আমার আর প্রিয়ন্তীর দু’জনেরই দরকার ছিল। আসলে আজ আমাদের একটা প্রোগ্রামে যাওয়ার কথা, কিন্তু শপিংয়ের বিষয়টা একেবারেই মাথা থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। এখন কিছু কিনাকাটা করা খুব জরুরি। আর আমার শরীরের অবস্থা তো দেখছোই… তুমি যদি প্রিয়কে সঙ্গে নিয়ে একটু মলে গিয়ে আসতে—খুব বেশি সময় লাগবে না। দুটো শাড়ি আর সামান্য কিছু জিনিসপত্রই তো লাগবে।”
প্রিয়ন্তী স্বাভাবিক বসে তখনো। চোখ দুটো নিবদ্ধ টিভির স্ক্রিনে। যেন খুব মনোযোগ ধরেই ঘন্টা খানেক লাগিয়ে দেখে যাচ্ছে সেটা। তাজধীর মেয়েটার নির্লিপ্ত সেই চাহুনি পরখ করে সোজাসাপ্টা গলায় নাখোজ জানিয়ে বলল,
"আমার সময় নেই।ড্রাইভার আছে—ওকে দিয়ে পাঠিয়ে দে!"
আর এই মুখ্যম সুযোগটুকুই ঝড়ের বেগে লুফে নিলো প্রিয়ন্তী,
“হ্যাঁ ভাবি! আমি ড্রাইভারকে নিয়ে চলে যেতে পারবো।”
মেয়েটার অযাচিত কথায় ভ্রু কুচকলো তাজধীর। এতক্ষনে হাফ ছাড়ল প্রিয়ন্তী। জানতো লোকটা এমনটাই বলবে। হলো ও তাই। ও তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে উঠে রুমেরে দিকে অগ্রসর হলো। ওদিকে নিরাশ হলো মিতালী। এত সুন্দর করে রিকোয়েস্ট করার পরও তার ভাই না করে দিলো? সিদ্ধান্ত নিলো সেই যাবে ননদের সঙ্গে। মেয়েটাকে একা ড্রাইভারের সঙ্গে পাঠানোটা কেমন দৃষ্টিকটু দেখায়।
ততক্ষনে গ্রিন টি এসে হাজির হলো তাজধীরের সামনে। সোফায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দূ চুমুক দিতে দিতে বিড়বিড় করল,
“বেয়াক্কল মাইয়া, মানবতার খাতিরেও তো অন্তত আরেকটা বার রিকোয়েস্ট তো করবি। এই যা! বেশি পার্ট দেখাতে গিয়ে কি উল্টো নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলাম নাকি!"
তাজধীর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চায়ের কাঁপটা খালি করে টেবিলে রাখতে রাখতে ভারিক্কি সরে বোনকে বলে গেল,
“আমি ওই পাশেই যাচ্ছিলাম একটা কাজে। যদি কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে তোর ননদকে পাঠিয়ে দিস। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।"
বলেই বেরিয়ে গেল সে। মিতালী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল দরজার দিকে। প্রিয়ন্তী নেমে আসতেই মিতালী জানাল, বাইরে তার ভাই অপেক্ষা করছে গাড়ি নিয়ে। দ্রুত যেতে। যা শুনতে না শুনতেই রীতিমতো চোখ কপালে তুলে বলল প্রিয়ন্তী,
“আমি যাব না ভাবি।"
"কেন প্রিয়? ভাইয়া নিজে থেকেই পরবর্তীতে বলল নিয়ে যাবে। প্লিজ না করোনা। ভাইয়া না গেলে আমায় যেতে হবে তোমার সঙ্গে। আমার শরীরটা একদমই সায় দিচ্ছেনা!"
প্রিয়ন্তী দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল,
"কিন্ত ভাবি! তোমারও যেতে হবেনা। প্রয়োজনে আমি শ্রেয়া কে বল দিচ্ছি। ওকে আসতে বলছি!"
"ভাই যেহেতু রাজি হয়েছেই, প্লিজ না করোনা। আর ভাইয়ার পছন্দ সত্যিই খুব সুন্দর। তুমি কথা না বাড়িয়ে এখন দ্রুত যাও। কিনাকাটা করতেও তো সময় লাগবে নাকি।তুমি ভাইয়ার সাথে গেলে অন্তত আমি চিন্তামুক্ত থাকব।”
আর কিছুই বলতে পারলোনা প্রিয়ন্তী।আর নাতো কোনো যুক্তিতে বোঝ দিতে সক্ষম হলো ভাবিকে। মিতালীর একপ্রকার জোড় করেই পাঠিয়ে দিলো মেয়েটাকে বাইরে। প্রিয়ন্তী যেতেই হাফ ছাড়ল মিতালী। যাক! ওর ভাইয়ের সঙ্গে মেয়েটাকে মাঝ সমুদ্রে ছেড়ে দিলেও চিন্তা হবেনা। তার ভাই মানুষটাই এমন।
—————
গাড়ির ইঞ্জিন অন রেখেই অপেক্ষামান তাজধীর।
ড্রাইভিং সিটে বসে এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে অপর হাতে আলগোছে ফোন চেকিং দিচ্ছে।চোখে রোদচশমা। গায়ে অলিভ গ্রীন রঙা শার্ট। হাতা গুলো সুন্দর করে গুছিয়ে কনুই পর্যন্ত টেনে রাখা। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাড়ি থেকে ধীর পায়ে বের হলো প্রিয়ন্তী। হাতে ছোট্ট একটা হ্যান্ডব্যাগ শক্ত করে চেপে ধরে ছোট ছোট কদমে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো কালো রঙা মারসিটিজটির সামনে।
গাড়ির কাছে এসে একবার আড় চোখে তাকাল তাজধীরের দিকে। তাজধীর তাকায়নি। যেন দেখতেই পায়নি। মন ধ্যান ডুবিয়ে ফোনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে রইলো ওমনেই। প্রিয়ন্তী নিসপিস করে গিয়ে দাঁড়ালো পিছনের দিকে। দরজার হ্যান্ডেলে হাত চেপে টানলো।
খুলল না দরজাটা।এবার খানিকটা জোড়েই টানল প্রিয়ন্তী। ফলাফল ঘুরেফুরে একই।বারকয়েক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চালিয়েও লাভ হলোনা বিশেষ।
একচুলও নড়ল না গাড়ির ডোর। ভেতরে বসে তাজধীর সবটাই দেখছে সামনের আয়নায়।প্রিয়ন্তী বিরক্ত হয়ে এবার জানালার কাছে এসে ঝুঁকল।অনীহা নিয়েই বলল,
"লক করে রেখেছেন কেন? ডোর খুলুন!"
“যেভাবে আমার গাড়ির ওপর রাগ ঝাড়ছেন,আমার গাড়ি ভেঙে ফেলার ধান্দায় নেইতো আবার?"
“আশ্চর্য! কোথায় বসবো আমি? দরজা না খুললে টানবো না? লক খুলুন!”
তাজধীর নির্বিকারে বলল,
“খুলছে না?”
“দেখতে পাচ্ছেন না? "
রীতিমতো চটে গিয়েই বলল প্রিয়ন্তী। বিনিময়ে তাজধীরের বরাবরের মতোই দায়সারা জবাব,
“সেটা তো আমারও প্রশ্ন। সামনের দরজা খোলা সেটা দেখতে পাচ্ছেন না? "
“আমি সামনে বসবো কেন?”
গলায় স্পষ্ট অনীহা নিয়ে প্রশ্ন করল প্রিয়ন্তী এবার।
তাজধীর এবার ফোনটা পাশে রেখে চোখ তুলে বলল,
“পেছনের দরজা যদি না খোলে, তাহলে অপশন কয়টা থাকে, মিস? ম্যাথটা তো একদমই সহজ!"
প্রিয়ন্তীর চোয়াল ঝুলে হাঁ হয়ে গেল। ছোট ছোট চোখ করে সন্দীগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইলো,
“আপনি ইচ্ছে করে লক করেছেন?"
“হতেও পারে! এখন আপনি যদি একজন নেভির লেফটেন্যান্ট কমান্ডার কে সরাসরি ড্রাইভার ভেবে তার গাড়িতে উঠে বসেন সেটা তো আর আমি এমনি এমনি মেনে নিতে পারিনা, তাইনা?"
"মানে?"
“মানেটা খুব সিম্পল! আপনি পেছনে বসে থাকবেন, আর আমি সামনে বসে আপনাকে ড্রপ করব—উম অ্যাকচুয়াললি এই সেটআপটা আমার সাথে যায় না।”
প্রিয়ন্তীর মাথা ভনভন করে উঠল রাগে। পুরুষ মানুষ এত পেঁচানো হবে কেন? আজব! কোথা থেকে কোথায় চলে যায়। অতশত আরে ভাবলনা প্রিয়ন্তী।এখন তো ফিরেও যাওয়া যাবেনা। অবশেষে কোনো উপায়ান্তর না পেয়েও একটা বিরক্ত শ্বাস ছেড়ে
সামনে দরজাটা খুলে ধপাস করে বসে পড়ল পাশে।
সিটবেল্ট টানতে টানতে বলল,
“চলুন!"
ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে গাড়ি স্টার্ট করল তাজধীর। প্রিয়ন্তী মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। অনিচ্ছায় এসে লোকটার পাশে বসলেও লোকটার শরীরের ওই মিষ্টি সফট ঘ্রানটা গাড়ির ভিতর ঘুরেফিরে এসে ওর নাকেই সুরসুর করে ঢুকছে যেন। যাতে মেয়েটার অস্বস্তি হুরহুর করে বাড়ছে বৈকি কমছে না। বাইরে তাকিয়ে থাকার ভান করলেও ভেতরে ভেতরে তোলপাড় হচ্ছে। রাগ, অস্বস্তি, লজ্জা, বিরক্তি সব মিলেমিশে ঝড় বইছে ওর ভেতরে।
গাড়ি চলতে শুরু করল। প্রথম কয়েক মিনিট নীরবতা চলল। শুধু ইঞ্জিনের শব্দ আর মাঝে মাঝে বাইরের হর্ন শোনা যাচ্ছে কানে। তাজধীর দুই হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে একদম মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করছে। চোখ সামনে, মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। যেন পাশে কেউ বসেই নেই। প্রিয়ন্তীর বিরক্তিটা ঠিক এখানেই।একবারও তাকাচ্ছে না লোকটা! মাঝে মাঝে এমন ভান করে যেন তাকে চিনেই না। হাবভাব এমন যেন রাস্তার কোন স্ট্রেঞ্জারকে ধরে এনে লিফট দিয়েছে।
ও মুখ ঘুরিয়ে একঝলক তাকাল। লোকটার কঠোর, তীক্ষ্ণ,সার্প চোয়াল দৃশ্যেমান হলো তাতে। প্রিয়ন্তী বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল সাথে সাথে।এই লোকটার দিকে তাকাবি না প্রিয়ন্তী। একদম তাকাবি না। তাকালেই ফাসবি। শেষ হয়ে যাবি পুড়ে। মনে মনে নিজেকেই ধমকাল সে।হাঁসফাঁস করতে করতে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে তুলে নিলো হাতে। স্ক্রল করতে শুরু করল অযথাই।কিন্তু মন কি স্ক্রিনে আছে। নেই। মনে মনে গজগজ করছে,
“এত ভাব দেখায় কেন লোকটা? যেন আমি নিজে থেকে এসেছি! ভাবি না পাঠালে আসতাম নাকি?”
এতক্ষন চুপচাপ একমনে গাড়ি ড্রাইভ করলেও আচানকই ধুপ করে মুখের উপর প্রশ্ন করে বসল,
"মিস প্রিয়ন্তী, আমার ব্লু হাফমুনটা দিচ্ছেন কবে?"
প্রিয়ন্তীর আঙুল থেমে গেল স্ক্রিনে। অবিশ্বাসে চোখ কপালে তুলে তাকালো লোকটার দিকে। কিসের মধ্যে কি? আশ্চর্য! ওকি এই ব্যাটার মাছ সঙ্গে নিয়ে ঘুরঘুর করছে নাকি। নাকি ওর ব্যাগের মধ্যে মাছটাকে লুকিয়ে রেখেছে? প্রচন্ড বিরক্তিতে বাকরুদ্ধ প্রিয়ন্তী।
"দেখুন! অন্যান্য মাছ নিলেও আমি কিছু বলতাম না। তবে বেছে বেছে আপনি আমার অতি পছন্দের মাছটাই ছিনতাই করেছেন।আমি আমার ব্লু হাফ মুনটা যাকে তাকে তো আর দিতে পারি না। ওটা আমার কাছে খুবই স্পেশাল। তাই স্পেশাল মানুষ ছাড়া, তাকে সবার কাছে শোভা পায় না রাখাটা। তো বলুন আমার ব্লু হাফ মুন দিচ্ছেন কবে?"
“চুরি করা জিনিস ফেরত চাইতেও লজ্জা করছে না?”
" তার মানে মানছেন আপনি চোর, সরি চুরনি?"
"এখানে মানা না মানার কি আছে?একবার যেহেতু নিয়েছিই, ফিরত দেয়ার জন্য তো আরে নেয়নি। তাই দেয়ার কথা ভুলে যান!"
“ দিবেন না ফেরত?”
“না।”
“কারণ?”
“কারণ আমার ইচ্ছা।”
"আমারওতো এখন অনেক কিছু ইচ্ছা করছে করতে? করবো?"
"ম মানে?"
তাজধীর ঝুঁকলো কিঞ্চিৎ। একদম ঘেঁষে এসে প্রিয়ন্তীর সম্মুখে হাত বাড়িয়ে সেটা ক্রস করে নিয়ে গেলো ওর ডান পাশে। একটানে সিটবেল্ট খুলতে খুলতে গলার সর খাঁদে নামিয়ে আওড়াল,
"মানে, আমরা এসে গেছি। নামবেন নাকি আমার সাথে একান্তে আরও কিছুক্ষন কাটাতে চাচ্ছেন এভাবে? আমার কিন্ত কোনো আপত্তি নেই। বেয়াইনের সঙ্গ পেতে মন্দ লাগছে না!"
বন্ধ করে রাখা শ্বাসটুকু ছাড়ল প্রিয়ন্তী। রেগেমেগে একপ্রকার ঝড়ের বেগেই নেমে দাঁড়ালো গাড়ি থেকে। নামতে নামতে কয়েকটা গালি শুনাতেও ভুলল না। অবশ্য সেসব গালিগুলো তাজধীরের অজানাই রইলো।
—————
গাড়িটা এসে থামল শহরের এক বড় শপিং মলের সামনে।প্রিয়ন্তী নেমে দাঁড়াতেই চাবি ঘুরিয়ে গাড়িটা পার্কিংয়ের দিকে নিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড় করাল তাজধীর।ইঞ্জিন অফ করে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে রইল ওভাবেই। একমনে কিছু একটা ভেবে দরজা খুলে নেমে এল বাইরে। যাওয়ার পথে প্রিয়ন্তী কে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলল,
“একটু দাঁড়ান। আমি আসছি।এখানেই দাঁড়াবেন।"
কথাটা বলে অতি দ্রুত বড় বড় পা ফেলে গাড়ির পাশ ঘেঁষে একটু দূরের দিকে এগিয়ে গেল। প্রিয়ন্তী ভ্রু কুঁচকে দেখল শুধু।লোকটার দৃষ্টি অনুসরণ করতেই চোখে পড়ল একটা পুরনো অটোরিকশা পাশে দাঁড়িয়ে। রিকশাটার গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে একজন মাঝবয়সী চালক। লোকটার অবস্থা দেখে যে কারও চোখ কুঁচকে যাবে। পুরোনো ছেড়া গামছা দিয়ে বারবার ঠোঁটের কোণা মুছছে সে। আর সেই গামছায় লেগে আছে তাজা র ক্তের দাগ। ঠোঁট ফেটে গেছে কোথাও, হয়তো একটু আগেই কারও সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়েছে।
লোকটা কাঁদছে। শব্দহীন সেই কান্না। তাজধীর গিয়ে থামল তার সামনে। বড্ড উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞেস করল তারপর,
“কি হয়েছে চাচা?আপনি আঘাত পেয়েছেন কিভাবে?"
লোকটা প্রথমে একটু চমকে তাকাল। মলিন, ফোলা ফোলা চোখ দুটো তুলে তাজধীরকে আগাগোড়া দেখল। পরিপাটি ফরমাল পোশাক, ব্যক্তিত্ব সব মিলিয়ে একটু ভরসা ফিরে পেলো যেন কোথাও।কম্পিত গলায় বলল,
“আর বইলোনা বাবা,এইতো একটু আগে একটা যাত্রী নিয়া আইছিলাম। রাস্তা দিয়ে আসার সময় একটা বড় গাড়ি আইসা রং ভাবে ধাক্কা মারলো। আমার রিকশাটা উল্টায়া পড়ল। আমি কিছু বললাম কেন, প্রতিবাদ করলাম কেন, এটাই হইলো আমার দোষ!গাড়ির মালিক উল্টা নামিয়া আইসা আমারে মারতে শুরু করলো। কইলাম, দোষ তো আপনার কিন্তু কে শুনে কার কথা? যেমনে পারলো ওমনেই মারল আমারে। "
এতটুকু বলে থামল লোকটা। গামছা দিয়ে ঠোঁটের কোনাটুকু পরিষ্কার করতে করতেই আবারও বলল,
“চারপাশে এত মানুষ আছিল বাবা কিন্তু একজনও এগায়া আসে নাই। আমরা গরিব মানুষ আমাদেরে দুই পয়সার দামও দেয় না কেউ। মার খাইলাম, রিকশা ভাঙল, কেউ একটা কথা কইলো না আমার হইয়া!"
শেষ কথাটায় পুরোপুরি ভেঙে পড়ল লোকটা।তাজধীর একান্ত মনোযোগেই শুনলো সবটা। ভাবভঙ্গির কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলোনা।চারোপাশ একবার চোখ বুলিয়ে দেখল,আশেপাশে তেমন লোকজন নেই। শুধু রাস্তার অপর প্রান্তে ফুটপাথ ধরে মানুষের ঢল দেখা যাচ্ছে। আর শপিং মলের সামনে দু’জন সিকিউরিটি গার্ড দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় ব্যস্ত। তাজধীর লোকটাকে শান্ত, ঠান্ডা গলায় বলল,
“আপনি এখানে একটু দাঁড়ান, চাচা। আমি আসছি!"
লোকটা কিছু বলার আগেই সে ঘুরে দাঁড়াল। ভারী কদমে হেঁটে চলে গেল সিকিউরিটি গার্ডদের দিকে।
দু’জন গার্ডের সামনে গিয়ে থামল তাজধীর।নম্র সরে ডেকে বলল,
“এক্সকিউজ মি!"
তন্মধ্য একজন চুপ করে থাকলেও অন্যজন পাশ থেকে এগিয়ে এসে বলল,
“জি স্যার?”
“এইমাত্র একটা রিকশা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। একজন লোককে মারধরও করা হয়েছে। ব্যাপারটা কী?”
গার্ডটা একবার চারপাশে তাকাল। যেন কেউ শুনছে কিনা যাচাই করল। তারপর নিচু গলায় বলতে লাগল,
“স্যার এইগুলো তো এখানে প্রায়ই হয়!"
“মানে?”
গার্ডটা একটু ইতস্তত করে, তারপর বলল,
“যে ছেলেটা মারছে সে এখানের এক বড় শিল্পপতির ছেলে। খুবই বিগড়ে যাওয়া, আর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বেড়ায়। যাকে তাকে মারধর করে, দোষ থাক বা না থাক।”
একটু থামল গার্ড। পরপর বলতে লাগল,
“আমরা কিছু বলতেও পারি না স্যার। চাকরি করি তো। প্রতিবাদ করলে উল্টা আমাদেরই সমস্যা হয়। কয়েকদিন আগেই আমাদের মত একজন এর প্রতিবাদ করেছিল,ফলস্বরূপ তার চাকরিটা খাইয়া দিছে ওরা!"
পাশের আরেকজন গার্ড এখনো চুপ। মুখে অস্বস্তির ছাপ এটে কাইকুই করছে। সিকিউরিটি গার্ডদের কথা শুনে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল তাজধীর। চোয়ালটা শক্ত হয়ে থাকলেও প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক। ঠোঁটের কোণা কামড়ে ধরে আশেপাশে আরেকবার চোখ বুলিয়ে দৃঢ় সরে জানাল,
“এখানে সিসি ক্যামেরা আছে, তাই না?”
মাথা নাড়ল ছেলেটি। গলার সর একই রেখেই পরপর অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল তাজধীর,
“আমি ফুটেজগুলো একটু দেখতে চাই।”
কিন্তু পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অন্য গার্ডটা, যে এতক্ষণ চুপ ছিল হঠাৎ এগিয়ে এলো সে। মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি আর বিরক্তি রেখে শুধাল,
“স্যার, যাকে-তাকে তো আর আমরা ফুটেজ দেখাই না। নিয়ম আছে। আর আপনি কে যে আপনা...
ইতিমধ্যে প্যান্ট এর পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা কার্ড বের চুপচাপ সেটা সামনে ধরতেই চুপসে গেল ছেলেটা। নিমিষেই বদলে গেল মুখের রং। চোখ দুটো বিস্ফোরিত করে মুখ হাঁ হয়ে গেল প্রায়।অস্ফুট সরে ভাঙা ভাঙা শব্দে বিড়বিড় করতে লাগল,
“লে… লেফটেন্যান্ট কমান্ডার…!”
পাশের গার্ডটাও ঝুঁকে তাকাল তখন। সেও এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দু’জনই একসাথে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করল তৎক্ষণাৎ। অনুনয় করে জানাল অবিলম্বে,
“স্যরি স্যার! আমরা আসলে বুঝতে পারিনি। ওই আর এক্সট্রিমলি স্যরি স্যার!”
কার্ডটা পুনরায় পকেটে ঢুকিয়ে রেখে শান্ত গলায় বলল তাজধীর,
“ফুটেজটা দেখান।”
গার্ড দু’জন দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
“জি স্যার! এইদিকে আসুন!"
তারা তড়িঘড়ি ভেতরের কন্ট্রোল রুমের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল তাজধীর কে। সিসিটিভি কন্ট্রোল রুমে ঢুকে তাজধীর চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল মনিটরের সামনে। স্ক্রিনে একের পর এক ফুটেজ চালানো হচ্ছে।
সেকেন্ড কয়েকের ব্যবধানেই দৃশ্যটা পরিষ্কার হয়ে উঠল। রিকশাটা ধীরে এগোচ্ছে। ঠিক তখনই এক দামী গাড়ি বেপরোয়া গতিতে এসে পাশ ঘেঁষে আঘাত করল। রিকশা কাৎ হয়ে পড়ে গেল খাঁদে। ভাগ্গিস পেসেঞ্জার ছিলোনা কোনো। লোকটা সামলে উঠতেই কিছু বলতে এগোল—আর ঠিক তখনই গাড়ি থেকে নেমে এল সেই ছেলে। তারপর কোনো কারণ ছাড়াই… ধাক্কা, ঘুষি, লাথি। চারপাশে মানুষ ছিল, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। তাজধীরের চোখ স্থির হয়ে রইল স্ক্রিনে।চোয়াল শক্ত হলো।
“ছেলেটাকে কোথায় পাবো?”
“স্যার, ও মলের ভেতরেই ঢুকছে। সম্ভবত ফুড কোর্টে গেছে।”
ফুড কোর্টে তখন উপচে পড়া ভীর। এক কোণায় বসে আছে সেই ছেলে। সামনে খাবার, পাশে তার গার্লফ্রেন্ড। হাসতে হাসতে খাবার খাচ্ছে। তাজধীর এগিয়ে এসে স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল,
“আপনাকে আমার সঙ্গে একটু নিচে আসতে হবে!"
গার্লফ্রেন্ডের সেলফির ক্যামেরায় বন্ধি হচ্ছিলো দুই যোগোল। হঠাৎ এই অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতিতে ছেলেটা বিরক্ত হয়ে উঠল। ক্যামেরা নামিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল তাজধীরের দিকে। চোখেমুখে স্পষ্ট অবজ্ঞা। ধারালো দৃষ্টিতে চেয়ে হংকার ছুড়ার মতো করেই ফোঁসফোঁস করে উঠল,
“কেন? আপনি কে?”
তাজধীর শান্তভাবেই বলল,
“নিচে গিয়ে বলছি। আসুন!"
ছেলেটা হেসে উঠল তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে।ভাব দেখিয়ে বলল,
“আপনি কি আমাকে অর্ডার দিচ্ছেন? জানেন আমি কে?”
“আ"ম নট ইন্টারেস্টেড। আপাতত আমার সঙ্গে আপনার নিচে আসাটা মোস্ট ইম্পরট্যান্ট!"
এইবার ছেলেটা বিরক্ত হয়ে চেয়ার ঠেলে উঠল রাগে। গজগজ করে জানাল,
“ফাজলামো পাইছেন হা?চিনি না জানিনা নিচে যাবো কেন? হু দ্যা হেল ইউ আর?একবারে...
পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আচানক তাজধীর ঝুকে গিয়ে ছেলেটার কানের পাশে ফিসফিস করে কিছু বলতেই ছেলেটা চুপসে গেল। রাগ, ক্ষোভ বিলীন হয়ে ভর করল কেমন অস্বস্তি। মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের রঙ বদলে গেল। আগের সেই উদ্ধত ভঙ্গি মিলিয়ে গেল কোথাও। ক্ষীণ ঘাম জমলো কপালে। পরপর নিজেকে স্বাভাবিক রাখার ভান ধরে গার্লফ্রেন্ড কে বলল অপেক্ষা করতে। সে আসছে এক্ষুনি।
প্রথমে ছেলেটা আর তার ঠিক পিছনে এসে দাঁড়ালো তাজধীর সেই রিকশাচালকের সামনে। লোকটা এখনো দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কণা চেপে আছে। তাজধীর ছেলেটাকে সামনে ঠেলে দিল,
“চেনেন উনাকে?বাবার বয়সী একটা লোকের উপর হাত উঠাতে বিবেকে বাঁধলো না? মাফ চান উনার কাছে। ইভেন শুধু মাফ'ই নয় উনার রিকশার যাবতীয় ভর্তুকি ও দিবেন! দূ ইট ফাস্ট!"
শেষের কথাটুকুতে ছেলেটা কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠলেও দাঁড়িয়ে রইলো অনড়। নড়লো চরলো না। যাকে একটু আগেই বেধুমসে মে রে ঠোঁট ফাটিয়ে গেল সেই দুই টাকার লোকের কাছে নত হবে সে? তাহলে থাকবে তার মান ইজ্জত? ততক্ষনে বেশ কিছু সংখ্যক লোক এসে জড়ো হয়েছে সেখানে। ছেলেটাকে আগের ন্যায় তখনো স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এবার খানিকটা অধৈর্য হলো তাজধীর। স্বাভাবিক কদমে এগিয়ে এসে ছেলেটার ঘাড়ে বুড়ো আঙ্গুল চেপে ঘাড়টা খানিকটা টেনে আনল মুখের সামনে। তারপর বিড়বিড় করে কি বলল জানেনা প্রিয়ন্তী, পরের মুহূর্তেই কেমন ছেলেটা হড়বড় করেই ক্ষমা চেয়ে বসল। সাথে পকেটে থাকা মানিবেগ থেকেও কতগুলো টাটকা হাজার টাকার নোট বাড়িয়ে দিলো লোকটার দিকে। তবে লোকটা সেসব নিলোনা। উল্টো বলল,
"গরিব হইতে পারি, মাথার ঘাম পায়ে ফেইল প্রতিদিন দুইবেলা ভাত খাইতে পারি, তবে আমাগো আত্মমর্যাদা আছে। তুমি আমার পোলার বয়সী।মাফ কইরা দিলাম তোমারে। আল্লাহ তো আছেনই। তিনি সব দেখেন।গরিবগো লগে এমন কইরোনা বাবা, আল্লাহ সহ্য করবেন না। যাও মাফ কইরা দিলাম!"
প্রিয়ন্তী মুগ্ধ হয়ে দেখল শুধু। একটা মানুষ একটা নিরপেক্ষ ভাবে, এতটা ঠান্ডা মস্তিষ্কে কিভাবে সবটা সামলাতে পারে? ও আশ্চর্য না হয়ে পারছেইনা। নাতো কোনো বাজে ভাষা ব্যবহার করল, আর নাতো কোনো রকম রাগ দেখালো। তারপরও সবকিছু কি নিখুঁত ভাবে সামলে নিলো। আচ্ছা উনি ওই ছেলেটার কানের কাছে ঝুকে কি এমন বলল যে লোকটা সঙ্গে সঙ্গেই মাফ চেয়ে বসল? প্রিয়ন্তীর জানতে খুব আগ্রহ হলো। ততক্ষণে তাজধীর এগিয়ে এসেছে ওর কাছাকাছি। এসে তাগাদা দিয়ে জানাল,
"কি মিস প্রিয়ন্তী? শপিং করবেন না?"
বলেই পুনরায় হাঁটা ধরলো মলের ভিতরে। প্রিয়ন্তীর ধ্যান ভাঙলো। পায়ের গতি বাড়াল দ্রুত। লোকটার বরাবর হয়ে আচানক প্রচন্ড কৌতূহল থেকে করেই বসল প্রশ্নটা,
"আচ্ছা ছেলেটাকে তখন কি বললেন কানের কাছে ওভাবে ঝুকে? যে এক কথাতেই রাজি হয়ে গেল মাফ চাইতে?"
তাজধীর থেমে দাঁড়ালো। প্যান্টের পকেটে দূ হাত ঢুকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় শুধাল,
"বেশি কিছুনা। সূরা শুনিয়েছি। আল্লাহর ভয় দেখিয়েছি। ভয় পেয়েই তো গটাগট মাফ চেয়ে নিলো।"
"এ্যা!"
ভ্যাবাচেকা খেয়ে থেমে দাঁড়ালো প্রিয়ন্তী। ওই লোকটার সমস্যাটা কি? আজব!দুনিয়ার সবার সঙ্গে সিরিয়াস থাকলেও শুধুমাত্র ওর সঙ্গেই কেন এমনটা করে?কেন কেন কেন?কটমট করে তাকিয়ে তাজধীর কে পাশ কেটেই বড় বড় কদমে সোজা মলের ভিতরে ঢুকে গেল প্রিয়ন্তী।
·
·
·
চলবে……………………………………………………