অরুণাভ হুট করেই মাকে ছেড়ে বিছানা থেকে নামলো। মেঝেতে বসে মায়ের দুই পা বুকে জড়িয়ে হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। অস্পষ্ট শব্দমালা জুড়ে বলে, “আম্মু, ভোর অনেক স্যরি। আর হবে না। প্লিজ কথা বলো আমার সাথে! তুমি কথা না বললে আমার কিছুই ভালো লাগে না। প্লিজ আম্মু, প্লিজ? তুমি এভাবে বললে আমি তো মরেই যাবো”
অরুণ সরকার ফোনে কথা বলতে বলতে বেখেয়ালি ভাবে রুমে প্রবেশ করে। ঘরের পরিস্থিতি দেখে সে কয়েক মুহুর্তের জন্য নির্বাক হয়ে গেল। ফোনের ওপাশের ব্যক্তি হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে। অরুণে কোনো জবাব নেই। একসময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। অরুণ সরকার ধীর পায়ে এগিয়ে যায় মা ছেলের দিকে।
অরুণাভ তখনও মায়ের পা বুকে জড়িয়ে বাচ্চাদের মতো কেঁদে যাচ্ছে। বারবার ক্ষমা চাইছে। পাতার স্নেহমাখা হাত চুলের ভাঁজে ভাঁজে। সে নরম গলায় বলল, "ভোর, কেঁদো না। পা ছাড়ো আমার।"
" মা... মা আ'ম স্যরি, আ' সরি, আ'ম সো স্যরি। আমাকে মারো, কাটো, বকো কিন্তু এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিও না। আমি তোমার আদরের ভোর সোনা, তাই না? আর হবে না... প্রমিজ। আমার কাছে তুমিই সব।শুধু তুমি আর তুমিই। আমার তুমি হলে আমার আর কিচ্ছু চাই না।"
"বাবাকেও না?"
অরুণাভ মুখ তুলে চাইলো ক্ষণ। অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে দৃঢ়তার সাথে জবাব দিলো, "না, আমাকে তোমার মতো করে কেউ ভালোবাসে নি, মা। আব্বুও না।"
পাতা দৃষ্টি তুলে অরুণ সরকারের দিকে তাকালো। ভেবেছিল লোকটা প্রতিবাদ করবে। কিন্তু সে চুপটি করেই রইলো। পাতা দৃষ্টি হটিয়ে অরুণাভের মুখ পানে চাইলো। সিক্ত গাল মুছে দিয়ে বলল,
"কেঁদো না ভোর সোনা।"
অরুণাভ পা ছেড়ে মায়ের দুই হাতের পৃষ্ঠে ঘন ঘন চুমু খেলো। তারপর গলা জড়িয়ে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে। পাতা তাঁর পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত হতে বলে। অরুণাভের কান্নার গতি কমে আসলে পাতা বলে,
“তোমার বাবা বলেছে, দেড় কি তিন বছরের ছিলে তুমি। তখন ওনাদের ডিভোর্স হয়। মায়ের চেহারাটাও মনে থাকার কথা না। সেখানে…আমি কি তোমার মা হয়ে উঠতে পারি নি?”
অরণাভ আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মাকে। ভাঙা স্বরে বলল, “আমার ওই মহিলার সাথে যোগাযোগ ছিলো। আমি ফুপ্পিকে প্রশ্ন করেছিলাম, বাকি সবার মতো আমার মা কেন আমাদের সাথে থাকে না? ফুপ্পি উত্তরে বলেছিল, মা, বাবার সাথে রাগ করে চলে গেছে। তবে আমি যদি মায়ের রাগ ভাঙাতে পারি মা আবারও আমাদের সাথে থাকবে। তাই আমি ফুপ্পির ফোন দিয়ে তাঁর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করতাম। আব্বু না থাকলে রোজ কথা বলতাম। তিনিও আমার সাথে কথা বলতেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তারপর কি যেন হলো। উনি আমার সাথে আগের মতো ভালোবেসে কথা বলছিলেন না। বিরক্ত হচ্ছিলেন। পরে ফুপ্পি বলেছিল উনি আর আমাদের কাছে আসবে না। আমি খুব কেঁদে ছিলাম। তারপরও ওনাকে ফোন করতাম, কথা বলতাম। তারপর তুমি আমার আম্মু হলে, আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম সেদিন। বাকিদের মতো আমারও আম্মু আছে। আর সে আমাকে খুব খুব খুব ভালোবাসে।”
“ভালোবাসলেও নারির টান তো অন্য কারো সাথে।”
অরুণাভ কিছু সময় চুপ থেকে বলল, “আমি শুধু ওনাকে বোঝাতে চাইতাম, আমার আম্মু আছে। উনি আমাকে ভালো না বাসলেও আমার আম্মু আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। আমাকে অনেক আদর করে। আমি বুঝতে পারিনি আমার বোকামি তোমার মন খারাপের কারণ হবে।”
অরুণাভের ছেলেমানুষী গলা। পাতা হেসে বলল, “বাপের মতো মন ভোলানো কথা শিখেছো!”
পাতা অরুণের চোখাচোখি হয়। পাতা নজর সরালেও অরুণ সরকার শান্ত চোখে চেয়ে রয়।
“হোয়াট হ্যাপেন্ড? পাপা… মাম্মাম…ব্রো!”
অরুণিতা দরজা খোলা পেয়ে ঘরে এসে, ঘরের থমথমে অবস্থা দেখে ভ্রু কুঁচকে একে একে ডাকে সবাইকে। কারো কোনো হেলদোল নেই। সে বাবার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। ধীর কণ্ঠে জানতে চাইলো,
“হোয়াই দে আর ক্রাইং পাপা? ইজ দ্যাট এভরিথিং ওকে?”
অরুণ সরকার মেয়ের দিকে তাকালো শুধু, কিছু বললো না। অরুণিতা ঘার উঁচালো। তারপর যেমন এসেছিল তেমনি চলে গেলো। ইগোর স্কেলে সে বাপের দুই কাঠি উপরে।
পাতা অরুণাভের ভেজা মুখখানি আঁচলে মুছিয়ে দেয়। কপালে ঠোঁট চেপে ধরে বলে, “কাঁদে না বাচ্চা! আমার একটু অভিমান হয়েছিল তবে আর নেই।”
অরুণাভ মায়ের চোখে চোখ রাখে। সে বুঝতে পারে অভিমানের পাল্লা এখনও ভারী। শুধু বুঝতে দিচ্ছে না। সে চোখে চোখ রেখেই বলল,
“ওই মহিলার মুখ দেখার আগেই যেন আমার মরণ হয়ে যায়।”
“চাপড়ে পিঠ লাল করে দেবো। এসব কেমন কথাবার্তা!” অরুণ সরকার পাশ থেকে ধমকে ওঠে।
অরুণাভ সেই ধমক গ্রাহ্য করে না। পাতা করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে অরুণাভের দিকে। ফর্সা মুখটা কান্নার ফলে লাল কৃষ্ণচূড়া হয়ে আছে। সে শান্ত সুরে বলল,
“এসব কথা আরেকবার মুখে আনলে কানে নিচে বাজাবো। তুমি ছোট বাচ্চা তো নও। ভালো মন্দের বুঝ তোমার আছে। তোমার যদি তাঁর সাথে দেখা করা, কথা বলা, ভালো লাগে তুমি করতে পারো। আমার তরফ থেকে কোনো বাঁধা বিপত্তি পাবে না।”
“আম্মু…”
অরুণাভ কিছু বলতে চাইলেও পাতা বলতে দেয় না। মাথায় হাত রেখে বলে,
“অনেক বড় ক্রিকেটার হও। তারপর লাল টুকটুকে বউ আনবো ঘরে, নাতি নাতনির মুখ দেখবো। তারপর চিরতরে চোখ বুজে নিবো।”
অরুণাভ শেষ তিক্ত কথাটা অনেক কষ্টে হজম করে। মা বাবা ছাড়া সে কিছুই কল্পনা করতে পারে না। সে প্রসঙ্গ বদলে বলল, “আমার সাথে কথা বলো।”
“কার সাথে বলছি?”
অরুণাভ হেসে দিলো। হাসলো পাতাও। অরুণাভের নাক চেপে ধরে বলল, “তোমার নাক থেকে সর্দি ফুরালো না।”
অরুণাভ লজ্জা পায়। টি শার্টের হাতায় নাক ডলে। পাতা নাক মুখ কুঁচকে নিয়ে বলে, “যাও চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দাও। কেঁদে চোখ মুখের কি হাল! একটু পরেই বলবে আম্মু মাথা ব্যথা করছে, টিপে দাও!”
অরুণাভ হেসে ফেললো, “আম্মু তোমাকে সবসময় হাসিখুশি থাকতে হবে। তুমি হাসলে আমাদের গোটা পরিবার হাসে।”
“আমার হাসিখুশি থাকা তো তোমাদের উপর নির্ভর করে। তোমরা আমাকে ভালো রাখলে আমি হাসিখুশি। খারাপ রাখলে তো মন খারাপ হবেই। অনেক হলো যাও ফ্রেশ হয়ে নাও!”
অরুণাভ কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলো মায়ের দিকে। কবে শেষ হবে এই অভিমানের ঝুরি? সে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। মায়ের মুখটা আঁজলায় ভরে কপালে চুমু দিয়ে বলল, “ভোর লাভস ইয়ু সো মাচ মায় সুইট আম্মু!”
অরুণাভ চলে গেলে অরুণ সরকার দরজা চাপিয়ে দিয়ে এগিয়ে আসে। গায়ের ব্লেজার খুলতে খুলতে টেনে টেনে বলল, “এই যে পা জড়িয়ে… হাউমাউ করে কেঁদে… আমিও কি ক্ষমা টমা পেতে পারি?”
পাতা মুখ ফিরিয়ে চোখের জল মুছে নেয়। নাক টেনে বলে, “ভেবে দেখতে পারি!”
অরুণ সরকার শু খুলে তাঁকে সাজিয়ে রাখে। টাইয়ের নট ঢিলে করতে করতে পাতার পায়ের কাছে মেঝেতে বসে পড়লো। কালো পাড়ের দারুচিনি শাড়ির আড়ালে নুপুর পরা ফর্সা পা। অরুণ সরকার পা জোড়া দুই হাতে আঁকড়ে ধরে। বেলুনের মতো ফোলা বৃদ্ধাঙ্গুলদ্বয়ে দাঁত দিয়ে কামড়ে দেয়। পাতা পা ছিনিয়ে নিতে চাইলে অরুণ সরকার পা দ্বয় বুকে চেপে ধরে। পাতার হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে, চোখে চোখ রেখে ভরাট স্বরে বলল,
“ইয়্যুর হাইনেস, প্লিজ ফরগিভ মি! প্লিজ টক টু মি। আ’ম ওলসো লাভ ইয়্যু, না জান?”
—————
স্টাডি রুম থেকে কোলাহল ভেসে আসছে। কোলাহলে বিরক্ত হয়ে আনিকা দুই হাতে কান চেপে বিরক্তের শ্বাস ছেড়ে চেঁচায়। তাঁর চেঁচানোতে কোলাহল থামে, তবে তা খুবই অল্প সময়ের জন্য। আবার যেমন তেমনই। আনিকা ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়ে। অরুণাভ হেসে উঠলো। তাঁর মাথায় চাটা মেরে বলে,
“নিজে ড্যান্সের ডি–টাও জানিস না। আবার আমাদের উপর চেঁচাচ্ছিস। লজ্জা করে না তোর?”
আনিকা উঠে দাঁড়ালো। ধুম করে অরুণাভের পিঠে কিল বসিয়ে বলে, “আমি বলি নি আমি ডান্স পারি। তবে মনিটরে দেখানো সিম্পল একটা স্টেপ করার মতো ক্ষমতা আছে আমার। তোদের তো তাও নেই। হাত পা ছোড়া ছাড়া আর কি পারিস?”
মোহন এগিয়ে এসে বন্ধুর কাঁধে কনুই ঠেকিয়ে বলে, “ডোন্ট আন্ডারএস্টিমেট দা বয়েস পাওয়ার। আমরা নাগিন ড্যান্সে মশহুর! আন্ডার নাইন্টিনের সুপার ফোরে শ্রীলঙ্গাকে হারিয়ে আমরা সবাই নাগিন ড্যান্স দিয়েছিলাম। রীতিমত ভাইরাল হয়েছিলাম। দেখো নি ভিডিও?”
“আমি ওসব ফালতু জিনিস দেখি না।”
“তা দেখবে কেন? তোমরা তো দেখবে…‘এক নাম্বার…তুজে কাম্বার…হাইরে তাল সিকি সিকি
হায়! কিতনি সুন্দর…তুজে ডিম্পল…হেয় ভাই জিতছেন জিতছেন!’
কাকের গলায় শুধু গেয়েই না, নেচেও দেখালো মোহনলাল। তাঁর নাচ গানে সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে। অরুণাভও হাসে, তবে আনিকার রাগী চাহনিতে বন্ধুকে থামাতে বাধ্য হয়। আনিকা রাগ দেখিয়ে কাউচে বসে পড়ল। শেখাবে না ড্যান্স। যা পারুক করুক।
রূপক হায় হায় করে বলল, “আপু বসলে কেন? জলদি স্টেপ ধরিয়ে দাও। সময় তো নেই। শেখার পর প্র্যাকটিসও যে করতে হবে!”
“আমি পারবো না। যে বেশি লাফাচ্ছে তাঁকে বল।”
বলেই আনিকা আড়চোখে মোহনের দিকে তাকালো। মোহন ক্লোজআপ হাসি দিলো, “তোমরা চাইলে আমি শেখাতে পারি। একচুয়ালি ক্রিকেটে আমাদের একটা ভাইরাল স্টেপ আছে। খুবই সিম্পল। যেকেউ পারবে! দাঁড়াও আমি দশ সেকেন্ড শিখিয়ে দিচ্ছি! দুই হাতে নাগিনের মতো ফণা তুলবে। দেন চোখ বড়বড় করে জিভ বের করে কোমড় এরকম হিপ আপ করবে? আন্ডারস্ট্যান্ড?”
রূপক মাথা দোলায়। মোহন ১,২,৩…কাউন্ট করে নাচে আর উঁচু গলায় গান গায়, ম্যায় নাগিন নাগিন…! রূপকও দাঁত কেলিয়ে তাঁকে অনুকরণ করে। অরুণাভের দিকে তাকিয়ে বলে,
“হেয় ব্রো, তুমিও আসো না। বেশ মজা কিন্তু! আমরা অরুর বার্থডেতে এই স্টেপ করি কি বলো?”
অরুণাভ তাঁর মাথায় চাটা মেরে বলে, “ওডিয়েন্স পঁচা ডিম টমেটো ছুঁড়ে মারবে।”
“তাহলে কি করবো? ড্যান্স পারফরমেন্স বাদ দিই তবে? গানের ব্যবস্থা করা যায় না? আমি কিন্তু সুন্দর গাইতে পারি।”
অরুণাভ ভেবে দেখলো, আইডিয়া মন্দ নহে। কিন্তু গাইবে কে? সে রূপকের দিকে তাকিয়ে বলল, “গেয়ে দেখা তো একটা?”
রূপক কেশে গলা পরিষ্কার করে নিলো। এক কানে হাত চেপে, চোখ দুটো বন্ধ করে এমন ভাব ধরলো যেন আত্যাধিক কোন গান গাইবে। কিন্তু মুখ দিয়ে বেরুলো,
“কচু বনে হেগে দিলো, কালো কুকুরে
ওওও কচু বনে হেগে দিলো, কালো কুকুরে
খগেনের মা বারি দিলো ঢেঁকির মুগুরে…”
আনিকা রেগে গিয়ে পায়ের স্যান্ডেল ছুঁড়ে মারলো রূপকের মুখ বরাবর। মোহন হাসতে হাসতে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে পড়েছে। নয়ন একপাশে দাঁড়িয়ে মুখে হাত চেপে হাসে। অরুণাভ মুখে প্লাস্টিকের হাসি ফুটিয়ে বলল, “ওয়াওওও ভেরি-ই নাইস! মনে হলো বহুবছর পর ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত টাইপ কিছু শুনলাম। কি সুন্দর সঙ্গীত! তুই লিখেছিস বুঝি? হাসন রাজাও ফেল!”
তাদের ভর্ৎসনায় রূপক মুখ বাঁকিয়ে বলে, “হয়েছে হয়েছে! এটা অনেক ভাইরাল একটা গান। তোমরা কখনো শোনো নি?”
অরুণাভ মাথা নাড়লো, শোনে নি। রূপক ফোন বের করে তাঁকে দেখাতে লাগলো। মোহনও উঠে এসে দেখে। আনিকা বিরক্ত হয়ে স্টাডিরুম ছাড়ার জন্য পা বাড়ায়। অরুণাভ দুই হাত মেলে তার তাঁর সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো।
“প্লিজ আনিবুড়ি, যাস না। তুই স্টেপ কর আমরা সবাই শিখে নিচ্ছি।”
“আমি নিজেই পারি না তোদের কি শেখাবো। অরুকেই ডাক, ও সুন্দর করে শিখিয়ে দিবে।”
আনিকার কথায় চুপ থাকা নয়ন বলল, “বাহ্ রে! ওর বার্থডে পার্টির সারপ্রাইজ ড্যান্স ওঁর থেকেই শিখবো? তাহলে তো মজাই নষ্ট হয়ে যাবে।”
“হ্যাঁ নয়ন ঠিক বলছে। আচ্ছা আমরা এই গানটা বাদে অন্য কোনো গান চুজ করি? এটা কেমন সেকেলে সেকেলে! হিপ হপ ওঁর বলিউড?”
রূপক চট করে বললো। অরুণাভ ঘোর বিরোধিতা করে বলে, “গান এটাই ফিক্সড।”
আনিকা তাঁর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে রূপককে বলে, “বলিউড বেটার। গান কোনটা ভালো হবে?”
“সালামে ইস্ক!”
“নো!”
“ওওও ও তো পাল মেয় খুশ হেয়,
পাল মেয় খফা!
বাদলে ও রাং হার ঘাড়ি!
পার যোভি দেখু রূপ উসকা,
লাগতি হেয় পেয়ারি বাড়ি!
উসকো যিতনা দেখু
উতনা সোচু…”
রূপকের গলা সত্যিই সুরেলা। বেশ শোনায়! আনিকা খুশি মনে বলে, “ফাটাফাটি!এটাই লক করলাম তাহলে। অরুর সাথে গানটা স্যুট করে।”
বলেই আনিকা খুশি মনে এই গানের ড্যান্স স্টেপ খুঁজতে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে আবারও কাউচে বসলো। আর কারো কিছু করার নেই। তাঁরা এবেলা ধুমিয়ে স্টেপ গুলো মুখস্থ করে প্র্যাকটিস করে। শুরুতে তালে তাল না মিললেও অনেকবার প্র্যাকটিসের পর চলার মতো পারফরম্যান্স রেডি।
—————
অরুণ সরকার আর আরিয়ান সরকারের একমাত্র আদরের বোন আদুরি সরকার। দুই ভাইয়ের-ই লাডলি। পাতার বড় ভাই লুবমানের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পারিবারিকভাবে বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল এককালে। বছর কয়েক সংসারও করে। তারপর একদিন বিচ্ছেদ হানা দের দোরগোড়ায়। দোষ দুই পক্ষেরই ছিলো। কিন্তু মানুষ মাত্রই বিচিত্র প্রাণী। তাঁরা নিজেদের দোষ স্বীকার করতে নারাজ, অন্যের কাঁধে দোষ ঠেলতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আদুরি, লুব তাদেরই একজন। যখন দুটো সম্পর্ক একসাথে জুড়ে থাকে, আর একটা সম্পর্ক ভেঙে যায়! খুব সাধারণ ভাবেই অপর সম্পর্কের উপর প্রভাব পড়ে।। আদুরি-লুবমান সম্পর্কের বিচ্ছেদের কারণে অরুণ-পাতার সম্পর্কে প্রভাব না ফেললেও পাতার সাথে তাঁর বাপের বাড়ি এবং আদুরির সম্পর্কে ফাটল ধরে আছে।
আদুরির স্বামী বাংলাদেশী হলেও চাকরি সূত্রে নিউ জার্সিতে বসবাস। আদুরিও সেখানেই থাকে। বছর অন্তর এক দুইবার ঘুরে যায় দেশ। কিছুদিন আগেই সে পাঁচ বছরের ছেলে আরাফকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। এতোদিন শ্বশুরবাড়িতেই ছিলো। বড় ভাই ও ছোট ভাইয়ের ফোনে আজ বিকেলে সে বাপের ভিটায় হাজির। ড্রয়িং রুমে বসা রুবিকে দেখেই জড়িয়ে ধরে মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। কুশলাদি বিনিময়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একসময় পাশে বসা পাতাকে খেয়াল করে বলল,
‘‘কেমন আছো, বড়ভাবী?’’
পাতার অস্বস্তি বাড়ে। জবাব দিতে একটু দেরি হয়। ততক্ষণে আদুরি আবারও রুবির সাথে আলাপ শুরু করে দিয়েছে। পাতা অপমানিত বোধ করলো। সে কিছু না বলে হনহনিয়ে চলে যায়। তাঁর প্রস্থানেও রুবি, আদুরির আলাপন বিঘ্নিত হয় না।
অরুণিতা সুদূরে বেতের মোড়ায় বসে এতক্ষণ সবটাই লক্ষ্য করছিলো। কোলের ল্যাপটপ রেখে গলার হেডফোন পুনরায় কানে তুলে নেয়। কফির মগ হাতে এগিয়ে যায় ড্রয়িংরুমের দিকে।
আদুরি অরুণিতাকে দেখে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে, “আরে আমাদের অরু যে! কত্ত বড় হয়েছিস। দুদিন পর মনে হবে তুই ভোরের বড় বোন।”
অরুণিতা গম্ভীর মুখে এগিয়ে গিয়ে সিঙ্গেল সোফায় বসে সেন্টার টেবিলে পা তুলে দিলো। রিমোট হাতে টিভিটাও অন করলো। ওদিকে ভাতিজির এহেন আচরণে রুবি, আদুরি দুজনেই মূক। রুবি উঠে এসে অরুণিতার হেডফোন খুলে নিয়ে খানিকটা শাসনের সুরে বলল,
“অরু, এ কেমন অভদ্রতা! ফুপ্পি এসেছে দেখিস নি?”
অরুণিতা অনাগ্রহ ভরা চোখে তাকালো ফুফুর দিকে। ঠোঁট চোখা করে বলল, “হ্যালো”
তারপর আবারও টিভির পর্দায় চলা টম এন্ড জেরির মারামারিতে ডুবে গেলো। আশেপাশে কি হচ্ছে দেখার সময় নেই। ভাতিজি এরূপ আচরণে আদুরি কষ্ট পায়। থমথমে মুহূর্তে হঠাৎ প্রহরের আগমন। সে ফুফুর আগমনের চেয়ে আরাফের আগমনে বেশি খুশি। খেলার একজন মানুষ পাওয়া গেলো। সে খুশিতে গদগদ হয়ে আরাফকে জড়িয়ে ধরতে নেয়। কোত্থেকে অরুণিতা এসে খপ করে বাহু চেপে ধরে। একপ্রকার টানতে টানতে নিয়ে যায় দোতলায়। প্রহর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলে,
“আপুনি আমি তোমার রং পেন্সিল নিই নাই। তোমার কুকিজও লুকিয়ে খাই নাই। তোমার মেকআপ বক্স দিয়ে আমার পুতুল বউকেও সাজিয়ে দিই নাই। শুধু ওই টেডিটাকে একটা চুমু দিয়েছি। ও কি তোমাকে বলে দিয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
প্রহরের মুখটা ভোঁতা হয়ে আসে। শয়তান টেডি! সে কত্ত করে বললো, আপুনিকে যেন বলিও না। মুখ বন্ধ রাখতে চকলেটও দিয়েছিলো। তাও বলে দিলো?
“আরাফের সাথে একদম মিশবে না। আর ফুপ্পির সাথেও কথা বলবে না। কিছু দিলে নেবেও না। বুঝেছো ওলাফ?”
“কেন? ফুপ্পি কি তোমাকে কষ্ট দিয়েছে? আর আরাফও?”
“হ্যাঁ, তবে আমাকে না। তোমার আদরের মাম্মামকে। তাই আমার কথা যেন মনে থাকে।”
প্রহরের মুখে নিকষ কালো আঁধার নামে। ফুপ্পি তো তাঁকে অনেক আদর করে। তাহলে আম্মুকে কেন কষ্ট দিলো?
অপরদিকে আদরের ভাতিজির এহেন আচরণে আদুরি যতটা অপমান বোধ করে তাঁর চেয়ে বেশি কষ্ট পায়। কষ্টে দুচোখ ভিজে ওঠে। সে ছোট ভাইয়ের কাছে নালিশ করে। আরিয়ান সরকার সব শুনে ভাতিজিকে ডেকে পাঠালো। অরুণিতা আসে।
“চাচ্চু ডেকেছিলে?”
“হ্যাঁ, আসো তোমার নামে নালিশ এসেছে।”
অরুণিতা এগিয়ে গিয়ে চাচ্চুর পাশে দাঁড়ালো। ক্রন্দনরত ফুফুর দিকে এক পলক দেখে নিয়ে চাচ্চুর উদ্দেশ্যে বলল, “কে করলো নালিশ?”
আরিয়ান অরুণিতার হাত ধরে নিজের পাশে বসায়। স্নেহের স্বরে বলে, “আমাদের অরুর মতো মেয়েই হয় না। রূপে গুণে সব দিকেই মিস পার্ফেক্ট।”
“টক টু দ্য পয়েন্ট!” অরুণিতার কাটকাট গলা।
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানতে চাইলো, “তোমার ফুপ্পির সাথে কথা বলো নি কেন? সে তোমাদের কত ভালোবাসে বোঝাতে হবে তোমাদের? দেখো, কথা বলো নি বলে কেঁদে মেকআপ নষ্ট করে ফেলেছে। এসেই হাউমাউ করে কেঁদে বলছে, ‘ছোট ভাইয়া, অরু আমার সাথে কথা বলছে না।’”
অরুণিতা আদুরির দিকে তাকিয়ে সম্বোধনহীন বলে, “কথা বলিনি?”
আদুরি ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ক্রন্দনরত সুরে বলল, “দেখলে ভাইয়া?”
আরিয়ান অরুণিতার দিকে তাকিয়ে হতাশ সুরে ডাকে, “অরু?”
“এনি প্রবলেম?”
অরুণিতার ভাবলেশহীন গলায় আরিয়ান কি বলবে ভেবে পায় না। ভাতিজি তাঁর ভাইয়ের কোনো অংশে কম না, দুই কাঠি উপরেই ধরা যায়।সে জানতে চাইলো, “সেটাই তো! কি প্রবলেম চাচ্চুটার?”
“প্রবলেম সৎ এবং আপনের। সে আমার পাপার সৎ বোন।”
“অরুণিতা, বিহেভ ইয়্যুর সেল্ফ!” আরিয়ান শাসনের সুরে ধমকায়।
অরুণিতা মুখে প্লাস্টিকের হাসি ঝুলিয়ে বলে, “আ’ম বিহেভিং ওয়েল। পাপা সে’জ উই শুড ট্রিট পিপল দ্য ওয়ে দে ট্রিট আস। টকিং টু হার স্টেপব্রাদার’স ওয়াইফ, সি ফিলস অকওয়ার্ড। দেন হোয়াই শুড আই বি সো ক্লোজ উইথ মাই স্টেপ আন্ট?”
“অরু!” আদুরি ধমকায় অরুণিতাকে। অরুণিতা তাঁকে গ্রাহ্য করে না। চাচাকে বলে,
“মাম্মাম, ওখানেই বসেছিল। উনি তাঁকে ইগনোর করে চাচিমনির সাথে কথা বলছিল, গলায় লাগছিলো। হাউ ক্যুড আই টলারেট ওল অফ দিস?”
ঘরে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। আরিয়ান বোঝানোর চেষ্টা করে, “অরু, সিচুয়েশন টা একটু ক্রিটিক্যাল! তুমি তো জানোই তোমার মামার সাথে আদুরির একটা সম্পর্ক ছিলো। তারপর ডিভোর্স…এখানে অনেক কথা আছে। তুমি ছোট মানুষ..”
“হোয়াট কাইন্ড ওফ ‘কথা? চাচ্চু তাঁরা রিলেশনে জড়ানোর আগে পাপা বা মাম্মামের পারমিশন নিয়েছিল কি? একে অপরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। বনিবনা হয় নি, আলাদা হয়ে গেছে। নর্মাল বিষয়। কিন্তু এখানে মাম্মামের কি দোষ? তোমার বোন মামুর উপর কেস করতে চেয়েছিল পাপা কেস করতে দেয় নি। তাই পাপা শ্বশুরবাড়ির লোকের হয়ে গেলো। এসবের ভিড়ে মাম্মাম তাঁর বাপের বাড়ি যায় না কত বছর হয়ে গেলো। সেসব কারো চোখে পড়ে না, নাহ্?”
অরুণিতা অনেকটা ধৈর্য সহকারে ধীর গলায় সবটা বলে গেলো। আরিয়ানের মনে হলো কথাগুলো অরু না, অরুণ ভাই বলছে। সে বোনের দিকে তাকায়। আদুরিও ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি বড় ভাবীর সাথে কথা বলি না? আমি যেচে কথা বলতে যাই, বরং উনিই গা বাঁচিয়ে চলে। আর ও ছোট মানুষ! ছোটদের মতো থাকবে। বড়দের মধ্যে কথা বলবে কেন?”
“আমি বড়দের মধ্যে কথা বলতে চাইও নি। নালিশ দেওয়া হয়েছিল তাই আমি আমার সাইড ক্লিয়ার করলাম। এতটুকুই!”
অরুণিতা এবার হালকা অনুভব করে। ভেতরটা এতক্ষণ জ্বলছিল দাউ দাউ করে।
—————
অরুণ সরকার রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলো। গায়ে সাদা অ্যাপ্রোন, হাতে গ্লাভস! ওভেন থেকে কেকটা বের করে কেবিনেটে রাখে। কাল মেয়ের বার্থডে তাই প্রতিবছরের মতোই নিজ হাতে কেক বানাচ্ছে।
হঠাৎ পাতাকে হনহনিয়ে রান্নাঘরে ঢুকতে দেখা গেলো। অরুণ কোণা চোখে তাঁর চিন্তিত মুখপানে তাকালো। মহিলা তাঁর সাথে কথা বলে না। দুই একটা শব্দ যা উচ্চারণ করে সেগুলো কথার কাতারে পড়ে না।
“ভোরের বাবা, আরিয়ান ভাইয়ার স্টাডিরুমে ঘুরে আসেন তো। এক্ষুনি যান, ইটস ইমার্জেন্সি!”
“কি হয়েছে?”
“কি হবে? আপনার মেয়ে আপনার মতোই হয়েছে। বড়দের মুখের উপর যা নয় তাই বলবে। ম্যানার বলতে কিছুই নেই। আপনি এখনও দাড়িয়ে কেন? জলদি যেতে বললাম না।”
“আরে, আমি কাজ করছি তো।”
“রাখুন আপনার কাজ। আগে মেয়েকে সামলান গিয়ে। ছোট ছোটদের মতো থাকবে। বড়দের ঝামেলায় পড়তে হবে কেন ওকে? আস্ত বেয়াদব হয়েছে। আজ ওঁর পিঠে লাঠি ভাঙবো।”
পাতার মুখটা রাগে লাল হয়ে আসে। অরুণের মাঝে সেরকম কোনো হেলদোল দেখা গেলো না। সে এখনো ছুরি দিয়ে কেকের গায়ে ক্রিম লেপ্টে দিচ্ছে। পাতা রেগে বলে,
“কিছু বলছি আমি! যাবেন নাকি আমি গিয়ে চুলের মুঠি ধরে টেনে আনবো?”
অরুণ শান্ত গলায় বলে উঠলো, “কি হয়েছে না বললে কিভাবে যাই? ঘটনা কি!”
পাতা কিছুই বললো না, শান্ত চোখে চাইলো শুধু। চোখে জমা সকল রাগ পানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অরুণ সরকার ছুরি রেখে দেয় তৎক্ষণাৎ। অ্যাপ্রোন খুলে রেখে রান্নাঘর ছাড়তে ছাড়তে বলে,
“যাচ্ছি তো! এমন করে তাকালে তো ভয় করে! কেক খেয়ে ফেলো না যেন। এখানেই থেকো।”
পাতা কেকের দিকে তাকায়। ছুরিটা হাতে নিয়ে কেকের দফারফা করে ছাড়ে। এতো রাগ লাগছে কেন? রাগটা কার উপর? আদুরি নাকি আদরের মেয়ের উপর!
অরুণ দরজায় কড়া নেড়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ভাই-বোনদের উদ্দেশ্যে ভদ্রসুলভ হেসে মেয়ের পাশে টুল টেনে বসে। আদুরির মুখোমুখি সে। বোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“কখন এলি? আমি ফোন করলাম, বললি আসতে পারবি না…ছেলের শরীর ভালো নেই। আরাফকে রেখে এসেছিস নাকি আবার?”
“উহু, সাথেই এনেছি। নিচে ভাবীর কাছে আছে। আমি আসতাম না। ছোট ভাইয়া ফোন দিয়ে বলল তাই আর মানা করতে পারি নি।”
আদুরি কথায় অরুণ ম্লান হাসলো। সে বড়ভাই ফোন করলো মানা করতে পেরেছে আর ছোট ভাইকে মানা করতে পারে নি।
“ভালো করেছিস। তা মুখটার এ হাল কেন?”
আদুরি আরিয়ানের দিকে তাকায়। অরুণও তাকায়, “ওঁর দিকে তাকাচ্ছিস কেন? কি হয়েছে?”
“ফুপ্পি ভাতিজি লেগেছে। আদুরি নাকি পাতাকে ইগনোর করেছে। তাই অরু আদুরিকে ইগনোর করেছে। টিট ফর ট্যাট!”
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিলো। অরুণ সরকার মেয়ের দিকে তাকালো ক্ষণ। অরুণিতা নিমিষেই রেগে গেল। বলল,
“আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছো কেন? আমার মাম্মামের সাথে কথা বলবে না, আমি কেন তাঁর সাথে কথা বলতে যাবো?”
আদুরিও চুপ থাকলো না, “ভাইয়া আমি ভাবীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কেমন আছো ভাবী?’ ভাবী জবাব দেয় নি। এখানে অপমানটা কে করলো আগে? তারপরও আমি কিছু বলি নি। হয়তোবা অতীতে আমারও কিছু ভুল ছিলো। কিন্তু আমার কথা হলো, ছোট মানুষ হয়ে বড়দের বিষয়ে কথা কেন বলবে? কি কি বলে নি তোমার মেয়ে! এখানে সৎ আপনের প্রশ্ন আসবে কেন, জবাব দাও ভাইয়া? তুমি তোমার মেয়েকে নিশ্চয়ই শিখিয়েছো যে আমি ওদের সৎ ফুপ্পি! তাই তো ওরাও বলে।”
“আদুরি আস্তে কথা বল!” আরিয়ান ধমকে ওঠে। আদুরি দমলো না মোটেই। তেজস্বী স্বরে অরুণকে বলল, “আমার ছেলেটা অসুস্থ। অসুস্থ ছেলেকেই টেনে এনেছি ভাতিজির বার্থডে বলে। কিন্তু ভাতিজির যা রূপ দেখলাম। আমার বাপের বাড়ি আসার শখ মিটে গেছে।”
সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নীরব কান্নায় বুঁদ হয়। অরুণিতা চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে। যেসব মানুষ কেঁদে জিততে চায় তাদের অরুণিতা একটুও সহ্য করতে পারে না। ফুপ্পি তাঁর অনেক পছন্দের ছিলো। কিন্তু আজকের পর…! অরুণ সরকার মেয়ের দিকে ফিরে গম্ভীর মুখে হুকুম দেয়,
“ফুপ্পিকে স্যরি বলো?”
“বলবো, তাঁকে আগে মাম্মামকে স্যরি বলতে বলো।”
অরুণিতার একরোখা জবাব। অরুণ আরেকটু কঠোর চিত্তে বলল, “অরুণিতা, স্যরি বলতে বললাম না?”
অরুণিতা উঠে দাঁড়ালো। বাবার চোখে চোখ রেখে বলল, “সে বলুক, দেন আমিও বলবো। না হলে প্রশ্নই আসে না।”
অরুণ সরকার মেয়ের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল কতক্ষণ। আদুরি ফ্যাচফ্যাচে কান্না অব্যহত রেখে বলল, “আমি বাকি সব বাচ্চাদের থেকে অরুকে বেশি ভালোবাসি। কত স্নেহ করি। আর আজ সে আমার সাথে কতটা রুডলি কথা বলছে।”
কথাগুলো মিথ্যে নয়। অরুণিতা ছোট্ট বেলা থেকেই সবার চোখের মণিতে থেকেছে তাঁর দুষ্টু মিষ্টি আচরণে সে সবার প্রিয় ছিল। আরিয়ান বোনের কথার পৃষ্ঠে বলল,
“তুই শুধু ওর রুডনেস দেখলি। কেন রুড হলো সেটা দেখলি না আদুরি। পাতা তোর বড় ভাবী। তোর উচিত ছিলো রুবির আগে তাঁর গলায় পড়া। তাঁর সাথে কুশল বিনিময় করা। তুই তাঁকে ইগনোর করে রুবির সাথে গপ্পো জুড়ে দিলি। রাগটা অস্বাভাবিক?”
“আমি সবসময়ই ভাবীর সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছি। ভাবীই আমাকে দেখে গম্ভীর হয়ে যায়। ঠিকঠাক কথাও বলে না। যে কথা বলে না তাঁর সাথে আমি কিসের গপ্পো জুড়ে দিবো? সে আমাকে ঘৃণা করে।”
“তুই বলিস না, সেও বলে না। তুই বল, সেও বলবে। এখনি গিয়ে কথা বলবি পাতার সাথে। এটা আমার আদেশ। আরে পাতা এতোটাই নরম মনের, তুই যদি ওর হাতটা ধরে ভাবীও ডাকিস কেঁদে তোকে বুকে টেনে নিবে। ওর মতো কোমল, নরম মনের মানুষ আমি দুটো দেখিনি। ও মন উজাড় করে স্বার্থহীন ভালোবাসতে জানে, ঘৃণা করতে না। তুই যা… এখনি যা। পাতা কোথায়?”
আরিয়ান বোনকে আদেশ করে বড় ভাইয়ের কাছে পাতার সন্ধান জানতে চাইলো। অরুণ ছোট্ট করে জানায় রান্নাঘরে আছে। আরিয়ান বোনকে যেতে বলে। আদুরি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
“ওকে ফাইন। আমি আবারও কথা বলতে যাবো। কিন্তু এবার সে কথা না বললে আমি আর কখনোই এ বাড়িতে আসবো না। সরকার বংশের রক্ত আমার শরীরেও বইছে।”
অরুণ হেসে উঠে দাঁড়ালো, “চল, দেখি কে কথা না বলে। বাট তোকে আগে হাত ধরে সত্যি মনে স্যরি বলতে হবে। তারপর বুকে টেনে নেওয়ার দায় ওর।”
“ভাবী কক্ষনো বুকে টেনে নিবে না। তাঁর কাছে ভাই-ই সব।”
আদুরি অভিমানী স্বরে বলল। অরুণ সরকার বোনের কাঁধে হাত রেখে ভরসা দেয়।
পাতা এখনও রান্নাঘরেই। কেক খাচ্ছিলো। অরুণ দরজায় দাঁড়িয়ে আদুরিকে ভেতরে পাঠায়। আদুরি ধীর পায়ে এগিয়ে যায় পাতার দিকে। পাতা আবারও অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। আদুরি আর লুবমান যখন বিচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছিল পাতা দু'পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করানোর অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নি উল্টো সম্পর্কে তিক্ততা বেড়েছে। ননদ ভেবেছে ভাইয়ের সাফাই গাইতে এসেছে, আর ভাই ভেবেছে নিজ সম্পর্ক নড়বড়ে না হয় তাই ননদের কাছে মাথা ঝুকাতে বলছে। তারপর ভাই ও ননদ দুজনের থেকেই দুরত্ব মেপে চলেছে।
আদুরি এগিয়ে এসে পাতাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে। পাতা খানিকক্ষণ স্থবির হয়ে পড়ে থাকে। অস্বস্তি নিয়ে তাকায় দরজায় দন্ডায়মান অরুণ সরকারের দিকে। অরুণ মুচকি হেসে বলে, “টেক হার!”
পাতা এক হাত আদুরির পিঠে রাখে। আরেক হাত তাঁর মাথায়। স্নেহের সুরে ডেকে বলে, “আদু ভাই? কাঁদছো কেন?”
ব্যস! ননদ ভাবীর মধ্যকার মনোমালিন্য ধুলিসাৎ। দু'জনে দুজনের সাথে ভাব বিনিময় করে। অরুণ তাদের কথোপকথনই শুনছিল। হঠাৎই চোখ পড়ে কেকের দিকে। চোখের আকার নিমিষেই ছোট ছোট হয়ে আসে। তাঁর কেক কোথায় গেলো?
—————
“বাডি, এই শীতের রাতে সেজেধেজে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?”
“নাইট ওয়াক বাডি!”
“ক্যান আই জয়েন ইয়্যু?”
“নোপ!”
অরুণাভ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল। মোহনলাল বিড়াল শাবকের গা বুলিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করে,
“বাট হোয়াই?”
“তোর জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়েই আমি হাঁটতে বেরুচ্ছি। সেই তোকে নিয়েই যদি হাঁটতে বেরোয় তাহলে তো কথাই নাই বাডি।”
অরুণাভ জিন্সের প্যান্ট কোমড় অবদি তুলে হুক লাগায়। টি শার্টে দুই হাত ঢুকিয়ে গলায় তুলে। তখনই হারামি বন্ধুর হারামিপনা শুরু। কোমড়ে থাকা প্যান্ট হাঁটুতে নেমেছে। Under Armour —ব্র্যান্ডের আন্ডারওয়ার মানসম্মান অক্ষত রেখেছে। বন্ধুর অস্বাস্থ্যকর আচরণে রেগে খুন হয় অরুণাভ। নিজ প্যান্ট তোলার আগে বন্ধুর শর্টস নামিয়ে দিলো। মোহনলাল দুই হাতে মানসম্মান ঢেকে নেয়। চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বানিয়ে বলে,
“ছিঃ বাডি ছিঃ! তুই আমার দেহ পাবি কিন্তু মন কক্ষনো পাবি না। আমার মন তো সেই কবেই পাতাবাহারে আঁটকে গেছে।”
অরুণাভ দুষ্টু হেসে স্বীয় প্যান্ট উপরে তুলতে তুলতে বলে, “তোর মন দিয়ে আমি কি করবো। আমার তো দেহটা হলেই চলবে বাডি…”
হঠাৎই থেমে যায় অরুণাভ। মোহনের দৃষ্টি খেয়াল করে চোখের আকার ক্রমশই বড় হয়। সে ঝড়ের গতিতে পেছন ফিরলো।
“কি হচ্ছে টা কি এখানে?” অরুণ সরকারের গমগমে গলা। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সে। হাতের মিনি ট্রেতে দুটো দুধের গ্লাস।
অরুণাভ চাঁপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, “আব্বু কারো রুমে ঢোকার আগে নক করতে হয়! প্রাইভেসি বলতে একটা ওয়ার্ড আছে বুঝলে?”
“এই তোমাদের প্রাইভেসি?”
অরুণ সরকার খেয়ে ফেলা দৃষ্টিতে ছেলে ও ছেলের বন্ধুর দিকে তাকায় । অরুণাভের কান দুটো নিমিষেই রক্তিম হয়ে এসেছে। সে খেয়াল করে মোহনের শর্টস এখনো নিচে পড়ে আছে। বেচারা দুই হাতেই মান সম্মান ঢেকে রেখেছে। অরুণাভ দাঁত কটমট করে বলল,
“প্যান্ট উপরে তোল বাইনঞ্চোত!”
নিচু কণ্ঠে বললেও অরুণের তেজী কান ঠিকই শুনে নিলো ছেলের মুখ কর্তৃক নির্গত বিশুদ্ধ দেশি গালি। এহেন ভাষায় মূক হয়ে গেল সে। মোহন অরুণাভের পেছনে এসে শর্টস তুলে নেয়। ক্যাবলাকান্তের হাসি উপহার দিয়ে বলে,
“আঙ্কেল, আপনি যেমনটা ভাবছেন তেমন কিছুই…”
“আমি কি ভাবছি?” অরুণ সরকার চট করে প্রশ্ন ছুঁড়লো।
অরুণাভ পারে না বন্ধুকে রাম দা দিয়ে ফালা ফালা করতে। সে বাবার দিকে তাকিয়ে হালকা পাতলা হাসি ফুটিয়ে বললো, “ইট ওয়াজ টোটালি মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং! তুমি কিছু বলবে? ওহ্ আচ্ছা দুধ দিতে এসেছো!”
অরুণাভ এগিয়ে এসে গ্লাস দুটো নিয়ে নেয়। বাবাকে বলে, “তুমি এখন আসতে পারো! আসতে পারো বলতে তোমার যদি কিছু বলার থাকে বা কাজ থাকে ভেতরে আসতে পারো। আসো ভেতরে আসো?”
অরুণাভ কথার খেই পায় না। অস্বস্তি লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসছে তাঁর। আব্বু কি না কি ভাবছে! আব্বু চলে গেলে সে বন্ধুর কিমা বানিয়ে ছাড়বে। অরুণ সরকার ভেতরে গেল না। সে যা দেখেছে তা কি চোখের ভুল? নাকি অন্য কোনো ব্যাপার লুকিয়ে আছে। দুজন উঠতি বয়সী ছেলে… নিজ ভাবনায় নিজেই চমকায় অরুণ। কি ভাবছে সে! তাঁর কলিজা এতোটা জঘন্য কাজ কখনোই করতে পারে না। তাঁর দেখার ভুল। হয়তোবা ওঁরা মজা করেছে! অরুণ সরকার খেয়াল করে তাঁর কান দিয়ে গরম ধোঁয়া জাতীয় কিছু বেরুচ্ছে! উফ! এতোটা অস্বস্তিকর মুহূর্ত কখনো তৈরি হয় নি।
অরুণাভ স্ট্যাম্প হাতে বন্ধুকে ধাওয়া করেছে। মোহনলাল নিজেকে বাঁচাতে মরিয়া। সে আহত গলায় বলে, “বাডি আমি কি জানতাম নাকি তোর বুড়ো বাপ রং টাইমে এন্ট্রি নিবে?”
“বুড়ো কাকে বলছিস? তুই বুড়ো, তোর বাপ বুড়ো তোর চৌদ্দ গুষ্টি বুড়ো। সাহস থাকে তো কাছে আয়!”
অরুণাভের তেজস্বী স্বরের পৃষ্ঠে মোহনলাল দুষ্টু হেসে বলল, “বাডি ভালোভাবে বলো! ওই যে ক্লোজ আপ স্টাইলে? কাছে আসো, কাছে আসো, কাছে আসোওও না! কাছে আসো নাআআআ!”
মোহন দুই হাত বাড়িয়ে চুমুর ভঙ্গিমা করে। অরুণাভ আরো রেগে যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মোহন সুযোগ খুঁজে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা লক করে দিল। তারপর শর্টসের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সিটি বাজাতে বাজাতে চলে গেলো যেদিকে দুচোখ যায়।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই ড্রয়িংরুমে তার ক্রাশের দেখা মিলে গেল। ক্রাশ তাঁর ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে টিভি দেখছে। সে ঝাকরা চুলে আঙুল বুলিয়ে এগিয়ে যায়। ঝলমলে হাসি উপহার দিয়ে বলে,
“হেয় প্রিটি লেডি!”
পাতা, প্রহর দুজনে একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করে, মুচকি হাসে। যা মোহনের বুক এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয়। সে খুশিতে গদগদ হয়ে পাশের খালি সোফা ইশারা করে বলে, “ম্যাম, ক্যান আয় সিট হেয়ার?
পাতা হেসে বলে, “বসো, আর ম্যাম ডাকলে কিন্তু রাগ করবো।”
মোহন গুটিসুটি মেরে পাশে বসে বলে, “সে আপনি রাগ করলেও আমি আপনাকে আন্টি ডাকতে পারবো না। বুকের বা পাশে বড্ডো কুটকুট করে।”
“এ্যাঁই ছেলে, তুমি কি আমার সাথে ফ্লার্ট করছো?” পাতার চোখের আকার বড় হয়।
মোহন বুকে হাত চেপে বলে, “ম্যাম, এভাবে ডাকবেন না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।”
পাতা বাঁকা চোখে চায়। মোহনের পিঠে আলতো চড় মেরে বলে, “বদ ছেলে, বন্ধুর মা তোমারও মা!”
মোহন তৎক্ষণাৎ বিরোধিতা করে বলল, “বন্ধুর বউ যেমন আমার বউ হতে পারে না, সেই সূত্র ধরে বন্ধুর মা আমার মা কথাটিকে মিথ্যে প্রমাণিত করলাম। দ্বিতীয়বার এ কথা বলবেন না ম্যাম! আমি হলুদ কালার হারপিক খেয়ে শহীদ হয়ে যাবো।”
প্রহরের চোখে ঘুম নেমেছিল। তবে মোহনলালের এ কথায় ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই প্রশ্ন করে, “হারপিক তো ব্লু কালার হয়। ইয়েলো কালার তো পটি’র হয়ে থাকে। আমার পটি ইয়েলো কালার। তুমি চাইলে আমার পটি খেতে পারো।”
“খামোশ, বালক। বড়দের কথার মাঝে নাক গলানো ভালো স্বভাব না।
মোহন গম্ভীর গলায় বলল। প্রহর ট্যারা হয়ে স্বীয় নাক দেখার চেষ্টা করে বলে, “আমার নাক তো ঠিকই আছে। আমি কখন নাক গলালাম মোহন ভাইয়া?”
মোহন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো প্রহরের দিকে। তারপর পাতাকে জিজ্ঞেস করে, “ম্যাম এই চ্যাটার বক্স কোত্থেকে কুড়িয়ে এনেছেন?”
পাতা প্রহরকে বুকে জড়িয়ে নেয়। শাল দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে নিয়ে বলে, “এনেছি রূপকথার শহর থেকে। বায় দা ওয়ে তোমার শীত করছে না? এই হাড় কাঁপানো শীতে ঠ্যাং বের করে ঘুরছো!”
মোহন নিজ পায়ের দিকে তাকায়। অতি উত্তেজনায় শর্টস পরেই ক্রাশের সামনে এসেছে! শা*লা তুই ইয়েলো কালার পটি খেয়েই মরবি! মনে মনে নিজেকে ভর্ৎসনা করে মোহন পাতার সম্মুখে বীরদের মতো করে হাসলো। কিচেন হয়ে কফির মগ হাতে এদিকে এগিয়ে আসা অরুণ সরকারকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
“বুড়ো হই নি যে হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি ধরবে। টুপি, জ্যাকেট পরে প্যাকেট হয়ে ঘুরবো ফিরবো। এইসব শীত আমাদের মতো ইয়ং ম্যানদের গায়ে লাগে না।”
“তা মন্দ বলো নি।”
অরুণ সরকার মোহনের উপর সুক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সিঙ্গেল সোফায় এসে বসে। এই ছেলেটাকে তাঁর সুবিধার লাগে না। সবসময় ভোরের সাথে চিপকে থাকবে, আবার পাতাবাহারের সাথে ফ্লার্ট করার চেষ্টা করবে। তাঁর ছেলেটাও কিছু বলে না।
“ম্যাম সাহস দিলে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতাম!” মোহন ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল। পাতা ভ্রু কুটিতে ভাঁজ ফেলে বলে, “কি জিজ্ঞাসা করতে চাও?”
“এটাই যে, আঙ্কেল কি কালোজাদু করেছিল?” পাতার দিকে ঘেঁষে ফিসফিসিয়ে বললো মোহন।
পাতা অবুঝ স্বরে বলে, “কালোজাদু?”
“হ্যাঁ, আমি শতভাগ নিশ্চিত আঙ্কেল আপনাকে কালোজাদু করে বিয়ে করেছে। নয়তো আপনিই দেখেন! কোথায় ওই চুল দাঁড়ি পাকা বুড়ো লোক আর কোথায় আপনি! আকাশ পাতাল ফারাক।”
পাতা ঠোঁট চেপে হেসে বলল, “তা একটু করেছিল বৈ কি!”
“আপনি কিছু বলেন নি?”
“কি বলবো বলো? মায়ায় পড়ে গেছি তো। তাও যে সে মায়া না। ভয়ঙ্কর মায়া।”
দুজনের ফিসফাস সহ্য হয় না অরুণ সরকারের। কফির মগ ঠাস করে রেখে হনহনিয়ে ড্রয়িংরুম থেকে চলে যায়। মোহন মুখ বাঁকিয়ে পাতার সাথে গল্প চালিয়ে যায়।
—————
“এসব কথার মানে কি আনি? তুই হঠাৎ সময় নেয়ার কথা বলছিস কেন? আর তুই কি করে বলতে পারিস আমি কয়েকবছর পর তোকে ভুলে যাবো? আই লাভ ইয়্যু… আ’ল লাভ ইয়্যু এট দা এন্ড ওফ মায় লাইফ। তুই প্লিজ চাচিমণির কথায় উল্টোপাল্টা কিছু মাথায় নিস না! তুই একটু মাথা ঠান্ডা করে সবটা ভাব।”
আনিকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আমি ভেবেচিন্তেই তোর সাথে কথা বলতে এসেছি ভোর। আমরা দুজনেই এখন ছোট। আমাদের অনুভূতি শুধু ভালোলাগা নাকি ভালোবাসা তা বোঝার জন্য আমাদের আরেকটু সময় নেওয়া উচিত। এতো দ্রুত বিয়ের চিন্তা করা উচিত হবে না। তুই তোর ক্রিকেট ক্যারিয়ার গড়ে তোল, আমিও আমার পড়ালেখার পাঠ চুকাই।”
অরুণাভ মাথা নত করে হাঁটে ফুটপাত ধরে। কিছু সময় নীরাবতায় কেটে যায়। আনিকা জিজ্ঞাসা করে,
"কিছু বলছিস না যে?"
"কি বলবো? সব তুই বলে দিলি। আমার কথার গুরুত্ব আছে কি?"
"ভোর?"
“আনি, শুধু কোর্ট ম্যারেজ করে রাখি? আমরা তো এখই সংসার জীবন শুরু করছি না। যাস্ট এনসিওর হতে যে তুই আমার। ভবিষ্যতে তোর মা আর কিছুই করতে পারবে না।” অরুণাভ যথাসম্ভব শান্ত হয়েই বলে যায়।
আনিকা বলে, “মায়ের কথা আসছে কেন ভোর? আমরা নিজেদের কথা বলছি। আমাদের ফ্যান্টাসি থেকে বেরিয়ে বাস্তবতা দেখা উচিত ভোর। আই থিংক আমরা একসাথে কখনো সুখী হতে পারবো না।"
অরুণাভেল মুখটা ক্রমশই গম্ভীর হয়ে আসে, "হঠাৎ এমন মনে হওয়ার কারণ?"
"আব্বু বোঝালো কেন আমরা সুখী হয় পারবো না।"
অরুণাভের মানসপটে চাচ্চুর মুখটা ভাসে। আনিকা আরও বলেন, "প্রতিটি মা বাবা চায় তার ছেলে মেয়ে ভালো কিছুর সংস্পর্শে যাক…”
“তাঁর মানে বলতে চাইছিস আমি ভালো না? আমি খুব খারাপ ছেলে?”
“আমি সেটা বলি নি।”
“আমরা সব প্ল্যান করে রেখেছিলাম না বল? আমি কাগজপত্রও রেডি করতে দিয়েছি। এখন তুই মাঝপথে এসে বলছিস সময় চাই তোর। তুই কি আমাকে ভালোবাসিস না?”
“না।”
অরুণাভ আহত চোখে চায়। আনিকা হাঁটা থামিয়ে দেয়। ফুটপাতেই বসে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতেই বলে, “ভোর, আমি এখনও কনফিউজড। আমি জানি না। আমি ছোটবেলা থেকেই তোর বউ হতে চাইতাম। কিন্তু…”
“কিসের কিন্তু আনি? কোনো সমস্যা আছে? তুই আমাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারিস।”
অরুণাভ এবারও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। আনিকা হয়তোবা ভয় পাচ্ছে! আবার এও হতে পারে ওর মা ওকে দূর্বল করার চেষ্টা করছে। সে আনিকার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে। দুই হাত মুঠোয় ভরে বলে,
“কি সমস্যা আনিবুড়ি? আমাকে বলে দেখ?”
আনিকা চোখে চোখ রেখে বলল, “সমস্যার কথা বলতে পারছি না। বাট আমি এমন কিছুই করবো না যার জন্য ভবিষ্যতে আমাকে পস্তাতে হয়। আমি ভাবার জন্য সময় নিলাম।”
অরুণাভ ব্যথিত হয়। তবে আশা ছাড়ে না। সে হাতের মুঠো শক্ত করে বলে, “আমি কথা দিচ্ছি তোকে পস্তানোর সুযোগ দিবো না। আমি তোকে অনেক ভালোবাসবো, অনেক সুখে রাখবো। আনি ট্রাস্ট মি?”
আনিকা হাত ছাড়িয়ে নিল। স্পষ্ট করে বলল, “আই ওয়ান্ট…বাট…আই কান্ট বাডি। প্লিজ গিভ মি সাম টাইম।”
অরুণাভ পলকহীন তাকিয়ে থাকলো আনিকার দিকে। জ্যাকেটের পকেটে থাকা সেই প্লাটিনাম রিং বের করে বলল, “আজ পর্যন্ত আমার উপার্জনের সব টাকা দিয়ে এটা বানিয়েছি। যত সময় লাগে নে, কিন্তু এই রিংটা গ্রুহন কর? আমি ভাববো তুই আমার হয়ে আছিস।”
“স্যরি, আই কান্ট টেইক দিস।”
অরুণাভ বাড়িয়ে দেওয়া রিং ফিরিয়ে নিলো। তাঁর মন বড্ড অশান্ত হলো। ভেতরটায় ভাঙচুর হলো। মলিন মুখে বলল, “কোন ব্যপার না। জোরজবরদস্তি নেই। তুই যেমন বলবি।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………