ভাব তরঙ্গ - পর্ব ১৯ - বেলা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

ভাব তরঙ্গ - বেলা শেখ
          বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সদস্য ফারুখ আহমেদ আর আয়নাল হক মিরপুর স্টেডিয়ামে উপস্থিত। রোদচশমা আর মাথায় সাদা ক্যাপ পরে ছেলেদের খেলা দেখছে আর নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে। বেলা ঠিক মাথার উপর হওয়ায় তীর্যকভাবে তেজস্বী রোদ মানব শরীরে ঘাম ছোটাচ্ছে। কথা বলার এক ফাঁকে ফারুখ আহমেদ বললেন,

“ব্যাট করছে ছেলেটাকে চিনেন?”

আয়নাল হক ব্যাট হাতে ছক্কা চার হাঁকা ছেলেটার দিকে তাকায়। একটা বলও ছেড়ে দিচ্ছে না। প্রতিটি বল বাউন্ডারির বাইরে। সে মুগ্ধ চোখে সেদিকে তাকিয়ে থেকেই জবাব দিলো, “হুম হু, লাস্ট বিপিএলে হাইয়েস্ট উইকেট টেকারের মধ্যে থার্ড পজিশনে আছে। বাট ব্যাটিং পজিশন খারাপ।”

“এখন কেমন খেলছে?”

“ভালো, দম আছে বলতে হবে। বাট উইদাউট প্রেসার সবাই ভালো খেলে। যে আন্ডার প্রেসারেও নিজের স্পিরিট ধরে রাখতে পারে সেই নায়ক।”

ফারুখ আহমেদ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলেন, “ছেলেটাকে ঠিকঠাক গড়িয়ে নিতে পারলে ভালো কিছু করতে পারে। আপনি একবার ভেবে দেখতে পারেন।”

“বলছো?”

“বলছি।” ফারুখ আহমেদের আত্নবিশ্বাসে আয়নাল হক আবারও ছেলেটার দিকে তাকান। বললেন, “মঈনুল হোসেনও সেম কথা বলেছিল। বাট আমি গুরুত্ব দেই নি। তুমিও যখন বললে একটাবার ভাবা যায়। বাড়ি কোথায়?”

“এলাকার ছেলে।”

আয়নাল বাঁকা দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে ফারুখ আহমেদ বললেন, “খুব সাধারণ ছেলে, কিন্তু খেলা দেখলে মনে হয় ছেলেটার মধ্যে কিছু একটা আছে, যা অন্য কারোর মধ্যে নেই। বিকেএসপি থেকে দেখে আসছি।”

“ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড?”

“বড়লোক বাপের ছেলে। ডিভোর্স হওয়ার পর ওঁর মা যখন চলে যায়। বাপ আরেকটা বিয়ে করে। সৎ মায়ের ঘরেই মানুষ।”

“ওর বাবা কি কাজ করে?”

“সরকার ফ্যাশন হাউজ….”

“অরুণ সরকারের ছেলে?”

আয়নাল হক কিছুটা বিস্মিত হয়। ছেলেটার সাদামাটা চলাফেরা দেখে বোঝা মুশকিল! ফারুখ আহমেদ সায় দিলে আয়নার হক বললেন, “ডাকো তো ওকে?”

ফারুখ আহমেদ ক্রিজের দিকে এগিয়ে যায়। হাত তুলে ইশারা করে বলল, “অরুণাভ, এদিকে আয়!”

অরুণাভ হেলমেট খুলে হাঁপায়। ব্যাট বগলে রেখে হাতের গ্লাভস খুলতে খুলতে এগিয়ে আসে। ভেজা কপালে আছড়ে পড়া চুল পেছনে ঠেলে দেয়। ঘাম গুলো বৃষ্টির ফোঁটার মতো পতিত হয়। ক্লিন শেভ করা চিকনা চোয়ালে গম্ভীর ভাব। সুশ্রী চেহারায় খেলে বেড়ায় অদম্য সাহস, চোখ দুটোয় চিকচিক করে দৃঢ় প্রত্যয়। সাদা পোশাকে আব্রুত যুবক এক নতুন স্বপ্নে অভিসারী!

“স্যার, ডাকছিলেন?” কণ্ঠে বাচ্চামো টোনটা গায়েব হয়ে পুরুষালী ভাঙা ভাঙা স্বর। ঢোঁক গিলতেই অ্যাদাম’স অ্যাপলের ওঠানামা!

“আয় তো আমার সাথে!” ফারুখ আহমেদ বলেই হাঁটা শুরু করে দিলেন। অরুণাভ তাঁর পায়ে পায়ে চলছে। ফারুখ আহমেদ হঠাৎ ধীমান কণ্ঠে বলল,
“সালাম কালাম দিস। আর ভদ্রভাবে কথা বলবি।”

অরুণাভের কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হয়। আয়নাল হকের সামনে দাঁড়িয়ে বিনম্রচিত্তে সালাম দেয়। আয়নাল হক সালামের জবাব নিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করেন, “নাম?”

“অরুণাভ সরকার!”

“ক্যাটাগরি?”

অরুণাভ সরকার দৃঢ়তার সাথে জবাব দিলো “লেফ্ট-আর্ম অর্থোডক্স স্পিনার এন্ড লেফ্ট হ্যান্ডেড ব্যাটার।”

“স্ট্রাইক রেট?”

“টি টোয়েন্টিতে ১২৫+, স্যার!”

“বলিং ইকোনমি?”

“৫.৭-৬”

অরুণাভের আত্নবিশ্বাসী, জড়তাহীন জবাবে আয়নাল হক ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন। দম আছে ছেলেটার! তিনি কপাল চুলকে খানিকটা ধীর কণ্ঠে বললেন,

“লাল সবুজ জার্সি গায়ে দিতে চাইলে পঁচাত্তর লাখ লাগবে। সামনে টি টোয়েন্টি খেলবে পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কায়। পারফর্ম ভালো হলে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে।”

অরুণাভ কতক্ষণ বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকায় ফারুখ আহমেদের দিকে। তা খেয়াল করে আয়নাল হক বলল, “ওর দিকে তাকিয়ে লাভ নেই। আমার দিকে তাকাও। আর বলো পঁচাত্তর দিতে পারবে কি-না? না দিতে পারলে বলো, আরো অনেকে টাকা হাতে বসে আছে। তোমার পারফরম্যান্স ভালো তাই তোমাকে চুজ করলাম!”

অরুণাভ ব্যাটের ভর দিয়ে দাঁড়ালো। হেলমেট বুকে ঠেস দিয়ে ধরে বলল, “স্যার বুঝলাম না। কিসের টাকা দিতে হবে?”

“লাল জার্সি গায়ে জড়াবে টাকা লাগবে না? সব এতোই সোজা! দেখো সময় নষ্ট না করে বলো রাজি কি-না! অবশ্য তোমার রাজি না হওয়ার কারণ দেখছি না। তোমার বাপের তো টাকার অভাব নেই।”

অরুণাভ হেসে বলল, “তা না থাকুক কিন্তু আমি টাকা দিতে পারবো না স্যার।”

“কেন? তুমি কি ভাবছো টাকা না দিয়েই ন্যাশনাল টিমে সিলেক্ট হবে? বালক ওতটাও ট্যালেন্টেড নও। তাছাড়াও বড় বড় ক্রিকেটাররাও টাকা দিয়েই টিমে জায়গা পেয়েছে।”

“স্যার, ভুল ক্রুটি মার্জনা করবেন। আমি ঘুষ দিয়ে বা কোনো প্রকার অসদুপায় অবলম্বন করে কিংবা দালাল ধরে টিমে সিলেক্ট হতে চাই না। আমি নিজ যোগ্যতায় দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখে এসেছি। দেশ যদি আমাকে যোগ্য না মনে করে, আমি খেলবো না।”

আয়নাল হক ফারুখ আহমেদের দিকে রুষ্ট দৃষ্টি ক্ষেপন করে বলল, “হি মার্কড মি দালাল! হাউ ডেয়ার হি?” কথা থামিয়ে অরুণাভের দিকে আঙুল তুলে শাসানোর সুরে বলে, “তোমার ক্রিকেট ক্যারিয়ার এখানেই শেষ। ব্যাগপত্র বেঁধে বাড়ি ফিরে যাও, রাইট নাও!”

অরুণাভ ব্যাটটা তুলে আবারও বগলের তলায় আঁটকে রাখলো। হেলমেট মাথায় পড়ে গ্লাভস পরতে পরতে বলল, “নয় বছর বয়স থেকে ক্রিকেট খেলি। ক্রিকেট আমার ইমোশন, আমার প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা। এত সহজে ছেঁড়ে ছেঁড়ে যাবো না স্যার। আব্বু বলে আমি একটু বেশি ঘারত্যাড়া স্বভাবের।”

“ভাব দেখাচ্ছো?”

“ভাবের তরঙ্গে ভাসছি স্যার!”

“দেখো ডুবে না যাও!”

“আমার লাইফজ্যাকেট আছে স্যার। আপনাকে ভাবতে হবে না।”

আয়নাল হক সুক্ষ্ম চোখে অরুণাভের প্রস্থান দেখলো। ওঁর লাইফজ্যাকেট কে? খোঁজ নিতে হয় দেখছি।

ক্রিজে ফিরে গিয়ে ব্যাটিং পজিশনে দাঁড়ায় অরুণাভ। ইশারায় বল করতে বলে। বল ছুঁড়লে অরুণাভ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাঁকে শূন্যে ভাসায়। বল গিয়ে আয়নাল হকের ঠিক মাথার উপর দিয়েই বাউন্ডারি পার করেছে। 

ছেলেটার সজারু দৃষ্টি যে তার দিকেই নিবদ্ধ, বুঝতে পেরে আয়নাল হক বাঁকা হাসলো। ফারুখের উদ্দেশ্যে বলল, “ছেলেটার উপর নজর রাখো। খুব শিগগিরই দেখা হবে!”

“বাচ্চা ছেলে… ওর কথায়…”

“বাচ্চা ছেলে? আমার তো অন্যকিছু মনে হলো। চলো হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি।” আয়নাল হক ও ফারুখ আহমেদ হাঁটতে হাঁটতে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

জোহরের আজান পড়তেই অরুণাভ খেলা বন্ধ করে সবার সাথে নামাজ সেরে নেয়। স্পোর্টস ব্যাগ কাঁধে ফেলে বাড়ির উদ্দেশ্যে স্টেডিয়াম ছাড়তেই ফোনটা টুং টাং সুরে গেয়ে ওঠে। অরুণাভ ফোন বের করে কতক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিসিভ করে বলল,

“বল, শুনছি!”

“বললি ভার্সিটিতে আসবি। এলি না যে?”

“কাজ পড়ে গেলো!”

“তোর আবার কিসের কাজ?”

অরুণাভ কিছু সময় চুপ থেকে গম্ভীর মুখে বলল, “বিসিবির দুজন সদস্য এসেছে মিরপুর স্টেডিয়ামে। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য নতুন মুখ বাছাই করা হবে তারই…”

“বুঝতে পারছি! আমি ভার্সিটিতেই আছি। তুই কি এ বেলা আসতে পারবি?”

“ইম্পোর্টেন্ট কিছু?”

আনিকা ঠোঁট চেপে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ম্লান হেসে বলল, “আমি তো তোর কাছে ইম্পোর্টেন্ট নই যে আমি বললেই আসবি। যাইহোক ইদানিং তোর খোঁজখবর পাওয়া যায় না তাই এমনি কথা বলতাম। ইম্পোর্টেন্ট কিছু না। আসবি?”

“দেখি!”

“দেখি না। ক্লিয়ার করে বল আসতে পারবি নাকি না।”

“আচ্ছা।”

আনিকার রাগ হয় প্রচুর। সে তেজদীপ্ত কণ্ঠে বলল, “কি আচ্ছা? হেঁয়ালি না করে স্পষ্ট কথা বল!”

“যেতে পারবো না আমি। কাজ আছে!”

বলে কল কেটে দেয় অরুণাভ। আনিকা ফোন কানে ঠেকিয়ে অনুভূতিহীন তাকিয়ে থাকে। তুবা তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলল, “দেখলি তো মানুষ কত দ্রুত রং বদলায়? আর তুই ওঁর কথায় নাচতে নাচতে কোর্ট ম্যারেজ করতে চলে যাচ্ছিলি! যদি সত্যিই করে নিতি! কি হতো তখন?”

আনিকা কান থেকে ফোন নামিয়ে বলে, “আমার মনে হচ্ছে ও আমার উপর অভিমান করেছে। তাই ইগনোর করছে। নয়তো আমি সময় চেয়েছি তাই আমাকে সময় দেওয়ার জন্য দূরত্ব বজায় রেখে চলছে।”

তুবা সহ আনিকার সবকটা বান্ধবী হতাশ হয়। আনিকা ওদের দিকে তাকিয়ে বলে, “তোরা বুঝতে পারছিস না! আমি ভোরকে চিনি। একসাথে হেসে-খেলে, মারামারি-ঝগড়া করে বড় হয়েছি আমরা। ও আমাকে কক্ষনো ঠকাবে না। ভোরের সিক্ত চোখে ভালোবাসারা পরিস্ফুটিত হয়। আমাকে খুব ভালোবাসে ছেলেটা।”

আনিকার আরেক বান্ধবী সুমি বলল, “দেখ আনি হয়তো ভোর সত্যিই তোকে ভালোবাসে। কিন্তু ভালোবাসাটা চিরকাল থাকবে তাঁর গ্যারান্টি নেই, তাই না? তুই সময় নিয়েছিস, ওকে অবজার্ভ কর। পরীক্ষা কর তোর প্রতি ওর ভালোবাসা কতটা স্ট্রং! তারপর তুই একটা সীদ্ধান্তে আহত পারবি। আগেই বোকার মতো বিয়ে শাদি করে বসিস না।”

আরশি ধীরতার সাথে বোঝাল, “ আঙ্কেল আন্টির কথাগুলোও মাথায় রাখিস। ওনারা তোর বাবা মা। নিশ্চয়ই তোর খারাপ চাইবে না, তাই না? আন্টির সাথে ভোরের ইস্যু আছে, তাই আন্টি তোর আর ভোরের রিলেশনে নারাজ। কিন্তু আঙ্কেল? আঙ্কেলের কাছে তো কোনো কারণ নেই ভোরকে রিজেক্ট করার! ভাতিজা হয়, বিয়ে হলে মেয়ে চোখের সামনেই থাকবে, সারাজীবনের জন্য। তারপরও কেন উনি রাজি হচ্ছেন না? ভোরকে ছেড়ে কেনই বা তৈমুর নেওয়াজকে তোর জন্য পার্ফেক্ট ভাবছে? নিশ্চয়ই কোনো ভেলুয়েবল রিজন থাকবে, তাই না?”

আনিকা টেবিলে মাথা এলিয়ে দিল। উদাসী সুরে বলল, “আব্বু ভাবছে আমরা একসাথে বেশিদিন স্টে করতে পারবো না। আমাদের মাঝে বোঝাপড়া ভালো না, বন্ডিংটা খুবই নড়বড়ে। তাছাড়াও আমরা প্রায় সমবয়সী। এক্ষেত্রে আন্ডারস্ট্যান্ডিং লেভেল কম হয়। আর এটা সত্যিই রে। আমরা দু'জনেই খুব জেদি, বদ রাগী। ত্যাড়ামি তো আমাদের রক্তে মিশে আছে। আর বিষয় যদি ইগোর হয় মাথা নোয়াবার প্রশ্নই আসে না। কিভাবে মিলবে আমাদের ভাব তরঙ্গ?”

“তৈমুরকে পছন্দ করার কারণ?”

আনিকা মুচকি হেসে বলল, “ওই শালা একটা চিজ ভাই। আমি এতো বিরক্ত করেছি কিন্তু কখনো মুখ দিয়ে উফ শব্দ বের করতে পারেনি। এক কথায় ডেলটা ম্যান। আর প্রায়োরিটির বিষয়টি আমার খুব ভালো লাগে। আমরা মেয়েরা কি চাই বল? একান্ত মানুষটির প্রায়োরিটির লিস্টে টপে থাকবো। পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমি বললে সব বাদ।”

আনিকার কথায় তাঁর বান্ধবী সমস্বরে ‘ওহ্ হো’ বলে টিজ করে। আনিকা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে, “বিরক্ত করিস না তো। এমনিতেই বাড়িতে ঝামেলার শেষ নেই। চাচ্চুরা বলা নেই কওয়া নেই, হুট করে বাড়ি ছেড়েছে। আব্বু রাগ করে কিছু বলে নি, জানতেও চায় নি কেন বাড়ি ছেড়েছে। মাস চারেক হবে আলাদা থাকছি সবাই। এর মাঝে আম্মু আবারও আব্বুর মাথায় তৈমুর নামক ভুত চাপিয়ে দিয়েছে। কি এক ঝামেলা! একথা ভোর জানলে না জানি কোন তুফান টেনে আনে! আর ওই তৈমুর নেওয়াজকেও বলি হারী। একবার রিজেক্ট হওয়ার পরও কোন আক্কেলে এমুখো হস? দেখা হলে ইচ্ছে মতো ঝেড়ে দিবো।”

—————

ফোন পকেটে ফেলে সামনে কদম ফেলতেই পেছন থেকে কোচ মঈনুল হোসেনের ডাক ভেসে আসে। অরুণাভ ঘুরে দাঁড়ায়। 

মঈনুল হোসেন এগিয়ে এসে অরুণাভের পিঠ চাপড়ে বলল, “বদমাইশ, কনফিডেন্ট থাকা ভালো, কিন্তু অভার কনফিডেন্ট মানুষকে মুখ থুবড়ে ফেলে। আয়নাল স্যারকে কি বলেছিস?”

অরুণাভ মাথার টুপিটা খুলে পকেটে রাখে। গম্ভীর মুখে সামনে হাঁটতে হাঁটতে বলে, “কি বলবো?”

মঈনুল হোসেন রেগে গিয়ে বললেন, “একদম হেঁয়ালি করবি না। কি কথা হয়েছে তোদের মধ্যে?”

“আপনাকে বলেন নি উনি?”

“অরুণাভের বাচ্চা!”

“স্যরি কোচ। আমি নিজেই এখনও বাচ্চা। আমার বাচ্চা আবার কোত্থেকে আসবে?”

মঈনুল হোসেন শাণিত দৃষ্টি ক্ষেপন করে। অরুণাভ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, “পঁচাত্তর লাখ টাকা চাইছিলো।”

“কমই চেয়েছে। দিয়ে দে। তোর বাপের অভাব আছে নাকি?”

অরুণাভ শান্ত চোখে চায়, “এই জায়টাতেই বাংলাদেশ হেরে যায় কোচ। ট্যালেন্টকে টাকার দাড়িপাল্লায় তুলে কিভাবে কাপ আনবেন?  

মঈনুল হোসেন হেসে অরুণাভের কাঁধ চাপড়ে বললেন, “দুর্নীতি কোথায় নেই বল তো? ক্রিকেট অঙ্গনেও অহরহ দালাল ঘুরে বেড়ায়।”

“আপনি আমাকে দালালের ফাঁদে পা দিতে বলছেন?”

“আমি নিজেও অবাক আয়নাল ভাই একথা বলেছে। তাঁকে ভালোই ভেবেছিলাম।”

“আপনাকে কে বলল?”

“বলে নি। দেখলাম তুই ওদের সাথে কথা বলছিলি তাই আন্দাজ করলাম। আমি ভেবেছিলাম ভালো খবর পাবো। কিন্তু…”

মঈনুল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিছু সময় চুপ থেকে বললেন, “তোর ভেতর দম আছে। আমি আশায় আছি তোকে লাল সবুজ জার্সিতে খুব শিঘ্রই দেখতে পাবো।”

গম্ভীর অরুণাভের মুখে এ যাত্রায় এক চিলতে হাসি দেখা গেলো। সুন্দর দেখতে ছেলেটাকে হাসলে মন্দ লাগে না। মঈনুল হোসেন হাতঘড়িতে সময় দেখে শুধালেন, “কোথায় যাবি এখন?”

“আগে বন্ধুর বাড়ি তারপর নিজের বাড়ি।”

“সময় হবে? আমার একটু হসপিটাল যেতে হবে। তোর ম্যামের হাতটা পুড়ে গেছিল কিছুদিন আগে। আজকে আবার ড্রেসিং করাবে। মহিলা চিল্লাচিল্লি করবে, আর আমি ওসব কান্নাকাটি… মানে বুজছিস তো?”

“বুঝেছি, বউয়ের কান্নাকাটি দেখলে আপানার কান্নারাও বেরিয়ে আসে।”

মঈনুল হোসেন কটমট করে তাকালো। অরুণাভ তাঁর দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে রিকশা থামায়। 

“বড়লোক বাবার আদরের ছেলে! আমি ভাবছি গাড়িটারি সাথে আছে। রিকশা বেঁচে যাবে।”

অরুণাভ বাঁকা চোখে চেয়ে রিকশায় উঠে বসে। বলে, “আমার বাপ বড়লোক, আমি নই। যখন আমি বড়লোক হবো তখন গাড়ি সাথে নিয়ে ঘুরবো। উঠুন কোচ রিকশা ভাড়া আমিই দেব।” 

মঈনুল ইসলাম উঠে বসে অরুণাভের পিঠ চাপড়ে দিলো। ছেলেটাকে তাঁর প্রচন্ড ভালো লেগেছে। সেরকম কোনো পরিস্থিতি আসলে সে মেয়ে জামাই বানাতে দ্বিধাবোধ করবেন না। এরকম ছেলে কোটিতে একটা পাওয়া যায়।

—————

সনাতন ধর্মের বিয়ের রীতি অনুসারে নববধূ আলতায় পা ডুবিয়ে স্বামীর সংসারে প্রবেশ করে। গৃহ প্রবেশ যাকে বলে। নিজ পদচিহ্ন দেখে পত্রলেখার সেটাই মনে হচ্ছে। কিন্তু সে আলতায় নয়, রক্তের পদচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে সাদা টাইলসে। এক নার্স তাঁকে খেয়াল করে এগিয়ে আসে। ব্যতিব্যস্ত হয়ে পত্রলেখাকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যায়। নার্সের হাতের মুঠোয় বন্দি নিজ হাতের দিকে তাকায় পত্রলেখা। সে অনেকক্ষণ ধরে চাইছিল কেউ একজন তাঁর হাতটা ধরে অভয় দিক, ‘কিচ্ছু হবে না আমি আছি তোমার পাশে।’

“এই মেয়ে পা কিভাবে কেটেছো? যেভাবে রক্ত বের হচ্ছে, মনে হচ্ছে ক্ষত বেশ গভীর।”

পত্রলেখা নার্সের কথা শুধুই শোনে, বলার ক্ষমতা তাঁর নেই। নোটবুক আর কলমটাও সঙ্গে আনা হয় নি। কিভাবে হবে ভাব বিনিময়?

“কথা বলছো না কেন? তুমি একা এসেছো? সাথে কেউ আসে নি?”

পত্রলেখা এবার মাথা নাড়লো, কেউ আসে নি। কে আসবে? তাঁর যে কেউ নেই। তাঁর নীরব উত্তরে নার্স একপল তাঁর দিকে তাকালো। তারপর ব্যস্ত পায়ে কেবিন অবদি নিয়ে গেলো তাঁকে।

কেবিনে ঢুকতেই পত্রলেখার নজর কাড়লো কালো শার্ট পরিহিত এক যুবক। গম্ভীর মুখে বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই আরেক বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে। বয়স্ক লোকটাকে না চিনলেও যুবককে চিনে সে। তাঁর ব্যথাতুর মন কি ভেবে যেন খুশি হয়ে গেলো। এই দুঃসময়ে অবশেষে চেনা কাউকে পেয়ে গেলো। পত্রলেখা না চাইতেই গোঙানির মত গোঁ গোঁ ধ্বনি সৃষ্টি করে। খুবই করুণ শোনায় সেই অসহায়ত্ব ভরা সুর।

 যুবক সহ বয়স্ক লোকটা, এমনকি ডাক্তারও অদ্ভুত শব্দের সন্ধানে পত্রলেখার দিকে তাকায়। পত্রলেখা সেই যুবকের দিকে তাকিয়ে, চাহনিতে অধাধ আশার আলো। যুবকটির মাঝে অবশ্য কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেলো না। সে আলগোছে মুখ ফিরিয়ে সামনে তাকায়। যেন পত্রলেখা নামক প্রাণীটিকে সে জীবনে দেখেই নি। 

পত্রলেখার সমস্ত খুশি চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। সে তবুও আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। নার্স তাঁকে ঝাড়ি দিয়ে বেডে বসায়। পায়ের পাতায় বাঁধা রক্ত ভেজা ওড়না খুলতেই তাজা রক্তের ধারা প্রভাবিত হয়। 

“হায় আল্লাহ! কিভাবে কেটেছে? কাঁচ বিঁধেছিল নাকি? মনে হচ্ছে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। কে বের করেছে, তুমি? এই মেয়ে কথা বলছো না কেন? হ্যাঁ?”

নার্সের ঝাড়িতে পত্রলেখা টলমল চোখে চায়। ঠোঁট উল্টিয়ে ফোঁপায়। ইশারায় বোঝায় সে কথা বলতে পারে না। নার্স বিস্ফোরিত চোখে কতক্ষণ তাকিয়ে রইল। 

“স্যার, পেসেন্ট বোধহয় কথা বলতে পারে না। ক্ষত বেশ গভীর। সেলাই লাগবে। প্রচুর ব্লাড লস হয়েছে। বোকা মেয়েটা একাই এসেছে। সাথে কাউকেই আনে নি।”

ডাক্তার পত্রলেখার দিকে একপল তাকিয়ে আবারও পূর্বের রোগীর পোড়া হাতে ড্রেসিংয়ের কাজ করতে করতে বলল, “সিস্টার, দ্রুত বায়োডিন দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে নিন। আর পায়ের তালুতে লিডোকেইন ইনজেক্ট করুন। অবস হতে হতে আমি এই কাজটা শেষ করছি। আর মিস পেসেন্ট, দ্রুত বাড়ির লোকদের কাছে খবর পাঠান। একজন অভিভাবক তো লাগবেই।”

পত্রলেখা ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে মায়ের নাম্বারে লাগাতার মিসড কল করে যায়, টেক্সট পাঠায়। রিকশায় বসেও সে একই কাজ করেছে কিন্তু সাঁড়া পায় নি, এখনো পেল না। একসময় হতাশ হয়ে ফোনের নোটবুকে কিছু লিখে নার্সকে দেখায়,

“আমার চিকিৎসা করুন, ফিস নিয়ে ভাববেন না। ব্যথায় নিজেকে পাগল পাগল লাগছে।”

নার্স মায়া ভরা চোখে তাকালো পত্রলেখার দিকে। মাথায় হাত বুলিয়ে নিঃশব্দে সান্ত্বনা দিলো। ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ইনজেকশন পুশ করে দেয়। পত্রলেখা একটু পরপরই যুবকটির দিকে তাকায়। কিন্তু যুবকটি ভুলক্রমেও তাঁর দিকে তাকাচ্ছে না। কি নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন একটা। মানবতার খাতিরেও তো তাকাতে পারে। 

মঈনুল হোসেনের স্ত্রীর পোড়া ক্ষতের ড্রেসিং হয়ে গেলে অরুণাভ সরকার তাকে নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। পত্রলেখার দিকে একটিবার ফিরেও তাকায় না। 

ডাক্তার মঈনুল হোসেনকে বিদায় করে পত্রলেখার কাছে আসে। ক্ষত সেলাইয়ের প্রস্তুতি নেয়। পত্রলেখা ভয়ে আবারও অদ্ভুত শব্দমালা জপে। পা টেনে নেয়। ডাক্তার নার্সকে ইশারা করলে নার্স পা চেপে ধরে। সুই শরীরে বিঁধতেই পত্রলেখার চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসে। ভয়ে কাঁপতে থাকে। ভাসা ভাসা জলদিঘী হতে বড়বড় অশ্রুরা ঝড়ে পড়ে বিরামহীন। অনুভব করে বিশাল এই দুনিয়ায় সে কতটা একা! হাতটা ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কেউ নেই তার, কেউ নেই। 

জারুল ফুল রঙা চেক লেডিস শার্ট, ফ্লেরড জিন্স, গলায় স্কার্ফ বাঁধা। কেশগুচ্ছ পাঞ্চক্লিপে বাঁধা পড়েছে। অবাধ্য চুল গুলো বাঁধন ছিন্ন করে দমকা হাওয়ায় এলোমেলো উড়ছে। ভাসা ভাসা মনোমুগ্ধকর চোখ দুটো যেন জলদিঘী। ব্যান্ডেজে মোড়ানো পা নিয়ে পত্রলেখা ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে আসে। গোড়ালিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। পায়ের পাতা অবশ হয়ে থাকায় ব্যথা খুব একটা মালুম হচ্ছে না। কিন্তু সাদা ব্যান্ডেজ রক্তিম হয়ে আসতে দেখে পত্রলেখা ঘাবড়ে যায়। হাঁপানি রোগীদের মতো জোরে জোরে শ্বাস টানে। চোখের সামনে পুরনো যুগের ঝিরিঝিরি টিভির চ্যানেল ভাসে। বলহীন হাতে থাকা প্রেসক্রিপশন দমকা হাওয়ায় উড়ে যায়। ব্যস্ত ফুটপাতে অষ্টাদশী মাথা ঘুরে পড়ে গেলো। তাঁকে নিয়ে ফুটপাতে ছোটখাটো হুলস্থুল বেঁধে গেলো নিমিষেই। পত্রলেখা আধো আধো শুনতে পায়। শ্বাস নিতে কষ্ট হয় বিধায় হা করে বড় একটা দম নেওয়ার চেষ্টা করে। তখনই কারো বাহুডোরে আবদ্ধ হয় সে। কারো হৃদযোগে চলমান ধুকপুক শব্দ শ্রবণেন্দ্রিয়ে এসে আলোড়ণ সৃষ্টি করে। পত্রলেখা আচানাক চোখ মেলে তাকালো। চেনামুখটার দর্শনে স্বস্তিবোধক দম ছেড়ে আবারও চোখ বুজে নিল সে।

“এ্যাঁই পত্রলেখা… শুনছো, পত্রলেখা?”

গালে আলতো চাপড় মেরে ধীমে ধীমে ডাকে অরুণাভ সরকার। পত্রলেখা শোনে না, জ্ঞান হারিয়েছে। মুখটা হা করা! এক পথচারী বলে, “শ্বাস নিতে পারছে না, কেউ শ্বাস দাও!”

অরুণাভ পথচারীর দিকে তাকালো। আশেপাশে সবাই পুরুষ মানুষ। কে দিবে শ্বাস? অরুণাভ লম্বা শ্বাস টেনে নেয়। হাতটা মুঠোয় ভরে পত্রলেখার ঠোঁটে চেপে ধরে নিজ মুঠোয় ফুঁ দেয়। প্রক্রিয়া কার্যকরী হলো কি-না বোঝা গেলো না। অরুণাভ কাজটা অব্যহত রাখলো। এক ফাঁকে বলল,

“কেউ পানি আনুন, আর ওই যে প্রেসক্রিপশনটা ধরুন তো!”

একজন প্রেসক্রিপশন তুলে অরুণাভের পকেটে রেখে দেয়। আরেকজন পানির বোতল এনে পত্রলেখার মুখে পানির ছিঁটা দিতে থাকে। একটু পানি মুখের ভেতরও ঢেলে দেয়। তার একটু পরপরই হা করে বড় শ্বাস টেনে পত্রলেখা হুঁশে ফিরে। দূর্বল চিত্তে চোখের পাতা মেলে দেয়। বুঝতে পারে কার বাহুডোরে তাঁর অবস্থান। কার হৃদযোগের ধুকপুক শব্দ তাকে পেরেশান করছে। পারফিউম আর ঘামের মিশ্রণে তৈরি হওয়া ঝাঁঝালো গন্ধ তাঁর হৃদবাড়িতে ঝড় তুলে দিচ্ছে। 

“পত্রলেখা তুমি শুনছো আমাকে?”

পত্রলেখা চোখ পিটপিট করে। পানির ঝাপটা তার চোখের পাতা ভারী করে দিয়েছে। তাকাতে সমস্যা হচ্ছে। শক্ত খসখসে হাতটা তাঁর মুখ মন্ডলের পানি মুছে নিলো। পত্রলেখার চোখ দুটো টলমল করে উঠলো।

“এ্যাঁই মেয়ে কথা বলছো না কেনো?”

বলেই আহম্মক হয়ে যায় অরুণাভ। সে ভুলে গিয়েছিল মেয়েটা কথা বলতে পারে না। পত্রলেখা ম্লান হাসলো। হাসতে হাসতেই তারপর ঠোঁট উল্টে ফুঁপিয়ে কেঁদে দিলো। হস্তদ্বয় অরুণাভের বুক পকেটের শার্ট মুঠোয় ভরে নিয়েছে। মুখটাও হৃদযোগের খুব কাছে। অরুণাভের ভেতর সত্ত্বা কেঁপে উঠলো। খানিক্ষণ বিমূঢ় হয়ে থেকে বলল, 

“কান্নার কি হলো? এ্যাঁই পত্রলেখা?”

নাহ্ মেয়েটা যেন জেঁকে বসতে চাইছে। অরুণাভ হাতটা সরিয়ে বলল, “আমি হেল্প করছি, তুমি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করো।”

পত্রলেখা কিছু পল গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর নিজে নিজেই ওঠার চেষ্টা করলো তবে সফল হলো না। অরুণাভ বাহু ধরে দাঁড় করিয়ে দেয়। 

“হাঁটতে পারবে কি?”

পত্রলেখা পায়ের ব্যান্ডেদের দিকে তাকালো। অরুণাভও পায়ের দিকেই তাকিয়ে। তালুর ব্যান্ডেজ লাল হয়ে এসেছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ব্যান্ডেজ চেন্জ করা উচিত।”

পত্রলেখা না বোঝায়। অরুণাভ জিজ্ঞেস করে, “হাঁটতে তো পারবে না, আমি কোলে নিলে অসুবিধা হবে? বড় ভাইয়ের মতো ভেবে নাও।”

বড় ভাইয়ের মতো…পত্রলেখার মাথা চক্কর দিলো। অরুণাভ দ্বিধাচিত্তের সাথে পত্রলেখাকে পাঁজা করে ক্লিনিকে ফিরে যায়।

“মামুনি, পেছন গাড়ি আঁটকে জ্যাম লেগেছে। গাড়ি ছাড়বো?”

 ড্রাইভার পেছন সিটে বসা আনিকার দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করে। আনিকার দৃষ্টি, গ্লাস নামানো জানালা ভেদ করে রাস্তার ধার ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লিনিকের সদর দরজায়। সদ্যই এক যুবক এক সুন্দরী রমনীকে সযত্নে কোলে নিয়ে ভেতরে চলে গেলো। সে এই পথেই যাচ্ছিলো। ফুটপাতে অরুণাভকে দেখে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলে। গ্লাস নামিয়ে ডাকও দিয়েছিল। কিন্তু অরুণাভ শুনতে পায়নি। তারপরের দৃশ্য টুকুর সে প্রত্যক্ষ দর্শক।

প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে ফার্মেসী থেকে ওষুধ পত্র সংগ্রহ করে অরুণাভ ওয়েটিং জোনে ফিরে আসে। 

“তোমার মা ফোন ধরলো?”

পত্রলেখা মায়ের নাম্বার থেকে ইনকামিং কল কেটে মুখ তুলে না বোধক মাথা নাড়ে। অরুণাভ নিম্ন ওষ্ঠাধর কামড়ে ভাবলো কতক্ষণ। বলল, “ঠিকানা বলো আমি পৌঁছে দিচ্ছি।”

পত্রলেখা ফোনের নোটবুকে কিছু টাইপ করে ফোনটা মেলে ধরে। সেথায় ঠিকানা লেখা আছে। অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বলল, “গার্লস হোস্টেল! তুমি হোস্টেলে থাকো? কিন্তু কেন?”

পত্রলেখা কপালে হাত ঠেকিয়ে হতাশ ভরা মুখ বানায়, পোড়াকপাল। অরুণাভ রিকশা ঠিক করে এসে পত্রলেখাকে নিয়ে যায়।‌ রিকশায় বসিয়ে দিয়ে বলে, “মামা তোমাকে হোস্টেলের সামনে নামিয়ে দিবে। যেতে পারবে না?”

পত্রলেখার উজ্জ্বল মুখখানি অনুজ্জ্বল হয়ে আসে। ভাসা চোখের চাহনিতে একাকীত্বের ছোঁয়া। সে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। ওষুধের পলি উঁচিয়ে ইশারায় দাম জানতে চেয়ে, পার্স খুলে টাকা গুনতে থাকে। বেশ কয়েকটা হাজার টাকার নোট। অরুণাভ থমথমে মুখে বলল, “টাকা দিতে হবে না, পত্রলেখা। মামা, আপনি রিকশা ছাড়েন।”

পত্রলেখা জোর করেই হাজার তিনেক টাকা অরুণাভের শার্টের পকেটে গুঁজে দেয়। অরুণাভ আর কিছু বলল না। রিকশা ছাড়তেই পত্রলেখা নীরব কান্নায় বুঁদ হয়। বুকের বা পাশে অদ্ভুত চিনচিনে ব্যথার উদ্রেক হয়। ক্ষণিকের আলাপনে সে যতটা খুশি হয়েছিল, তাঁর চেয়ে বেশি দুঃখ এখন হচ্ছে। আফসোস হচ্ছে, দেখা না হলেই তো পারতো। হঠাৎ রিকশা থেমে যায়। পাশে এসে বসে কেউ।

“দেশের সুনাগরিক হিসেবে আমার কর্তব্য তোমাকে হোস্টেল অবদি পৌঁছে দেওয়া।”

তাঁর ফিরে আসায় পত্রলেখা খুশি হতে পারলো না।পাখি যে আবার যে চলে যাবে। তাঁর নীড়ে হয়তোবা আর কোনোদিন ভিড়বে না। 

হোস্টেলের ম্যাট্রনের হাতে পত্রলেখাকে হস্তান্তর করেই অরুণাভ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ম্যাট্রন পত্রলেখাকে কতক্ষণ ঝাড়লো। পা কেটে গেছে, তার কাছে আসলেই সে ক্লিনিক নিয়ে যেতো। পাকনামি করে একা যেতে কে বলেছে? পত্রলেখা নতমুখে সব ঝাড়ি শোনে। সেসময় তাঁর মাথা ওত কাজ করে নি। শুধু মনে হচ্ছিলো, এ দুনিয়ায় তাঁর ঘায়ে মলম লাগানোর কেউ নেই। নিজ ঘায়ে নিজেকেই মলম লাগানো উচিত। 

সে অরুণাভের দিকে তাকায়। মুচকি হেসে এক হাতের আঙুলগুলো একসাথে রেখে, হাতের আঙুলের ডগা চিবুকে ছুঁইয়ে তারপর হাতটা সামনের দিকে আলতো করে এগিয়ে নেয়, ধন্যবাদ। অরুণাভ তাঁর ইশারা ইঙ্গিত কিছুই বুঝলো না। তবে ভদ্রসুলভ একটা হাসি উপহার দিয়ে ফিরে গেল তাঁর গন্তব্যে!

পত্রলেখা হোস্টেল রুমে নিজ বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকে। সারা অঙ্গে মৃদু কম্পন টের পায়। ব্যথায় জ্বর আসবে, তাই বুঝি এরকম অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে? কিন্তু এই অনুভূতিটুকুন মিষ্টি মিষ্টি। জ্বরের অনুভূতি তো তিতকুটে স্বাদের হওয়ার কথা। পত্রলেখা মুচকি হেসে নিজেই নিজেকে জড়িয়ে নিলো। শরীর থেকে অন্যরকম একটা গন্ধ তাঁর নাকে এসে লাগছে। সুখ সুখ গন্ধ! ফোনের রিংটোনে পত্রলেখার ভাবনাচ্ছেদ ঘটে। বালিশের পাশ থেকে ফোনটা বের করে। মা ভিডিও কল দিয়েছে। রিসিভ করে কানে ঠেকাতেই মায়ের উদ্বিগ্ন গলা ভেসে আসে,

“কি হয়েছে তোমার, পত্র? ফোন, টেক্সট দিয়েছিলে আমি দেখামাত্রই কল ব্যাক করেছি। কিন্তু তুমি বারবার ফোন কেটে দিচ্ছিলে। রাগ হয়েছে সোনাটার?”

পত্রলেখা মাথা নেড়ে না বোঝায়। পপী চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “চোখ মুখ ওমন লাগছে কেন? অসুস্থ তুমি?”

না বোধক মাথা নাড়ে পত্রলেখা। পপী চৌধুরী স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন, “আমি শুক্রবারে আসবো তোমাকে দেখতে। সেদিন আমরা একসাথে অনেক সময় কাটাবো। আচ্ছা তোমার কি কি চাই টেক্সট করে দাও। আসার সময় আমি নিয়ে আসবো।”

পত্রলেখা ফোন কেটে তাঁর কি কি চাই মাকে টেক্সট করে দেয়। সে তো রোজগার করতে পারে না, তাই সব কিছুর জন্য মায়ের উপরেই নির্ভর হয়ে থাকতে হয়। মা বুকে না রাখতে পারলেও তাঁর সব খরচ বহন করে। একটা পরিবার ছাড়া কখনো কোনো কিছুর অভাব দেয় নি। 

—————

পাতা ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে। ছোট্ট প্রহর তাঁর বাড়ন্ত পেটে কান পেতে কিসব আজগুবি আজগুবি কথা বলছে তাঁর অনাগত ভাই/বোনের সাথে। পাতা সেসব শুনে হাসে। মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চায়,

“তুমি কি খুশি?”

“না, আমি প্রহর। তবে তুমি বোনের নাম খুশি রাখতে পারো। ইটস আ সুইট নেম।”

প্রহর বিজ্ঞ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলে সব। পাতা ছেলের গাল জোড়া টেনে টেনে বলে, “পাকনা বুড়ো আমার আব্বাজান। বোন হবে কে বলেছে?”

“পাপা বলেছে!”

সিঙ্গেল সোফায় বসে মোবাইলে গুঁতোগুতি করা বাবাকে দেখিয়ে বলে প্রহর। পাতা তাকে জিজ্ঞেস করে, “কি করে বুঝলেন মেয়ে হবে?”

অরুণ নজর তুললো। বাড়ন্ত পেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “মন বললো তো!”

“আব্বু মন কি কথা বলতে পারে?”

প্রহরের প্রশ্নে অরুণ আত্নসমর্পন করে নিলো, “আমি জানি না। তুমিই বলেছিলে তোমার বোন চাই। তাই আমি বলেছিলাম বোন-ই হবে দেখেনিও।”

পাতা ছোট ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো, “যদি ভাই হয়?”

“আই হ্যাভ নো প্রবলেম মাম্মাম। কিন্তু আমি, ভাইটুস, আপুনি, আরেকটা পিচ্চি আপুনি। হলো না ইকুয়াল ইকুয়াল?”

পাতা ছেলেকে কাছে টেনে আদরে আদরে ভরিয়ে দিল। প্রহর মিটিমিটি হাসে। হঠাৎ হাসি থামিয়ে বাড়ন্ত পেটের দিকে তাকায়। ছোট্ট মনে গভীর একখানা প্রশ্ন হাজির হয়। সে কালবিলম্ব না করে প্রশ্ন করে,

“মাম্মাম, তোমার টম্মিতে বাবু কে দিয়ে গেছে?”

পাতা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো প্রশ্ন শুনে। সিঙ্গেল সোফায় বসা অরুণ সরকারও ফোন থেকে মুখ তুলে তাকালো একবার। প্রহর মায়ের বাহু ঝাঁকিয়ে বলে, “বলো না মাম্মাম?”

“ভালো পরী দিয়ে গেছে!” 

“কিভাবে দিয়েছে?”

পাতা আমতা আমতা করে বলল, “পাখিদের মতো পরীদেরও দুটো ডানা আছে। একটা জাদুর কাঠি আছে। ডানা দিয়ে উড়ে এসেছিল। আর জাদুর কাটি ঘুরিয়ে জাদু করে বাবু দিয়ে গেছে!”

প্রহর চোখ বড় বড় করে রেখেছে। যেন কান না, সে চোখ দিয়েই কথা শুনছে। পাতা ছেলেকে চুপ থাকতে দেখে স্বস্তি পায়। কাশির শব্দে ছেলের বাপের দিকে তাকায়।

অরুণ সরকার ফোনে নজর রেখেই বলল, “আমার তো ডানাও নেই, জাদুর কাঠিও নেই।”

কথা শেষ হতে না হতেই মুখ বরাবর কুশনের ঢিল লাগে। অরুণ ভোঁতা নাক ডলে। প্রহর স্বীয় কপালে চাপড় মেরে বলে,

“ওহ্ হো পাপা! মাম্মাম তোমার কথা বলছে না তো! মাম্মাম পরীর কথা বলছে। আচ্ছা মাম্মাম পরী এলে আমাকে কেন ডাকলে না?”

“ছোট সরকার, আপনাকে দেখে পরীরা লজ্জা পায়। তাই আপনি ঘুমে কাঁদো থাকলেই সব হয়।”

এবারের জবাব অরুণ সরকার দিলো। পাতার ফর্সা মুখটা রক্তিম হয়ে আসে। ছেলের অলক্ষ্যে ছেলের বাপকে চোখ রাঙায়। প্রহর কিছু সময় ভেবে বলল, “লজ্জা কেন পাবে? আমি কি পরীদের চুমু খেয়েছি? আমি শুধু আমার বউকে চুমু খেয়েছিলাম। তখন বউ লজ্জা পেয়ে মুখ ঢেকেছিল।”

অরুণ অত্যন্ত হতাশ বদনে ছেলের দিকে তাকায়। এই ছেলে এখন কথায় কথায় বউ বউ করে। তাদের তো জ্বালায়-ই সাথে টুটুলকেও ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন করে জ্বালাবে। পাতা ছেলেকে থামানোর জন্য বলল, “আগে হোম ওয়ার্ক শেষ করো তারপর কথা। যাও পাপার কাছে? অরুর পাপা, ওকে হোমওয়ার্ক গুলো করান তো।”

পড়াশোনার কথা উঠতেই প্রহরের মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়। কিছু বলবে অরুণ উঠে এসে ছেলের মুখ চেপে ধরে সেন্টার টেবিলের উপর বসিয়ে হাতে বই খাতা কলম ধরিয়ে দেয়।

রান্নাঘর হতে টুংটাং শব্দ আসে। পাতা সেদিকে তাকিয়ে দেখে অরুণিতা চায়ের কাপে চামচ ঘটঘটাচ্ছে। সে চড়া গলায় বলে, “আম্মু, আমার জন্যেও এক কাপ চা বানাস তো!”

“আপুনি আমিও কিন্তু?” প্রহরও সুযোগ বুঝে হাত তোলে। অরুণ সরকার হাত নামিয়ে দিয়ে হোমওয়ার্ক করতে ইশারা করে।

অরুণিতা চার কাপ চা বানালো। ট্রে হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসে। এক কাপ মায়ের হাতে আর দুকাপ সেন্টার টেবিলের উপর রাখলো। নিজ কাপ নিয়ে মায়ের পাশেই বসলো সে। পাতা চায়ে চুমুক দিয়েই মেয়েকে প্রশংসায় ভাসায়। লোকটার মতো মেয়েরও রান্নার হাত দূর্দান্ত। কিছু রাঁধলে আঙুল চেটেপুটে খেতে বাধ্য। 

প্রহর ফুঁ দিয়ে চায় পান করে। মাথা নাড়িয়ে বলে, “আপুনি অনেক মজা হয়েছে খেতে।”

অরুণিতা চুপচাপ চায়ের কাপে ডুবে। তাঁর গম্ভীর চাহনি সেন্টার টেবিলে অবহেলায় পড়ে থাকা এক কাপ চায়ের উপর। যখন দেখলো চা থেকে ধোঁয়া ওঠা থেমে গেছে সে চায়ের কাপটা তুলে ফেরত নিয়ে গেলো। সিঙ্কে কাপ সহ চা ঠাস করে ফেললো। কাপটা তিন খন্ডে নিজ প্রাণ ত্যাগ করে পরপারে চলে যায়। তাঁর আহাজারিতে পাতা অবাক হয়ে বলল, “কি ভাঙলো রে?”

“আ কাপ ওফ টি!”

অরুণিতা থমথমে মুখে জবাব দিয়ে হনহনিয়ে দোতলায় চলে যায়। ছোট ছোট চোখ দুটোয় শিশির বিন্দুরা হাসছে। ভোঁতা নাকের ডগায় রাগেরা আসন পেতেছে। 

পাতা দোতলা থেকে নজর নামিয়ে অরুণের উদ্দেশ্যে বলে, “যেমন বাপ, তাঁর তেমন মেয়ে। এতো ইগো এদের বাপরে! আর কতদিন চলবে এসব?”

অরুণ সরকার প্রসঙ্গ এড়িয়ে ছেলেকে হোমওয়ার্ক বুঝিয়ে দেয়। পাতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আপনারা কি আপোষে আসবেন না? অরুর পাপা চার মাস কম সময়? অনেক হয়েছে, এবার মেয়েটার সাথে কথা বলুন। ওঁর মুখ দেখলেই বোঝা যায় আপনার সাথে কথা বলার জন্য কতটা তরপাচ্ছে। তাছাড়াও আপনিই তো বলেন, অরু মেয়ে কম মা বেশি। সেই মায়ের সাথে কথা বলছেন না আপনি!”

“ভুল করেছে, স্যরি বলুক তারপর…”

কলিং বেলের আওয়াজে অরুণ থেমে গেলো। আলগোছে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। বাইরে অরুণাভ দাঁড়িয়ে আছে। মুখখানা নিত্যদিনের মতোই ক্লান্তিতে আঁকা। অরুণ ছেলের কাঁধের স্পোর্টস ব্যাগটা নিজ হাতে তুলে নেয়। দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলে, “আজ এতো দ্রুত এলে যে?”

স্পষ্টতই খোঁচা। অরুণাভ তা হজম করতে স্বীয় কানের রিং ঘোরাতে ঘোরাতে ভেতরে ঢুকে। অরুণ বিষয়টা খেয়াল করে বলে, “তোমার জন্য সুন্দর ডিজাইনের একটা ঝুমকা বানিয়েছি। কাল অফিস গিয়ে নিয়ে এসো তো! আর হ্যাঁ নাকটাও ফুড়ো করলে বলিও কিন্তু, নোসপিনও বানিয়ে দিবো।”

অরুণাভ নাকের পাটা ফুলিয়ে বাবার দিকে তাকালো। দাঁত কটমট করে বলল, “আব্বু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু? আমি কিন্তু এক্ষুনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবো।”

“দরজা খোলাই আছে!”

অরুণাভ খোলা দরজার দিকে তাকায়। ছেলের মনোভাব বুঝে উঠতেই অরুণ সরকার দরজা লাগায়। আত্নসমর্পন করে বলে, “মজা করছিলাম তো। ভেতরে চলো, ফ্রেশ হয়ে খেতে আসো। আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি।”

অরুণাভ কিছু বললো না আর। মায়ের ডাক ভেসে আসতেই অরুণাভ ড্রয়িং রুমে চলে গেল। অরুণ চলে যায় রান্নাঘরের দিকে। 

পাতা ঈষৎ রাগ দেখিয়ে ছেলেকে বলে, “রাত কটা বাজে হুঁশ আছে তোমার? কোথায় ছিলে এতক্ষণ? কি করছিলে?”

অরুণাভ মুচকি হেসে মায়ের গাল আঁকড়ে ধরে। কপালে সস্নেহে চুমু দিয়ে বলল, “একটা শুট ছিল। সেখানেই ব্যস্ত ছিলাম।”

“কিসের শুট?”

“ওটা সিক্রেট! যখন দেখবে তখন শকড হবা।”

অরুণাভ মায়ের পাশে বসে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকায়। প্রহর মুখ বাঁকিয়ে খাতায় শব্দ বুনতে থাকে। গালটা ফুলিয়ে রেখেছে। অরুণাভ নিজ মুখটা গম্ভীর বানালো। আড়চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “কারো কি অনেক বেশি আদর চাই? যদি চায় তাহলে যেন আমার কাছে চলে আসে।”

প্রহরও বাবার মতো গোমড়া গোমড়া মুখ বানানোর চেষ্টা করে বলল, “কারো আদর চাই না আমার। আমার বউকে কেন বকবে?”

অরুণাভ বাঁকা চোখে চাইলো। পত্রলেখার সুন্দর কায়ার মুখটা মানসপটে ভাসলো। মেয়েটার শরীরের হাল কেমন এখন? সে প্রহরকে বলল, “আমি কাউকে বকি নি।”

“বকেছো, টুটুল ভাইয়া সব বলে দিয়েছে আমাকে। তুমি চাও না আমার বউ আমার কাছে থাকুক। আমার কাছে ফিরে আসুক। তুমি হিংসে করো তাই না?” 

প্রহরের মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে এসেছে। এক্ষুনি কেঁদে ভাসাবে। অরুণাভ হতাশ হয়। এই এক কথা ভাইটির যখন মনে পড়বে তখনই অভিমান করে থাকবে। সে কেশে গলা পরিষ্কার করে নিলো। বলল, “আমি কেন হিংসা করবো?”

“কারণ তোমার যে বউ নেই। আমার বউ দেখে তোমার হিংসে হয়। তোমাকে কি মাম্মাম শেখায় নি হিংসে করা ভালো কাজ না?”

অরুণাভ কতক্ষণ কথা বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। এসব কোনো কথা! পাতা দুই ভাইয়ের কান্ডে ঠোঁট টিপে হেসে বলে,

“কে এই পত্রলেখা? মেয়েটা দেখছি খুব দুষ্টু! দুই ভাইয়ের মধ্যে কলহ সৃষ্টি করেছে!”

প্রহর মায়ের প্রশ্নের জবাবে বলে, “আমার বউ দুষ্টু না। সে খুব সুইট আর প্রিটি। একদম তোমার মতো মাম্মাম। আদর আদর।”

পাতা মুখ বাঁকালো। ছেলের বউ বউ জপে বিরক্ত হয়ে বলল, “এরা এখনই বউ বউ করে। বিয়ে হলে যে কি করবে আল্লাহ মালুম। অরুর বাবা এমনি এমনি ভয় পায় না! বউ পেলে নিশ্চিত মা বাপকে চিনবে না।”

অরুণাভ মায়ের কথার প্রতিবাদে বলে, “কথাটা তোমার ছোট ছেলেকে বলো, আমাকে না। আমার সম্ভাবনা জিরো।”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ!”

“বউ এলে দেখা যাবে।”

“বউটউ কিচ্ছু আসবে না।”

“কেন?”

“আমি বিয়েই করবো না।”

অরুণাভ নিজ অভিব্যক্তি জানান দেয়। অরুণ সরকার শরবতের গ্লাস ছেলের সামনে রেখে বলল, “তুমি গিরগিটির কোনো অংশ কম নও আব্বু। ছোটবেলায় বিয়ের কথা উঠলেই কেঁদে কেঁদে বান ডেকে আনতে। বিশে পা দিতে না দিতেই বিয়ের জন্য ব্যাঙের মতো লাফাচ্ছিলে। ছ্যাঁকা খাওয়ার ফিলিং পেতেই বলছো জীবনেও বিয়ে করবে না। কিন্তু আমার সিক্সসেন্স বলছে, কদিন পর বউ এনে বলবে, আব্বু তোমার বউমা, আশির্বাদ দাও।”

পাতা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। হাসলো প্রহরও। অরুণাভ কোণা চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে শরবতের গ্লাসে চুমুক দিলো। এক চুমুকে সবটা সাবাড় করে গ্লাস ঠাস করে রেখে হনহনিয়ে চলে গেলো। তাঁর প্রস্থানে ড্রয়িংরুমে হাসির হাট বসলো। হঠাৎ অরুণ সরকার দোতলায় তাকায়। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে অরুণিতা তাদেরই দেখছিল। অরুণ তাকানোয় বাবা মেয়ের চোখাচোখি হয়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp