খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ১৪ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          আমার মেয়ে মুশফিকা বিনতে মুহাইমিন ওরফে কৃপা। এই মানবীর জীবনে মাত্র দুটো প্রাণীর পাত্তা আছে। অন্তত তিন মাস অবধি তাই ছিলো। সেই দুই প্রাণী ব্যতীত, কারোর কোলে যেতো না সে। কেউ আহ্লাদ দেখিয়ে কোলে তুলতেই সে তার রুপ দেখাতো। মানুষটি লজ্জা পেয়ে কৃপাকে ফেরত দিত। যে দুই প্রাণীর এই মানবী থাকতেন সেই দুই প্রাণী হলাম আমি এবং সাহেব। সাহেবের এন্ট্রি যদিও পড়ে হয়েছে কিন্তু রক্তের টান। বাবা বলতে মেয়ে পাগল। আর সাহেবও তার দেশি পেয়ারা পার্ট টুকে আদরে সোহাগে মুড়িয়ে রাখার চেষ্টা করেন। তিনি তাকে আহ্লাদ করতে পারেন না। কিন্তু মেয়ে ঠিক বাবার আহ্লাদ কেড়ে নেয়। সাহেব অফিস থেকে ফিরতেই যখন তার ভারী স্বর শুনতো, "উউউউউ, উউউউ" করে একটা ন্যাকা কান্না শুরু হতো। নাকটা ফুলিয়ে, নিচের লাল ঠোঁটটা বাঁকিয়ে উল্টিয়ে এমন একটা আহ্লাদী কান্না করতো যে বাবা নিতে বাধ্য। এতো ঢং তো আমিও করতাম না। আর মেয়ের এমন ঢং দেখে সাহেবকেও তাড়াহুড়ো করে তার শুধু হাতটা ধুঁয়ে ঘামের কাপড় সমেত তাকে কোলে নিতে হত। তিনি হাটতেন আর বললেন,
"তুই কি জানিস তুই তোর মায়ের মতো নকটা? একটা আস্তো যন্ত্রণা!"

আমার মেয়ে বাবার ঘাড়ে মাথাটা রেখে জবাব দিত,
"উউউউ, উউউ!"

আমি দেখতাম আর মনে মনে বলতাম,
"ঠিক হয়েছে, একদম আল্লাহর বিচার।"

—————

মা হবার ভার আমার শরীরে প্রকট ভাবেই দেখা গেলো। বাসায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই আমার সেলাইয়ে ইনফেকশন হলো। সেই থেকে তিনদিন জ্বরে ভুগলাম। সেই তিনদিন বিনোদনের শেষ ছিলো না। আমি বিছানা থেকে উঠতে পারি না। সাহেব আবার অফিস ছুটি নিলেন। আমি মিনমিনিয়ে বললাম,
"মাকে ডাকি? মিষ্টি আপু তো আছেন ই। মা কৃপাকে সামলাবে!"

সাহেব হুংকার ছাড়লেন,
"আমার মেয়ে আমি সামলাবো!"

বেশ সামলাক আমার কি। মেয়ে কেমন ধানী লংকা বাবাও টের পাক। আমার তো মাজা ব্যাথা হয়ে গেছে। মেয়ে তার আসল রুপ দেখালো। সকাল থেকে শান্ত থাকলেও যেই তাকে গোসলে নেওয়া হলো অমনি সে কি চিৎকার। গোসল করাতে নিয়ে গিয়েছিলো সাহেব এবং জরিনা। জরিনা এবং সাহেব দুজন দুজনকে দেখতে পারেন না। জরিনার ভাষ্য,
"আমি বিশ্বগাধা বিধায় সাহেবের ঘর করি। এই লোকের ঘর হাসিনাও করবে না!"

তাই তাদের মধ্যে শীতল যুদ্ধ আগ থেকেই চলমান। গোসলের সময় কৃপাকে সাহেবের কোলে দিয়ে জরিনা খ্যাটাং করে বললো,
"শুধু ওরে ঝুলায়ে রাখবেন। পানি আমি দিমু।"
"ঝুলায়ে রাখবো মানে আমার মেয়ে কি মুরগী নাকি? এই শুদ্ধ করে কথা বলো!"
"এতো কতা কন কে? কইছি যেইটা হেইয়া করেন! নয়তো আমি যামু গা! নিজে নিজেই করায়েন গোসল!"

এদিকে মেয়ে হাত পা ছুঁড়ে কি চিৎকার! পানি তার একদম অপছন্দ। পানি ছোঁয়ালেই সে এমনভাবে কাঁদে যেন তাকে কেউ মারছে। পানির গামলাতে নামাতেই সে পায়ে ভর দিয়ে উপর দিকে লাফ দিচ্ছিলো। সাহেব খুব নাকানিচুবানি খেলেন। কিভাবে মেয়েকে ধরে রাখবে বুঝতে পারলেন না। জরিনা এদিকে খ্যাকখ্যাক করে উঠলো,
"করেন কি! ওয় তো পানিত পড়বো।! উল্টান উল্টান ওরে। পিঠে পানি দিবো। আরে করেন কি করেন কি! পানি খায়ে ফেলবে তো। সাঁতার শিহানোর তো দরকার নাই।"

সাহেব ছটফটে মেয়েকে সামলাতে যেয়ে প্রায় ফেলেই দিচ্ছিলেন৷ জরিনা কোনো মতে গোসল করিয়ে ঝামটি মেরে বললেন,
"আপনের মতো অকম্যা আমি জীবনে দেখি নাই"

সাহেবকে অকম্যা বলার সাহস যে নারী দেখাতে পারে তাকে আমি একুশ তোপের সালামী জানাই। এই সাহস আমি বউ হয়ে এই ক বছরে করতে পারি নি। সাহেব রেগে মেগে আগুণ। ধমকে বললেন,
"বেয়াদব মেয়েটাকে কাল থেকে যেন না দেখি।"

তাকে কোনোমতে আমি ঠেঁকালাম৷ জরিনা ছাড়া আমি অচল, দিশেহারা। অসহায় স্বরে বললাম,
"বাদ দিন। ও এমন ই! কাজ ভালো করে।"
"এই বেয়াদবকে প্রশ্রয় দিব নাকি?"
"প্লিজ! একটু কৃপা করুন। আমার একটু সুবিধা হয় ও থাকলে?"

সাহেবের চোখ মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে এলো। ফলে জরিনাকে আর বাদ দেওয়া হলো না। তিনি বিরক্তির সাথে বললেন,
"যন্ত্রণা, যতসব!"

আমার মেয়ের স্বভাব রানী ভিক্টোরিয়ার মত। আমার সাহেবকে সেদিন হারে হারে সে টের পাইয়ে দিয়েছে সে আসলে কি জিনিস। দুধ খাওয়ার পর সে হাঁসফাঁস করবে, ঢেকুর তুলবে না, তারপর বমি করে কোল ভাসিয়ে দিবে। ডাক্তারের ভাষ্যমতে তার পরিপাকতন্ত্র এখনো সম্পূর্ণরুপে প্রস্তুত হয় নি। তাই যা হজম করতে পারে না তা বমি করে দেয়। তাকে নিয়ে কোথাও বসা যাবে না। সবসময় তাকে হাটার উপর রাখতে হবে। বসলেই তার ট্রানজিস্টর শুরু হয়। ফলে সাহেব হাটতে হাটতে তার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু যেহেতু মেয়েকে সে একাই সামলাবে বলে অঙ্গিকার নিয়েছে তাই কোনোরকম হম্বিতম্বিও করতে পারলেন না। যেই একটু শান্ত হয়ে ঘুম ঘুম ভাব এলো, বাচ্চাটা অমনি প্রসাব করে ভাসিয়ে দিলো। তারপর আবার কান্না। সাহেব আমার কোলে দিয়ে পোশাক বদলানেন। সকাল থেকে বহুবার কাপড় পাল্টাতে পাল্টাতে ক্লান্ত হয়ে গেলেন আমার সাহেব। একবার বমি তো একবার প্রসাব।আমার তার এই খাবি খাওয়া অবস্থা দেখে খুব মজা লাগছিলো। আমার মনে একটা ক্ষীণ আশা জন্মালো, আমার মেয়েই পারবে এই কৃপাধারী হুতুমকে লাইনে আনতে। এই ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম টের পেলাম না। 

যখন ঘুম থেকে উঠলাম দেখলাম সাহেব আমার পায়ের নখ কেটে দিচ্ছেন। আমার পায়ের নখ কাটা হয় না অনেকদিন, বুড়ো আঙ্গুলের নখটা তো ভেঙ্গেও গেছে। সময়-ই পাই না। মেয়ে এক মুহূর্ত ছাড়ে না। গোসল বা খাওয়াটাই আমার কাছে বিলাসিতা হয়ে গেছে। আমি উঠে বললাম,
"কি করেন?"
"দানবী নখ কাটি। নখ দিয়ে নিশ্চয়ই মাটি খোঁড়া হবে না!"

আমি হাসলাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে আমার নখ কাঁটছেন, দেখতে খুব সুন্দর লাগছিলো। তার চুল বড় হয়েছে। সূক্ষ্ণভাবে দেখতে একদুটো পাঁকা চুল দেখা যায়। সেই শান্ত, নির্লিপ্ত চোখজোড়ার উপর ঘন আঁখিপল্লব। বিকালের কমলারোদের আঁচড়ে খুব শৈল্পিক সৃষ্টি লাগলো আমার বুড়ো হুতুমটাকে। পাশে তাকিয়ে দেখলাম মেয়েকে পাশে শোয়ানো। সে ঘুমাচ্ছে। হাত দুটো ছড়ানো, কিন্তু তালু মুঠ করা। কি শান্ত পরীর মতো লাগছে। আমার এই দুনিয়াটা আমার দেখতে খুব ভালো লাগলো। মনে হলো এটাই আমার এক মুঠো প্রশান্তি। মেয়েকে বিছানায় শোয়ানোর মত এই বিশাল কাজটা আমার সাহেব কি করে করলেন তা অবশ্য বুঝতে পারলাম না। আমি অবাক হয়ে তাকে শুধালাম,
"আপনি ওকে শোয়াতে পেরেছেন? ও তো শোয় না। বুকের উপর লেপ্টে থাকে!"

তিনি চোখ না তুলেই গম্ভীর স্বরে বললেন,
"মুরোদ থাকতে হয়! সবার দ্বারা তো সব হয় না!"

ব্যাস, আমার অনুভূতি কেঁচে গেলো। এই হুতুমটা খোঁচা না মেরে কথা তো বলতে পারে না। ভালো কথা কি মুখ থেকে বের হবে না! সব কিছুতেই একটা খোঁচা। যন্ত্রণা! যতসব! এমন একটা ভাব যেন সব পেরে উলটে দিয়েছে। দুধ তো খাওয়াতে পারো না, সেই তো আমার কাছেই আসতে হয়। তাহলে এতো ফটফট কেন? এর মধ্যেই কৃপা মুড়িয়ে মুড়িয়ে উঠে গেলো। আর গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগলো। সাহেব হতভম্ব গলায় বললেন,
"দশ মিনিটও হলো না শোয়ালাম! এ কি ঘুমালো নাকি ঘুমের ভান করলো!"

আমি সশব্দে হেসে ফেললাম। বললাম,
"আপনারই মেয়ে!"

হুতুম কঠিন চোখে তাকালেন। আমি কৃপাকে ঠান্ডা করতে বললাম,
"আসেন আম্মা, আপনার জন্য বান্দী প্রস্তুত!"

—————

প্রেগন্যান্সির পর মায়েদের মানসিকতার পরিবর্তন হয় শুনেছিলাম। পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন এই কথাগুলো কাল্পনিক লাগতো। অনেকটা ঢং মনে হত! মুড সুইং, হঠাৎ হঠাৎ রেগে যাওয়া, কান্না করা, বিরক্ত হওয়া, মন খারাপ হওয়া-- এই বিষয়গুলো আমার কাছে বাড়াবাড়ি লাগতো। মা হয়েছি এটাই তো আনন্দের বিষয়। একটা ছোট পুতুল কোলে খেলবে এটাই তো সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। কিন্তু কৃপার জন্মানোর পরের তিনটে মাস আমার কাছে খুব বিভীষিকাময় ছিলো। মা হবার এই যাত্রাটা আমার জন্য সহজ ছিলো না। 

আমার বয়স তখন বিশের দোয়ারে। উপর থেকে সিজারের প্যাশেন্ট। আমার সেলাইতে একবার না মোট দুবার ইনফেকশন হয়েছিলো। সেই সেলাই শুকাতে এক মাস সময় লেগেছিলো। তখন চিকিৎসা এতো উন্নত ছিলো না। ফলে ইনফেকশন হওয়া যেন খুব সাধারণ বিষয়। ব্যাথায় পেট টনটন করতো। পুঁজ বের হত। জ্বর আসতো। মাঝে মাঝে আমি হাউমাউ করে কাঁদতাম। উপর থেকে আমার মেয়ে কৃপা একবিন্দু আমাকে ছাড়তো না। সারাদিন চিৎকার করতো, কাঁদতো। ওকে দুধ খাওয়ালেও কাঁদতো, না খাওয়ালেও কাঁদতো। হাগু করলেও কাঁদতো, না করলেও। এখন হলে ডাক্তাররা "কলিগ বেবি" আখ্যা দিতেন। তখন ডাক্তার কোনো অসুখ খুঁজে পেলেন না। বললেন,
"অপরিপক্ক বাচ্চা, দুনিয়াতে এডজাস্ট করতে সময় লাগছে!"

 ওকে আমি কারোর কোলে তাকে দিতে পারতাম না। নিজের ফুপু, দাদীর কোলেও না। এমন দিনও গেছে আমি ঘুমাই নি সারারাত। কৃপা আমার বুকের উপর ব্যাঙ্গাচির মতো পড়ে আছে আর আমি সারা রাত সজাগ। ঘাড় ধরে আসতো, মাজা কটকট করতো। সাহেব আমাকে সাহায্য করতেন। অফিস থেকে ফেরার পর আমাকে একটু মুক্তি দিতেন। কিন্তু তাকে সকালে অফিস যেতে হত। তাই রাতে তাকে সজাগ রাখতে পারতাম না। খুব মায়া লাগতো। মানুষটা মাঝে মাঝে জোর করে আমাকে ধমকে ঘুমাতে পাঠাতো। আমি একটু পর উঠে যেতাম কৃপার কান্নায়। কারণ সাহেবের ক্লান্তিভরা চোখ ঘুমে ভেঙ্গে আসতো। মাঝে মাঝে অসহ্য লাগতো আমার। যখন কোনোভাবেই কৃপার কান্না থামাতে পারতাম না তখন মাথায় বিশ্রী বিশ্রী চিন্তা আসতো। 

একবার কৃপার কি হয়েছে জানি না, শুধু কাঁদছিলো। একটু পর পর খাচ্ছিলো আর বাথরুম করছিলো তারপর আবার কাঁদছিলো। মাঝে মাঝে নাকে মুখে দুধ উঠাচ্ছিলো। তখন ডাইপার এতো কমন ছিলো না। আমরা কাঁথাই ব্যবহার করতাম। ফলে কাঁথা ভিজিয়ে ডিবি হলো। দু বালতি জমলো। শ্বাশুড়ি মার কড়া বাক্য,
"বাচ্চার কাঁপড় কাজের মেয়েকে দিয়ে ধোঁয়াবা না। নিজেই ধুবা কিন্তু বউ!"

সেই কাঁথার ডিবি দেখে আমার কান্না চলে এলো। পেটে ব্যাথার মধ্যে কত্তগুলো কাথা ধুঁতে হবে। সারারাত নির্ঘুম, আমার শরীর ক্লান্ত। সাহেব উঠে পড়েছেন। তিনি একবার মেয়েকে নিয়ে হাটেন, আমি একবার হাটি। একটা সময় আমার দুধও পাচ্ছিলো না মেয়ে, ফলে কি কান্না! তখন মনে হয়েছিলো ওকে আঁছাড় দেই। এতো কান্না করে কেন! থামে না কেন! কিন্তু পরমুহূর্তে কথাটা ভাবতেই আমার বুক কেঁপে উঠলো। আমি ধপ করে বসে পড়লাম বিছানায়। "আস্তাগফিরুল্লাহ"-- পড়লাম দ্রুত। সাহেবের কাছ থেকে কৃপাকে বুকে জড়িয়ে নিলাম। কি বাজে চিন্তা! সেদিন মেয়ে ঘুমিয়েছিলো সকাল দশটায়। পরদিন সাহেব অফিস কামাই দিয়েছিলেন। মেয়েকে যে ডাক্তার দেখানো হয় নি, এমন না। ডাক্তার, কবিরাজ, হুজুর, হোমিওপ্যাথি সব দেখানো হয়েছে। কিন্তু লাভ হয় নি। মেয়ের এই কান্না তিনমাস পর্যন্ত চলমান ছিলো। এই তিনটা মাস আমার ওজন কমে গিয়েছিলো অনেক। দু বার ইউরিন ইনফেকশনও হয়েছিলো। ডাক্তার আমার সাহেবকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন,
"খাওয়ান, খাওয়ান না নাকি! ওজন কমছে কেন? এমন হলে তো আবার রক্ত দেওয়া লাগবে।"

সাহেব আমার দিকে চিন্তিত চোখে তাকালেন। আমি মাথানত করে ফেললাম। তিনি বাসায় এসে জরিনাকে গুরুতর দায়িত্ব দিলেন আমাকে যেন সে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। জরিনা রসিয়ে রসিয়ে বললো,
"খাইষ্টা বেডার পীরিতও আছে!"

—————

তিনমাস পর আমার মেয়ের কান্নার স্রোত কমলো। কিন্তু তার রঙঢঙ কি শেষ আছে? নতুন ধরণের আহ্লাদ সে করতো। দাদীর কোলে দিলে মাথাটা উল্টে, নাক ফুলিয়ে, নিচের ঠোঁট উল্টে,
"উউউউ, উউউউ" 

করতো। মাঝে মাঝে বিছানায় শুইয়ে দিলে পায়ে ঠেকনা দিয়ে মাজা তুলে ফেলতো যেন আমি কোলে নেই। আমার সাথে তার আহ্লাদ ছিলো ভিন্ন রকম। আমি "আম্মু" বলতেই সে জিহ্বা বের করে হাসতো। আর "উউউ, আয়ায়ায়া!" করতো। সাহেবকে দেখে সে হাসতো না। হাসি শুধু আমার জন্যই যেন বরাদ্দ। তার হাসি দেখলে আমার সব কষ্ট পানি হয়ে যেত। আমার মনে আছে, একবার আমি রান্না করছিলাম। মা বেতের মোড়ায় কৃপাকে কোলে নিয়ে আছে। কৃপা আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটটা উল্টে আছে। যেন আমি এসে তাকে কোলে নেই। মাঝে মাঝে আমি তার সাথেই কথা বলতাম, সে "হুউউ, উউউউ!" করে সাড়া দিত। তার কথা তার মা কোথাও যাবে না। তার সামনে পুতুলের মতো বসে থাকবে। আমি তাকে মেকি বকা দিয়ে বলতাম,
"এই ভদ্রমহিলা! আমি কি তোর পার্সোনাল মানুষ? খেতে দিবি না, ঘুমাতে দিবি না। বাথরুমেও যেতে দিস না। বলি তুই তো যেখানে সেখানে কল ছেড়ে দিস, আমি কি সেটা পারি। আমাকে বাথরুমে যেতে হবে না!"

আমার কথায় কৃপা জিভটা বের করে এতো সুন্দর করে হাসতো যে বকা দিতেই আমি আমি ভুলে যেতাম। আমি সেই সুযোগে বলতাম,
"তুই হলি মায়ের মেয়ে, আমি যা পারি নি তুই তা করবি। তোর বাপকে দেখলেই নিজের ট্রানজিস্টর ছেড়ে দিবি। আর বাপ কোলে নিলেই হেগে দিবি। পারলে মুখে বমি করে দিবি। এমন ভাবে হাসবি যেন মনে হয় তুই কৃপা করেছিস। পারবি না আম্মু? আমার সব শোধ তুই তুলবি।"

আমার মেয়ে কি বুঝতো জানি না, সে মাথাটা টুং টুং করে নাড়ি, বিছানাতেই হাত পা ছুড়ে দাপাদাপি করতো আর জিভ বের করে বোকার মতো হাসতো। এই হাসিটা আমার সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। 

—————

ধীরে ধীরে কৃপা বড় হতে লাগলো। দেখতে দেখতে ছয়মাসে পা রাখলো সে। আমার দিন শুরু হতো কৃপার কান্নায় আর শেষ হত ওকে ঘুম পাড়িয়ে। মেয়ে রাতে আমাকে ঘুমাতে দেওয়া শুরু করলো। সাহেবও একটু শান্তিতে ঘুমাতেন। একদিন তিনি শুধালেন,
"কলেজ টলেজ কি যাওয়া হবে না? পড়াশোনা চাঙ্গে?"
"আর কলেজ যেয়ে কি হবে! আপনার মেয়ে সামলাবে কে?"
"মেয়েকে নিয়ে গেলেই হয়!"
"মেয়েকে নিয়ে ক্লাস করবো?"
"ইম্পোর্টেন্ট গুলো করা হোক। পরীক্ষাগুলো দেওয়া হোক।"

না মন্দ বলেন নি তিনি। কৃপা তখন বাহিরের খাওয়া দাওয়া শুরু করেছে। সুতরাং একটু খিঁচুড়ি নিয়ে গেলেই হবে। কিন্তু মেয়ে সামলে, ঘর সামলে ক্লাস?এই লোকটা আমার একটুখানি শান্তি পছন্দ করেন না। আমি এসে সাহেবের পাশে বসলাম। তার কাঁধে মাথা দিয়ে আফসোসের স্বরে বললাম,
"আমার শান্তি আপনার সহ্য হয় না তাই না?"

সাহেব আমার দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে বললেন,
"আমি কি তোমার শ্বাশুড়ি?!"
"তার থেকে খারাপ। মানুষের শ্বাশুড়ি, ননদ জ্বালায়। আমার বর জ্বালায়!"

সাথে সাথেই গালে কামড় দিলেন তিনি। গাল জ্বালিয়ে বললেন,
"পেয়ারার মাথার পোকা আবার নেত্য শুরু করেছে? পরিষ্কার প্রয়োজন!"
"উহু, কৃপা প্রয়োজন"

বলেই আমি তার গলা জড়িয়ে ধরলাম। একটু আহ্লাদ করবো ওমনি আমার ঘুমন্ত মেয়ে উঠে গেলো। আর ঘর ফাঁটিয়ে কাঁদতে লাগলো। আমি বললাম,
"আপনাদের বাপ, মেয়েকে আমি প্যাকেট করে হিমালয়ে পাঠিয়ে দিবো!"

সাহেব বাঁকা হাসলেন যেন। তারপর নিজেই উঠে মেয়েকে কোলে নিলেন। আমি মনে মনে ছক কষলাম আমার আমার নতুন রুটিনের। 

—————

আমার সংসার মৃদু গতিতে হেলেদুলে চলছিলো। আমার সাহেব, আমার কৃপা, আমার শ্বাশুড়ি আর আমি। এই চারজনের ছোট সংসার। কৃপা বসতে শিখেছে। নিজে নিজে না। তবে বসিয়ে দিলে বসে থাকে। মাঝে মাঝে টুপুস করে পড়ে যায়। তখন শ্রাবণ মাস চলে, ঘনঘন মেঘের গর্জনে পৃথিবী কাঁপছে। রাত নয়টা বেজে সাত। সাহেবের অপেক্ষায় আমি বারবার দরজা দেখছি। তিনি এতো দেরি করেন না। আমার বুকে কামড় পড়লো। অবশেষে যখন কলিংবেল বাজলো আমি ছুটে গিয়ে দরজা খুললাম। দরজার ওপাড়ে সাহেব কাকভেজা হয়ে আছেন। আমি তাকে দ্রুত গামছা এগিয়ে বললাম,
"এতো দেরি কেন? আপনি তো এতো দেরি করেন না!"

সাহেব মাথা মুছতে মুছতে বললেন,
"আমার ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের সাথে দেখা হলো। কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেছে। ও হ্যা আগামীকাল রিইউনিয়ন। বিকালে যাবো। এই যে কার্ড! তুমি আর পার্ট টু রেডি হয়ে থেকো!"

আমি কার্ড হাতে নিলাম। ওখানে লেখা "১৯৮৫ ব্যাচের পুনর্মিলন"। এই প্রথম সাহেবের বন্ধুদের সাথে আমার দেখা হবে। সাহেব আত্মকেন্দ্রিক মানুষ তার যে বন্ধু আছে সেটাই আমি জানতাম না। মনে মনে আনন্দ লাগলো। সাহেব সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিবেন এই বিষয়টা আমার আনন্দের মূল কারণ। পরদিন আমি সুন্দর একটা শাড়ি পরে তৈরি হলাম। আমার কৃপাকে পুতুলের মতো সাজালাম। আমার মেয়ের গোলগোল চোখগুলো খুব মায়াকাড়া। তাই তাকে সবকিছুতেই মাশাআল্লাহ লাগে। সাহেব এসে আমাকে নিয়ে গেলেন এক রেস্তোরায়। যতটা আনন্দের সাথে আমি গিয়েছিলাম, আনন্দটা টেকসই হলো না। তারই এক বন্ধু বলে উঠলেন,
"যা ব্যাটা, তুই এতো কচি মেয়ে বিয়ে করবি ভাবিই নি। আমরা তো আশাই করেছিলাম তুই রুপসাকে বিয়ে করবি! লায়লা মজনু জুটির এভাবেই বিচ্ছেদ লেখা ছিলো! আফসোস!"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp