পবনপত্র - পর্ব ১৭ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          বাদলের সাইকেল থেকে নামলো রাশেদ। গাছতলায় তার দায়িত্বে সাইকেলটা রেখে বাদল কয়েক পা এগিয়ে রোদে গিয়ে দাঁড়ালো। অনেক কষ্টে চোখ মেলে তাকালো জানালাটার দিকে। কপাট লাগানো। সে কপালের উপর থেকে হাত নামায়, হতাশ হয়ে গাছতলায় আসে। রাশেদ গম্ভীরভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। ছেলেটাকে দু' চারটে নীতিবাক্য শুনিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে তার, প্রেম বিষয়ক! যদিও তার নিজেরও আহামরি অভিজ্ঞতা নেই। সে চোখের সামনে প্রথমবার কোনো মানুষের ভরাডুবি দেখছে। তাও আবার মানুষটা বাদল! যে অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষদের দুই চোখে দেখতে পারে না। নীরবতা সহ্য করতে পারে না। কিন্তু এমন একজনের কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে, যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে চলেছে এসব গুণাবলী! ছেলেটার এই ব্যাকুলতা কয়দিন টেকে, রাশেদ কেবল তাই দেখতে চায়।

ছুটি দিয়েছে।
তামান্না প্রাচীরের একপাশে দাঁড়িয়ে ফাঁকা রিকশা খুঁজছে। বাকি মেয়েগুলো দরজার সামনে দল বেঁধে কথা বলছে, কেউ কেউ হাঁটতেও শুরু করেছে।
বাদলের সামনে সবাই অস্পষ্ট। সবার শেষে বিষণ্ণ মুখে যে মেয়েটা বের হলো, ছেলেটার সবটুকু মনোযোগ তার দিকে।

মৌমিতা স্বভাবসুলভভাবে তামান্নার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। এতোদূর থেকে তাদের কথোপকথন অনুমান করা সম্ভব নয়। বাদল তবু ঐ মুখটা থেকে দৃষ্টি সরালো না। ডাগর ডাগর কালো আঁখি, নাকের বামপাশে ছোট্ট জ্বলজ্বলে একটা অলংকার, মুখের উপর এলোমেলো চুল—প্রতিটা খুঁটিনাটি সে যেন চোখ দিয়েই গোগ্রাসে গিলে ফেললো। সমস্ত অপরাধবোধকে ঠেলে সরিয়ে দিলো! এই মুহূর্তে দূরে দাঁড়ানো, নাগালের বাইরের মানুষটাকে নিজের ভাবতে কোনো দ্বিধা কাজ করলো না। মেয়েটার ভেতরটা যেন স্পষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে। ঐ অসামাজিকতা, অহংকারের খোলসের আড়ালে খুব সংবেদনশীল একটা মানুষ রয়েছে, যার সাথে কোনো রাখঢাক নেই বাদলের। কিছু অজানা নেই। এটাতেই যেন একটু সাহস পেলো ছেলেটা। নিজের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের কথা ভুলে গেলো।
আজকের রোদটা কড়া। সেটাকে উপেক্ষা করে একজন অপলক তাকিয়েই রইলো রাস্তার ওপাড়ের অস্পৃশ্য প্রিয়তমার দিকে। অন্যজন যদিও ফিরে তাকালো না একবারও। রিকশায় উঠে বসলো, চোখের পলকে হারিয়ে গেলো দৃষ্টির অন্তরালে।

রবিউল স্যারের ক্লাসরুমে খটখট শব্দে বৈদ্যুতিক পাখা চলছে। বাদল খুব তাড়াহুড়ো করে ঢুকে পড়লো সেখানে। যে ছেলেটা ৩য় বেঞ্চে ব্যাগ রাখতে যাচ্ছিলো, তাকে টেনে সরালো, নিজের ব্যাগটা ছুঁড়লো জানালার পাশে। ছেলেটা হতভম্ব হয়ে প্রতিবাদ করলো, “আরে? তুই আমার জায়গায় কেন—”

“এখন থেকে আমার জায়গা।”

বাদল দায়সারাভাবে কথাটা বলেই বেঞ্চের ভেতরে ঢুকে বসলো। তার সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে ছেলেটা সময় নষ্ট করলো না। তাছাড়া ক্লাসে স্যার উপস্থিত। এসময় বাদলের মতো একজনের সঙ্গে তর্ক না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
রাশেদ প্রতিদিনের মতোই শেষ বেঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো, বাদল তাকে ডেকে ওঠে, “রাশেদ? এখানে বস।”

এই আসনে বসে রাশেদ স্বস্তিবোধ করলো না। সে দেয়ালের দিকে বসে অভ্যস্ত। আশঙ্কা করলো, বাদল হয়তো এখন থেকে প্রতিদিনই এখানে বসবে। কেননা এর পেছনের কারণটা সে বুঝে ফেলেছে। লাইব্রেরির আসনটা দখল করেছিলো অজান্তেই। এখন জেনে বুঝেই মেয়েটার সাথে জড়িত প্রতিটা জায়গায় দখলদারিত্ব চালাবে।
জানালার কপাট খুলে দিয়ে বাদল বাইরে চেয়ে দেখে। খাতা বের করে টেবিলে রাখতেই তার চোখে পড়ে এক কোণে লিখে রাখা নামটা, ‘মৌমিতা’।

স্যার পড়ানো শুরু করলেন। সে মনোযোগ দিলো না। তার কারণে পাশের জনও মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হলো। রাশেদ বারবার বিরক্ত হয়ে বাদলকে অঙ্ক করতে বললো। বাদল পাত্তাই দেয় না। খাতাটা একবার এদিক, একবার ওদিক নিতে থাকে। বেঞ্চের উপর কলম ঘষে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে গালে হাত রেখে। এক মুহূর্তও স্থির হতে পারে না। এতোদিনের সাধনার ব্যক্তিকে যেন প্রায় হাসিল করে ফেলেছে সে! যদিও সেই ব্যক্তি নিজেই জানে না, তাকে জয় করতে কেউ এমন মরিয়া হয়ে উঠেছে। জানতে পারলেও বাদলের বিশেষ সুবিধা হতো কিনা, সন্দেহ।

রাত সাড়ে নয়টা।
মারুফ ওষুধ খাওয়ার পরেই সোফায় গিয়ে বসলেন। নিচু টেবিলটার উপর থেকে খবরের কাগজটা হাতে নিলেন। আজ দিনটা তার বেশ ব্যস্ততায় কেটেছে। দোকানে ক্রেতাদের ভিড় হয়েছিলো ঠিকই, সে হিসেবে বিক্রি হয়েছে সামান্যই। দেশের খবরাখবর দেখার সময় পাননি। কী যেন মনে করে তিনি পেছনে ঘুরলেন, ডেকে উঠলেন, “মৌ মা?”

প্রতিবারের মতোই মৌমিতা একটু দেরিতে জবাব দিলো, “জ্বী আব্বা?”

“শুনে যাও।”

পত্রিকা পড়ার ব্যাপারটাকে মারুফ খুব গুরুত্ব দেন। মেয়ে দুটোকেও সর্বশেষ সংবাদ গুলোর ব্যাপারে ধারণা রাখতে বলেন। মার্জিয়া চাপে পড়লে মাঝে মধ্যে খবরের কাগজ উল্টেপাল্টে দেখে। কিন্তু মৌমিতা এ বিষয়ে খুব বিদ্রোহী। সপ্তাহের একটা দিন বাদে সে পত্রিকা ছুঁয়েও দেখে না। দেখলেও কেবল রম্য-রচনা আর সাহিত্যের বিভাগগুলো পর্যন্তই তার দৌড় সীমাবদ্ধ। সংবাদ পাঠে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। খন্দকার সাহেব টাকা খরচ করে পত্রিকা নেন মেয়েদুটোর সাধারণ জ্ঞানের জন্যই। অথচ তারা এই ব্যাপারটাকে কোনো গুরুত্বই দেয় না।

মৌমিতা পাশে এসে দাঁড়াতেই মারুফ জিজ্ঞেস করলেন, “পেপার পড়া হয়েছে আজকে?”

“না, আজকে... ভালো লাগছিলো না।”

“এখানে ভূত কে এঁকেছে?”

“কোথায়?”

মারুফ আঙুল দিয়ে কাগজের উপর আঁকা মুখটা দেখালেন। কোনো এক রাজনৈতিক নেতার ছবির উপর কলম দিয়ে দাগ দেয়া হয়েছে। টাক মাথার উপর খাঁড়া খাঁড়া কয়েকটা চুল, নাকে বিরাট একটা নোলক, কপালের মাঝামাঝি বড়সড় টিপ। এটা দেখে মৌমিতা থ হয়ে রইলো।

“তুমি করেছো নাকি?”

মেয়েটা হাত নেড়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায়, “না না, আমি কিছু করিনি।”

“তাহলে কে করলো? মার্জু করেছে?”

“মনে হয় না। ও আঁকলে চুল এতো খাঁড়া হতো না!”

মারুফ গম্ভীর ভঙ্গিতে সামনে তাকালেন, রিপনকে হেঁটে যেতে দেখতেই বলে উঠলেন, “রিপন? এটা তুমি এঁকেছো নাকি?”

“কোনটা?” রিপন এগিয়ে এলো, ছবিটার দিকে তাকিয়ে নাক-মুখ কুঁচকে বললো, “বেয়াদব লোক একটা! দেখলেই মুখে কালি মেখে দিতে ইচ্ছা করে। এবার তো তবু সাজুগুজু করিয়ে দিয়েছি।”

আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না মারুফ। পত্রিকা ঘুরিয়ে আবার নিজের দিকে ধরলেন। চশমাটা ঠিক করে মনোযোগ দিয়ে কোনো একটা কলামে চোখ বোলাতে লাগলেন।
মৌমিতা বুঝলো না, এ সময়ে হেসে ফেলা উচিত হবে কিনা। সে হাত দিয়ে মুখ চেপে চুপচাপ সরে গেলো। ঘরে ঢুকে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসলো।

ব্যস্ততা না থাকলে ইদানিং বিরক্তিকর সব চিন্তাভাবনা তার মাথায় ঘোরে। এর থেকেও গুরুতর সমস্যা হলো, এই অদ্ভুতুড়ে চিন্তাগুলোকে মস্তিষ্ক থেকে তাড়ানোর উপায় হচ্ছে না। তার কাছে এখন ডায়েরিটা নেই। থাকলে হয়তো নিজের এসব ভাবনার একটা মানচিত্র আঁকা সম্ভব হতো। চিন্তাধারার কোনো বিকৃতি আসলেই ঘটছে কিনা—তা বিচার করা সহজ হতো।
তার খুব অদ্ভুত একটা অভ্যেস আছে, যার বিষয়ে সে নিজেও বেশ ভালোভাবেই অবগত। অন্যকে অপছন্দ করার চেয়ে তার কাছে নিজের ঘাড়ে দোষ চাপানো সহজ। তার অবচেতন মনটা তাড়াহুড়ো করে ঘোষণা দিয়ে ফেলে, কোন ব্যক্তিকে সে পছন্দ করবে, আর কাকে অপছন্দ করবে। এই সিদ্ধান্তের পর আর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো যায় না।

বাদল নামের ছেলেটা তার সাথে খুব জঘন্য আচরণ করেছে। তবু তার দায়ভারের সম্পূর্ণ বোঝা নিজ কাঁধে তুলে নিতে ইচ্ছে করছে মৌমিতার। নিজের দোষ সে দেখছে না। আর ছেলেটার দোষ সে দেখতে চায় না। এমন কেন হবে?
সম্পূর্ণ অপরিচিত, অনাত্মীয় এবং অনেকখানি বিগড়ে যাওয়া একজন মানুষের প্রতি হঠাৎ এতো মমত্ববোধ জন্মানোর কারণ কী? এতোটুকু মৌমিতা নিশ্চিত–বাদলকে সে ক্ষমা করেনি। অথচ তার কাজগুলোর ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, এমনকি তার ঔদ্ধত্যের পেছনের কারণটাও যাচাই করতে চাচ্ছে। ছেলেটাকে কি নিজেই এমন করতে বাধ্য করেছে? মিথ্যা অভিযোগের প্রেক্ষিতেই হয়তো সে এতোটা ক্ষুব্ধ হয়েছিলো। তার ঐ বন্ধুও দাবি করছিলো, মেজাজ খারাপ হলে বাদল হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

মৌমিতা মাথায় হাত দিলো। নিজের উপর মাঝে মাঝে বিরক্ত না হয়ে উপায় থাকে না। কেন ঐ ছেলেটার সমস্ত অশোভন কার্যকলাপকে সে গ্রহণযোগ্যতা দিতে চাইছে? অবশেষে নিজের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করলো মেয়েটা, দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “হুহ! পারলে আরও তিন চারটা অভিযোগ ঠুকে দিতাম বেয়াদবটার নামে। তাহলেই একটু শান্তি পেতাম।”

—————

বিরতির সংকেত পাওয়া মাত্রই বাদল ক্ষিপ্রগতিতে বই খাতা ব্যাগে তুলে রাখে। বেঞ্চ থেকে কোনোমতে বেরিয়ে ধুপধাপ হাঁটতে শুরু করে।
প্রথমেই লাইব্রেরিতে যাবে সে। মেয়েটাকে সেখানে না পেলে দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের 'খ' শাখায় যাবে। ক্ষমা চাওয়া তার উদ্দেশ্য নয়। সে মৌমিতাকে ঘাঁটাতে চায়, আরেকটু জানতে চায়। হয়তো কিছু জানাতে চায়।
বাস্তবের সাথে ডায়েরির ঐ সত্তাকে সে একটু একটু করে মেলাতে শুরু করেছে। আর এটাই তাকে রোমাঞ্চিত করছে বারবার। সংশয়েও ঠেলে দিচ্ছে অবশ্য। সে নিজের সর্বস্ব দিয়ে বিশ্বাস করেছে, মেয়েটাকে তার মতো করে কেউ জানে না। এদিকে বাস্তবের মানুষটাকে সে চরম অপদস্থ করেছে। চিনতেও পারেনি।
তবে দায় নিতে মোটেও রাজি নয় বাদল। দায় নেয়াটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। মৌমিতা তাকে নিয়ে কী ভাবছে—এ বিষয়ে দ্বিধা করারও যেন ফুরসত নেই তার। সে নিজের তীব্র অনুভূতির জোয়ারে সবকিছু ওলটপালট করে দিতে জানে কেবল।

বাদলের অবশ্য এটা মনে নেই, মেয়েটা নিজে থেকেই ঝড় চেয়েছিলো। তার এই বিধ্বংসী ইচ্ছেটা অজান্তেই কতোটা আত্মঘাতী হয়ে ধরা দিতে পারে, এ ব্যাপারে কারোই ধারণা নেই। উভয়েই অনভিজ্ঞ, তারা জানে না, ঝড় সবসময় কেবল ফুল-পাতা ঝরানো দমকা বাতাস আর জলের ধারা নয়। কখনও তা বসতভিটে লণ্ডভণ্ড করে দেয়া সর্বনাশা কালবৈশাখীও হতে পারে।

লাইব্রেরিতে এখনও তেমন কেউই আসেনি। মাত্রই তো ঘণ্টা বাজলো। বাদল এক কোণের ঐ আসনটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দরজার দিকে তাকায়। তারপর আলমারির অপর পাশে গিয়ে পায়চারি করতে থাকে। মৌমিতা খন্দকার আসছে না।
ছেলেটা পুরোনো ভবন থেকে বেরিয়ে আসে। অনিশ্চয়তা একটু একটু করে দানা বাঁধছে ভেতরে। দেখা হবে কি?

শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে পেছনের জানালাটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। অস্থির চোখে খুঁজতে থাকে চেনা মুখখানি। দূরের ৪র্থ বেঞ্চের কিনারায় বসে থাকা এক মানবীর উপর তার দৃষ্টি স্থির হয়। সে গালে হাত দিয়ে মনোযোগ সহকারে কিছু একটা পড়ছে। ওড়না দ্বারা মুখের একাংশ ঢাকা। বাদল দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়েও থেমে গেলো। ভেতরটা খচখচ করছে। অন্যের অনুভূতি নিয়ে সে কখনোই ভাবে না। তবু মনে হলো, মেয়েটা কি তাকে এতো সহজে নিজ অন্তরে জায়গা দেবে? মাফ করবে? সামান্য লাইব্রেরির একটা সিটও সে কেড়ে নিতে পারেনি। সেখানে আস্ত একটা হৃদয় কেড়ে নেওয়া সোজা কথা নয়।
বাদল ঢোক গিললো। জানালা ভেদ করে আবার ভেতরে তাকালো। ভেতরে লালিত সকল আকাঙ্ক্ষা, উত্তেজনা মুহূর্তের ব্যবধানে একাধিক প্রশ্নের আড়ালে ডুবে গেলো। সে জানালার গ্রিলে হাত রাখলো। সিনিয়ররা কী ভাবছে, তা মাথায় এলো না। কেবল অর্ধ উন্মুক্ত ঐ মুখাবয়বের দিকে সে আকুল হয়ে তাকিয়ে রইলো।

মেয়েটা খুব যত্ন নিয়ে বইয়ের পাতা ওল্টায়। তারপর আবার গালে হাত দিয়ে সেখানেই মনোনিবেশ করে। চাতক পাখির ন্যায় তৃষ্ণার্ত দু'টি চোখ তার পানে চেয়ে রয়েছে, সে টের পায় না। বরাবরের মতোই শান্ত সে, ঢেউবিহীন স্থির সরোবর। আর জানালার ওপাড়ের উত্তাল সমুদ্র যেন সৈকতে আছড়ে পড়লো। এক কদম পিছিয়ে গেলো ছেলেটা। হীনমন্যতা গ্রাস করলো তাকে। এতোক্ষণের সব কল্পনা-জল্পনা কর্পূরের মতো হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে। যে মানুষটার অন্তঃস্থলের অলিগলি তার চেতনায় গেঁথে আছে, তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেও অদ্ভুত জড়তা কাজ করলো।

ছেলেটা উপলব্ধি করলো, মৌমিতাকে সে চেনে না। চেনার সাধ্যও তার নেই। মেয়েটা ডায়েরিতে নিজের ভাবনাগুলো লিখেছে, নিজেকে লেখেনি। সে যেন একটা মহীরুহ, ডায়েরিটা শুধু তার কয়েকটা পাতার সমষ্টি মাত্র। ঐ বৃক্ষের অধিকাংশ পাতাই তার ধরাছোঁয়ার বাইরে। সুতরাং যার নাড়ি-নক্ষত্র নিজের আয়ত্তে বলে সে দাবি করছে, সেই ব্যক্তির ব্যাপারে তার জ্ঞান একেবারেই নগণ্য।

টিফিনের বিরতি শেষ হওয়ার আগেই বাদল ক্লাসে ফিরে এলো। রাশেদ আড়চোখে একবার তার দিকে তাকালো। সে পাশে বসতেই রাশেদ নিচু স্বরে বললো, “কী খবর? তোর মুখটা এমন দেখা যায় কেন?”

“কেমন দেখা যায়?”

“বাংলার পাঁচের মতো।”

“আজাইরা।”

“কয়েকদিন হলো খেয়াল করলাম, তুই আর কুকুরগুলোকে খাওয়াচ্ছিস না।”

বাদল ছোট একটা শ্বাস ফেলে। বেঞ্চের ধারটা অযথা নখ দিয়ে খুঁটতে শুরু করে। সে টাকা জমাচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদের একটা বই কিনবে। নিজের জন্য নয়। বই-পুস্তকে তার বিশেষ আগ্রহ নেই।

কলেজের পেছনের গলিটা সুনসান। মৌমিতা যতো এগোতে লাগলো, ততোই যেন বিরক্ত হলো সে। এদিকে একটা দোকান আছে। সেখানে নোনতা বিস্কুট পাওয়া যায়। বেশ কয়েকবার কিনেছে সেগুলো। তবে আজ অন্য একটা কাজে এখানে এসেছে।
মার্জিয়া বিট লবণ আনার দায়িত্ব দিয়েছে তাকে। আব্বাকে বলেনি। এসব মুখরোচক খাদ্যে মারুফের প্রবল আপত্তি। যদিও মেয়েদের আবদার তিনি অপূর্ণ রাখতেন না, তবে দীর্ঘ একটা বক্তৃতা দিতেন, এই আরকি। কথাটা রাবেয়ার কানে গেলে আরো সমস্যা। তিনি কোনো ছাড় দিতেন না। অপ্রয়োজনীয় খরচ করা তিনি সহ্যই করতে পারেন না।

মৌমিতা দাঁড়ালো। কিছুটা দূরত্বেই কয়েকজন লোক হাতাহাতি করছে। তাদের দেখে নেশাগ্রস্ত মনে হলো। এগিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কিনা, বোঝা গেলো না। মেয়েটা তবু ধীরে ধীরে পা ফেলতে শুরু করে। লোকগুলো খুব চেঁচামেচি করছে। রাস্তায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে থাকা কুকুরগুলো হঠাৎ জেগে উঠলো। হিংস্র স্বরে গর্জন করতে লাগলো। একটা মাতাল লোক টলতে টলতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই, কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে যার-তার পেছনে ধাওয়া করতে যায়। মৌমিতা কোনোমতে ঘুরেই পেছন দিকে ছুট দেয়। বাদল হাত এগিয়ে তাকে থামতে বললো, “দাঁড়ান, দাঁড়ান।”

ইচ্ছে না থাকলেও মেয়েটাকে থামতে হলো, মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। কুকুরগুলোকে চাপা গর্জন করে তেড়ে আসতে দেখে সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাদলের দিকে আরেকটু সরে দাঁড়ালো।

“দৌড়ানোর চেষ্টা করবেন না। নাহলে ওরা আপনার পেছনেই ছুটবে। সব পাগলা কুকুর এখানে।”

“জানি আমি!”

মৌমিতার কর্কশ ধমকে ছেলেটা বিচলিত হলো না। সে নিজ দায়িত্বে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, কুকুরগুলোর দৃষ্টি থেকে আড়াল করলো তাকে। বাদলের কথার ধরনটা এবার আরও অভিভাবকসুলভ শোনালো, “আপনি এদিকে কেন?”

মৌমিতা উত্তর দিলো না। স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। সে বুঝতে পারছে না, কুকুরগুলো তার আশেপাশে এসে হুট করে এতো শান্ত হয়ে গেলো কেন। বাদল দূরে হাঁটতে থাকা নেশাগ্রস্ত লোকগুলোর দিকে তাকিয়েই আরও জোর দিয়ে বলে, “এখানে কেন?”

“কাজ আছে।”

“এখানে আপনার কী কাজ? এই রাস্তাটা ভালো না। কোনো মেয়ে মানুষ আসে না এইদিকে।”

“সবকিছুতে মেয়ে মানুষ!”

মৌমিতা অপ্রস্তুত হয়। কথাটা মনে মনে না বলে জোরে বলে ফেলেছে ভুল করে। সে থমথমে মুখে বাদলের দিকে তাকায়, কোনো প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ে না তার। এই ছেলেটাই সেদিন অমন করে কথা বলেছিলো, এখন আবার এমন নাটক দেখাচ্ছে কেন? বাদলের মতো মূর্তিমান বিভীষিকা তার রক্ষাকর্তা হওয়ার অভিনয় করছে, এটা সে মানতে পারলো না। এখন এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া সবচেয়ে দরকারি। ছেলেটার সামনে বিট লবণও কিনতে পারবে না, প্রচ্ছন্ন হলেও একটু সংকোচ কাজ করছে তার মধ্যে। দ্রুত কয়েক পা পেছায় সে। অপরজন টের পায় ঠিকই, তবে বাধা দেয় না। মৌমিতা দ্রুত হাঁটতে শুরু করলো। কলেজের দিকে যেতে যেতেই আবার পেছনে ঘুরলো, তবে ছেলেটাকে আর ভালোমতো দেখা গেলো না।

আজ দিনটা কাটলো অদ্ভুত এক দোলাচলে।
টিউশনে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই মৌমিতার। অঙ্ক করা হয়নি। এই অধ্যায়টা টেনেটুনে শেষ করতে পারলেই সে বাঁচে। তামান্না যেহেতু আগেরদিন এসেছিলো, আজ নির্ঘাত অনুপস্থিত থাকবে। খুবই একঘেয়ে সময় কাটবে। তবু মেয়েটা নিজেকে বোঝায়, বড়লোকদের অতো পড়তে হয় না! মৌমিতাকে পড়তেই হবে, যতো কষ্টই হোক না কেন।
তার কোনো ভাই নেই। আব্বার বড় মেয়ে সে। অনেক বড় ভরসার স্থল। আব্বাকে খোঁটা দেয়া প্রতিটা মানুষকেই সে উপযুক্ত জবাব দেবে।

ওড়নাটা মাথায় দিয়ে মৌমিতা ব্যাগ কাঁধে নিলো, মনে পড়লো, টিউশনে গেলে তো আরেকজনের সাথে দেখা হতে পারে। যদি দেখা হয়, সেটা মোটেও সুখকর হবে না। তাও দেখা হওয়ার সুপ্ত আশা নিয়েই সে বেরিয়েছে! সবচেয়ে বিরক্তিকর জিনিসগুলোই কেন যেন তার কাছে উপভোগ্য।
বেঞ্চের পানি মুছতে ভালো না লাগলেও সে ওখানেই বসে। ভেজা মেঝেতে পা রাখতে হয়, তবু জানালার পাশের ঐ জায়গা ছাড়া কোথাও শান্তি পায় না।

আজকে বেঞ্চ শুকনো। মেঝেতেও পানি নেই। শুধু আজ না, বেশ কিছুদিন হলো বাঁদরটার উৎপাত কমেছে। মৌমিতা প্রসন্ন চিত্তে নিজের আসনে গিয়ে বসলো। বাইরের রৌদ্রোজ্জ্বল প্রকৃতির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর, টেবিলের বাম পাশের ঐ কোণে দৃষ্টিপাত করতেই তার ভ্রু যুগল কুঁচকে যায়। মৌমিতার নামের উপরে আরেকটা নাম লেখা, ‘বাদল’। দুর্বল অক্ষর, তবু জ্বলজ্বল করছে লেখাটা।

মৌমিতা শ্বাস আটকে তাকিয়ে রইলো নামটার দিকে। নিজের নাম সে লিখেছিলো বাম হাতে, বেঞ্চের সাথে আড়াআড়ি করে। তার নামের সাথে সমান্তরালে বাদলের নামটা কেউ নিশ্চয়ই ডান হাতেই লিখেছে। ঠিকঠাক লিখতে বেশ খাটুনি হয়েছে, তা বোঝা যাচ্ছে। তবে মূল কথা হলো, কে লিখেছে? কেন লিখেছে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp