পবনপত্র - পর্ব ১৯ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          বারান্দায় কাপড় শুকাতে দেওয়া। আমজাদ বিরক্ত হয়ে দেয়াল ঘেঁষে হাঁটছে, হাতে বালতি। এখন হয়তো আড়াইটার মতো বাজে। রাশেদদের ব্যবহারিক ক্লাস শুরু হয়েছে কয়েকদিন হলো। ওরা এখন একটু দেরিতেই হোস্টেলে ফেরে।
গ্রিল ভেদ করে বাইরে থুতু ফেলতে গিয়েই আমজাদ লোকটাকে দেখলো। গতকাল যে ভদ্রলোক এসেছিলো বাদলের সাথে দেখা করতে, নাম সম্ভবত হারুন।

“হারুন ভাই, ভালো আছেন?”

কাউকে হুটহাট আপন মানুষের মতো সম্বোধন করতে আমজাদ মোটেও কার্পণ্য করে না। তার ডাক শুনে লোকটা মাথা তুলে দোতলার বারান্দায় তাকালো। রোদের কারণে চোখ খুলতে পারলো না পুরোপুরি। মলিন হেসে বললো, “বাদল আছে?”

“এখনই চলে আসবে। ওদের ছুটি দিয়েছে মনে হয়।”

“ওহ।”

হারুন আর ভেতরে গেলো না। সামনের ভবনটার দিকে দৃষ্টি রেখে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। কটকটে গরম, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম। তাই শরীর ঘামছে না। একেবারে পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বিজ্ঞান বিভাগের ছুটি হয়ে গেছে। আবাসিক হলের দিকে ছাত্রদের জোয়ার আসে। তারই মাঝে হারুন তাকিয়ে থাকে কপালে ভাঁজ ফেলে, কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে খুঁজতে থাকে। তবে বাদলই তাকে আগে লক্ষ করে।

“রাশেদ, তুই যা, আমি আসছি।” ছেলেটা হারুনের সামনে এসে দাঁড়ায়, “আসসালামু আলাইকুম।”

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। এতো ছাত্রছাত্রী এখানে, তোমাকে তো দেখতেই পাইনি প্রথমে। যাই হোক, টাকাটা পেয়েছো?”

“হ্যাঁ। আপনার এই অবস্থা কেন? চোখের আশপাশ কালো হয়ে গেছে। ঘুম হয় না?”

হারুন অসহায়ত্ব লুকাতেই যেন হাসলো একটু, দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে উচ্চারণ করলো, “তোমাকে বলা উচিত না, তবুও বলছি। আর কোনো উপায় দেখছি না। শোনো, বৃষ্টিকে একটা চিঠি লেখো তো, ওকে একটু বোঝাও—”

“কী বোঝাবো?”

“বোঝাও যে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি চাকরির জন্য। তবু উঠতে বসতে খোঁটা দেয় তোমার বোন, সারাক্ষণ অপমান করে। সংসারটা তো টিকিয়ে রাখতে হবে।”

বাদল পায়ের কাছে থাকা ফুলের টবটার দিকে তাকায়, বিনা কারণে হাতের আঙুল মটকাতে মটকাতে বলে, “আপাকে আমি বোঝাতে পারবো না। চাকরি কেন করতেই হবে? ব্যবসা তো খারাপ নয়। আমাকেও মাসে মাসে এতো টাকা দিচ্ছেন আপনি। কোনো অসুবিধা হচ্ছে?”

হারুন ডানে-বামে মাথা দোলায়, “সেটা বৃষ্টি বুঝতে চায় না। ওর কাছে চাকরিই সব। ব্যবসা নাকি আজ আছে, কাল নেই। মেয়েটার ধৈর্য নেই।”

“মেয়েদের ধৈর্য এমনিতেও কম থাকে। আপার ধৈর্য আরও কম। আর এতো ঝামেলা মনে হলে সেটা বিয়ের আগেই বোঝা উচিত ছিলো।”

লোকটার মুখে একরাশ অন্ধকার নামে, সে আমতা আমতা করে, “আমার কাছে কখনোই ঝামেলা মনে হয়নি বাদল। তুমি ওকে বলো, আমাকে একটু হলেও সম্মান দিতে। আর কিছু চাই না।”

বাদল হেসে ফেলে, “যে মেয়ে আপনার সাথে পালিয়ে যাওয়ার সময় নিজের বাবা মায়ের সম্মানের কথা চিন্তা করে নাই, সেই মেয়ের কাছ থেকে আপনি সম্মান আশা করেন কীভাবে?”

হারুন নিচু করে রাখা মাথাটা আর উঁচু করলো না, চাপাস্বরে বললো শুধু, “আচ্ছা আসি।”

“হারুন ভাই?” ছেলেটা হঠাৎ তাড়াহুড়ো করে বলে ওঠে, “আমার কথায় মন খারাপ করবেন না। আমি আপনার কোনো দোষ দেখি না। আপনি মানুষ হিসেবে একটু বেশিই ভালো, তাই—”

“বৃষ্টিরও কোনো দোষ নাই। একটা নিশ্চিন্ত জীবন চাওয়া দোষের কিছু না। আমি তাহলে যাই। কোনো কিছু দরকার হলে জানাবা, চিঠি পাঠাবা। কেমন?”

বাদল মাথা কাত করলো। আরেকটা কথা সে বলতে চেয়েছিলো। কিন্তু বলা হলো না।

—————

আশ্বিন মাসের আগমনী সুর প্রকৃতি জুড়ে। আলমারির সর্বশেষ তাকটা থেকে একটা বই বের করলো মৌমিতা। ভূমিকা পড়ে দেখলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই। ভেতরের কাহিনী জানার খুব একটা কৌতূহল কাজ করলো না। তবু সে চেয়ারটা টেনে বসলো, ঐ বইটাই রাখলো টেবিলের উপর। তার একঘেয়ে সময়টা কেটে যেতে বেশিক্ষণ লাগলো না।
বাদল এসে সামনে দাঁড়ায়, মৌমিতাকে ‘আপু’ ডাকতে ইচ্ছে করছে না তার। সে গলা খাঁকারি দিলো। মেয়েটা তার দিকে মনোযোগ দিতেই শুকনো গলায় বললো, “এই বইটা কালকে রেখে গিয়েছিলেন।”

মৌমিতা বাদলের হাতে থাকা ‘বহুব্রীহি’ নামক বইটার দিকে এক নজর দেখে, “ওটা আমার নয়।”

“আপনারই! রাখেন।”

বাদল টেবিলের উপর বইটা রাখলো।

“বললাম তো, আমার বই নয়। তোমার জিনিস তুমিই রাখো।”

“রেখে কী করবো? আমি বই পড়ি না। এটা আপনার জন্যেই—”

“আমি বিনামূল্যের জিনিস রাখি না।”

“বিনামূল্যে কই দিলাম? আপনার ডায়েরিটা আমার কাছে আছে। আপনি যেহেতু ফেলেই দিয়েছেন, আপনার নিশ্চয়ই দরকার নেই? আমার কাছেই থাক। ওটার বিনিময়ে বইটা রাখেন।”

মৌমিতা ভ্রু কুঁচকালো, কথাটা বুঝতে পারলো না পুরোপুরি। তার বিভ্রান্তি অনুধাবন করে বাদল আরও স্পষ্ট করে বলে, “আপনি ডাস্টবিনে ডায়েরি ফেলে দিয়েছিলেন, মনে আছে? ওটা আমি খুঁজে পেয়েছি, আমার কাছেই রেখে দিয়েছি।”

মেয়েটা খানিকক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে চোখ নামালো। তার অভিব্যক্তি দেখে মনের অবস্থা আঁচ করা গেলো না। কোনো এক দিকে শূন্য দৃষ্টি রেখেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো সে। আর একটা কথাও না বলে দরজার দিকে পা বাড়ালো। বাদল সেখানে দাঁড়িয়েই তাকে ডাকার চেষ্টা করে, “বইটা নিয়ে যান। ম্যাডাম?”

মৌমিতা থামলো না। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে সোজা ক্লাসে ফিরলো সে। তবে শ্রেণিকক্ষেও বেশিক্ষণ থাকতে পারলো না। ছুটি নিয়ে বাড়িতে ফিরে এলো।

রান্নাঘর থেকে থালা বাসনের শব্দ আসছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে জুতো খুললো মেয়েটা। দরজাটা খুলতে গিয়ে একটু শব্দ করে ফেললো। রাবেয়া বাসন মাজতে মাজতে বলে উঠলেন, “মার্জু? এতো তাড়াতাড়ি স্কুল ছুটি দিলো আজকে?”

কোনো উত্তর পেলেন না তিনি। টের পেলেন, কেউ ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পেছনে ঘুরে বড় মেয়েকে দেখে তিনি খানিকটা নিশ্চিন্ত হলেন, “ওহ, মৌ। তোমার ক্লাস হয়নি?”

মেয়েটা যান্ত্রিক ভঙ্গিতে ঘরে গিয়ে ঢুকলো। তার এরূপ আচরণ রাবেয়ার কাছে নতুন না। তাই তিনি এ বিষয়ে আর মাথা ঘামাতে চাইলেন না। যদিও মনটা একটু খচখচ করে উঠলো। ঘরের দরজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর তিনি আবার কাজে মনোযোগ দিলেন।

মৌমিতা ছিটকিনি আটকে দিলো। ব্যাগটা খাটে রেখে নিজেও বসে পড়লো সেখানে। মাথায় হাত দিয়ে ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করলো। রিকশা ভাড়া না থাকায় হেঁটে আসতে হয়েছে। বুকটা ধড়ফড় করছে এখনও। তার মনে হলো, পায়ের নিচের মেঝেটা অস্বাভাবিকভাবে দুলছে, ভূমিকম্প হচ্ছে।

ঐ ডায়েরি তার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা সম্পদ। নিজের মনের গভীরের সব সাদাকালো ভাবনাই সে তুলে রেখেছে ঐ নীল মলাটের ভেতরে। যে কথাগুলো কেউ জানে না, সেগুলোও ওখানে লিপিবদ্ধ। অথচ এই মুহূর্তে বাদলের মতো অনিরাপদ, বখাটে আর সুযোগসন্ধানী একটা ছেলের হাতে তার জীবনের সবচেয়ে গোপন তথ্যগুলো।
মেয়েটা আতঙ্কে কুঁকড়ে ওঠে। কোনো সন্দেহ নেই বাদল তা পড়ে ফেলেছে শেষ অবধি। নইলে তো বহুব্রীহি বইটার প্রসঙ্গে জানতে পারতো না। সবই জেনে গেছে তাহলে! তার দুর্বলতা, ভয়, লজ্জা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা—সব। যা সে মার্জিয়াকেও বলেনি কখনও, তা এখন বাদল জানে।

নিজের উপর ক্ষোভ প্রকাশের শক্তিটুকুও যেন অবশিষ্ট নেই মৌমিতার। দুই হাতে চোখের পানি মুছে সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে বোঝায়, অমন বোকামির ফলাফল হিসেবে এর থেকে ভালো কিছু আশা করা যেতে পারে না। ডায়েরিটা পুড়িয়ে ফেলা উচিত ছিলো। তা না করে সে জিনিসটাকে ফেলে এসেছে সবচেয়ে অরক্ষিত একটা জায়গায়। সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিলেন, বাস্তবটা কখনোই তার কল্পনার মতো নয়। বাস্তবতা নিষ্ঠুর, নিকৃষ্ট।
সেদিন কাগজের উড়োজাহাজটা যার মাথায় গিয়ে পড়েছিলো, সে কোনো রূপকথার রাজপুত্র নয়, বরং চরম অসভ্য একটা মানুষ। তাকে পরিচিত ভাবার স্পর্ধা দেখিয়েছিলো মৌমিতা। তারপর ছেলেটা তার পরিচিত জগৎটাকেই উল্টেপাল্টে দিলো। তার অস্তিত্বে এমনভাবে ঢুকে পড়লো, যেখান থেকে বের করে দেওয়া আর সম্ভব হবে না।

মৌমিতা বিছানায় শুয়ে পড়লো। তাকে কলেজে যেতে হবে আবার, টিউশন ক্লাসে যেতে হবে। বাদলের মুখোমুখি হতে হবে। ভাবতেই তার শরীরটা আরেকবার শিউরে ওঠে। আবার নিজেকে দোষারোপ করে সে। এতো বড় বোকামিটা সে কীভাবে করতে পারলো?

আচমকা মেয়েটার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো তার আব্বার উপর। তিনি যদি সেদিন ওভাবে ডায়েরিটা খুলে না দেখতেন, তাহলে এতো বড় সর্বনাশটাও হতো না। নিজের মেয়ের প্রতি কি তার সন্দেহ এতোটাই বেড়ে গিয়েছিলো যে তিনি মেয়ের ব্যক্তিগত জীবনে থাবা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করলেন না? গোপন কথা লিখে ফেলার বুদ্ধিটাও কি এজন্যই দিয়েছিলেন—যাতে মৌমিতার কোনোকিছুই তার কাছে লুকায়িত না থাকে?
মেয়েটা দুই হাত দুইপাশে ছড়িয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে রইলো। সে আর কিছুই ভাবতে চায় না। মাথাটা এমনিতেও খুব ভারী মনে হচ্ছে। চোখের সামনে সবকিছু দুলছে এখনও। সে অন্যকারও দোষের বোঝা আর নিজ ঘাড়ে চাপাবে না।

মার্জিয়া ঘরে ফিরে দেখলো, আপা আজ আগেই বাড়িতে এসেছে। এ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা কাজ করলো না তার মধ্যে। বরং সে আরও প্রফুল্ল হয়ে উঠলো।

আজকে মাগুর মাছ রান্না করা হবে। ছোট মেয়ের উত্তেজনা দেখে রাবেয়া একটু ভয়ই পেয়েছেন। ছোটখাটো খাবার বা নাস্তা তৈরি করতে দিলে তবু কোনো অঘটন ঘটে না। কিন্তু তাকে তরকারি রাঁধার দায়িত্ব দেয়াটা বাড়াবাড়িই বটে। মেয়েটাকে আটকানোর কোনো উপায় দেখলেন না তিনি। তারপরেই বুদ্ধিটা তার মাথায় এলো। মৌমিতা থাকলে মার্জিয়ার কোনো অসুবিধা হবে না। দুই মেয়েকে কাজে লাগিয়ে দিয়ে আজ নাহয় রাবেয়া খাতুন নিশ্চিন্তে একটু বিশ্রাম নিলেন, এতে ক্ষতি তো নেই। তিনি উৎসাহী হয়ে ঘরে গেলেন, মৌমিতাকে বললেন, “মৌ, আজকে তোমরা দুই বোন মিলে রান্না করো দেখি।”

দেয়ালের দিকে মুখ করে মৌমিতা গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিলো বিছানায়। আদেশ শুনেও সে ওভাবেই শুয়ে রইলো। ঘুমানোর ভানও করলো না। বাম হাতের তর্জনী ঘুরিয়ে দেয়ালে অদৃশ্য নকশা আঁকতে লাগলো। তার আম্মা আবারও বললেন, “মৌ? ওঠো, আজকে তো তাড়াতাড়ি এসেছো। অন্যদিন সময় পাও না। বোনকে সাহায্য করো একটু।”

মৌমিতা ক্লান্ত স্বরে বলে, “আজকে পারবো না।”

চোখের সামনে মেয়ের এমন অবাধ্যতা সহ্য করতে পারলেন না রাবেয়া। রাগে ফুঁসে উঠলেন, চাপা গর্জন করে বললেন, “কেন? আজকে পারবা না কেন? এই যে আমি মানুষটা এই একই কাজ প্রতিদিনই করে যাচ্ছি, একদিনও কি বলেছি, আজকে পারবো না?
এতো বয়স হয়ে গেলো, তবু দায়িত্ব নিতে শেখোনি। তোমার বয়সে আমি সংসার করেছি, বাড়ির সব কাজ করতে হয়েছে আমাকে। সেই যে বিয়ে করে আসলাম এখানে, একটা দিনও ছুটি পাইনি। যতোই জ্বর থাকুক, শরীরটা খারাপ হোক। মার্জুর বয়স তোমার চেয়েও কম। তবু কতো কাজ করে মেয়েটা। লজ্জাও লাগে না তোমার?”

মেয়েটা দেয়ালের উপর থেকে আঙুল সরায়। হাত দুটো শরীরের চারপাশে গুটিয়ে নেয়। ওঠার কোনো লক্ষণ দেখায় না। রাবেয়া হাল ছাড়লেন, ঘর থেকে বেরোনোর আগে তবু আরও কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিলেন, “এখন আমার কথা গায়ে লাগে না, ভালো। বড় হও। আমার জায়গায় না থাকলে তো আর বুঝবা না। কতো কষ্ট করে তোমাদেরকে মানুষ করছি। জানি না আরও কতো বড় হলে সেটা বোঝার মতো বোধশক্তি হবে তোমার।
ঘরের মানুষের কাছে ভালো হতে পারো না, বাইরের মানুষ কেমন করে মেনে নিবে এইসব আচরণ? তোমাকে যারা শান্তশিষ্ট বলে, ভদ্র বলে, তাদের কাছে গিয়ে থাকো দুইদিন। তারপর দেখো আর প্রশংসা করে কিনা। ফাঁকা কলসি বাজে বেশি, তখন ঠিকই টের পাবে...”

আম্মার কথাগুলো ধীরে ধীরে অস্পষ্ট শোনাতে লাগলো। তিনি হয়তো রান্নাঘরে ফিরে গেছেন। সেখানে মার্জিয়া তুমুল উদ্যমে রান্নার আয়োজন করছে।
মৌমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। জীবনটার প্রতি হঠাৎ করেই কেমন যেন একটা বিতৃষ্ণা জন্মালো তার। আশেপাশের জগৎ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে হলো, অন্যরকম মনে হলো। আবার কিছুটা অপ্রয়োজনীয়ও মনে হলো। সবাই তো প্রতিনিয়ত নানান বিপদের সম্মুখীন হয়। তবু কতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। তাদের হয়তো সহনশীলতা বেশি। মৌমিতা কেন অতো সহজে মানিয়ে নিতে পারে না?

গালে মুখে হাত ঘষলো সে। চোখের পানিতে সব চিটচিটে হয়ে আছে। হাত-মুখ ধুতে হবে। খাট থেকে তবু নামতে পারলো না। আম্মার সামনে সে আপাতত যাবে না। দুপুরে কিছু খাবেও না। ঘুমিয়ে পড়বে, নতুবা ঘুমানোর ভান করবে। আর কিছুই ভালো লাগছে না তার। আজকে টিউশনে যাওয়ার পরিকল্পনাও বাতিল।
গালের নিচে হাতটা রেখে মৌমিতা আরেকটু ভালোভাবে শোয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দেহটা স্বস্তি পেলো না কোনোভাবেই। সে জবরদস্তি চোখ বন্ধ করলো।

—————

জুনায়েদ দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে জমিয়ে রাখা পাতা আর আবর্জনার স্তূপের দিকে তাকায় ত্যক্ত মুখে, “চাচা?”

মারুফ কাপড় গুছিয়ে রাখছিলেন। ডাক শুনে তিনি গলা বাড়িয়ে বললেন, “হ্যাঁ, জুনায়েদ? কী অবস্থা তোমার?”

ছেলেটা নাক-মুখ কুঁচকে ভেতরে ঢোকে। ওসমানকে উদ্দেশ্য করে একটু ধমকের সুরে বলে ওঠে, “সারাদিন কী কাজটা করো তুমি? একটু ঝাড়ুও দিতে পারো না?”

ওসমান গাল ফুলিয়ে আবার কাজে মনোনিবেশ করে, “ঝাড়ু তো দিলামই সকালে। পাশের দোকানের ছোকরাটা সব ময়লা এখানে জমা করে—”

“একটা থাপ্পড় দিতে পারো না?”

কথাটা বলেই জুনায়েদ বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে মারুফ ব্যস্তভাবে বলে ওঠেন, “আরে আরে, শোনো। তুমি ওসব ঝামেলায় যেও না তো।”

ছেলেটা ঘুরে দাঁড়ায়, “আপনারা কিছু বলেন না কেন? চুপ থাকেন বলেই তো ওরা আরও সুযোগ পায়। ব্যবসা করতে এসে বেয়াদবি করে, ছ্যাঁচড়ার দল!”

শেষের একজোড়া শব্দ সে ইচ্ছাকৃত একটু গলা উঁচিয়েই উচ্চারণ করলো, পাশের দোকানের লোকগুলোর কানে যেন যায়। মারুফ তার এই অহেতুক ক্রোধটাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলেন, হেসে সামনের কাঠের টুলটি নির্দেশ করলেন, “ওখানে বসো তো। কথা আছে।”

চোখে চশমা পরলেন তিনি। হিসাবের খাতাটা খুলে ভালো করে দেখে নিলেন কিছু একটা। জুনায়েদ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। খন্দকার সাহেবের গোলগাল মুখটিতে সোনালি ফ্রেমের চশমাটা খুব ভালো লাগে দেখতে, একটা ভারিক্কি ভাব আসে। যদিও আজ তার মুখটা খুব মলিন দেখালো। হয়তো কোনো কারণে বেশ ক্লান্ত হয়ে রয়েছেন। তবু একগাল হেসে তিনি নরম সুরে বললেন, “আজকে ভালোই বিক্রি হয়েছে। কিছু লাগবে নাকি তোমার, বলো দেখি?”

জুনায়েদ রাগ দেখাতে গিয়ে ব্যর্থ হলো, “আপনার হাতে টাকা আটকাতেই চায় না। এই অযথা খরচ করার স্বভাবটা বাদ দেন তো চাচা।”

মারুফ কিছু বলার আগে ওসমান নিজের অভিযোেগ পেশ করলো, “আমাকে একটা টুপি কিনে দিয়েছেন জোর করে। কতোবার বললাম যে লাগবে না।”

খাতা বন্ধ করলেন মারুফ। সেটাকে টেবিলের নিচের ড্রয়ারটাতে রাখলেন, “আছি বলেই দিতে পারছি। আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন, আমার সংসার চলছে। দুটো টাকা অতিরিক্ত খরচ করলে কি রিজিক কমে যাবে?”

জুনায়েদ তাড়া দেখায়, “আমার জন্য কিছু করতে হবে না। সম্ভব হলে আপনার দুই মেয়ের জন্য কিছু নিয়ে যান।”

“তা তো নেবোই। তুমিও বলো কিছু। আমার তো... কোনো ছেলে নেই।”

“আমারও কোনো ছোট ভাইবোন নেই চাচা। আর ওরা আমার ছোট বোনের মতোই। আমিও কিছু পেলে ওদের জন্যে নিয়ে যাই।”

“তুমি কি ব্যস্ত?”

“হ্যাঁ। আরকি, এক জায়গায় যেতে হবে।”

“আচ্ছা, যাও তাহলে। আর শোনো, একদিন দুপুরে তোমার আর জহির ভাইয়ের দাওয়াত থাকলো আমাদের বাড়িতে। তোমার যেদিন সময় হয়, ভাইকে বলে রেখো।”

“ঠিক আছে।”

মারুফ সন্তুষ্ট চিত্তে চশমাটা খুললেন। সেটা বুকপকেটে রাখলেন সযত্নে। মনে মনে আবার হিসেব কষতে লাগলেন। মেয়েদুটোর স্কুল, কলেজ আর স্যারদের বেতন যা বাকি আছে, সব মিটিয়ে ফেলবেন। তারপরই অন্য কোনো খরচের কথা ভাববেন তিনি।

মাগুর মাছের তরকারিটা খারাপ হয়নি। মার্জিয়া অতি উৎসাহে মশলা বেশি দিয়ে ফেলেছে ঠিকই, তবে খেতে ভালোই হয়েছে। সে একে একে সবার দিকে তাকাচ্ছে। সবার মুখের ভাব বোঝার চেষ্টা করছে। মারুফ খুশি হয়ে বললেন, “ভালোই রেঁধেছে ছোট মা।”

রিপন মাথা দোলায়, “হুম। লবণ বেশি হয়েছে।”

মার্জিয়া তার মামার মুখের দিকে তাকায় তপ্ত দৃষ্টিতে। তারপর ঐ বাঁকা মন্তব্য এড়িয়ে যাওয়ার ভান করে, “পুরোটা আমি বানাইনি। আম্মা সাহায্য করেছেন।”

রাবেয়া স্বামীর পাতে মাছের টুকরো তুলে দিলেন, “আরেকদিন মৌ রান্না করবে। আজকে ওর শরীরটা একটু খারাপ ছিলো তো।”

মারুফ বড় মেয়ের দিকে ঘুরলেন। দেখলেন, খুব অল্প ভাত তার পাতে। সেটাও ঠিকমতো খাচ্ছে না সে। থালার উপরে অহেতুক আঙুল ঘোরাচ্ছে। চোখজোড়া স্থির। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে।

“একটু তরকারি নাও।”

মৌমিতা যেন আব্বার কথাটা শুনতেই পারেনি। আগের মতোই অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকে সে।

“মৌ মা? শুকনো ভাত নিয়ে বসে আছো কেন? তরকারি নাও।”

মেয়েটা ডানে-বামে মাথা নাড়ে, মৃদু প্রতিবাদ জানায়, “উঁহু।”

মার্জিয়া একটু আক্ষেপ করে বলে, “নাও না একটু—”

মারুফ আর কোনো পূর্বসংকেত না দিয়েই, সরল মনে চামচভর্তি তরকারি তুলে দিলেন মেয়ের প্লেটে। মৌমিতা শুরুতেই চমকে উঠলো, তারপর বিরক্ত হয়ে আব্বার দিকে তাকালো। আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে প্লেটটা ঠেলা দিয়ে সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো। রাবেয়া তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেন, “মৌ?”

মৌমিতা হনহন করে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়ে। ডাইনিং টেবিলে অবস্থানরত মানুষগুলো হতভম্ব হয়ে বসে থাকে খানিকক্ষণ। রিপন শুধু একবার গম্ভীর স্বরে বলে, “বাপের মতোই জেদ মৌয়ের!”

রাবেয়া তাকে চোখ রাঙালেন। রিপন তা গ্রাহ্য করলো না। মারুফের অবশ্য কোনোদিকে খেয়াল নেই। তিনি গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে গেলেন। হাতে তুলে রাখা লোকমাটাও তার মুখ পর্যন্ত পৌঁছালো না।

রান্নার ব্যস্ততায় মার্জিয়া গোসল করতে পারেনি। বিকেলের দিকে সে জামা-কাপড় নিয়ে গোসলখানায় গিয়ে ঢুকেছে। রাবেয়া ঘরে ঢুকে বড় মেয়েকে ভালোমতো শাসিয়ে এসেছেন। তাতে কাজ হয়নি, একটুও দানাপানি খাওয়াতে পারেননি তাকে। শেষের দিকে খুব আদর করে বোঝালেন, মেয়েটা তবু একচুল পরিমাণ নড়লো না।

এখন মারুফ দোকানে যাবেন। যাওয়ার আগে মেয়েদুটোর ঘরের দ্বারে গিয়ে দাঁড়ালেন। মৌমিতা টেবিলে হাত গুটিয়ে মাথা রেখে বসে আছে, মুখটা দেয়ালের দিকে। তার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন মারুফ, “এভাবে রাগ করে না খেয়ে থাকা যায় না। খেয়েদেয়ে রাগ করে বসে থাকো। আসো।”

মৌমিতা ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে নিজের মানসিক ক্লান্তিটা জানান দেয়ার চেষ্টা করে। বিড়বিড় করে বলে, “আমার ডায়েরি পড়লেন কেন?”

কথাটা মারুফ স্পষ্টভাবে শুনতে পারলেন না। তিনি কিছুটা ঝুঁকে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে মা?”

মেয়েটা কিছু না শোনার ভান করে বসে রইলো আগের মতোই। মারুফ তার মাথায় হাত বুলিয়ে মমতামাখা কণ্ঠে বললেন, “মৌ মা? আসো খাও।”

মৌমিতা তৎক্ষণাৎ তার হাতটা ঠেলে সরায়, আবার মুখ লুকিয়ে বসে পড়ে, ভাঙা স্বরে বলে ওঠে, “আমাকে ‘মা’ বলে ডাকবেন না। আমি আপনার মা নই।”

খন্দকার সাহেব বলতে পারলেন না কিছুই। অসহায়ের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর আবার ডেকে উঠলেন, “মৌ মা?”

“বললাম তো, মা বলবেন না! এতো আদিখ্যেতা করার দরকার নাই।”

কান্না আটকানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করে মৌমিতা। এরপর কেটে যায় বেশ কিছুটা সময়। আর কেউ ‘মা’ ডেকে সাধাসাধি করলো না তাকে। সে মাথা তুলে পাশ ফিরে দেখে, আব্বা চলে গেছেন। ঘর ফাঁকা, দরজাটা চাপানো। মেয়েটা গলার কাছে ভারী কিছু অনুভব করে। দুই বাহুর মাঝে মুখ লুকাতেই তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রুর জোয়ার নেমে আসে। দুর্বল দেহখানি কেঁপে ওঠে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp